অশৃঙ্খল প্রভেদন

অশোক মুখোপাধ্যায়

 


অশৃঙ্খল পরিবর্তন-এর ধারণাটিকে বিজ্ঞানের ক্যানভাসে সমাদর করে নিয়ে আসার প্রথম কৃতিত্ব ডারউইনের। তিনিই দেখালেন, প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি ঘটে প্রকৃতির নিজস্ব খেয়ালে, নিজস্ব ধারায়; কারও ইচ্ছা অনিচ্ছায় নয়, কারও নির্দেশে বা পরিকল্পনায় নয়; কোনও পূর্ব-স্থিরীকৃত নিয়মেও নয়। কয়েক বছরের মধ্যেই গ্রেগর মেন্ডেল বংশগতির নিয়মে এই তত্ত্বকেই প্রয়োগ করলেন পুরোপুরি গাণিতিক ছাঁদে। কিছুদিনের মধ্যেই পদার্থবিজ্ঞানেও সে ঢুকে পড়ল প্রথমে ম্যাক্সওয়েল পরে বোলৎস্‌মানের হাত ধরে। আর পাঁচ দশক বাদে সেই সম্ভাব্যতার তত্ত্বই হয়ে উঠল কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের মৌল গাণিতিক স্তম্ভস্বরূপ

 

পূর্ব-প্রসঙ্গ: নশ্বরপন ঈশ্বর

এর আগে আমরা বিবর্তনের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যায় বারংবার অশৃঙ্খল প্রভেদন কথাটা উচ্চারণ করেছি। সেই ব্যাপারটা আসলে কী? জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের হঠাৎ এইদিকে নজর পড়ল কেন? এবং কীভাবে? বিজ্ঞানের চর্চায় এর তাৎপর্যই বা কী? অশৃঙ্খলাই যদি থাকে, এর মধ্যে নিয়ম বাসা বাঁধে কী করে? কার্যকারণ সম্বন্ধই বা এখানে কীভাবে কাজ করে? নাকি, অশৃঙ্খল মানেই “ওরা অকারণে চঞ্চল”?

চলুন, আরও কিছু কথা বুঝে নেওয়া যাক।

এটা ভাল করে বুঝতে হলে আমাদের একটু অঙ্কের বই হাতে নিয়ে শুরু করতে হবে। গণিতের ছাত্ররা জানেন, গণিতে চলরাশি (variable) বলে একটা বস্তু আছে। যে রাশির মান ক্ষণে ক্ষণে পালটে যায় তাকে বলা হয় চলরাশি। যেমন, মানুষের বয়স, ঘড়ির দেখানো সময়, ঝুড়িতে রাখা আলুর ওজন, ইলিশ মাছের সাইজ, ট্যাক্সির মিটার রিডিং, বইয়ের দাম, তাপমাত্রা, স্কুল ছাত্রদের ইতিহাস পরীক্ষায় প্রাপ্ত নম্বর, ইত্যাদি। এই রাশিগুলির মান যে পরিবর্তনশীল, তা আন্দাজ করা নিশ্চয়ই খুব একটা কঠিন নয়।

কিন্তু লক্ষ করে দেখুন, এখানে দুরকম পরিবর্তনশীল রাশির কথা বলা আছে। মানুষের বয়স, ঘড়িতে দেওয়া সময় কিংবা ট্যাক্সির মিটার রিডিং বৃদ্ধির একটা দস্তুর আছে। যেমন তেমন করে বাড়ে না (বা, যেখানে প্রযোজ্য, কমে না)। ২০১৯ সালে যাঁর বয়স ৫৩ ছিল, আপনি নিঃসন্দেহ, এই বছর তাঁর বয়স ৫৭। ট্যাক্সির মিটার (খারাপ না হলে) প্রতি ২০০ মিটার অন্তর একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা বাড়ছে বলে দেখায়। কিন্তু সবজিওয়ালার ঝুড়িতে যে নতুন আলু দেখছেন, যদি সেগুলি একটা একটা করে হাতে নেন, তাদের প্রত্যেকটার ওজন আলাদা আলাদা রকম হবে। আকার দেখে আপনি ওজনের একটা আন্দাজ হয়তো পেতে পারেন, কিন্তু সেটা বেশ কঠিন কাজ। এই কাঠিন্য আপনি সহজেই বুঝবেন, যখন খেয়াল করবেন, সবজিওয়ালা দু-কেজি আলু দিতে গিয়ে ওজন মেলাতে শেষের দিকে তিন-চারটে আলু তুলে তুলে দেখছেন, কোনটাতে দু-কেজির থেকে বাড়তি সবচাইতে কম হয়।

বাজারে গিয়ে টম্যাটো কিংবা চিংড়ি কেনার সময় ওজন নেওয়ার বেলায়ও এই একই ব্যাপার দেখা যাবে।

এই দ্বিতীয় ধরনের রাশিগুলিকে গণিতের ভাষায় বলা হয়ে থাকে অশৃঙ্খল চলরাশি (random variable)। এখানে রাশিগুলির মান পরিবর্তনশীল হলেও আমাদের জানা কোনও পূর্বস্থিরীকৃত গাণিতিক নিয়মের অন্তর্গত হয়ে নির্ধারিত হচ্ছে না। অন্তত হাতে হাতে সেরকম কোনো নিয়মের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না।

অশৃঙ্খল মানে কি হ-য-ব-র-ল? এলোমেলো? এলোপাথারি? যা-খুশি-তাই? উল্টোপাল্টা? বিশৃঙ্খল? উচ্ছৃঙ্খল? নিয়মহীন? লাগাম ছাড়া?

না। এরকম কোনওটাই এর পারিভাষিক অর্থ নয়।

এর অর্থ অনেকটা ছাঁচহীন, অপরিকল্পিত, অনির্ধারিত, অবিজ্ঞাত, ইত্যাকার।

লুডোর ছক্কার দানের কথাই ভাবুন। একবার দান দিলে যদি দুই পেয়ে থাকেন, পরেরবার তিন বা চার পাবেন— এরকম বলা যায় না। আবার এক থেকে ছয়ের মধ্যেই তো থাকবে— তার বাইরে পনেরো বা সাতাশ তো আর হবে না। ঝুড়ির সেই আলুগুলো ৩৭ গ্রাম বা ৫৪ গ্রাম হতে পারে, তা বলে একটা আলুর ওজন তো আর দেড় কিলোগ্রাম হবে না! চলরাশির এই বৈশিষ্ট্যটা নতুন, অতএব এর জন্য একটা নতুন পরিভাষাও লাগবে। সেই হিসাবে ইংরেজিতে random; আর বাংলায় আমরা বলছি অশৃঙ্খল।

কিন্তু তা সত্ত্বেও অশৃঙ্খল রাশিগুলির বিভিন্ন মান এক অন্য ধরনের নিয়ম মেনে চলে। তাকে বলা হয় বৃহৎ সংখ্যার নিয়ম (law of large number) কিংবা সম্ভাব্যতার নিয়ম (law of probability)। তারও গাণিতিক প্রকাশ আছে। তবে অন্যরকম। সেও এক ধরনের জবরদস্ত অঙ্ক। ডানদিক-বাঁদিক সহ সমীকরণ টাইপ। সেও বেশ কঠোর নিয়ম। সেই নিয়মের ভেতরেই কার্যকারণ নিঃশব্দে ঢুকে পড়ে। নিয়ম মানেই তো তাই। কারণ আছে বলেই এক রকম ঘটনার সম্ভাবনা বেশি হয়, কারণের অভাবেই অন্য কিছু ঘটার সম্ভাবনা কম।

যেমন, কারও রক্তে শর্করার পরিমাণ ১১০ মাইক্রোগ্রাম/মিলিলিটার-এর বেশি হলে এক ধরনের বিপদের সম্ভাবনা আছে। সম্ভাবনা মানেই বিপদ হয়ে গেল, এমন নয়, হতেও পারে। শর্করার পরিমাণ যত বেশি, বিপদের সম্ভাবনাও সেই অনুপাতেই বেশি হতে থাকবে। তিনি যদি জানতে চান কেন, একজন চিকিৎসক তাঁকে সহজেই বুঝিয়ে দিতে পারবেন। তিনি কিন্তু কারণটাই বোঝাবেন। প্রাণ-রাসায়নিক এবং শারীরতাত্ত্বিক কার্যকারণ দিয়েই বোঝাবেন। বিপদটাও বুঝিয়ে দেবেন।

এই যেমন লুডো খেলায় একজন খেলুড়ের ছক্কার দানে কত পড়বে? আগে থেকে কিছুই বলা যাবে না। এক থেকে ছয়— এর মধ্যে যে কোনওটাই পড়তে পারে। তাস হাতে ব্রিজ খেলায় একজন ঠিক কী কী তাস পাবেন আগে থেকে একেবারেই বলা সম্ভব নয়। অথবা, একজন খেলুড়ে নিজের হাতের তাস দেখে পার্টনারের অথবা অন্য দুই খেলুড়ের হাতে কী কী তাস পড়েছে বলতে পারেন না।

এতটা অজ্ঞানতা নিয়ে তাহলে খেলাটা এগোয় কী ভাবে? সম্ভাব্যতার অমোঘ নিয়মে। অনেকবার চাল দিলে কয়েকবার ছয় পাওয়াটা প্রায় নিশ্চিত। কয়েকবার তাস বণ্টন করলে এক-একজনের এক-আধবার টেক্কা বিবি ইত্যাদি পাওয়াও একই রকম নিশ্চিত। এর ফলেই খেলাটা চলতে পারে। যাঁরা এই সম্ভাব্যতার কায়দাটা যত ভাল বোঝেন, তাঁরা তত ভাল খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন।

এই যে একটি চলরাশির বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত ধরনের মান প্রাপ্তির সম্ভাবনা, একেই বলা হয়েছে অশৃঙ্খল পরিবর্তন। এই ধারণাটা ইউরোপের গণিতশাস্ত্রে অন্তত সপ্তদশ শতাব্দ থেকেই ভালমতো চর্চা হয়েছে। এর খাতিরে অনেক উপপাদ্য, অপেক্ষক ও সমীকরণ জন্মগ্রহণ করেছে। কিন্তু গণিতের বাইরে বিজ্ঞানের অন্য কোনও শাখায় বহুদিন পর্যন্ত এর তেমন প্রয়োগ দেখা যায়নি।

এই সম্ভাব্যতার জোরেই অসংখ্য সদস্যের সুদীর্ঘকাল ব্যাপী অশৃঙ্খল পরিবর্তনের মধ্যে দু-একটা সফল বৈচিত্র্য এসে যাওয়ার ঘটনাটা প্রায় স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। তার ভিত্তিতেই প্রাকৃতিক নির্বাচন হতে থাকে। এর ফলেই একদিকে প্রজাতিগুলি ঘন ঘন বদলে যায় না, স্থায়িত্ব নিয়ে টিকে থাকে; অপরদিকে দীর্ঘমেয়াদে বিবর্তনও সম্ভব হয়। প্রাকৃতিক নির্বাচন এই দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়াতেই কাজ করতে থাকে। এই প্রক্রিয়ার ভেতরে দৈব বা ঐশ্বরিক সত্তার যে কোনও প্রয়োজন পড়ে না শুধু তাই নয়, তাকে ঢোকাতে গেলেই বরং বেজায় গোলমাল দেখা দেয়।

বরং এই অশৃঙ্খলার ধারণাই ঐশ্বরিক কারণকার্যবাদের বিরুদ্ধে একটা শক্তিশালী ভ্যাক্সিন হয়ে দাঁড়াল। কীভাবে— আমরা আগেই আলোচনা করে এসেছি। সফল নমুনাগুলি ঈশ্বর ভেবেচিন্তে নকশা করে বানিয়েছেন ভাবলে বেশ যুৎসই হয় ঠিকই, কিন্তু তখন ব্যর্থ বৈচিত্র্যগুলিকেও ঈশ্বরের কারসাজি হিসাবে মেনে নিতে হয়। আর সেরকম বললে বেচারার কোনও ইজ্জত থাকে না। অথচ ঈশ্বর-প্রকল্প ছেড়ে দিয়ে অশৃঙ্খল প্রভেদন বললে সফল এবং ব্যর্থ— দুরকম বৈচিত্র্যেরই সুষম ব্যাখ্যা মেলে। এই যে কদিন আগের সিরিয়া তুরস্কের ভূমিকম্পে কম পক্ষে পনেরো হাজার লোক ঘর বাড়ি চাপা পড়ে মারা গেলেন— একে আপনি কোনওভাবেই ভগবানের লীলা হিসাবে দেখাতে পারবেন না। বা দেখালেও, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের বেঁচে যাওয়া লোকজন মানবে বলে মনে হয় না। এবার, দুটি শিশু আশ্চর্যজনকভাবে বেঁচে গেছে দেখিয়ে যদি কেউ ঈশ্বরের মহানুভবতা দাবি করতে যান, তখন ইঙ্গারসলের সেই অবোধ বালকের মতোই আবার জিজ্ঞেস করতে হবে: ভগবান কি শুধু সেই দুটো শিশুর কথাই ভেবেছে? বাকিদের কথা ভাবেনি? সেটা খুব বাজে দেখাবে। এইসব সময়ে চুপ করে থাকাই শ্রেয়। বড় জোর রামকৃষ্ণের মতো শিশু ভোলানাথ হয়ে বলতে পারেন, ঈশ্বরের কাজকর্ম আমরা আর কতটুকু বুঝি? নাস্তিক ভদ্রলোকেরাও তখন তা নিয়ে তেমন তর্কাতর্কি করতে চাইবে না।

বাস্তবে, সত্যটা হল, উচ্চমাত্রার ভূমিকম্পের কবলে পড়লে ঘরবাড়ির ভাঙা স্তুপে লোকজনের চাপা পড়ে মরে যাওয়ার ঘটনাই স্বাভাবিক; তবু ছাঁচের বাইরে গিয়ে দু-চারজন কোনওক্রমে বেঁচেও যেতে পারেন। ঝড়-ঝঞ্ঝা, বন্যা, ঘুর্ণিঝড়, বজ্রপাত, সুনামি, ইত্যাদির মতোই ভূমিকম্পও একটি অশৃঙ্খল প্রাকৃতিক ঘটনা বলেই এরকম ব্যতিক্রম ঘটে। এর বেশি বলা সম্ভবই নয়। আমরা আমাদের অসুবিধার কথা ভেবে দুর্ঘটনা, দুর্বিপাক, বিপর্যয়, এবম্বিধ নানা শব্দে বর্ণনা দিলেও আসলে এই সবই স্রেফ প্রাকৃতিক ঘটনা মাত্র।

এই অশৃঙ্খল পরিবর্তন-এর ধারণাটিকে বিজ্ঞানের ক্যানভাসে সমাদর করে নিয়ে আসার প্রথম কৃতিত্ব ডারউইনের। তিনিই দেখালেন, প্রাকৃতিক ঘটনাগুলি ঘটে প্রকৃতির নিজস্ব খেয়ালে, নিজস্ব ধারায়; কারও ইচ্ছা অনিচ্ছায় নয়, কারও নির্দেশে বা পরিকল্পনায় নয়; কোনও পূর্ব-স্থিরীকৃত নিয়মেও নয়। তিনি অবশ্য ধারণাটা তুলে আনলেও অঙ্কের ভাষায় তা বলেননি বা বলতে পারেননি। সেই প্রস্তুতি সম্ভবত তাঁর ছিল না। এই ধারণাটা বিজ্ঞানের দরবারে নিয়ে আসার ফলেই সম্ভাব্যতার নিয়ম প্রথম তাস খেলার আসর থেকে বৈজ্ঞানিক নিয়মের জাতে উঠে আসার ছাড়পত্র পেল। এদিকে কয়েক বছরের মধ্যেই গ্রেগর মেন্ডেল বংশগতির নিয়মে সেই তত্ত্বকেই প্রয়োগ করলেন পুরোপুরি গাণিতিক ছাঁদে। কিছুদিনের মধ্যেই পদার্থবিজ্ঞানেও সে ঢুকে পড়ল প্রথমে ম্যাক্সওয়েল পরে বোলৎস্‌মানের হাত ধরে। আর পাঁচ দশক বাদে সেই সম্ভাব্যতার তত্ত্বই হয়ে উঠল কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের মৌল গাণিতিক স্তম্ভস্বরূপ।

 

[আবার আগামী সংখ্যায়]

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4760 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. বিবর্তনের চার স্তম্ভ – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...