স্যমন্তক দাস— অধ্যাপক, আপনজন, বন্ধু, সহযোদ্ধা

আব্দুল কাফি

 



অধ্যাপক, প্রাবন্ধিক

 

 

 

 

আমাদের যাবতীয় স্মৃতিচারণ, জীবন থেকে নিষ্ক্রান্ত মানুষের জন্য শোকপালন আসলে আমাদেরই কাছে জমা থাকে। তা তো আর সেই উদ্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে পৌঁছয় না কখনও, তাঁর ক্ষতচিহ্নময় হৃদয়বৃত্তান্তে সেসব কথার কোনও স্পর্শ লাগে না কোনওদিন।

আমরা নিজেদেরই বলছি, বলে চলেছি, ভুলতে নেই। কিন্তু তবুও সবাই প্রায় জানি, বিস্মৃতিই ভবিতব্য। অন্তত ব্যক্তিমানুষের ক্ষেত্রে তো বটেই। তেমন তেমন লোক হলে ইতিহাস বইয়ের পাতায় বেশ একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের মাঝে জ্বলজ্বল করবে নাম— সে অবশ্য আলাদা কথা। কিন্তু তা বাদ দিলে, এই যে আমাদের এত প্রিয় মানুষেরা প্রতিদিন চলে যাচ্ছেন এবং যাবেনও, তাঁদের সবাইকে কি মনে রাখি? রেখে দিই চিরকাল? অনেক ক্ষেত্রে হয়তো তথ্য আকারে থাকেন, একটি ইভেন্ট হিসেবে থাকেন, এক একটি ঘটনার মাঝখানে হঠাৎ উচ্চকিত একটি দৃশ্যের মধ্যে বিরাজিত থাকেন— কিন্তু তার বেশি কিছু ঘটে কি? চিরকাল মনে রাখব, কোনওদিন ভুলব না— এই কথাগুলো কাকে শোনাই? যাঁর সম্পর্কে বলছি তিনি তো নেই শোনার জন্য, তাহলে কি সম্মুখস্থ বাকিদের বলছি? নিজেকে শোনাচ্ছি? না-ভোলা যে গুরুতর দায় ও দায়িত্ব সেইটে মনে করাচ্ছি? ভুলে যাওয়ার মতো নিষ্ঠুরতা কিছুতেই আমি করব না— এইটে মনে করে সাময়িকভাবে নিজেকে রেহাই দিচ্ছি? নিজেকে নিজের কাছে সহনীয় করে রাখছি খানিক? জানি তো, আবছা হয়ে আসবে, ভারাক্রান্ত হয়ে থাকব না আগামীকাল কিংবা পরশু, অন্য দায়িত্বে বৃত হব, হেসে উঠব, রেগে উঠব, মিছিলে গিয়ে চিৎকার করব মানবাধিকারের দাবিতে— সিনেমা নিয়ে কিংবা উন্নয়নের বীভৎসতা নিয়ে প্রকাশ্য তর্কও করব— মাঝে মাঝে স্মৃতি থেকে তীক্ষ্ণ শিসের মতো উঠে আসবেন স্যমন্তকদা। একেই কি মনে রাখা বলে? এইটুকুই “ভুলব না” শব্দের দৌড়?

বেশ কয়েকবার স্যমন্তকদা বলেছিলেন বিখ্যাত মার্কসবাদী চিন্তাবিদ ও সমালোচক রেমন্ড উইলিয়াম্‌স্‌-এর কথা। তত্ত্বকথার জগতে পণ্ডিত হিসেবে স্বীকৃত উইলিয়াম্‌স্‌ মার্কসবাদের পণ্ডিতি বিচার-বিশ্লেষণের পাশাপাশি আর একটা কাজ করতেন প্রায়ই। সপ্তাহান্তের ছুটিতে নিজের গাড়ির ডিকিতে তুলে নিতেন বিভিন্ন ইংরিজি উপন্যাস— খুব খটোমটো কিংবা জটিল বুনোটের নয়, সরল মানবিক অনুভূতির গল্প, ডিকেন্স কিংবা থ্যাকারের মতো, আর তারপর সে সব বই নিয়ে চলে যেতেন শহর ছাড়িয়ে দূরে, পল্লীর দিকে। সেসব বই পড়তে দিতেন, পড়তে উৎসাহিত করতেন সাধারণ মানুষকে। নিজের মার্কসীয় প্রজ্ঞায় হয়তো তিনি এই সব বইয়ের নানা সীমবদ্ধতা, নানা ত্রুটি, বিভিন্ন রাজনৈতিক গোলমাল চিহ্নিত করতে সক্ষম ছিলেন, কিন্তু তবুও এই সব বইয়ের উপকারিতা বিষয়েও তিনি ছিলেন আস্থাশীল। এইসব আখ্যানের অন্তর্লীন শক্তির উপর ভরসা ছিল তাঁর, মনে করতেন হয়তো, সরল এই সব গল্প বহু মানুষের মন তৈরিতে, রুচি তৈরিতে, তাদের ‘রাজনৈতিক’ স্বচ্ছ দৃষ্টি তৈরিতে সাহায্য করবে। রেমন্ড উইলিয়ামসের মতো নয় হুবহু, কিন্তু স্যমন্তকদাও বোধ হয় কাছাকাছি কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি করেছিলেন কলকাতার লেকের ধারের বুক ক্লাব। সেখানে তাঁর ডাকে শহরের কৃতবিদ্য আরও অনেকেই জড়ো হয়েছিলেন, আর জুটেছিল প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ ছাত্রদের কেউ কেউ। বিভিন্ন বই পড়া হত সেখানে, নানা ভাষার, নানা ধাঁচের। বইপড়াকে সুতো হিসেবে ব্যবহার করে আসলে গড়ে উঠত মন, মতের ও অনুভূতির আদানপ্রদানে গড়ে উঠত রুচি— দৃষ্টি ছড়িয়ে পড়ত চতুর্দিকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর মাঝেও স্যমন্তকদাও এইসব করে গেছেন তাঁর সরাসরি-ছাত্রদের নিয়ে।

অনেক ছোট বয়স থেকেই তিনি যাকে বলে কর্মী— ‘অ্যাকটিভিস্ট’ হিসেবে দেখেছেন নিজেকে। পারিবারিক সূত্রে বর্ধমানের কলানবগ্রামে চলে গিয়েছেন বারবার, ফেরি নামক একটি সংস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, বড় কোম্পানির রাসায়নিক সারের বদলে জৈব ধারায় শস্য ফলনের প্রক্রিয়াকে আরও সাশ্রয়ী ও বাজারের বিপুল প্রতিযোগিতার সামনে কী করে আরও সক্ষম করে তোলা যায় তার জন্য একটি ছোট কিন্তু বলিষ্ঠ লড়াইয়ে যুক্ত থেকেছেন, নানা অ-সরকারি সংস্থার কাজের সঙ্গে জড়িয়ে থেকেছেন দীর্ঘকাল, কখনও আবার তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগের গবেষণা প্রকল্পের সঙ্গে জুড়ে দিয়েছেন এই বাংলার ফুরিয়ে যাওয়া ধানের বীজের কাহিনি— হারিয়ে যাওয়া ধানের নানা প্রজাতির সঙ্গে সঙ্গে কী করে হারিয়ে গেছে অজস্র গল্প এবং সংস্কৃতির নানা চিহ্ন— তা নিয়ে সাহিত্যচর্চায় নিবিষ্ট ছাত্রের মনোযোগ চাই— এও তাঁর অনেকগুলি কাজের মধ্যে অন্যতম একটি। সুন্দরবনের ভূপ্রকৃতি-পরিবেশ এবং সংলগ্ন মানুষের জীবন, সংস্কার, বিশ্বাস ও লড়াই নিয়ে একাধিক ডিসিপ্লিনের গবেষকমণ্ডলীর সঙ্গে তিনিও ছিলেন খুব যাকে বলে কেন্দ্রীয় ভূমিকায়। লম্বা একটা সময় জুড়ে চষে বেড়িয়েছেন সুন্দরবনের প্রায় সবকটি ব্লক।

তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার কাজ ছিল ডারউইন, ডারউইন-বাদ এবং উনিশ শতকের ইংরিজি নভেল নিয়ে। সেটি অবশ্য বই আকারে ছেপে বেরোয়নি, এ তাবৎ সে বিষয়ে খুব যাকে বলে আকুলিবিকুলি আগ্রহও তাঁর ছিল না। সম্প্রতি শোধগঙ্গার ওয়েবসাইটে সেই চমকপ্রদ গবেষণাপত্র আপলোড করা হয়েছে। সংক্ষিপ্ত মনোগ্রাফ আছে তাঁর, দেশি বিদেশি অনেকগুলি সম্পাদিত বইতে প্রবন্ধ সঙ্কলিত হয়েছে, অনুবাদ করেছেন অনেক। কিন্তু এর বাইরেও অজস্র ‘লিখেছেন’ স্যমন্তক। হাল আমলের উচ্চশিক্ষা চত্বরে যে ধরনের লেখা প্রকাশ করা প্রায় একটি আবশ্যিক ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে সেই রকম ফুটনোটের কাঁটাওয়ালা লেখাও যেমন লিখেছেন, তেমনি যে-সব লেখায় তেমন ‘নম্বর’ নেই, প্রমোশনের মায়াময় প্রচ্ছায়া নেই, যেসব লেখায় তেমন গেরামভারি পণ্ডিতি ছিটকে ছিটকে বেরোয় না, কিন্তু অনেক মানুষের কাছে দরজা খোলার কাজ করে দিতে পারে— তেমন লেখা তাঁর প্রচুর। সম্ভবত এটি তাঁর একটি রাজনৈতিক অবস্থানকেই চিনিয়ে দেয়। আকাদেমির ভিতরের এক সদস্যের কাজ আসলে কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে স্যমন্তকের ভাবনা এইভাবে ছড়িয়ে থেকেছে অজস্র ফিল্ড রিপোর্ট, বই-এর রিভিউ, সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নিয়ে নির্মোহ ও যুক্তিসিদ্ধ ‘কলাম’ কিংবা সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন প্রসঙ্গকে দরকার ও সুযোগমতো পুনর্বিচার করা উত্তর-সম্পাদকীয় প্রতিবেদনে। টেলিগ্রাফ সহ বিভিন্ন সংবাদপত্রে তিনি নিয়মিত এবং অনিয়মিতভাবে যেসব কলাম লিখেছিলেন গত প্রায় কুড়ি বছর ধরে, সেসব লেখা একত্র করে গুছিয়ে দাঁড় করালে বোধ হয় তাঁর এই মনোভাবটি, তাঁর চিন্তা ও আগ্রহের ব্যাপক পরিধিটি স্পষ্ট হবে। তিনি চলে যাওয়ার মাত্র মাসখানেক আগেই, ২৪ জুন ২০২২ তারিখের ‘দি টেলিগ্রাফ’ কাগজে একটি উৎকৃষ্ট নিবন্ধ ছাপা হয়েছিল। সেটির শিরোনাম ছিল “হাইব্রিড সেল্‌ভ্‌স্‌”। কতরকম আমি থাকে আমাদের মধ্যে তা মাঝে মাঝে ঠাহর করা দরকার আসলে তাই ইঙ্গিত করছিলেন তিনি, তর্জমার মারফত বহু ভাষার সাহিত্য পড়ার সুবাদে আমাদের চৈতন্য কীভাবে এক জটিল সাঙ্কর্য লাভ করে চলেছে, একই সঙ্গে মূল এবং তর্জমা পড়ার সুযোগ থাকলে কী ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয় আমাদের চিন্তায়, কীভাবে বহুভাষাস্পর্শ আমাদের “শুদ্ধ” “মৌলিক” থাকতে দেয় না— বিচিত্র করে তোলে ক্রমশ— এসব গভীর চিন্তা তিনি প্রায় কথা বলার ঢঙে লিখেছিলেন সেই নিবন্ধে। যেন ভাবছেন, কিংবা খুব মৃদু স্বরে, নিচু গলায় কথা বলছেন কাছে বসা কোনও শ্রোতার সঙ্গে— এমন তরিকায় এগোচ্ছিল সে লেখা, আচম্‌কা পাঠক সেই কথাস্রোতের মধ্যে আবিষ্কার করে খানিক হতচকিত হয়ে পড়বেন এইরকম বাক্যের সমুখে পৌঁছে— “to be Indian is to be both translator and translated by others.”

সাম্প্রতিক সময়ে একজন ভারতীয় চিন্তাশীল মানুষের এইটে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয়। অনুবাদ করে চলা এবং একই সঙ্গে অপরের দ্বারা অনূদিত হয়ে চলা একজন আধুনিক ভারতীয়ের অভিজ্ঞান— এ কথা কেবল অনুবাদতত্ত্বের কিংবা আর একটু বড় অর্থে সাহিত্যের এলাকায় বিচার্য থাকে না, এই বাক্য একটি স্পষ্ট এবং গভীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তও ঘোষণা করে। এমন নানা বার্তা স্যমন্তকের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটালেই যে কেউ পেতে পারতেন— পণ্ডিতের ভানটুকুও তার জন্য বয়ে নিয়ে যেতে হত না তাঁর সামনে।

একই সঙ্গে ভরত নাট্যশাস্ত্র কিংবা আধুনিক ইউরোপীয় সাহিত্যের কোনও টেক্সট পড়ানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নানা জটিল দায়িত্ব পালন, ছাত্রদের নানাবিধ ছোটবড় সঙ্কটে গায়েগতরে খেটে সম্ভাব্য সমাধান ঢুঁড়ে বের করা— এই সব নিয়ে প্রসন্ন ব্যস্ততায় দিন কেটেছে স্যমন্তকের। আরও কত ধরনের সামাজিক কাজ ও আন্দোলনের সঙ্গে যে জড়িয়েমড়িয়ে ছিল আমাদের স্যমন্তকদা সেইটে এখ্‌খুনি লিখে ফেলা অসম্ভব।

কিন্তু এরপরেও— নিশ্চয় হঠাৎ নয়, নিশ্চয় বেশ কিছুদিন ধরেই ক্লান্তি জমছিল ঝুলকালির মতো। এক টুক্‌রো বুদ্বুদের মতো এক খণ্ড শূন্যস্থান ধীরে ধীরে বাড়ছিল— ক্রমে সেই শূন্য বুদ্বুদ গোটা চেতনাকে খেয়ে ফেলল একদিন। ক্ষুদ্র বুদ্বুদের ফাঁকা অন্তর স্যমন্তকদার সমস্তটাই অধিকার করে নিল।

আমাদের তুচ্ছতার মাপ অনুযায়ী, আমাদের নিজস্ব নানা গোলমাল অনুযায়ী আমরা হয়তো স্যমন্তকের সিদ্ধান্তের মানে ও কারণ কল্পনা করতে থাকবে কিছুকাল। যেন যথার্থ একটা কারণ খুঁজে পেলে আমাদেরই অশান্তি ও অস্বস্তি খানিক কমবে। আমাদের যুক্তির স্বল্প ভাঁড়ারের রসদ অনুযায়ী যদি পড়ে ফেলতে না পারি এই ঘটনা তাহলে তো নিজের অক্ষমতায় নিজেই বিপদগ্রস্ত হয়ে পড়ব, তাই প্রাণপণে আমরা বানিয়ে তুলতে চাইব কারণ—।

তারপর সে চেষ্টাও একদিন ক্লান্তিকর হয়ে পড়বে। আমরা হয় হাল ছেড়ে দেব, নয়তো আপাতত কোনও পর্যাপ্ত কারণের আভাস আঁকড়ে ধরে নিজেদের ভোলাতে সক্ষম হব। তারও পরে, সব যখন আরও ম্লান হয়ে যাবে, কোনও এক বিপজ্জনক মুহূর্তে আমরা কী বিস্ময়ে লক্ষ করব, স্যমন্তকদাকে আর ভাল করে মনে করতে পারছি না। তাঁর অনুপস্থিতি অভ্যাস হয়ে গেছে আমাদের, সয়ে গেছে। সেই হৃদয়াবিদারক সয়ে-যাওয়ার দিনটির কথা অনুমান করে, আমি বিষণ্ণ হয়ে আছি আজ। তুমিও একদিন বিবর্ণ হয়ে যাবে স্যমন্তকদা? আমার কাছেও? তোমার চলে যাওয়া দুঃখের খুবই, কিন্তু এইটেও কম বেদনার নয়। তোমার না-থাকাটি তলিয়ে যাবে আমাদের কখনও-উচ্চকিত-কখনও-ম্লান নানাবিধ থাকার মধ্যে। এবং তোমার সঙ্গে আমার আর কোনওদিন দেখা হবে না!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...