বিস্মৃতির জরি

প্রতীক

 

–না, খুব যে কাজের চাপ তা না। আসলে… ইয়ে… স্মৃতি নাই তো। ও না থাকলে তো আবার আমি কাজ করতে পারি না।

–বয়স কত হল তোমার?

জানি নিতান্ত অভদ্রের মত হল কথাটা, কিন্তু জিজ্ঞেস না করে থাকতে পারলাম না। ধীরেনদা প্রায় আমার বাবার বয়সী। নেহাত এলেবেলে লোক বলেই কাকু বা জেঠু বলতে কেউ শেখায়নি। ওই বয়সের লোক যদি বলে বউ সামনে না থাকলে কাজ করতে পারি না, তাহলে হাসিও পায়, রাগও হয়।

মফস্বলের এই হচ্ছে ঝামেলা। অলস, ফাঁকিবাজ লোকেদের এড়িয়ে চলা যায় না কিছুতেই। সবুজগ্রাম স্টেশনের আশেপাশে অনেক দোকান। বাড়িতে একটা সাইকেল থাকলে টুক করে চলে যেতাম, বসে থেকে শাড়িটায় ফলস লাগিয়ে আনতাম। কিন্তু বাবা মারা যাওয়ার পরে সাইকেলটা চালানোর লোক নেই বলে আমিই বেচে দিয়েছিলাম। আমাদের বাড়িটা সবুজগ্রাম স্টেশন থেকে এত দূরে, যে এই ভর সন্ধেবেলা খানাখন্দ ভরা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া, হেঁটে আসা অসম্ভব। অটো বা টোটো পেতে গেলে এই আট-ন ডিগ্রি ঠান্ডায় মেন রোডের ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। আমাদের মোড়টা থেকে অটো, টোটো দুটোর স্ট্যান্ডই আবার চার-পাঁচ স্টপেজ দূরে, যা আসে ভর্তি হয়েই আসে। ফলে কতক্ষণে জায়গা পাওয়া যাবে কেউ জানে না। এখানে যে রিকশা স্ট্যান্ডটা ছিল সেটাও উঠে গেছে। রিকশাওয়ালারা সব টোটোওয়ালা হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি জানি বলেই দিবানিদ্রার পর আড়মোড়া ভেঙে, ধীরে সুস্থে চা-বিস্কুট খেয়ে, ঝুপ করে সন্ধে নেমে যাওয়ার পর যখন মোনালিসা আদুরে মেয়ের মত বলল— এ মা! দ্যাখো, আমার কাঞ্জিভরমটায় ফলস লাগানো হয়নি, একদম ভুলে গেছি। প্লিজ একটু লাগিয়ে এনে দাও, তখন মাথার ভিতর আগুন জ্বলে উঠেছিল। কী আশ্চর্য! সেই বেঙ্গালুরু থেকে নতুন কেনা শাড়িটা বয়ে নিয়ে এল এতদূর, সল্টলেকে বাপের বাড়িতে থাকল তিনদিন, আর এই ঘুমন্ত মফস্বলে এসে খেয়াল হল শাড়িতে ফলস লাগানো নেই! এবারে আসাই হয়েছে বিয়েবাড়ি যাওয়ার জন্য, তার জন্যে এক প্রস্থ নতুন শাড়ি এবং মেক আপ কেনা হয়েছে। অথচ এই জরুরি কাজটাই খেয়াল রাখতে পারলেন না মহারানি! আমি ফেটে পড়ার আগেই মা বলল, রাগ করিস না, বাবা। অসুবিধা নেই। এখন তো থান রোডের মোড়েই দর্জির দোকান হয়েছে। তোর ক্লাসে পড়ত সেই যে শিবরাম বলে ছেলেটা? ওরই দোকান। তুই যা, দাঁড়িয়ে থেকে করিয়ে নিয়ে আয়।

কিন্তু মোড়ে এসে দেখি শুধু সেই দোকানটা নয়, সব দোকানই বন্ধ। কনকনে শীতে পথে লোকজন বিরল। একজনকে পেয়ে কারণ জিজ্ঞেস করলাম, সে তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলল, বৃহস্পতিবার। ওই যে বললাম— মফস্বল। গোটা দুনিয়া অনলাইনে চব্বিশ ঘন্টা বাজার করছে, আমাদের সবুজগ্রামের দোকানদাররা এখনও বৃহস্পতিবার দোকান বন্ধ রাখে। মায়েরও বলিহারি। আমি না হয় পড়াশোনা, চাকরি— সব মিলিয়ে বছর দশেক বাইরে আছি। মা এত বছর এখানে থেকেও কী করে ভুলে গেল কথাটা? এইসব ভেবে ফুঁসছি, এমন সময় মিতালী সঙ্ঘের খেলার মাঠের এক কোণে ধীরেনদার টিমটিমে আলো জ্বলা একলা বাড়িটার দিকে চোখ পড়ল।

ধীরেনদা এখানকার অজস্র বন্ধ কারখানার কোনও একটায় কাজ করত। সে কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে আমার জন্মের আগেই। তারপর সংসার চালাতে বাড়িতে বসেই দর্জির কাজ ধরেছে। ছোটবেলায় মায়ের হাত ধরে গেছি, পরে মায়ের জিনিসপত্র পৌঁছে দিয়েছি, ফেরত নিয়ে গেছি। মা বলত ওর কাজ নাকি চমৎকার, কিন্তু সময় লাগায় বড় বেশি। দুটো ব্লাউজ বানাতে হয়ত দু মাস লাগিয়ে দেবে। এমন লোকের কাছে তাড়া থাকলে একেবারেই যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু আমার আর উপায় কী? ভোর সাড়ে ছটায় আমাদের জন্যে গাড়ি এসে যাবে। তিনজনে যাব সাঁইথিয়া পেরিয়ে, আমার দূরসম্পর্কের এক মাসতুতো বোনের বিয়েতে। সে নাকি গণ্ডগ্রাম। ওসব জায়গায় যাওয়ার আমার বিশেষ উৎসাহ নেই, মোনালিসারও থাকত না। কিন্তু এই বোনটি মোনালিসার কলেজবেলার প্রাণের বন্ধু, এরই সূত্রে আমাদের আলাপ। অতএব।

ধীরেনদার চামড়া চিরকাল মোটা। আলস্যের জন্য অকথা কুকথা বরাবরই শুনতে দেখেছি, কোনওদিনই জবাব দেয় না। আমার খোঁচাতেও মিটিমিটি হাসল, তারপর বলল— ষাইট। তবে হেইডা আমার এহনের ব্যাপার না। তোমার মায়েরে জিগাইও।

–কিন্তু আমার তো এখুনি করে না দিলে হবে না। কাল ভোরে বেরিয়ে যাব। বিয়েবাড়ি আছে। শাড়িটা পরতে পারবে না ফলস ছাড়া।

ধীরেনদার কিছু চুল পেকেছে, তাছাড়া চেহারাটা দেখলাম তিরিশ বছর আগের মতই আছে। তখন মা তাড়া দিলে যেরকম বোকা বোকা ভঙ্গিতে মাথা চুলকাত, ঠিক সেইভাবে মাথা চুলকে বলল— হুম, হাতের লক্ষ্মী কি আর পায়ে ঠেলা যায়? যা বাজার…। আইচ্ছা বসো। দ্যাও দেহি প্যাকেটখান।

একটু স্বস্তি পেলাম। বাবা এই লোকটার সম্বন্ধে খুবই উচ্চ ধারণা পোষণ করত। মা দীর্ঘসূত্রিতার জন্য নিন্দা করলে বলত— আরে ও কি আর পাঁচটা দর্জির মত? ও হল শিল্পী। ওর কাজে মেজাজটাই হল আসল। মা অবশ্য জামাপ্যান্ট সায়া-ব্লাউজ বানানো, শাড়িতে ফলস লাগানো লোককে শিল্পী বলে মানতে নারাজ। বাবা বলত— বললেই হল? তুমি তাহলে দামি কাপড়ের ব্লাউজগুলো বানাতে এখান থেকে গড়িয়াহাট দৌড়াও কেন? কী যেন তোমার প্রিয় দর্জির দোকান? সেখানে কী মধু আছে? ধীরেন যে কাজ করে তারাও তো তাই করে। ভাল দর্জি মানেই শিল্পী, বুঝলে? বড় বড় ফিল্মস্টারদের যে বাঁধা দর্জি থাকে সে কি এমনি? ধীরেনের অবস্থা হল, গেঁয়ো যোগী ভিখ পায় না। বাপ-পিতেমোর বানানো লোনাধরা দেয়ালের বাড়িতে বসে দর্জিগিরি করে তো, তাই তোমরা পাত্তা দাও না। ওর যদি ক্যাপিটাল থাকত, একখানা ঝাঁ চকচকে দোকান দিত, তাহলেই সবাই গদগদ হয়ে যেত।

বাবার তত্ত্বটা হয়ত ঠিক, কিন্তু দর্জিকে তো তেমন দর্জি হতে হবে। ধীরেনদার কী বিশেষত্ব আছে আমি কখনও বুঝিনি, মা-ও বোঝেনি। প্রতি বছরই পুজোর দেড়-দু মাস আগে গোটা দুয়েক জামাকাপড় তৈরি করতে ওকে দেওয়া হত। কোনওবারই ষষ্ঠীর সন্ধের আগে সেগুলো পাওয়া যেত না। তখন ওসবের শিল্প কে পরখ করতে যাবে? ফিটিং ঠিকঠাক হলেই হল। অন্য দর্জির তৈরি জামাকাপড় নিয়ে দু-একটা অভিযোগ থাকলেও ধীরেনদার তৈরি জিনিস নিয়ে কখনও দুবার ভাবতে হত না, এই যা। লোনাধরা দেয়াল যে তিরিশ বছরেও বদলায়নি, সেটাই প্রমাণ করে ধীরেনদা শিল্পী-টিল্পী কিছু নয়। এমনকি সময়মত জিনিসপত্র বানিয়ে দিতে পারলেও হয়ত উন্নতি করতে পারত। সে উদ্যমটুকুও লোকটার নেই। প্যাকেট থেকে মোনালিসার শাড়িটা বার করে যেরকম চোখ কুঁচকে পুঙ্খানুপুঙ্খ দেখছে স্রেফ ফলস লাগানোর জন্য, তাতে বোঝাই যায় কেন এর কিস্যু হল না। কতক্ষণ লাগাবে কে জানে! এই গুমোট ঘরটায় এর সামনে চুপচাপ বসে থাকা অসহ্য। সময় কাটাতে কথা বলা দরকার। কত আর ফোন ঘাঁটব? তাই বললাম— দরজার বাইরে একটা আলো লাগাতে পারো তো। ঢুকতে গিয়ে আরেকটু হলে হোঁচট খেয়ে পড়ছিলাম। ঘুরঘুট্টি অন্ধকার একেবারে।

ধীরেনদা মন দিয়ে শাড়িটা দেখতে দেখতে অস্ফূটে বলল— হইয়া যাইব। আর তো কয়টা দিন।

–কটা দিন? কী হবে কটা দিন পরে?
–আলোয় চারদিক ভাসায় দিব অ্যাক্কেরে।
–কে?

ধীরেনদা নাকে নেমে আসা বাইফোকাল চশমার ওপর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল— সব জাগায় যিনি করতাছেন, তিনিই করবেন।

ওকে এরকম দার্শনিক কথাবার্তা বলতে জন্মে শুনিনি। হঠাৎ আমার মনে হল, লোকটা পাগল হয়ে যায়নি তো? এত বছর পাড়ায় থাকি না, এবার এসেও মায়ের সঙ্গে ওকে নিয়ে কোনও কথাবার্তা হয়নি। অবশ্য ও কথা হওয়ার মত কেউ নয়। ইতিমধ্যে হয়ত ওর মস্তিষ্কবিকৃতি হয়েছে। দীর্ঘদিন অভাবের মধ্যে কাটালে অনেকের ওরকম হয় শুনেছি। হয়ত সেই কারণেই বউ ছেড়ে চলে গেছে। মা-ই বা একবারের জন্যও ওর কাছে আসতে বলল না কেন? নিশ্চয়ই জানে ব্যাপারটা। সেই কারণেই বলেনি। উঠে পড়ে বললাম— তুমি ছেড়ে দাও, বুঝলে? আমি বরং দেখি স্টেশনের দিকে গেলে কিছু সুবিধা হয় কিনা।

ধীরেনদা ছুঁচে সুতো পরাতে পরাতে বলল— লাভ নাই। বেস্পতিবার। স্টেশনেও সব বন্ধ।

কথাটা সত্যি। মহা ফাঁপরে পড়লাম। অবশ্য কেবল অনুমানের ভিত্তিতে এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনও মানে হয় না। ধীরেনদার আচরণগুলোর একটাও কিন্তু অস্বাভাবিক নয়। বরাবর যেমন সময় দিয়ে কাজ করতে দেখেছি, এখনও তো তেমনভাবেই কাজ করছে। ওই তো ফলস লাগানো শুরু করেছে। কাজটা তো সময়সাপেক্ষ ঠিকই, আর এখন তো সবে সাড়ে সাতটা। শীতের সন্ধেবেলা, আর এই বাড়িটার থেকে অন্য বাড়িগুলোর অনেকটা দূরত্ব বলেই মাঝরাত বলে মনে হচ্ছে। আমার তো এত তাড়াহুড়ো করার কোনও দরকার নেই। ধীরেনদা যদি সাড়ে দশটাও বাজায়, আমার বাড়ি তো এখান থেকে হেঁটে সাত-আট মিনিট। বরং কথা-টথা বললে সময়টা দেখতে দেখতে কেটে যাবে।

–বউদি কি বাপের বাড়ি গেছে?
–বাপের বাড়িই গেছিল। তারপর যে কী হইল!

যেভাবে হাত উল্টে কথাটা বলল, তাতে আমার আবার সন্দেহ হল যে বউ আর ফিরে আসবে না বলেই গেছে।

–কী হল বলতে? শরীর খারাপ হয়েছে?
–হ, তাই তো কইল আমার শালায়।
–ডাক্তার দেখিয়েছে?
–তা দেখাইছে। লাভ হয় নাই।
–এখনও ভুগছে?
–সেরমই তো কয়।
–তাহলে গিয়ে নিয়ে এসো একদিন। ভাল ডাক্তার দেখাও। অসুবিধাটা কী কিছু জানো?
–কিছুই বোঝন যায় না। অনেকদিনের রোগ। এহানে থাকতেও এই রোগটাই আছিল। খালি কয় শরীল খারাপ, শরীল খারাপ। এদিকে ডাক্তারে তো কিছুই পায় না। আমার মনে হয় অসুখ আসলে শরীলে না। মনে।

আমি একটু নিশ্চিন্ত হলাম। যে লোক অন্যের মনের অসুখ বুঝতে পারে, সে নিশ্চয়ই নিজে পাগল নয়।

–মনের অসুখ কেন? বৌদি তো বেশ হাসিখুশিই ছিল যদ্দূর মনে পড়ে।
–সে তো তুমি অনেককাল আগে দ্যাখছ।
–ও, এই ক বছরে কিছু হয়েছিল?
–নূতন কিছু না। আসলে রোজগার তেমন নাই তো, সাধ আহ্লাদ নাই, ছেলেপুলেও হয় নাই। অল্প বয়সে তেমন অসুবিধা হয় নাই। বয়স বাড়তে মেজাজটাই বিগড়ায় গেল আর কি। সবেতেই আমারে গালাগাল করে।

বুঝলাম, বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। কাউকে এত ব্যক্তিগত প্রশ্ন করা উচিত নয়। এইসব হাঁড়ির খবরে আমার কী দরকার? কিন্তু ততক্ষণে ধীরেনদার বলার বেগ এসে গেছে। কাজ ছাড়া এ বাড়িতে কোনওদিনই কেউ আসে না, তার ওপর দীর্ঘদিন হয়ে গেল বউ নেই। ওর বোধহয় অনেক কথা জমে ছিল। আমি ঢাকনা তুলে দেখতে গেছি, এখন আর ঢাকনা বন্ধ করার উপায় নেই। গলগল করে কথা বেরোচ্ছে।

–আমাগো সময় তো বিয়া বাপ-মায় ঠিক করত, তা আমি অরে দ্যাখতেও যাই নাই। আমার বাবা গিয়া অ্যাক্কেরে লগ্ন ঠিক কইরা আইছিল। শুভদৃষ্টির সময় দেইখা আমার তো পছন্দ হইয়া গ্যালো, অর কিন্তু পছন্দ হয় নাই। আমার থিকা দশ বচ্ছরের ছোট, তহন সবে ষোল। বাসরঘরে সে কী লজ্জার ব্যাপার! সক্কলের সামনে কইয়া দিল, এই ঘোড়ামুখো বুড়ো বরের সঙ্গে আমি থাকুম না।

শুনে আমার মনে হল ব্যাপারটা ভারী অপমানজনক, এই গোপন ইতিহাসটা শুনে ফেলে বেশ খারাপ লাগছিল। অথচ ধীরেনদা কিন্তু হেসে খুন। সময়ে ক্ষত মিলিয়ে গেছে, এখন এটা ওর কাছে স্রেফ একটা মজার ঘটনা।

–ফুলশয্যায় আমার লগে কথাই কয় না, খালি কাঁদে। তা আমি কইলাম আমারে দ্যাখতে মন্দ হইতে পারে, কিন্তু আমার হাতের গুণ আছে। আমার বাড়ি চলো, দ্যাখামু অ্যানে। তা কয়, কী গুণ? আমি কইলাম, তোমারে কেমন সোন্দর বেলাউজ, জামা, সেমিজ বানায় দিমু দেখবা। তহন কয়, কোথায় শিখলা? সেইসব গপ্প করতে করতে ভাব হইল। বাড়ি আইস্যা তারে চারখান ফুলহাতা জরি দেয়া বেলাউজ বানায় দিই, তবে তার বর পছন্দ হয়।

গল্পটা মজার। স্বামী অবাধ্য স্ত্রীকে ব্লাউজ বানিয়ে দিয়ে পোষ মানাল, এরকম আগে শুনিনি। একঘেয়েমিটা কাটল। একটা সিগারেট ধরাতে বাইরে যাব বলে উঠে দাঁড়িয়েছি, ধীরেনদা কী বুঝল কে জানে, বলে— দ্যাখবা? আসো আসো। কী বিপদ! অন্য লোকের বউয়ের ব্লাউজ দেখতে যাব কেন? আমি কিছু বলার আগেই ধীরেনদা ওর সেলাই মেশিন থেকে উঠে এসে আমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল পাশের ঘরে। দরজার পর্দাটা টানা ছিল বলে এই ঘরটা দেখা যাচ্ছিল না, কিন্তু মনে হয়েছিল অন্ধকার। মনে হল যেন ধীরেনদা পা দিতেই ম্যাজিকের মত আলো জ্বলে উঠল, আমি পিছু পিছু ঢুকলাম।

এইটুকু ঘরে যে এত জিনিস থাকতে পারে, না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। ঘরের অর্ধেকের বেশি জায়গা জুড়ে একটা বিশাল খাট। অমন কারুকার্য করা, ছত্রিওলা খাট এখন আর তৈরি হয় না। আমাদের বাড়িতে দাদু-ঠাকুমার বিয়ের খাট আজও আছে। সেটা ছাড়া ওরকম খাট কোথাও দেখিনি। বাকি জায়গাটুকুর মধ্যে রয়েছে একটা লম্বা আয়না লাগানো আলমারি, একটা চারপেয়ে টেবিল। টেবিলে বহু জন্ম কাচা হয়নি এমন একটা কভার। সেই কভারের ওপর তিল ধারণের জায়গা নেই। চিরুনি, নতুন আর পুরনো পাউডারের কৌটো, সিঁদুরের কৌটো থেকে শুরু করে ডাঁই করা খবরের কাগজ, ইয়া মোটা গোটা চারেক বাঁধানো বই, আধখাওয়া মলাটের পঞ্জিকা, একখানা শ্রাদ্ধবাড়িতে পাওয়া গীতা, বাজারের ব্যাগ, ছুরি, কাঁচি, নেল কাটার, মোবাইলের হেডফোন— কিছুই বাদ নেই। দেওয়ালে একটা তাক আছে, সেখানে মনে হল তেত্রিশ কোটি দেবতার সকলেরই হয় মূর্তি নয় ছবি রয়েছে। আর আছে শুকিয়ে কালো হয়ে যাওয়া ফুল। ঘরে কোনও জানলা নেই, কেবল দুদিকে দুটো দরজা। ভিতর দিকের দরজাটা আবার বন্ধ। আলমারির মাথাটা পর্যন্ত খালি নেই। বড় বড় দুটো কাপড়ের পোঁটলার পাশের সামান্য জায়গাটুকুতে কোনওমতে বসে আছে একটা টিভি। ঘরভর্তি ঝুল, মাকড়সার জালের বহর আর টিমটিমে আলো দেখে বুঝতে অসুবিধা হল না ধীরেনদার বউয়ের মনের অসুখ কেন হয়েছে। এ ঘরে একদিন থাকতে হলে আমিই অসুস্থ হয়ে পড়ব।

জীবনে প্রথম এত দৈন্যের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছি। হাঁ করে এসব দেখতে দেখতে খেয়াল হল ধীরেনদা আলমারিটা খুলে ফেলেছে, আঁতিপাতি করে কিছু একটা খুঁজছে। বউ চলে যাওয়ার পর থেকে ধীরেনদা একেবারেই অচল হয়ে পড়েছে বোঝা যাচ্ছে। ঠাকুরের ফুলগুলো ফেলেনি, বিছানার চাদরটাও ধুলোময়, কিন্তু টানটান। লোকটা কি ঘুমোয়ওনি ইতিমধ্যে?

–বৌদি কবে গেছে, ধীরেনদা?

আমার প্রশ্নে খোঁজাখুঁজি থামিয়ে আমার দিকে ঘুরে তাকাল। দৃষ্টিটা কেমন উদভ্রান্তের মত। ভারী উদাস গলায় বলল— যেদিন গ্যাছে সেইদিন থিকা দিন, মাস, বচ্ছরের কি আর হিসাব রাখছি? খালি হেইডাই বোঝলাম, যে যাবার মন করে তারে ঠেকায় রাখা যায় না। গ্যালে সে আর ফিরাও আসে না।

এ আবার কী রকম কথা রে বাবা! ফিরে না আসার কথা উঠছে কেন? আমার আবার কেমন অস্বস্তি হতে শুরু করল। ঘরটার মধ্যে দমবন্ধও লাগছিল। তাই বললাম— ছেড়ে দাও না। ওসব দেখে আমি কী করব? তুমি আমার কাজটা শেষ করে দাও তাড়াতাড়ি। রাত বাড়ছে, ঠান্ডাও বাড়ছে। বাড়ি যেতে হবে।

–এই তো! এই তো পায়া গেছি, বলে একটা কাপড়ের ব্যাগ আলমারি থেকে বার করে খাটের ওপর রাখল ধীরেনদা। তারপর বার করল চারটে সাতপুরনো ব্লাউজ। ভাঁজ খুলে পাশাপাশি মেলে রাখল খাটের ওপর। আমি অবাক। ওই ব্লাউজ যে তৈরি করে, তাকে সত্যিই স্রেফ দর্জি বলে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেকালের সাদাকালো সিনেমার নায়িকাদের এরকম ব্লাউজ পরতে দেখেছি। লাল, নীল, সবুজ আর কালো রঙের ওপর অত সূক্ষ্ম, জটিল জরির নকশাওলা ব্লাউজ আমাদের সবুজগ্রামের কোনও মহিলা যে কস্মিনকালে পরেননি সে কথা জোর দিয়ে বলতে পারি।
–ধীরেনদা! তুমি এইরকম কাজ জানো? তা এরকম আর কাউকে বানিয়ে দাওনি কেন?
–কী কইরা দিমু? আমারে কেউ ভাল কাজ করতে দিছে? শস্তা কাজগুলা আমায় দিয়া করাইছে। আর কেবল তাড়া। ভাল কাজে সময় লাগে, খরচ করা লাগে। এই বেলাউজগুলা কত দামি কাপড়ের তুমি জানো? জরির দাম জানো? আমি স্মৃতিরে অনেক টাকা খরচ কইরা বানায় দিছিলাম। তহন তো চাকরিটা আছিল। গয়নাগাঁটি তো কোনওদিন দিতে পারি নাই। কিন্তু যহন পারছি, ভাল ভাল জিনিস নিজের হাতে বানায় দিছি। আরও আছে। দ্যাখবা? তোমার পায়ের নীচে দ্যাহো।

পাপোষ আর কে খেয়াল করে? ধীরেনদার কথায় খাটের পাশে রাখা পাপোষটার দিকে তাকালাম। এটাও বহু পুরনো। ব্লাউজগুলো আলমারিতে সযত্নে ছিল বলে রং-টং তবু বজায় আছে। পাপোষটার রং বোঝা দায়, ধারের দিকের সেলাইও খুলে গেছে। তবু বুঝতে পারলাম সুতোর কাজ করে ঢেউয়ের ওপর পাল তোলা নৌকোর নকশা করা হয়েছে। প্রশংসাই করতাম, তার আগেই আসো, তোমারে আরেকখান জিনিস দেখাই বলে ভিতরের দরজাটা খুলে আমাকে গ্রিল দেওয়া ছোট্ট বারান্দায় নিয়ে গেল। বাড়িটা ছোট, কিন্তু বাড়ির পিছন দিকে যে এতখানি জমি আছে জানতাম না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখলাম অনেকটা ফাঁকা জায়গা পেরিয়ে একটা ঝলমলে তিনতলা বাড়ির পিছন দিক। ও বাড়িটা চেনা। প্রোমোটার অভয় সরকারের। ওঁর একমাত্র ছেলে সুকান্ত আমার খুব বন্ধু ছিল একসময়।

–একবার দ্যাহো দেহি, চিনতে পারো কিনা?

ধীরেনদার কথা শুনে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখি ফ্রেমে বাঁধানো একটা লাইফ সাইজ এম্ব্রয়ডারির কাজ। না চেনার কোনও কারণই নেই। এই তো বৌদি! ছুঁচ সুতোর কাজ, অথচ কী জীবন্ত! ছোট থেকে যতবার এ বাড়িতে এসেছি, বৌদির মুখে একটা হাসি দেখেছি। খুব কম লেখাপড়া জানা, সাধারণ চেহারার একজন মহিলার হাসি যেমন হয় আর কি— ভোঁতা। কিন্তু এক ধরনের সারল্য ছিল, যা ধীরেনদার থেকে জিনিস নিতে এসে শেষ হয়নি শুনে বিরক্ত হওয়া লোকের মেজাজও ঠান্ডা করে দিত। দেয়ালের এই বৌদির মুখে অবিকল সেই হাসি! কী আশ্চর্য! এই গোবেচারা, কুঁড়ে লোকটার এত ক্ষমতা! আর সে কিনা বাড়িতে বসে দু-পাঁচশো টাকার কাজ করে জীবনটা কাটিয়ে দিল! আমার মুগ্ধতা কেটে গিয়ে রাগ এসে পড়ল। অলস লোক আমি দু চক্ষে দেখতে পারি না। আর গুণী লোকের অলস হওয়া তো অমার্জনীয় অপরাধ।

–আচ্ছা ধীরেনদা, তোমার হাতের কাজ এত ভাল। তুমি সারাজীবন এই বাইরের ঘরে বসে মেশিন চালিয়ে জীবনটা নষ্ট করলে? একটা ছোট দোকান দিতে পারতে। বেশি করে কাজ করলে লোকে তোমার কাজ জানতে পারত, তাতে আরও কাজ পেতে। আস্তে আস্তে ব্যবসা বাড়ত, তোমার কষ্টের দিন কেটে যেত। এই যে নিজেও কষ্ট পেলে, বৌদিকেও কষ্ট দিলে…
–দোকান? দোকানঘর তো কিনছিলাম ঝিলের ধারে নব্বই সালে। সে ঘরও হইল না, আমার টাকাও মাইরা দিল। স্মৃতি বিয়ার গয়না বেইচা টাকা দিছিল।
–সে কী! সে তো অনেক টাকা! এত বড় দুনম্বরি কে করল? তুমি কাউকে কিছু বলোনি? লোকটাকে তো পুলিসে দেয়া উচিত।
–উচিত? ধীরেনদা আবার সেই অদ্ভুত উদাস গলায় বলল— জগতে উচিত কাজটা আবার হয় নাকি? আমার জীবনের সম্বল মাইরা দিয়া সরকারবাবু তিনতলা বাড়ি হাঁকায় নিল, আর আমি ন্যাংটা হইয়া রইলাম। উচিত।
–সরকারবাবু! মানে এই অভয় সরকার?
–হ্যাঁ হ্যাঁ। দেখতাছ না, কেমন বাড়ি ভর্তি আলো করছে আমার আলো মাইরা নিয়া? কতজনের কাছে গিয়া বলছি, এত বড় অবিচার আমার সঙ্গে হইল। আপনারা কেউ কিছু কইলেন না। নিদেন আমার টাকাটা ফিরতের ব্যবস্থা করেন। ও টাকা তো ওনার হাতের ময়লা। কোনও শালায় কিছু করল না। বড় আঘাত পাইছিল স্মৃতি। তবে তহন বয়স কম আছিল, সামলায় নিছে। এহন আর…
–বৌদি তাহলে গয়নার শোকেই?
–গয়নার কথা কইতাছিল কয়দিন ধইরা। আমারেই দোষ দিতাছিল। তা দোষ তো আমারই। আমিই তো সরকারবাবুরে বিশ্বাস করছিলাম। আমিই তো বইস্যা বইস্যা সেলাইফোঁড়াই কইরা গ্যালাম জীবনভর। গতর খাটায় মজদুরি করলে এর থিকা ভাল হইত। কিন্তু কী জানো বাপ? ব্রাহ্মণ সন্তান যে। আমাগো কিছুই নাই, কেবল প্রেস্টিজ। লোকে কী কইব, হেইডাই ভাবছি। হাঁড়িতে ভাত না থাকলে যে লোকে ভাত দিব না, হেইডা মনে রাখা উচিত আছিল।

কী বলব বুঝতে না পেরে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলাম। মাথা তুলে দেখি ধীরেনদা কেমন অদ্ভুতভাবে একদৃষ্টে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমার খেয়াল হল, মোনালিসার কাজটা করাতে এসেছি। সে কথা বলতে যাব, ধীরেনদা বলল— তুমি ওই বেলাউজগুলা নিয়া যাও, বুঝলা? বৌমার এহন কচি বয়স। ওদেরই ওসব মানায়। আর বৌমা পরলে দুইটা লোকে দেখব, দেইখা আমার সুখ্যেত করব। কাউরে তো কইতে শুনলাম না, ধীরেন অমুক কাজটা ভাল করছে।

–আরে না না, সে কী কথা? বৌদির কত সাধের জিনিস ওগুলো, তোমার নিজের হাতে বানিয়ে দেওয়া। ওসব নেওয়া যায় নাকি? তাছাড়া বৌদি আর ফিরে আসবে না তো বলেনি। তুমি শুধু শুধু এসব ভাবছ।

ধীরেনদা হঠাৎ প্রায় আমার গায়ে উঠে পড়ে বলল—

–আইব না। আর সে আইব না। যেহানে গ্যাছে সেহান থিকা আর আসা যায় না।

কথাটা শুনেই আমার পিলে চমকে উঠল। এ তো বদ্ধ উন্মাদ! আসল কথা তাহলে এই। এতক্ষণ আমি কেবল এর পাগলামি সহ্য করছিলাম। ইশ! কতখানি সময় নষ্ট হল। এখন এর হাত থেকে পালানো যায় কী করে ভাবতে হবে। কিন্তু পালানোর কথা ভাবতেই খপ করে আমার হাতটা ধরে ধীরেনদা বলল—

–সবই তো জাইনা ফেলছ। বাকিটুক আর থাকে ক্যান? আসো তোমারে দেখায় দিই। কাল সকালে তো এ বাড়ি প্রোমোটারের লোক আইসা মাটিতে মিশায় দিব। এহানে দশতলা ফ্ল্যাট হইয়া গ্যালে আর কে মনে রাখব ধীরেন দর্জিরে, তার গিন্নিরে? তুমি জাইনা যাও ঘটনাটা।

বারান্দার এক প্রান্তে রান্নাঘর আর বাথরুম দেখেছিলাম। আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেল অন্য প্রান্তে। সেখানে একটা বন্ধ দরজা। এক টানে সেই দরজা হাট করে খুলতেই মারাত্মক দুর্গন্ধ নাকে এল। ধীরেনদা বলল—

–ভালমন্দ খাওয়া জোটে না, তাও মায়া কাটে না। শ্বশুরের ভিটেটাও থাকব না শুইন্যা কী করছে দ্যাহো।

আলো জ্বলে উঠল, দেখলাম ওটা গুদামঘর। তবু কোনও সময়ে ফ্যান লাগানো হয়েছিল, সেই ফ্যান থেকে শাড়ি গলায় পেঁচিয়ে ঝুলছে ধীরেনদার স্মৃতি। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলাম। শেষে আত্মহত্যার সাক্ষী! আত্মহত্যা না খুন— তাই বা কে জানে? এই উন্মাদের পক্ষে সবই সম্ভব। যা গন্ধ বেরিয়েছে, তাতে ঘটনাটা যে বেশ কয়েকদিন আগে ঘটেছে তাতে সন্দেহ নেই। এতদিন লুকিয়ে রেখেছে কেন? পিছনে ঘুরে তাকিয়ে দেখি ধীরেনদা নেই। সর্বনাশ! লোকটা আমাকে ফাঁসিয়ে দিয়ে পালাল না তো? দৌড়ে বাইরের ঘরে এসে দেখি, সেলাই মেশিনের ওপর কাত হয়ে পড়ে আছে ধীরেনদা, চশমাটা মাটিতে। ওই চোখ জ্যান্ত মানুষের নয়।

 

আমাদের বিয়েবাড়ি যাওয়া হয়নি। পরদিন ভোর সাড়ে ছটায় বাড়ি ভাঙতে এসে প্রোমোটারের লোকেরা আমাকে উদ্ধার করে। আমি বাইরের ঘরে ধীরেনদার মৃতদেহের সামনেই মাটিতে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিলাম। ওই ঠান্ডায় আমার বেঁচে থাকার কথা নয়। ধীরেনদার খাটের তোষক পেতে শুইয়ে, তৈরি আর কাটছাঁট করা জামাকাপড়ের স্তূপ দিয়ে আমাকে চাপা দিয়ে রেখেছিল কেউ, তাই বেঁচে গেছি। আমার মাথার নীচে বালিশের মত করে রাখা ছিল মোনালিসার কাঞ্জিভরম, ফলস লাগানো। আর সেই ব্লাউজগুলো।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...