থিয়েটারের কলম্বাস হাবিব তনভীরের সঙ্গে মুলাকাতের স্মৃতি

রামচন্দ্র সিং

 


হাবিব সাহেবের সঙ্গে পাঁচ দশকের এই যাত্রায় অন্যতম মাইলফলক হয়ে রইল আমার অভিনেতা থেকে নির্দেশক হয়ে ওঠা। ২০০৯ সালে হাবিব সাহেবের চলে যাওয়া থেকে আমি নয়া থিয়েটারে নির্দেশকের ভূমিকায় আছি। সাহেবের শিক্ষা অনুযায়ী, তাঁর দেখানো পথে এই কঠিন সময়েও আমরা সেটাই করার চেষ্টা করে চলেছি, যার জন্য নয়া থিয়েটারের খ্যাতি। লোকনাট্য

 

লখনৌয়ের ভারতেন্দু নাট্য অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়েই হাবিব তনভীর সাহেবের নাম জানতে পারি। এ-ও জানতে পারি, যে তাঁর রচিত বিশ্বপ্রসিদ্ধ নাটক ‘চরণদাস চোর’ বিশ্ব নাট্য উৎসবে প্রথম পুরস্কার পেয়েছে।

লখনৌয়ের পাট চুকতেই আমি সোজা দিল্লি চলে এলাম, হাবিব সাহেবের কাছে। তখন নতুন নাটক তৈরি করছেন তিনি। প্রায় দু-বছর ধরে পরিশ্রম করছেন। নাটকটি স্তেফান জোয়েগের দ্য আইজ অফ মাই ব্রাদার নামের একটা ছোট গল্পের উপর ভিত্তি করে পূর্ণাঙ্গ নাটকের রূপ দেওয়া হয়েছিল। নাম রাখা হয়েছিল ‘দেখ রহে হ্যায় নয়ন’। সেই নাটকের তখন গান আর স্ক্রিপ্টিং চলছে। ওঁর নাটক লেখার পদ্ধতিটা ছিল এরকম— এক-একটা সিন উর্দুতে লিখে রিহার্সালে নিয়ে আসতেন, তারপর উপস্থিত সমস্ত অভিনেতাদের নিজেই পড়ে শোনাতেন। তারপর চল্লিশ-পঞ্চাশজন অভিনেতাদের সকলকে ধরে ধরে ওই সিন সম্পর্কে তাদের মতামত জানতে চাইতেন।

 

তবে আমি যেবার প্রথম দেখা করলাম, আমার থেকে সেবার কিছুই জানতে চাইলেন না। হয়তো প্রথমবার কাজ করতে গেছিলাম বলেই। যাই হোক, দেখ রহে হ্যায় নয়ন-এর প্রথম সিন পড়ার পর সবার কথা বলতে বলতে বেজে গেল রাত এগারোটা। আমি পৌঁছেছিলাম সন্ধ্যা ছটা নাগাদ। আমায় কিছুই বলতে বলা হচ্ছে না দেখে আমি মনে মনে ভাবছি, এত বড় নামী ডিরেক্টরের কাজকর্ম কী বোরিং! আরও নানান সাত-পাঁচ আজেবাজে ভাবনা মাথায় ঘুরতে শুরু করেছে তখন। এমন সময় ভারী গলার আওয়াজ শুনে চমকে উঠলাম— “আপনি কোথা থেকে আসছেন?” খুব উৎসাহী হয়ে বললাম, “লখনৌ থেকে।” আরও বললাম, “আমি ভারতেন্দু নাট্য অ্যাকাডেমিতে দু-বছরের ট্রেনিং নিয়েছি। তারপর এক বছর ইন্টার্নশিপ করেছি, আর এক বছর অভিনেতা হিসাবে অভিনয়ও করেছি।” নিজের সম্বন্ধে এত কিছু বলে একটা উৎসাহ দেওয়ার মতো উত্তরের আশায় ছিলাম। শুধু চমৎকার খরজদার কণ্ঠস্বরে শুনলাম— “একই সময়ে কাল চলে আসুন।” ব্যস, এই একটা কথা বলেই হাবিব নিজের ব্যাগ নিয়ে সেদিনকার মতো ছুটি ঘোষণা করে চলে গেলেন।

আমার সমস্ত উৎসাহে যেন জল পড়ল। আমি চলে গেলাম মন্ডি হাউসে আমার গুরুমিত্র বিজয় শুক্লার কাছে।

জায়গাটা ছিল বের সরাই। জেএনইউ ক্যাম্পাসের লাগোয়া গ্রামীণ পরিবেশ। এখানেই ডিডিএ ফ্ল্যাটে থাকতেন হাবিব। তাঁরই সঙ্গে, অন্য ফ্ল্যাটে, থাকতেন ছত্তিশগড়ের অন্য শিল্পীরা। ওই বাড়িরই উঠোনে নয়া থিয়েটার বিশ্ববিখ্যাত বহু প্রযোজনার জন্ম হয়েছে, যেমন আগ্রা বাজার, চরণদাস চোর, বাহাদুর কলারিন, হিরমা কি অমর কহানি, সোন সাগর ইত্যাদি।

এবার পালা দেখ রহে হ্যায় নয়ন-এর, যার জন্য আমি লখনৌ থেকে দিল্লি এসেছি। আজ, হাবিব সাহেবের সঙ্গে মোলাকাতের দ্বিতীয় দিনে, সকলে ওই উঠোনে পৌঁছে গেছে সন্ধ্যা ছটায়। হাবিব সাহেব অবশ্য আসবেন একটু দেরিতে। সাতটা-সাড়ে সাতটা নাগাদ। মন্ডি হাউস থেকে বের সরাই পৌঁছতে আমাদেরও সাড়ে সাতটা বেজে গেল। মন্ডি হাউস থেকে গেলাম, কারণ আমি ও আমার লখনৌয়ের আরও তিনজন সতীর্থ বিজয় শুক্লাজির সঙ্গে যেতে চাইছিলাম। শুক্লাজি তখন দিল্লির শ্রীরাম সেন্টার ফর আর্ট অ্যান্ড কালচারের রেপার্টরিতে অভিনয় করেন। ওখানকার কাজ মেটাতে ওঁর ছটা-সাতটা বেজে যেত। সে কারণেই হাবিব সাহেবের রিহার্সালে ছটায় পৌঁছনো আমাদের সম্ভব হল না।

এদিকে একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটল। ওইদিনই হাবিব সাহেব এলেন ছটায়, এবং তার আগের দিনই হাবেভাবে উদাসীনতা দেখালেও আমাদের জন্য অপেক্ষা করে রইলেন ওই সাড়ে সাতটা পর্যন্তই। আমরা পৌঁছতেই নিজের হাতঘড়ির দিকে তাকালেন। আমাদের হয়ে বিজয় শুক্লাজি সাফাই দিলেন— যে ওঁর অপেক্ষাতেই আমাদের দেরি হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।

 

এখানে বিজয় শুক্লাজির কথা একটু বলে না নিলেই নয়। শুক্লাজি হাবিব সাহেবের নির্দেশনায় মাক্সিম গোর্কির এনিমি-র মুখ্য ভূমিকায় এনএসডি রেপার্টরিতে অভিনয় করেছিলেন। তখন উনি, মানে শুক্লাজি, এনএসডি-র বি-গ্রেড আর্টিস্ট। এনিমি-র সাফল্যের পর উনি এ-গ্রেডে পৌঁছন। শুক্লাজির অভিনয় প্রতিভা দেখে হাবিব সাহেব এতটাই প্রভাবিত হন যে এনএসডি-র কন্ট্রাক্ট শেষ হলে শুক্লাজিকে তিনি নয়া থিয়েটারের একজন করে নেন। হাবিব সাহেব বলতেন— বিজয়ের মতন অভিনেতা হিন্দি থিয়েটারে নেই।

তা যাই হোক, শুক্লাজি তো হাবিব সাহেবের কাছে আমাদের হয়ে সাফাই গাইলেন। তারপরেই বললেন— ‘যাও যাও স্যারের পা ছুঁয়ে প্রণাম করো।’ আমরাও সুড়সুড় করে শুক্লাজির কথামতো কাজ করলাম। তারপর রিহার্সালের জন্য বিছিয়ে রাখা মাদুরের এক কোণায় চুপচাপ বসে পড়লাম।

ধীরে ধীরে আমাদের সকলের অডিশন শুরু হল। আমরা তিনজন— আমি, অভিজিৎ মণ্ডল আর এবনর সাদিক। প্রথমে অভিজিতের অডিশন হল, তারপর সাদিকের, আর সবশেষে আমার। আমি অভিনয় করে দেখালাম ধর্মবীর ভারতীর অন্ধায়ুগ কে অশ্বত্থামা থেকে একটা অংশ। আমাদের তিনজনের অভিনয়ক্ষমতা প্রদর্শনে রাত এগারোটা বেজে গেল। আমাদের অভিনয়শেষে সবাই একদম শান্ত, চুপচাপ। স্তব্ধতা ভেঙে হাবিব সাহেব বললেন, ছেলেদের মধ্যে খুব এনার্জি আছে। আচ্ছা, আবার কাল দেখা হচ্ছে। হাবিব সাহেব এ কথা বলতেই শুক্লাজি নিজেই হাবিব সাহেবের ব্যাগটা সঙ্গে নিয়ে সাহেবের সঙ্গেই হাঁটা লাগালেন। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফিরেও এলেন। আজকের দিনটাও কোনও আশ্বাস ছাড়াই আমরা মন্ডি হাউসের দিকে রওনা দিলাম।

নতুন অভিনেতাদের যাচাই করার পদ্ধতি হাবিব সাহেবের ক্ষেত্রে কিছুটা অন্যরকম ছিল। অন্যান্য সরকারি বা বেসরকারি জায়গায় যেমন দশ-পনেরো মিনিটের অডিশন হত, তেমন ব্যবস্থায় ওঁর ভরসা ছিল না। উনি মনে করতেন এইটুকু অভিনয় দেখে কারও পটুতা সম্বন্ধে সিদ্ধান্তে আসা অসম্ভব। এর ফলস্বরূপ আবারও তৃতীয় দিনে, এবং চতুর্থ দিনেও আমাদের অডিশন চলতে থাকল।

তৃতীয় দিন থেকে আমরা একেবারে ছটায় ওই রিহার্সালের উঠোনে উপস্থিত। হাবিব সাহেব এই আসেন কী সেই আসেন! বলা তো যায় না। এদিকে বাকি কারও মুখে আমাদের নিয়ে কোনও কথা নেই। মিউজিশিয়ানরা হাবিব সাহেবের সদ্য কম্পোজ করা গানের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। আমাদের উৎকণ্ঠা বাড়তেই থাকে।

এদিকে ছটা থেকে সাতটা বাজতে যায়। হাবিব সাহেবের দেখা নেই। যে উৎসাহের সঙ্গে আমরা রিহার্সালে এসেছিলাম তাতে ভাঁটা পড়তে থাকে। আটটা বেজে যেতে আমরা নয়া থিয়েটারের একজন সিনিয়র অভিনেতা উদয় রামজির শরণাপন্ন হই। হাবিব সাহেব কোনও কাজে মন্ডি হাউস বা অন্য কোথাও গেলেন কি? কারণ আমি শুনেছিলাম যে নয়া থিয়েটারের প্রশাসনিক সব কাজই উনি নিজে করে থাকেন। এর মধ্যে সমস্ত মিটিং ইত্যাদি সব ওঁকেই করতে হয়। কিন্তু উদয় রামজি জানালেন যে সাহেব তাঁর বাড়িতেই আছেন। কিছু একটা লেখা নিয়ে ব্যস্ত আছেন। হয়তো দেখ রহে হ্যায় নয়ন-এর গান লিখছেন, উনি জানান।

আমাদের ধৈর্য তো প্রায় শেষ হওয়ার মুখে। রাত যখন নটা বাজতে চলল, হাবিব সাহেব এসে পৌঁছলেন। এসেই বললেন, ‘আপনারা যে যেমন গান জানেন, শোনান, আর দেবীলালজি (হারমোনিয়াম মাস্টার), এঁদের গলায় সুর কেমন আপনি একটু দেখে নিন।’ আমরা যে যেমন গান জানতাম গাইলাম, আর সঙ্গে দেবীলালজি সুর চেক করতে করতে চললেন। সেদিনটা গানবাজনাতেই কেটে গেল। সব শেষ হল যখন, রাত তখন প্রায় বারোটা।

চতুর্থ দিন ছিল মুভমেন্টের। হাবিব সাহেবের গায়কেরা গান গাইছেন, যন্ত্রীরা বাজাচ্ছেন, আর তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমরা অভিনয় করছি। মানে ফিল্মের প্লেব্যাকের মতন আর কী। সেদিনের পুরোটাই এসবে গেল। রিহার্সালশেষে সকলের বাড়ি ফেরার পালা। হাবিব সাহেব সকলের আগেই বেরোলেন। কিন্তু কিছুদূর গিয়েই ফিরে এলেন। আমাদের সঙ্গে বিজয় শুক্লা ছিলেন। তাঁকে বললেন, কাল আপনি এদের নিয়ে সাতটার সময় আসুন। মনে একটু আশার সঞ্চার হল। কারণ হাবিব সাহেবের কণ্ঠে আজ কিছুটা ঘনিষ্ঠতা আঁচ করলাম।

এবার, পঞ্চম দিন, আমরা ঠিক সাতটায় রিহার্সালে পৌঁছলাম। হাবিব সাহেব এলেন সাড়ে সাতটায়। উদয় রামজিকে বললেন স্ক্রিপ্ট বের করতে। নাটকে তিন সদাগরের পার্ট ছিল। আমাদের তিনজনকে ভাগাভাগি করে পড়তে বললেন। বিজয় দেব আমাদের পার্ট পড়ালেন। এরপর সমস্ত শিল্পীদের সঙ্গে নিয়ে পুরো স্ক্রিপ্ট পড়া হল রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত। রিহার্সাল শেষ হলে বিজয় শুক্লাজিকে হাবিব সাহেব নিজের বাড়িতে ডাকলেন।

এদিকে আমরা ওই উঠোনে অপেক্ষায় রইলাম। আধ ঘণ্টাখানেক বসে থাকার পর শুক্লাজি এলেন। এসেই সুসংবাদ দিলেন। অভিনয়ের জন্য আমরা তিনজনই মনোনীত হয়েছি। মাইনে মাসে ছশো টাকা। আর থাকার ব্যবস্থা হয়েছে খেলগাঁওতে সরকারের দেওয়া জায়গায়। সেইখানে যেন বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে যথাসময়ে পোঁছে যাই। বাকি কথা পরের রিহার্সালে হবে।

এ-কথা শুনে আনন্দে আমরা আত্মহারা। অন্যদিনের মতো আর বাসের অপেক্ষায় না থেকে অটো ধরে শুক্লাজির ঘর মন্ডি হাউসের জন্য রওনা দিলাম।

 

১৯৯২ সাল থেকে হাবিব সাহেবের সঙ্গে থেকে বহু নাটকে অভিনয় করলাম। পাঁচ দশকের এই যাত্রায় অন্যতম মাইলফলক হয়ে রইল আমার অভিনেতা থেকে নির্দেশক হয়ে ওঠা। ২০০৯ সালে হাবিব সাহেবের চলে যাওয়া থেকে আমি নয়া থিয়েটারে নির্দেশকের ভূমিকায় আছি। সাহেবের শিক্ষা অনুযায়ী, তাঁর দেখানো পথে এই কঠিন সময়েও আমরা সেটাই করার চেষ্টা করে চলেছি, যার জন্য নয়া থিয়েটারের খ্যাতি। লোকনাট্য।


*লেখক নয়া থিয়েটার-এর নির্দেশক

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4557 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

  1. পড়তে পড়তে নিজেই উত্তেজিত হয়ে উঠেছিলাম যেন আমিই অডিশন দিচ্ছি হাবিব তনভিরের কাছে!

আপনার মতামত...