বোধাতুর বোধোদয়

প্রিয়দর্শী চক্রবর্তী

 

উত্তর কলকাতার হাতিবাগানে যে পাড়ায় কেটেছিল আমার বাল্যশৈশব, সেই ক্ষুদিরাম বসু রোডের যে প্রান্ত অধুনালুপ্ত বিশ্বরূপা থিয়েটার হলের উঠোনে গিয়ে মিশেছে রাজা রাজকৃষ্ণ স্ট্রিটে, সেই মোড়ের ঠিক মাথাটিতে ফুটপাথেই গুছিয়ে সংসার এক পরিবারের। ‘ছিল’ বলছি না, কারণ দিনকয়েক আগেও ওপাড়ায় গিয়ে চোখে পড়ল সেই একই চেনা ঘর-গেরস্তালি, চেনা চেনা মেহনতি কিছু মুখ। যদিও এখন বয়সের ছাপ আর মেদের আধিক্য স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে। আশির দশকে দেখতাম বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বৃহৎ সংসারের আয় নির্ভর ছিল গোটা দুয়েক টানারিক্সার ওপর। শহরে এখন সে পাট প্রায় চুকেছে। জানি না, আজকাল তাদের জীবিকা সংস্থানের উৎস কী…!

সে যাই হোক। আলটপকা সেই ফুটপাথবাসী পরিবারের প্রসঙ্গ মনে পড়ল— তা মোটেই আলগোছে কিছু নয়। প্রসঙ্গের হয়তো কিছু প্রাসঙ্গিকতা, অন্তত ব্যক্তিগতভাবে, আমার ক্ষেত্রে থাকতেও পারে। ছোটবেলায় সন্ধে নামলে ল্যাম্পপোস্টের আলোআঁধারিতে ফুটপাতে ছড়ানো শয্যা-বাসনকোসন ডিঙিয়ে যেতে বেশ ভয় ভয় করত। কর্মক্লান্ত দিনান্তে আকণ্ঠ মদ্যপানে নিজেদের রাজাধিরাজ মনে করা পরিবারের পুরুষ সদস্যদের তখন নিত্যদিনের হম্বিতম্বি, অবশ্যই বউবাচ্চাদের ওপর। গালাগালি মারধোর চলত সবই। এবং তা চলত বড়তলা থানা থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বেই! প্রচলিত যাবতীয় অশ্লীল অথবা নিষিদ্ধ শব্দের প্রথম পাঠ আমার ওখানেই। হাজার কটুবাক্য, ‘খানকি’ ‘বেশ্যা’ ইত্যাদি প্রভৃতির ভিড়ে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই যোগ করে দেওয়া লিঙ্গসূচক এক সম্বোধন— ‘মেয়েছেলে’! একে কচিমগজ, তায় মা-র ভাইয়েরা সম্পর্কে বাবার কে হন— সে প্রশ্নের উত্তরে লজ্জিত নতমুখে বলতাম— ‘বাবা খারাপ কথা বলতে বারণ করেছে…।’ তো এ-হেন কোমলমতি কান ঐ ‘মেয়েছেলে’ শুনে একটু বিভ্রান্তই হয়ে পড়েছিল। বাবাকে অবোধ প্রশ্ন— ‘ছেলেমেয়ে মানে তো সব্বাই, শুধু ছেলেরা নয়। মেয়েছেলে কেন শুধুই মেয়ে? আর মেয়ে হলে সে আবার ছেলে হতে যাবে কেন?’ সহজসরল উত্তরটা আজও মনে আছে। বলেছিলেন বাবা— ‘মেয়েদের মানুষ বলে মানতে অসুবিধে হলেই ছেলেরা ঐ নামে মেয়েদের শাসন করতে চায়।’ মাত্রই বারো-তেরো বছর বয়সে পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্য, লিঙ্গবৈষম্য ইত্যাদি নিয়ে দৃঢ়গর্ভ কোনও উপলব্ধির স্তরে তখন পৌঁছনো ছিল দুষ্কর। আর ‘সাবঅলটার্ন’ জাতীয় কোনও পরিভাষা তো নিজেই তখন নিতান্ত অঙ্কুরিত হওয়ার পর্যায়ে। তবু কোথাও হয়তো বোধের সঞ্চার ঘটিয়েছিল ঐ কয়েকটা শব্দ— ‘মানুষ বলে মানতে অসুবিধে হলে’! মোটামুটি নিজের মতো করেই ধরে নিয়েছিলাম, ‘মেয়েছেলে’-ও নিষিদ্ধ শব্দের তালিকাভুক্ত, শিক্ষিত সমাজে বর্জনীয়।

ভাষার ব্যবহারে মন্দ-ভালো শুদ্ধ-অশুদ্ধ-র ভেদ টানাটানিতে মাঝে বছর গড়িয়ে গেল অনেক। যদিও একচুলও টলল না সেই বাক্যের জাত্যর্থ— ‘মানুষ বলে মানতে অসুবিধে হলে’। পথেঘাটে, ট্রামেবাসেট্রেনে, এমনকী কর্মক্ষেত্রেও বিভিন্ন পরিমণ্ডলে ইতিউতি কানে ভেসে আসে আজও… ‘মেয়েছেলে’! তাই টলেছে যতটুকু, তা হয়তো শুধুই সেই প্রত্যয়— তথাকথিত শিক্ষার্জনের কৌলীন্যকামী অনুভূতিতে। ধাক্কা লাগে মননে— বর্জনীয় শব্দের আনাগোনা কেবল নিম্নবর্গের অশিক্ষার অভিব্যক্তি নয়। পরিশীলিত শিক্ষার উচ্চবর্গীয় আভিজাত্যের বেড়া টপকিয়েও মাঝেমধ্যে নখদন্তে বের হয়ে আসে আদিম পুরুষতন্ত্রের সেই চিরাচরিত আধিপত্যের জৈবিক অভ্যাস! আর ফিরে ফিরে তাই হোঁচট খেতেই হয় ‘মানুষ বলে মানতে অসুবিধে হলে’-র গর্তে! অশিক্ষা আর কুশিক্ষার মধ্যে ব্যবধানটুকুও ক্রমশ খাটো হয়ে আসে। কিংবা একসময় মিশে অতিক্রম করে যায় অশিক্ষার অন্ধকারকে কুশিক্ষার ছায়া! রাত্রি নামলে তফাতটুকুও ঘুচে কোথাও যেন একাকার হয়ে পড়ে ফুটপাথের ছেঁড়াফাটা সংসারের অন্ধকার আর আসবাব-গ্যাজেটে ঠাসা আকাশছোঁয়া আবাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জ্বলে ওঠা হীরকদ্যুতির বৈভব।

বারো বছর পেরিয়ে গেছে, বাবা চিরবিদায় নিয়েছেন। তবুও এ গড়পড়তা জীবনে যতটুকু বোধোদয়, চিন্তাচেতনার মুক্তি, মেন্টরের ভূমিকায় তিনিই আজও ছেয়ে রয়েছেন দিগ্‌বিদিক। আর তাঁর জৈবিক অবলম্বনের বিচ্ছিন্নতায় যাবতীয় এই বছরগুলো জুড়ে মিডিয়া বিক্রমের সৌজন্যে সমান্তরালে এঁটে থাকা মগজে কার্ফু, হায়দ্রাবাদ থেকে উন্নাও, পুরুলিয়া থেকে কলকাতার বিক্ষিপ্ত নানান ভয়াল সংবাদে! ভাগ্যিস, প্রহর জুড়েই সেরিব্রায় বিছিয়ে থাকেন বাবা, ঘোলাটে এই সময়ের প্রতিষেধক ‘মানুষ বলে মানতে অসুবিধে হলে’-র প্রলেপ নিয়ে। আসলে অসুস্থ বোধ করার ইতিহাস এই তো সবে নয়। পার্কস্ট্রিট থেকে কামদুনি, কাটোয়া থেকে কাকদ্বীপ, কড়েয়া হয়ে দিল্লি, অথবা ভোপাল থেকে সাম্প্রতিক শিলিগুড়ি— উচ্চ বা নিম্নবর্গ নির্বিশেষে আততায়ী পিশাচের করাল থাবার গ্রাস সর্বত্রগামী এবং ক্রমবর্ধমান বিগত এক দশক জুড়ে। অথবা দশক নয়, শতক কিম্বা সহস্রাব্দের বিষম সামাজিক ভ্রান্তির উত্তরাধিকারে দীর্ণ আজ আমাদের পরিপার্শ্ব। রাষ্ট্র হয় নীরব দর্শক, নয়তো ন্যায়ের বিপরিতমুখী যুক্তিতে আচ্ছন্ন। অন্যদিকে পাপের নির্মূলীকরণে সম্পূরক অন্যায়ের সমর্থনে ঝুঁকে পড়ছে জনমত! অথচ বুকের খাঁচায় গেঁথে বসে থাকা ‘সামাজিক যক্ষ্মার কাশি’-র উপশমের কোনও মহৌষধ আজও অধরা! রাষ্ট্র-আদালত-পুলিশের জবরদস্তির আওতায় তেমন চিকিৎসার স্থায়ী নিদান অসম্ভব। পারিবারিক কিংবা সামাজিক শিক্ষার ন্যায়সঙ্গত পথ নির্ধারণই হয়তো একমাত্র দিশা, শিকড় থেকে বিষবৃক্ষের উৎপাটনে।

কিন্তু সন্ধান কই অসম্মানিত ধরিত্রীর, ক্লিষ্টতায় জর্জর মানবজন্মের মুক্তির তেমন দিশারীর! কবেই বা পারিবারিক এবং সামাজিক স্তরে মানসিকতার উত্তরণ ঘটবে ‘মানুষ বলে মানতে অসুবিধে’-র এঁদো কুয়োর পাঁক থেকে? ১৯৬৮-র ৩১ ডিসেম্বর ‘দৈনিক কালান্তর’-এর পাতায় একটি ছোটগল্প লিখেছিলেন বাবা, অমলেন্দু চক্রবর্তী— ‘কুমারী মাটির বুকে’। বিশেষ অংশগুলো ক্রমাগত ধাক্কা দিয়ে যায় মেলাতে চাওয়া পরিধির কুয়াশায়—

…সার খোলে তালিম দেওয়া আকবর মিঞার ডাগর-ডোগর কার্তিক শালির ক্ষেতটার ঠিক মাঝখানে কেমন একটা টাক পড়েছিল, শুয়ে পড়েছে গাছগুলি। সোনামণিকে ওরা ওইখানেই টেনে এনে ফেলল, শুইয়ে দিলো। চিৎকার করতে পারেনি সোনামণি, ওদের গলার মাফ্‌লার দিয়ে ওর মুখ শক্ত করে বাঁধা ছিল, ওদের শক্ত হিংস্র থাবার কাছে সোনামণির দুটো নরম হাতের অক্ষম প্রতিরোধও বুঝি ভেঙে পড়েছিল। কিন্তু একবার, শুধু একটি মুহূর্তের জন্যেই হয়তো বা আচমকা নাড়া খেয়েছিল মেয়েটা। চোখের ওপর আবিষ্কার করে ফেলেছিল ওই নীল চাঁদোয়ার মতো উদার আকাশ, ওই হীরের মতো উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলি, ওই ত্রয়োদশীর চাঁদের মতো আলো আর জ্যোৎস্না। বাতাসে পাকা ধানের ঘ্রাণ পেয়েছিল…।

……

…সোনামণির আততায়ীকে আমি খুঁজছি। সে আজও ফেরার।…

……

সোনামণির আততায়ী আজও গ্রেপ্তার হয়নি।

কীভাবেই বা হাতের মুঠোয় সে ধরা পড়বে, যখন পিছলে জিইয়ে থাকার যাবতীয় রসদ মজুত এই ঘুণ ধরা পরিপার্শ্বের আনাচেকানাচে! অন্তর্গত ক্রোধমুক্তির দরজায় বাইরে থেকে তালা আঁটা। ভিতরঘরে গুমরে মরা ‘এই ঘুম’, যখন ‘গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ’ অবিরাম কালরাত্রির ফেনিয়ে ওঠা দিগ্‌ভ্রান্ত দিগ্‌বলয়ে!

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...