নোটবন্দি: ফিরে দেখা

সুমন কল্যাণ মৌলিক

 



প্রাবন্ধিক, মানবাধিকার কর্মী

 

 

 

 

আচ্ছে দিনের মুক্তকচ্ছ সমর্থক হোক বা অন্ধ ভক্ত— সময়টা কারওই ভালো কাটছে না। একদিকে কোভিড অতিমারি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পর্বতপ্রমাণ ব্যর্থতা ও ৫৬ ইঞ্চি ছাতিবিশিষ্ট প্রধানমন্ত্রীর নিদারুণ অযোগ্যতা অপরদিকে দেউলিয়া অর্থনীতির ভ্রূকুটি। অহরহ নিজেদের নতুন বিশ্বের ‘সুপারপাওয়ার’ হিসেবে দাবি করা ভারত আজ বচনবাগীশ প্রধানমন্ত্রী ও তার সহকর্মীদের দৌলতে জিডিপির বিচারে বাংলাদেশের চেয়েও নিচে। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতে বেকারত্বের হার ২৩ শতাংশ যা স্বাধীন ভারতে সর্বোচ্চ। এই মুহূর্তে শুধু গঙ্গা দিয়ে নাগরিকদের লাশই ভেসে যাচ্ছে না, একই সঙ্গে ভেসে যাচ্ছে বিজেপির আইটি সেল ও কর্পোরেট মিডিয়ার যুগলবন্দিতে গড়ে ওঠা লৌহপুরুষের ইমেজ। সম্প্রতি চিত্রনাট্য মেনে করোনায় মৃতদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কান্নার ছবিকে দেশি-বিদেশি মিডিয়া কুম্ভীরাশ্রু হিসাবে ব্যঙ্গ করেছে যা কিছুদিন আগেও কল্পনা করা যেত না। এই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ মেরামতির জন্য ‘বি পজিটিভ’ নামে আরেক দফা প্রচারাভিযান সংগঠিত করতে চলেছে সরকার যার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সাত বছর পূর্তি। স্বাভাবিকভাবেই এই সময় মিথ্যা প্রচারের ফানুসকে চুপসে দেওয়ার জন্য আমাদের শুধু করোনাকালে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, একই সঙ্গে বিগত সময়ে নরেন্দ্র মোদির যে সমস্ত নীতি ও সিদ্ধান্তের দরুন দেশের আর্থিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে তাকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে যুক্তি-তর্কের সাহায্যে। বর্তমান নিবন্ধে আমরা ফিরে দেখব মোদি সরকারের বহু আলোচিত সেই নীতি— নোটবন্দি বা বিমুদ্রাকরণ।

২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি টেলিভিশনে এক অগ্নিবর্ষী ভাষণের মধ্যে দিয়ে নোটবন্দির কথা ঘোষণা করেন। এর ফলে একধাক্কায় বাজার চলতি নোটের ৮৬ শতাংশ (নগদ অর্থমূল্য ১৫.৪৬ লক্ষ কোটি টাকা) অবৈধ হয়ে যায়। আর মাস ছয়েক পরে সেই সিদ্ধান্তের ছয় বছর পূর্ণ হবে। যে কোনও আর্থিক সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে প্রথম মানদণ্ড হল সেই সিদ্ধান্ত কোন উদ্দেশ্য পূরণের জন্য গৃহীত হয়েছিল এবং প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সেই উদ্দেশ্য কতটা পূরণ হল তা বিচার করা। দেখা যাক নোটবন্দির ঘোষিত উদ্দেশ্য কী ছিল।

এক্ষেত্রে প্রথমে বলা হয়েছিল নোট অবৈধ ঘোষণার কারণ আসলে দুটো— (১) জাল নোট, যা দেশের অর্থনীতির ক্ষতিসাধক এবং বিভিন্ন নাশকতামূলক কার্যকলাপের (প্রধানত তথাকথিত সন্ত্রাসবাদ) পৃষ্ঠপোষক। (২) হিসাব বহির্ভূত আয় সম্পদ, যা সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা অনুসারে ব্ল্যাকমানি বা কালা ধন। এ দুটো উদ্দেশ্য পূরণের জন্য মোদির ঘোষণা আসলে এক যুদ্ধের হুঙ্কার, এবং গোটা দেশবাসী সেই যুদ্ধের সৈনিক। আর সেই যুদ্ধের শেষে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে এক ‘রামরাজ্য’। ব্যাঙ্কে বা এটিএমের সামনে দীর্ঘ লাইন আসলে শেষ লাইন, মোদির ভাষায় যা খতম করবে দারিদ্র, অভাব, বঞ্চনা ও কালোবাজারির চিরকালীন লাইনকে।

কিন্তু কিছুদিন পর থেকে জাল টাকা ও কালাধনের বিরুদ্ধে রণদামামার আওয়াজ কমতে লাগল। আর মোদি ও তার উপদেষ্টাদের মুখে আমরা শুনতে পেলাম নতুন গান, যে গানের মূল কথা হল ‘ক্যাশলেস ইকোনমি’। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট নির্ভর নগদবিহীন অর্থনীতি হয়ে উঠবে আমাদের যাবতীয় মুশকিল আসান। অর্থাৎ মাত্র একমাসের মধ্যে আমরা দেখতে পেলাম, নিজের সুবিধামত গোলপোস্ট সরানোর খেলা। প্রত্যেকদিন নতুন নতুন লক্ষ্য ও আর্থিক তত্ত্ব ঘোষণা, কিন্তু কোনও কিছুতেই স্থির না থাকা। তাতে অবশ্য মোদিবাবুরা পালাতে পারবেন না। কারণ জালটাকা বা কালাধন বা ক্যাশলেস ইকোনমির স্লোগান— আমরা যুক্তি ও তথ্যের আলোকে সরকারের তৈরি করা প্রত্যেকটা গোলপোস্টকেই মেপে দেখব।

২০১৬-র ৮ নভেম্বর বাজারে পুরানো ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট মিলিয়ে ১৫.৮৮ লক্ষ কোটি টাকা ছিল। তার মধ্যে জমা পড়েছে ১৫.২৮ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ, ৯৯.৮ শতাংশ নোট ব্যাঙ্কব্যবস্থায় ফিরে এসেছে। ৫০০ টাকার নোটের ৯৯.১৭৭ শতাংশ ও ১০০০ টাকার নোটের ৯৮.৭ শতাংশ ফিরে এসেছে। পুরনো ১০০০ টাকার নোটের মধ্যে ০.০০০৭ শতাংশ নোট ও ৫০০ টাকার নোটের মধ্যে ০.০০২ শতাংশ জাল বেরিয়েছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার প্রাপ্তি হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা, অথচ নোট ছাপাতে খরচ হয়েছে ২১ হাজার কোটি টাকা। এই তথ্যগুলি থেকে এটা পরিষ্কার যে নোটবন্দির মাধ্যমে জাল নোট শেষ করার উদ্দেশ্যটা হয় ব্যর্থ হয়েছে বা আদৌ জাল টাকা ভারতীয় অর্থনীতির মূল সমস্যা নয়। অর্থনীতি সম্পূর্ণ জালটাকাবিহীন— পৃথিবীতে এমন কোনও দেশের অস্তিত্ব নেই। এদেশেও জাল টাকা আছে। আজ নয়, চিরকালই আছে। সমস্যাটা তখনই বড় আকার ধারণ করে যদি তা দেশের মূল অর্থনীতিকে গ্রাস করে। কলকাতা-স্থিত ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইন্সটিটিউট এবং ন্যাশানাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সির সমীক্ষা থেকে প্রকাশ পেয়েছে বাজারে চালু প্রতি দশ লক্ষ নোটের মধ্যে জালের সংখ্যা মাত্র আড়াইশো। শতাংশের হিসাবে সমগ্র মুদ্রার মাত্র ০.০২৫ শতাংশ। আরও বলা হয়েছে কোনও একটি নির্দিষ্ট সময়ে বাজারে চালু জাল নোটের মোট মূল্য ৪০০ কোটি টাকার বেশি নয়। তাহলে, মাত্র ৪০০ কোটি টাকার জাল নোট সামলাতে গিয়ে ‘ধর্মযোদ্ধা’ প্রধানমন্ত্রী ১৫.৪৬ লক্ষ কোটি টাকার (৮৬ শতাংশ) নোট বাতিল করে দিলেন।

আসলে জাল নোট নয় বরং জাল নোট নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জালিয়াতি করা হয়েছে। আর সে জালিয়াতিকে গেলানের জন্য তার ওপর মাখানো হয়েছে ‘সন্ত্রাসবাদ’ জনিত ভীতির প্রলেপ। কিন্তু তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেওয়া যায় আমাদের পড়শি রাষ্ট্র (পড়ুন পাকিস্তান) জাল টাকা ভারতের বাজারে ছড়িয়ে দেশের অর্থনীতিকে বিপন্ন করেছে, তা হলে প্রযুক্তিনির্ভর জালিয়াতি তারা আর যে করবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়? বরং ছকটা এখানে অনেক জটিল। সন্ত্রাসবাদ ও জাল টাকার জুজু দেখিয়ে মোদি সরকার আসলে কাশ্মিরিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের লড়াই, নাগা-মিজো-মনিপুরি জনগণের জাতিসত্তার স্বীকৃতি প্রতিষ্ঠার লড়াই, পূর্ব ও মধ্য ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে জল-জমি-জঙ্গল বাঁচানোর জন্য দলিত ও আদিবাসী মানুষের প্রতিরোধ আন্দোলনের ন্যায্যতাকে নাকচ করতে চায়। সবচেয়ে হাস্যকর হল যে জাল টাকা আটকানের জন্য হাজার টাকার নোট বদল করে দু হাজার টাকার নোট চালু করা হয়েছিল, যে দু হাজার টাকার নোট আবার ধীরে ধীরে বাজার থেকে তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

নোটবন্দির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অবশ্যই কালো টাকা। নরেন্দ্র মোদির ঘোষণার পর প্রাথমিক পর্যায়ে যে জনসমর্থনের জোয়ার দেখা দিয়েছিল,তার প্রধান কারণ অবশ্যই কালো টাকা বিরোধী জেহাদ। কিন্তু কালো টাকা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই এক রাতের নাটক নয়, বরং এক ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। স্বাভাবিকভাবে আমাদের প্রশ্ন ছিল, নোটবন্দির মাধ্যমে দেশের ৮৬ শতাংশ মুদ্রাকে অচল করে দিয়ে অর্থনীতি থেকে কালো টাকা নির্মূল করা সম্ভব? ৯৯.৭ শতাংশ টাকা আবার ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় ফিরে এল। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আশা ছিল তিন লক্ষ কোটি টাকা আর ফিরবে না। কিন্তু বাস্তবে টাকার অঙ্কটা দশ হাজার কোটি টাকার সামান্য বেশি। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে দেশে কালো টাকা ফিরিয়ে আনা ও পরবর্তীতে প্রত্যেক নাগরিকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা ঢুকিয়ে দেওয়ার যে মিথ্যা প্রচার নরেন্দ্র মোদি ও অমিত শাহেরা চালিয়েছিলেন, নোটবন্দির সময় কালো টাকা বিরোধী জেহাদ সেই একই মিথ্যাচারের অন্তর্গত।

এক্ষেত্রে অর্থনীতিতে কালো টাকা কীভাবে থাকে সেটাও আমাদের বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। পুরনো হিন্দি সিনেমার কিম্ভূতকিমাকার খলনায়ক ছাড়া কেউ বালিশের ওয়াড়ে বা তোষকের তলায় কালো টাকা গচ্ছিত রাখে না। কেন্দ্রীয় সরকারের আয়কর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী তাদের তল্লাশির মধ্যে দিয়ে যত ‘কালা ধন’ বাজেয়াপ্ত করেছে, তার মাত্র ৫ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ রয়েছে নগদে। বাকি সম্পদ জমি, সোনা ও শেয়ারে গচ্ছিত আছে। কালো টাকা স্টক নয়, আদতে চলমান। কোনও আর্থিক বর্ষে যেটা ‘কালো টাকা’, তা আবার আর্থিক বিনিময়ের প্রক্রিয়ায় ‘সাদা টাকায়’ রূপান্তরিত হয়। ভারতীয় অর্থনীতিতে কালো টাকার পরিমাণ কত তা নিয়েও বিভিন্ন মত আছে। এক্ষেত্রে সব মহলে তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য হিসাব হল বিশ্বব্যাঙ্কের, যাতে বলা হয়ছে ভারতীয় জিডিপির ২০-৩০ শতাংশ কালো টাকা। তাই কালো টাকা তৈরির পথটা বন্ধ না করে এক হুকুমে নোটবন্দি করে কালো টাকা বাজেয়াপ্ত করার কল্পনা নির্বোধের দিবাস্বপ্ন ছাড়া আর কিছু নয়। বাস্তবেও অন্য কিছু ঘটেনি।

এবার আমরা দেখে নেব এদেশে ক্যাশলেস ইকোনমির হালহকিকত। একথা অনস্বীকার্য যে সরকার ডিজিটাল পেমেন্টের ক্ষেত্রে নানান ধরনের সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে এবং একই সঙ্গে নগদ টাকার লেনদেনকে নিরুৎসাহিত করার জন্য নানান ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। ব্যাঙ্ক ও এটিএম থেকে গ্রাহক বেশিবার টাকা তুললে তাকে অতিরিক্ত চার্জ দিতে হচ্ছে। ইন্টারনেট পরিষেবার তুলনামূলক উন্নতি ও স্মার্টফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা বেড়েছে। এই সবকিছুর ফলে শহরাঞ্চলে ডিজিটাল পেমেন্ট বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু নগদ টাকার ওপর নির্ভরতা কমেনি। এক্ষেত্রে আমরা সংখ্যাতত্ত্বের আশ্রয় নিতে পারি। ২০১৭ সালের ৮ নভেম্বর অর্থনীতিতে নগদের জোগান ছিল ১৭.৯৭ লক্ষ কোটি টাকা। নোটবন্দির পর ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে তা কমে হয় ৭.৮ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু নোটের জোগান যেই ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে তখন ছবিটা আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরতে থাকে। ২০২০ সালের নভেম্বর মাসে পরিমাণটা হয় ২৬.১৯ লক্ষ কোটি টাকা অর্থাৎ সরল পাটিগণিতের হিসাবে ২০১৬ সালের তুলনায় ৮.২২ লক্ষ কোটি টাকা (৪৭ শতাংশ) বেশি। বিষয়টা অস্বাভাবিক নয় কারণ ২০১৬ সালের এক সমীক্ষা অনুসারে ভারতে নগদভিত্তিক অর্থনীতির পরিমাণ ছিল ১.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার যা ২০২১ সালে হবে ২.৪৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল গতবছর লকডাউনের সময় মানুষ কিন্তু নগদের ওপরেই ভরসা করেছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারি মাসে এটিএমের মাধ্যমে মানুষ টাকা তুলেছে ২,০০,৬৪৮ কোটি টাকা যা লকডাউনের সময়ে (আগস্ট ২০২০) বেড়ে হয়েছে ২,৩৭,৭৭৮ কোটি টাকা। আর ইউপিআই-এর মাধ্যমে ব্যবসার পরিমাণ মার্চ ২০২০-র তুলনায় এপ্রিল ২০২০-তে ১৯.৮ শতাংশ কমে যায়। এই সংখ্যা প্রমাণ করে ক্যাশলেস ইকোনমির স্লোগানও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছে।

জাল নোট, কালো টাকা, ক্যাশলেস ইকোনমির মত বহুকথিত উদ্দেশ্যগুলি পূরণে চূড়ান্ত ব্যর্থ হলেও নোটবন্দি দেশের অর্থনৈতিক পরিকাঠামোটি চুরমার করে দিতে একশো শতাংশ সফল। সেই সার্জিকাল স্ট্রাইকের পর আমরা দেখেছিলাম ব্যাঙ্ক ও এটিএমের দরজায় হত্যে দিয়ে পড়ে আছেন লক্ষ লক্ষ আমার-আপনার মত সাধারণ মানুষ। ব্যাঙ্কের লাইনে যে ১২৫ জন সহ নাগরিকের মৃত্যু ঘটেছিল তাঁদের কেউই আম্বানি-আদানি-টাটাদের বাড়ির লোক ছিলেন না। সে ইতিহাস দীর্ঘায়িত করে লাভ নেই, আমরা বরং দেখব এই নোটবন্দি ভারতের অর্থনীতিতে কিরকম দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলল। নোটবন্দির অব্যবহিত পরেই দেশের অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমি’ (CMIE) বলেছিল নোটবন্দির কারণে ভারতীয় অর্থনীতিকে ১.২৮ লক্ষ কোটি টাকা গচ্চা দিতে হবে, যা বাস্তবত দিতে হয়েছে আরও অনেক বেশি। গীতা গোপীনাথ ও গ্যাব্রিয়েল চোডরো নোটবন্দির অর্থনৈতিক প্রভাব সংক্রান্ত গবেষণায় দেখিয়েছেন এই সিদ্ধান্ত ব্যবসা ও চাকরির ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলেছে। আঘাতটা সবচেয়ে বেশি আসে অসংগঠিত ক্ষেত্রে। অর্থনৈতিক সংস্থা অ্যামবিট ক্যাপিটাল হিসাব করে দেখিয়েছিল ২০১৭-১৮ আর্থিক বর্ষে বৃদ্ধির হার কমে হবে ৫.৮ শতাংশ। সেই যে বৃদ্ধির গতি নিম্নমুখী হতে শুরু করে তা আজ ঋণাত্মক। সিএমআইই-এর হিসাব অনুযায়ী নোটবন্দির প্রথম চার মাসে ১৫ লক্ষ মানুষ কাজ হারান। আমরা বরং রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন গভর্নর রঘুরাম রাজনের সেই কথাটি স্মরণ করতে পারি যেখানে তিনি বলেছিলেন প্রথমে নোটবন্দি ও পরে জিএসটি (এই বিষয়টিও দীর্ঘ আলোচনার দাবি রাখে) ভারতের অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করায়। নোটবন্দি ভারতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থাকেও প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তুঘলকি সিদ্ধান্তের ফলে দেশের কো-অপারেটিভ ব্যাঙ্কগুলো ঠুঁটো জগন্নাথ হয়ে যায়। এমনকি খোদ রিজার্ভ ব্যাঙ্কেরই ৪৩ দিনে ৬০ বার নতুন ঘোষণার ফলে সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিই মানুষের বিশ্বাস হারায়। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের বক্তব্য এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য—

নোটে লেখা থাকে যে তা নিয়ে গেলে তার সমপরিমাণ টাকা দিতে ব্যাঙ্ক প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সেই কথা ভাঙা স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত— এই সিদ্ধান্ত নোট, ব্যাঙ্ক, অর্থনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের মূলে কুঠারাঘাত।

নোটবন্দির ঘোষণার কয়েকদিন পর নরেন্দ্র মোদি বুক ঠুকে বলেছিলেন আমাকে দয়া করে ৫০ দিন সময় দিন, ব্যর্থ হলে পুড়িয়ে মারবেন। যদিও মোদিজির জমানায় ভিন্ন ধর্মের বা ভিন্ন চিন্তার মানুষদের পুড়িয়ে মারা, পিটিয়ে মারা, কুপিয়ে মারা জলভাত, তবু গণতন্ত্রে ও যুক্তিবাদে বিশ্বাসী মানুষের কাছে পুড়িয়ে মারার দাবি এক বর্বরোচিত আস্ফালন ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু নোটবন্দির পাহাড়প্রমাণ ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বিচারবিভাগীয় তদন্তের মুখোমুখি হোন— এ দাবি আমাদের করতেই হবে। বিশিষ্ট জার্মান সাংবাদিক ডঃ নরবার্ট হেইরিং বলেছেন, ‘Demonetisation itself may be an act of corruption’। আমরা এ কথাকে সমর্থন করি।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3545 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...