গোয়েল ভবন

অমিতরূপ চক্রবর্তী

 

বাড়িটায় কে বা কারা থাকে আমি জানি না। আমি কাউকে এ বাড়ির ফটক দিয়ে ঢুকতে বা বেরুতে কখনও দেখিনি। কেমন একটা গাঢ় নৈঃশব্দ্য বাড়িটাকে ঘিরে। ফটক অবশ্য খোলা থাকে। সেখান দিয়ে চোখে পড়ে সিমেন্টে বাঁধানো রাস্তা বাড়িটার ভেতরের দিকে চলে গেছে। কম্পাউন্ডের ভেতরে নানা ধরনের গাছ। তাদের ঝাঁকড়া ডালপালা সীমানা প্রাচীরের মাথা জ্যাম করে রেখেছে। কোনও কোনওটা বেরিয়ে এসেছে রাস্তার ওপর। সেই ডালগুলো থেকে খুদে সাদা তিসির মতন কী নাম-না-জানা ফুল রাস্তার শানে ঝরে ঝরে পড়ে থাকে। পথচারীরা সেই ফুল মাড়িয়ে মাড়িয়ে যায়। লোহার ফটকের পাশে গেটের থামে মার্বেলে অবশ্য লেখা আছে গোয়েল ভবন। গোয়েল তো অবাঙালি পদবি। আবার ভবন কথাটা বাংলায়। বাড়িটা মূল ফটকের চাইতে একটু উঁচুতে। রাস্তা থেকে সেই অনেকটা ইশকুল বিল্ডিং ধাঁচের বাড়ির খানিকটা দেখা যায়। কাচ বসানো বড় বড় জানালা। সবগুলিই বন্ধ। দেওয়ালের রং লাইম ইয়োলো। তারপরেই আবার ছন্নছাড়া বিভিন্ন গাছের ডালপালা। লাল থোকা থোকা ফুল। হয়তো গুলমোহর। ফটকের ভেতরে সিমেন্ট বাঁধানো রাস্তায় চোখে পড়ে একধারে জল দেওয়ার একটা নাইলন পাইপ পড়ে আছে বা হয়তো ওটা ওভাবেই রাখা। তার মুখ দিয়ে কখনও তিরতির জল গড়িয়ে পড়তে দেখেছি। জল পড়ার জন্যেই হয়তো এই বাড়িতে ঢুকে যাওয়ার রাস্তাটা সবসময় ভিজে ভিজে থাকে। সিমেন্টে কোথাও কোথাও মিহি শ্যাওলাও জমেছে।

গোয়েল ভবন এই নামটার পারস্পরিক বিরোধিতাই আমার কৌতূহল জাগায়। গোয়েল অবাঙালি পদবি। আবার বাড়ির নামকরণের ক্ষেত্রে ভবন শব্দটা বাংলায় ভীষণ প্রচলিত। অবশ্য অ-বাংলা ভাষাতেও এর প্রয়োগ আছে। কিন্তু আমার কেন জানি ইনটুইশানের মতোই মনে হয় এই নেমপ্লেটের যে ভবন শব্দটা— তা বাঙালি মানে বাংলা ভাষাভাষী কারও দেওয়া। নয়তো বাংলা ভাষাভাষীর প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া।

আপনি বলবেন, হয়তো গোয়েলদের কোনও বংশধর কোনও বাঙালি মেয়েকে বিয়ে করেছিল। তাদের সন্তানেরা মানে পরবর্তী প্রজন্ম এটা করেছে। পিতৃপুরুষদের পদবির সঙ্গে মায়ের জাতের প্রতি সম্মান দিয়ে ভবন শব্দটা রেখেছে। হয়তো এই শব্দটা ওই বাঙালি স্ত্রী-টিরই দেওয়া। নয়তো সেই দম্পতিরাই পরামর্শ করে, বুদ্ধি করে এমন একটা নামকরণ করেছে, যাতে দু পক্ষেরই মান থাকে। হ্যাঁ, আমিও ভেবেছি এমন। কিন্তু তবুও মনে হয়েছে, থিওরি যেন ফুলফিল হচ্ছে না। কী একটা পয়েন্ট যেন ভেবে দেখার ক্ষেত্রে বাদ পড়ে যাচ্ছে।

এই রাস্তায় আরও অনেক নতুন নতুন সুদৃশ্য বাড়ি আছে। একটি তে-তলা বাড়ি তো পুরোটাই নাইলনের নেট দিয়ে মোড়া। এমনকী ছাদের মাথাও। প্রথমটায় না বুঝলেও. পরে কারণটা বুঝতে পেরেছিলাম। ব্যাপার এই যে, এই বাড়িতে অনেক পায়রা। বাড়ির মালিকের হয়তো পায়রা পোষার বাতিক। পায়রাগুলো যাতে উড়ে পালাতে না পারে— তাই এই ব্যবস্থা। গায়ে গায়ে ঠাসাঠসি করে অনেক পায়রাকে আমি জানালার কার্নিশে বসে থাকতে দেখেছি।

আরেকটি প্রকাণ্ড বাড়ির নাম সেন’স কনক্লেভ। বাড়ির বাইরের গেটে দুজন সিকিউরিটি। মূল বিল্ডিংয়ের মার্বেল বসানো সিঁড়িতে একটা কালো কুচকুচে দোহারা কুকুর শুয়ে থাকে। বোধহয় হাউন্ড। লেজের ডগা কাটা। কেন যে অ্যাতো নিরাপত্তা— আমি কখনও এটা ভেবেও আশ্চর্য হই। বাড়িতে নিশ্চয়ই অসৎ কাজকর্ম হয় না। বাড়িতে তো সেই মালিকের সংসার, আত্মীয়-পরিজনরাই থাকে। তাছাড়া হতে পারে মালিক মানুষটি হয়তো বাড়িতে প্রচুর ক্যাশ টাকা গচ্ছিত রাখে। কিন্তু তাই-বা কেন হবে? টাকা রাখার জন্য ব্যাঙ্ক আছে। যিনি এমন একটি বাড়ির মালিক তিনি ব্যাঙ্কের সুবিধা নেবেন না— তা হয় না। এই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার ব্যবস্থাও হয়তো মালিকের শখ বা বাতিক। উঁহু, অসম্ভব নয়।

এই যে অ্যাতো বাড়ি, এদের মধ্যে গোয়েল ভবনই সবচেয়ে অদ্ভুত। একটি কারণ এই নাম। দ্বিতীয় কারণ ওর গুমোট, নৈঃশব্দ্যমাখা পরিবেশ আর মনুষ্যহীনতা।

গোয়েল ভবনের সামনের রাস্তাটা দিয়ে আমি কিছুটা দূরে একটা পাবলিক স্কুলে পড়াতে যাই। প্রতিদিনই আমার ক্লাস থাকে। আমি ইতিহাস পড়াই। স্কুলে পড়িয়ে আবারও ওই গোয়েল ভবনের সামনে দিয়েই আমার ভাড়া বাড়িতে ফিরি। মুখ-হাত ধুয়ে কিছু খেয়ে খানিকক্ষণ বিশ্রাম নিই। সন্ধের দিকে দুটো টিউশানি থাকে। সেগুলো সেরে আমি বাসস্টপের কছে একটা স্টেশনারি দোকানে গল্পগুজব করতে যাই। দোকানটি আমার বন্ধু মোহিতের। ওর দোকানের বাইরে বাঁধানো জায়গায় কয়েকটি বেঞ্চ রাখা আছে। সেখানে আমরা কয়েকজন বন্ধুবান্ধব মিলে আড্ডা দিই। মোহিত সুযোগ বুঝে এসে ঠেকা দিয়ে যায়। সিগারেট খায়। নটার দিকে আবার ভাড়াবাড়িতে ফিরি। গ্যাসে রান্না বসাই। যেদিন রান্না করতে ইচ্ছে করে না হোটেলে খেয়ে আসি। ঘরে এসে ফোন নিয়ে বসে যাই রিনির সঙ্গে কথা বলতে। রান্না করলে সেদিন আর রিনির সঙ্গে কথা বলি না। সারাদিনের ধকলে খুব ক্লান্ত লাগে। টিভি চলিয়ে একটু খবরটবর দেখি। তারপর শুয়ে পড়ি।

রিনির পরিচয়টা এখানে অল্প জানিয়ে রাখি। রিনি আমার মাধ্যমিকের ব্যাচমেট। একই স্কুলে আমরা পড়তাম। কলেজে ওঠার পর পরই রিনির বিয়ে হয়ে যায় এক ফুটবল খেলোয়ারের সঙ্গে। ফুটবল খেলোয়ার ভদ্রলোকটি বিয়ের তিনবছর ঘুরতে না ঘুরতে বাইক অ্যাকসিডেন্টে মারা যান। রিনিরা তখনও কোনও ইস্যু নেয়নি। এরপর রিনির আবার বিয়ে হয় একটু বেশি বয়সের এক হোমিওপ্যাথের সঙ্গে। বয়স্ক লোকটিরও প্রথম পক্ষের স্ত্রী মারা গেছে। সন্তান নেই। উনি রিনির প্রতি ভীষণ কেয়ারিং। সামান্য হাঁচি হলেই ডাক্তার ভদ্রলোক রিনির মুখে হোমিওপ্যাথির গুলি গুঁজে দেন। রিনির দ্বিতীয় বিয়ের বয়স এখন নয় থেকে দশে গড়াতে চলল। ওদের ছেলেমেয়ে নেই। রিনি নিশ্চিত যে আর হবেও না। কারণ ভদ্রলোকটির বয়স পঞ্চান্ন ক্রস করতে চলল।

আমি কখনও বলি, ডাক্তার দেখা নয়তো টেস্টটিউব বেবি নিয়ে নে।

রিনি বলে, ডাক্তারের চিন্তাভাবনাটা ডাক্তারসুলভ হতে হবে তো। যে লোকটা রাতে সাপ না বলে লতা বলে, সে টেস্টটিউব বেবির কথা শুনলে কী রিঅ্যাক্ট করবে— বুঝতেই পারিস।

–তোদের ফিজিক্যাল রিলেশন হয়?
–ইচ্ছে ষোলোআনা কিন্তু ক্ষমতা নেই। পারে না।
–তুই টলারেট করছিস কী করে?
–প্র্যাকটিস করলে হয়ে যায়। মেয়েরা অনেক অসম্ভব জিনিস পারে। তোরা কল্পনাও করতে পারবি না।

যেদিন আমাদের কথা হয়, গভীর রাত অবধি কথা হয়। আমি রিনিকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এই যে ফোনে গভীর রাত অবধি কার না কার সঙ্গে কথা বলিস, তোর বর কিছু বলে না?

রিনি বলে, লোকটি একটু বাবা টাইপের জানিস তো। সকালে চা খেতে খেতে বলে অত রাত অবধি ফোনে কথা না বলে মাঝে মাঝে তোমার বন্ধুকে বাড়ি আসতে বলো না। মোবাইল ফোনের রেডিও অ্যাক্টিভ বিকিরণ আছে। বেশিক্ষণ কথা বললে তোমার ইনসমনিয়া হতে পারে। নার্ভাস সিস্টেমের ওপর স্ট্রেস পড়তে পারে। মাঝে মাঝেই একটানা কথা বলো। এক কাজ কোরো, আমার ঘরে ক্যালিফস আছে। সকালে সন্ধ্যায় চারটে করে খেও। কী বলবি বল?

–এ তো সিনেমার মতন রে?
–কেন? তোর কেসও তো সিনেমার মতন। ভাইয়ের সংসারে অশান্তি দেখে বিয়েই করলি না। ছাত্র পড়িয়ে জীবন কাটাচ্ছিস। ভাস্তা-ভাস্তিদের বিয়ের সময় হয়ে গেল।

রিনি মিথ্যে বলেনি কিছু। ভাই ভালোবাসা করে বিয়ে করল। তারপর থেকেই ওদের সংসারে আগুন জ্বলছে। ভাই বদরাগী কিন্তু করবী মেয়েটিও কম নয় কিছু। একদিন তালা ছুঁড়ে ভাইয়ের মাথা ফাটিয়ে দিল। সে কী বিশ্রী অবস্থা। পাড়ার লোক বাড়িতে এসে জানাল ওদের প্রতিদিনের এই অশান্তির চোটে তারাও জেরবার হয়ে যাচ্ছে। আমার বাবা নেই। মা-ই বাড়ির অবিভাবক। বাবার বন্ধু সমরেশজেঠু মা-কে বললেন, ব্যাপারটা খুব খারাপ দিকে গড়িয়ে যাচ্ছে বীণা। অবিলম্বে এর বিহিত করো। প্রতিদিন দিনে-রাতে এমন অশান্তি। পাড়া-প্রতিবেশীরাও তো অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। আর তোমার ছেলে আর ছেলের বউয়ের যে অশ্লীল ভাষা— শোনা যায় না। সবাই তো বলছে ওয়ার্ড কাউন্সিলারের কাছে অভিযোগ জানাবে। নাহ, বীণা সত্যিই এভাবে চলতে পারে না। কিছু একটা বিহিত করো তোমরা।

মা আর যেন কাঁদতে পারেন না। কঠিন হয়ে বসে রইলেন। করবীকে কিছু বোঝানো মানে মানসম্মান খোয়ানো। ভাইকে ডেকে মা বললেন, ছোটু তোরা আলাদা হয়ে যা। তোদের বাবা গরীব ছিলেন, কিন্তু তাঁর একটা সম্মান ছিল। তাঁর আর তাঁর পরিবারের সম্মানটুকু এভাবে ধুলোয় মিশিয়ে দিস না তোরা। তোদের স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়ায় আমি তো ঢুকতে পারি না। আর ঢুকেই বা কী হবে। তোদের দুজনকেই কিছু বলা অর্থহীন। তাই আর নয়, অন্য কোথাও উঠে যা এই বাসা ছেড়ে। আমার শরীর ভালো না। রোজ রোজ এইসব অশান্তি আমিও সহ্য করতে পারি না।

করবী ওর দুই ভাইকে ডেকে এনে আমাকে আর মা-কে যাচ্ছেতাইভাবে অপমান করল। করবীর ভাইয়েরা শাসিয়ে গেল, ছোট ছেলে আর ছেলের বউকে তাড়িয়ে সম্পত্তি আত্মসাৎ করার চেষ্টা করলে থানা-পুলিশ করব। মামলা করব। সেদিন মা সারারাত বারান্দায় আলো নিভিয়ে বসে রইলেন। পরদিন সকালে মায়ের ডেডবডি পাওয়া গেল মায়েরই ঘরে। বিছানায়। ভোরে ইঁদুর-মারা বিষ খেয়েছিলেন তিনি।

এর একবছরের মাথায় ওদের ঘরে যমজ সন্তান এল।

বাড়ির প্রতি বিবমিষা চলে এসেছিল আমার। তারপরেই শিলিগুড়ির এ-দিকটায় চলে আসি। প্রথমে প্রথমে এক মাড়োয়ারির চালের আড়তে কাজ করতাম। ভয়ঙ্কর সেই অভিজ্ঞতা। প্রধাননগরের কাছে একটা মেসে থাকতাম। রুমমেটরা সবাই আমার চেয়ে বয়সে ছোট। কেউ কী এক কোম্পানির সেলসে কাজ করত। কেউ মোবাইল কোম্পানির কাস্টমার কেয়ারে। মদ খেয়ে প্রায় প্রতি রাত্রেই হুল্লোড় করত। ল্যাপটপে ব্লু ফিল্ম দেখত। অসহ্য রকমের এক অবস্থা। তিনটি বছর কীভাবে যে ওখানে কাটিয়েছি, তা আমিই জানি। শেষে ওই সমরেশজেঠুরই এক বন্ধুকে ধরে এই পাবলিক স্কুলের চাকরিটা। স্কুলটা বাগডোগরার কাছাকাছি। একটা নতুন তৈরি হওয়া টাউনশিপের মতো জায়গায়। আমি কাছাকাছি সস্তায় একটা এক কামরার ঘর ভাড়া নিলাম। এখানে এসে যেন জীবনে ফিরলাম।

রিনি যে এদিকেই থাকে, তা জানতাম না। এখানে একটা বাজার আছে। কাছাকাছি আর্মি ব্যারাক আছে বলে বাজারে কাস্টমার ভালোই। তাছাড়া এইসব নতুন নতুন টাউনশিপে ফ্ল্যাট কিনে প্রচুর লোক চলে এসেছে। পরিত্যক্ত মাঠ, মজা ডোবা ভরিয়ে প্রচুর নতুন নতুন বাড়ি হয়েছে। আমার চোখের সামনেই তো কত ফাঁকা, পতিত জায়গায় সুদৃশ্য সব বাড়ি উঠে গেল। যে রাস্তার একধারে ছিল ডোবা আর জঙ্গল, রাতারাতি সেসব বদলে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল তেতলা, পাঁচতলা বাড়ি। উঁচু-নিচু রাস্তা হয়ে গেল স্ট্রিট। ভাবাই যায় না।

যে-কথা বলছিলাম, রিনি যে এদিকেই কোথাও থাকে তা আমি জানতাম না। দিনে ইস্কুল আর রাতে টিউশানি পড়িয়ে চলেছি। চাকরিবাকরি পাওয়ার সময় শেষ। এখন এই-ই আমার রুজিরুটির উৎস। একদিন বিকেলে বাজারে গিয়েছি। আনাজপাতির দোকানে দাঁড়িয়ে দরদাম করছি। আমার পাশেই একটু দূরে একটি মহিলা ক্রেতা। একটু মোটা, মুখে মাস্ক। এ-দিকটায় অক্টোবর নভেম্বরে খুব ধুলো ওড়ে। অনেকেই মুখে মাস্ক ব্যবহার করেন অ্যালার্জির হাত রেখে রক্ষা পাওয়ার জন্য। যথারীতি আমি আনাজপাতি দরদাম করছি। হঠাৎ কাঁধের খুব কাছে কেউ এসে বলল— কী রে চিনতে পারছিস?

চমকে উঠেছিলাম। ততক্ষণে সেই মহিলা ক্রেতা মুখের মাস্ক নামিয়ে হো হো করে হেসে উঠেছে। একটু সময় লাগলেও রিনিকে চিনতে পেরেছিলাম। বাজার করা লাটে উঠল। রিনি আমাকে একরকম গ্রেফতার করে নিয়ে বসাল একটি চা-মিষ্টির দোকানে। আমার উল্টোদিকে বসে বলল, তুই এখানে কী করছিস?

সব ঘটনা রিনিকে ভেঙেচুরে বললাম। রিনি বলল, স্কুলটার নাম শুনেছি। লেগে থাক। ভবিষ্যতে হয়তো গভর্মেন্ট আন্ডারটেকিং হয়ে যেতে পারে। আমার তোকে দেখে দারুণ আনন্দ হচ্ছে। একলা থাকতে থাকতে শেষ হয়ে যাচ্ছিলাম। তোকে এভাবে পেয়ে আবার আশা জাগছে।

তারপর রিনির মুখেই শুনলাম ওর বৃত্তান্ত।

আমরা কফি আর সিঙাড়া খেলাম। রিনি বলল, তোর নাম্বার দে তাড়াতাড়ি। সারাদিন তো তোকে পাওয়া যাবে না, রাতে ফোনে কথা বলব। আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোর বাড়ি এদিকে কোথায়? ও বলল, আরে এই তো, বাজার ছাড়িয়ে তিনটি গলির পরে। জায়গাটার নাম বিবেকানন্দ পল্লী। টোটোতে দশ টাকা নেবে। আমার তিনি তো ডাক্তার। একডাকে সবাই চেনে। কাউকে বলবি মাধবডাক্তারের বাড়ি কোনটা, দেখিয়ে দেবে। চল আজ উঠি।

–একটা কথা বলব?
–কী রে?
–তুই কিন্তু এখনও সুন্দর আছিস। একটু মুটিয়ে গিয়েছিস, এই যা।
–এইরকম ফ্লার্ট করা তোদের পুরুষমানুষদের একটা জেনেটিকাল দোষ। সুন্দর থাকতে চাই বলে সুন্দর আছি। সবকিছুই কি আর সময় কন্ট্রোল করে? কিছুটা রাশ তো নিজের হাতেও থাকে, তাই না? তাছাড়া থাইরয়েডের প্রবলেম। মুটিয়ে যাব না তো কী?
–তোর মুখে এমন লিটারেরি কথা শুনে অবাক হচ্ছি। একটা সময় গায়ে বাঘ পড়লেও শব্দ করতিস না।
–এটারও ওই একই নিয়ম। বলতে চাইতাম দেখে বলতে পারছি।

বাড়ি ফিরে সেদিন শুধু আলুসেদ্ধ ভাত খেয়েছিলাম। রিনির ঘোর আমাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।

এরপর রোজকার রুটিনে যুক্ত হল আরেক নতুন অধ্যায়। রাতে রিনির সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলা। একদিন জানালায় চোখ পড়তেই দেখলাম রাত ফর্সা হয়েছে। ভাগ্যিস পরদিন ইশকুলে ছুটি ছিল।

আরেকদিন রিনির সঙ্গে সেই বাজারেই দেখা। আবার সেই চা-মিষ্টির দোকানে বসে কফি আর সিঙাড়া খাওয়া। ইতিমধ্যেই আমি রিনির দ্বিতীয় ম্যারেড লাইফ সম্পর্কে আমি অনেককিছুই জেনে ফেলেছি। ও বলল, জানিস এই বুড়ো লোকটাকে প্রথম প্রথম আমার অসহ্য লাগত। এখন কেমন একটা মায়া পড়ে গেছে।

–শুধু মায়ার ওপরে ভর দিয়ে বাকি জীবনটা কাটাতে পারবি?
–জানি না রে। লোকটা কীরকম যেন বাবা বাবা টাইপ। তাই আরও মায়া হয়। লোকটা সরল।
–আগের ভদ্রলোকটি?
–ওরে বাবা, সাঙ্ঘাতিক রকমের চালাক। মনের কথা কীভাবে যেন বুঝে যেত। বুনো পশুর মতো আমাকে আদর করত। ওর চোখদুটোই ছিল ভীষণ সুন্দর। পুরুষমানুষের অত গভীর সুন্দর চোখ আমি দেখিনি।

অবলীলায় রিনি এসব বলে যেত। আমি ওকে দেখতাম শুধু। ওর কথা বলার ভঙ্গি, তাকানোর ভঙ্গি, চায়ে চুমুক দেবার ভঙ্গি। কিছুতেই সেই ব্যাচমেট মেয়েটির সঙ্গে এই মেয়েটিকে মেলাতে পারতাম না।

–চাকরিবাকরির চেষ্টা করছিস না কেন? বয়েস তো আছে।
–দুর বাবা, নতুন করে পড়াশোনা করা আমার আর হবে না। ঘুষ দিয়ে যে চাকরি কিনব— অত পয়সাও আমার নেই। গ্রাম্য একজন হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের ব্যাঙ্ক ব্যালান্স আর কত থাকে বল? ভিজিট আর ওষুধ মিলিয়ে টেনেটুনে তো বড়জোর একশো টাকা। অনেক পেশেন্টের ট্রিটমেন্ট তো ফ্রি।
–তোর হাজব্যান্ড তো তাহলে খুব বড় মনের মানুষ।
–বললাম না, বাবা বাবা টাইপের। সবার দুঃখ-দর্দের প্রতি নজর।
–আর তোর প্রতি?

আমার প্রশ্নের উত্তরে কিছুক্ষণ চা মুখে নিয়ে বসে রইল রিনি। ঠোঁট কামড়ে ধরল। তারপর বলল, আমার প্রতি লোকটির নজর নেই বললে, মিথ্যে বলা হবে। আমার কোনও কিছুতেই ওর না নেই। বরং প্রশ্রয়ই আছে। শুধুমাত্র একটা জিনিস লোকটি পারে না। ওর মতো লোকের পক্ষে পারার কথাও নয়। চেষ্টাও করেনি যে তাও নয়। এইজন্য লোকটা হয়তো মনে মনে ইনফিরিওরিটি সমস্যায় ভোগে। আমি বুঝি সেই যন্ত্রণাটা। লোকটা যে প্রতি মুহূর্তে মরমে মরে যাচ্ছে, তা আমি টের পাই।

এরপর আমরা কেউই অনেকক্ষণ কোনও কথা বলিনি। রিনি শুধু শব্দ করে কফিতে চুমুক দিচ্ছিল। আমি বাইরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে কিছুই ভাবছিলাম না। শুধু একটা পোটাটো চিপসের ছেঁড়া প্যাকেট কীভাবে দুই বিপরীত দিক থেকে আসা গাড়ির হাওয়ায় খানিকটা এগিয়ে যায়, আবার পিছিয়ে আসে, আবার এগিয়ে যায়, আবার পিছিয়ে পড়ে— এইসবই দেখছিলাম।

স্তব্ধতা ভাঙল রিনি। কফিতে চুমুক শেষ করে বলল, চল, তোকে একটা জায়গা থেকে ঘুরিয়ে আনি।

আমি বললাম, কোথায়? রিনি সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে আমাকে প্রায় টানতে টানতে রাস্তায় নিয়ে এল। তারপর একটি আগতমান টোটোকে দাঁড় করিয়ে আমাকে নিয়ে উঠে বসল। টোটোচালককে বলল— বিবেকানন্দ পল্লী চৌপথি চলো।

টোটোতে যেতে যেতে কেন জানি না আমার গোয়েল ভবনের খোলা ফটকটার কথা মনে পড়ল। স্যাঁতসেতে বাড়িতে ঢোকার নিঝুম রাস্তাটা মনে পড়ল। গুলমোহরের মতো লাল থোকা থোকা ফুল ধরা কম্পাউন্ডের গাছগুলির কথা মনে পড়ল আর সেই যে নাইলনের পাইপ, যার মুখ দিয়ে তিরতির করে জল বেরিয়ে গড়িয়ে পড়ে— সেই পাইপটার কথা মনে পড়ল।

বলবেন তো, এই দৃশ্যাবলির অন্তর্গত কোনও অর্থ নেই! আমিও জানি সত্যিই অন্তর্গত কোনও অর্থ নেই। কিন্তু কী জন্যে যে আমার মানসপটে ওই ছবিগুলিই বার বার ভেসে উঠছিল— আমি ঠিক বলতে পারব না।

টোটো থামার পর রিনি পয়সা মিটিয়ে রাস্তার এপার থেকে অন্যপারের একটি কাঠের ছোট্ট বারান্দা দেওয়া ঘর দেখিয়ে বলল, আমরা ওইখানে যাব।

 

২.

ঘরটার সামনে এসে দেখলাম কাঠের বারান্দায় বেঞ্চে কয়েকজন শীর্ণ, বয়স্ক লোক বসে আছে। মুখে মেছেতার ছোপ নিয়ে সিঁথিতে চওড়া সিঁদুর দেওয়া একটি মহিলাও বসে আছে। দরজায় ঈষৎ ঝুল খাওয়া দড়িতে একটা ময়লা, সবুজ রঙের পর্দা ঝুলছে। দরজার পাশে একটি কাঠের নেমপ্লেট। তাতে লেখা, ডাঃ মাধব পুরোকাইত। বিএইচএমএস।

রিনি খুব সাবধানে পর্দাটা সরিয়ে বলল, পেশেন্ট আছে নাকি? আসব? আসতে পারি?

নিজের অনুমানক্ষমতার ওপর কেমন আমার একটা বিশ্বাস ছিল। ভাবতাম লোকের নাম দেখে আমি মূল লোকটার বাহ্যিক চেহারা আন্দাজ করতে পারি। চোখ দেখে বুঝতে পারি ভেতরের মানুষটা কেমন হবে। কয়েকবার পরীক্ষা করেছি। দেখেছি বেশ কাছাকাছি গেছে। যেমন বৌভাতের দিন যখন করবী আমাদের খেতে দিল, ওর চোখ দেখে মনে হয়েছিল এই মেয়েটি ক্রুদ্ধ সাপিনীর মতো হবে। পরে তো দেখেছিলাম ওর বিষধর চেহারা। এখন রিনির কথা শুনে যে লোকটি টেবিলে নানা সাইজের শিশি-বোতলের ওপার থেকে মাথা তুলল তাকে দেখে আমার নিজের অনুমানক্ষমতার ওপর এতদিনের লালিত বিশ্বাস জোর ধাক্কা খেল। চুরমারই হয়ে গেল বলা যায়।

যিনি মাথা তুললেন তার মাথার চুল বেশিটাই সাদা। গালের চাপদাড়ির রঙও সাদা। আমার কলেজে একজন বিজ্ঞানের অধ্যাপক ছিলেন ডিএনএস অর্থাৎ দীননাথ সান্যাল। অবিকল তাঁর মতো চেহারা এই লোকটির। চশমার ভেতরে দীপ্ত দুই চোখ। মণিতে কিছুটা নীলাভ ছোঁয়া। লোকটি মাথা তুলেই হেসে বলল, আরে রি, কী ব্যাপার? এই সময়ে হঠাৎ?

–ইয়ে, মানে আমার সেই বন্ধুটিকে নিয়ে এসেছি। যার সঙ্গে আমি রাত জেগে গল্প করি। সুদীপ্ত।
–তাই? কই, ওকে ভেতরে নিয়ে এসো। আমার যা চেম্বার! একজনের বেশি দুজন আঁটে না। বলো তো তোমাদের বসতে দিই কোথায়? কই ওকে আ…! আমার দিকে চোখ পড়তেই মানুষটি হেসে বলল, আসুন, আসুন। দেখছেনই তো যে ছোট্ট ঘর, বসতে দেওয়ার জায়গাও নেই।

রিনি যেন চিত্রার্পিতের মতো দাঁড়িয়েছিল। এবার ও খুব শান্ত স্বরে বলল, পেশেন্ট তো বেশি নেই। ওদের দেখে বাড়ি যাওয়া যাবে না?

–হ্যাঁ, যাওয়া যাবে না কেন! তোমরা তাহলে বরং বাইরেই একটু ওয়েট কর। আমি তাড়াতড়ি ওদের দেখে দিচ্ছি।

রিনি যেন বাচ্চা মেয়ে। সম্মতির ভঙ্গিতে ঘাড় নেড়ে আমার হাত টেনে বলল, আয়।

রিনির এমন চেঞ্জ দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছিলাম।

একটু পরে ভদ্রলোক ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। ঘরের দরজায় তালা লাগালেন। তারপর বাইরে এসে বারান্দার দরজায় আরেকটি তালা লাগালেন। তারপর আমাদের কাছে এসে হেসে বললেন, সরি, আপনাদের দাঁড় করিয়ে রাখলাম। তারপর বললেন, রি, দ্যাখো তো একটা টোটোকে থামাতে পারো কিনা?

আমি অভিভূত হয়েছিলাম ভদ্রলোকটির চেহারায়, কণ্ঠস্বর আর বাচনভঙ্গিমায়। প্রতিটি শব্দ কী যত্ন নিয়ে উচ্চারণ করা। যেখানে যতটুকু বিরতি দরকার, ঠিক ততটুকুই বিরতি। এমনভাবে কথা বলতেন আমাদেরই কলেজের আরেক অধ্যাপক। এসএন অর্থাৎ সর্বজয় নাথ। তিনি যখন কথা বলতেন, সবাই নিশ্চুপ হয়ে শুনত।

রিনি টোটো দাঁড় করাতে পেরেছিল একটা। আমি আর রিনি পেছনের সিটে পাশাপাশি। ভদ্রলোক টোটোর উল্টোদিকে। টোটোচালকের দিকে পিঠ দিয়ে। বললেন, আপনার কথা রি-র মুখ থেকে শুনে আমি খুব খুশি হয়েছি। আমি সারাদিন পেশেন্ট, ওষুধ, চিকিৎসা নিয়ে পড়ে থাকি। কোনও জটিল পেশেন্ট এলে রাত জেগেও পড়াশোনাও করতে হয় আর এই মেয়েটা সারাদিন একা পড়ে থাকে। ওর ওপর দিয়ে কী ভীষণ মেন্টাল স্ট্রেস যায় বলুন।

আবার বললেন, প্র্যাক্টিশনার হিসেবে আমি ব্যাকবেঞ্চারই। কত ভালো ভালো লারনেড প্র্যাক্টিশনার আছেন। এই এলাকায় থাকি বলে দু-একটা পেশেন্ট পাই। নুন-ভাতটুকু জোটে। আপনাদের স্কুলের নাম আমি শুনেছি। ভালো স্কুল। আপনাদের মতো যোগ্য লোকেরা আছেন বলেই ভালো স্কুল। আপনাদের মতো এফিসিয়েন্ট টিচাররা আছেন, এতে ছাত্রদের লাভ হবে।

ছোট সাদা একটা বাড়ির সামনে এসে থামল টোটোটা। ভদ্রলোক নেমে পয়সা মিটিয়ে বললেন, আসুন। এই আমাদের বাড়ি। কুঁড়েঘরই বলা ভালো।

বাড়ির হাতায় ছোট্ট বাগানমতো। মধ্যে দিয়ে রাস্তা পাকা সিঁড়ির ধাপ অবধি গেছে। রিনির কাছেই বোধহয় বারান্দার দরজার চাবি ছিল। ও দরজার তালা খুলে দরজা মেলে দিল। হাতের বাঁ পাশে একটা ঘর। ওষুধের শিশি-বোতলে বোঝাই। মুখোমুখি ঘরটা বেডরুম। ভদ্রলোক বললেন, জুতো খুলতে হবে না, আসুন।

বিছানার মুখোমুখি দেওয়ালের সঙ্গে একটা কৌচ। আমি ওটাতেই বসলাম। নিজের জুতোসুদ্ধ পা-দুটো দেখতেই খুব অস্বস্তি হচ্ছিল। ভদ্রলোক বললেন, রি বোধহয় চা আনতে গেছে। আগে চা খান।

কী ভেবে আবার বললেন, আসলে রি-কে নিয়ে আমি খুব ওরিড। সারাটাদিন একা পড়ে থাকে মেয়েটা। মুখে কিছু না বললেও আমি ওর অবস্থাটা ফিল করি। ভাবুন তো, মন খুলে কথা বলার মতোও কেউ নেই। আসলে ওর যা বয়েস, তাতে আপনাদের মতো কাউকে পাশে পাওয়াই উচিত ছিল ওর। আমিও একটা হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে বসলাম। এতে করে মেয়েটাকে একরকম পানিশমেন্টই দিলাম আর কী।

দেখলাম ভদ্রলোক শূন্যদৃষ্টিতে একটা ক্যালেন্ডারের দিকে চেয়ে আছেন। নিজেই বিড়বিড় করে বললেন, আই হ্যাভ ডান এ মিসটেক সুদীপ্তবাবু। কীভাবে এটাকে উইথড্র করব বুঝতে পারছি না।

ঠুং করে একটা শব্দ হতেই দেখলাম রিনি ট্রে-তে করে চা-বিস্কুট নিয়ে এসেছে। ও বাধ্য ছাত্রীর মতো সামনের একটা টেবিলে চা, বিস্কুটের প্লেট নামিয়ে রাখল। ভদ্রলোক বললেন, দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসো।

আবার বললেন, সুদীপ্তবাবু, আমি ছিলাম নরেন্দ্রপুর মিশন ইস্কুলের ছাত্র। স্বামীজিদের দেখে খুব ইন্সপায়ার্ড হতাম। ভাবতাম ইন ফিউচার ওঁদেরই পথ বেছে নেব। কিন্তু কথায় আছে না, হোয়াট মেন ডু জাস্ট অপোজিট অফ হোয়াট দে ওয়ান্ট— আমিও তাই করলাম। প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পরে আমার গোল্ডেন চান্স ছিল। কিন্তু আবারও ভুল করলাম। রি-কে দেখুন, মনে হয় কোনও প্রাণ আছে ওর মধ্যে?

আমার থেকে একটু দূরে আরেকটা সিঙ্গল কৌচে রিনি বসেছিল। দেখলাম ওর মুখ নীচু। আঙুলে পরে থাকা আংটিকে অন্য আঙুল দিয়ে ঘোরাচ্ছে। কী বলব, কী করব বুঝতে পারছিলাম না। হঠাৎ একটা অপরাধবোধ হল আমার। পাশাপাশি রিনির ওপরেও প্রচণ্ড রাগ হল। এইরকম একটি মানুষের বিষয়ে আমাকে মিসলিড করার জন্য।

ভদ্রলোক বললেন, সুদীপ্তবাবু, বুঝতে পারছি আপনি একটা এমব্যারাসিং কন্ডিশনে পড়েছেন। আপনি আর রি ইস্কুলবেলার বন্ধু। তাই আপনাকে মনের কথাগুলো খুলে বললাম। রি-কে প্রতি মুহূর্তে তিলে তিলে মেরে ফেলছি সুদীপ্তবাবু। আপনি ওকে জীবনে ফেরান। রি আমাকে বলেছে আপনি আনম্যারেড। আপনি ওকে বিয়ে করুন। আমাকে মুক্তি দিন। বলতে বলতে ভদ্রলোক দেখলাম আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।

রিনিও হাউহাউ করে কেঁদে উঠল।

এই ঘটনার অনেকদিন পর একদিন যখন গোয়েল ভবনের সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে ইস্কুলে যাচ্ছি, দেখলাম টুপি পরা দারোয়ান গোছের একটা লোক গোয়েল ভবনের ফটকের পা্ল্লাদুটো ঠেলে ঠেলে গেটের মুখটাকে প্রশস্ত করছে। আমি ইচ্ছে করেই কৌতূহলবশত হাঁটার গতি কমিয়ে দাঁড়িয়ে গেলাম। দেখলাম বাড়ির ভেতর থেকে সিলভার ব্ল্যাক রঙের একটা দুর্দান্ত গাড়ি বেরিয়ে আসছে। পেছনের সিটে দুজন নারী-পুরুষ বসে আছেন। একজন উর্দি পরা ড্রাইভার ড্রাইভ করছে। গাড়িটা গেটের কাছে এসে কিছুক্ষণের জন্য থামল। পেছনের সিটের পুরুষটি জানালা দিয়ে মুখ বের করে গেটের সেই দারোয়ান গোছের লোকটাকে কিছু একটা বুঝিয়ে দিলেন। আর এপাশের মহিলাটি জানালার কাচ নামিয়ে বাইরে তাকালেন। আমাকে দেখলেন একঝলক। তারপর রাস্তার উল্টোদিকের বাড়িটার ছাদ পেরিয়ে আকাশের দিকে তাকালেন। দিনের উজ্জ্বল আলো সহ্য করতে পারছেন না বলে যেন চিলের ডানার মতো ভুরুদুটি কুঁচকে আছেন। তার মাঝামাঝি একটু ওপরের দিকে অস্তমান সূর্যের মতো একটা লাল টিপ।

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...