সফলতা নিস্ফলতা: তরুণ মজুমদার

সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়

 



চলচ্চিত্রবেত্তা, শিক্ষক, গদ্যকার, সাংস্কৃতিক ভাষ্যকার

 

 

 

তরুণ মজুমদারের প্রয়াণ আমাদের মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবিতাকে একটি বড় পরিহাস চিহ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল। আমাদের সিনেমাবোদ্ধারা চিরকাল সত্যজিত-ঋত্বিককে নিয়েই সন্তুষ্ট ছিলেন, বড়জোর মৃণাল সেন— এই পর্যন্ত ছিল তাদের গতি। তারা খেয়ালও রাখেন না যে সত্যজিৎ রায়ের পরের বছরই ঋষিকেশ মুখোপাধ্যায়েরও জন্মশতবর্ষ। তরুণ মজুমদার প্রয়াত হলে তাঁর সম্পর্কে যে শোকোচ্ছাস দেখা যায়, তার অনেকটাই ইন্টেলেকচুয়াল বিমূঢ়তা। একথা কেন বলছি? বলছি এই জন্যে যে আমাদের ফিল্ম সোসাইটির অভ্যেস অনেকটাই আমাদের ইউরোপীয় শিল্পরুচির অনুবর্তী করেছিল এবং আমরা যাকে চলচ্চিত্র নির্মাণের শিখর প্রদেশ ভাবছিলাম, তা আসলে ইউরোপীয় আর্ট সিনেমার ভাষাশৈলী। সেখানে আন্তনিওনি সত্য, ফেলিনি, গোদার বা বুনুয়েল সত্য, কিন্তু কখনওই আমরা আমাদের মত করে বাস্তবতার মায়ায় বন্দি হতে জানতাম না। সত্যজিৎ রায় বা ঋত্বিক ঘটকের ক্ষেত্রেও আমরা যে মাঝে মাঝে হোঁচট খেয়েছি, তার কারণ আমরা ইউরোপীয় নন্দনতত্ত্বের সঙ্গে তাঁদের সর্বত্র মিলিয়ে নিতে পারিনি। অথচ, যেদিন থেকে বাংলা সিনেমায় শব্দ প্রবেশ করল, অর্থাৎ সেই ১৯৩১ সাল থেকেই বাঙালিরা গল্পের অনুরাগী। তার একটা মূল কারণ হয়তো এই যে আমরা জাতি হিসেবে সাহিত্যের যতখানি আকাশ স্পর্শ করতে পেরেছি, ততটা খুব কম জাতিসত্তাই পেরেছে। আর যে কথাটা বলবার, তা এই যে সিনেমায় প্রথম শব্দ এল, সঙ্গে সঙ্গেই আমরা আমাদের যাবতীয় মনোযোগ নিবদ্ধ করলাম সংলাপের ওপরে। অর্থাৎ আমরা ঠিক করলাম, নিউ থিয়েটার্সের সৌজন্যে, যে একটি ভালো সাহিত্য গল্পকে আরও ভালো চিত্রনাট্যে সাজিয়ে আরও ভালো অভিনয় দিয়ে যদি পরিবেশন করতে পারি, তাহলেই একটা ভালো সিনেমা হবে। অর্থাৎ সিনেমা বলতে আমরা বুঝে ফেললাম, একটি দৃশ্য ও শ্রুতিতে পরিবেশিত একটা উপন্যাস বা গল্প। বাঙালি তো সিনেমাকে ‘বই’ এমনি এমনি বলে না! তরুণ মজুমদার সম্ভবত এই ঘরানার শেষ প্রতিনিধি। তিনি জানতেন যে আমাদের গল্প বলার ঢং হলিউড আমাদের রক্তে প্রবেশ করায়নি। আমাদের কথকতার একটা বিশেষ ধরন ছিলই আর তাতে সম্পদের জোয়ার এনে দিয়েছিলেন আমাদের কথাশিল্পীরা। বিশেষত, মধ্যবিত্তের কথার ধরনে তো সারা বিশ শতক জুড়েই বিরাজ করলেন ‘জবাকুসুমসঙ্কাশ’ শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রমথেশ বড়ুয়া ও দেবকীকুমার বসু, শহর ও মফস্বলের অজস্র মধ্যবিত্ত পরিবারকে যেভাবে শব্দের হরিণে, দৃশ্যের মায়ায় মজিয়েছিলেন, তা কিংবদন্তি হয়ে আছে। তরুণ মজুমদার সেই যুগেরই সন্তান। এটা নেহাত সমাপতন নয় যে বাংলা সবাক চিত্র যে বছর শুরু হয়, সে বছরই তরুণ মজুমদারের জন্ম।

তরুণ মজুমদারের ছবিতে বহির্বঙ্গ, কিন্তু সংলগ্ন বঙ্গ, এত বেশি করে থাকে, তাতেও সঙ্কেতটা মূলত নিউ থিয়েটার্স প্রদর্শিত পথেই এসেছিল। ১৯৩৭ সালে প্রমথেশ বড়ুয়া ‘মুক্তি’ ছবি তৈরি করলেন। এই ছবিতে রবীন্দ্রনাথের একটি গানকে ব্যবহার করার জন্য কবির অনুমতি চাইতে তিনি তাঁর দ্বারস্থ হয়েছিলেন। বস্তুত, ওই গানটিতে সুরারোপ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ নন, পঙ্কজ কুমার মল্লিক। সেই সাক্ষাতেই রবীন্দ্রনাথ ওই সিনেমার চিত্রনাট্যের কিছুটা অংশ প্রমথেশ বড়ুয়ার কাছ থেকে শুনতে চান এবং শুনেই বলেন, বাহ, এ তো চমৎকার হচ্ছে, কলকাতার বাইরের জায়গার কথা উঠে আসছে, ছবির নাম ‘মুক্তি’ রাখো না! বাঙালি তখনই পুজোর ছুটির সিনেমা বলতে প্রথমবার অসমের গৌরীপুর, তার নিসর্গদৃশ্য, এমনকি প্রমথেশ বড়ুয়ার নিজের পালিত হাতিটিকে দেখতে পেল। একই ধারায় তরুণ মজুমদার বাঙালিকে মাঝে মাঝেই শিমুলতলায়, সাঁওতাল পরগণা এমনকি বীরভূমে নিয়ে গেছেন। তিনি বাঙালিকে একটা ছুটির মায়া দেখিয়েছেন, যা আমাদের অভিভূত করেছিল। এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, সিনেমায় এই গল্প বলার রীতিতে তরুণ মজুমদার এক স্মরণীয় নাম।

অন্য আরেকটি ব্যাপারে আমাদের তরুণ মজুমদারের কথা মনে রাখা উচিত, সাধারণত যা আমরা ভুলে থাকি। তা হল যখন তিনি ছবি করতে এলেন, ততক্ষণে স্টুডিও যুগের অবসান ঘটেছে, অন্যদিকে শিল্পী-চলচ্চিত্রকার যেমন সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক প্রমুখের আবির্ভাব হয়েছে, এবং একইসঙ্গে চলচ্চিত্রে নক্ষত্র-ব্যবস্থা বা স্টার-সিস্টেম সূচিত হয়েছে, মূলত উত্তমকুমার ও সুচিত্রা সেন-এর সৌজন্যে। এ কথা বলা যেতে পারে যে তরুণ মজুমদারের প্রথম ছবি ‘চাওয়া পাওয়া’ উত্তম-সুচিত্রাকে নিয়েই তৈরি, কিন্তু অনতিকালের মধ্যেই তিনি এই মোহ কাটান। পরবর্তীকালে তিনি গল্পের ওপর এত বিশ্বাসী হয়ে ওঠেন যে যখন তিনি ‘পলাতক’ ছবিটি তৈরি করেন, তাঁর প্রযোজকেরা অনুপকুমারের মতো একজন তথাকথিত গৌণ নায়ককে নিয়ে ছবি করতে রাজি ছিলেন না, কিন্তু তরুণ মজুমদারের দুঃসাহস তাঁদের বুঝিয়েছিল যে অনুপকুমারও ‘চলতে পারে’। এই ছবিতে অনুপকুমার কতদূর ‘চলেছিলেন’ তা তো এখন আসমুদ্রহিমাচলেরই বিস্ময় চিহ্ন। স্বয়ং শিবরাম চক্রবর্তী আনন্দবাজারে তাঁর কলম ‘অল্পবিস্তর’-এ লিখেছিলেন— সাধারণত এই-ই হয় যে আজকাল বাঙালিরা হিন্দি ছবির চালু গান গুনগুন করে, কিন্তু এই প্রথম দেখলাম হিন্দুস্থানি রিকশাওয়ালা ‘মন যে আমার কেমুন কেমুন কোরে’ গাইতে গাইতে ঘণ্টা ঠুনঠুন করে রিকশা নিয়ে চলেছে।

পলাতক

এমনকি আমরা দেখব, বাণিজ্যসফল ‘পলাতক’ ছবির নির্মাণ কৌশলেও নিউ থিয়েটার্স-এর পারিপাট্য অক্ষুণ্ণ ছিল। সেটা এখনকার বাণিজ্যিক সিনেমার অগোছালো মনোভাব নয়৷ ধনীর বাড়ির চিত্রায়ণে আজকাল ডিজিটাল ক্যামেরা ও ডিজিটাল টেকনোলজির ব্যবহার সত্ত্বেও তা দৃষ্টিনন্দন হয়ে ওঠে না, চারিদিকে সম্পদ উপচে পড়লেও তা দৃশ্যনির্মাণে অব্যবহৃত থেকে যায়। পলাতক-এর ক্ষেত্রে তা হয়নি। পলাতক-এ যখন ডে ফর নাইট ফটোগ্রাফি ব্যবহার করা হচ্ছে অর্থাৎ সৌমেন্দু রায়ের সৌজন্যে দিনের বেলা রাত্রির দৃশ্যপট তৈরি করা হচ্ছে, সেই নির্মাণশৈলী সেই সময়ের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে। অথবা ধরা যাক, ‘সংসার সীমান্ত’ ছবিতে যখন একটি গণিকাগৃহ নির্মাণ করা হচ্ছে, যাকে বাংলা সিনেমার সবচেয়ে প্রামাণ্য গণিকাগৃহ বলে আমার মনে হয়, তখন বুঝতে হবে তরুণ মজুমদার সংগঠিত বাস্তবকে অনুপুঙ্খরূপে জানেন ও বোঝেন এবং তাঁর এই প্রয়োগনৈপুণ্য তৈরি হয়েছে মূলত স্টুডিও সিস্টেম বিশেষত নিউ থিয়েটার্সের কাছে প্রাপ্ত শিক্ষা থেকেই।

তিনি একসময় ‘যাত্রিক’ গড়েছিলেন, তার সঙ্গে সঙ্গে ‘অগ্রদূত’ ও ‘অগ্রগামী’-ও ছিল। এই তিনটি সংস্থা শেষবারের মতো স্টুডিও-যুগ এবং ব্যক্তি-যুগের মধ্যে একটি সাঁকো নির্মাণ করে দিয়েছিল। পাশাপাশি, তরুণ মজুমদার একথা প্রমাণ করে দিয়েছিলেন, অন্য অনেকের সঙ্গেই হয়তো, যে তেমন একটি গল্প যদি ঠিকভাবে পরিবেশন করা যায়, তাহলে যেকোনও অনামা নায়ক-নায়িকা অভিনীত ছবিও জনপ্রিয় হতে পারে। এমনকি যদি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত না গাইয়ে ‘জীবনপুরের পথিক রে ভাই’ও গাওয়ানো যায়, তাহলেও ওই দেবকণ্ঠের সূত্রে চলচ্চিত্রের জনপ্রিয়তার গ্যারান্টি দেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ হলিউড পরিচালকদের মতো তাঁর ধারণা হয়েছিল যে তিনি যে পেশায় আছেন, সেখানে যদি জনপ্রিয়তার সামান্যতম হানি হয়, তাহলে তা অমার্জনীয়। উল্টোদিকে ছবির জনপ্রিয়তা যদি থাকে, তাহলে সমালোচকরা ভুরু কোঁচকালেও তাতে তেমন কিছু আসবে যাবে না৷ ঠিক তাই-ই হয়েছিল। ভি শান্তারামের অর্থ বিনিয়োগে যখন ‘পলাতক’ তৈরি হল, তখন যাদের লজ্জা পাওয়ার কথা, তারা হলেন বাঙালি প্রযোজক।

শ্রীমান পৃথ্বীরাজ

বাঙালি সমালোচকরাও তরুণ মজুমদারের বিষয়ে তরুণ মজুমদারের জীবৎকালে তেমনভাবে কোনওদিনই খুব বেশি কিছু লেখেননি। কিন্তু আমরা দেখতে পাচ্ছি, মৃত্যুর পরে তাঁর অকুণ্ঠ প্রশংসা হচ্ছে, কখনও তা তাঁর মেরুদণ্ডের জন্য, কখনও-বা মানুষ হিসেবে ওঁর নিরহঙ্কারী, অমায়িক ব্যবহারের জন্য, বা অন্য কোনও কারণে। কিন্তু তাঁর ছবি কেন ভাল— তা নিয়ে কোথাও বিশেষ কথাবার্তা হচ্ছে না। তরুণবাবুর পরিচালন কুশলতার এক চমৎকার উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ ছবির শেষে একটি চুম্বনদৃশ্য। একেবারে শেষ দৃশ্যে নায়ককে চুম্বন করার জন্য নায়িকা মহুয়া রায়চৌধুরী একটু উঁচু হয়ে গেলেন, ফলত মেয়েটির গোড়ালি আমরা দেখতে পেলাম, কিন্তু তাদের মুখ দেখতে পেলাম না। আমরা বুঝতে পারলাম, এই সে সময় যখন ‘একটি কথার দ্বিধা-থরোথরো চূড়ে ভর করেছিল সাতটি অমরাবতী’, এই সেই চুম্বন যা মানুষকে অমরতা দেয়, অনশ্বরতা দেয়। তরুণবাবু কখনওই চুম্বন মুহূর্তটি আমাদের দেখালেন না, মেয়েটির পা সামান্য উঠল, তার ফলে মেয়েটির শাড়ি অল্প সরে যাওয়ায় আমরা দেখলাম একটি সায়ার নিম্নাংশ, তাতে আলপনার মতো নানারকম চিত্র-বিচিত্র করা একখানি পাড়। সামান্য সায়ার ওই কারুকাজটুকু, স্বামী-স্ত্রীর আটপৌরে ও সলজ্জ চুম্বনটিকে এক চিরকালীন ফ্রেমে বন্দি করে রাখল। এই যে ডিটেইল সম্পর্কে তরুণ মজুমদারের ধারণা তা বাংলা ছবিতে খুব কম পরিচালকের মধ্যে আমরা দেখতে পেয়েছি। কিংবা তিনি যে হলিউডকে কত তীব্রভাবে অনুভব করেছিলেন, তা বোঝা যায় যখন তিনি ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’-এই আমবাগানের মধ্যে দিয়ে মোটরগাড়ির দৌড় করান। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, আমার আগে সত্যজিৎ রায়ও বলেছেন, ওরকম সার্থক chase sequence বাংলা ছবিতে এর আগে আর কখনও আসেনি, পরেও খুব কমই এসেছে। আর এ সমস্তটাই তরুণ মজুমদার তৈরি করেছিলেন অতি অল্প উপকরণে। তিনি কখনওই বিরাট বাজেট নিয়ে বা বিরাট আয়োজন করে ছবি তৈরি করেননি, বিদেশি লোকেশনে গিয়ে শুটিং করেননি। তিনি বাঙালির মন জুগিয়ে বাঙালির নুন-হলুদ-মশলা দিয়েই নেহাত সাদামাটা মাছের ঝোল রান্না করেছেন, যা সহজপাচ্য, কিন্তু তাঁর হস্তনৈপুণ্যে সেই সাধারণই অসম্ভব সুস্বাদু হয়ে উঠেছে। এই যে তিনি ‘বালিকা বধু’-র মতো ছবি করেন, এ ছবিকে শুধুমাত্র বাল্যপ্রেমের ছবি ভাবলে ভুল হবে। এ ছবির নির্মাণ দেখলেও আশ্চর্য হতে হয়। যখন হেডমাস্টারটিকে মাঠের মধ্যে দিয়ে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ঠিক সে সময় দৃশ্যটিতে আলোর ব্যবহার অসামান্য। কিংবা বালিকাটি যখন যুবতীতে রূপান্তরিত হচ্ছে, তার মধ্যে আগত যে পরিবর্তন, তাকে বোঝাতে পরিচালক কোণারক মন্দিরের গায়ে ভাস্কর্যের মন্তাজ খুব দ্রুততার সঙ্গে ব্যবহার করেন, আর মুহূর্তে দৃশ্যটির সৌন্দর্য অশ্লীলতার পরশ মুক্ত হয়। আমরা, সাধারণ দর্শকরা, একটা ইঙ্গিতমাত্র বুঝতে পারি যে আমাদের চোখের সামনে এইমাত্র স্বর্গ ও মর্ত্যের মিলন সম্পন্ন হল।

বালিকা বধূ

তরুণ মজুমদার পর্দায় গল্প বলতে জানতেন, কিন্তু তা পুরোপুরি আমাদের ভাষার দিকপাল ছোটগল্প লেখকরা যেভাবে লিখে গেছেন, ঠিক সেভাবে নয়। বাংলা ছোটগল্পের স্বর্ণযুগে প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে নরেন্দ্রনাথ মিত্র অথবা বিমল কররাও যখন লিখতেন, তখনও আমরা দেখেছি যে স্বাধীনতার ফাঁকি, মধ্যবিত্তের পরিত্রাণহীন পতন, কলকাতার ক্লেদ তাঁদের অনেক সময় বিচলিত করলেও হতোদ্যম করেনি। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সবকিছুর মধ্যেও জীবনে কোথাও একটা শরতকালের শিউলি, একটু মেঘভাঙা রোদ, একটু নিভৃত অবকাশ আছে। তরুণ মজুমদারও ঠিক তাই মনে করতেন। তরুণ মজুমদার পঞ্চাশ দশকের সন্তান হলেও, খুব আশ্চর্যভাবে দেখা যাবে, তিনি তাঁর রচনায় তিক্ততা, রিরংসা এবং নাগরিক দিনযাপনের মলিন কোনও দাগ রাখেননি। এটা তাঁর বিরুদ্ধে সমালোচনা হিসেবেও কেউ কেউ ব্যবহার করতে পারেন। এমনকি ‘সংসার সীমান্তে’ ছবিতে তিনি যখন চোর ও গণিকার প্রণয় দেখান, তখনও সেখানে একটি প্রসন্ন হাসি এসে সমাপ্তি চিহ্ন এঁকে দেয়। একজন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, মতি নন্দী বা শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখায় যা সহজেই চোখে পড়ে, সেই ক্ষয় বা পতনের জগৎ তরুণ মজুমদারের নয়। শঙ্খ ঘোষ, অলোকরঞ্জন, উৎপলকুমার বসু, বা বিনয় মজুমদারের মতো সাঙ্কেতিক জগৎও তাঁর নয়। তরুণ মজুমদার সবসময়ই আমাদের সংস্কৃতিতে শিথিল কিন্তু মূল্যবান কিছু নুড়িপাথর, যা অতীতের, যা শৈশবের, সেইসব মুহূর্তের কাছে বারেবারে আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।

একইসঙ্গে, তরুণ মজুমদারের বিরুদ্ধে এই সমালোচনা করা যেতে পারে যে তিনি কেন সমকালীনতার সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করতে পারলেন না। তরুণ মজুমদারের একেবারে বিপরীতধর্মী পরিচালক ছিলেন ঋত্বিক ঘটক, দেশভাগ পরবর্তী দুঃস্বপ্ন যাঁকে বিষয়ের জরায়ু পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিল। অন্যদিকে তরুণ মজুমদার সবসময়ই মনে করেছেন যে বিরহ দহন সত্ত্বেও মানুষের স্বর্গবাসের অধিকার আছে। ঋত্বিক ঘটক না তরুণ মজুমদার, কে বেশি সত্যি— এ প্রসঙ্গ অবান্তর আর এর উত্তরও আমাদের জানা আছে। কিন্তু তরুণ মজুমদারের ছবির দিকে তাকিয়ে আমরা দেখি যে তিনি মহার্ঘ নায়ক-নায়িকার শরণাপন্ন না হয়েও শুধু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠের ওপর নির্ভর করে এমন মুহূর্ত তৈরি করতে পারেন যা কোনও সার্থক কবিতার মহত্তম মুহূর্তের থেকে কিছু কম নয়। এবং আমি বারবারই বলছি, তরুণবাবুর ছবি কোনও দুর্লভ হীরের গয়না নয়, বহু কোটি টাকা তার বাজেট নয়, তিনি আমাদের জীবনের আটপৌরে ধরনটাকেই সিনেমার পর্দায় ছুটির অবকাশ হিসেবে ভাবতে শিখিয়েছিলেন। ‘কাঁচের স্বর্গ’ থেকে শুরু করে তাঁর জীবনের প্রায় শেষ প্রান্ত অবধি একথা সত্য৷

দাদার কীর্তি

সত্তর দশকে যে তিনটি ছবি তিনি বানালেন, ‘দাদার কীর্তি’, ‘ফুলেশ্বরী’ এবং ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’— এই তিনটি ছবি সত্তরের দশকে প্রেমের মডেল হয়ে উঠল। যতদিন অবধি উদারীকরণের অর্থনীতি ও ব্যাপক নগরায়ণ আমাদের সমাজে থাবা বসায়নি, ততদিন অবধি প্রেম বলতে বাঙালি যা বুঝত, তার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন তরুণ মজুমদার। আমরা যদি তাঁর ছবির আলো দেখি, কস্টিউম দেখি, তাঁর ছবির সঙ্গীত দেখি, ক্যামেরা চালনা দেখি, আমরা বুঝতে পারব প্রতিটি বিভাগে কতখানি মনোযোগ ও দক্ষতা থাকলে, জনরুচি ও বক্স অফিস দুটোকেই দখল করা যায়। বস্তুত, বাংলা সিনেমা বরাবর সত্যজিৎ রায়কে অনুসরণ করার চেষ্টা করেছে৷ কিন্তু সত্যজিতের প্রতিভা তাঁর অনুজদের ছিল না। এখনও যে নেই, তা ইতিমধ্যেই প্রমাণিত। আর ঋত্বিক ঘটক তো পুরোপুরি অননুকরণীয়, কেননা তিনি ব্যাকরণের উর্ধ্বে। বরং আজ আমার আক্ষেপ হয়, আমরা যদি নিউ থিয়েটার্স থেকে আহৃত গল্প বলার ঢং যা একদা প্রমথেশ বড়ুয়া ও দেবকীকুমার বসু তো বটেই, নির্মল দে, অজয় কর, অরবিন্দ মুখোপাধ্যায় ও তপন সিংহ গ্রহণ করেছিলেন, তবু আমরা আর এঁদের উত্তরাধিকার অনুসরণ করলাম না। ১৯৬৫ সালে তপনবাবু ‘গল্প হলেও সত্যি’-তে একটি ঠাট্টা করেছিলেন, সেখানে একটি চরিত্র উচ্চারণ করছে— থ্রুফো। ফ্রাঁসোয়া ত্রুফো-র নামের উচ্চারণের প্রতি ফিল্ম সোসাইটি ইন্টেলেচুয়ালদের এতখানি আগ্রহ, তার বদলে বা তার পাশাপাশি বাঙালি বুদ্ধিজীবীরা যদি একটি ধানের শিষের ওপর একটি শিশিরবিন্দুকে দেখতে চাইতেন, তাঁরা যদি তরুণ মজুমদারকে চিনতে পারতেন, জানতে চাইতেন এই মাটির রস ও রহস্য কত গভীর, তাহলে বাঙালির সামগ্রিক চলচ্চিত্র যাত্রা যে আরও উন্নততর হতে পারত সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। তরুণ মজুমদার চলে গেলেন, কিন্তু বাংলা চলচ্চিত্রের শরীরে যে ক্ষতচিহ্ন তৈরি হয়েছে, আমরা কবে যে তা থেকে উদ্ধার পাব জানি না।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...