স্যমন্তকদা…

গৌরব চট্টোপাধ্যায়

 



লেখক যাদবপুর বিশ্বাবিদ্যালয়ের তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের ছাত্র। বর্তমানে কলিঙ্গ ইন্সটিউট অব ইন্ডাস্ট্রিয়াল টেকনোলজির স্কুল অব ল্যাঙ্গুয়েজে ইংরেজির সহকারী অধ্যাপক

 

 

 

স্যমন্তকদা,

তোমার ছবি দেওয়া একটা পোস্টার দেখলুম কিছুদিন আগে। ডিপার্টমেন্টেরই পোস্টার। তুমি দেখলে? এত জ্যান্ত চোখদুটো তোমার। পাশে লেখা ‘শ্রদ্ধা ও স্মরণ’। যেন এই দুটো শব্দের ওপর তুমি একটা কিছু বলবে। কোনও ক্রিটিকাল ডিসকোর্স। কিছু বলার ছিল তোমার? বলবে না? এত জ্যান্ত ছবিটা তোমার। অথচ আমি জানি, ‘শ্রদ্ধা ও স্মরণ’ আমার শোনা হবে না।

আমারই কিছু কথা বলার ছিল তোমায়। না বললেও হত। তবু। আমরা বিএ সেকেন্ড ইয়ারে পড়াকালীন, তুমি ডিপার্টমেন্টে এলে। আমরা একটু ক্ষুণ্ণ হয়েছিলুম। আবার আরেকজন ইংরেজি! কেন, বিভাগের ছাত্রছাত্রী কেউ ছিল না? কিছু মনে কোরো না। আমরা তো তখন তোমায় জানতুম না। তুমি চিবুক উঁচিয়ে চলা। তোমার চলার মধ্যে পরোয়াহীন সাহস। কথা বলতে ভয়ই করে। মনে হয়, কী জানি, যদি অবজ্ঞা করে। আমার ভাল্লাগত না। কিন্তু শুধু আমারই ভাল্লাগেনি। এক বন্ধু বলেছিল, স্যমন্তকদা দারুণ। রোম্যান্টিসিজম পড়িয়ে দিয়েছে আমায়। ওয়ার্ডসওয়ার্থকে কীরকম গালমন্দ করেছে। এক বন্ধুনি তোমার মতো দেখতে পাঞ্জাবি কিনে এনেছিল। সাইজে বড় হয়েছিল অনেক। তাও। তোমাকে ফলো করে গিয়েছিল রানিকুঠি অবধি। তুমি কোথায় থাকো, দেখতে। কিন্তু আমার তোমার ক্লাস করা হয় না। তুমি লিটারেচার অ্যান্ড আদার আর্টস পড়াও। পড়াও লিটারেচার অ্যান্ড ফুড। আর সেইখান থেকে নাকি চলে যাও সাহিত্য আর খাদ্যহীনতার গল্পে। দুর্ভিক্ষের সাহিত্য। আমি সেই পেপার নিই না। তাও লোভ হয়। তুমি সাহিত্যিক প্রতিগ্রহণ পড়াও ইংরেজি ট্রান্সলেশনে। কিন্তু আমি তো বাংলা জানি। খামোকা ট্রান্সলেশন পড়ব কেন! আমি গল্প শুনি। তুমি বৈষ্ণব পদাবলি আর গীতগোবিন্দ পড়াতে গিয়ে রাধার জবানিতে কৃষ্ণকে চিঠি লিখতে দিয়েছ। অ্যাসাইনমেন্ট। আমার আবারও লোভ হয়। কিন্তু আমি তো তোমার পেপার নিইনি।

এমএ-তে তোমার ক্লাস পেলুম ফাইনালি। তুমি পড়াবে ড্রামাটিক মোড। নাট্যশাস্ত্র আর অভিজ্ঞানশকুন্তলম। এক ইটালিয়ান মেয়ে নাট্যশাস্ত্রের ক্লাস করত তোমার। ইংরেজি জানে না বেচারি। ডিকশনারি নিয়ে ক্লাসে বসত। কিন্তু কামাই করতে দেখিনি। তুমি লিখতে দিলে, নাট্যশাস্ত্র প্রেসক্রিপটিভ না ডেসক্রিপটিভ। নির্দেশধর্মী না বর্ণনাধর্মী। সেই ইতালীয় মেয়ে বলল, ভরত তো ভগবান। ভগবান যা বলেন, সবই নির্দেশ। তুমি হেসেছিলে। সেইদিন নাট্যশাস্ত্রের ক্লাসে আমরা শিখেছিলুম সংস্কৃতি কীভাবে পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করে দেয়। শকুন্তলা পড়াতে গিয়ে একবার জিজ্ঞেস করেছিলে, কী হত বল তো যদি ভরতের জায়গায় শকুন্তলার এক কন্যাসন্তান জন্মাত। আমাদের নাটকের পাঠ পালটে গিয়েছিল, স্যমন্তকদা। আমরা নড়ে বসেছিলুম।

একদিন কেউ একটা এসে খবর দিল, স্যমন্তকদা ডাকছে। আমাকে? ডাকছে? আমি নগণ্য মানুষ। আমার কেন ডাক পড়েছে, জানি না। গেলুম। দেখলুম তুমি আর অভীকদা বসে আড্ডা মারছ। আমায় ডেকে বললে, এই তো। বোসো। ইংরেজকে বাংলা শেখাতে পারবে? আমি দোনামোনা করছি। অভীকদা বলল, খুব পারবে। কী পড়াব, কীভাবে পড়াব সেসব তর্কে তুমি গেলেই না। বললে, তোমার ফোন নাম্বার দিচ্ছি। ও তোমায় ফোন করবে। আর শোনো, তোমাদের মতো ভালমানুষদের নিয়ে একটাই ভয়। তোমরা কম টাকা চেয়ে বসবে। পাউন্ডে রোজগার করে কিন্তু। খেয়াল রেখো। পার আওয়ার চার্জ করবে। না, স্যমন্তকদা, অযথা বিনয়ের পাঠ আমি তোমার থেকে শিখিনি। কাজের মূল্য আদায় করে নিতে শিখেছি।

কিন্তু কাজের কথার বাইরেও তো পৃথিবী হয়। তুমি আর অভীকদা আড্ডা মারো। আমিও। আমাকেও তোমরা ডেকে নাও। না, আমি কারও চোখে অবজ্ঞা দেখি না। আমার অপরাধবোধ হয়। তুমি স্টেশনের নাম নিয়ে গল্প করো। নো-আদার ঢালের গল্প তোমার থেকেই শোনা। বেলমুড়ি স্টেশনের নাম নিতে নেই, এই কথা তুমি জানো দেখে আমি তাজ্জব। তুমি বলো, তোমাকে যে গ্রামটায় যেতে হয়, তার নাম কলানবগ্রাম। হুইচ মেকস নো সেন্স। কলানবগ্রাম বলে বাংলায় কোনও শব্দ হয় না। আমি অবাক হয়ে ভাবি, এ কথা তুমি জানো? তুমি যে ট্রান্সলেশনে বাংলা পড়াও। তুমি বলো কুরোসাওয়া কী করে থ্রোন অব ব্লাডে ম্যাকবেথের চরিত্রাভিনেতাকে বেছেছিলেন। বলো, ভ্যান গঘের ছবিগুলো বেশিরভাগই আসলে তিনফুট বাই আড়াইফুটের ছোট ক্যানভাসের ওপর আঁকা। সামনে থেকে দেখলে দেখবে অন্যরকম লাগছে। সেইখান থেকে হঠাৎ করে কী করে চলে আসে, ওয়াল্টার বেঞ্জামিন আর অরা। বলো, বুঝলে গৌরব, আমরা কালেক্টর নই। আমরা হলাম হোর্ডার। আমিও আসলে হোর্ড করছি স্যমন্তকদা, চিঠি জুড়ে এলোপাথাড়ি কথা জমাতে জমাতে চলেছি। তোমার ওই জ্যান্ত চোখ। মুখের ওই চোরা তাচ্ছিল্যের হাসি। আমার সাজিয়ে লেখার ক্ষমতা নেই স্যমন্তকদা।

ইউজিসি নতুন নিয়ম করেছে। সিবিসিএস। চয়েস বেসড ক্রেডিট সিস্টেম। আমি তখন ব্রেইনওয়্যার ইউনিভার্সিটির ইংরেজি ডিপার্টমেন্টের হেড। সেখানকার লোকজনকে কিছুতে বোঝাতে পারছি না কাকে বলে সিবিসিএস। কে এসে বললে বুঝবে বলো দেখি। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করি। ভয়ে ভয়ে। দক্ষিণ কলকাতার এলিট মানুষ। বারাসাতের গণ্ডগ্রামে আসবে? তুমি দেখি এককথাতেই রাজি হয়ে যাও। শুধু তাই নয়, আমাকে মেইল করে দাও সমস্ত জরুরি ডকুমেন্ট। মনে করে। কোনও রিমাইন্ডার ছাড়াই। বলে দাও, গাড়ি পাঠাতে হবে। তুমি এলে। অনেকদিন বাদে তোমায় দেখলুম। দেখে আঁতকে উঠেছি। এ কী চেহারা হয়েছে তোমার। তোমার মুখে সেই ঈষৎ মশকরা ঈষৎ তাচ্ছিল্যের হাসি। ব্লাডসুগার ধরা পড়েছে। নিয়ম করে খেতে হয়। তবু খাবার তুলে দিলে। যিনি খাবার পরিবেশন করছিলেন, তিনি হাঁ হাঁ করে উঠেছেন। তোমার মুখে হাসি। ওই হাসিটা ভুলি কী করে স্যমন্তকদা? এমএ ইংলিশের পপুলার লিটারেচারের সিলেবাস তৈরি করেছি। দু-দুখানা পেপার। অনেক ভেবেচিন্তে হিসেবনিকেশ করে। মনে মনে দুশ্চিন্তা। ঠিক হয়নি। কে দেখে দেবে? বোর্ড অব স্টাডিজের মিটিং-এ তোমায় দেখাই। জানি, এ নিয়ে তোমার কথার পরে আমার আর কিছু বলার থাকবে না। তুমি সিলেবাস দেখে দ্যাখো বটতলার পর্নোগ্রাফিও রয়েছে সেখানে। তোমার ঠোঁটের কোণে হাসি। ইয়েস আই অ্যাম হ্যাপি। ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ে আমার। বিভাগে কোনও সাহেব অতিথি এলে, তুমি ইচ্ছে করে পকেট থেকে বিড়ি ধরিয়েছ। বলেছ, দিস ইজ ইন্ডিজিনাস। আর বিড়িতে টান দিয়ে হাসি।

ব্রেইনওয়্যারের চাকরি ছেড়ে দিয়ে তোমায় জানাইনি। একদিন বোর্ড অব স্টাডিজ-এর হোয়াটস্যাপ গ্রুপ থেকে বলেকয়ে বিদায় নিচ্ছি, সঙ্গে সঙ্গে তোমার মেসেজ। ব্রেইনওয়্যার ছেড়ে কোথায় আছ এখন? সেই তোমার সঙ্গে আমার শেষ কথা স্যমন্তকদা। তোমার হোয়াটস্যাপে তোমার কোনও ছবি নেই। তোমার ওই জ্যান্ত চোখ। নেই। শেষবার কথা বলার সময় তোমার চোখের দিকে তাকানো হয় না আমার। তোমার উন্নত চিবুকের দিকে দেখা হয় না। দিন কেটে যায়। আমি আবারও চাকরি ছাড়ি। তোমায় জানাই না। কেমন আছ তুমি। জানতে চাই না। কথা হয় না। দিনের পর দিন। দরকারে তোমায় মেইল করেছি কত। অদরকারে চিঠি লেখার সময় আমার হয় না। শুধু একদিন একলাইনের একটা মেসেজ আসে। পৃথিবী টলে ওঠে। আমি তো হোর্ডার, স্যমন্তকদা। আমি তো সংগ্রহ করিনি কিছুই, যা পেয়েছি, মজুত করে গেছি কেবল। মজুত করে রাখা ঘর আমার টলমল করে। ছবির পরে ছবি ভেঙে যায়। মধুবনী চ্যাটার্জির রক্তকরবী দেখে ফিরছি, তোমার সঙ্গে দেখা। গড়িয়াহাটের খাদিমসে জুতো কিনতে গেছি, তুমি সেখানে সপরিবারে। রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশনে, আমি একদিকের মেট্রো ধরব, তুমি অন্যদিকের। এত কথা কী বলেছি আমি তোমার সঙ্গে? আমার মনে পড়ে না। শুধু মজুত করা ছবি। ভেঙে ভেঙে যায়। তোমার কথা বলতে বন্ধুরা ফোন করে। আমার কী বলার আছে বলো তো? শুধু তোমার ওই জ্যান্ত চোখ। ও চোখের দিকে তাকানো হল না আমার। ও চোখ আগুনে পুড়ে গেছে।

ইতি, গৌরব।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...