টোকিও অলিম্পিক— ভারতীয় ক্রীড়া ইতিহাসের এক জরুরি অধ্যায়: একটি বিশ্লেষণ

অম্লান চক্রবর্ত্তী

 



তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী, ভ্রমণবিলাসী, ক্রীড়াপ্রেমী, আলোকচিত্রী

 

 

 

অলিম্পিক গেমস শেষ হয়েছে দিন সাতেক হল। তবে হ্যাংওভার এখনও কাটেনি। আশাতীত সাফল্য এবং ক্রিকেট বাদে অন্যান্য খেলাগুলির দিকেও এই বিশাল জনজাতির নজর ঘুরিয়ে দিল এইবারের অলিম্পিক গেমস। শুধু তাই নয়, সামনে রেখে গেল এক স্বপ্নরঙিন উজ্জ্বল দিন।

আসলে বিগত কয়েক বছর ধরেই ‘খেলো ইন্ডিয়া খেলো’ এবং ‘টার্গেট অলিম্পিক পোডিয়াম স্কিং’ বা টিওপিএস-এর মাধ্যমে ভারতের খেলাধুলোর সামগ্রিক মান উন্নত হয়েছে। স্কাউটিংয়ের মাধ্যমে প্রতিভার সন্ধান, তার লালনপালন এবং পরিকাঠামোগত উন্নতির কারণে অলিম্পিক এবং প্যারালিম্পিকের বহু খেলায় ভারতীয়রা বর্তমানে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। ফলে গঠিত হয়েছে জেতার মানসিকতা। এর ফল দেখা গেছে সদ্যসমাপ্ত অলিম্পিক গেমসে।

২০২১ সালের টোকিও অলিম্পিক নিয়ে আলোচনা শুরু করার আগে ফ্ল্যাশব্যাকে সামার অলিম্পিকসের ইতিহাসে ভারতের সাফল্যের দিকে একবার তাকানো যাক। এর আগে ৩১টি সামার অলিম্পিকের ২৭টিতে অংশ নিয়ে ভারতের পদক সংখ্যা ছিল ২৮— ৯টি সোনা, ৭টি রুপো এবং ১২টি ব্রোঞ্জ। একটু জুম করলে দেখা যায়, ৯টি সোনার ৮টিই এসেছে পুরুষদের হকি থেকে এবং এছাড়াও একটি রুপো ও দুটি ব্রোঞ্জও হকি থেকেই এসেছে। এমনকি ১৯০০ সালে ভারতীয় দলের হয়ে খেলা সাহেব নর্ম্যান পিচার্ড-এর ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে রুপো বাদ দিলে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত প্রত্যেকটি পদকই এসেছে হকি থেকে।  শুধুমাত্র ১৯৫২ সালে খাশাবা দাদাসাহেব যাদব ভারোত্তোলনে একটি ব্রোঞ্জ লাভ করেন। ১৯৮০ সালকে একটি পর্যায় ধরার একটি কারণ আছে। পরবর্তী তিনটি অলিম্পিকসে ভারতের ঝুলিতে একটিও পদক আসেনি।

এরপর ১৯৯৬-এর আটলান্টা অলিম্পিকে পুরুষদের টেনিসে লিয়েন্ডার পেজ ব্রোঞ্জ জিতলেও বা ২০০০ সালে সিডনিতে ভারোত্তোলন বিভাগে মহিলাদের ৬৯ কেজিতে কর্ণম মালেশ্বরী ব্রোঞ্জ পেলেও পরবর্তী ৪-৫টি অলিম্পিকসে এই ইভেন্টগুলি থেকে কোনও পদক আসেনি, বা ভারতীয় খেলোয়াড়রা পদক জয়ের দাবীদার এই কথাও জোর দিয়ে বলার সময় আসেনি।

বরং ২০০৪ সালের আথেন্স অলিম্পিকে রাজ্যবর্ধন রাঠোরের রুপো (মেনস শুটিং ডাবল ট্র্যাপ) পরবর্তীকালে ভারতীয় অলিম্পিকের একটি শুভশঙ্খধ্বনি। এর পর থেকেই শুটিংয়ে পদক আসতে পারে এই স্বপ্ন দেখা শুরু হয়। পরেরবার অর্থাৎ ২০০৮ সালে বেজিংয়ে পুরুষদের দশ মিটার এয়ার রাইফেলে সোনা জেতেন অভিনব বিন্দ্রা। বলা চলে, রাজ্যবর্ধন রাঠোর যে ব্যাটন নিয়ে দৌড় শুরু করেছিলেন, সেই নিশান আরও এগিয়ে নিয়ে যান অভিনব বিন্দ্রা। ২০১২য় লন্ডন অলিম্পিকসেও শুটিং থেকে একটি রুপো ও একটি ব্রোঞ্জ আসে। ২০১৬-য় শুটিং থেকে কিছু না এলেও শুটিং একটি আশা-ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে।

অন্য দিকে ২০০৮ থেকে প্রায় প্রতিটি অলিম্পিকেই বক্সিং এবং কুস্তিও হয়ে ওঠে ভারতের পদক জয়ের এক সম্ভাবনার জায়গা। বক্সিংয়ে বিজেন্দর সিং (২০০৮, মিডলওয়েট ৭৫ কেজিতে ব্রোঞ্জ), মেরি কম (২০১২, ফ্লাইওয়েট ব্রোঞ্জ) এবং কুস্তিতে সুশীল কুমার (পুরুষদের ফ্রিস্টাইল ৬৬ কেজিতে ২০০৮ সালে ব্রোঞ্জ এবং ২০১২ সালে রুপো), যোগেশ্বর দত্ত (২০১২, পুরুষদের ৬০ কেজিতে ব্রোঞ্জ) এবং সাক্ষী মালিক (২০১৬, মহিলাদের ৬০ কেজিতে ব্রোঞ্জ) ১৩০ কোটি জন-গণ-মানসে এই দুটি খেলায় অলিম্পিকের পদক জয়ের স্বপ্ন দেখাতে সক্ষম হন।

এর সঙ্গে রিওতে সাইনা নেহওয়ালের ব্রোঞ্জ জয় এবং লন্ডনে পিভি সিন্ধুর রুপো জয় ব্যাডমিন্টনকেও  ভারতের পদক জয়ের একটি সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসাবে তৈরি করেন। এবং এই খেলাটিতে ভারতের বিগত প্রায় ১২-১৩ বছরে সাফল্যের কারণ দ্রোণাচার্য পুলেল্লা গোপীচাঁদের অ্যাকাডেমি।

অতএব ১৯৮০ সালের পর আগে পদকের সম্ভাবনা বলতে ছিল হকি, মাঝের তিন বছরের খরা কাটিয়ে ওঠার পর থেকে ভারত মোটামুটি ২-৪টি পদক অলিম্পিকসে জয় করতে পারে এই ভরসা দিয়েছে শুটিং, কুস্তি, বক্সিং এবং ব্যাডমিন্টন।

২০২১ সালের অলিম্পিকসের শুরুতেও এর বেশি কিছু ভরসা ছিল না। যদিও এই বছর ভারতের দল ছিল অন্যান্যবারের তুলনায় সবচেয়ে বড় দল। ১২৭ জন অ্যাথলিট এই বছর ভারতের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন। পুরুষ ও মহিলা হকিতে ১৮ জন করে খেলোয়াড়, ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে ২৬ জন, শুটিংয়ে ১৫ জন, বক্সিংয়ে ৯ জন, কুস্তিতে ৭ জন, তীরন্দাজি-সেইলিং-গল্ফ-টেবিল টেনিস-ব্যাডমিন্টনে ৪ জন করে, টেনিস-সাঁতারে ৩ জন করে, রোয়িংয়ে ২ জন এবং ভারোত্তোলন-জুডো-জিমন্যাস্টিক্স-ফেন্সিং-ইকুয়েস্ট্রিয়ানে ১ জন করে খেলোয়াড় এই বছরে ভারতের হয়ে পদকের লক্ষ্যে টোকিওর রওনা হন।

সাম্প্রতিক অতীতে দেখা যায়, বিভিন্ন ইভেন্টে ভারতীয়দের মধ্যে এই ১২৭ জনের দলগত/ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স যথেষ্টই ভালো। তবু অলিম্পিকসের পদক জয় বহুক্ষেত্রেই ওই বিশেষ দিনের মনস্তত্ত্ব এবং স্নায়ুর উপর নির্ভর করে। তাই পদক আসা-না আসার একটা দোলাচল সর্বদাই থাকে।

পদকের লড়াই শুরু হল তীরন্দাজি, শুটিং এবং ভারোত্তোলন দিয়ে। তীরন্দাজিতে মিক্সড ইভেন্টে কোয়ার্টার ফাইনালে কোরিয়ার কাছে পরাজিত হলেন দীপিকা কুমারী এবং প্রবীণ যাদবকে নিয়ে গড়া দল। ব্যক্তিগত ইভেন্টেও কোয়ার্টার ফাইনালের চৌকাঠেই আটকে গেলেন ভারতীয় তীরন্দাজরা। আসলে কোরীয় তীরন্দাজরা অনেক ধারাবাহিক ছিলেন এবং মাঠে বায়ুপ্রবাহ এবং তার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াও তীরন্দাজির একটি সমস্যা। জাপানে প্রশান্ত মহাসাগরীয় হাওয়ার সঙ্গে কোরীয়দের পরিচিতি থাকলেও ভারতীয়দের নেই। তাই প্রবল লড়াইয়ের পরেও পরাজয় ঘটে ভারতীয় তীরন্দাজদের। পাঁচটি বিভাগের চারটিতেই সোনা জেতেন কোরীয়রা।

শুটিংয়ের ফল এই বছর বেশ হতাশাজনক। ফাইনালে উঠেও স্নায়ুর চাপে ভোগেন ভারতীয় খেলোয়াড়েরা।

তবে গেমসের দ্বিতীয় দিনেই প্রথম পদক আসে ভারতের ঘরে। ভারোত্তলনে ৪৯ কিলো মহিলা বিভাগে রুপো যেতেন চানু সাইকম মীরাবাঈ। রিও অলিম্পিক্সেও চানুকে নিয়ে আশা ছিল ভারতবাসীর মনে। কিন্তু সেখানে হতাশ করেন তিনি। তাই এবার ছিল তাঁর নিজেকে প্রমাণ করার লড়াই। পূর্বোক্ত টিওপিএস চানুর জন্য ব্যয়বহুল প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। মার্কিন ফিজিও এরোন হর্সচিগকে নিয়োগ করা হয় তাঁর কোচ এবং পরামর্শদাতা হিসাবে। ফলস্বরূপ, ২৪ জুলাই সকাল থেকেই যথেষ্ট পজিটিভ ছিলেন মনিপুরের মেয়ে চানু। ফাইনালে স্ন্যাচিংয়ে প্রথমবার ৮৪ ও পরের বার ৮৭ কিলোর ওজন তুলে দ্বিতীয় স্থানেই ছিলেন। তারপর ক্লিন এন্ড জার্ক রাউন্ডে ১১০ এবং ১১৫ কেজি তোলার পরেই রুপো নিশ্চিত হয়ে যায়।

দ্বিতীয় দিন খাতা খুললেও ভারতের ঝুলিতে পরের পদক আসতে সাতদিন লেগে যায়। ব্যাডমিন্টনে এইবার প্রবল আশা ছিল পিভি সিন্ধুকে নিয়ে। রিওতে ফাইনালে উঠেও পরাজিত হন স্পেনের ক্যারোলিনা মারিনের কাছে। এবার মারিন ছিলেন না, তাই সোনা জয়ের প্রবল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সেমিফাইনালে সিন্ধু ০-২ গেমে হেরে গেলেন চিনা তাইপেইয়ের তাই জু ইংয়ের কাছে। পরদিন অবশ্য চৈনিক প্রতিদ্বন্দ্বী হে বিং জিয়াওকে ২-০ গেমে হারিয়ে ব্রোঞ্জ জিতলেন সিন্ধু।

ইতিমধ্যে অসমের গন্ডগ্রাম বরমুখিয়া থেকে উঠে আসা বক্সার লাভলিনা বৰগোহাঁই মহিলাদের ওয়াল্টারওয়েট বিভাগে সেমিফাইনালে উঠে পদক নিশ্চিত করলেন। লাভলিনার লড়াইটা ছিল কঠিন। তাঁর জন্ম যে গ্রামে, সেখানে খেলার পরিকাঠামো তো দূরের কথা, পাকা রাস্তাও নেই। স্পোর্টস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (সাই)-র একটি আন্তঃস্কুল ট্রায়ালে উঠে আসেন তিনি। দিল্লি ও রাশিয়ায় যথাক্রমে ২০১৮ ও ২০১৯ সালে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জয় করে থাকলেও তাঁর উপর ভরসা তেমন ছিল না। কিন্তু গোটা দেশকে চমকে দিয়ে তিনি সেমিফাইনালে ওঠেন এবং সেখানে হেরে গেলেও তাঁর হাত ধরে ব্রোঞ্জ পদক আসে ভারতে।

জুডো-জিমন্যাস্টিক্স-ফেন্সিং-ইকুয়েস্ট্রিয়ানে প্রথম রাউন্ডের বাধা পেরোতে পারেননি ভারতীয় খেলোয়াড়েরা। পরিকাঠামোগত সমস্যা আছে ভারতে। ‘খেলো ইন্ডিয়া খেলো’ বা টিওপিএস এখনও সবক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।

টেনিসে ব্যর্থতা স্বাভাবিক ছিলই। তা হয়েছেও। টেবিল টেনিসে সুতীর্থা এগোচ্ছিলেন ভালোই, কিন্তু শেষ অবধি হল না।

বরং এইবছর অলিম্পিক গেমস ভারতের হকি দলের জন্য ছিল পুনর্জন্মের মঞ্চ। এই দলটি ছিল ভীষণ সম্ভাবনাময় দল। ২০১৬, ১৮ চ্যাম্পিয়ানস ট্রফিতে রানার্স, ভুবনেশ্বর বিশ্বকাপে একমাত্র খারাপ পারফরম্যান্স – ষষ্ঠ। জাকার্তা এশিয়াডে ব্রোঞ্জ পেয়েছিল এই দল। শুরুতেই নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ২-১ গোলে জিতলেও অস্ট্রেলিয়ার কাছে ১-৭ গোলে হেরে যায় ভারতের পুরুষ দল। কিন্তু পরাজয়ের অপমানকে জেদে পরিণত করে ফিরে আসে পরের ম্যাচগুলিতে। স্পেনকে ৩-০, আর্জেন্টিনাকে ৩-১ এবং জাপানকে ৫-৩ গোলে হারিয়ে গ্রুপের দ্বিতীয় দল হিসাবে কোয়ার্টার ফাইনালে যায় ভারত। প্রতিপক্ষ ব্রিটেনের বিরুদ্ধে শুরুতে এগিয়েও থার্ড কোয়ার্টারে স্লো খেলে গোল খেয়ে যায়। শেষ মুহূর্তের একটি গোল ৪১ বছর পর সেমিফাইনালে তোলে ভারতকে।

সেমিফাইনালে ২-১-এ এগোনোর পরেও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছিল না, কারণ প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম তারুণ্যে ভরা দল। সবুজ বা হলুদ কার্ডের জন্য মাঠে সাময়িক দশজন হয়ে গেলে বিপদ ছিল। এবং যে ভয়টা ছিল, সেটাই হল। বেলজিয়ামের দ্বিতীয় এবং তৃতীয় গোলের সময় ভারত দশজন হয়ে গেল। সঙ্গে পেনাল্টি কর্নার পেয়ে গোল শোধ করে এগিয়ে গেল বেলজিয়াম।

ব্রোঞ্জ মেডেল ম্যাচে জার্মানিকে ৫-৪ গোলে হারিয়ে অবশেষে হকিতে পদক এল।

অন্যদিকে হকিতে মহিলা দলটি গ্রুপের তিন ম্যাচে ১১ গোল খেয়েও বাকি দুই ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছয় এবং সারা হকি বিশ্বকে চমকে দিয়ে প্রবল পরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে দেয়। সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ও ব্রোঞ্জ মেডেল ম্যাচে ব্রিটেনের কাছে হার হয়তো পদক থেকে দূরে সরিয়ে দেয় দলটিকে, কিন্তু উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আলোর সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে ভারতীয় মহিলা হকি দলের থেকে।

হকির এই সাফল্যে বড় অবদান ওড়িশার মূখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়েকের। হকি খেলায় স্পনসর করেছেন। ভুবনেশ্বরে কলিঙ্গ স্টেডিয়ামের পরিকাঠামোও বিশ্বমানের। সেখানে বিশ্বকাপ হকিও আয়োজিত হয়েছে।

আর অবশ্যই দুই কোচ— পুরুষ দলের গ্রাহাম রিড এবং মহিলা দলের সাজোয়াদ মারহীন। ভারতীয়দের চিরাচরিত রিস্টওয়ার্ক আজ পাওয়ার হকির যুগে অচল। রিড এটাই বুঝে বদল এনেছেন ভারতের খেলার ধরনে। আর মারহীন? ৩ ম্যাচে ১১ গোল খাওয়া দলটিকে নিয়ে গ্রুপে ১৩ গোল করা অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর ক্ষমতা যে কোচ রাখেন তিনিই প্রকৃত দ্রোণাচার্য।

গলফ নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। বিশেষত মহিলাদের ব্যক্তিগত বিভাগে অদিতি অশোক এবং দীক্ষা ডাগরের কথা। অদিতি শুরু থেকেই চমৎকার খেলে ফাইনালে পৌঁছন। ফাইনালেও ভালোই এগোচ্ছিলেন। বিশ্বের ২০০ নম্বর হয়েও পদকের আশা দেখাচ্ছিলেন, যদিও শেষ মুহূর্তে অল্পের জন্য পারলেন না।

অপরজন দীক্ষা ডাগর। তিনি মূক ও বধির। ডেফলিম্পিকসে রুপো জিতেছিলেন। পঞ্চাশ নম্বরে শেষ করলেও প্রতিবন্ধকতাকে হারিয়ে জয়ী দীক্ষা। এইখানেই অলিম্পিকসের সার্থকতা।

কুস্তিতে পুরুষদের ৫৭ কেজি বিভাগে রবিকুমার দাহিয়া সেমিফাইনালে ২-৯ পিছিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত একটি অলঙ্ঘ্য প্যাঁচে ফেললেন প্রতিদ্বন্দ্বীকে। হরিয়ানার প্রত্যন্ত গ্রাম দাহিয়া থেকে আগত রবি শক্তিশালী হন গুরু সতপালের কাছে ট্রেনিং নিয়ে। আর চোখের সামনেই পেয়েছিলেন গ্রামের অন্য কুস্তিগির সুশীল কুমারকে। কিন্তু ফাইনালে হেরে গেলেন। তাই শেষমেশ রুপো জয়েই সন্তুষ্ট থাকতে হল ভারতকে।

কুস্তিতে পুরুষদের ৬৫ কেজি বিভাগে ব্রোঞ্জ জিতলেন বজরং পুনিয়া। গেমসের শেষ দিন। হেরে গেলেন দীপক পুনিয়া।

আর এই শেষ দিনেই ছিল ভারতের সবথেকে বড় প্রাপ্তিযোগ। ট্র্যাক এন্ড ফিল্ডে ভারত সোনা তো দূর অস্ত, কোনও পদক ভারত জিততে পারে, এমন ভাবনাও কারও মাথায় ছিল না। ১২১ বছর আগে সে সাহেবের হাত ধরে দুটি পদক এলেও স্বাধীনতার পর কোনও পদকের স্বপ্ন ছেড়েই দিয়েছিল ভারতবাসী। ১৯৬০ সালে রোম অলিম্পিকে মিলখা সিংয়ের ফটোফিনিশে ব্রোঞ্জ মিস বা ১৯৮০ সালে পিটি ঊষার চতুর্থ হওয়া ছাড়া তেমন বড় সাফল্য ছিল না ভারতীয়দের।

আগে ডিসকাস ছোড়ার ফাইনালে উঠেও জিততে পারলেন না কমলপ্রীত কৌর। কিন্তু জ্যাভলিন থ্রোয়ে রেকর্ড দূরত্ব ছুড়ে ফাইনালে উঠলেন নীরজ চোপড়া। ফাইনালে ৮৭.৫৮ মিটার থ্রোয়ের পর আর বর্শার দিকে তাকাননি তিনি। মুষ্টিবদ্ধ হাত উঠে গিয়েছিল আকাশে। জাতীয় সঙ্গীতের আবহে পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে সোনার মেডেল লাভ তখন ছিল আর সময়ের অপেক্ষা।

এই আত্মবিশ্বাসের জন্য প্রয়োজন পরিকাঠামো। এশিয়াড এবং কমনওয়েলথ গেমসে সোনা জয়ী নীরজ কোচ হিসাবে পেয়েছেন সর্বকালের সেরা জ্যাভলিন থ্রোয়ার জার্মানির উই হনকে। সঙ্গে হরিয়ানা সরকারের অত্যাধুনিক ব্যবস্থা তো আছেই। গোটা দেশবাসীর কৃতজ্ঞ থাকা উচিত হরিয়ানা সরকারের কাছে। সরকারের বিনিয়োগ আজ সোনার ফসল ফলিয়েছে।

শেষ লগ্নে একটি ব্রোঞ্জ এবং সোনা জয়ের পর এটিই ভারতের সেরা অলিম্পিক পারফরম্যান্স। ১টি সোনা, ২টি রুপো ও ৪টি ব্রোঞ্জ ভারতকে পদক তালিকায় প্রথম পঞ্চাশটি দেশের মধ্যে হয়তো জায়গা করে দিল। এখন প্রয়োজন আগামীর দিকে হেঁটে যাওয়া।

এই লেখায় বারবার উঠে আসছে ‘খেলো ইন্ডিয়া খেলো’ এবং টিওপিএস-এর মতো প্রোগ্রামের কথা। আসলে ১৩০ কোটির দেশে ট্যালেন্ট হান্টিং এবং তারপর তার পরিচর্যা করা প্রায় অসম্ভব। চূড়ান্ত অব্যবস্থার মধ্যে থেকেও এই দুটি প্রোগ্রাম অন্তত একটি মঞ্চ তৈরি করে দিচ্ছে খেলোয়াড়দের জন্য।

২০২১ সালের অলিম্পিক কাগজে কলমে শেষ। কিন্তু হয়তো এটি একটি শুরুও। ভবিষ্যৎ এর প্রমাণ দেবে। আশা কিন্তু করাই যায়…

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...