বাংলা কবিতার নিঃসঙ্গ রেডিও স্টেশন প্রবুদ্ধসুন্দর কর

যশোধরা রায়চৌধুরী

 



কবি, গদ্যকার, প্রাবন্ধিক

 

 

 

অমৃতের মাদকতা রক্তে মিশে আছে
টলমল করে ওঠে সমস্ত শরীর
পথে ও বিপথে ঘুরে খানাখন্দে পড়ি
যেন তীব্র ক্ষুধায় আকন্দপাতা খেয়ে
স্বেচ্ছা-অন্ধ হয়েছি দেবতাদের দেশে।

পরজন্ম বলে যদি সত্যি কিছু হয়
সমুদ্রমন্থন শেষে রাহুর কবন্ধ আমি
অমরত্ব নয়, চাই চাঁদের প্রণয়।

(পরজন্ম)

২৬ জুলাই ২০২২। অন্তর্হিত হলেন জাদুকর এক, কবিতার। প্রবুদ্ধসুন্দর কর। আমাদের বন্ধুপ্রবর। এক জ্যান্ত মানুষ। ১০০ শতাংশ কবি।

এই দীন দুনিয়াতে অনেক কবিকে দেখা হল। অনেক কবির এপিটাফ লেখাও হল। এত প্রিয় সব মানুষ চলে গেলেন। চলে গেছেন নাসের হোসেন, চলে গেছেন প্রবীর দাশগুপ্ত। তাপস লায়েক। সব যাওয়াই অসময়ে যাওয়া। প্রতি যাওয়া রেখে যায় এক অনিঃশেষ আফশোস, এক অনিবার ক্রোধ, কার বিরুদ্ধে জানি না।

১৯৬৯-এর জাতক প্রবুদ্ধ। আমার চেয়ে কয়েক বছরের ছোট। অনন্ত কথা বলত ফোনে। সর্বদা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ব্যস্ত।

প্রবুদ্ধর আশাবাদী মন, হায়দ্রাবাদের সার্জারি রুমে ঢোকার আগের মুহূর্ত অব্দি ভেবেছিল সব ঠিক হবে। আমরাও ভেবেছিলাম। অন্যদিকে বছরের পর বছর প্যাংক্রিয়াটাইটিসের মত জটিল অসুখে ভুগতে ভুগতেও প্রবুদ্ধর মনের জোর কমেনি, কমেনি তার অ্যাটিচ্যুড, তার কবির অহঙ্কার। আর তার ২৪ ঘন্টার কবিতাযাপন। সে ক্রমাগত নানা ভারতীয় ভাষার কবিদের থেকে অনুবাদ করে চলত, ইন্ডিয়ান লিটারেচারের পাতা থেকে। সে লিখে ফেলেছিল অনেকগুলি পর্বে তার আত্মজৈবনিক স্মৃতিচারণ, নীল উপত্যকার রাখাল। সে লিখেছে তার ফেসবুক পোস্ট। পড়ে কেউ রেগেছি। কেউ বিরক্ত হয়েছি। এত বেশি তির্যক, খোলামেলা, আকাট সত্যি সপাটে বলা, এবং শ্লেষ ও ব্যঙ্গের শাণিত ছুরিতে বিদ্ধ করা তার পোস্ট। অনেক সময়েই আমরা অস্বস্তিতে সরে গেছি। কেউ কেউ আনফ্রেন্ড করেছে। কিন্তু সর্বদা আমাদের সামনে জ্বলজ্বল করেছে এক শক্তিশালী মননশীল কবির কলম।

তার প্রতি কবিতায় মিশে আছে এই সময়ের বিষ ও বিষাদ। সে লিখেছে অনিবার তার সময়কে। রণজিৎ দাশ আমার ও তার প্রিয় কবি। তা নিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা আড্ডা দিয়েছি। যুক্তিবাদী অতি সচেতন কাব্যভাষায় সে রণজিৎ দাশের যোগ্য উত্তরসূরি। উত্তর-পূর্বের কবিদের আত্মা সে বহন করত। উত্তর-পূর্বের বাংলা কবিতার নির্দিষ্ট একটি রাজনীতি আছে। তাও সে বহন করত। বারবার সে আমাকে আলাপ করিয়েছে, লিখিয়েছে উত্তরপূর্ব নিয়ে। অসংখ্য কবিদের সঙ্গে আলাপ করাত। পল্লব ভট্টাচার্য বা মিলন কান্তি দত্ত, সমরজিৎ সিংহ বা অশোক দেবের সঙ্গে আমার আলাপ প্রবুদ্ধর সূত্রে। ২০০৯ সালে গুয়াহাটিতে তিন বছরের জন্য যখন যাই, প্রবুদ্ধ এসেছে বারংবার আমার কাছে। সে এতটাই সামাজিক, এতটাই মানুষকে কাছে টানতে সক্ষম এক টগবগে চরিত্র যে উত্তরপুবের লেখক কবির বৃত্তে সে আমাকে সপাটে অন্তর্ভুক্ত করিয়েছে।

প্রবুদ্ধর একেবারে অসময়ে এই প্রস্থান তাকে আমাদের চোখে আরও বড় বিস্ময়বালক করে দিল। সে তার প্রতি বই আমাকে পড়াত। তার অবিস্মরণীয় সব কবিতা এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে ফেসবুকের পাতায় পাতায়। তারই অল্প কিছু দিয়ে আমি এ লেখাও সাজিয়ে দিলাম।

দু-চোখ মোমের শিখা, তাই
কালি পড়ে রাত-জাগা দু-চোখের কোলে।
আমাকে এ আলো ভেদ করে না বলেই
এই ছায়া, অনচ্ছ অবগ্রহের মৃত্যুপূর্ব অসুস্থকালিমা।

(ছায়া)

ইন্দ্রজাল কমিক্স তার প্রথমদিকের কাব্যগ্রন্থের নাম। ৯০ দশকের অনেক কবির শৈশব কৈশোরময় অবসেশনের ইন্দ্রজাল কমিক্স-এর নাম ব্যবহারেই একটা অত্যাশ্চর্য কাণ্ড ঘটিয়েছিল এই সময় সচেতন কবি। এর পরের কিছু প্রিয় বই নৈশশিস, আত্মবিষ। অসুস্থ শহর থেকে। অ্যাসিড বাল্ব। একটা মৃত্যুচ্ছায়া বিস্তারিত থাকত তার কবিতায়। থাকত বোদলেয়ার কথিত নরকের কথা অথবা পাপ পঙ্কের কথাও। থাকত অসংখ্য নানা রেফারেন্সে জীবনের কথা, কিন্তু শ্লেষে চোবানো।

শীর্ণ কবিতার বইয়ের মতো
ব্যর্থতারচিত এই আয়ুষ্কাল
ব্লার্ব, শয়তান কিংবা ঈশ্বরলিখিত।

(ব্লার্ব)

তার কিছু কবিতা মুখে মুখে ঘোরার মত। এত বেশি বুদ্ধিমান লেখা এগুলি যে হিরের টুকরোর মত ঝলমল করে। সারা অক্ষরসমূহ থেকে ঝরে পড়ে মেধা।

জঙ্গলের ভেতর কোথাও এক পরিত্যক্ত রেডিও স্টেশন
কোনো একদিন খুঁজে পেলে জেনো, স্তব্ধতাই এর সিগনেচার টিউন
নৈঃশব্দ্য ব্যতীত হাহাকার, বিলাপ, অশ্রুপাতের ধারাবিবরণী
২৩৬.৪ মিটারব্যান্ড তথা ১২৬৯ কিলোহার্টজে প্রচারিত হয়নি কখনো
অধিবেশনের শুরুতে বা শেষে ঘোষিত হয়নি স্টেশনের নাম।
জঙ্গলের ভেতর কোথাও স্তব্ধতার সিগনেচার টিউন শুনতে পেলে
জেনো, আত্মকণ্ডূয়নমুগ্ধ এই স্টেশনের ধ্বংসাবশেষই আকাশবাণী প্রবুদ্ধসুন্দর।

(রেডিও স্টেশন)

এই কবিতায় অমোঘভাবে উঠে এসেছে জীবন সংক্রান্ত কিছু প্রশ্ন। লেখক ও কবির নিজস্ব পহেচান বারবার আত্মপ্রশ্নে কবিকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। প্রাতিষ্ঠানিকতা আর কবির সাফল্য কী, সেইসব প্রশ্ন এসে বসেছে তার করতলে।

মৃত্যুশয্যায় সম্রাট আলেকজান্ডার সেনাপতিদের ডেকে যেমন অন্তিম ইচ্ছে তিনটি জানিয়েছিলেন, তেমনি সেই একই তিনটি ইচ্ছে আজ আমিও জানিয়ে রাখি। প্রথমত, আমার মৃত্যুর পর আমার চিকিৎসকেরা যেন শবদেহ কাঁধে তুলে শ্মশানের পথে বয়ে নিয়ে যায়। কেননা আমার চিকিৎসক বাল্যবন্ধু দীপঙ্কর কখনওই আমাকে মৃত্যু থেকে বাঁচা‌তে পারবে না। সে শুধু জন্ম বলে যাকে ভ্রম হয়, সেই মৃত্যুযাপন কাটিয়ে যাওয়ার জন্যে বড়জোর আমাকে মাঝেমাঝেই সুস্থতা ফিরিয়ে দেবে। দ্বিতীয়ত, আমার মৃত্যুর পর অন্ত্যেষ্টিযাত্রায় যেন আমার অর্জিত সমস্ত শূন্যতা পাঠকদের জন্যে পথে পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। কেননা জীবনে অনেক সময় অপচয় করে আমি শুধু শূন্যতার পেছনেই ছুটে গেছি যা আমার সঙ্গে কখনো যাবে না। তৃতীয়ত, শেষযাত্রায় আমার হাত দুটি যেন বাইরে ছড়ানো থাকে। আমি চাই, আমার মেধাবী পাঠকেরা দেখুক আমি খালি হাতেই জন্মেছিলাম। খালি হাতেই আবার ফিরে যাচ্ছি। আমার উন্মুক্ত হাতের রেখায় ভাগ্যরেখা বলে এমন কিছুই ছিল না যা হাত থেকে সোজা প্রতিষ্ঠান বা অমরত্বের দিকে যায়।

(আমার অন্তিম ইচ্ছা)

প্রবুদ্ধ তোমার স্পিরিট রয়ে গেল আমাদের কাছে। তোমার অনবদমনীয় আত্মা অক্ষরগুলি থেকে ঝরে পড়বে অনন্তকাল। স্যালিউট, বন্ধু।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. পরিবেশ ও পুঁজিতন্ত্র — ষষ্ঠ বর্ষ, তৃতীয় যাত্রা – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...