ইমোজিনামা

ইমোজিনামা -- অম্লানকুসুম চক্রবর্তী

অম্লানকুসুম চক্রবর্তী

 

কনফিউজ়ড লাগছে লিখতে গিয়ে যদি কনফিউজড বানানে এস হবে না জেড হবে-র মধ্যে দ্বন্দ্ব চলে, তার একটা সহজ সমাধান রয়েছে। মোবাইলের ইমোজি অপশনে গিয়ে একটা চোখ উপরে তোলা মুখ কিংবা মাথার উপরে শনিগ্রহের উপগ্রহের মতো চক্কর কেটে চলা কোনও ছবি পছন্দ করে নিয়ে পাঠিয়ে দিলেই কাজ মিটে যায়। কাউকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে ইংরিজির কনগ্র্যাচুলেসন্স বানানটা যদি জীবনের অনেক সময় নিয়ে নেয়, তাহলে একটা হাততালির ইমোজি পাঠালেই মনের কথা বলা হয়ে যায়। কোনও কৃতী মানুষকে একবার অভিনন্দন জানালে যদি ‘প্রশংসা কম পড়িয়াছে’ বলে মনের মধ্যে প্রশ্নের উদয় হয়, তাহলে গোটা গোটা অক্ষরে বারবার অভিনন্দন লেখা হলে তা দৃষ্টিকটু লাগে। হাতের সামনেই সহজ উপায় অবশ্য রয়েছে। হাততালির চিহ্নটা একবারের বদলে পাঁচবার পাঠানো যেতে পারে। ইমোজির সংখ্যার সঙ্গে মনের আনন্দ-কান্না-উদ্বেলের একটা সমানুপাতিক সম্পর্ক রয়েছে।

১৭ জুলাই ফেলে এলাম বিশ্ব ইমোজি দিবস। ভাষা নিয়ে খুঁতখুঁত করেন যাঁরা, দুনিয়াজুড়ে ইমোজির বাড়বাড়ন্তে তাঁদের কপালের ভাঁজ যে ক্রমশ প্রকট হচ্ছে তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এঁদের একটা বড় অংশ গেল গেল রব তুলে বলছেন, ভাষার মধ্যে যতটুকু ঔৎকর্ষ ছিল, উন্মাদের মতো ইমোজি ব্যবহারে তার সলিলসমাধির রাস্তা মোটামুটি পাকা। তাঁদের আশঙ্কা, মনের ভাব প্রকাশের জন্য মানুষ আর উপযুক্ত শব্দ খুঁজবে না, অজস্র ইমোজির মধ্যে যার সঙ্গে মনের মিল পাবে, তাকে পছন্দ করে ‘কাজ সারবে’ চটজলদি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাঁরা বলছেন, চিঠি লেখার দিন তো উবে গিয়েছে কবেই। এসএমএস কিংবা হোয়্যাটসঅ্যাপে লম্বাচওড়া কোনও বার্তা লেখার সময়ে মানুষের মাথা জুতসই শব্দ সন্ধানে যতটুকুও বা ব্যস্ত থাকত, বাঁধভাঙা জলের মতো ইমোজি ব্যবহারে ওই সামান্য মাথা ঘামানোর অবকাশটুকুও আর লোকেদের থাকবে না। এই হল গিয়ে ভাষার ভবিষ্যৎ!

মনে পড়ে, স্কুলজীবনে কোনও মজার এসএমএস পেলে খুটখুট করে টাইপ করে লিখতাম, কী হাস্যকর। এর পরে তা হয়েছিল হা হা। যত বেশি হাসি, তত বেশি হা। কোচিং সেন্টারে ইংরিজি মিডিয়ামের এক বন্ধু শিখিয়েছিল এলওএল। এর পুরো মানে নাকি লাফিং আউট লাউড। ও বলেছিল, বাংলার পাতি হা হা-র থেকে এই এলওএল অনেক বেশি স্মার্ট। এর পরে শিখেছিলাম একটা কোলন, ড্যাশ ও ব্র্যাকেটকে পর পর টাইপ করে হাসিমুখ বোঝানোর এক আশ্চর্য টেকনিক। ব্র্যাকেটটাকে উল্টে দিলেই হাসিমুখ নিমেষে বদলে যেত কান্নায়। আমাদের জীবনের ইমোজির আদি রূপ কি ওটাই? অত্যাধুনিক স্মার্টফোনে আজ হাসতে চাওয়ার সময় দেখি, অ্যান্ড্রয়েড মেলে ধরে হাসির গাদাখানেক অপশন। কান্নারও তাই।

মোবাইল ফোনে ক্রমাগত বোতাম টিপে অক্ষর টাইপ করতে জাপানিদেরই কি আলস্য ছিল সবচেয়ে বেশি? হয়তো বা। না হলে ইমোজির গর্ভগৃহ উদীয়মান সূর্যের দেশ হল কী করে! ১৯৯৮ সালে জাপানের শিগেটাকা কুরিতা তৈরি করে ফেললেন পৃথিবীর প্রথম ইমোজি। সে দেশের এনটিটি ডোকোমোর একটি কারিগরি দলের হয়ে তিনি কাজ করতেন। ইমোজির যাত্রার সেই শুরু। এর পরে তা ঢুকে যায় অ্যাপলের আইফোনের বাইনারি কলকব্জায়। পরের স্টেশন অ্যান্ড্রয়েড। নতুনভাবে কথা বলার জাল ছড়িয়ে ফেলতে ইমোজিকে বেশি বছর অপেক্ষা করতে হয়নি। এর পাশাপাশি ২০১৩ সালে জেরেমি বার্জ তৈরি করে ফেললেন ইমোজিপিডিয়া— দুনিয়ার সবচেয়ে বড় ইমোজি সহায়িকা। কোনও ইমোজির স্থান-কাল-পাত্র নিয়ে খোঁজ নিতে চাইলে সেকেন্ডে তা বাতলে দেবে এই ইমোজিপিডিয়া। মধ্য তিরিশের এই অস্ট্রেলীয় হয়ে গেলেন ওই সংস্থার সিইও। অন্য সিইওদের সঙ্গে জেরেমির একটাই তফাৎ। চিফ একজিকিউটিভ অফিসারের বদলে চিফ ইমোজি অফিসার! ১৭ জুলাইকে বিশ্ব ইমোজি দিবস হিসেবে দেগে দেওয়ার কাজটিও করেছেন জেরেমি। ইমোজিপিডিয়ার ডিইও অর্থাৎ ডেপুটি ইমোজি অফিসার কিথ ব্রোনি গর্ব করে দেখিয়েছেন দুনিয়াজুড়ে ইমোজি ব্যবহারের ক্রমশ বেড়ে চলা গ্রাফ। দশ বছরের প্রায় ৬.৭ বিলিয়ন টুইটারের ডেটার ময়নাতদন্ত করা হয়েছে। জানা গিয়েছে, ২০১৪ সালে প্রতি দশটা টুইটে ব্যবহার করা হত একটা ইমোজি। তিন বছর পরে, ২০১৯ সালে ইমোজি ব্যবহারের হার হয় প্রতি ছটা টুইটে একটা। ২০২১-এর হিসেব প্রতি পাঁচটা টুইটের মধ্যে একটায় ইমোজি ব্যবহারের তথ্য দিচ্ছে। ওয়াকিবহাল শিবিরের অনেকে বলছেন, এই ট্রেন্ড থেকে একটা বিষয় মোটামুটি স্পষ্ট। আর হয়তো বছর পাঁচেক। গ্রাফের এমন পথ ধরে এগোতে থাকলে বছরখানেক পরে হয়তো চারটের মধ্যে একটা টুইট ইমোজি-মাখা থাকবে। বছর তিনেক পরে হয়তো তিনটের মধ্যে একটা। ২০২৬-২৭ সাল নাগাদ টুইটে অক্ষর বলে আর অন্য কিছু থাকবে না। হাসি-কান্না-ফ্যাক্ট-রাগ সবই হয়তো আদানপ্রদান করা হবে ইমোজির মাধ্যমে।

ব্রোনির তথ্য বলছে, মাইক্রোব্লগিং প্ল্যাটফর্ম টুইটারে যে ইমোজিটি ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা আসলে আনন্দাশ্রু। ফেস উইথ টিয়ার্স অফ জয়। আহ্লাদি মুখের দুচোখ দিয়ে উথলে উঠছে বারিধারা। দুনম্বরে আছে হাউহাউ করে কেঁদে চলা মুখ। লাউডলি ক্রাইং ফেস। ধকধক করনে লগা হার্ট চিহ্ন আছে চার নম্বরে। ‘আপনি ভালো থাকবেন’ বললেই উত্তরে যে হাত জোড় করা প্রণামের চিহ্ন দেখতে পাই আজকাল, সেই ‘ফোল্ডেড হ্যান্ডস’ ইমোজি ব্যবহারের নিরিখে ২০২০ সালে ছিল অষ্টম স্থানে।

এ হল টুইটারের বাইনারি ডেটার হিসেবনিকেশ। হোয়্যাটসঅ্যাপের ট্রেন্ডও মোটামুটি একই কথা বলে। অর্থাৎ ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টোচ্ছে যত, অক্ষরের জলাভূমি ভরাট করে তাতে গড়ে উঠছে ইমোজির পোক্ত বাড়ি। আমাদের ডিজিটাল জীবনের সুখদুঃখ নিয়ে যাঁরা চর্চা করেন, তাঁরা এই ইমোজির নাম দিয়েছেন ‘রিলেশনশিপ মেনটেনেন্স টুল’। অক্ষরের থেকে হয়তো ইমোজিতে মনের ভাব প্রকাশ করা যাচ্ছে অনেক দ্রুত। তবে মন খারাপ করা তথ্য হল, সেই ইমোজিমাখা মনের ভাবে অধিকাংশ সময়ই মিশে থাকছে প্লাস্টিক। যা আমাদের অক্ষরে বলতে ইচ্ছে করে না, সত্যি কথা বলতে মন সায় দেয় না, তখন ইমোজিই হয়ে উঠতে পারে এক ম্যাজিক অস্ত্র। যে আনন্দ-বার্তা পড়ে আমাদের হাসতে ইচ্ছে করে না একটুও, তখন ‘আপনার মেসেজটি পেয়ে খুব আনন্দ পেলাম’ না লিখে যদি আহ্লাদি মুখের একটা ইমোজি পাঠিয়ে দেওয়া যায় চোখের পলকে, সত্যি কথা বলতে কি, তাতে আমাদের কাজ কমে। অনেকে মনে করেন, অধিকাংশ ইমোজিরই অন্তরমহলের সঙ্গে আমাদের মনের অন্দরমহলের মিল নেই কোনও।

অক্ষরের বার্তায় যতটুকু আবেগ মিশিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন থাকত, এই ইমোজি দুনিয়ায় তা কি আবেগসম্পৃক্ত হয়ে উঠছে ক্রমশ? দু লাইনের ছোট্ট এক হাসির কথা যদি সেকেন্ড খানেকের মিচকি হাসি দাবি করে, প্রেরককে উত্তর দেওয়ার সময় তাতে ফুটে উঠছে আনন্দাশ্রুর ইমোজি। মানে হাসতে হাসতে চোখে জল। যাঁকে অক্ষরে প্রণাম জানাতে ইচ্ছে করেনি কোনওদিন, ইমোজিচিহ্নে মুড়িমুড়কির মতো তাঁকে কিংবা তাঁদের উদ্দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছি প্রণামের ইমোজি। ফোল্ডেড হ্যান্ডস। এই ট্রেন্ড চলছে বিশ্বজুড়ে। কোনও শোকসংবাদ পেলে বাস্তবে চোখ থেকে এক বিন্দু জল না বেরোলেও ডিজিটাল খাতায় ভরিয়ে দিচ্ছি দু চোখ দিয়ে নায়াগ্রার নিঃসরণ। সমাজের শিক্ষা অনুযায়ী, এমন দুটি মুখ মানে দ্বিগুণ কান্না।

ইমোজির বিশ্বজয়ে ঢাক পেটান যাঁরা, তাঁরা অবশ্য বলছেন জেটগতির যুগের নয়া ভাষা হবে এমনই। ভাষা বিপর্যয়ের সম্ভাবনা নিয়ে তাঁদের দুশ্চিন্তা নেই। ইমোজিপ্রেমীরা মনে করছেন, অক্ষরমালার সঙ্গে সমান্তরাল পথে পাড়ি দেবে ইমোজিলিপি। এই দুই লিপির মধ্যে কোনও বিরোধের কথা তাঁরা মানতে নারাজ। সাবেকি অক্ষররসিকদের ভয়ের জায়গা এটাই। তাঁদের ক্রমশ ঘন হয়ে আসা ভ্রূকুটি বলে, প্রতিটা ইমোজির জন্মের সঙ্গেই প্রমাদ গোনে বেশ কিছু শব্দ কিংবা শব্দবন্ধ। ভাষা হতে পারে স্থানীয় কিংবা আন্তর্জাতিক, যা খুশি। প্রতিটা বছরই পুরনো হয়ে যাওয়ার আগে তার ঝুলিতে পুরে ফেলে সেই বছরের সঞ্চিত ইমোজিরাশি। সামান্য কিছু ভাঁড়ার নিয়ে রাস্তা চলা শুরু করেছিল যে কয়েকটি ইমোজি, আশা করা যাচ্ছে, ২০২২ সালের মধ্যে তার সংখ্যা ৩৪০০ পেরোবে। নতুন ইমোজির জন্মের সংখ্যার হিসেব রাখা হয়। আর অব্যবহৃত অব্যবহৃত অব্যবহৃত হতে হতে একলা হয়ে যাওয়া, কিংবা মরে যাওয়া শব্দরা হয়তো নিহত গোলাপকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায়। এই নিঠুর দুনিয়ায় দুজনের কেউই বুঝি বিচার পেল না!

আর মাত্র কয়েকটা দিন। মোবাইল খুলে দেখব, তাতে কিলবিল করছে হাজারে হাজারে ইমোজি। পতঙ্গের মতো একটার গায়ে লেপ্টে থাকবে অন্যটা। আমাদের মনের গভীরে হীরাপান্নার মতো হাসি-কান্না দুলবে। প্রিয় শব্দ কিংবা কবিতার কোনও প্রিয় লাইন নয়, ইমোজির সঙ্গেই মেলাতে বাধ্য হব আমাদের ওয়েভলেংথ। ইহাই ভবিতব্য।

পুঁটু নাচে কোনখানে, ইমোজিদলের মাঝখানে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...