এ বিশ্ব কি এ শিশুর?

কৌশিক দত্ত

 

মানুষের জীবন বড় সস্তা এদেশে, বলা ভালো তথাকথিত তৃতীয় বিশ্ব জুড়ে। খাদ্যের তুলনায় উদরের, কর্মের তুলনায় হাতের সংখ্যা বেশি হলে যেমন হওয়ার কথা, ঠিক তাই। মানবিক অনুভূতিসমূহেরও মৃত্যুযুগ এই শতাব্দী। মৃত শিশুর মুখ তবু রক্ত ঝরায় হৃদয়ের শেষ জীবিত প্রকোষ্ঠে, যেখানে শিকড় ছিল মাতৃত্ব-পিতৃত্ব নামক কিছু আদিম স্নেহের। হঠাৎ একদিন সকালের কাগজ যদি আপনার চায়ের কাপ ঠোঁটে ছোঁয়ানো মুখে ছুঁড়ে মারে সাগরবেলায় আয়লান কুর্দি অথবা হাসপাতালে বাতাস খুঁজে না পাওয়া এক-দুই-তিন-তেষট্টি অতি ক্ষুদ্র শব, তবে হয়ত শেয়ার বাজারের হিসেব বা মেসি-রোনাল্ডো-কোহলি দেখতে ভুল হয়ে যেতে পারে। প্রজাতি হিসেবে সম্পূর্ণ মরে যেতে মানুষের আরও দুশ’ বছর লাগবে, বিজ্ঞানীরা বলেছেন। ততদিন আমরা বেঁচে থাকার চেষ্টা করব পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে আর বিপন্ন বোধ করব তাদের ধ্বংস হতে দেখলে। শিশুমৃত্যু আসলে নিজের ভবিষ্যতের মরে যাওয়া। তা দেখে কেঁদে ওঠা আসলে নিজের সমূহ অবলুপ্তির ভয়ে কাতরতা।

শিশুদের বাঁচাতে চাওয়ার আবেগ বস্তুত প্রজাতির উদ্বর্তনের এক প্রয়োজনীয় বন্দোবস্ত। জীববিজ্ঞানের নিরিখে আবেগমাত্রই বেঁচে থাকার মৌল তাগিদের এক প্রতিবর্ত প্রকাশ আসলে। শিশুমৃত্যুজনিত আবেগের যৌক্তিক পরিণতি, অতএব, শিশুদের বাঁচানোর চেষ্টা। বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাবার চেষ্টার মধ্যে কবির প্রতিজ্ঞা থাকবে, ফেসবুকীয় বিলাপ থাকবে, ক্রোধ থাকবে, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। জঞ্জাল সরানোর বাস্তবসম্মত প্রয়াস এবং ফলপ্রদ পদ্ধতির সন্ধান জরুরি।

মানবশিশু জন্মমুহূর্তে শারীরিকভাবে অন্য অনেক প্রাণীর তুলনায় দুর্বল, সময়ের আগে জন্ম নিলে তো কথাই নেই। তখন শরীরের তাপমাত্রা বা রক্তের শর্করা বজায় রাখতেও সে হিমসিম খায়। অতঃপর নিওনেটাল টিটেনাস থেকে শুরু করে অন্ত্র, ফুসফস, রক্ত, মস্তিষ্কের নানাবিধ ব্যাধি তো আছেই। সংক্রমণজনিত রোগ ছাড়াও জন্মগত ত্রুটি (যেমন হৃদপিণ্ডের) বা নানারকম জিনগত সমস্যা প্রাণঘাতী হতে পারে। বস্তুত জীবনের প্রথম বছরটি পার করতে না পারার সম্ভাবনা এতটাই যেকোনও এলাকার মানুষের আয়ুষ্কাল অনুমান করার জন্য “লাইফ এক্সপেক্টান্সি অ্যাট দ্য এজ অব ওয়ান” হিসেব করা হয়।

স্পষ্টতই শিশুদের প্রয়োজন বিশেষ সুরক্ষা। হয়ত সিংহশাবকের চেয়ে কিছু বেশি যত্ন প্রয়োজন মানবশিশুর। মানুষের সমাজবদ্ধ হয়ে ওঠার অন্যতম কারণ শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। শিশুসুরক্ষা সমাজের দায় ও দায়িত্ব। বর্তমান কাঠামোয় সেই সমাজ শুরু হয় পরিবার থেকে, শেষ হয় রাষ্ট্রে। বিভিন্ন অসরকারি সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার ভূমিকা বা প্রয়োজনীয়তাও অনস্বীকার্য। এর প্রতিটি পর্যায়ে সচেতনতা, আন্তরিকতা বৃদ্ধি পেলে এবং বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ হলে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব। বিজ্ঞানের প্রয়োগ মানে আরও দেড়লক্ষ ভেন্টিলেটর নয়, এর মানে পরিচ্ছন্নতা থেকে পুষ্টি, সর্বক্ষেত্রে সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা এবং সঠিক সময়ে সঠিক চিকিৎসা।

মগজে গেঁথে নেওয়া প্রয়োজন, শিশুর যত্ন শুরু হয় মায়ের যত্ন থেকে, এমনকি সেই মা গর্ভবতী হওয়ারও আগে থেকে। বস্তুত, তা শুরু হওয়া উচিত সেই মায়ের শিশুকাল থেকে বা তাঁর মায়ের থেকে। সুস্থ, শিক্ষিত ও সুখী মা সুস্থ শিশুর প্রাকশর্ত। অবশ্যই তা শিশুর সর্বাঙ্গীণ কুশলের গ্যারান্টি নয় এবং শিশুর সুস্থতার দায় একা মায়ের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়ার কোনও যুক্তি নেই, এমনকি মা যথেষ্ট যত্ন পেলেও।

চিকিৎসার ক্ষেত্রেও মনে রাখতে হবে সেই পুরনো প্রবাদ, “সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়”। শিশু-শরীরে প্রায়শই দশ ফোঁড়ের স্থান সংকুলান হয় না, তাই অনেক দেরিতে শহরের বড় হাসপাতালে দৌড়ানোর চেয়ে বেশি ফলপ্রদ প্রথমাবস্থায় গ্রামীণ হাসপাতালের কড়া নাড়া।

দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিজ্ঞানের প্রয়োগের পথে সবচেয়ে বড় বাধা অর্থনীতি (অশিক্ষাকে এর অংশ হিসেবেই ধরছি)। দরিদ্রের জন্য পুষ্টি কোথায়? নিরাপদ প্রসবের ব্যবস্থা আছে কি সর্বত্র? আছে কি প্রসব-পরবর্তী সমস্যার উপযুক্ত চিকিৎসা? প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছানোর রাস্তা কত দীর্ঘ? সেখানে গেলেই কি পাওয়া যাবে প্রাথমিক চিকিৎসাটুকু? ব্লক হাসপাতাল, কোথায় সে? শহর কত দূরে? সেখানকার গোলকধাঁধায় মন আঁধার হলে কি দেহাতি মা-বাপের হাত ধরে কেউ, নাকি দেখতে চায় শুধু আধার কার্ড?

শিশুমৃত্যু তাই চলতে থাকে। কখনও আন্ত্রিক, কখনও এনকেফালাইটিস বা ম্যালেরিয়া, কোথাও অক্সিজেনের অভাব তো কোথাও পরিশ্রুত পানীয় জলের নামই শোনেনি কেউ। উন্নয়নের সঠিক নীতি অবলম্বন ও প্রয়োগের ক্ষেত্রে বহুবছরের সামগ্রিক প্রশাসনিক ব্যর্থতা এর মূলে। কেন্দ্র ও বিভিন্ন রাজ্যের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব বিভিন্ন সময়ে থেকেছে বিভিন্ন দলের হাতে। সঠিক দিশায় এগোতে না পারার দায় কমবেশি সকলেরই। স্বাস্থ্যখাতে ব্যয়বরাদ্দ কমিয়ে বন্দুকসজ্জায় বাজেট বাড়ালে সরকারের তরফে ঘোষণা করা হয় যে মানুষ নয়, মানচিত্রই দেশ; অভ্যন্তর নয়, সীমান্তই তার সত্তা।

দায় সামগ্রিকভাবে আমাদেরও। আমাদের রাজনীতিবোধ অতি বিচিত্র ও নেতিবাচক। আমরা আমাদের প্রশাসকদের সঠিক কাজ করতে বাধ্য করিনি, বস্তুত তার চেষ্টাই করিনি। পারস্পরিক দোষারোপের সহজ রাজনৈতিক খেলাটিতেই আমরা মেতে থেকেছি। যদি আমার দলের সরকার হয়, তাহলে এককথায় সব দায় ঝেড়ে ফেলব অথবা অকারণ তুলনা টেনে বলব, “কেরলেও তো ৪২০ জন মারা গেছিলেন”, আর যদি আমি হই সরকার-বিরোধী, তাহলে খুব খানিক গালমন্দ করে আনন্দ পাব এবং পরবর্তী নির্বাচনে রাজনৈতিক ফায়দা তোলার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। এই রাজনীতি দেখে মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, শিশুদের মৃত্যুতে সত্যি কি কেউ দুঃখিত, নাকি আরেকটি রাজনৈতিক মুদ্রা হাতে পেয়ে ভোটবাজারের ক্রেতাসাধারণ আদতে খুশি?

বহু সংখ্যক শিশুর অকালমৃত্যু অথবা অন্য কোনও অপ্রত্যাশিত দুর্ঘটনা ঘটলে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। তদন্ত তো হওয়ার কথা সমস্যার উৎস খুঁজে বের করে তাকে শোধরানোর জন্যে। অথচ আমরা তদন্ত বলতে বুঝি এক-দুজন মানুষকে দোষী চিহ্নিত করে শাস্তি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা। জনতার দাবিও মূলত সেটাই। নিজেদের বাঁচানোর জন্যে অতএব সরকারি অফিসার বা কর্মচারীরা সত্য অস্বীকার করবেন, মিথ্যের জাল বুনবেন। সাম্প্রতিক গোরক্ষপুরের ঘটনার ক্ষেত্রে যেমন রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রীয় তদন্তকারী দল বলে দিলেন অক্সিজেনের অভাবে মৃত্যু হয়নি। অথচ বলা উচিত ছিল, মৃত্যুর কারণ যাই হোক, এত বড় হাসপাতালে অক্সিজেন না থাকাটা মেনে নেওয়া যায় না। মুখ্যমন্ত্রী বললেন, এ শহর চিরকাল নোংরা, আগেও এখানে এত বাচ্চা মরেছে। অথচ বলার কথা ছিল, যদিও এখানে আগেও শিশুমৃত্যু হয়েছে, তবু আমার সময়ে যে আবার হল, এ আমার দুর্ভাগ্য ও ব্যর্থতা; সংশোধনের দায়ও আমাদের। বলতে পারলেন না তাঁরা এইটুকু কথা সাহস করে। সরকারও জানে, দায় মেনে নিলেই বিরোধীপক্ষ সেটাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। সুতরাং চলতে থাকবে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা, বাস্তবকে না দেখার চেষ্টা। সব মিলিয়ে সত্যকে স্বীকার করার, তার মুখোমুখি হওয়ার, নিজের (বা নিজের দপ্তরের) কাজের বিশ্লেষণে সৎ হবার কোনও সামাজিক বা রাজনৈতিক পরিসর নেই। সত্যভাষণকে প্রবলভাবে ডিসকারেজ করার একটা বন্দোবস্ত রয়েছে আমাদের সিস্টেম এবং আমাদের প্রতিরোধ, উভয়ের মধ্যেই। শাসন বলতে আমরা বুঝি ক্ষমতার আস্ফালনের দ্বারা সকলকে চুপ করিয়ে রাখা, আর আন্দোলন বলতে বুঝি কাউকে গালি দেওয়া বা পেড়ে ফেলা। গঠনমূলক প্রশাসন এবং আন্দোলনে আমাদের প্রবল অনীহা। তাই রাজা বদল হয়, বদলায় না গভর্নেন্স।

বিক্রমাদিত্যকে বেতাল শুনিয়েছিল এক বালকের গল্প, যার দরিদ্র বাবা-মা তাকে বিক্রি করে দিয়েছিল রাজার কাছে, আর তান্ত্রিকের পরামর্শে রাজা তাকে বলি দিতে উদ্যত হয়েছিলেন। মৃত্যুর প্রাকমুহূর্তে ছেলেটি একবার কেঁদেছিল আর একবার হেসেছিল। কেন তার এই হাসি-কান্না? বিক্রমাদিত্য বলেছিলেন জন্মের পর সন্তানকে রক্ষা করেন পিতামাতা, অথচ তাঁরা অর্থের লোভে সন্তানকে বিক্রি করে দিলেন! এই দুঃখে ছেলেটি কেঁদেছিল। সকলে বিরূপ বা ব্যর্থ হলে প্রজা যায় রাজার শরণে, আর সেই রাজাই কিনা নিজস্বার্থে অসহায় বালক প্রজাকে বলি দিতে চলেছেন! এই প্রহসন দেখে সে হেসেছিল। আমাদের শিশুরাও বুঝি আমাদের কাজকর্ম দেখে অবাক হয়ে দেয়ালা করে। গর্ভস্থ কন্যাভ্রূণকে হত্যা করাচ্ছেন বাবা, ডাস্টবিনে কুকুরের মুখে অসুস্থ সন্তানকে ফেলে দিচ্ছেন মা, নিতান্ত কেজো ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে রণে ভঙ্গ দিচ্ছেন বৈদ্য, আশ্রয় না দিয়ে অজুহাত দিচ্ছেন রাজা, আর বিবেকের বেশধারী সমাজ শকুনির সঙ্গে বসে সদ্যমৃত শিশু-হাড় থেকে তৈরি করছে রাজনৈতিক দ্যূতক্রীড়ার অক্ষ।

কে বাঁচাবে এই জাতিকে? কে বাঁচাবে এই প্রজাতিকে? এ বিশ্ব কি এ শিশুর বাসভূমি হবে কোনওদিন? নাকি বধ্যভূমি রঙমহলে একবার কেঁদে আর ক্ষণিক হেসে বিদায় নেবে আরও তেষট্টি হাজার… তেষট্টি লক্ষ শিশু?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3248 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. তবে ‘খাদ্যের তুলনায় উদরের, কর্মের তুলনায় হাতের সংখ্যা বেশি’ বলে কি জনসংখ্যাকেই দেশের মূল সমস্যা বলতে চাইলেন? যদি হয়, আপত্তি রইল…

আপনার মতামত...