হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ

কাজী আব্দুল ওদুদ

 

কাজী আব্দুল ওদুদ গল্প, উপন্যাস লেখার পাশাপাশি যে বিষয় নিয়ে আজীবন গভীরভাবে চিন্তা করেছেন তা হল ভারতে বিশেষত বাংলায় মুসলমান সমাজের পশ্চাৎপদতার কারণ ও তা থেকে উত্তরণের উপায়। এ নিয়ে তাঁর গভীর ভাবনাচিন্তার প্রকাশ ঘটেছে তাঁর প্রবন্ধের মধ্য দিয়ে৷ নিজে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ হয়েও তিনি সমগ্র বিষয়টি চিন্তা করেছেন সম্প্রদায়-নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে, ফলে তাঁর চিন্তা কখনও একদেশদর্শিতার দোষে দুষ্ট হয়নি। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ কাজী আব্দুল ওদুদের 'চিত্তবৃত্তির ঔদার্য্য' নিয়ে এতটাই আশান্বিত ছিলেন যে তিনি তাঁকে নিজাম বক্তৃতা দিতে বিশ্বভারতীতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। ১৯৩৫ সালের মার্চ মাসে কাজী সাহেব হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক ও তাদের মধ্যে বিরোধের কারণ নিয়ে পর্যায়ক্রমে তিনটি বক্তৃতা রাখেন। এই বক্তৃতাগুলি বিশ্বভারতী থেকে বই হয়ে প্রকাশ পায় ১৯৩৬ সালে, যার মুখবন্ধ লিখে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কাজী আব্দুল ওদুদের প্রথম নিজাম বক্তৃতার তারিখ ছিল ২৬ মার্চ। নিচের লেখায় এই মূল্যবান বক্তৃতার অংশবিশেষ উদ্ধৃত করা হল। বক্তৃতাগুলি সম্প্রতি গ্রন্থাকারে পুনরায় প্রকাশ পেয়েছে মইনুল হাসানের সম্পাদনায়, সূত্রধর প্রকাশনা থেকে।

২৬ মার্চ্চ, ১৯৩৫

বাংলার এই মুসলমান/সমাজ, বিশেষ করে’ এর সুবিশাল নিম্ন অংশ যে অসার্থক জীবন যাপন করতো না তার পরিচয় রয়েছে সে-কালের লোক-সাহিত্যে। ওহাবীপ্রভাবের পূর্ব্বে মুসলমান সমাজের উপরে প্রবল ছিল সুফী-প্রভাব। মোটের উপর সেটি উদার মানবতার প্রভাব কিন্তু আচারপরায়ণতা অলৌকিকতাপ্রীতি এ-সবও ছিল তার সঙ্গে যুক্ত।

এই সমাজ মানস শক্তির দিক দিয়ে তেমন সবল না হলেও ওহাবী-প্রভাবকে বাধা দিতে যে চেষ্টা না করেছে তা নয়। লালন ফকির প্রমুখ উনবিংশ শতাব্দীর মুসলমান-বাউলদের গানে রয়েছে সেই প্রতিবাদের ঝঙ্কার। সে-চেষ্টা সফল হয় নাই কেন সে-সম্বন্ধে এই ক’টি কথার উল্লেখ করা যেতে পারে:

১) অলৌকিকতার উপরে সুফী ও ওহাবী দুই মতেরই শ্রদ্ধা। কাজেই ওহাবীরা যখন পরম অলৌকিক কোরআন ও হজরত মোহম্মদের পয়গম্বরের দোহাই দিলেন মুসলমান হিসাবে তখন অপর পক্ষের প্রায় কোনো উত্তরই রইল না।

২) অনুবর্ত্তিতা দুইয়েরই ধর্ম্ম। সে-ক্ষেত্রে পীরের অনুবর্ত্তিতার চাইতে পয়গম্বরের অনুবর্ত্তিতার মহিমা বেশী মনে হওয়া স্বাভাবিক।

৩) এই মুসলমান-সমাজে কু-আচার যথেষ্ট ছিল। প্রাচীন ইসলামের উন্নততর আচারের সামনে সে-সব নতশির না হয়ে পারে নাই।

কিন্তু দীর্ঘকালের জীবনধারার প্রতি মানুষের যে স্বাভাবিক মমতা তাকে এইসব যুক্তি জয় করতে পারতো না যদি রাজনৈতিক কারণ এর সহায়রূপে এসে না দাঁড়াত৷ বস্তূতঃ অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর ওহাবী আন্দোলনকে এক রাজনৈতিক আন্দোলন বলেও গণ্য করা যেতে পারে— ধ্বংসশীল মুসলিম জগতের গা ঝাড়া দেবার ও এক চেষ্টা৷ ভারতে অথবা বাংলায় রাজনৈতিক কারণ যে এর প্রভাবের মূলে তা বোঝা যায় ব্রিটিশ শাসন-কালে মুসলমানদের অবস্থার ইতিহাসের কথা ভাবলে। ব্যাপারটি সংক্ষেপে এই:

হিন্দুসমাজের পদস্থ ব্যক্তিদের আনুকূল্যে বাংলায় ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই পরিবর্ত্তনে মুসলমানেরা যে খুব বিচলিত হয় নাই তা বোঝা যায় এই দুটি ব্যাপার থেকে:

(১) ইংরেজদের অধিকৃত বাংলায় প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কলিকাতা-মাদ্রাসা ইংরেজদের আনুকূল্যে মুসলমানদের লাভ হয়;

(২) ইংরেজ শাসনের সূচনায় হিন্দু প্রধানতঃ রাজস্ববিভাগে ও মুসলমান প্রধানতঃ বিচার-বিভাগে নিযুক্ত থেকে জীবিকা অর্জ্জন করতে থাকে। সে-দিনে বাংলার মুসলমান যে বাংলাদেশে উন্নততর সম্প্রদায় ছিল রামমোহন রায় তাঁর বিলাতে সাক্ষ্যদানে ও হান্টার সাহেব তাঁর Indian Mussalmans গ্রন্থে সে-কথা বলেছেন— “When the country passed under our Rule the Muslims were the superior race.”

মুসলমানদের অবস্থার পরিবর্ত্তন আরম্ভ হলো দশসালা বন্দোবস্ত থেকে, আর তাদের সম্ভ্রান্তদের আর্থিক দুর্গতি চরমে পৌঁছলো সনদ দেখাতে না পেরে যখন তাঁদের বহু নিষ্কর জমিজমা বাজেয়াপ্ত হয়ে গেল— ইংরেজিতে এর নাম Resumption Proceedings— আর যখন আদালতের ভাষা পার্শীর পরিবর্ত্তে ইংরেজি হলো। দশসালা বন্দোবস্তের ফলে মুসলমানদের আর্থিক অবস্থার কেমন পরিবর্ত্তন হলো সে-সম্বন্ধে হান্টার সাহেবের উক্তি এই:

Muslims landlords or collectors of revenue did not directly deal with the Muslim peasants, and they employed Hindu bailiffs to collect the revenue directly from the peasantry. So the Hindus infact formed a Subordinate Revenue Service, and took their share of the profits before passing the collection on to the Muslim Superiors. The latter however were responsible to the Emoeror and formed a very essential link in the Muslim Fiscal system. The series of changes introduced by Lord Cornwallis and Sir John Shore ending in the Permanent Settlement in 1793 put an end to this fiscal system of the Muslims.

The Permanent Settlement most seriously damaged the position of Mohamedan houses, for the whole tendency of the settlement was to acknowledge as the landlords the subordinate Hindu Officers who dealt directly with the husbandmen.

It elevated Hindu collectors, who upto that time had held but unimportant post position of the landlords, gave them a proprietory right in the soil  and allowed them to accumulate wealth which would have gone to the Muslims under their own Rule. (Indian Mussalmans)

এ-সব ব্যবস্থা যে মুসলমানদের শক্তিহীন করবার জন্যই করা হয়েছিল তা মনে হয় না, রাজস্ব যাতে বেশী পাওয়া যায় ও নিশ্চিতরূপে পাওয়া যায় এইই ছিল শাসকদের প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু এর ফলে মুসলমানদের জন্য শোচনীয় হলো। এই সময়ে ভারতে আসে ওহাবী আন্দোলন। বাংলার ওহাবী আন্দোলন যে মুখ্যতঃ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তা বোঝা যায় বাংলার ওহাবী-নেতা তিতুমিঙার বিদ্রোহ থেকেও:

Titu belonged to the Wahhabi sect of Muhammadan fanatics, and was excited to rebellion in 1831 by a beard-tax imposed by Hindu landholders. He collected a force of insurgents 3000 strong, and cut to pieces a detachment of Calcutta militia which was sent against him. The magistrate collected reinforments but they were driven of the field. Eventually the insurgents were defeated by a force of regulars and their stockade was taken by assault. (Imp. Gazt. Vol. XXIV-p.71.)

ওহাবীরা ইংরেজের হাতে যখন অনেকখানি নিস্তেজ হলো তখন ইংরেজ ও মুসলমান সম্পর্ক দাঁড়াল এই- ইংরেজ সহজেই সকল মুসলমানকে শত্রুপক্ষ ভাবলো এবং তাদের সঙ্গে ব্যবহারে সদয়তা তার পক্ষে সম্ভবপর হলো না; মুসলমানদের সবাই যে ওহাবীমতাবলম্বী হলো তা নয় কিন্তু ইংরেজদের প্রতি বিরূপতা তাদের ভিতরে ব্যাপক হলো। পার্শীর পরিবর্ত্তে ইংরেজিকে রাজভাষা করা হলে মুসলমানরা প্রতিবাদ করেছিল, কিন্তু প্রতিবাদে ফল না পেয়ে তারা ইংরেজি শিখতে এগোলো না। হান্টার সাহেব বলেছেন- ধর্ম্মের সঙ্গে সম্পর্ক-বিবর্জিত শিক্ষা মুসলমানেরা পছন্দ করতে পারলে না। –কিন্তু মুসলমানদের খুব বড় অন্যায় এই হলো যে নতুন ব্যবস্থা সম্বন্ধে না-ই তারা বল্লে, ভাল করে বাঁচতে হলে কোন কোন ব্যাপারে হাঁ-ও বলতে হবে সে-চেতনা তাদের ভেতরে দেখা দিল না। অচিরেই তাদের অবস্থা এমন হীন হয়ে পড়লো যে সিপাহী বিদ্রোহের পরে স্যার সৈয়দ আহমদ প্রধান কর্ত্তব্য জ্ঞান করলেন শাসকদের বিষদৃষ্টির পরিবর্ত্তে প্রসন্ন দৃষ্টি মুসলমানদের জন্য লাভ করা।

মুসলমানদের দুর্গতির সঙ্গে চললো হিন্দুদের উন্নতি-চেষ্টা ও তাদের প্রতি শাসককুলের আনুকূল্য। তাই ওহাবীরা যখন শান্ত হয়ে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্দ্ধে মুসলমানদের ধর্ম্ম ও সমাজের সংস্কারক রূপে এলেন তখন মুখে তাঁদের অনুবর্ত্তিতা তেমন ব্যাপকভাবে স্বীকৃত না হলেও ধীরে ধীরে এ-দেশের দুর্দ্দশাগ্রস্ত মুসলমানদের মনে এ-ধারণা দৃঢ়মূল হওয়া বিচিত্র নয় যে ধর্ম্মের আদিম ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়া ভিন্ন ইহকাল ও পরকালের জন্য তাদের আর কি করবার থাকতে পারে। হিন্দু-সমাজে সূচিত জাগরণ এ-প্রতিক্রিয়া রোধ করতে সমর্থ হলো না কেন দ্বিতীয় বক্তৃতায় তার উত্তর দিতে চেষ্টা করা হবে।

আমরা দেখলাম ওহাবী প্রভাবে এ-দেশের মুসলমানদের একটি বিশেষ চেতনা লাভ হলো। এ-আন্দোলনে তাদের কোনো উপকার যে না হয়েছে তা নয়— এর ফলে ভাববিলাসিতা থেকে কিছু উদ্ধার তারা পেয়েছে, কিছু সঙ্ঘবদ্ধও তারা হয়েছে। কিন্তু আদর্শ হিসেবে এর দুর্ব্বলতা এইখানে যে এ অতীতের ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়াই সবচাইতে বড় কাজ মনে করে— সেই ব্যবস্থাই এর কাছে চিরন্তন ধর্ম্ম। বলা বাহুল্য এ-মত সর্ব্বপ্রকার চিন্তার সম্প্রসারণের বিরোধী: সমস্ত রকমের নূতন পরীক্ষা সন্দেহের চোখে দেখা এর প্রকৃতি। এ-মত যে উন্নতিকামী জাতীয়তাবাদী আধুনিক মুসলিম জগতে বর্জ্জিত হচ্ছে তা বুঝতে পারা যাচ্ছে। কিন্তু ভারতের মুসলমান একে বর্জ্জন করতে পারছে না— তার নিজের দুর্ব্বলতা সম্বন্ধে চেতনা তার এ-মতের বর্জ্জনের পথে বাধা হচ্ছে।

এ দশা থেকে এ-দেশের মুসলমান কি মুক্তি পাবে? না, নানা দিক থেকে ধাক্কা খেয়ে খেয়ে এইখানেই তার দৃঢ়স্থিতি হবে। এর সদুত্তর নির্ভর করছে অনেকগুলো ব্যাপারের উপরে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বক্তৃতায় সে-সবের আলোচনার চেষ্টা হবে।


*বানান অপরিবর্তিত

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...