ভারতভুক্ত কাশ্মিরের ইতিহাস

সৌভিক ঘোষাল

 

 

(এখানে পড়ে নিতে পারেন কাশ্মিরের ভারতভুক্তির ইতিহাস)

নেহরু আমল

দেশভাগের সময় ও কাশ্মিরের রাজা হরি সিং চেয়েছিলেন তার রাজ্য ভারত পাকিস্তান কোনও ডোমিনিয়নেই যুক্ত হবে না, ইউরোপের সুইজারল্যান্ডের মত তৃতীয় একটি নিরপেক্ষ সত্তা হিসেবে থেকে যাবে। কিন্তু ১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের পরে মাত্র দু মাস জম্মু কাশ্মির এই অবস্থায় ছিল। অক্টোবর মাসের ২২ তারিখ রাজ্যের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে হানাদাররা ঢুকে পড়ে। তারপর তারা দ্রুত গতিতে রাজধানী শ্রীনগরের দিকে অগ্রসর হয়। এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় মহারাজা হরি সিং ভারতের কাছে সাহায্য চান এবং শেষ পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনী গিয়ে কাশ্মিরকে মুসলিম হানাদারদের হাত থেকে রক্ষা করে। এই ঘটনা প্রক্রিয়ার মধ্যেই ভারতের সঙ্গে যুক্ত হবার জন্য মহারাজা একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। ২৬ অক্টোবর ১৯৪৭ এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

 

এই হানাদার কারা ছিল তাই নিয়ে বেশ কিছু বিতর্ক রয়েছে। রাজা হরি সিং, কাশ্মির উপত্যকার প্রধান রাজনৈতিক শক্তি ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং ভারতের মতে এই হানাদাররা ছিল মূলত পাকিস্তানের মদতপুষ্ট। পাকিস্তান অবশ্য কখনওই এটা স্বীকার করেনি। তারা বরাবরই বলে এসেছে এটা সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের একটা স্বতঃস্ফূর্ত বিদ্রোহ ছিল। রাজা হরি সিং-এর শাসনে কাশ্মিরি মুসলমানরা যেভাবে অত্যাচারিত হচ্ছিল, তার প্রতিকার করতেই তারা নিজেরা এগিয়ে গিয়েছিল। পাকিস্তান কেবল তাদের কূটনৈতিক সমর্থন দিয়েছে। হানাদারদের সঙ্গে যখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর লড়াই চলছে সেই সময় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ভারতের গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন ১৯৪৭ সালের পয়লা নভেম্বর লাহোর যান এবং সেখানে জিন্নার সঙ্গে তার একটা বৈঠক হয়। মাউন্টব্যাটেনকে জিন্না বলেন ভারত যদি কাশ্মিরের ওপর তার দাবি ছেড়ে দেয় তাহলে পাকিস্তান আর একটি বিতর্কিত রাজ্য জুনাগড়ের উপর তার দাবি ছেড়ে দেবে। স্বাভাবিকভাবেই ভারত বা তার প্রতিনিধি মাউন্টব্যাটেন এটা মানতে পারেননি। যাইহোক ততদিনে কাশ্মিরে শীত এসে পড়ায় সামরিক কর্মকাণ্ড কিছু দিনের জন্য স্থগিত রাখা হয়।

 

কাশ্মিরের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারগুলোর দিকে এ সময় নজর ফেরানো হয়। কাশ্মিরের নতুন প্রধানমন্ত্রী হলেন ন্যাশনাল কনফারেন্সের অবিসংবাদী নেতা শেখ আব্দুল্লাহ। হরি সিংকে একটি চিঠি লিখে শেখ আব্দুল্লাহকে কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রী করার পরামর্শ দিয়েছিলেন জহরলাল নেহেরু। সেই চিঠিতে নেহেরু লিখেছিলেন– কাশ্মিরে যদি এখন যদি কাজের লোক কেউ থেকে থাকেন তো তিনি হলেন শেখ আব্দুল্লাহ। স্পষ্টতই তিনি এখন কাশ্মিরের প্রধান জনপ্রিয় ব্যক্তি। সঙ্কটকালে যেভাবে এগিয়ে এসে তিনি সমস্যার টুঁটি চেপে ধরলেন তা থেকে মানুষটি কোন ধাতুতে তৈরি তা বোঝা যায়। তার সততা আর মনের ভারসাম্য সম্পর্কে আমি অতি উচ্চ ধারণা পোষণ করি। তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার কাজে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছেন। হতে পারে ছোটখাটো ব্যাপারে তিনি অনেক ভুল করবেন, কিন্তু আমার ধারণা প্রধান প্রধান বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে তিনি নির্ভুল বলেই গণ্য হবেন।

শেখ আব্দুল্লাহ প্রসঙ্গে কেবল জহরলাল নেহেরুই নন, মহাত্মা গান্ধিও একই রকম ধারণা পোষণ করতেন। দিল্লিতে একটি সভায় গান্ধিজি শেখ আব্দুল্লাহকে নিয়ে যান। সভাটি ছিল শিখ ধর্মের প্রবর্তক গুরু নানকের জন্মদিন উপলক্ষে। সেখানে শ্রোতাদের সঙ্গে শেখ আব্দুল্লাহর পরিচয় করিয়ে দিয়ে গান্ধি বলেন– শেখ সাহেব কাশ্মির সিংহ নামে পরিচিত। তিনি একজন খাঁটি মুসলমান। তবে তিনি কাশ্মিরের অন্য দুপক্ষেরও মন জয় করে নিয়েছেন। শিখ হিন্দু মুসলমান এই তিন দলের মধ্যে যে আদৌ কোনও বিভেদ আছে তা তিনি ভুলিয়ে দিয়েছেন। হিন্দু আর শিখরা তার কথা শুনেছে। এখন মুসলমান, হিন্দু আর শিখরা এককাট্টা হয়ে কাশ্মিরের অপরূপ উপত্যকাটিকে রক্ষা করার কাজে নেমেছেন। মহাত্মা গান্ধি আর জহরলাল নেহেরু উভয়ের কাছেই শেখ আব্দুল্লাহ হয়ে উঠেছিলেন নিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে থাকা এক ব্যক্তির প্রতীক। পাকিস্তানের শাসকরা অবশ্য শেখ আব্দুল্লাহকে নিচু নজরেই দেখত। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি শেখ আব্দুল্লাহকে বর্ণনা করেছিলেন কুইসলিং অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতক বলে।

 

কাশ্মিরের সমাধান সূত্র কোথায় আছে তা নিয়ে ভাবনাচিন্তা প্রসঙ্গে নেহেরু কাশ্মিরের মহারাজা হরি সিংকে একটি চিঠি লিখে চার ধরনের বিকল্প সম্পর্কে আলোচনা করেছিলেন। প্রথম বিকল্পটি ছিল একটা গণভোট করা এবং সেই গণভোট করে গোটা রাজ্যের জনগণ কাদের সঙ্গে যোগ দিতে চায় তা নির্ণয় করা। দ্বিতীয় বিকল্পটি ছিল গোটা কাশ্মিরের এক স্বাধীন সত্তা বজায় রেখে চলার প্রস্তাব। সে ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশই কাশ্মিরের প্রতিরক্ষার নিশ্চয়তা দেবে। তৃতীয় বিকল্প ছিল রাজ্য ভাগাভাগি করা। এই ভাগাভাগির শর্ত অনুসারে জম্মু ভারতে চলে আসবে আর রাজ্যের বাকি অংশ যাবে পাকিস্তানে। চতুর্থ বিকল্পটি ছিল জম্মু ও কাশ্মির উপত্যকা ভারতে চলে আসবে কিন্তু পুঞ্জ ও তার পাশের অঞ্চলটা চলে যাবে পাকিস্তানে। নেহেরু এও লিখেছিলেন কাশ্মিরের ভারতীয় সঙ্ঘের মধ্যে থাকাটা অত্যন্ত জরুরি কিন্তু আমরা সেটা যতই চাই না কেন, শেষ পর্যন্ত ব্যাপক জনগণের শুভেচ্ছা ছাড়া এটা কোনওদিনই সম্ভব হবে না। কিছুকালের জন্য সেনাবাহিনী কাশ্মিরকে ধরে রেখে দিতে পারে কিন্তু তার পরিণামে পরে এর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে। ব্যাপক জনগণকে কীভাবে বোঝানো যাবে যে ভারতের সঙ্গে থাকলেই তাদের মঙ্গল, এই দিকটা খতিয়ে দেখতে হবে। সাধারন একজন মুসলমান যদি মনে না করেন যে ভারতের সঙ্গে থাকলে তার স্থান নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, তাহলে তিনি তো অন্য দিকে চলে যাবেনই। আমাদের মূল নীতির মধ্যে এই বিষয়টাকে আনতে হবে। না হলে এ ক্ষেত্রে আমরা ব্যর্থ হব।

 

১৯৪৮ সালের গোড়াতেই ভারত রাষ্ট্রসঙ্ঘে কাশ্মির সমস্যাটি তোলার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়। লর্ড মাউন্টব্যাটেন এই পরামর্শ দিয়েছিলেন। ভারত রাষ্ট্রসঙ্ঘে দাবি জানাল কাশ্মির যেহেতু ভারতের অঙ্গ হয়ে গেছে, তাই কাশ্মিরের উত্তরভাগ থেকে পাকিস্তানের প্রতি অনুগত গোষ্ঠীগুলির বেআইনি দখলদারি উৎখাত করার কাজে তাকে সাহায্য করুক রাষ্ট্রসঙ্ঘ। ভারতের এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে অনেক অধিবেশন এবং বিতর্ক হল রাষ্ট্রসঙ্ঘে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে প্রতিনিধিত্ব করলেন অসাধারণ বাগ্মী স্যার জাফারুল্লাহ। প্রতিনিধিদের তিনি বোঝাতে চাইলেন ১৯৪৬-৪৭ সালে সারা ভারত জুড়ে যে মর্মান্তিক দাঙ্গা চলেছিল, কাশ্মিরে হানাদারদের আক্রমণ হল তারই একটি পরিণাম। মুসলিম ভাই-বোনদের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে দুশ্চিন্তার স্বাভাবিক প্রক্রিয়াতেই এই ঘটনা ঘটেছে। এর পেছনে পাকিস্তানের কোনও প্রত্যক্ষ মদত ছিল না। দেশভাগের অসমাপ্ত প্রক্রিয়ার একটি অঙ্গ হিসেবেই কাশ্মির সমস্যাকে তিনি তুলে ধরলেন। নিরাপত্তা পরিষদের আলোচ্যসূচিতে বিষয়টি জম্মু কাশ্মির সমস্যার বদলে লেখা হল ভারত পাকিস্তান সমস্যা বলেই।

শেখ আব্দুল্লাহ এবং জহরলাল নেহেরু

একদিকে যখন রাষ্ট্রসঙ্ঘে কাশ্মির নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে এবং অন্যদিকে কাশ্মিরে ভারতীয় সেনাবাহিনী এবং পাকিস্তানের মধ্যে সামরিক আদান-প্রদান জারি রয়েছে, এই সময় রাষ্ট্রসঙ্ঘ কাশ্মির বিষয়ক এক বিশেষ কমিশন গঠন করে। কমিশনের সদস্যরা দিল্লি এবং কাশ্মিরের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে দেখেন এবং তাদের অভ্যর্থনা জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ। রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রতিনিধি চেক কূটনীতিবিদকে আব্দুল্লাহ জানান একমাত্র কাশ্মির ভাগই হল এই সমস্যার উপযুক্ত সমাধান। তা না হলে ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে বিবাদ এবং যুদ্ধ অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে থাকবে আর সাধারণ মানুষ এর ফলে অবর্ণনীয় কষ্টের মুখোমুখি হবে।

শেখ আব্দুল্লাহ এই সময় সাগ্রহে কাশ্মিরের সঙ্গে ভারতের বন্ধনের উপর জোর দিতে চেয়েছিলেন। ১৯৪৮ সালের মে মাসে তিনি শ্রীনগরে সপ্তাহব্যাপী এক স্বাধীনতা উৎসবের আয়োজন করেন। ভারত সরকারের বড় বড় নেতারা সেখানে আমন্ত্রিত ছিলেন। এই সময় ভারতের স্বাধীনতা লাভের প্রথম বার্ষিকীতে মাদ্রাজের নামকরা সাপ্তাহিক স্বতন্ত্র পত্রিকাতে শেখ আব্দুল্লাহ একটি বার্তা পাঠান। সেখানে উত্তর আর দক্ষিণকে, পাহাড় আর উপকূলকে, সর্বোপরি কাশ্মির আর ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করার বাসনা তিনি ব্যক্ত করেন। এই বার্তায় তিনি লিখেছিলেন এমন একদিন আসবে যখন আমাদের দেশের বিস্তার বোঝাবার জন্য আমরা কাশ্মির থেকে কন্যাকুমারিকা– এই শব্দগুচ্ছটি ব্যবহার করব।

ভারতের প্রতি এই মুগ্ধতার পাশাপাশি এই সময় শেখ আব্দুল্লাহ পাকিস্তানকে এক বিবেকবোধহীন বর্বর শত্রু বলেও উল্লেখ করেন। পাকিস্তানকে তিনি এক ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র বলে মনে করতেন এবং বলতেন মুসলিম লিগ কখনওই নয় রাজন্যমুখী। এই সময় কাশ্মিরের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে তিনি জানিয়েছিলেন সেটা কার্যকর হবে না, কেননা কাশ্মির রাজ্যটা খুব ছোট এবং খুব দরিদ্র। আর সেরকম কিছু হলেও পাকিস্তান তাকে গিলে ফেলার জন্য প্রস্তুত। একবার তারা সে চেষ্টা করেছে পারলে আবারও করবে।

 

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাশ্মিরের পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে শেখ আব্দুল্লাহ সব থেকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন ভূমি সংস্কার তথা জমি পুনর্বণ্টনের প্রক্রিয়াটির ওপরে। এর আগে কাশ্মিরে অল্প কিছু হিন্দু এবং মুসলিম পরিবারের হাতে বিশাল বিশাল জমিজোত কেন্দ্রীভূত ছিল। আর গ্রামের অধিকাংশ মানুষ সেখানে শ্রমিক হিসেবে বা স্বেচ্ছা-রায়ত হিসেবে কাজ করত। আব্দুল্লাহ শাসনের প্রথম বছরে চল্লিশ হাজার একর উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টন করা হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ অনুপস্থিত মালিকানা বেআইনি বলে ঘোষণা করেন। ভাগচাষিদের প্রাপ্য শস্যভাতার পরিমাণ ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৭৫ শতাংশ করেন। সমস্ত ঋণ মকুব বলে ঘোষণা করেন। জমির মালিকদের শেখ আব্দুল্লাহ কোনও ক্ষতিপূরণ দেননি। তার এই গোটা সংস্কার প্রক্রিয়াটাই ছিল অত্যন্ত র‍্যাডিক্যাল এবং কাশ্মিরের অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য। শেখ আব্দুল্লাহর এই সমস্ত নীতিমালা কাশ্মির উপত্যকায় তার জনপ্রিয়তাকে একেবারে তুঙ্গস্পর্শী করে তুলেছিল। মহারাজা হরি সিংকে সরিয়ে তাঁর আঠারো বছর বয়সী পুত্র করণ সিংকে সিংহাসনে বসানোর মধ্যে দিয়ে তার ক্ষমতা কাশ্মিরে একেবারে নিরঙ্কুশ হয়ে ওঠে।

শেখ আব্দুল্লাহ

কাশ্মিরে যুদ্ধ, কূটনৈতিক আলাপ আলোচনা, অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন সংস্কার এই পর্ব যখন চলছিল তখনই ভারতীয় সংবিধান গণপরিষদে তার চূড়ান্ত রূপ লাভ করছিল। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি চালু হল ভারতীয় সংবিধান এবং সেখানে কাশ্মিরকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হল ও তাকে বেশ কিছু পরিমাণ স্বশাসনের নিশ্চয়তা দেওয়া হল। সংবিধানের ৩৭০ নম্বর ধারায় স্পষ্ট করে বলা হয়– রাষ্ট্রপতি প্রতিরক্ষা, বিদেশনীতি আর যোগাযোগ এই তিনটি বিষয় ছাড়া অন্য সমস্ত ব্যাপারে ওই রাজ্যের সরকারের সঙ্গে পরামর্শ করে চলবেন।

 

১৯৫১ সালের অক্টোবরে কাশ্মির গণপরিষদে নির্বাচন হয়। শেখ আব্দুল্লাহর নেতৃত্বাধীন ন্যাশানাল কনফারেন্স ৭৫টি আসনের সবকটিতেই বিজয়ী হয়। মাত্র তিনটি আসন ছাড়া অন্যত্র তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখেই পড়তে হয়নি। গণপরিষদে আব্দুল্লাহ দেড় ঘণ্টা ধরে তার উদ্বোধনী ভাষণ দেন। এই ভাষণে কাশ্মিরের সামনে কী কী বিকল্প আছে, সেগুলি নিয়ে আলোচনা করেন। একটি বিকল্প হল পাকিস্তানে যোগ দেওয়া। কিন্তু সেটি সামন্ততান্ত্রিক ও ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র, যা কাশ্মিরি মন মানসিকতার বিপরীত। আরেকটি বিকল্প হল স্বাধীন সত্তা নিয়ে থাকা। এর সমস্যা হল কাশ্মিরের ক্ষুদ্র আয়তন এবং সীমিত অর্থনৈতিক শক্তি। এই দুটি বিকল্প বাদ দিয়ে তৃতীয় বিকল্পটার দিকেই শেখ আব্দুল্লাহ জোর দেন। সেটা হল অভ্যন্তরীণ স্বশাসন নিয়ে ভারতের সঙ্গে থাকা। এই তৃতীয় বিকল্পটির প্রতি তার টান প্রকাশ করলেও এই সম্পর্কে তাঁর কিছু ক্রমবর্ধমান আশঙ্কাও তিনি এই সময় থেকে প্রকাশ করতে শুরু করেন। এর প্রেক্ষাপটে ছিল ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে হিন্দুত্ববাদীদের কিছু উগ্র কণ্ঠস্বর। এমনকি জম্মু অঞ্চলেই কেবলমাত্র হিন্দুদের স্বার্থরক্ষার জন্য ১৯৪৯ সালে তৈরি হয়েছিল প্রজা পরিষদ। ১৯৫২ সালে জম্মুতে আব্দুল্লাহর এক বক্তৃতার আগে ভারতের তেরঙ্গা পতাকার পাশাপাশি ন্যাশানাল কনফারেন্সের নিজস্ব পতাকা ওড়ানোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায় কিছু হিন্দু ছাত্র। তাদের গ্রেপ্তার করা হলে বিক্ষোভ শুরু হয়। বেশ কিছু দাঙ্গাহাঙ্গামার ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সেখানে কারফিউ জারি করতে হয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্তেও উত্তেজনা দেখা যায়। হিন্দুত্বের এই আস্ফালন শেখ আব্দুল্লাহকে শঙ্কিত করে তোলে এবং তিনি বলেন তার দল ভারতের সংবিধানকে মেনে নিতে প্রস্তুত, কিন্তু তার আগে নিশ্চিত হতে হবে এখানে সাম্প্রদায়িকতাকে কবরে পাঠানো গিয়েছে। নেহরুর পরে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে সেই প্রশ্নও তিনি তোলেন। এই সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সাথে আলোচনায় তিনি কাশ্মিরের স্বাধীনতার প্রশ্নটি নিয়ে আলোচনা করেন এবং কাশ্মির আলাদা অস্তিত্ব নিয়ে থাকলে আমেরিকা তাকে কীভাবে কতটা সাহায্য করবে তাও জিজ্ঞাসা করেন। শেখ আব্দুল্লাহর মধ্যে যে কিছু বদল আসছে তা নেহরুর চোখ এড়ায়নি এবং সেকথা তিনি তার বোন বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিতকে লেখা একাধিক চিঠিতে স্পষ্টভাবেই জানান।

 

১০

১৯৫২ সালের জুলাই মাসে কাশ্মির প্রশ্নে ন্যাশানাল কনফারেন্স ও ভারত সরকারের মধ্যে দিল্লি চুক্তি সম্পাদিত হয়। এই চুক্তি অনুসারে ঠিক হয় যে কাশ্মিরিরা ভারতের পূর্ণ নাগরিক বলে স্বীকৃতি পাবেন এবং অনেক বেশি মাত্রার স্বশাসন ভোগ করবেন। কাশ্মিরের নতুন যে পতাকার পরিকল্পনা করেছিল ন্যাশনাল কনফারেন্স, জাতীয় পতাকার পাশেই তা শোভা পাবে। শ্রীনগরের সম্মতি না নিয়ে দিল্লি অভ্যন্তরীণ গোলযোগের জন্য বাহিনী পাঠাতে পারবে না। অন্যান্য সব রাজ্যের ক্ষেত্রে জায়গীর অবশিষ্ট সম্পর্কে যা ক্ষমতা সেটা কেন্দ্র পড়ে থাকলেও কাশ্মিরের ব্যাপারে সেটা রাজ্যের উপরেই থাকবে। সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ একটা দিক এই চুক্তিতে রাখা হয় সেটা হল এই রাজ্যের বাইরের কোনও লোক এই রাজ্যের মধ্যে কোনওরকম জমি বা সম্পত্তি কিনতে পারবে না। এই নিয়মটা করার পেছনে যে ভাবনা কাজ করেছিল সেটা হল ব্যাপকসংখ্যক বহিরাগত যদি কাশ্মিরে চলে আসে তাহলে কাশ্মির উপত্যকার জনতাত্ত্বিক চেহারা বদলে যেতে পারে। তাকে আটকানোর জন্য এই ব্যবস্থাটি নেওয়া হয়েছিল।

 

১১

দিল্লি চুক্তির পরেই ভারতের মধ্যে একটি অংশ থেকে এই চুক্তি এবং কাশ্মিরের স্বশাসন নিয়ে প্রশ্ন ও আপত্তি তুলে বিক্ষোভ আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। জম্মু অঞ্চলে আগেই প্রজা পরিষদের বিক্ষোভ আন্দোলন চলছিল। ১৯৫২ সালের সাধারণ নির্বাচনের পরে জনসঙ্ঘ এবং তার নেতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আন্দোলন শুরু করেন। শ্যামাপ্রসাদ প্রশ্ন তুললেন কাশ্মিরের রাজ্য পতাকা আর জাতীয় পতাকাকে সমমর্যাদা দেবার মধ্যে দিয়ে ন্যাশনাল কনফারেন্স এবং কাশ্মিরের আনুগত্য নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। সার্বভৌম দেশ এ জিনিস মেনে নিতে পারে না। তিনি এও বললেন কাশ্মির উপত্যকা খণ্ডিতভাবে ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে চায় থাকুক, কিন্তু জম্মু এবং লাদাখের বৌদ্ধ অঞ্চল যদি চায় তাহলে তাদের অবশ্যই ভারতের সঙ্গে পূর্ণমাত্রায় যুক্ত হতে দিতে হবে। তবে তার প্রস্তাব ছিল গোটা রাজ্যকেই কোনওরকম বিশেষ ছাড় ব্যতীত ভারতের অঙ্গ করে নেওয়ার। এর ফলে ভারতের অন্যান্য অংশের সঙ্গে এর সমতা প্রতিষ্ঠা হবে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন। শ্যামাপ্রসাদ এ প্রশ্নও তুললেন যে, অন্যান্য রাজন্য শাসিত রাজ্যগুলির ক্ষেত্রে তাদের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল স্বশাসনের, কিন্তু তারাও তো শেষ পর্যন্ত সংবিধানকে অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলতে রাজি হয়েছে। যে গণপরিষদ ভারতের সংবিধান তৈরি করেছে, শেখ আব্দুল্লাহ নিজেই ছিলেন তার সদস্য। অথচ এখন তিনি বিশেষ সুবিধা দাবি করছেন কাশ্মিরের জন্য। এই গোটা বিষয়টিকে ভারতের পক্ষে বিপজ্জনক এবং শেখ আব্দুল্লাহ দ্বিচারিতা করছেন বলে তুলে ধরতে থাকেন শ্যামাপ্রসাদ। এই সমস্ত বিষয় নিয়ে তিনি জঙ্গি আন্দোলন শুরু করেন। জম্মুর প্রজা পরিষদের যে আন্দোলন, সেই আন্দোলনকেও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় প্রত্যক্ষ সমর্থন করেন। জম্মু সফরে গিয়ে তিনি প্রজা পরিষদের সমর্থনে বেশ কিছু জনসভায় ভাষণ দেন।

 

১২

কাশ্মিরের স্বশাসনকে নিয়ে দেশের মধ্যে যখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, এমনকি কংগ্রেসের মধ্যেও অনেক সাংসদ এই নিয়ে জনসঙ্ঘের আন্দোলনের পাশে দাঁড়াচ্ছেন, সেই সময়ই কাশ্মির উপত্যকা ভ্রমণে আসেন মার্কিন রাজনীতিবিদ অ্যাডলাই স্টিভেনসন। বলা হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্টিভেনসন আব্দুল্লাহকে নৈতিক সমর্থনের পাশাপাশি আরও বেশ কিছু আশ্বাস দেন। বিভিন্ন বেসরকারি সূত্রের মতে কাশ্মির স্বাধীন হলেই নাকি এক কোটি ৫০ লক্ষ ডলার ঋণ তখনই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীন কাশ্মিরকে দিতে প্রস্তুত ছিল। এছাড়াও আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হবে যে কাশ্মির উপত্যকায় অন্তত পাঁচ হাজার আমেরিকান পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করবে। প্রত্যেকটা হাউসবোট আর হোটেল ভর্তি থাকবে মার্কিন পর্যটকে। কাশ্মিরি হস্তশিল্পীদের যাবতীয় শিল্পসম্ভার আমেরিকানরা কিনে নেবে। তিন বছরের মধ্যেই কাশ্মিরের প্রত্যেকটি গ্রামে বিদ্যুৎ চলে আসবে। এই ধরনের আরও নানা উন্নয়নমূলক এবং অর্থনৈতিক সাহায্যের প্রস্তাব এবং দেশে কাশ্মিরের স্বশাসন নিয়ে বিক্ষোভ আন্দোলন– সব মিলিয়ে শেখ আব্দুল্লাহ কাশ্মিরের স্বাধীনতার প্রশ্নটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন। এই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১১ মে কাশ্মিরে প্রবেশ করেন। শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার কথা বলে তার প্রবেশ সম্পর্কে আগেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছিল। শ্যামাপ্রসাদ তা অমান্য করেন এবং তাকে গ্রেপ্তার করে শ্রীনগরের জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই জেলে থাকাকালীন সময়ে ২২ জুন তার হার্ট অ্যাটাক হয় এবং পরের দিন ২৩ জুন শ্যামাপ্রসাদ মারা যান। ২৪ জুন ভারতীয় বায়ুসেনার একটি বিমানে করে শ্যামাপ্রসাদের মরদেহ তার কোলকাতার বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়। শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কলকাতা এবং ভারতের বিভিন্ন জায়গায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। সব থেকে মারাত্মক অবস্থা হয় জম্মুতে। সেখানে লুটপাট, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, বিভিন্ন সরকারি কার্যালয়ে আগুন ধরানো– ইত্যাদি ঘটনা চলতে থাকে। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের চিতাভস্ম নিয়ে জনসঙ্ঘর এক বিরাট মিছিল দিল্লির পথে পথে এগিয়ে চলে এবং মিছিলকারীদের মুখে ছিল বদলা নেওয়া স্লোগান। সোচ্চার কণ্ঠে মিছিল দাবি তোলে– ‘কাশ্মির আমাদের।’ রাজধানীতে এলে শেখ আব্দুল্লাহকে খুন করা হবে এরকম হুমকিও সেই সময় শোনা যেতে থাকে। ন্যাশনাল কনফারেন্সের মধ্যেও সেই সময় দুটো পরিষ্কার বিভাজন হয়ে যায়। একদিকে শেখ আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে একটি অংশ কাশ্মিরের স্বাধীনতার প্রশ্নটি নিয়ে বেশি করে ভাবতে থাকেন এবং অন্য অংশটি স্বশাসনের ভিত্তিতে ভারতের মধ্যে থেকেই সমাধানের কথা ভাবেন। এই দ্বিতীয় অংশের নেতৃত্ব দেন গুলাম মহম্মদ বক্সি। নেহরু যেমন শেখ আব্দুল্লাহর দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনকে মেনে নিতে পারেননি, তেমনি শেখ আব্দুল্লাহর সঙ্গে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের রাজনৈতিক প্রতিনিধি স্টিভেনসনের শলাপরামর্শকে বামপন্থীরাও সন্দেহের চোখে দেখেছিলেন। নেহরু আব্দুল্লাহকে দিল্লি এসে আলাপ আলোচনার প্রস্তাব দেন, কিন্তু শেখ আব্দুল্লাহ সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন। তিনি কাশ্মিরের স্বাধীনতা ঘোষণা করতে চলেছেন, এমন জল্পনা চলতে থাকে। এই পরিবেশে সদর ই রিয়াসত করণ সিং শেখ আব্দুল্লাহকে কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করেন এবং সেই পদে বসান গোলাম মহম্মদ বক্সিকে। শেখ আব্দুল্লাহকে অন্তরীণ করা হয় নতুন প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে।

শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়

১৩

১৯৫৩ থেকে ১৯৬৩ কাশ্মিরের প্রধান হিসেবে কাজ চালান গোলাম মহম্মদ বক্সি। তিনি বরাবরই ছিলেন দক্ষ সংগঠক। সংগঠনের একদম তৃণমূল স্তর পর্যন্ত তার যোগাযোগ ও প্রভাব ছিল। তার আমলে কাশ্মিরের পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া দ্রুত গতিতে এগিয়ে যেতে থাকে। জনসাধারণের ক্ষোভ বিক্ষোভ সরাসরি শোনার জন্য প্রতি শুক্রবার তাঁর দরবার বসত এবং এটি অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। বক্সি ধানের সংগ্রহ মূল্য বেশ কিছুটা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এর ফলে কাশ্মিরের মানুষের অধিকাংশের আয় বেশ কিছুটা বেড়ে যায়। বিদ্যালয় স্তরের শিক্ষাকে সম্পূর্ণ অবৈতনিক করে দেওয়া হয়। অনেক নতুন নতুন ডাক্তারি ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ খোলা হয়। ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে জম্মু কাশ্মিরের করের ব্যবধান মুছে দেন বক্সি। কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে তদবির করে প্রচুর টাকা কাশ্মিরের জন্য নিয়ে আসেন তিনি। কাশ্মিরে বাঁধ, রাস্তা, সুড়ঙ্গ, হোটেল ইত্যাদি প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয়। দুর্নীতি ও শেখ আব্দুল্লাহকে অন্তরীণ করে রাখার অভিযোগ সত্ত্বেও সব মিলিয়ে উন্নয়নমূলক কাজ ও ধীর পদক্ষেপের মাধ্যমে বাকি ভারতের সঙ্গে কাশ্মিরের যোগসাধনের প্রক্রিয়াকে গোলাম মহম্মদ বক্সি অনেকটা এগিয়ে নিয়ে যান।

 

১৪

গোলাম মহম্মদ বক্সির শাসন আমলের শেষদিকে ভারতের এক বড় ধাক্কা আসে চিন যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে। ১৯৬২র নির্বাচনের পরেই শুরু হওয়া এই যুদ্ধে ভারত পর্যুদস্ত হয় ও মনোবল নানা দিক থেকে ধাক্কা খায়। এই সময়েই ১৯৬৩তে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে কাশ্মির আবার ভীষণ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১৯৬৩র ২৭ ডিসেম্বর কাশ্মিরের হজরতবাল মন্দির, যেখানে হজরত মহম্মদের স্মৃতিচিহ্ন তার চুল রাখা ছিল, সেটি চুরি যায়। সাতদিন পরে তা আবার ফেরৎ আসে, তবে সেটি আসল না নকল তাই নিয়ে সংশয় তৈরি হয় ও কাশ্মির সহ দেশের নানা প্রান্ত মুসলিমরা মারাত্মক বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। এমনকী পূর্ববঙ্গে এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় সেখানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর ব্যাপক অত্যাচার শুরু হয়ে যায় ও দলে দলে হিন্দু শরণার্থী হিসেবে ভারতে চলে আসতে শুরু করেন। এটা স্পষ্ট হয়ে যায় কাশ্মিরের অশান্তি শুধু কাশ্মিরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, তার ব্যাপক প্রভাব অন্যত্রও ছড়িয়ে পড়বে। কাশ্মির সমস্যা মেটানোর জন্য বৃদ্ধ অশক্ত নেহরু মন্ত্রীসভায় তাঁর সহকারী লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে কাশ্মিরে পাঠান। ততদিনে কামরাজ পরিকল্পনা অনুসারে যারা দল ও জনগণের সঙ্গে নতুন করে সেতুবন্ধনের জন্য প্রশাসন ছেড়ে দিয়েছেন, তাদের মধ্যে ছিলেন গুলাম মহম্মদ বক্সিও। নেহরু বিশেষভাবেই চেয়েছিলেন শেখ আব্দুল্লাহর কারামুক্তি হোক ও অতীতের তিক্ততা ভুলে তার মাধ্যমে কাশ্মির সমস্যা সমাধানের রাস্তায় নতুন করে হাঁটা হোক।

১৯৫৮তে কারামুক্ত শেখ আব্দুল্লাহ

১৫

শেখ আব্দুল্লাহ ১৯৫৩ থেকে দশ বছর কারাবন্দি ছিলেন। তার মধ্যে ১৯৫৮তে কয়েকমাসের জন্য তিনি মুক্ত ছিলেন। কিন্তু এই পর্বেই তার বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সঙ্গে যোগসাজশে স্বাধীন কাশ্মির তৈরির চেষ্টা ও উপত্যকায় অস্থিরতা তৈরিতে মদত দেবার মতো মারাত্মক সব অভিযোগ ওঠে। পুনরায় কারাবন্দি করার পাশাপাশি এবার তার বিরুদ্ধে শুরু হয় দেশদ্রোহের মামলাও। ১৯৬৪ সালে নেহরুর আগ্রহে একে পেছনে ফেলে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। শেখ আব্দুল্লাহও অতীতের তিক্ততা ভুলে ‘পুরনো বন্ধু ও কমরেড’ নেহরুর ডাকে আন্তরিকভাবে সাড়া দেন। প্রথমে উপত্যকার মানুষের সাথে কিছুদিন কাটিয়ে, সভা সমিতিতে বক্তব্য রেখে তিনি দিল্লিতে এসে ওঠেন নেহরুর বাসভবনে। সেখানে থাকাকালীন নেহরু ও দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতার সাথে তার আলাপ আলোচনা হয়। নেহরু ছাড়াও জয়প্রকাশ নারায়ণ ও রাজা গোপালাচারির কাছ থেকে তিনি সমর্থন শুভেচ্ছা পান নতুন শান্তি উদ্যোগের। এরপর তিনি যান পাকিস্তানে, শাসক আয়ুব খাঁর সাথে বৈঠক করতে। আয়ুব খাঁ ও পাকিস্তানের জনগণের কাছ থেকে শেখ আব্দুল্লাহ অভূতপূর্ব সংবর্ধনা পান। এই সফরে শান্তি ও সমাধানের লক্ষ্যে যখন আলোচনা চলছে, তখন হঠাৎই মৃত্যু হয় পণ্ডিত জহরলাল নেহরুর। সফর অসমাপ্ত রেখে সোজা নেহরুর মৃতদেহের পাশে এসে ভেঙে পড়েন শেখ আব্দুল্লাহ। তার এবং আরও অনেকের মনে হয় নেহরুর মৃত্যুতে কাশ্মির সমস্যাকে আলাপ আলোচনার মধ্যে দিয়ে শান্তিপূর্ণ পথে মেটানোর রাস্তা জটিল হয়ে গেল। এর পরের বছর শেখ আব্দুল্লাহ হজে যান ও ফেরার পথে আলজিয়ার্সে বৈঠক করেন চিনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই-এর সঙ্গে। এই বৈঠক মারাত্মক আলোড়ন তোলে, কারণ সদ্য সমাপ্ত চিন যুদ্ধের পর চৌ এন লাই তখন শত্রু শিবিরের প্রধান লোক। তার সঙ্গে বৈঠক করার অপরাধে দিল্লি বিমান বন্দরে নামা মাত্রই শেখ আব্দুল্লাহকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে নিয়ে আসা হয় দক্ষিণের শৈল শহর কোদাইকানালে এবং একটি বাংলো বাড়িতে কিছু নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রাখা হয়।

 

নেহরু পরবর্তী আমল

 

১৬

জহরলাল নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধির শাসনামলের মধ্যে মাত্র বছর দুয়েক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। নেহরুর প্রয়াণের পর স্বল্পকালীন সময়েই কাশ্মির প্রসঙ্গে ভারতের অবস্থান অনেক বদলে যায়। জম্মু কাশ্মিরে ৩৭০ ধারা সরাসরি তুলে না দিয়েও তাকে অনেকটাই অকার্যকরী করে দেওয়া হয়। বাকি ভারতের সঙ্গে জম্মু কাশ্মিরকে অঙ্গীভূত করার চেষ্টার মধ্যে তার স্বশাসনের দিকগুলিকে অনেকটা কমিয়ে আনা হয়।

  • রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে অর্ডিনান্স জারি করিয়ে কাশ্মিরের জন্যও লাগু করা হয় সংবিধানের এমন কয়েকটি ধারা, যা যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিপরীতে কেন্দ্রীকরণের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। এই দুটো ধারা হল ৩৫৬ ও ৩৫৭। এর সাহায্যে কাশ্মিরের নির্বাচিত রাজ্য সরকারকে কেন্দ্রের সরকার প্রয়োজনমত ফেলে দিতে পারত।
  • কাশ্মিরের প্রশাসনিক প্রধানকে আর প্রধানমন্ত্রী না বলে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে অভিহিত করা হল। বাকি ভারতের অন্যান্য রাজ্যগুলির সাথে এই ব্যাপারে কোনও ব্যবধান স্বীকার করা হল না।
  • জম্মু কাশ্মিরের শাসক হিসেবে স্বীকৃত সদর ই রিয়াসৎ পদটি বাতিল করে দেওয়া হয়। যে পদে প্রথমে অভিষিক্ত ছিলেন মহারাজা হরি সিং এবং তারপরে তার পরে তার পুত্র করণ সিং।
  • এর আগে ভারতের লোকসভায় জম্মু কাশ্মিরের সাংসদরা সরাসরি নির্বাচিত হতেন না। জম্মু কাশ্মিরের বিধানসভা প্রতিনিধি মনোনীত করত। এই ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে বাকি ভারতের মতো সরাসরি নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে লোকসভার সাংসদ নির্বাচন শুরু হয়।

এইসব বড় বড় পরিবর্তনগুলো হয়েছিল খুব কম সময়ে। নেহরুর মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যেই। অন্যদিকে নেহরুর মৃত্যু ও শেখ আব্দুল্লাহর কোদাইকানাল কারাবাসের সুযোগে পাকিস্তানের মদতে কাশ্মির উপত্যকায় অস্থিরতা তৈরির বেশ কিছু চেষ্টা শুরু হয়। লালবাহাদুর শাস্ত্রী তখন প্রধানমন্ত্রী। এর একটি ছিল অপারেশন জিব্রাল্টার। বেশ কিছু জঙ্গি গোষ্ঠীকে অস্ত্র প্রশিক্ষণ দিয়ে কাশ্মির উপত্যকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তারা বোমা মেরে বিভিন্ন সেতু উড়িয়ে দেওয়া ও সরকারি ভবনগুলোয় বোমা নিক্ষেপের কাজ চালিয়ে যায়। এর পাশাপাশিই স্থানীয় জনগণকে ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে তারা উশকানি দিতে থাকে। স্থানীয় কাশ্মিরিরা অবশ্য এতে খুব বেশি সাড়া দেননি সেই সময়। অনেক অনুপ্রবেশকারীকে ধরে তারা নিজেরাই পুলিশের হাতে তুলে দেন। এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হলে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী সরাসরি লাইন অব কন্ট্রোল পেরিয়ে কাশ্মিরে ঢুকে পড়ে। কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে ১৯৬৫র গোটা সেপ্টেম্বর মাস জুড়ে চলল ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ। আলাপ আলোচনার মধ্যে দিয়ে কাশ্মির সমস্যার সমাধান আরও জটিল জায়গায় পৌঁছল। ভারত পাক যুদ্ধের আগেই অবশ্য কাশ্মিরের সঙ্গে ভারতের বন্ধনকে দৃঢ় করার উদ্যোগ শুরু হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধের পরে তা আরও গতি ও দৃঢ়তা পায়।

 

১৭

৭১-এর যুদ্ধে বাংলাদেশের জন্ম ও পাকিস্তানের শোচনীয় পরাজয়ের পর এই উপমহাদেশের শক্তি ভারসাম্যর নতুন ছবি দেখা যায়। পাকিস্তান হতোদ্যম হয়ে পড়ে ও ইন্দিরা গান্ধির মর্যাদা দেশে ও দেশের বাইরে শক্তিশালী চেহারায় আত্মপ্রকাশ করে। কাশ্মিরেও তার প্রভাব পড়ে। শেখ আব্দুল্লাহ কাশ্মিরে ফেরেন ও সেখানকার জনগণকে নতুন পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে বোঝান যে ইসলামাবাদ থেকে সাহায্যের মুখাপেক্ষী না থেকে ভারতের সঙ্গে সম্মানজনক রফা করাটাই বাস্তবোচিত হবে। ১৯৭৫ সালে ইন্দিরা ও শেখ আব্দুল্লাহর মধ্যে একটি চুক্তি হয়। এই চুক্তির সূত্র অনুসারে শেখ আব্দুল্লাহ কাশ্মিরে গণভটের দাবি পরিত্যাগ করেন। ৩৭০ ধারার বিশেষ ক্ষমতাবলে স্বশাসন নিয়ে ভারত রাষ্ট্রের অঙ্গীভূত হিসেবে কাজ করতে স্বীকৃত হন। ২২ বছর পর আবার কাশ্মিরের প্রধান হন শেখ আব্দুল্লাহ। পদটি তখন প্রধানমন্ত্রীর বদলে মুখ্যমন্ত্রীতে রূপান্তরিত হয়েছে। ১৯৮২তে মৃত্যু পর্যন্ত আব্দুল্লাহই ছিলেন কাশ্মিরের মুখ্যমন্ত্রী।

ইন্দিরা গান্ধি ও শেখ আব্দুল্লাহ

১৮

শেখ আব্দুল্লাহর মৃত্যু, আফগানিস্তানে সোভিয়েত প্রভাবিত সরকারের বিরুদ্ধে আল কায়দা সহ বিভিন্ন সশস্ত্র জঙ্গি গোষ্ঠীর সাফল্য কাশ্মিরে আবার নতুন পরিস্থিতি সঞ্চার করে। শেখ আব্দুল্লাহর মৃত্যুর পর কাশ্মিরের জনগণকে সার্বিকভাবে প্রভাবিত করার মতো নেতা আর কেউ ছিলেন না। কাশ্মির রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক আলাপ আলোচনার বদলে এই সময় থেকে ক্রমশ সামরিক কার্যকলাপের জায়গায় চলে যায়। ১৯৮৭র বিধানসভা নির্বাচনের আগে কাশ্মিরে ন্যাশনাল কনফারেন্সের জনপ্রিয়তায় যথেষ্ট ভাঁটা পড়ে। তারা এবং ভারতের জাতীয় কংগ্রেস আগের তিক্ততা ভুলে জোটবদ্ধ হয়ে লড়াই করেছিল শেখ আব্দুল্লাহর পুত্র ও মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আব্দুল্লাহর নেতৃত্বে। বিভিন্ন মুসলিম রাজনৈতিক দল উপত্যকায় এই সময় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং তাদের এক জোট, মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট, কাশ্মিরে এই বিধানসভা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। প্রচুর ভোট পেলেও তারা খুব বেশি আসন পায়নি। অভিযোগ ওঠে যে জোর করে ভারতের শাসকেরা ব্যাপক নির্বাচনী কারচুপির মধ্যে দিয়ে নিজেদের পছন্দমতো ফলাফল বের করে এনেছে। এই অভিযোগের সারবত্তা ছিল এবং পরে শাসকদের অনেকে তা স্বীকারও করে নেন। কাশ্মিরের জনগণের কাছে বিষয়টা ছিল খুবই স্পষ্ট। এই রাজনৈতিক অবিমৃশ্যকারিতার মূল্য দিতে হয় এবং গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পরিবর্তে সশস্ত্র অভ্যুত্থান শুরু হয় কাশ্মিরে। ভারত থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতার দাবি জনপ্রিয় হয়। এই সশস্ত্র লড়াইয়ের নেতৃত্ব ছিল জম্মু কাশ্মির লিবারেশন ফ্রন্ট বা জেকেএলএফ-এর হাতে। তারা সশস্ত্র উপায়ে কাশ্মিরের স্বাধীনতার জন্য লড়াই শুরু করেছিল বটে, কিন্তু ন্যাশনাল কনফারেন্সের মতো তারাও ছিল পুরোপুরি অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের। কিন্তু এই সমীকরণও ক্রমশ বদলে যায়। মুসলিম ধর্মীয় আইডেনটিটি ভিত্তিক হিজবুল মুজাহিদিন সহ বিভিন্ন মুজাহিদিন সশস্ত্র গোষ্ঠীই কাশ্মিরের স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। আজাদির স্লোগানের সাথে সাথেই জেহাদের কথা উচ্চারিত হতে থাকে। সোভিয়েতের বিরুদ্ধে আফগানিস্তানের হয়ে লড়াই করা মুজাহিদিনেরা আফগান যুদ্ধের পর কাশ্মিরে চলে আসে। আল কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেন অনেক পরে ২০০২ সালের এক ভিডিও বার্তায় তাদের জেহাদের বিষয়গুলির মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাশ্মিরের কথাও উল্লেখ করেছিলেন। এই সাম্প্রদায়িক মুজাহিদিনরা উপত্যকার অমুসলিমদের ওপর আক্রমণ শুরু করে। সবচেয়ে বেশি হামলার মুখোমুখি হন কাশ্মিরি পণ্ডিতেরা। তাদের নির্বিচারে খুন করা শুরু হয়। বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। বাড়ির মেয়েদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। দলে দলে কাশ্মিরি পণ্ডিত সপরিবারে কাশ্মির উপত্যকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ভারত রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উপদ্রুত কাশ্মিরে পাঠানো হয় হাজার হাজার সেনা ও ১৯৯০-এর মধ্যেই অন্তত আশি হাজার সেনা কাশ্মিরের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থান করতে থাকে।

 

১৯

১৯৯০-এর পর থেকে কাশ্মিরে রাজনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমশ কমতে থাকে এবং সামরিক কার্যকলাপই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে। বিতর্ক শুধু তৈরি হয় সশস্ত্র জঙ্গিদের পরিচয় নিয়ে। ভারত রাষ্ট্রের মতে এরা মূলত পাকিস্তান ও অন্যান্য নানা জায়গা থেকে কাশ্মিরে ঢুকে পড়েছে। পাকিস্তানের মতে ভারতীয় মিলিটারির আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় এটা কাশ্মিরের ভেতর থেকে চালানো স্বাধীনতা যুদ্ধ। ভারত কাশ্মির বিষয়ে সব সময়েই দ্বিপাক্ষিক আলোচনা চেয়েছে, কারণ কাশ্মির ভারতের অঙ্গ। পাকিস্তান মনে করেছে কাশ্মিরে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে, সে কারণে এর সমাধানে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ দরকার। ভারত তৃতীয় কোনও পক্ষের হস্তক্ষেপ কাশ্মির বিষয়ে মানতে রাজী নয়। ১৯৬৫র ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের ছ বছরের মাথায় ১৯৭১এ বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে আর একবার যুদ্ধ বেধেছিল ভারত পাকিস্তানের মধ্যে। এর পরের যুদ্ধ বাধে সাতাশ বছর পর ১৯৯৮তে, যা কার্গিল যুদ্ধ নামে পরিচিত। ১৯৬৫র যুদ্ধের মতো এবারেও কাশ্মির ও সীমান্ত সমস্যাই পুরোদস্তুর যুদ্ধে পরিণত হয়, তবে এই যুদ্ধের সময় ভারত পাকিস্তান দু পক্ষই ছিল পরমাণু শক্তিধর। পুরোদস্তুর যুদ্ধ না হলেও কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে ছায়াযুদ্ধ ও সীমান্তের গোলাগুলি বর্ষণ অবশ্য নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হিসেবেই থেকে গেছে। বিশেষ করে কোনও বড় ধরনের জঙ্গি হামলার ঘটনা ঘটলেই যুদ্ধের পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের ঠিক আগেই পুলওয়ামার জঙ্গি হানার ঘটনার পর পাক অধিকৃত কাশ্মিরের বালাকোটে গিয়ে জঙ্গি ঘাঁটি ধ্বংস করে আসার দাবি জানায় ভারতীয় বায়ুসেনা। যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে, যদিও শেষ পর্যন্ত তা এড়ানো সম্ভব হয়।

 

২০

২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনে ভারতীয় জনতা পার্টি বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হল। তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাশ্মিরে স্বশাসনের যে বিশেষ ধারা ছিল ভারতের সংবিধানে, সেই ৩৭০ ধারাকে এরপর বিলুপ্ত করে দেওয়া হল। জম্মু কাশ্মির রাজ্যটিকেও ভেঙে দেওয়া হল। লাদাখকে একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে এবং জম্মু ও কাশ্মিরের বাকি অংশকে আরেকটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত করা হল। লোকসভা, এমনকি রাজ্যসভাতেও সেই এই বিলগুলি বিজেপি সহজেই পাশ করিয়ে নিল, বিরোধীদের অনেকেই তাকে সমর্থনও জানাল। অন্যদিকে কাশ্মির উপত্যকায় আরও বিপুল পরিমাণ মিলিটারি নিয়ে গিয়ে তাকে সেনাবাহিনী দিয়ে মুড়ে দেওয়া হল। গণ্ডগোলের অজুহাতে টেলিফোন, টেলিভিশন, ইন্টারনেট সবকিছু বন্ধ করে দেওয়া হল। লাদাখ এবং জম্মুতে এই সিদ্ধান্তগুলির পক্ষে সমর্থন থাকলেও এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে আগামীদিনে কাশ্মির উপত্যকায় নতুন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সঞ্চারের সম্ভাবনা প্রবল।

 

তথ্যসূত্র

  1. Ramchandra Guha – India after Gandhi
  2. Sumantra Bose – Kashmir: Roots of Conflict, Paths to Peace
  3. Christopher Snedden – Kashmir-The Untold Story: The Unwritten History
  4. A G Noorani – The Kashmir Dispute
  5. Shujaat Bukhari and R. Vijay Sankar – The Dirty War In Kashmir
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...