জনগণনা, দলিত জনগণ এবং হিন্দু রাষ্ট্রের লক্ষ্যে নির্বাচন

অরবিন্দু দাশগুপ্ত

 



অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী

 

 

 

এই বছরটা দেশের জনগনার বছর। যদিও সরকার এখনও পর্যন্ত ঠিক করতে পারেনি দেশের জনগণনা করবে কি করবে না। কিছুদিন আগে স্বরাষ্ট্র দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী নিত্যানন্দ রাই জানিয়েছিলেন তপশিলি জাতি (SC) এবং তপশিলি উপজাতি (ST) ছাড়া অন্য কোনও নিচু জাতের জনগণনা হবে না। অর্থাৎ ওবিসি অন্তর্ভুক্ত জনগণের কোনও জনগণনা হবে না। এদিকে নীতীশ কুমার, যিনি রাজনীতিতে কুর্মি নেতা নামে পরিচিত এবং জিতেন মাঝি, দলিত সম্প্রদায়ের নেতা নামে পরিচিত, উভয়েই সরকারের এবারের জনগণনায় জাতপাতের সমস্ত বিভাগের পরিচয় দিয়ে নাম নথিভুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন।

এবারের জনগণনা বিজেপি ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ভারতীয় সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়ে আছে জাতপাতের পরিকাঠামো। যদিও দেশের স্বাধীনতার পূর্বে কিংবা পরে কোনও সরকারই দেশের জনগণনায় তাদের স্বীকৃতি দেয়নি, তবুও নিচু জাত কিংবা ওবিসি-কে বাদ দিয়ে কোনও রাজনৈতিক পার্টি নির্বাচন ভাবতে পারে না। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ১৯৫১-২০১১ পর্যন্ত যে কয়টি জনগণনা হয়েছিল সেখানে এসসি ও এসটি বাদ দিয়ে অন্য কোনও জাতের সামাজিক অস্তিত্ব স্বীকার করা হয়নি। ১৯৪১ সালে জনগণনায় এদেশে প্রথম সমস্ত মানুষকে তাদের জাত ধর্ম পরিচয়ের ভিত্তিতে জনগণনা হয়েছিল। দুঃখের বিষয় হল ইংরেজ শাসকেরা দলিত ও নিম্নবর্ণের মানুষদের ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজিত করল। ফলে বেশিরভাগ নিচু জাতের মানুষ হিন্দু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল।

আগামী ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে দলিতের স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে জনগণনায় জাতের রাজনীতির জায়গা থেকে গুরুত্বপুর্ণ। একটু পিছনের দিকে তাকালে কিছু কিছু বিষয় সবার মনে পড়বে। যেমন ধরুন ১৯৮৭ সালে রাজীব গান্ধি মন্ত্রীসভার দু নম্বর নেতা ভি পি সিং মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। কারণটা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক নয় বলে সেই চর্চা করছি না। ১৯৮৮ সালে জাত-জাতি নিয়ে মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের মধ্য দিয়ে এদেশে রাজনীতিতে দলিত অভ্যুত্থান ঘটে। ১৯৮৯ সালে মণ্ডল কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে ওই দলিতদের নিয়ে জনতা দল তৈরি করেন ভি পি সিং। প্রসঙ্গক্রমে বলা ভালো ১৯৭৭ জনতা পার্টি গঠনের সময় বিভিন্ন জাতের পার্টি ছিল। এবং ১৯৮৯ লোকসভা নির্বাচনে দু বছরের জন্য প্রধানমন্ত্রীর গদিতে বসেন ভি পি সিং। মণ্ডল কমিশনের মধ্য দিয়ে দলিতরা রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব লাভ করে। সে সময় গণনায় দেখা গেল এদেশে জনগণের ৪৯.৫ শতাংশ— পরবর্তীকালে ৫২ শতাংশ হলেন দলিত সম্প্রদায়ের মানুষ। এ বছরের ১ এপ্রিল জাতীয় সাংবিধানিক সভায় ওবিসি বা দলিতদের জনগণনার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানান হয়। সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া হয় দলিতদের নিয়ে কোনও রূপ জনগণনা সম্ভব নয়, কারণ স্বাধীনতার পর থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক এসসি, এসটি বাদে অন্য কোনও নিচু জাতের গণনা করা হবে না। রেজিস্টার জেনারেল অব ইন্ডিয়া গত ৩১ আগস্ট ২০১৮ জানিয়ে দিয়েছিল ওবিসিদের কোনও পরিসংখ্যান সরকার রাখে না। অপরদিকে ইউপিএ আমলে সরকারের তরফে লোকসভায় জানানো হয়েছিল ওবিসিদের একটি কেন্দ্রীয় তালিকা আছে কিন্তু তাতে ওবিসিদের উপবর্গ (Sub set), চূড়ান্ত পিছিয়ে থাকা (most Backward) মানুষজনের পরিচয় স্পষ্টভাবে ছিল না। সেই জন্য ইউপিএ আমলে শেষের দিকে ঠিক হয়েছিল দলিতদের আর্থ সামাজিক ভিত্তিতে জনগণনা করা হবে। কিন্তু তার হদিশ কেউ কখনও পায়নি।

বিষয়টি যে ধীরে ধীরে পাকিয়ে উঠছে তা বেশ বোঝা যাচ্ছে। বর্তমান সরকারের এ ব্যপারে ভাবনা জানতে হলে সঙ্ঘ পরিবারের দিকে আগে তাকাতে হবে। তারাই বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের দিশা ঠিক করে দেয়। ২৪ মে ২০১০ তৎকালীন সঙ্ঘপ্রধান সুরেশ ভাইয়াজি ওবিসি প্রসঙ্গে তাঁর মত জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন “আমরা জনগণনায় বিভিন্ন বর্গের উল্লেখের বিরোধী নই, তবে জাত হিসেবে তার অস্তিত্বকে পরিসংখ্যানে লিপিবদ্ধ করার বিরোধী।” অর্থাৎ আরএসএসের দিশা হল দলিত হিসেবে তার অস্তিত্বকে অস্বীকার করা। গত ২০১৯ লোকসভা নির্বাচনে একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ওবিসিদের ওপরের অংশ অর্থাৎ স্বচ্ছল অংশের ৩০ শতাংশ ভোট বিজেপির পক্ষে গিয়েছিল এবং নিচের অংশের ৪২ শতাংশ ভোট বিজেপি পেয়েছিল। ওবিসির ভোট হিন্দি বলয়ে বিজেপির দিকে ঝোঁকার ফলে লোকসভায় সামগ্রিকভাবে ভোট ৬ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছিল বিজেপি। দলিতরা জনগণনায় স্বতন্ত্রভাবে স্বীকৃতি যদি পায় তবে মহান হিন্দুত্বের পরিসংখ্যানে ভাঙন ধরবে, যেটা বিজেপি কখনওই চাইবে না। তাই সরকারের তরফ থেকে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে জনগণনায় নীতিগতভাবে তপশিলি জাতি এবং তপশিলি উপজাতি ভিন্ন অন্য কোনও জাতের জনগণনা হবে না। খোদ উত্তরপ্রদেশে ওবিসি জনসংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ। আগামী বছর উত্তরপ্রদেশে বিধানসভা নির্বাচন হবে। আগামী ২০২৪ লোকসভা নির্বাচনের পরিপ্রেক্ষিতে বিজেপির ও সঙ্ঘ পরিবারের কাছে এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। তাই ওবিসিদের নানা ধরনের উৎসাহ ও সুযোগ দিতে কেন্দ্রীয় সরকার বদ্ধপরিকর। এমনকি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভায় ওবিসি মন্ত্রীর সংখ্যা ২৭ জন! এই পরিসংখ্যানগুলি থেকে একটি বিষয় পরিষ্কার বোঝা যায় দলিতরা জনগণনায় আলাদাভাবে স্বীকৃত হোক বা না হোক দলিতদের এই রাষ্ট্র উপেক্ষা করতে পারছে না। ২০১৫ সালে হায়দ্রাবাদ ইউনিভারসিটি-ছাত্র রোহিত ভেমুলার আত্মহত্যা যেভাবে দেশ জুড়ে ছাত্রসমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছিল তাতে বিজেপি কংগ্রেস সহ নানা উচ্চবর্ণের প্রতিনিধিত্বকারী পার্টি রীতিমত আস্বস্তিতে পড়েছিল। সাম্প্রতিক কালে পুনায় এলগার পরিষদের আন্দোলন আদতে দলিতদের অস্তিত্বের আন্দোলন। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বেশ কিছু আন্দোলনের সাথী জেলে আটক। গত শতাব্দীতে বাবাসাহেব আম্বেদকার উচ্চবর্ণের বিরুদ্ধে দলিতদের সংগঠিত করার নিরলস প্রচেষ্টা করে গেছেন। দেশে চাকরি থাকুক বা না থাকুক, শিক্ষা গ্রহণ করার পারিবারিক আর্থিক স্বচ্ছলতা থাকুক বা না থাকুক, ওবিসিদের সংরক্ষণ বেড়েই চলেছে। যাদের সরকার স্বীকৃতি দিতে চায় না তাদের জন্য সংরক্ষণ কেন? উত্তরপ্রদেশে দলিতদের ওপর নির্বিচারে নির্যাতন, খুন, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, বিনা বিচারে আটক সবই চলছে। তোমাদের মারব পিটব এমনকি তোমাদের মেয়েদের ধর্ষণ করব, মাঠে মেরে ফেলে দিয়ে আসব, তবে রাষ্ট্র/সমাজে থাকতে হলে ভোটটা আমাদেরই দিতে হবে। এইসব সত্যের ওপরে বড় সত্যটি হল অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে নিচুজাতের জাগরণ প্রাচীন যুগ থেকে চলেছে। বুদ্ধই প্রথম অস্পৃশ্যতা-বিরোধী লড়াই শুরু করেন। এই লড়াইকে আটকানোর সাধ্য সঙ্ঘ ও সরকার কারও নেই। ভারতীয় সমাজে একটি উন্নত গণতন্ত্রই অস্পৃশ্যতাকে দূর করতে পারে। যেখানে মানুষে মানুষে বিভেদের সমস্ত সামাজিক কলঙ্ক মুছে যাবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3604 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...