এক কল্পিত আখ্যান ও ঘরে ফেরার গান

সোমনাথ মুখোপাধ্যায়

 


প্রাবন্ধিক, গদ্যকার, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক

 

 

 

এ বছর গরমের দাপট বেশ বেড়েছে। তাই বেলা গড়াতেই মহল্লার মানুষজনের দরজার খিল এঁটে ঘরে ঢুকে পড়ার বেজায় তাড়া। একে অতিমারির ফতোয়া, তার ওপর আগুনে গরমের দাপাদাপি। মহল্লার অলিগলি বেবাক শুনশান, লোকজন সব গৃহবন্দি। স্বাভাবিক সময়ে গোটা অঞ্চল নানান কিসিমের মানুষজনের আনাগোনায়, হাঁকাহাঁকির শব্দে একেবারে গমগম করে। অথচ এখন…। অন্যান্য বছরে বাৎসরিক পরীক্ষার পর্ব মিটে যেতেই মুন্না, প্রেম, গোপাল, বান্টিরা ব্যাট, বল আর উইকেটের তিন কাঠি নিয়ে নেমে আসে রাস্তায়। কংক্রিটের বাঁধানো রাস্তাগুলো, কী আশ্চর্য জাদুকাঠির ছোঁয়ায়, এক লহমায় মোহালি, ওয়াংখাড়ে বা ইডেন গার্ডেনস হয়ে ওঠে। ব্যাটসম্যানরা ব্যস্ত থাকে হাতের ব্যাট ঘুরিয়ে রানের তুবড়ি ফোটাতে আর বোলাররা হাত থেকে গোলা দাগতে থাকে হই হই করে। এখন সব নিস্তব্ধ, মাঝে মাঝে মনে হয় কোন অভিশাপে ব্যস্ততার অহঙ্কার এমন ঘুচে গেল। অতিমারির কারণে এ-বছর স্কুলের কোনও পরীক্ষাই নেওয়া যায়নি। আর পরীক্ষা হবেই বা কী করে! পঠনপাঠনের পাট চুকেছে অনেকদিন। গোটা স্কুলবাড়িটাকে ছোট্ট একটা ফোনের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া যায়! অথচ দেখো, অনলাইন ক্লাসের ডিজিটাল মোড়কে মুড়ে তাকেই এখন হজম করানোর চেষ্টা চলছে। প্রেম এবার ক্লাস ফোরে উঠবে। ওর স্কুল থেকে সমানে মেসেজ আসছে ওর বাবার মোবাইল ফোনে… নতুন শিক্ষাবর্ষে ওকে নতুন ক্লাসে নাম লেখাতে হবে। আপনার ওয়ার্ড প্রেম সেহার পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। স্কুলে নতুন ক্লাসে আপনার ওয়ার্ডের নাম নথিভুক্ত করে আমাদের সঙ্গে সহযোগিতা করুন। ভর্তি সংক্রান্ত সমস্ত তথ্যের জন্য স্কুলের ওয়েবসাইট ডব্লুডব্লুডব্লু ডট অমুক ডট কম দেখুন।

অনেক আশা আর স্বপ্ন নিয়ে প্রেমের বাবা ওমপ্রকাশ সেহার ছেলেকে গ্রামের প্রান্তে, পকেটে হঠাৎ পয়সা আসা বড়লোকের মতো, গজিয়ে ওঠা শহরের একটা বেসরকারি স্কুলে দাখিল করেছিল। নিজের জীবনে বিশেষ লেখাপড়ার সুযোগ পায়নি। গ্রামের স্কুলেই দশ ক্লাসের পাট চুকিয়ে সে বড়েচাচার হাত ধরে এসে যোগ দিয়েছিল শহরের এক কাপড়ের কলে। আজ সে অধ্যবসায় আর পরিশ্রমের দৌলতে সুপারভাইজার পদে উন্নীত হয়েছে। বেশ চলে যাচ্ছিল দিনগুলো। স্ত্রী সবিতা, ছেলে প্রেম, মেয়ে মাধুরী আর বৃদ্ধা মাকে নিয়ে তার সুখের সংসার। কিন্তু অতিমারির দাপটে সব কেমন ওলটপালট হয়ে গেল। আজ এক বছরেরও বেশি সময় একরকম গৃহবন্দি অবস্থায় দিন কাটছে। কোম্পানি জানিয়ে দিয়েছে তাদের পক্ষে আগের বেতন দেওয়া সম্ভব নয়, মাইনে প্রায় আধা হয়ে গিয়েছে। কীভাবে এমন পরিস্থিতির সঙ্গে যুঝবে তা ভেবে আকুল হয়ে যাচ্ছে ওমপ্রকাশ। এই মহল্লার কেউ ভালো নেই।

ছোট্ট প্রেম এই বদলে যাওয়াটা বেশ বুঝতে পারছে। আজ কতদিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ। স্কুল, ক্লাসঘর, খেলার মাঠ, বেঞ্চে গা-ঘেষাঘেষি করে বসে থাকা বন্ধুরা, তাদের সঙ্গে নানা খুনসুটি, স্যার আর ম্যামদের আদর-শাসন— সবকিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মনমরা সময় কাটে প্রেম ও তার বন্ধুদের। মোবাইলের পড়াশোনায় তার মন বসে না। বাবার পাশে শুয়ে থাকতে থাকতে দু চোখ ঘুমে ঢলে পড়ে। এমন সময়ে তীব্র শব্দে আবারও বেজে ওঠে মোবাইল ফোন। সুইচ বাটনে হাল্কা চাপ দিতেই ভেসে আছে যান্ত্রিক কিছু শব্দ। হিয়ার ইজ অ্যান অ্যানাউন্সমেন্ট ফ্রম …। ইয়োর ওয়ার্ড হ্যাজ বিন প্রোমোটেড টু ক্লাস ফাইভ। প্লিজ এনরোল হিজ নেম ফর ফোর্থকামিং সেশন। ফর ফিজ অ্যান্ড আদার ডিটেইলস কনট্যাক্ট অমুক ডট কম। প্রবল হতাশায় ওমপ্রকাশ ফোনটাকে সাইলেন্ট মোডে রেখে একটু ঘুমোবার চেষ্টা করে। লাগাতার ফোনের তাড়নায় এই কদিন ঠিক করে ঘুম হয়নি। প্রেমের ভবিষ্যত নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেবে তা ঠিক করে উঠতে পারে না। নিজের মহল্লার অন্যান্য অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেছে এ বিষয়ে। তাদের অনেকের অবস্থাই ওমপ্রকাশের মতো। অবশ্য গোপাল সরকারি স্কুলে পড়ে বলে তার বাবা দীনদয়ালের কোনও বাড়তি উদ্বেগ নেই। ছেলেকে সেখানেই ভর্তি করে দিয়েছে। মহল্লার বাজারে একটা ছোট্ট মনিহারি জিনিসের দোকান তার। লকডাউনের কারণে ব্যবসাপত্র প্রায় লাটে উঠেছে। প্রাইভেট স্কুলের হাজারো খরচের বোঝা বইবার মতো সামর্থ্য নেই। অগত্যা মধুসূদনই ভরসা…

তন্দ্রার ভাবটা বেশ গাঢ় হয়ে উঠতেই নতুন একটা ঘোষণার শব্দ কানে আসে ওমপ্রকাশের। আওয়াজটা স্পষ্টতর হওয়ার অপেক্ষায় নিদ্রালু চোখদুটোকে বন্ধ করেই কান দুটোকে খাড়া করে। মিউনিসিপ্যালিটির তরফে কোনও ঘোষণা? কেননা করোনাকালে সহনাগরিকদের স্বাস্থ্যবিধিগুলিকে মেনে চলার জন্য নানা সচেতনতামূলক প্রচার চালানো হয় নিয়মিত; আবার কখনও সরকারি প্রকল্পের সুবিধা নেওয়ার জন্য আবেদনপত্র সহ ‘দুয়ারে সরকার’কে এনে হাজির করে প্রশাসন। তবে সব প্রচারেরই ধ্বনিগত তারতম্য আছে। এ আওয়াজ তো তেমন নয়! ওমপ্রকাশ মনে মনে খানিকটা উত্তেজনা বোধ করে আওয়াজটাকে বুঝতে না পারার জন্য। ঘোষণার শব্দটা অনেকটা তীব্র হয়। ঘোষকরা মহল্লার এই প্রান্তে হাজির হয়েছেন। ঘোষণার শব্দ আরও, আরও… আরও স্পষ্ট হতে হতে একসময় ওমপ্রকাশের কর্ণপটে এসে আছড়ে পড়ে, বাঙ্ময় হয়ে ওঠে— ‘আব কি বারি/স্কুল সরকারি’। ওমপ্রকাশ ও প্রেম— বাপ আর ব্যাটা— দুজনেই ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। দুজনে পরস্পর মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকে পরম বিস্ময়ে। চারিদিক থেকে কপাটের ছিটকিনি খোলার শব্দ ভেসে আসে। বিছানা থেকে দ্রুতপায়ে নেমে আসে ওমপ্রকাশ। পেছনে প্রেম— প্রেমকুমার সেহার। প্রোমোটেড টু ক্লাস ফাইভ, পঞ্চম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ…

২.

এবার একটা পরিসংখ্যানের পর্ব। সূত্র— ডাইরেকটোরেট অফ স্কুল এডুকেশন, হরিয়ানা গভর্নমেন্ট। কী বলছে এই পরিসংখ্যান? সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় আধিকারিকরা জানাচ্ছেন— ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষ চালু হওয়ার তিন মাস পরে প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করে দেখা গেছে যে, বিগত ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রায় ১২.৫ লক্ষ বেসরকারি স্কুল-শিক্ষার্থী স্কুলে ভর্তি হয়নি। মানে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী নতুন শিক্ষাবর্ষে তাদের নাম স্কুলের নতুন ক্লাসে নথিভুক্ত করেনি। হরিয়ানা শিক্ষা দপ্তর সূত্রে জানা যাচ্ছে যে ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে রাজ্যের বেসরকারি স্কুলগুলিতে মোট ২৯.৮৩ লক্ষ শিক্ষার্থী তাদের নাম নথিভুক্ত করলেও এ বছর (২০২১-২২) তা নেমে এসেছে ১৭.৩১ লক্ষে। অর্থাৎ ১২.৫২ লক্ষ শিক্ষার্থী আলোচ্য শিক্ষাবর্ষে হরিয়ানা রাজ্যের বেসরকারি, ব্যক্তিগত বা ট্রাস্টের অধীনস্থ স্কুলগুলি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে— স্কুলে ভর্তি হয়নি। হরিয়ানাতে এমআইএস (ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম) ব্যবস্থাপনায় স্কুলের প্রতিটি ছাত্র-ছাত্রীর নাম ও বিবরণ নথিভুক্ত করতে হয় (আমাদের রাজ্যেও এমন ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে), আর সেই তালিকা যাচাই করতে গিয়েই আধিকারিকদের চক্ষু চড়কগাছ।

বিষয়টি নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়ে গেছে সরকারি শিক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তা থেকে স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত। কেন এমন বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী নিজেদের নাম নতুন শিক্ষাবর্ষের খাতায় ওঠাল না? কী এর সম্ভাব্য কারণ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে একাধিক সম্ভাবনার কথা বলছেন আধিকারিকরা। যার মধ্যে, তাঁদের মতে, প্রাইভেট স্কুলের লাগামছাড়া খরচের বহর অন্যতম প্রধান কারণ। অতিমারিজনিত গভীর অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সাধারণ মানুষের এখন নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর দশা। বহু সংখ্যক মানুষ কর্মচ্যুত হয়েছেন অথবা কর্মের নিরাপত্তা খুইয়ে কোনওরকমে মাথা নুইয়ে রুটি-রুজির সংস্থানে দিনাতিপাত করছেন। এই বিধ্বস্ত আর্থিক অবস্থায় সন্তানদের ব্যয়বহুল শিক্ষার আয়োজন করা তাঁদের পক্ষে মোটেই সম্ভব হচ্ছে না। ফলে নিতান্ত বাধ্য হয়েই সন্তানদের স্কুলের আঙিনা থেকে হয় সরিয়ে রাখছেন, না-হয় বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে এতদিন দুয়োরানি হয়ে থাকা কম খরচের সরকারি স্কুলগুলিকেই হয়তো বেছে নিয়েছেন।

এমনটা যদি সত্যিই হয়ে থাকে যে, এই অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অভিভাবকেরা খরচ কমানোর জন্য ব্যয়বহুল বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে ছেড়ে কম খরচের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলিকেই তাঁদের সন্তানের শিক্ষার জন্য বেছে নিয়েছেন তাহলে হায় হায় করে আর্তনাদের খুব কারণ আছে বলে মনে হয় না। কেননা মাথায় রাখতে হবে— শিশুর শিক্ষাটাই মূল বিবেচনার বিষয়, শিক্ষার আয়োজন নয়।

এই অবসরে প্রেমদের স্কুলের শিক্ষাখাতে খরচের বহরটা এক নজরে দেখে নেওয়া যাক। একালে স্কুলের নামের সঙ্গে বিদ্যালয়, বিদ্যাভবন, বিদ্যানিকেতন জাতীয় সেকেলে শব্দবন্ধ জুড়ে দেওয়ার প্রবণতা বিলকুল বাতিল হয়ে গেছে। তার বদলে এসেছে ইন্টারন্যাশনাল বা গ্লোবাল জাতীয় শব্দবন্ধ জুড়ে দেওয়ার উদগ্র প্রতিযোগিতা। তা যাই হোক, আমাদের প্রেমকুমার সেহার এমনই এক স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী। পঠনপাঠনের জন্য তার পিতৃদেবকে চারটি আলাদা আলাদা কিস্তিতে দিতে হয় ২৮,৭৫০ টাকা। প্রতি তিন মাস অন্তর ৭,১৮৮ টাকা করে চারটি কিস্তিতে এই টাকা দিতে হয়। এই টাকা প্রেমের অতিসাধারণ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আদায় করে প্রতিবছর। এই অতিমারিকালে খরচটাকে সামান্য কমিয়ে করা হয়েছে ২৫,৫০০ টাকা। ‘অতিমারি ডিসকাউন্ট’ ৩২৫০ টাকা। এ যেন নাকের বদলে নরুণ উপহার দেওয়া। পাশাপাশি প্রেমদের মহল্লার সরকারি স্কুলে পড়াশোনার খরচ এতটাই সামান্য যে তা উল্লেখ করতেও সঙ্কোচ হয়। এক ধরনের অলীক হীনম্মন্যতাবোধ দীর্ঘশ্বাস হয়ে মনের গভীরে ঝড় তোলে। সরকারি স্কুলের পঠনপাঠনের বার্ষিক খরচ মাত্র দুইশত টঙ্কা। এই টাকা একবারে জমা দিতে না পারলে বারংবার ফোন করে অভিভাবকদের তারা দেওয়ার ব্যবস্থা নেই। সরকারি ব্যবস্থাপনায় আয়োজনের আড়ম্বর নেই, আর তাই হয়তো অভিভাবকেরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এমন বিমুখতা কেবল হরিয়ানা রাজ্যের সমস্যা তা নয়, আমাদের রাজ্যের হালও একইরকম।

৩.

বেসরকারি স্কুল থেকে লোপাট হয়ে যাওয়া এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীর একটা অংশ যে একটু একটু করে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি ঝুঁকছে তা আর নিছক অনুমান থাকে না বিভাগীয় পোর্টালে সংশ্লিষ্ট স্কুলগুলির তরফে শিক্ষার্থীদের নামের তালিকা নথিভুক্ত করার বিষয়টি দেখলে। একবার এমনই এক পরিসংখ্যানের তালিকাটি দেখে নেওয়া যাক।

শ্রেণি সরকারি বিদ্যালয়ে চলে যাওয়া ছাত্রসংখ্যা
প্রথম ১৪৩২
দ্বিতীয় ৭৮৬৭
তৃতীয় ১৬২৩৪
চতুর্থ ১৭০৬৫
পঞ্চম ১৬৬৫২
ষষ্ঠ ১৭০০২
সপ্তম ১৬৫৫৬
অষ্টম ১৪৩২৭
নবম ১২১৪০
দশম ৮০২৩
একাদশ ৭৩৮৬
দ্বাদশ ৭০৩০

*এপ্রিল-মে ২০২১, এই দু মাসে বেসরকারি স্কুল থেকে সরকারি স্কুলে যোগদানকারী মোট ছাত্র/ছাত্রীসংখ্যা ১,৪১,৭১৪ জন। সূত্র: শিক্ষাবিভাগ— হরিয়ানা।

এই পরিসংখ্যান থেকে একটা বিষয় বেশ পরিষ্কার যে অতিমারিকালে দীর্ঘমেয়াদি লকডাউনের বিষয়টি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার তথাকথিত ভারসাম্যে বেশ বড় রকমের পরিবর্তন এনেছে। এই বিষয়টিকে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে, একরকম মেনেই নেওয়া হয়েছে যে সরকারি বা সরকারপোষিত বিদ্যালয়গুলিতে পড়াশোনা কিছুই হয় না, নিয়মশৃঙ্খলা বা আধুনিক পঠনপাঠনরীতির সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষিকারা পরিচিত নন, সরকারি স্কুলের গোটা ব্যবস্থাটাই একটা খয়রাতি ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে এবং এককালে ভালো ভালো ছাত্ররা এই বিদ্যালয়গুলিতে ভর্তি হলেও বর্তমানে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মূলত প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়ারাই এখানে পড়তে যায়। ফলে এই সমস্ত সরকারি বা সরকারপোষিত পাঠশালে ছেলেমেয়েদের পাঠানো মানেই হল প্রাণপ্রিয় সন্তানদের আগামী দিনগুলিকে নিবিড় আঁধারে ঢেকে ফেলা। এই ধারণা আজ দেশের সর্বত্র অভিভাবকদের মনে প্রবলভাবে চাগিয়ে উঠেছে। আমাদের রাজ্যে এই অভিরুচির ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মনে করার কোনও কারণ দেখি না।

৪.

শিক্ষার্থীদের এই ‘দলবদল’-এর সিদ্ধান্ত কী চোখে দেখছেন হরিয়ানার শিক্ষামন্ত্রী থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ শিক্ষা-আধিকারিকরা?

গতবছর ও এ-বছরের ছাত্রভর্তির সংখ্যার এই বিপুল ফারাক আমাকে অত্যন্ত অবাক করেছে। কেন এমনটা ঘটল তা আমাদের অবশ্যই তদন্ত করে দেখতে হবে।

–কানোয়ার পাল গুর্জর। শিক্ষামন্ত্রী, হরিয়ানা

.

আসলে অভিভাবকরা ধরেই নিয়েছেন যে অতিমারির দরুণ এবছরও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি বন্ধই থাকবে। ফলে নিচু ক্লাসের অনেক শিক্ষার্থীই আর কোনও স্কুলে ভর্তি হয়নি।

–রাম সেহার। ফতেহাবাদ গ্রামের একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ের পরিচালন সমিতির সদস্য

.

আমি এমন অনেক অভিভাবকের কথা জানি যাঁরা প্রাইভেট স্কুলগুলোর বিপুল আর্থিক চাহিদার কারণে তাঁদের সন্তানদের এই শিক্ষাবর্ষে স্কুলে ভর্তি করতে পারেননি। এক বিপুল সংখ্যক শ্রমজীবী অভিভাবক, যাঁরা পূর্ত ও নির্মাণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত, এই অতিমারির কারণে কাজ হারিয়েছেন। ফলে আর্থিক দিক থেকে তাঁরা এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন যে নিজেদের সন্তানদের পড়াশোনার ইতি টানতে বাধ্য হয়েছেন।

–রাজেশ চৌবারা। শ্রম-সংগঠক, চৌবারা গ্রাম

.

বর্তমান শিক্ষাবর্ষে বহু অভিবাসী শ্রমিক কাজ হারিয়ে নিজের নিজের রাজ্যে সপরিবারে ফিরে যাওয়ায় তাঁদের সন্তানেরা স্কুলে ভর্তি হয়নি। ফলে গত বছরের তুলনায় এবছর ছাত্রসংখ্যা পরিসংখ্যানে বড় রকমের ফাঁক থেকে গেছে।

–জনৈক প্রাইভেট স্কুল পরিচালক

.

এই সমস্ত বিবৃত অনুমানের সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসছে আরেকটি কারণও। ‘এই বছর সরকারি স্কুলগুলির তরফে স্কুলে ভর্তি হওয়ার আবেদন জানিয়ে জোরদার প্রচার চালানো হয়েছে। এই কারণেই হয়তো অভিভাবকদের একটা বড় অংশ তাঁদের সন্তানদের বেসরকারি স্কুলের পরিবর্তে সরকারি স্কুলে ভর্তি করেছেন। প্রাইভেট স্কুলগুলিতে ভর্তিসংখ্যা কমে যাওয়ার এটাই হয়তো অন্যতম প্রধান হেতু।’

সংশ্লিষ্ট মহলে এই বিষয়ে অনুপুঙ্খ কাটাছেঁড়া চলুক, অনুসন্ধান হোক সম্পৃক্ত নানান বিষয়ে। সমস্যাটির যে গহীনতর ব্যঞ্জনা রয়েছে তা উপলব্ধি করছি সকলেই। এই সুযোগে আমরা সমস্যাটিকে নিয়ে বরং নাড়াচাড়া করে দেখি একদম আমাদের মতো করে।

৫.

ঘটনাটিকে কী বলব? শিক্ষা-পরিযান? নিঃসন্দেহে এই ঘটনা অনেক অনেক প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিল আমাদের। একে একে সেই প্রশ্নগুলোকে দেখে নেওয়া যাক।

এক. স্কুল ছেড়ে যাওয়া ১২.৫২ লক্ষ শিক্ষার্থীরা কি সবাই নতুন স্কুলে ভর্তি হল?

এই প্রশ্নের উত্তর এই মুহূর্তে দেওয়া কঠিন, কেননা হরিয়ানা সরকারের তরফে এই বিষয়ে অনুসন্ধান চলছে। যতক্ষণ না তাদের সমীক্ষা-রিপোর্ট আমাদের কাছে এসে পৌঁছচ্ছে ততক্ষণ বিস্তারিত কিছু বলা হয়তো সম্ভব নয়, কিন্তু কতগুলো অনিবার্য সম্ভাবনার কথা মাথায় আসছে। যদি নিছক সম্ভাবনাতত্ত্বের কথা মাথায় রেখে ধরে নিই যে প্রাইভেট স্কুলছুট ১২.৫২ লক্ষ শিক্ষার্থীই স্কুল বদলে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছে, তাহলে চিন্তা বা উদ্বেগের বিশেষ কারণ নেই কেননা শিশুর প্রয়োজন সুশিক্ষা। সরকারি স্কুলে তা মিলবে। এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস। কিন্তু এই ছেলেপিলেরা যদি পড়াশোনা ছেড়ে মাঝপথে স্কুলছুট হয় তাহলে তা প্রবলভাবে উদ্বেগজনক। একেই আমাদের দেশে স্কুলছুটের হার অত্যন্ত বেশি, তার ওপর অতিমারিজনিত আপৎকালীন অবস্থায় স্কুল ছেড়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা যদি এভাবে বেড়ে যায়, তাহলে অন্ধকার যে ঘনতর হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই সমস্যাটি কেবল হরিয়ানার সমস্যা নয়, এটা একটা জাতীয় সমস্যা। অন্য রাজ্যের তথ্য হাতে এলে দেশের শিক্ষা অবক্ষয়ের প্রকৃত ছবিটা হয়তো স্পষ্টতর হবে।

দুই. সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে পঠন-পাঠনের খরচের অসমতা কি নতুন সামাজিক বৈষম্য সৃষ্টি করছে?

একটা গল্প বলি। ঠিক গল্প নয়, আবার বিন্যাসের দৌলতে গল্পও বটে। একটু পুরনো তবে স্মৃতিতে এখনও সমুজ্জ্বল। তখনও অবসর গ্রহণ করিনি। শনিবার। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরব বলে নাগেরবাজার মোড় থেকে বাসে উঠেছি। দুপুরবেলা, তাই বাস বেশ ফাঁকা। বাস চলতে শুরু করল। খানিকটা পথ পাড়ি দিতেই কৈশোর চাপল্যে খলখলিয়ে দুই ছাত্রী বাসে উঠল। সামনের দরজা দিয়ে।

–এই… এদিকে আয়… সিট আছে…
–পেছনে চল.. দেখ, ডাকছে… জায়গা আছে…
–কী রে? কেমন আছিস?
–ভালো। তোরা?
–চলে যাচ্ছে। এই, তুই লাইফ সাইন্স কোথায় পড়িস?
–আমি নিজেই পড়ি। আমাদের স্কুলের দিদি চমৎকার বুঝিয়ে দেন। কোনও সমস্যা হলেই দিদির কাছে চলে যাই…
–কী ভালো রে!
–এই… তোদের স্কুলে তো নানান রকম জিনিস দেয়। চাল, ডাল, স্কুলড্রেস, জুতো… হা হা হা…!
–এত কিছু? তোদের তো মাইনেও দিতে হয় না, তাই না?
–এই তুই মাম্পিকে চিনিস? ওর ভালো নাম…
–হ্যাঁ, চিনি। ও আমার খুব ভালো বন্ধু। কী ভালো গান গায়। তুই চিনলি কী করে?
–আরে ধুর! চিনতে যাব কোন দুঃখে? ওর মা আমাদের বাড়িতে কাজ করে।
–আরে ওদের স্কুলে তো সব ফার্স্ট জেনারেশন লার্নারদের ভিড়। ও ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব না করে কী করবে! আমার ড্যাড তো বলে সরকারি স্কুল মানে বিনি পয়সার স্কুল, গরিবদের জন্য।

এরপরেও ওদের কথা চলে। তবে আমি আর সে কথা শোনার জন্য সামান্যতমও আগ্রহী হইনি। বুঝতে পারি অভিভাবকমহলের ফাঁপা গৌরব গাঁদ হয়ে প্রবেশ করেছে তাদের সন্তানদের মধ্যেও।

তিন. সরকারি বা সরকারপোষিত পাবলিক স্কুলগুলি কি এই ঘরে ফেরা শিক্ষার্থীদের চাপ ও প্রত্যাশা বহনে সর্বতোভাবে সক্ষম?

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সন্দেহ নেই। তর্কের খাতিরে যদি ধরে নিই যে হরিয়ানাতে যেভাবে স্কুল বদলেছে শিক্ষার্থীরা তেমনটা প্রায় প্রতি রাজ্যেই ঘটেছে, তাহলে আমাদের সত্যিই নতুন করে প্রাইভেট স্কুলের পরিবর্তে তথাকথিত পাবলিক স্কুল বা সরকারি ও সরকারপোষিত বিদ্যালয়গুলির পঠনপাঠনের রীতিপদ্ধতি, অনুশাসন, পরিচালন ব্যবস্থা ও পরিকাঠামোর নবীকরণ নিয়ে সদর্থক, আন্তরিক ভাবনাচিন্তা করার সময় এসে গিয়েছে। এই বিষয়ে বিদ্যালয়ে প্রত্যক্ষভাবে সক্রিয় দুই পক্ষকেই— শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-শিক্ষিকা— আজ নতুন করে চিন্তাভাবনা করতে হবে। দিল্লির সরকারি স্কুলগুলির আশ্চর্য রূপান্তর ঘটেছে বিগত কয়েক বছরে। আজ দিল্লির বহু শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা ভরসা রাখছে সরকারি বিদ্যালয়ের ওপর। প্রাক-অতিমারি পর্বেই দিল্লিতে শুরু হয়েছিল এই ঘর-ওয়াপসি। তাই দিল্লির সরকারি বিদ্যালয়গুলির এই আশ্চর্য রূপান্তর প্রক্রিয়া সারা দেশের কাছেই এক অনুসরণীয় মডেল হয়ে উঠতে পারে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা যদি তাঁদের সিলেবাসকেন্দ্রিক পঠনপাঠনের চেনা বৃত্তের বাইরে এসে শিক্ষার্থীদের আরও আপন করে নিতে পারেন স্কুল পরিসরেই, তাহলে স্বপ্নগুলো সত্যিই ডানা মেলবে অনেক রঙিন ও উজ্জ্বল হয়ে। এখন দিন ফিরছে, গাঙে ঢুকছে নতুন জোয়ারের জল, এটাই হল নাও নিয়ে ভেসে পড়ার সেরা সময়। নতুন পৌষালী পরব হয়তো শুরু হতে চলেছে অনতিবিলম্বে।

 

৬.

ফিরে যাওয়া যাক আমাদের গল্পের সেই ওমপ্রকাশের কাছে। মাইকে ঘোষণার শব্দ শুনে ঘর্মাক্ত আদুল গায়ের ওপর একটা জামা চড়িয়ে সে তখন সদর দরজার দিকে পা বাড়িয়েছে…

বাইরে ঘোষণার শব্দ এখন অনেক স্পষ্ট— ‘আব কি বারি/স্কুল সরকারি’। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে বেশ অবাক হয় ওমপ্রকাশ। তিনজন মানুষ মাইক আর একগোছা কাগজ হাতে এসেছেন মহল্লায়। তাদের ঘিরে রয়েছে এ পাড়ার আরও বেশ কিছু মানুষ। সঙ্গে রয়েছে তাদের ছেলেমেয়েরা। ভিড়ের মধ্যে থেকে দীনদয়াল এগিয়ে আসে।

–আরে ওমপ্রকাশ ভাই, তুমিও এসেছ! খুব ভালো হয়েছে। এই হল ললিতজি। গোপালের স্কুলের মাস্টারমশাই। খুব ভালো মানুষ। বলি কী, প্রেমকে এখানেই ভর্তি করে দাও। সুরজপ্রসাদ, গোপীচান্দ, নন্দু— সকলেই তাদের ছেলেদের এখানে ভর্তি করবে বলছে। কী ভাবছ ওমভাই? এই মাগগি-গন্ডার দিনে ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার পেছনে এত টাকা খরচ করবার সংস্থান কি এখন আমাদের আছে? এই মাস্টারমশাইরা নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে ঘুরে ছাত্রদের খোঁজখবর রাখছে, পড়াশোনা দেখিয়ে দিয়ে যাচ্ছে। আর চিন্তা কোরো না। আমি ললিতজির কাছ থেকে ফর্ম নিয়ে নিচ্ছি।

ওমপ্রকাশ খুব মন দিয়ে দীনদয়ালের কথাগুলো শোনে। নিজেকে অনেকটা হালকা লাগছে এখন। একবার নরম চোখে ছেলে প্রেমের দিকে তাকায় সে, সম্মতি নেওয়ার জন্য। প্রেম মুচকি হেসে ঘাড় নাড়ে। ফিসফিস করে বলে, ‘আব কি বারি/স্কুল সরকারি’। কথাগুলো মহল্লার বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে স্বস্তির আশ্বাস হয়ে।

পুনশ্চ: নিশ্চিন্তে কলম বন্ধ করেছিলাম। টেবিলে পড়ে থাকা খবরের কাগজটা নিতান্ত আলস্যভরে খুলতেই নজরে এল এক খবর। না, প্রতিদিনের খুন-ধর্ষণ-রাহাজানি-প্রতারণা-রাজনৈতিক আস্ফালন-মিথ্যা প্রতিশ্রুতি-হামলা-হাঙ্গামার চেনা খবর নয়। এতক্ষণ কলম চালানোর পুরস্কারের মতো এও এক পরম স্বস্তির খবর— বাড়ছে ভরসা, জেলার সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বাড়ল ১৬ হাজার। জেলার নাম উত্তর ২৪ পরগনা— আমার নেটিভ ডিস্ট্রিক্ট। তাহলে কি আমাদের রাজ্যেও শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীদের বিপ্রতীপ চলন শুরু হল? সমুদ্রের রুপোলী ইলিশের দল এবার গাং পথে উজানে ছোটা আরম্ভ করবে?

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...