অ্যাবসার্ড নাটকের প্রাসঙ্গিকতা ও আয়নেস্কো-র লেখা একটি নাটকের প্রযোজনা

কুন্তল মুখোপাধ্যায়

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আমাদের সমাজ আর তার আগের সমাজ একেবারেই যে আলাদা, সে আর আলাদা করে বলে দেওয়ার দরকার থাকে না। আগ্রহীরা একথা সবাই জানেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাত সমাজে যে বিপুল হতাশা আর ভারহীনতার সৃষ্টি করেছিল, নাগরিক কৃত্রিমতার আর ব্যক্তিমানুষের বিচ্ছিন্নতার, যেখান থেকে আয়োনেস্কো-র ও পরে বেকেটের জন্ম হয়।

সামাজিক ইতিহাসের পাঠকমাত্রই জানেন এলবেয়ার কামুর আউটসাইডার-এর সেই পৃথিবীখ্যাত প্রারম্ভিক লাইন— মাই মাদার ডায়েড টুডে, অর মে বি ইয়েসটারডে, আই ডোন্ট হোয়েন। এই বাক্য কি এক ধরনের মানসিকতারই ফসল নয়? এও যে আসলে এক যুগচরিত্রের ফসল, এ কি অস্বীকার করা যাবে কখনও? বেকেট আমাদের জানাচ্ছেন তাঁর অ্যাবসার্ডিটি শুরু হয় একটি অ্যাপার্টমেন্ট দেখে! সেখানে যেসব মানুষ থাকেন, তাঁরা কেউ একে অপরকে চেনেন না, শুধু তাঁদের চাবি রাখা থাকে এক পাহারাদারের কাছে। অর্থাৎ সেই পাহারাদারের কাছে এক-একটা পরিবার শুধু একটা চাবি! আমাদের জীবন-জীবিকা-বেঁচে-থাকা যদি এইভাবে এক ফুৎকারে একটি ছোট্ট চাবিতে এসে দাঁড়ায়, তাহলে মনের ভিতরে এইরকম ভারহীনতার সৃষ্টি হয়। তবে এই হতাশা আর ভারহীনতা ছিল একেবারে পশ্চিমি চরিত্রের, ফলে এর ভারতীয় উৎস বা চরিত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া ছিল না, এই সময় হাতে আসে শীর্ষেন্দু মুখোপাধায়ের উপন্যাস ‘ঘুণপোকা’। এই উপন্যাস পড়ে প্রায় নিশ্চিত হওয়া যায় ইউরোপীয় এই সমাজহতাশা আর অ্যাবসার্ডিটি একই সঙ্গে ভারতের ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক, কারণ আমাদের দেশ ইউরোপের মতো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও একেবারে প্রভাবমুক্ত ছিল না, এই যুদ্ধের গভীর প্রভাব চাড়িয়ে গেছে আমাদের সমাজে। ফলে এই অ্যাবসার্ডিটির উত্তরাধিকার আজও বহন করছি আমরা আজও। একই কারণে সদ্য বুকার পাওয়া লেখক শেহান করুনাতিলকা একটি সাক্ষাৎকারে আমাদের জানাচ্ছেন—

Everyday when you scan the news, there are these absurd headlines. You can either be really depressed or make a joke about it. I think it’s the Sri Lankan character to do the latter. (The Times of India, Oct 23, 2022)

এখন, যা শ্রীলঙ্কার পক্ষে সত্যি, তা কি ভারতের পক্ষেও মিথ্যা হতে পারে? কারণ ওই একই সাক্ষাৎকারে সমস্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার লেখকদের স্বাধীনতা নিয়েই কথা বলছেন। কাজেই তিনি নিশ্চয় বিষয়টি আর দেশজ বলে পৃথক করছেন না। যে অ্যাবসার্ডিটি শ্রীলঙ্কার, তা কি করে আমাদেরও না হয়ে থাকতে পারে! আমরাও যেহেতু খুব শান্তি আর সুখে বসবাস করছি না আমাদের দেশে, শিক্ষার গভীর বিপর্যয়, অর্থের ক্রম-সম্প্রসারণ, কর্মহীনতা, রাজনৈতিক দিশাহীনতা আমাদের ক্রমশ হতাশ করে চলেছে। এ দেশে যেভাবে গণতন্ত্র মাফিয়া-অধ্যুষিত হয়ে চলেছে, তাতে সাধারণ সংবেদনশীল মানুষের প্রতিক্রিয়া হবেই। আর এর কঠিনতম প্রতিক্রিয়ার পরেও পরিস্থিতি যদি আরও অন্ধকার দিকে যেতে থাকে, তবে যেকোনও র‍্যাশনাল একে কাউন্টার করবেন অদ্ভুত এক অন্ধকার হাসি নিয়ে। যার কথা বলেছেন শেহান করুনাতিলকা। ফলে আয়োনেস্কো-র নাটক আজ আমাদের এই নিড অব দ্য আওয়ার। সময়ের সবচেয়ে জরুরি চিৎকার।

এমন সময়ে এক গভীর অন্ধকার হাসি নিয়ে কেউ যখন হেসে ওঠেন এবং যে হাসি বস্তুত কোথাও নিয়ে যায় না আমাদের, তখন তাকে নিয়ে ভাবতে হয় আমাদের। যে হাসি ক্রমশ কাউকেই দোষারোপ করে না, যে হাসি উদ্দেশ্যহীন, যে হাসি আমাদের শূন্যতাকে প্রতিষ্ঠা করে, যে হাসি আমাদের ‘শূন্যের উপরে ঘর’ বেঁধে দেয়, সে হাসি যিনি হাসেন তিনি নিজেকেও আসলে বিদ্ধ করতে চান। এই পরিস্থিতি আমাদের মনে করায় সুনীল কথিত কমলকুমারের সেই অন্ধকার রসিকতা। নিজের বিচ্ছিন্নতা বোঝাতে কমলকুমার বলেছিলেন, “আমার বই সতেরোজন কিনে নিয়ে আঠেরোজন ফেরত দিয়ে গেছে।” আসলে কমলকুমার এইভাবে কিছু বোঝাতে চাইলেন? সে তো নিশ্চয় চাইলেন, আর তা পাঠককে বোঝানো বাহুল্য। কারণ এই লেখার উদ্দেশ্য ভাব সম্প্রসারণ বা বিএ ক্লাসের নোট তৈরি নয়, যে কথাটি বোঝাতে চাই সেটা হল এই অ্যাবসার্ডিটি দিয়ে কিছু বলতে চান নাট্যকার। আর সেজন্যেই বৃহন্নলা নর্তকী নাটকে, যা আয়োনেস্কো-র অনুবাদ, প্রথমে আমরা সাইরেন শুনতে পাই। তা আমাদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা মনে পড়িয়ে দিলেও সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কথাও কি ভাবিয়ে দেয় না? আমাদের মনে পড়বে কোনও আন্তর্জাতিক রসায়নের জন্যে উদ্ভূত পরিস্থিতির বলিদান হতে হয় শ্রীলঙ্কার মতো দেশের সাধারণদের! এবং নাটকটি যে শুরু হয় একটি ঘর থেকে, সেই ঘর তো আসলে রাষ্ট্রের একটি ক্ষুদ্রতম একক! এবং সেই ঘরের সদস্যদের সঙ্গে যোগ দেন আরও এক বাড়ির সদস্যেরা এবং সবাই আক্রান্ত হয়েছেন দেখা যায় অ্যাবসার্ডিটিতে। এক বক্তব্যের সঙ্গে অন্য বক্তব্যের কোনও মিল নিয়ে। কারণ যুক্তি বা প্রতিযুক্তিকেই এখানে ভেঙে দিতে চাইবেন নাট্যকার। এইভাবে এই অদ্ভুত নাটকটি এগোতে থাকে। আর তৈরি হয় অহৈতুকী হাসির হুল্লোড় দর্শক যার কোনও অর্থ নেই! নাটকটি ক্রমশ অযৌক্তিক পথে এগোতে এগোতে দর্শককে নিয়ে যায় এমন একটা জায়গায় যেখানে সে যুগপৎ একঘেয়েমির শিকার আর এন্টারন্টেইনড হতে থাকে। The bold Soprano নাটকটি ক্রমশ শূন্যের ভিতরে গড়ে তোলে তার নিজস্ব ঘর, আর দর্শকেরা হাওয়ায় ঘর বানাতে থাকেন। মূলত হাওয়া দিয়ে এই ঘর আসলে আমাদের আমাদের কোথাও নিয়ে যায় না, কিন্তু হাসির উৎসার থেকে সে আমাদের উপর্যুপরি হতাশার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে শেখায়। নাট্য-পরিচালক বাবুন চক্রবর্তী কেবল আমাদের, এইভাবে, ভাবিয়ে তোলেন। চরিত্র চিত্রণে, আলো সংস্থাপনে, সঙ্গীত নির্বাচনে এক অনন্য প্রযোজনার উদাহরণ হয়ে থাকে। তবে আরও কিছু বলার বাকি থেকে যায়।

পাপিয়া বর্মণের যে শরীরী ভাষা ও সংলাপ সংস্থাপনে দক্ষতা, তা এই নাটকটির অসামান্য সম্পদ। কাজটি কিন্তু খুব সহজ ছিল না। অথচ কী অনায়াস দক্ষতায় তিনি ইউরোপীয় চরিত্রকে অনুবাদ করে ফেলতে পারলেন একটি বাঙালি গৃহবধূতে। অন্যদিকে পরিচালক নিজে নাটকটির খুব জরুরি মুহূর্তে প্রবেশ করলেন স্বাস্থ্যকর্মীর চরিত্রে। অতনু বর্মণ ও কাকলি দাস এমন এক দম্পতির অসামান্য অভিনয় করে গেলেন যা আমাদের দাম্পত্য নিয়ে নতুন করে ভাবায়! এতদিন একসঙ্গে থাকার পরেও কী আশ্চর্য একে অপরকে ওঁরা চিনতে পারছেন না, কারণ ভদ্রমহিলা কেবলই ভুলে যান আর এই প্রসঙ্গে যেকোনও সম্পর্কে বিচ্ছিন্নতার কথা আমাদের মনে পড়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীটির গল্পগুলির কথা আমাদের মনে পড়ে যাওয়া অসম্ভব কিছু নয়।

একটা সময় পরে মনে হচ্ছিল যেন চোখের সামনে একের পর এক স্বপ্নদৃশ্য অভিনীত হতে দেখছি! আমাদের সংস্কৃতির বারো ভুঁইয়ার রাজ্যে ধরেই নেওয়া হয় শহর কলকাতা ছাড়া কোথাও ভাল কাজ হয় না, সেখানে এই নাটক অভিনীত হলে এতদিন হইহই পড়ে যেত, আধা ইঞ্চি বা পৌনে পাঁচ ইঞ্চি নিউজপেপারওয়ালারা যারা সারাদিন শুধু ঘ্যাষ ঘ্যাষ করে ‘গল্প’ লেখেন, তারা জানারও চেষ্টা করলেন না কী অসাধারণ কাজ হয়ে গেল একটি ম্লান মফস্বল শহরে!

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4063 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...