তন্ময় ভট্টাচার্যের ফেবুদেওয়াল থেকে

রথের দিন 

 

….আজ, ঘুম ভাঙার সময়, ঘোর তখনও কাটেনি পুরোপুরি, ভাবছিলাম বাবা নিশ্চয়ই পাশের ঘরে রথ নামিয়ে রেখেছে, ধুলো-টুলো ঝেড়ে; যাতে আমি তাড়াতাড়ি স্নান সেরে সাজাতে বসে যাই! উঠলাম। আজ রথ। বৃষ্টি হবে না?

(বাবা। দেখতে দেখতে যার চুল পেকে এল, বয়সের সঙ্গে বাড়ছে মুখের শান্তভাব, মাঝেমধ্যে ঘুম থেকে সকালে ডেকে দেওয়ার সময় এখনও ‘দুর্গা দুর্গা’ বলে কানের কাছে। বাবা…)

পর্দা সরিয়ে তাকিয়ে আছি বাইরে। আগে এই সময় ভার্নার লেনের রাস্তায় ছোট-ছোট ছেলেমেয়েরা রথ সাজিয়ে তিরতির ঘুরে বেড়াত। সামনে দিয়ে কেউ গেলেই তার হাতে দিত বাতাসা, নকুলদানা, ফল। কার রথ কত সুন্দর হয়েছে এই নিয়ে আড়ে-আড়ে দেখত একে অপরকে।

(একটা টোটো দাঁড়িয়ে আছে ভার্নার লেনে। ভোট চলে গেছে অনেকদিন। ছিঁড়ে-যাওয়া ব্যানার উড়ছে হাওয়ায়। ফাঁকা রাস্তা। ফাঁকা…)

অম্বুবাচীর সময় বিধবারা অন্নগ্রহণ করেন না। ঠাম্মা সাবু মাখত। আম, নারকেলকোড়া, কলা দিয়ে মাখা সাবু। খেতাম। একসময় ঠাম্মা পিসির সঙ্গে অম্বুবাচীর সময় পুরী যাওয়া শুরু করল। শ্রীক্ষেত্রে অন্নগ্রহণে বাধা নেই। কেঁদেছিলাম খুব। কতদিন দেখতে পাব না! কিছু বছর পরে, যখন আর কাঁদি না, বলেছিল, ‘ভাই বড় হইয়া গ্যাসে।’ পুরী থেকে গজা এনে দিত। পাঞ্জাবি। মহাপ্রসাদ। ঝিনুক।

(পরশুদিন মা-কে বললাম, এ-বছর সাবু খাওয়াবে না? আজ দিল। নারকেলকোড়া দিয়ে মাখা সাবু। ঠাম্মাকে মনে পড়ে। ইঁচড়ের ঝোল, মোচাঘণ্ট, আলুপোস্ত-– এসবের ক্ষেত্রেও। মা হেরে যায়। রাঙা আলুর পায়েস খাই না কতদিন! কতদিন?)

ঘুম ভেঙে দেখতাম টিভি চলছে। ডিডি ন্যাশনালে পুরীর রথ দেখাত। এখনও নিশ্চয়ই…! রথের ছবি। ধারাবিবরণী। ওই যে রাজা এলেন! ঝাঁট দিচ্ছেন পথ। ওই যে, মন্দির থেকে পাণ্ডাদের কাঁধে চেপে বেরোচ্ছেন তিন বিগ্রহ। রথ চলছে। গড়াতে গড়াতে দুপুর হয়ে এল। ডিডি বাংলা। নীলাচলে মহাপ্রভু। অসীমকুমার।

(দড়ি টানছি। হুমড়ি খেয়ে মাটিতে পড়লেন জগন্নাথ। দোতলা থেকে। ভেঙে গেলেন। কষ্ট। সে বছর মন বসেনি আর। ছোটবেলা…)

ঘরকুনো স্বভাবের জন্য রথ নিয়ে কোনওদিনই বেরোইনি রাস্তায়। পশ্চিমঘরেই ঘুরঘুর, বড়জোর ছাদে। কাগজের ছোট্ট পতাকা উড়ত না বেশি। বাবা চাকার খাঁজে জমে থাকা ঝুল পরিষ্কার করত ফুঁ দিয়ে। কাশত। বাবারও ছোটবেলা ছিল তখন। আমি বড় হয়েছি। বাবাও…

(পশ্চিমঘরের তাকে উঁকি দিলাম। রথ আছে। কাত হয়ে, হাঁড়িকুড়ির সঙ্গে। নামাতে গেলে ধুলো পড়বে চোখে। সরে এলাম। আছে…)

 

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3659 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...