পেনশন ফান্ড বেসরকারিকরণের লক্ষ্যে কেন্দ্র সরকার দ্রুত আইন পাশ করতে চাইছে

অরবিন্দু দাশগুপ্ত

 



অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী

 

 

 

 

নানা কিছুর ইতিহাসের মতো কর্মক্ষম মানুষের বার্ধক্যে এসে বাকি জীবনটা চালানোর জন্য প্রাপ্ত বার্ধক্য ভাতা বা পেনশনেরও একটা ইতিহাস আছে। আজকের সময়ে যেমন সমস্ত মানুষের বেঁচে থাকার অর্থ হিসেবে পেনশনব্যবস্থা জনগণের সর্বস্তরে ছড়িয়ে পড়েছে, তেমনই মানুষের দীর্ঘ কর্মক্ষম জীবনের সঞ্চিত অর্থ পুঁজিপতিদের কারবারে লগ্নির অর্থ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। গত শতাব্দীতে আমেরিকা ও রাশিয়ার ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা একমাত্রিক রূপ ধারণ করেছে। অর্থাৎ পুঁজিবাদী বিশ্বই শেষ কথা। শ্রমিকশ্রেণির রক্ত-ঘামে খাটুনির যে অংশটি ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে তার ওপর ভোগদখলের অধিকার এখন পুঁজিপতিদের হাতে। বার্ধক্য ভাতার উদ্ভবের ইতিহাসের দিকে তাই একবার ফিরে তাকাই।

ইতিহাসে দেখা গেছে রোম সাম্রাজ্যে সৈন্যবাহিনি থেকে অবসর নেওয়ার পর রাষ্ট্রের তরফ থেকে অবসরে যাওয়া সৈনিকদের জমি দান করা হত। অগাস্টাস সিজর (খ্রিস্টপূর্ব ৬৩-১৪ খ্রিস্টাব্দ) প্রথম সেনাবাহিনির পেনশন চালু করে। ২০ বছর চাকরির পর অবসরের ভাতা হিসেবে ১৩ বছরের পারিশ্রমিক মোট অর্থ দেওয়া হত। এইটাই সেদিনের বার্ধক্য ভাতা ছিল। উক্ত অর্থ রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে ব্যয় করা হত। এরপর আমরা দেখি জার্মানির গোথার ডিউক আরনেস্ট দি পিয়াস ১৬৪৫ সালে বিধবা পেনশন চালু করেন। ১৫৯২-৯৩ ইংল্যান্ডে মিলিটারি পেনশন চালু হয়। ১৮১০ সালে ইংল্যান্ডে সরকারি কর্মীদের জন্য পেনশনব্যবস্থা চালু হয়। আমাদের দেশে ১৮৮১ সালে ব্রিটিশ ভারতে রয়্যাল কমিশন প্রথম সরকারি পেনশন চালু করে। যদিও তা ছিল ইউরোপিয়ন সরকারি কর্মীদের জন্য। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ পর্যন্ত পেনশন দেওয়ার বিষয়টি রাষ্ট্রের দায়িত্বে ন্যস্ত ছিল। উন্নত ইউরোপে পুঁজিবাদ তখন বিকাশমান সার্বিক চেহারায় অগ্রসরমান। রাষ্ট্রীয় বাজেটে পেনশন বাবদ অর্থ বরাদ্দ করা হত। বলা ভালো রাজকর্মচারী ও সৈনিকরাই এই বার্ধক্য ভাতা পেতেন। গত শতাব্দীতে আমেরিকা রাশিয়ার ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব জুড়ে পুঁজিবাদের পুরনো নৈতিকতার কাঠামো ক্রমাগত উবে যেতে শুরু করল। তার প্রভাব শ্রমিকশ্রেণির ওপর নানাভাবে পড়ল।

১৯২৮ সালে সোভিয়েতে প্রথম পেনশন চালু হয় শুধুমাত্র তাঁতশিল্পের শ্রমিকদের জন্য। এরপর ১৯৩২ সালে সোভিয়েতে সমস্ত শিল্পের শ্রমিকদের জন্য পেনশন বা বার্ধক্য ভাতা চালু হয়েছিল। বস্তুত সোভিয়েতে শ্রমিকশ্রেণি রাষ্ট্রের ক্ষমতায় আসার পর শ্রমিকদের জন্য যে সমস্ত সুযোগসুবিধা চালু করেছিল, বলা ভালো যে সমস্ত অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল, তার ফলে পুঁজিবাদী দেশগুলি ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল এবং ওয়েলফেয়ার ইকনমিক্স-এর নামে তারাও শ্রমিকদের বেশ কিছু অর্থনৈতিক দাবির আইনি স্বীকৃতি দিয়েছিল। এখানে বলে রাখা ভালো রাষ্ট্রের অধীনে যে সমস্ত শ্রমিক-কর্মচারীরা কাজ করতেন তারাই সরকারি মাসিক পেনশনের সুবিধা পেতেন।

এবারে আমাদের পেনশন ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের ভূমিকা ও লক্ষ্য দেখি। স্বাধীনতার আগে সরকারি বেসরকারি কোনও শিল্পেই শ্রমিকদের মাসিক পেনশনের ব্যবস্থা ছিল না। শিল্পে শ্রমিকরা প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা এবং আইনমোতাবেক বেসরকারি শিল্পের শ্রমিক কিংবা সরকারি কর্মীরা প্রভিডেন্ট ফান্ডের সমমূল্য যে টাকা মালিক/সরকার শ্রমিকদের দিত এই মোট অঙ্কের অর্থ অবসরের পর পেতেন। ১৯৫৭ সরকারি কর্মীদের জন্য প্রথম মাসিক পেনশনব্যবস্থা চালু করে কেন্দ্রীয় সরকার। এরপর ২০০৪ সালে সরকারি পেনশনের আইন পরিবর্তন করা হয়। এই পরিবর্তন ছিল ওই বছরের এপ্রিল মাস থেকে যারা সরকারি শিল্পে নিয়োগ পাবেন তারা আর সরকারি মাসিক পেনশন পাবেন না। এর অর্থ হল আগে সরকারি কর্মীদের পেনশন জাতীয় বাজেটে ধরা থাকত তা পেনশন আইনের পরিবর্তন করে নতুন কর্মীদের জন্য বন্ধ করা হল। পরিবর্তে তৈরি করা হল জাতীয় পেনশন প্রকল্প বা এনপিএস (National pension scheme)।

বিশ্বে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সব দেশে সমস্ত খেটেখাওয়া শ্রমজীবীদের পেনশনের ব্যবস্থা আছে। যদিও আইএলও-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের নব্বই শতাংশ শ্রমজীবী কোনও রকম পেনশন পান না। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি শিল্পের মালিকরা এবং বিমা কোম্পানিগুলি জোট গঠন করে সর্বসাধারণের জন্য পেনশন চালু করে। এই পেনশনের কোনও স্থির মাসিক অর্থ থাকবে না। গোটা অর্থই বাজারে লগ্নি করে যে অর্থ পাওয়া যাবে তাই দিয়ে পেনশনের মাসিক ভাতা ঠিক হবে। এই পেনশন দু ধরনের। এক) সংগঠিত শ্রমজীবী জনগণের ও দুই) অসংগঠিত শিল্পের মেহনতি এবং গরিব সাধারণ জনগণের। সংগঠিত শ্রমজীবী জনগণের দুটো ভাগ আছে। সরকারি ও বেসরকারি। বিশ্বের সমস্ত ঊন্নত দেশে সরকারি কর্মীদের পেনশনের বরাদ্দ  সরকারের বাজেটে ধরা থাকে।

 

এনপিএস এবং বর্তমান সরকারের লক্ষ্য

আমরা সবাই জানি অটলবিহারি বাজপেয়ি যখন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কেন্দ্রীয় শাসনে আসীন হন তখনই সরকারি কর্মীদের পেনশন আইন পরিবর্তন হয়। সরকারি পেনশন বলতে আমরা যা বুঝি অর্থাৎ সরকারি কোষাগার থেকে বরাদ্দ হয় অবসরপ্রাপ্ত কর্মীদের মাসিক পেনশন। আগেই বলা হয়েছে ২০০৪ থেকে সরকার নতুন চাকরি পাওয়া সরকারি কর্মীদের পেনশনের দায়িত্ব নেওয়া বন্ধ করে দিল। তার বদলে পেনশন ফান্ড তৈরি করা হল। সেই পেনশন ফান্ডে কর্মীদের কাছ থেকে কেটে নেওয়া মাসিক একটি অঙ্কের টাকা এবং সরকারের দেয় টাকা যুক্ত করে রাখা হবে। এইখান থেকেই মাসিক পেনশন পাওয়া যাবে। এতদূর পর্যন্ত কোনও সমস্যা আমাদের চোখে ধরা পরেনি। এই ফান্ডটির পরিচালন কমিটি হল পিএফআরডিএ (Pension fund regulatory and development authority)। এটিও একটি কেন্দ্রীয় সরকারের স্বশাসিত সংস্থা। বিজেপি, মোদিজি দ্বিতীয় দফায় কেন্দ্রের ক্ষমতায় আসার পর নিজেকে বেচার সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল। পিএফআরডিএ-কে বেসরকারিকরণের জন্য তার মন্ত্রীসভা সমস্ত ব্যবস্থা প্রস্তুত করে ফেলেছে। ইকনমিক টাইমস পত্রিকার ১৭ আগস্ট সংখায় ছাপা হয়েছে এনপিএস-এ অন্তর্ভুক্ত সংগঠিত শিল্পের শ্রমিক সংখ্যা প্রায় ৩০ লক্ষ এবং গচ্ছিত টাকার পরিমাণ এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। জমা টাকার পরিমাণ দেখে সরকারের টনক নড়েছে। এই ফান্ডের গচ্ছিত টাকা আরও বাড়াবার জন্য কেন্দ্রীয় সরকার নতুন নিয়ম ঘোষণা করেছে। সরকার জানিয়েছে ১৮-৭৫ বছর পর্যন্ত যে কোনও নাগরিক এনপিএস-এ সদস্য হতে পারবেন, যা আগে ৭০ বছর বয়স পর্যন্ত ছিল। এমনিতেই ঠিক হয়ে রয়েছে জমা টাকার ৪০ শতাংশ পুঁজির বাজারে বিনিয়োগ হবে। এবার এর সঙ্গে শর্ত চাপানো হল ন্যূনতম তিন বছরের আগে কেউ যদি টাকা তুলতে চায় তবে তার জমানো টাকার ৮০ শতাংশ টাকা পুঁজির বাজারে লগ্নি করতে হবে। অসংগঠিত শিল্পের শ্রমিক কিংবা স্বনির্ভর শিল্পের শ্রমিকরা এই এনপিএসে যাঁরা সদস্য তাঁদের সংখ্যা ২.৮ কোটি। যিনি বাড়ির পরিচারিকা হিসেবে কাজ করেন কিংবা যিনি ছোট একটি গাড়ি নিয়ে সব্জি বিক্রি করেন, তিনি ভবিষ্যতের জন্য হয়ত এনপিএসে টাকা জমাচ্ছেন— কিন্তু তার অর্থ কি এটা যে তিন বছরের মধ্যে অসহায় অবস্থায় পড়লেও ওই টাকা তিনি তুলতে পারবেন না অথবা তাঁর জমা টাকার ৮০ শতাংশ পুঁজির বাজারে লগ্নি করতে বাধ্য থাকবেন? ইতিমধ্যে বিমা কোম্পানিগুলিতে ৭৪ শতাংশ পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগের ছাড়পত্র সরকার অনুমোদন করেছে। সরকার পেনশন ফান্ডের জন্যেও আরও এক ধাপ এগিয়েছে। ডিপার্টমেন্ট অব প্রোমোশন অব ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড ইন্টারনাল ট্রেড ও কর্মচারী প্রভিডেন্ট ফান্ডের সঙ্গে এলআইসির এক দফা কথা হয়ে গেছে। এনপিএসের টাকা জীবনবিমা কোম্পানিগুলিতে বিনিয়োগ করা হবে। সেখান থেকে টাকা পুঁজির বাজারে চলে যাবে যা সর্বদা ঝুঁকিসাপেক্ষ। এই পরিকল্পনাকে বাস্তবায়িত করার জন্য মোদি সরকার জোর কদমে এগিয়ে চলেছে।

গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশক থেকে বিশ্বের দেশে দেশে এই পেনশন ফান্ডের ব্যবস্থা ছড়িয়ে পড়েছে। ওইসিডি (organization for economic co-operation and development)-র হিসেব অনুযায়ী সমগ্র বিশ্বে এই পেনশন ফান্ডের পরিমাণ ২০২০-র শেষে দাঁড়িয়েছে ৩৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। বর্তমান ভারতীয় টাকায় যার মূল্য দাঁড়ায় ২৫৯০ লক্ষ কোটি টাকা। এই টাকার ওপর ভোগদখল করছে বিশ্বের বড় বড় পুঁজির মালিকরা। সেটা অবশ্যই বিমা কোম্পানিতে অংশীদারি মালিকানার ভিত্তিতে। আমাদের দেশে পেনশন ফান্ডের পরিমাণ ১.৮৪ লক্ষ কোটি টাকা (২০২০-২০২১)। কেন্দ্রীয় সরকার চাইছে বিদেশি পুঁজিপতিরা এবং দেশের বৃহৎ পুঁজির মালিকরা এই টাকা নিয়ে এদেশে তাদের ব্যবসার প্রসার ঘটাক। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য স্টার্টআপ কোম্পানিগুলি এই অর্থ নিয়ে দেশে শিল্পের কাঠামো গড়ে তুলুক।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...