‘জীবনের সব জেদ, জাতপাত-ভেদাভেদ, দ্বেষ-রেশ শেষ হোক’

‘জীবনের সব জেদ, জাতপাত-ভেদাভেদ, দ্বেষ-রেশ শেষ হোক’ -- অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

 

সত্যযুগে নাহি ছিল জাতিভেদ
ছিল এক বর্ণ, এক ধর্ম্ম
পদবি কাহারো ছিল না কখনো
করিত সবে সবার কর্ম্ম
পদবি কাহারো নাহি রবে তাই
কেবলমাত্র থাকিবে নাম
তবেই বিভেদ ঘুচিবে সমূলে
সবে সুখে রবে অবিরাম।।

–অনিলচন্দ্র মজুমদার (নবসত্যযুগ)

সংবাদের শিরোনামে একটি নাম সেদিন উঠে এসেছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনে যুক্ত একজন ছাত্রী উপমা নির্ঝরণী, পদবি-বর্জিত একটি নাম। তাঁর বাবা, মোহিত রণদীপ নিজের পদবিও বিসর্জন দিয়েছেন বহু আগে। তিনি জানিয়েছিলেন, ‘‘পদবির মধ্যে জাতভিত্তিক অবস্থান মিশে থাকে। সেই কারণেই আমাদের এই ভাবনা।’’ একথা নির্ভেজাল সত্য যে পদবিই মানুষের জাতি, বর্ণ ও ধর্মকে টিকিয়ে রাখে। যেমন, ‘সুমন চট্টোপাধ্যায়’-এর মধ্যে যে ব্রাহ্মণত্বের আগুন আছে তা এক লহমায় নিস্তেজ হয়ে যায় ‘কবীর সুমন’ নামের সঙ্কল্পে। শ্রেণিহীন সমাজের আগে তাই ‘দিনবদলের স্বপ্ন’ দেখা বাঙালির জাতি-বর্ণহীন সমাজের প্রয়োজন। আশ্চর্যের বিষয় যে, এমনই একটি ধারণা থেকে, জাতি ও বর্ণবাদের মূলে আঘাত করার উদ্দেশ্যে ১৯৭৭ সালে জনতা দলের (ভারতের জাতীয় কংগ্রেস (অর্গানাইজেশন), ভারতীয় লোকদল, ভারতীয় জনসংঘ ও সোশ্যালিস্ট পার্টি একত্রিত হয়ে তৈরি করেছিল জনতা পার্টি) কার্যকরী কমিটির বৈঠকে পদবি বর্জনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল। কেননা মনে করা হয়েছিল যে পদবিই হল জাতি ও বর্ণের পরিচয়ের বাহক। অথচ এই একুশ শতকে পৌঁছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল যেভাবে জাতি ও বর্ণভিত্তিক বিভক্তিকরণের পাশাখেলা শুরু করেছে তা নাগরিক সমাজকে স্তব্ধবাক করে দিচ্ছে। একথা সত্য যে, বাঙালি হিন্দুর সমাজে জাতপাতের ছুঁৎমার্গ বহু প্রাচীন। শত শত বছর ধরে তার বিরুদ্ধে নানাপ্রকারের সংস্কার আন্দোলনও চলেছে। অনেকাংশেই তা সফল হয়েছে, কিছুটা আজও ত্রুটিমোচনের দাবি রাখে। গ্রামেগঞ্জে শুধু নয় শহরাঞ্চলের মানুষের মধ্যেও কিছুক্ষেত্রে নিচু জাতের মানুষের প্রতি প্রচ্ছন্ন হেনস্থার মনোভাব দেখা যায়, আজও। এগুলিরই ধ্বংসসাধন যেখানে রাজনৈতিক দলগুলির মূল উদ্দেশ্য ও প্রচার হওয়া উচিত, সেখানে একেবারে উল্টোরথ লক্ষ করা যাচ্ছে। এই ঘটনা বাঙালি জাতির নৈতিক অধঃপতনের সঙ্গে সঙ্গে পশ্চাৎবর্তী মননের ইঙ্গিত দেয়।

আমাদের সমাজে নাম ও উপনামের দ্বারা মানুষের পরিচয় নির্ধারিত হয়। উপনাম মূলত পেশা, সরকারি খেতাব ও শিক্ষাগত যোগ্যতার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়ে মানুষের জাতি ও বর্ণের কথা জানান দেয়। বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে জাতি ও উপজাতি এত প্রচুর ভাগে বিভক্ত যে সেখান থেকে আজকের দিনে মানুষের সত্যিকারের আদি-পরিচয়ের (অর্থাৎ প্রকৃতপক্ষে কে সদগোব, কে ব্রাহ্মণ ইত্যাদি) ব্যাপারে সন্ধান করতে হলে মশা মারতে কামান দাগতে হয়। ফিরে যেতে হয় বহু বছর আগের ঘটনায়। কেননা পদবি ব্যবহারের প্রথম নিদানই যে পাওয়া গিয়েছিল সনাতনী বৈদিক যুগোত্তরকালের মনু-সংহিতা ও বৃহদ্ধর্মপুরাণে।

শর্ম্মবদ্‌ ব্রাহ্মণস্য স্যাদ্‌ রাজ্ঞো রক্ষা সমদ্বিতম্‌।
বৈশ্যস্য পুষ্টি সংযুক্তং শূদ্রস্য প্রেষ্য সংযুতম।।”

(মনু-সংহিতা)

ব্রাহ্মণে দেবশর্ম্মানৌ রায়বর্ম্মা চ ক্ষত্রিয়ে।
ধনোবৈশ্যে তথা শূদ্রে দাস শব্দঃ প্রযুজ্যতে।।”

(বৃহদ্ধর্মপুরাণ)

আর তাই তো পুরাণ, রামায়ণ কিংবা মহাভারতে চরিত্রদের নামের শেষে সচরাচর পদবির উল্লেখ পাওয়া যায় না। পৌরাণিকযুগে বৃত্তির ভিত্তিতে যেমন ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র বিভাগ ছিল তেমন তিনটি মূল প্রাকৃতিক গুণ সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ-এর প্রকারভেদে বর্ণের জন্ম হয়েছিল। আর এই প্রকারান্তর জন্মগত ছিল না। সেজন্যেই দাসীপুত্র কবষ বৈদিক ঋষি, জবালার পুত্র সত্যকাম ও ক্ষত্রিয় বিশ্বামিত্র ব্রাহ্মণ হয়েছিলেন। কিন্তু পরশুরাম জন্মসূত্রে ব্রাহ্মণ হলেও কর্মের জন্য ক্ষত্রিয় হয়েছিলেন। শুধুমাত্র তাই-ই নয়, এদের মধ্যে স্পর্শের ব্যাপারেও কোনও বাধ্যবাধকতা ছিল না। অনুলোম (অর্থাৎ, ব্রাহ্মণরা ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র; ক্ষত্রিয়রা বৈশ্য ও শূদ্র; বৈশ্যরা শূদ্র পত্নী গ্রহণ করতে পারত) ও প্রতিলোম (অর্থাৎ, অনুলোমের বিপরীত ক্রম) বিবাহের ধারণাই তার যথাযোগ্য প্রমাণ। কিন্তু পরবর্তীকালে যখন গোষ্ঠীগত সম্পত্তি থেকে প্রথমে পারিবারিক ও পরে ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিবর্তনে সমাজের আর্থনীতিক পালাবদল ঘটে তখন স্বার্থান্ধ মানুষের ক্ষমতার অপপ্রয়োগে জন্মগত জাতি ও বর্ণবাদের উচ্চ-নীচ ভেদাভেদ প্রবল হয়। বৌদ্ধধর্ম কিছুটা এর মূলে কুঠারাঘাত করেছিল। কিন্তু খ্রিস্টীয় অষ্টম শতক থেকে যখন বৌদ্ধধর্মের প্রভাব নিষ্প্রভ হতে শুরু করে তখন থেকেই আবার ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনরুত্থান হয়। পাল বংশের অব্যবহিত পরে যখন সেন বংশের শাসনকাল শুরু হয় তখন রাজা বল্লালসেন এই বাংলার বুকেই কর্মভেদ অনুযায়ী নতুন ৩৬টি জাত বা শ্রেণির বিভক্তিকরণ শুরু করেছিলেন, যার দ্বারা ধীরে ধীরে জাতপাত, শ্রেণি-গোষ্ঠী, স্পৃশ্য-অস্পৃশ্য ইত্যাদির ছুঁৎমার্গ ও পতিত করে রাখার প্রবণতা ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল। পুরাকালে যেখানে শুধুমাত্র নামের দ্বারাই বংশ চেনা যেত, যেমন— রঘুবংশ, সেখানে সময়ক্রমে দেবদত্ত থেকে দেবরূপ দত্ত কিংবা বিজয়সেন থেকে বিজয়কুমার সেনের মধ্য দিয়ে বংশ চেনার উপক্রম হয়েছিল। আর সেই থেকেই জাতপাতের উৎপাত। তবে নবজাগরণকালে ও স্বাধীন ভারতে বাংলার বুকে বামপন্থী রাজনীতির প্রভাবে এই জাতপাতের নিকৃষ্টপনাকে বহুলাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভবপরও হয়েছিল। সেই উত্তরাধিকার আমাদের অন্তর থেকে বিনষ্ট হওয়ার কথা নয়। তা সত্ত্বেও আজও ট্রেনে-বাসের জমজমাটি আড্ডায় মুখোপাধ্যায় শ্রেষ্ঠ নাকি বন্দ্যোপাধ্যায়, ইত্যাদি আলোচনাতে নানা ব্যাখ্যা প্রায়ই শোনা যায়। অর্থাৎ মন যেন প্রচ্ছন্নভাবে কোথাও জাতকৌলিন্যকে টিকিয়ে রাখারই পক্ষপাতী, যার সুযোগ রাজনৈতিক দলগুলি নিয়ে থাকে। মনে আছে, অল্প বয়সে যখন কবিতা লেখার ভূত চেপেছিল মাথায় তখন একদিন ‘কবিসম্মেলন’ পত্রিকার দপ্তরে শ্যামলকান্তি দাশ আমার পদবি ‘ব্যানার্জি’ লেখা আছে দেখে বলেছিলেন— ‘বাংলা ভাষায় লেখালেখি করতে এসে ‘ব্যানার্জি’ আবার কী, ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ লিখবে।’ কবিতা লেখার ভূত কবেই নেমে গেছে কিন্তু ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ লেখার ধমকখানি আজও কার্যকরী। পরে খেয়াল করে বহু মানুষকেই এরকম পদ্ধতি অবলম্বন করতে দেখেছি। কবি নাট্যকার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় কখনও অভিনেতা সৌমিত্র চ্যাটার্জি হয়েছেন, বাংলাভাষার লেখক নীরদচন্দ্র চৌধুরী হয়েছেন ইংরেজিভাষার লেখক নীরদ সি চৌধুরী। কিন্তু ‘ব্যানার্জি’ ও ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ কি একই নাকি আলাদা, এই প্রশ্নের উত্তর সেই দিন থেকে তাড়া করেছে, কেননা ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, স্কুল-কলেজের মার্কশিট সর্বত্র ‘ব্যানার্জি’ আর লেখালেখির বেলায় ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ হলে কি একই মানুষকে বোঝাবে? বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে নাহয় লেখকের ভাগ্যে সাম্মানিক জোটে না। কিন্তু যদি জুটত সেখানে কি আইনগতভাবে ‘ব্যানার্জি’ ও ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’কে সমগোত্রীয়র মর্যাদা দেওয়া হত? লোকেশ্বর বসুর ‘আমাদের পদবির ইতিহাস’ বই থেকে জানা যায় যে, ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’ কিংবা ‘মুখোপাধ্যায়’ মোটেই সুপ্রাচীন কিছু নয়। এমনকি বঙ্গদেশেও এই পদবি ব্রাহ্মণ সমাজে বিরল ছিল। লোকেশ্বর বসু লিখেছেন, “উল্লেখ্য যে বন্দ্যোপাধ্যায়, চট্টোপাধ্যায়, মুখোপাধ্যায়, গঙ্গোপাধ্যায় পরিবর্তিত পদবি। আদি পদবি বাড়বি বা বন্দ্যঘটি, চাটুতি বা চট্ট, মুখটি, গাঙ্গুর বা গঙ্গো। মুখটি বা মুকুটি এখনও পাওয়া যায়। বাড়ব বা বাড়বি গ্রাম থেকে বাড়বি ও বন্দ্যঘটি রূপান্তর, তা থেকে বন্দ্যোপাধ্যায়।” ঠিক যেমনভাবে কুশো গ্রাম থেকে সৃষ্টি পদবি কুশারী লোকমুখে ঠাকুর পদবিতে অভিযোজিত হয়েছিল। একইভাবে “বাংলাদেশে গাঞি পদবির উদ্ভব হলেও আর্যাবর্তে অর্থাৎ উত্তরপ্রদেশে দেখা দিয়েছিল শিক্ষাগত দ্বিবেদী, ত্রিবেদী পদবি। সংস্কৃত উপাধ্যায় বিহারে ও বঙ্গদেশে ওঝা হয়ে দাঁড়ায়। বড় বড়ু বা বাড়ব-এর সঙ্গে ওঝা, মুখটির সঙ্গে ওঝা, চট্ট বা চাটুতির সঙ্গে ওঝা যুক্ত হয়ে বাড়ুওঝা, চাটুওঝা, মুখুওঝা পদবিগুলি হয়ে দাঁড়ায় বাঁড়ুজ্যে, মুখুজ্যে ও চাটুজ্যে। অবশ্যই দেশজ উচ্চারণের ফলে। পরে সেগুলিকে সংস্কার করে বর্তমান চেহারায় নিয়ে আসা হয়।” তবে এ-প্রসঙ্গে ওঝা বা উপাধ্যায়ের বদলে হিন্দির ‘জী’ যোগে বাঁড়ুজ্যে বা চাটুজ্যের ধারণাও সুপ্রচলিত। তবে এইখান থেকেই কীভাবে ১৭৬০ সালের পরে ব্রিটিশ রাজপুরুষদের মুখে মুখে ব্যানার্জি, চ্যাটার্জি ও মুখার্জি হয়েছিল তা বলাইবাহুল্য। সুতরাং, সে-জন্যেই বাংলাভাষার লেখককে ‘ব্যানার্জি’ বর্জনের নিদান দেওয়া হয় ও ‘বন্দ্যোপাধ্যায়’-এর প্রচলন হয়।

পদবির এইসব অতীতচর্চা ব্যতিরেকে আলোচনা করলেও আরও একটি দিকে আলোকপাত করা যায়। এই দেশে ১৮৭৫ সাল থেকে কিন্তু নাম ও পদবি পরিবর্তনের আইনসিদ্ধ অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যার প্রভাবও পদবি বদলের মধ্য দিয়ে জাতি-বর্ণ বদলে কিছু কম ছিল না। এই আইনগত সুবিধার ফলে বিবাহ, ধর্মান্তরকরণ ও শ্রুতিমাধুর্যের কারণে বহু মানুষ নানান সময়ে পদবির পরিবর্তন করেছেন, করছেনও। এমনকি বহু উঁচুজাতের মানুষ সরকারি সুযোগ-সুবিধার জন্য ধর্মের সঙ্গে পদবিরও পরিবর্তন করে তফসিলি সম্প্রদায়ভুক্ত ও অনগ্রসর শ্রেণিভুক্ত হয়েছেন। ফলে সমায়ানুক্রমে মানুষের আদি জাতিপরিচয় থেকে শ্রেণিপরিচয় সব-ই তালেগোলে লোপ পেয়েছে। এখন বাঙালি-অবাঙালি (নাম ও পদবি মিশে গিয়ে চন্দন দাস বললে বাঙালি নাকি ওড়িয়া বোঝা যায় না), হিন্দু-মুসলমান (চৌধুরী, মণ্ডল ইত্যাদি পদবি ও কাজী ব্যাতিরেকে অনিরুদ্ধ বা রিনি থেকে ধর্মগত পার্থক্য বোঝা যায় না), আদিবাসী-খ্রিস্টান (আলফ্রেড মুন্ডা বা দিলীপ সর্দার) ও বৌদ্ধ-বৈষ্ণব (দাশগুপ্ত, রায় বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হতে পারেন আবার অধিকারী, গোস্বামী বৈষ্ণব নাও হতে পারেন) সব একাকার হয়ে এক বৃহৎ সমাজ গড়ে উঠেছে যেখান থেকে জাতপাতের ভিত্তিতে আদি-পরিচয়ের সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রায় অসম্ভব। এখন সরকারি মতেই তফসিলি জাতি, উপজাতি ও অনগ্রসর শ্রেণির বিচারেই প্রায় ৬০, ৪০ ও ১৭৮ রকমের পদবির ভাগ-উপভাগের মিশ্রণ দেখা যায়। বেশিরভাগ মানুষ সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতে এগুলি ব্যবহার করেন ঠিকই কিন্তু মোটের ওপর আদি-পরিচয় খুঁজে বের করে অচ্ছুত বা একঘরে করে রাখা অথবা ছায়া মাড়ালে অশুদ্ধ হওয়া ইত্যাদি বিধানের দিন বাংলায় অন্তত আর নেই।

অথচ রাজনৈতিক দলগুলি যেন এইসব খবিশ প্রাচীনপন্থী কারবারেই ক্ষমতাদখলের বাজারমাত করতে আগ্রহী। সনাতনী বৈদিক সভ্যতার ধাঁচে সমাজকে ঢালার সদিচ্ছা কিন্তু সেখানে নেই। থাকলে প্রথমেই জাত ও বর্ণবাদকে খারিজ করা হত। কেননা জাতপাতের রাজনীতির সঙ্গে সনাতনী বৈদিক আদি ভারতের দর্শনের বিরোধই আছে। পক্ষান্তরে এখন আবার তফসিলি জাতি-উপজাতি, আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিয়ে সম্পূর্ণ পৃথক একটি ফ্রন্ট এই বাংলার বুকে তৈরি হয়েছে। সত্যিই পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ২০২১ সালের নির্বাচন এক নতুন অধ্যায় সূচিত করেছে। এই প্রথম রাজ্যে জাতপাত ও ধর্মের ভিত্তিতে মেরুকরণের রাজনীতি চালু হয়েছে। বহু পরিশ্রমে যেখানে বাঙালি সতীপ্রথা, কৌলীন্যপ্রথা, বাল্যবিবাহ, জাতিচ্যুতি, প্রায়শ্চিত্ত ইত্যাদি বিষয়গুলিকে জনসমাজ থেকে বর্জন করেছিল আজ সেখানেই পুনর্বার সেগুলিকে কবর থেকে খুঁড়ে আনা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে ভারতবর্ষ নামের দেশটি দীর্ঘ সময় ধরে আর্য-বৌদ্ধ-জৈন-মুসলমান-খ্রিস্টানের শাসন দেখেছে কিন্তু কোনওদিনই তা একটি ধর্মের জন্য নির্দিষ্ট রাষ্ট্র হয়ে যায়নি, লুঠতরাজের নায়কদের সঙ্গে ঔরঙ্গজেব কিংবা লর্ড কার্জনের মত শাসককেও পেয়েছে, তবুও তা ফ্যাসিবাদের জন্ম দিতে পারেনি। বরং অত্যাচারী শাসকই বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন। মানুষ মনে রেখেছে কেবলমাত্র সম্রাট অশোক কিংবা আকবরকে। সুতরাং বর্তমানের রাজনৈতিক প্রবাহ যেদিকেই গড়িয়ে যাক না কেন আদতে তা কিছুতেই ভারতের বহুত্ববাদী গণতন্ত্রের কাঠামোকে নষ্ট করতে পারবে কিনা তা সাধারণ মানুষের সংঘবদ্ধ হওয়ার প্রত্যয়ে নির্ধারিত হবে। মনে রাখতে হবে অনির্বাণ চট্টোপাধ্যায় যে-দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন সেটির কথা, তিনি লিখেছেন যে, ‘অ্যান্ড্রু মারান্‌জ তাঁর বইয়ের উপসংহারে লিখেছেন, অন্ধকারের কারবারিরা শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে পারে, কিন্তু তারা ব্যর্থ হবে কিনা সেটা নির্ভর করছে আমাদের ওপর। ইতিহাসের বঙ্কিম পথটির গতি ন্যায়ের দিকে— মার্টিন লুথার কিংয়ের সেই ঐতিহাসিক উক্তির সূত্র ধরে অ্যান্ড্রুর সংযোজন: সে-পথ নিজে নিজে ন্যায়ের দিকে ঘোরে না, আমরাই তাকে ঘোরাই।’ তাই বাঙালি সমাজকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, সে কি রাজনেতাদের অধোগতির ডাকে মনোনিবেশ করবে, নাকি তাকে বর্জন করবে?

 

সূত্রনির্দেশ:

  1. পদবির উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশের ইতিহাস – শ্রীখগেন্দ্র নাথ ভৌমিক
  2. আমাদের পদবির ইতিহাস – লোকেশ্বর বসু
  3. অন্যান্য
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...