ওগো দুখজাগানিয়া

কাজুও ইশিগুরো

 

ভাষান্তর: সৈকত ভট্টাচার্য

২০১৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার জয়ী সাহিত্যিক কাজুও ইশিগুরো জন্মসূত্রে জাপানি হলেও বর্তমানে ব্রিটিশ নাগরিক। জন্ম ১৯৫৪ সালে। লেখালিখি ইংরেজি ভাষাতেই করেন। ইশিগুরোর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস 'নেভার লেট মে গো'। টাইমস ম্যাগাজিনের বিচারে এই উপন্যাস ইংরেজি সাহিত্যের সেরা একশোটি উপন্যাসের মধ্যে স্থান পেয়েছে। এ ছাড়াও 'অ্যান আর্টিস্ট অফ দ্য ফ্লোটিং ওয়ার্ল্ড', 'দ্য রিমেইন্স অফ দ্য ডে', 'ক্লারা অ্যান্ড দ্য সান' ইত্যাদি লেখকের উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এই গল্পটি ইশিগুরোর 'নকটার্নস' গল্পসঙ্কলন থেকে নেওয়া। শিরোনাম Crooner

এমনই এক বসন্তের সকালে, দেশবিদেশের পর্যটকদের ভিড়ের মধ্যে আমি টোনি গার্ডনারকে দেখতে পেলাম। পিয়াৎজা সান মার্কো বা সেন্ট মার্কস স্কোয়ারের নতুন চাঁদোয়ার তলায় আমরা তখন গানবাজনা নিয়ে ব্যস্ত। রেস্তোরাঁর বদ্ধ কোণ ছেড়ে এই খোলামেলা জায়গায় এসে মনে একটা ফুরফুরে অনুভূতি যে হচ্ছে সেটা আমাদের বাজনা শুনলেই বেশ বোঝা যাচ্ছে।

অবিশ্যি আমাকে এই ব্যান্ডের নিয়মিত সদস্য ভাবলে ভুল হবে। বরং ‘অতিথি শিল্পী’ গোছের কিছু বলা যেতে পারে। আমার মত এমন অনেককেই এখানে, ভেনিস শহরের এই ‘পিয়াৎজা’র আশেপাশে খুঁজে পাবেন। এখানকার তিনটি বড় বড় ক্যাফের বাঁধা অর্কেস্ট্রাগুলি, তাদের প্রয়োজন হলে, আমাদের ডেকে নেয়। সাধারণত আমি ক্যাফে লাভেনাতেই বাজাই— কখনও কখনও অবিশ্যি কোয়াদ্রি বয়েজ বা ফ্লোরিয়ানদের সঙ্গেও যে যোগ দিইনি তা নয়— কিন্তু দিনের শেষে আবার ফিরে আসি ক্যাফে লাভেনার দোরেই। এদের সকলের সঙ্গেই আমার দিব্যি ভাব— শুধু মিউজিসিয়ানদের সঙ্গেই যে তা নয়, ক্যাফের ওয়েটারদের সঙ্গেও কম বন্ধুত্ব নেই। অন্য কোনও শহর হলে এতদিনে কোনও একটি অর্কেস্ট্রার একজন নিয়মিত সদস্য হয়ে যেতাম হয়ত। কিন্তু এখানে, এই ভেনিস শহরে, এদের এতদিনকার ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য সব উল্টো চালে চলে। যেমন, অন্য যেখানেই যান, দেখবেন একজন ভালো গিটারিস্টের একেবারে বিশেষরকম কদর। আর এখানে? ক্যাফে ম্যানেজাররা গিটারিস্ট শুনলেই একেবারে অপ্রস্তুত হয়ে পড়েন— গিটার এতটাই আধুনিক বাদ্যযন্ত্র— পর্যটকরা নাকি পছন্দ করেন না। গত বছর, এই জন্য, বেশ একখানি পুরনো স্টাইলের ডিম্বাকৃতি সাউন্ড-হোলওয়ালা জ্যাজ মডেলের গিটার কিনেছি— অন্তত যাতে আমায় কেউ ‘রক-এন্ড-রোলার’ বলে ভুল না করে। এর ফলে আমার ভাগ্য কিছুটা হলেও প্রসন্ন হয়েছে। কিন্তু ক্যাফে ম্যানেজারদের কাছে এখনও আমি অচ্ছুৎপ্রায়— আপনি যত বড় গিটারিস্টই হন না কেন, এই চত্বরে আপনাকে ভুলেও কেউ একখানি স্থায়ী চাকরি দেবে না।

আমার এই অবস্থার পিছনে আর একটি ছোট্ট কারণ আছে— আমি ইতালীয় নই, বা বলা ভালো আমি ভেনিসীয় নই। আমি, বা ওই স্যাক্সোফোন বাদক চেক ছোকরা— আমাদের এই ক্যাফে ম্যানেজাররা এমনিতে পছন্দ করে, তাদের ক্যাফেতে বাজানোর জন্য ডাকাডাকি অবধি করে— কিন্তু সেখানে নিয়মিত চাকরি দেয় না। সবসময় এদের এক ভয়— আমরা যে ইতালীয় নই— সেটা বুঝি জানাজানি হয়ে যায়। আর তার ফলে পর্যটকদের সামনে এরা যে খাঁটি ইতালীয় পরিবেশটিকে খাড়া করে রেখে ব্যবসা চালাচ্ছে, সেটিকে পাছে সকলে সন্দেহের চোখে দেখতে শুরু করে। তাই আমাদের ওপরে কড়া নির্দেশ— সানগ্লাস চোখে, স্যুট পরে ইতালীয়দের মত ব্যাকব্রাশ করে চুল আঁচড়ে এসো— কেউ সন্দেহ যাতে না করে। কিন্তু মুখ খুলেছ কি মরেছ!

এত সব সত্ত্বেও সবসময়ই একজন গিটারিস্ট এই তিন ক্যাফে অর্কেস্ট্রাতেই অপরিহার্য— যে পিছন থেকে সঠিক কর্ড মিলিয়ে ঐকতানকে সম্পুর্ণ করবে। পিয়াৎজা সান মার্কোর এই বিশাল চত্বরে ছড়ানো ছিটানো পর্যটকের দল রেডিওর নব ঘুরিয়ে চ্যানেল পাল্টানোর মত এক অর্কেস্ট্রা থেকে অন্য অর্কেস্ট্রাতে পরিভ্রমণ করেন। এক জায়গায় জুলি অ্যানড্রুজের পুরনো কোনও ছবির থিম বাজছে তো অন্য এক অর্কেস্ট্রা ধরেছে ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রার জনপ্রিয় কোনও গানের সুর। আমার মনে আছে, গত বছর এক দিন আমি বিভিন্ন ব্যান্ডে ঘুরে ঘুরে অন্তত নবার সঙ্গত দিয়েছিলাম ‘দ্য গডফাদার’-এর থিমের সঙ্গে।

এমনই এক দিন যখন এক ঝাঁক নতুন পর্যটকের সামনে একটি ব্যান্ডের সঙ্গে গিটার বাজাচ্ছি, আমাদের চাঁদোয়ার সামনে মাত্র ফুট ছয়েক দূরের একটি টেবিলে এক পেয়ালা কফি সহ টোনি গার্ডনারকে দেখতে পেলাম। এতে অবিশ্যি সাংঘাতিক অবাক হওয়ার কিছু ছিল না। এই সেন্ট মার্ক স্কোয়ারে বছরভর বিখ্যাত ব্যক্তিদের আনাগোনা লেগেই থাকে— ওয়ারেন বেটি কিংবা কিসিঞ্জারের মত মানুষদের হাত কয়েক দূরত্বের ব্যবধানে দেখে দেখে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সুতরাং বিশ্ববিখ্যাত কোনও ব্যক্তিত্বকে সামনা-সামনি দেখে আদিখ্যেতা করাটা আমাদের পক্ষে শোভা পায় না। কিন্তু, আমি হাত চারেক দূরের টেবিলে টোনি গার্ডনারকে দেখে নিজের উত্তেজনা চেপে রাখতে পারলাম না।

টোনি গার্ডনার। আমার মায়ের সবচেয়ে প্রিয় শিল্পী। আমাদের দেশে তখন কম্যুনিস্ট শাসন চলছে। মা অনেক কষ্ট করে ওর অনেকগুলো রেকর্ড জোগাড় করেছিল। আমি বেশ ছোট তখন। একদিনের ঘটনা বেশ মনে পড়ে। মা রান্নাঘরে কিছু কাজে ব্যস্ত। আর আমি বসার ঘরে এক সোফার থেকে লাফিয়ে অন্য সোফায় যাওয়ার খেলায় মেতেছি। আর কয়েকবার এপাশ-ওপাশ করার পর যথারীতি পা ফসকে পড়েছি পাশে রাখা টেবিলের ওপরে। সেখানে রাখা ছিল মায়ের গ্রামোফোন— আর সেই গ্রামোফোনে চড়ানো ছিল টোনি গার্ডনারেরই একটি রেকর্ড। আমার ধাক্কায় গ্রামোফোনের বেয়াড়া পিনটি এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিল রেকর্ডটিকে— আর তার সঙ্গে বোধহয় মায়ের হৃদয়ের অনেকখানিকেও। সেদিন আমার কপালে মায়ের কাছে প্রবল বকুনি যে জুটেছিল তা বলাই বাহুল্য। এই ঘটনার অনেক বছর পর, আমি তখন ওয়ারশতে কাজ করি, একদিন জানতে পারলাম ব্ল্যাক-মার্কেট রেকর্ডসের কথা। মায়ের সব খারাপ হয়ে যাওয়া টোনি গার্ডনারের অ্যালবামগুলোর শূন্যস্থান ফের পূরণ করে দিই— তার মধ্যে আমার নিজের দুষ্টুমিতে নষ্ট হয়ে যাওয়া সেই অ্যালবামটাও ছিল।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, টোনি গার্ডনারকে দেখে আমার এমন খুশি হয়ে ওঠার কারণটা আসলে কী? ওকে আমি ওই কয়েক হাত দূরের টেবিলে বসে থাকতে দেখে প্রথমে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারিনি— উত্তেজনার বশে কর্ড ধরতে একটা বিট বোধহয় মিসও করে ফেলেছিলাম। টোনি গার্ডনার! আমার মা যদি এখানে থাকত তাহলে ঠিক কী করত সেটাই আমার মাথার মধ্যে ঘুরছে। আর তখনই ঠিক করি যে এ সুযোগ আমি হাত থেকে যেতে দিতে পারি না— আমার এমন হ্যাংলামো দেখে যে যাই বলুক, আমার মায়ের জন্য, তার স্মৃতির প্রতি সম্মান রাখার জন্য অন্তত টোনি গার্ডনারের সামনে আমি একবার দাঁড়াতে চাই।

কিন্তু সমস্যা হল, তখনও আমাদের বেশ কয়েকটা গান বাজানো বাকি। যতক্ষণ না সেগুলো শেষ হবে, চাঁদোয়া ছেড়ে এক দৌড়ে গিয়ে ওর কাছে যাওয়াটাও সম্ভব নয়। আমার ধৈর্য ধরতে সমস্যা নেই— ভয় একটাই, টোনি গার্ডনার না টেবিল ছেড়ে উঠে চলে যান। আমাদের একটার পর একটা বাজনা চলতে থাকল— আর আমাকে আশ্বস্ত রেখে উনি ওই টেবিলে বসে রইলেন— সামনে ধোঁয়া ওঠা কফির পেয়ালা, হাতে সানগ্লাস। আর পাঁচজন আমেরিকান পর্যটকদের মতই পরনে একটা হাল্কা নীল পোলো আর ঢিলেঢালা ধূসর ট্রাউজার। রেকর্ডের প্রচ্ছদে ছেলেবেলায় যেমন ছবি দেখেছিলাম— চেহারাটা একইরকম— শুধু মাথার পাট করে আঁচড়ানো কালো কুচকুচে চুলে এখন ধূসরতার স্পর্শ। কফির কাপটার দিকে আনমনা হয়ে তাকিয়ে। যেন ওটা কফি না অন্য কিছু তা নিয়ে গভীর দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। মাঝেমধ্যে হাতের সানগ্লাসটা চোখে তুলছেন আবার কী ভেবে খুলে নামিয়ে নিচ্ছেন। আমি ওঁকেই লক্ষ করছিলাম। একটু মনঃক্ষুণ্ণ হলাম এটা বুঝতে পেরে যে ওঁর মন আমাদের অর্কেস্ট্রার দিকে একেবারেই নেই।

আমাদের বাজনা শেষ হতেই পড়িমরি করে দৌড়লাম ওঁর টেবিলের দিকে। মনে ভয়— কেমন করে শুরু করব কথা! টেবিলের কাছে পৌঁছে চুপচাপ দাঁড়ালাম। আমার দিকে পিছন করে একইরকম ভাবে বসে আছেন টোনি গার্ডনার। আমি গিয়ে দাঁড়াতে সম্ভবত ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় ওকে আমার নীরব উপস্থিতি জানান দিল। ঘাড় ঘুরিয়ে যে মুহূর্তে আমার দিকে ফিরে তাকালেন, আমার এতক্ষণ ভেবে রাখা সমস্ত কথা আমার মুখ দিয়ে একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল বাইরে— আমার পরিচয়, এই অর্কেস্ট্রাতে আমার ভূমিকা, আমার মায়ের কথা— সব কিছু। আমার প্রতিটি কথা মন দিয়ে শুনলেন। মাঝে মাঝে ‘হুঁ হাঁ’ করছিলেন। সব বলার শেষে যখন আমি ধন্যবাদ জানিয়ে চলে যাব বলে পা বাড়াব, টোনি গার্ডনার বললেন, আপনার জন্ম ঐ কম্যুনিস্ট দেশে? সেখানে তো মানুষের জীবনযাত্রা খুবই কষ্টকর ছিল শুনেছি।

–হ্যাঁ, সেসব তো পুরনো কথা। এখন তো এক মুক্ত গণতান্ত্রিক দেশ।— আমি একটু কাঁধ নাচিয়ে বললাম।
–যাক, সেটা ভালো কথা। টোনি বললেন, আপনি এতক্ষণ ওই ব্যান্ডের সঙ্গে বাজাচ্ছিলেন? বাহ… বসুন না! কফি?

আমার ‘না’কে খুব একটা পাত্তা না দিয়ে প্রায় জোর করেই আমায় ওঁর সঙ্গে বসতে বললেন। চেয়ার টেনে নিয়ে বসতেই আবার বললেন, আপনি আপনার মায়ের কথা বলছিলেন না? আমার গান ওঁর খুব পছন্দের ছিল?

আমি আবার মায়ের কথা বলি। এবার আরও একটু সবিস্তারে। আমাদের বাড়ির কথা, আমাদের গ্রামোফোনের কথা, ব্ল্যাক-মার্কেট রেকর্ডসের কথা। মায়ের সংগ্রহে থাকা রেকর্ডগুলোর কথাও বলি— অ্যালবামগুলোর নাম মনে নেই। শুধু মনে আছে ওগুলোর খামের ওপরে কীরকম কী ছবি ছিল। আমি সেই ছবিগুলোই বর্ণনা করছিলাম, স্মৃতি হাতড়ে। আর আমার বর্ণনার সঙ্গে মিলিয়ে টোনি গার্ডনার অ্যালবামটার নাম বলার চেষ্টা করছিলেন— ওহ, ওটা বোধহয় ‘ইনমিটেবল’। দ্য ইনমিটেবল টোনি গার্ডনার। আমার বর্ণনার শুনে নাম অনুমান করা নিয়ে বেশ একটা মজার খেলা শুরু হয়ে গেছিল আমাদের মধ্যে। কিন্তু সেটা হঠাৎই বন্ধ করতে হল একজন ভদ্রমহিলার আগমনে।

ভদ্রমহিলাকে একটু দূর থেকে দেখলে কোনও আমেরিকান ফ্যাশন ম্যাগাজিনের পাতা থেকে উঠে আসা এক যুবতী মডেল বলে ভ্রম হওয়াটা বিচিত্র নয়। কিন্তু মিস্টার গার্ডনারের পাশে বসে যখন চোখের সানগ্লাসটি কপালের ওপরে তুললেন বোঝা গেল যে উনি পঞ্চাশের গণ্ডি পার করেছেন অনেকদিনই।

লিন্ডি, আমার স্ত্রী।— মিস্টার গার্ডনার আমাকে বললেন।

মিসেস গার্ডনার আমার দিকে তাকিয়ে একটি মেকি হাসি হেসে স্বামীকে বললেন, ইনি আবার কে? এখানেও নতুন বন্ধু বানিয়ে ফেলেছ দেখছি!

–হ্যাঁ, ওর সঙ্গে গল্প করে বেশ সময় কাটাচ্ছিলাম। কিন্তু, দেখেছ কাণ্ড— ওর নামটাই জানা হয়নি আমার।
–জ্যান, আমি তাড়াতাড়ি বলি, বন্ধুরা জ্যানেক বলে ডাকে।
–আপনার ডাকনাম তো দেখি আসল নামের চেয়েও বড়।— লিন্ডি গার্ডনার আমাকে একটু ব্যঙ্গাত্মকভাবেই যেন বললেন।
–এরকম বলছ কেন?— মিস্টার গার্ডনারের গলায় যেন একটু হাল্কা ভর্ৎসনার সুর।
–খারাপ কিছু তো বলিনি।
–একজনের নাম নিয়ে ঠাট্টা করাটা কি ঠিক, লিন্ডি?

লিন্ডি গার্ডনার এবার আমাকে বললেন, আপনার কি খারাপ লেগেছে আমার কথাটা শুনে?

–না না, মিসেস গার্ডনার, একদমই না।— আমি তড়িঘড়ি এই বিড়ম্বনা থেকে উদ্ধার পেতে বলি।
–তবেই দেখুন! আমার হাজব্যান্ড মনে করেন যে আমি লোকের সঙ্গে সবসময়ই খারাপভাবে রূঢ় কথা বলি। বিশ্বাস করুন, আমি কিন্তু একেবারেই ওরকম নই।— মিসেস গার্ডনার এবার নিজের স্বামীর দিকে ফিরে বললেন, আমি সাধারণ পাবলিকের সঙ্গে এভাবেই কথা বলি, টোনি। এটাই আমার অভ্যাস। এটার মধ্যে খারাপ কিছু নেই।
–আচ্ছা, ঠিক আছে, টোনি গার্ডনার বললেন, এটা নিয়ে এত বিতর্কে যেতে হবে না আর। কিন্তু, এই ভদ্রলোককে একেবারে সাধারণ ‘পাবলিক’-এর দলভুক্ত কোরো না।
–ওহ, তাই নাকি? কে উনি? মেলায় হারিয়ে যাওয়া তোমার ভাই?
–প্লিজ! উনি একজন পেশাদার মিউজিসিয়ান। আমার সহকর্মী বলতে পারো। একটু আগেই উনি ওখানে বাজিয়ে এসেছেন।— মিস্টার গার্ডনার যেন একটু বিরক্ত।
–ওহ, হ্যাঁ। আবার আমার দিকে ফিরলেন লিন্ডি গার্ডনার, আপনি এতক্ষণ ওখানে বাজাচ্ছিলেন, না? খুব সুন্দর বাজান আপনি। অ্যাকোর্ডিয়নে ছিলেন, তাই না?
–আজ্ঞে, না, আমি আসলে গিটারে ছিলাম। আমি মিসেস গার্ডনারকে শুধরে দিই।
–এহ! গিটারিস্ট! কী বলছেন! আমি দেখলাম আপনাকে অ্যাকোর্ডিয়ন বাজাতে।
–মাফ করবেন, মিসেস গার্ডনার, আপনি বোধহয় ভুল করছেন। ওখানে অ্যাকোর্ডিয়ানে ছিল কার্লো— টাক মাথা একটি ছেলে…
–যাহ্‌, ইয়ার্কি মারছেন।
–কেন ওর সঙ্গে এরকম অভদ্রতা করছ?— মিস্টার গার্ডনার বেশ ধমকের সুরেই কথাটি বলে পরমুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, প্লিজ, লিন্ডি। আমার কথাটা একটু জোরে হয়ে গেছে। কিছু মনে কোরো না।

এক খণ্ড নীরবতা আমাদের টেবিলটাকে ততক্ষণে ছেয়ে ফেলেছে। মিস্টার গার্ডনার স্ত্রীর ডান হাতটা নিজের বাঁ হাত দিয়ে আলতোভাবে স্পর্শ করেন। একজন অচেনা মানুষের সামনে স্বামীর কাছ থেকে এমন অবাঞ্ছিত ধমক খেয়ে, আমি ভেবেছিলাম, মিসেস গার্ডনার বুঝি সেই মুহূর্তেই হাত সরিয়ে নিয়ে উঠে চলে যাবেন টেবিল ছেড়ে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, ভদ্রমহিলা অন্য হাত দিয়ে স্বামীর হাতটাকে নিজের দুই হাতের মধ্যে চেপে ধরলেন, চেয়ারটা নিয়ে আরও একটু সরে এসে বসলেন স্বামীর গা ঘেঁষে। টোনি গার্ডনার মাথাটা সামনের দিকে একটু ঝুঁকিয়ে বসে আছেন অপরাধীর ভঙ্গিতে— মিসেস গার্ডনারের দৃষ্টি তাঁর কাঁধের ওপরে দিয়ে দূরে ওই ব্যাসিলিকার দিকে কোথাও হারিয়ে গিয়েছে। দেখলেই বোঝা যায় যে সে দৃষ্টি নির্দিষ্ট কিছু দেখছে না, বরং ফিরে গেছে ফেলে আসা কোনও এক সময়ের কাছে। আর টেবিলে ওঁরা দুজন ছাড়াও যে আমি, একজন তৃতীয় ব্যক্তি উপস্থিত সে কথা এঁদের কারও খেয়াল আছে বলে মনে হচ্ছে না।

নাহ, আমারই দোষ। তোমাদের আড্ডাটাই বোধহয় নষ্ট করে দিলাম।— প্রায় ফিসফিস করে কথাগুলো বলে নীরবতা ভাঙলেন মিসেস গার্ডনার। তারপর ধীরে ধীরে নিজের দুহাত মিস্টার গার্ডনারের হাতের থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আমার দিকে এক পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন। লিন্ডি গার্ডনার একটু আগেও আমার সঙ্গে দুএকটা কথা বলেছেন, আমার দিকে সরাসরি তাকিয়েছেনও। কিন্তু এবারের এই অদ্ভুত মোহময় দৃষ্টি যেন আমাকে বশ করে ফেলছিল। মনে হচ্ছিল, লিন্ডি গার্ডনার যদি এই মুহূর্তে মুখ ফুটে কিছু চান, তার জন্য আমি বোধহয় সব করতে রাজি আছি…

–জ্যানেক, মিসেস গার্ডনার আমার নাম ধরে ডাকলেন, আমি দুঃখিত। টোনি ঠিকই বলেছে। আপনার সঙ্গে এমনভাবে কথা বলাটা সত্যিই ঠিক হয়নি। আমায় ক্ষমা করবেন।
–কী বলছেন, মিসেস গার্ডনার! একদমই না। আমি একেবারেই কিছু মনে করিনি যে…

আমার কথা শেষ না করতে দিয়েই মিসেস গার্ডনার আগের কথার খেই ধরেই আবার বলে ওঠেন, আর আপনাদের দুজনের কথার মধ্যে অকারণে বাধা দেওয়ার করার জন্য আমি খুবই দুঃখিত। আপনাদের গানবাজনার গল্প হচ্ছিল নিশ্চয়ই। আড্ডা চালিয়ে যান আপনারা। আমি চলি।

–একি! চলে যাবে কেন? মিস্টার গার্ডনার এতক্ষণে ফের কথা বললেন।
–না না, আমি আসলে বসার জন্য আসিইনি। আমি তোমায় এটাই বলতে এসেছিলাম যে আমার একটু সময় লাগবে। ওই ‘প্রাদা’র আউটলেটায় একবার না গেলেই নয়।
–ওহ, বেশ তো। তুমি তোমার ইচ্ছেমত সময় নাও— আমি এখানেই আছি।
–আচ্ছা, তোমরাও তোমাদের আড্ডা চালিয়ে যাও। চলি আমি। চলি, ভাই জ্যানেক। ভালো থাকবেন।— আমার কাঁধ আলতো করে ছুঁয়ে বিদায় জানিয়ে মিসেস গার্ডনার টেবিল ছেড়ে উঠে পর্যটকদের ভিড়ের মধ্যে ফের হারিয়ে গেলেন।

আমরা আবার ফিরে গেলাম আমাদের ছেড়ে আসা কথায়। মিস্টার গার্ডনার জিজ্ঞেস করছিলেন ভেনিসে গানবাজনার চর্চা সম্পর্কে। আমিও বলছিলাম, এই বিশাল চত্বরের গল্প— এই কোয়াদ্রি অর্কেস্ট্রা, যারা এই মুহূর্তে বাজাচ্ছে— তাদের কথাও। কিন্তু ওঁর মন যে আমার কথা বা ওই কোয়াদ্রি অর্কেস্ট্রার বাজনা— এই দুইয়ের কোনওটাতেই ছিল না, তা আমি দিব্যি বুঝতে পারছিলাম। ভাবছিলাম, ওঁকে একা থাকতে দিয়ে আমার এবার যাওয়া উচিত। ঠিক তখনই উনি আমায় হঠাৎ বললেন, একটা বিষয়ে আমার, আপনার সাহায্য দরকার। অবিশ্যি আপনার যদি বিষয়টি পছন্দ না হয়, আপনি স্বচ্ছন্দে ‘না’ করতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না।

তারপর আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে ভীষণ গোপন কোনও কথা বলার ভঙ্গিতে গলা নামিয়ে বললেন, জানেন তো, আমি আর লিন্ডি আমাদের বিয়ের পর হানিমুন করতে এসেছিলাম এই ভেনিসে। সেই সাতাশ বছর আগে। কত স্মৃতি… তারপর আর একসঙ্গে কখনও আসা হয়নি। এবারের এই বেড়াতে আসার পিছনেও একটা বিশেষ উপলক্ষ্য আছে…

–আপনাদের বিবাহবার্ষিকী? আমি জিজ্ঞেস করি।
–অ্যাঁ? ভদ্রলোক একটু চমকে গিয়ে আমার মুখের দিকে তাকান।
–না মানে, আপনি বললেন যে এই এবারের বেড়ানোটাও স্পেশাল আপনার কাছে।

মিস্টার গার্ডনার এবার হো হো করে হেসে করে উঠলেন। আর আমার মনে পড়ে গেল মায়ের গ্রামোফোনে একটা গান বাজত, তার কথা। সেখানে গানের মাঝে টোনি গার্ডনার কিছু কথা বলতেন— ছেড়ে যাওয়া প্রেয়সীর কথা। কথার শেষে সেই ভরাট কণ্ঠ থেকে উঠে আসত একটা বিষাদভরা অট্টহাসি। আজ, এখন, মিস্টার গার্ডনারের গলায় ঠিক একইরকম সুর শুনতে পেলাম।

–বিবাহবার্ষিকী? না হে, ওসব নয়। তবে যে পরিকল্পনাটার কথা বলছি, সেটা কিছুটা সেরকমই বটে! একটু রোম্যান্টিক। একদম ভেনিসীয় স্টাইলে একটা সেরেনাদ। এই জন্যই আপনাকে প্রয়োজন— আমার গানের সঙ্গে সঙ্গতের জন্য। সন্ধে নামার পরে একটা গন্ডোলা নিয়ে আমরা দুজন গিয়ে উপস্থিত হব লিন্ডির জানলার ঠিক নীচটাতে। দেওয়ালের গায়ে ঝোলানো টিমটিমে লণ্ঠনের আলো-আঁধারিতে লিন্ডি যখন এসে দাঁড়াবে আমাদের ওই প্যালাৎজোর জানলায় আপনি গিটারে কর্ড ধরবেন, আর আমি ধরব গান— ওর সবচেয়ে পছন্দের গানগুলো, একে একে। ভালো হবে না? আর, হ্যাঁ, আপনার উপযুক্ত পারিশ্রমিক আপনাকে আমি অবশ্যই দিয়ে দেব…
–মিস্টার গার্ডনার, আপনি গাইবেন, সঙ্গে আমি গিটারে থাকব— এ তো আমার স্বপ্নাতীত। আপনি যে আমার কাছে কী— সে তো ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। শুধু বলুন কবে আসব?
–যদি বৃষ্টি বাদলা না থাকে, আজকেই হোক না? মন্দ কী? এই ধরুন, সাড়ে আটটা নাগাদ? আমরা একটু জলদিই ডিনার করে নিই। খাওয়ার পর লিন্ডিকে কিছু একটা অজুহাত দেখিয়ে বের হয়ে আসাটা খুব একটা কঠিন হবে বলে মনে হয় না। আমি নৌকার ব্যবস্থা করে রাখব। তারপর আপনাতে আমাতে মিলে ওতে চেপে খালের মধ্যে দিয়ে জানলার নীচে পৌঁছাব। কী বলেন?

মিস্টার গার্ডনারের সঙ্গে এই কথোপকথনের সময় আমি কেমন জানি একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেছিলাম— যেন স্বপ্ন দেখছি মনে হচ্ছিল। আর এমন একটি মধুর রোম্যান্টিক পরিকল্পনা— কে বলবে যে একজন ষাটের ঘরে আর একজন পঞ্চাশ পার করে ফেলেছেন? মনে হচ্ছিল, এক প্রস্থ মান-অভিমানের পর এক নবকিশোর তার নবপ্রণয়ীর মানভঞ্জনের জন্য ব্যাকুল।

পরের কিছুক্ষণ ধরে আমরা দুজন মিস্টার গার্ডনারের এই পরিকল্পনাটিকে যত্ন নিয়ে সাজালাম— ঠিক কোন কোন গানগুলি গাইবেন তিনি, কোন স্কেল, কী কী কর্ড ব্যবহার হবে— সবকিছু। ততক্ষণে আমার ফের ডাক পড়েছিল চাঁদোয়ার তলায়— আমার ব্যান্ডের কাছে ফেরার জন্য। মিস্টার গার্ডনারকে আমি আশ্বস্ত করে সেদিকে পা বাড়ালাম।

 

আধো অন্ধকার শুনশান রাস্তা দিয়ে ছোট্ট সাঁকোটার কাছে পৌঁছতে কয়েক মিনিট দেরি হয়ে গেল। পিয়াৎজা সান মার্কোর বাইরের পৃথিবীটা আমার কাছে অনেকটাই অচেনা। ভেনিসের গলিঘুঁজি আমার কাছে ততটা সড়গড় হয়নি। পথ ভুলের জন্যই এই মিনিট কয়েকের বিলম্ব। মিস্টার গার্ডনার পৌঁছে গেছিলেন আগেই। একটা টিমটিমে আলো জ্বলা ল্যাম্পপোস্টের নীচে অপেক্ষা করছিলেন আমার জন্য। পরনে একটা কেমন একটা লাট খাওয়া অবিন্যস্ত গাঢ় রঙের স্যুট— জামার ওপরের তিনটি বোতাম খোলা।

আমি পৌঁছেই প্রথমে এই কয়েক মিনিট দেরির জন্য ক্ষমা চাইলাম।

–কয়েক মিনিট? ধীরে ধীরে বললেন মিস্টার গার্ডনার, লিন্ডি আর আমি সাতাশ বছর ধরে একসঙ্গে আছি, ভাই… কয়েকটা মিনিট সেখানে কীই বা তফাত গড়তে পারে?

সকালের সেই রোম্যান্টিক ‘কিশোর’ যেন কোথাও উধাও হয়ে গেছে। একটা প্রচ্ছন্ন বিষাদের আস্তরণ তার মুখে। পাশে, খালের মধ্যে আমাদের জন্য অপেক্ষমান গন্ডোলাটা জলের হাল্কা ঢেউয়ের ওপরে অল্প অল্প দুলছে। সেখানে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে গন্ডোলার চালক ভিত্তোরিও। এই ছেলেটাকে আমি চিনি। মুখে মিষ্টি। কিন্তু পিছনে, আমার মত, ইউরোপের সদ্য জন্ম নেওয়া দেশের থেকে রুটিরুজির খোঁজে ইতালিতে আসা অভিবাসীদের নামে যা ইচ্ছে মিথ্যা কুৎসা রটিয়ে বেড়ানো এর স্বভাব। আমায় দেখে ‘কী রে ভাই’ বলে এক গাল হাসল। আমি কথা না বলে একটু মাথা নাড়িয়ে প্রত্যুত্তর দিলাম। ভিত্তোরিওর হাত ধরে মিস্টার গার্ডনার নৌকাতে উঠলেন। তারপর আমার গিটারটা আমি মিস্টার গার্ডনারের হাতে দিয়ে আমিও উঠে এলাম। আজ আমার স্প্যানিশ গিটারটা নিয়ে এসেছি— অনেকদিন পর।

মিস্টার গার্ডনার একটু এদিক ওদিক করে নৌকোর সামনের দিকে একটি জায়গা পছন্দ করে বসলেন। গন্ডোলাটি বেশ জোরে দুলে উঠে যাত্রা শুরু করল। অন্ধকারে নিকষ কালো জলের দিকে তাকিয়ে মিস্টার গার্ডনার আবার হারিয়ে গেলেন গভীর ভাবনার মধ্যে।

মিনিট কয়েক চুপচাপ চললাম আমরা। জলের মধ্যে শুধু ছপাৎ ছপাৎ করে ভিত্তোরিওর দাঁড়ের শব্দ। দুপাশে অন্ধকারে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা বাড়িঘর, মাঝে মধ্যে এক একটা ছোট ছোট সাঁকো।

–আচ্ছা, আমি একটা কথা ভাবছিলাম, মিস্টার গার্ডনার ভাবনার গভীর থেকে বের হয়ে এসে বললেন, ‘বাই দ্য টাইম আই গেট টু ফিনিক্স’ গানটা লিন্ডির খুব পছন্দের। বহু দিন আগের রেকর্ড করা। এটা দিয়ে শুরু করলে হয় না?
–নিশ্চয়ই। আমি বললাম, আপনার রেকর্ড করা ভার্সনটা আমার মায়ের বরাবর খুব পছন্দের ছিল। সবসময় বলত, সিনাত্রা বা গ্লেন ক্যাম্পবেলের থেকে টোনি গার্ডনারের গলায় এ গান এক অন্য মাত্রা পেয়েছে।

মিস্টার গার্ডনারের মুখ দেখতে পেলাম না। অন্ধকারে শুধু মাথাটা একবার নাড়লেন অন্যদিকে তাকিয়ে। এই নিস্তব্ধতা চিরে শুধু শোনা গেল বাঁকের মুখে ভিত্তোরিওর হাঁক— গন্ডোলাটা ডাইনে ঘুরে আবার চলতে থাকল চুপচাপ।

–আমি এ গান কতবার যে ওকে শুনিয়েছি… মিস্টার গার্ডনার বললেন, ওর নিশ্চয়ই আজ আবার শুনলে ভালো লাগবে, না? সুরটা আপনার জানা আছে তো?

আমি বাক্স থেকে গিটারটা বের করলাম। তারপর গানটার কয়েক কলি বাজালাম।

–আর একটু উঁচুতে। উনি বললেন, আমারটা ই-ফ্ল্যাটে গাওয়া ছিল।

আমি আবার গিটারের তারে আঙুল ছোঁয়ালাম। একটু বাজানোর পর মিস্টার গার্ডনার খুব মৃদু আধো স্বরে গাইতে থাকলেন আমার গিটারের সঙ্গে। এই নিস্তব্ধ খালের মধ্যের বাতাস ওর এই গুনগুনানিতে পূর্ণ হয়ে উঠতে লাগল। আর আমি সেই ছেলেবেলাতে ফিরে গেলাম। আমাদের সেই ছোট্ট বাড়ির মেঝেতে কার্পেটের ওপরে শুয়ে আছি। মা সোফার ওপরে বসে— ক্লান্ত শরীর নিয়ে একরাশ মনখারাপের মধ্যে। আর ঘরের কোণে রাখা গ্রামোফোনে গেয়ে চলেছেন টোনি গার্ডনার— ‘বাই দ্য টাইম আই গেট টু ফিনিক্স’।

–বেশ। গান থামিয়ে বলে উঠলেন মিস্টার গার্ডনার, তাহলে ই-ফ্ল্যাটেই হবে। তারপর আমাদের প্ল্যানমাফিক ‘আই ফল ইন লাভ টু ইজিলি’ করে ‘ওয়ান ফর মাই বেবি’ দিয়ে শেষ করব। তিনটে গানই যথেষ্ট। ও এর চেয়ে বেশি শুনবে বলে মনে হয় না।

কথা শেষ করে মিস্টার গার্ডনার আবার বোধহয় ফেলে আসা ভাবনার মধ্যে ডুবে গেলেন। আমরাও আবার একরাশ অন্ধকার নৈঃশব্দর মধ্যে দিয়ে ভাসতে ভাসতে এগোতে থাকলাম। মাঝে মাঝে শুধু ভিত্তোরিওর দাঁড়ের শব্দ।

–আচ্ছা, মিস্টার গার্ডনার, আমিই মৌনতা ভাঙলাম, একটা কথা জিজ্ঞেস করি— আশা করি কিছু মনে করবেন না। মিসেস গার্ডনার কি এই পরিকল্পনার ব্যাপারটা জানেন কিছুটা? নাকি পুরোটাই সারপ্রাইজ হতে চলেছে?

উত্তরে একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পেলাম ওঁর দিক থেকে। তারপর বললেন, এটা আপাতত সারপ্রাইজ হিসাবেই আছে। কিন্তু আমি সত্যি জানি না যে ওর ঠিক কী প্রতিক্রিয়া হবে। হয়ত ‘ওয়ান ফর মাই বেবি’র আগেই আমাদের রণে ভঙ্গ দিতে হতে পারে।

ভিত্তোরিও একটা বাঁক ঘোরাতেই হঠাৎ হাসি আর তার সঙ্গে বাজনার আওয়াজ ভেসে এল। পাড়ে একটা রেস্তোরাঁ। এই হুল্লোড়ের উৎস সেখানেই। ভিড়ে ঠাসা। ওয়েটাররা একদিক থেকে অন্যদিকে দৌড়োদৌড়ি করছে অর্ডার নিয়ে। ওই প্রচণ্ড ব্যস্ত পরিবেশের সাপেক্ষে আমার কেমন যেন নিজেদেরকে ভীষণ নিশ্চল বলে মনে হল— যেন আমরাই বসে আছি নদী পারের জেটিতে, আর শান্ত নদীর বুক দিয়ে একটি উৎসব-মুখর প্রমোদতরী ভেসে চলেছে। রেস্তোরাঁটিকে পিছনে ফেলে আমরা এগিয়ে চলি।

–আচ্ছা, আমি কতকটা নিজের মনেই বলে উঠি, এই রেস্তোরাঁর লোকগুলো যদি জানতে পারত যে তাদের কয়েক হাতের মধ্যে দিয়ে এই মাত্র যে নৌকাটি চলে গেল, তাতে কিংবদন্তি টোনি গার্ডনার বসে আছেন, তাহলে ওদের কীরকম প্রতিক্রিয়া হত?

ভিত্তোরিও ইংরিজি বোঝে না খুব একটা। তবু আমার কথা শুনে কী বুঝল জানি না, একটু হাসল। মিস্টার গার্ডনার নীরব। আমরা আবার অন্ধকারের মধ্যে একটা সরু খালের মধ্যে এসে পড়েছি। দুপাশে বাড়িগুলির দরজায় শুধু জ্বলে আছে টিমটিমে আলো দুএকটা।

–আপনি এক কম্যুনিস্ট দেশের মানুষ তো… আপনি বুঝবেন না এসব। মিস্টার গার্ডনার আমাকে উদ্দেশ্য করে ধীরে ধীরে বললেন।
–দেখুন, আমার দেশ কিন্তু আর কম্যুনিস্ট শাসনে নেই— আমরা স্বাধীন, মুক্ত গণতন্ত্র এখন। আমার কথায় বোধহয় একটা প্রতিবাদের সুর প্রচ্ছন্ন ছিল।
–দুঃখিত, আমি কিন্তু আপনাকে বা আপনার দেশকে ছোট করার উদ্দেশ্য নিয়ে কথাটা বলিনি। আপনাদের সাহসিকতার তুলনা নেই। আমি সত্যিই আশা রাখি যে আপনাদের দেশে শান্তি এবং উন্নতি দুইই চিরস্থায়ী হোক। যেটা বলতে চেয়েছি, আমার যেমন আপনাদের দেশের অনেক কিছুই সঠিকভাবে বোধগম্য হবে না, তেমন এখানেও অনেক জিনিস আছে যা আপনার বুদ্ধি বা বোধের কাছে হয়ত এখনও অধরা।
–সে তো অবশ্যই, মিস্টার গার্ডনার।
–ওই রেস্তোরাঁতে যাদের দেখলেন না, আপনি যদি ওদের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন যে কেউ টোনি গার্ডনারের নাম শুনেছে কি না, অনেকেই, হয়ত বেশিরভাগই ‘হ্যাঁ’ বলবে, ওর মধ্যে কয়েকজন চিনেও ফেলতে পারে আমাকে— কিন্তু কতজন ‘টোনি গার্ডনার’-এর উপস্থিতিতে সত্যি সত্যি এক্সাইটেড হয়ে পড়বে, তা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। পুরনো দিনের বিরহগান গাওয়া একজন গায়ক— কী যায় আসে তাদের?
–আমার তা মনে হয় না, মিস্টার গার্ডনার। আপনি চিরকালীন। ঠিক সিনাত্রা বা ডিন মার্টিন যেমন। কিছু কিছু জিনিস তো চিরন্তন হয়— নূতনের খেলা শুরু হলেই কি আর সব পুরাতনকে চলে যেতে হয়?
–আমি জানি যে এ আপনার মনের কথা। কিন্তু একথা আমি সত্যিই বিশ্বাস করি না। তাই আপনার কথায় আত্মবিস্মৃত হয়ে আজ রাতে নিজেই নিজেকে আর উপহাস করতে চাই না।

মিস্টার গার্ডনারের কথাটার মধ্যে এমন কিছু একটা ছিল যে আমি আর কথা বাড়ালাম না। চুপ করে ফের ভেসে চললাম খালের মধ্যে দিয়ে। সত্যি বলতে ওই মুহূর্তে আমি একটা কথাই ভাবছিলাম যে কী কুক্ষণে আমি এর সঙ্গে ফেঁসে গেছি। কী যে হচ্ছে, কেনই বা এইসব নাটকীয়তা কে জানে। আর এই আমেরিকানদের ওপরে বিশ্বাস নেই। কে বলতে পারে, হয়ত মিস্টার গার্ডনার গান শুরু করলেন আর মিসেস গার্ডনার জানলা খুলে দুড়ুম করে গুলি চালিয়ে দিলেন আমাদের ওপরে।

ভিত্তোরিও-ও, আমি নিশ্চিত, এরকমই কিছু ভাবছিল। বুঝলাম একটা বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেওয়ালে ঝোলানো আলোতে ওর মুখ দেখে। আমার দিকে তাকিয়ে যে মুখভঙ্গি করল, তার মানে দাঁড়ায়, এটা কার পাল্লায় পড়েছি রে, ভাই? আমি কিছু উত্তর করলাম না। এই ভিত্তোরিওর কথায় সায় দেওয়ার মানে হয় না। অতীব বজ্জাত ছেলে। তার ওপরে প্রবল জাত্যাভিমান— আমাদের দু চোখে দেখতে পারে না। সুযোগ পেলেই যা খুশি রটায়। চোর, ডাকাত, ধর্ষক— কীই বা বলতে বাকি রেখেছে! এদিকে ওকে মায়ের মত স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে ছোট থেকে এত বড় করেছে কিন্তু ওর এক মাসী যে জিউ। সুতরাং ও যতই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে মিস্টার গার্ডনারের নামে কিছু বলার চেষ্টা করুক আমার কাছে থেকে সমর্থন পাওয়ার আশা দুরাশা।

–শুনুন, আপনাকে একটা গুপ্তবিদ্যা শেখাই। মিস্টার গার্ডনার হঠাৎ বলে উঠলেন। আমাদের অনুষ্ঠান কীভাবে জমাতে হয় তার একটা কৌশল। খুব সহজ। আপনাকে শুধু আপনার শ্রোতাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু একটা জানতে হবে। যে কোনও কিছু। কিন্তু সেটা এমন হওয়া চাই যে সেটা কেবলমাত্র ওই শ্রোতাদের জন্যই প্রযোজ্য। এমন কিছু যা এই শ্রোতাদের, আগের দিন যাদের সামনে গেয়েছেন তাদের থেকে স্বতন্ত্র করতে পারে। মনে করুন, আপনি কাল রোমে গেছিলেন গাইতে— আজ এসেছেন ভেনিস। ভেনিসের শ্রোতাদের কী সেই বিশেষত্ব আছে যেটা আগের দিনের রোমের শ্রোতাদের মধ্যে ছিল না? এটা ভাবতে হবে। হতে পারে, এখানের পর্ক চপ হয়ত বিখ্যাত বা বিশেষ একটি ওয়াইনের খ্যাতি হয়ত বিশ্বজোড়া। ব্যস, সেটুকু মাথায় রাখতে হবে আপনাকে। শ্রোতাদের সামনে সেটা প্রকাশ করার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এটা মাথার নিয়ে স্টেজে উঠলে দেখবেন ওই ভিড় করা মানুষেরা আপনার কাছে একটা স্বতন্ত্রতা লাভ করছে, একটা বিশেষ অবস্থান পাচ্ছে। আর তখন আপনার গান বা বাজনা সেটাও একটা বিশেষ মাত্রা পায়। আশা করি বোঝাতে পারছি যে কী বলতে চাইছি?
–নিশ্চয়ই। অনেক ধন্যবাদ, মিস্টার গার্ডনার। অবশ্যই এবার থেকে এটা মনে রাখব আমি। আপনার মত মানুষের থেকে শিখতে পারার ভাগ্য কজনের হয়!
–তাহলে, আজ রাতে আমরা লিন্ডির জন্য গান গাইব। লিন্ডি আমাদের শ্রোতা। তাহলে আপনার লিন্ডি সম্পর্কে কিছু জানা উচিত। তাই না? জানতে চান?
–নিশ্চয়ই। আমি অবশ্যই জানতে চাই।

 

পরের প্রায় মিনিট কুড়ি মিস্টার গার্ডনারের কথা শুনলাম। তার লিন্ডির কথা। আমাদের গন্ডোলা অন্ধকার খালের কালো জলের মধ্যে দিয়ে ভেসে বেড়াতে লাগল। কথা বলতে বলতে উনি নিজের স্মৃতির মধ্যে হারিয়ে যাচ্ছিলেন মাঝেমাঝেই। তখন মনে হচ্ছিল নিজের সঙ্গেই নিজের কথোপকথন চালাচ্ছেন। হঠাৎ হঠাৎ খালের ধারের কোনও বাড়ির দরজা বা দেওয়ালে লাগানো আলো এসে পড়ছিল আমাদের মুখে— সেই আলো বোধহয় সম্বিৎ ফেরাচ্ছিল ওর। আমার উপস্থিতির কথা ফের মনে পড়ছিল। তখন গলা খাঁকারি দিয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন, আপনি শুনছেন তো?

আমি শুনছিলাম। আমেরিকা দেশটির উত্তর অংশে ঠিক মাঝখানে যে রাজ্যটি, সেই মিনেসোটাতে জন্ম লিন্ডির। ওখানেই বেড়ে ওঠা, স্কুলে যাওয়া। কিন্তু ক্লাসে পড়ার বইয়ের চেয়ে মনোযোগ বেশি ছিল ফিল্ম ম্যাগাজিনের পাতায়। ফলে স্কুলের শিক্ষিকাদের অপছন্দের ছাত্রছাত্রীদের তালিকায় প্রথমেই জায়গা করে নিয়েছিলেন লিন্ডি।

–মজার ব্যাপার কী জানেন তো? মিস্টার গার্ডনার আমাকে বললেন, লিন্ডির মাথার মধ্যে এই প্রথাগত শিক্ষাদীক্ষার বাইরে একটা বৃহত্তর স্বপ্ন কাজ করে চলছিল— এটা ওর স্কুল-টিচাররা কেউ বোঝেনি। যার ফলে, আজ দেখুন লিন্ডিকে— ধনী, সুন্দরী, প্রায় সারা পৃথিবীটা ঘুরে ফেলেছে। আর ওই মিনেসোটার স্কুলের দিদিমণির দল? আমার তো মনে হয় ওরাও যদি কিছু ম্যাগাজিনের পাতায়, সময় থাকতে, চোখ বোলাত, তাহলে ওদেরও আরও বড় কিছু করার স্বপ্ন থাকত।

উনিশ বছর বয়সে হলিউডের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছাড়েন লিন্ডি গার্ডনার। কিন্তু জীবনযাপনের জন্য লস এঞ্জেলসের বাইরে রাস্তার ধারের এক ধাবাতে কাজ নিতে হয়।

আশ্চর্যের ব্যাপার হল, মিস্টার গার্ডনারের কথা শুনতে থাকি আমি, এই ছোট্ট ধাবাতে কাজ নেওয়াটাই কিন্তু ওর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। হলিউডের স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছাড়া মেয়েদের আড্ডা ছিল ওটা। হটডগ স্যান্ডউইচ আর কফি নিয়ে সকাল থেকে রাত অবধি ওদের গুলতানি চলত ওখানে।

আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা এই মেয়েগুলো ওখানে বসে আলোচনা করত ওদের নিত্যকার স্ট্রাগলের কথা— পরের নতুন দিন শুরুর আগে ছোট ছোট দুঃখ ব্যথা ভাগ করে নিত সবাই মিলে। এরা ছাড়া এখানে আর একজন যে ছিল সে হল মেগ, বছর চল্লিশের এক মহিলা। লিন্ডির সঙ্গেই সে কাজ করত।

এই সব মেয়ের দলের কাছে মেগ ছিল ‘দিদি’। হলিউডের অলিগলি নিয়ে তার পাহাড়-প্রমাণ জ্ঞান। একসময় সেও এদের মতই ছিল। অনেক আশা নিয়ে হলিউডে এসেছিল। এই মেয়েগুলোর নানা বিষয়ে জ্ঞান থাকত— চলতি ফ্যাশনের হালহকিকত থেকে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা বা গান। কিন্তু এইসব বিষয়ে এত কিছু জানার পিছনে উদ্দেশ্য একটাই ছিল— কীভাবে কোন উঠতি তারকার জীবনসঙ্গিনী হয়ে ওঠা যায়। ফলে সিনেমা গান এসবের নান্দনিক দিক ছেড়ে ওই নায়ক বা গায়কের ব্যক্তিজীবনই হত এদের আলোচনার মুখ্য বিষয়। আর মেগের কাছে থাকত হলিউডি তারকাদের হাঁড়ির খবর। কীভাবে তাদের মন পাওয়া যেতে পারে, মেগের আস্তিনের মধ্যে লুকানো ছিল তার হরেক কৌশল। লিন্ডি কাজের ফাঁকে মন দিয়ে এসব শুনত। এইসব আড্ডাগুলোই ছিল ওর হার্ভার্ড বা ইয়েল।

–কিন্তু, মিস্টার গার্ডনার, আমি ওর কথার মাঝে বাধা দিয়ে জিজ্ঞেস করি, এই যে মেগের কথা বললেন— হলিউডি তারকাদের সব খবর তার কাছে, তাদেরকে পটানোর কৌশল অবধি তার জানা, তাহলে সে নিজে কেন কোনও তারকার ঘরণী হয়নি? রাস্তার ধারের ধাবায় কাজ করে কেন তাকে দিন চালাতে হয়?
–ভালো প্রশ্ন করেছেন। আসলে কী জানেন, সব কিছু তো অত সরল নয়। মেগ তার জীবনে অনেককে দেখেছিল যারা আকাঙ্ক্ষার সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পেরেছিল শিখরে। আবার অনেকেই পারেনি। বন্ধুর পথের চড়াই-উৎরাই সে দেখেছিল। তাই সেসব অভিজ্ঞতার কথাই হয়ত বলত এই উচ্চাভিলাষী তরুণীদের। তাদের মধ্যে কেউ কেউ সেসব কাহিনির মধ্যে থেকে অন্তঃসারটুকু আহরণ করতে পারত। ঠিক যেমন, লিন্ডি করেছিল। এই সমস্ত আড্ডার থেকে সে নিজের স্বপ্নপূরণের পথ খুঁজে বের করেছিল। ছ বছরের মাথায় তার সাফল্য আসে। ভাবতে পারেন? এই ছ বছর সে কত ব্যর্থতা, কত অপমান সয়েছে, কিন্তু নিজের স্বপ্ন থেকে সরে আসেনি। বারংবার অসাফল্যের পর একদিন ঠিক সাফল্য এল।
–আপনার সঙ্গে দেখা হল?
–না না। প্রথমে ওর বিয়ে হয় ডিনো হার্টম্যানের সঙ্গে। ডিনোর নাম শোনেননি আপনি? মিস্টার গার্ডনার আমার দিকে তাকিয়ে একটু ব্যঙ্গের হাসি হাসলেন, তাহলে বেচারা ডিনোর রেকর্ড কম্যুনিস্ট দেশ অবধি পৌঁছে উঠতে পারেনি হয়ত। তবে, সেসময় ডিনোর বেজায় নাম। আমি লিন্ডির সঙ্গে যখন পরিচিত হই, ও তখন ডিনোর স্ত্রী। মেগের কাছ থেকে ও একটা শিক্ষা পেয়েছিল যে, চুড়োয় ওঠার জন্য আগে প্রাথমিক পথগুলো পার করা প্রয়োজন। হলিউডে এসে প্রথমেই তুমি সিনাত্রা বা ব্রান্ডোকে বিয়ে করার স্বপ্ন দেখো তাহলে মুশকিল। লিফটে করে ধীরে ধীরে ওঠো। প্রথমে দোতলাতে থাকো কিছুদিন। এইসময় ভালো করে পরিচিত হও সেখানকার পরিবেশের সঙ্গে। তারপর একদিন ওপরের তলার পেন্টহাউজের মালিক তোমার ঘরে বেড়াতে এসে তোমার হাত ধরে হয়ত বলবেন তার সঙ্গে আসার জন্য। লিন্ডি ডিনোর সঙ্গে থাকার সময় এই আশাতেই থাকত। আরও ওপরে যাওয়াটাই তার লক্ষ্য। তবে ডিনো এমনিতে দিব্যি মানুষ ছিল। লিন্ডির সঙ্গে প্রথম পরিচয়েই যে একেবারে প্রেমে পড়ে গেছিলাম, তা বলা ভুল। আমি যাকে বলে ‘পারফেক্ট জেন্টলম্যান’। খ্যাতির একেবারে মধ্যগগনে বিরাজ করছি। এদিকে ডিনোর জনপ্রিয়তা তখন কমছে। ওর পুরনো গায়কী নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছচ্ছে না। বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা বিটলস, রোলিং স্টোন— এসবে মজেছে। ডিনো হারিয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে। ঠিক তখনই বরাবরের উচ্চাভিলাষী লিন্ডিও তাকে ছেড়ে পা বাড়াল ওপরতলার পেন্ট-হাউজের দিকে। আমার সঙ্গে বিয়ে হল।
–আপনাকে আমি বললাম না, যে আমরা ‘আই ফল ইন লাভ টু ইজিলি’ গাইব? কেন জানেন? মিস্টার গার্ডনার কয়েক মুহূর্ত থেমে আবার বলতে লাগলেন, সেবার আমরা লন্ডনে গেছি। বিয়ের পর পরই। একদিন সকালে ব্রেকফাস্টের পর আমাদের প্রবল যৌন তাড়না হল। তাড়াতাড়ি করে ফিরেছি নিজেদের স্যুইটে। ফিরে দেখি হাউজকিপিং-এর একটি মেয়ে তখন ঘর পরিষ্কার করছে। আমাদের সবুর সয় না। চুপচাপ ঢুকে পড়লাম নিজেদের বেডরুমে। এদিকে বাইরের ঘরে মেয়েটি নিজের মনে কাজ করছে। আমাদের উপস্থিতির কথা জানেই না। আমরাও যথাসম্ভব শব্দ না করে সঙ্গম করলাম। হয়ে যাওয়ার পর বিছানার ওপরে জড়াজড়ি করে শুয়ে আছি আর নিজেদের কাণ্ড দেখে নিজেরাই হাসাহাসি করছি, আর বাইরের ঘরে সে মেয়ে যাচ্ছেতাই গলায় চিৎকার করে করে নিজের মনে গান গেয়ে চলেছে। সে যত জোরে গায়, আমাদের হাসির দমকও তত বাড়ে। একসময় হঠাৎ সে গান থামিয়ে রেডিও চালিয়ে দিল। চেট বেকারের ভরাট গলায় আমাদের স্যুইট পূর্ণ হয়ে গেল। ‘আই ফল ইন লাভ টু ইজিলি’। আমাদের হাসি থেমে গেছে তখন। দুজন দুজনের হাতের ওপরে মাথা দিয়ে ছাদের দিকে চেয়ে শুনছি চেট বেকারের মায়াময় কণ্ঠস্বর। ধীরে ধীরে আমিও গলা মেলাতে থাকলাম। লিন্ডি আমার বুকে মাথা দিয়ে জড়িয়ে ধরল আমাকে। আমি জানি না সত্যিই আজও ওর সেদিনের কথা মনে আছে কি না। তবু আজকে ওই গান আমি ওকে শোনাতে চাই।

একটানা এতক্ষণ কথা বলে মিস্টার গার্ডনার চুপ করলেন। আবছা আলোতে দেখলাম হাত দিয়ে চোখ মুছলেন উনি। ভিত্তোরিও চুপচাপ দাঁড় টেনে চলেছে। একটা বাঁক ঘুরে আমরা আবার সেই রেস্তোরাঁটির পাশে গিয়ে পড়লাম। ভিড় আরও বেড়েছে। আমার পরিচিত একটি ছেলে, আন্দ্রেয়া পিয়ানোতে বসেছে।

রেস্তোরাঁর আলোকবৃত্ত ছেড়ে আমাদের নৌকা ফের অন্ধকারে ঢুকতেই আমি বললাম, আমি জানি না, মিস্টার গার্ডনার, এ কথা বলার কতটা অধিকার আছে আমার। কিন্তু আমি আজ লক্ষ করলাম যে হয়ত আপনাদের দুজনের মধ্যেকার সেই ভালোবাসার সম্পর্কে কিছুটা ক্ষয় ধরেছে। এ ব্যাপারে আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলি। আমি ছেলেবেলা থেকেই আমার মাকে একাই দেখেছি। বিষণ্ণতা মাখা এক মানুষ— আপনি আজ এখন যেমন, তেমনি। আমার মা ছিল ভালোবাসার প্রত্যাশী। বারবার প্রেমে পড়ত আর খুশিতে ঝলমল করত চোখ, মুখ। আমাকে এসে বলত, দ্যাখো, ইনি তোমার নতুন বাবা হবেন। আমি প্রথম প্রথম সেটাই বিশ্বাস করতাম। পরে বুঝেছিলাম যে এভাবে হয় না। আমার মাকে অবশ্য সে বিশ্বাস থেকে সরাতে পারিনি। বারবার ভালোবাসা হারানোর পরে বিষাদভরা হৃদয়ে মা কী করত জানেন? আপনার কোনও একটি রেকর্ড গ্রামোফোনে চড়িয়ে নতজানু হয়ে বসত তার সামনে। আমাদের ওই ছোট্ট ঘরটা আপনার কণ্ঠস্বরে পূর্ণ হয়ে থাকত। আর আপনার সঙ্গে মাঝে মাঝে মা গলা মেলাত— বোধহয় তার মনের সমস্ত দুঃখ কষ্ট ওভাবেই গান হয়ে বেরিয়ে আসত বাইরে, আছড়ে পড়ত ছাদে, দেওয়ালে, মেঝেতে। বাইরে প্রবল শীতের মধ্যে ওই এক কামরার ঘরে ধীরে ধীরে বসন্ত এসে বাসা বাঁধত। মা বিষণ্ণতার গহ্বর থেকে উঠে এসে উজ্জীবিত হয়ে উঠত বারবার। মিস্টার গার্ডনার, এর জন্য আমি যে কতটা আপনার কাছে কৃতজ্ঞ সে কথা আমি কথায় প্রকাশ করতে পারব না। আপনার গান আমাদেরকে বাঁচিয়ে রেখেছিল সেই সময়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে শুধু আমি বা আমার হৃদয়-ভাঙা মা নয়, আপনার গান এ পৃথিবীতে আরও অনেক, অনেক মানুষকে তাদের জীবনের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে বারবার। তাহলে আপনি নিজে কেন এর ব্যাতিক্রম হবেন?

আমি একটু মৃদু হাসার চেষ্টা করি। রাতের নীরবতার মধ্যে সেটুকুই বড় শব্দময় শোনায়। আমি তারপর আবার বলি, আপনি আমার ওপরে আজ রাতে ভরসা রাখতে পারেন, মিস্টার গার্ডনার। আমি আমার সবটুকু উজাড় করে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। যে কোনও অর্কেস্ট্রার থেকে কম কিছু হবে না আমার আর আপনার যুগলবন্দি। কে বলতে পারে, আপনার আজকের গানই হয়ত আপনাদের দুজনের মধ্যেকার ক্ষয়িষ্ণু সম্পর্কের মোড় ঘুরিয়ে আবার ফিরিয়ে দেবে ভালোবাসার কাছে? সব সম্পর্কেই তো ওঠাপড়া থাকে, মিস্টার গার্ডনার।

ভদ্রলোক একটু হাসলেন। তারপর বললেন, আপনি ভালো মানুষ। আমার সঙ্গে আজ রাতে থাকার জন্য আপনার প্রতি আমি যারপরনাই কৃতজ্ঞ থাকব। আচ্ছা, লিন্ডি ঘরে ফিরে এসেছে কিন্তু। আলো জ্বলছে ঘরে। আমাদের আর সময় নষ্ট করলে চলবে না।

 

আমরা একটা পালাৎজোর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। এর আগেও বার দুই গেছি এখান দিয়ে। এখন বুঝলাম যে ভিত্তোরিও আমাদের একই চক্রাকার পথে বারবার ঘোরাচ্ছিল। আর মিস্টার গার্ডনার নজর রাখছিলেন ওই জানলার দিকে— কখন ঘরের আলো জ্বলবে। এখন আমরা ওই ঘরের দেওয়ালের ঠিক নীচে। আধখোলা জানলা দিয়ে ঘরের আলো বাইরে এসে পড়েছে। আর ওই জানলা দিয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি ঘরের ছাদের কড়ি-বরগার একটুখানি। মিস্টার গার্ডনারের ইশারাতে ভিত্তোরিও আমাদের দেওয়ালের আরও কাছে নিয়ে এল।

নৌকোটিকে টলোমলো করে মিস্টার গার্ডনার উঠে দাঁড়ালেন। ভিত্তোরিও তাড়াতাড়ি হাল না ধরলে জলে হাবুডুবু খেতে হত আমাদের। দাঁড়িয়ে উঠে মিস্টার গার্ডনার জোরে অথচ কোমলভাবে ডাকলেন, লিন্ডি? লিন্ডি?

জানলায় একটি হাত দেখা গেল প্রথমে। আধখোলা পাল্লাকে পুরো খুলে দিয়ে মিসেস গার্ডনার বেরিয়ে এলেন। আমাদের কিছুটা ওপরে একটা আলো জ্বলছে বটে, কিন্তু তার ঔজ্জ্বল্য এতটাই কম যে সম্পূর্ণ অন্ধকারকে দূর করতে সে একেবারেই অপারগ। আলোর বিপরীতে মিসেস গার্ডনারের অবয়বটুকু শুধু এখান থেকে বোঝা যাচ্ছে।

–এ কী! তুমি ওখানে কী করছ? মিসেস গার্ডনার ঝুঁকে পড়ে বললেন, আমি তো ভাবলাম তোমায় কেউ তুলে নিয়ে গেল নাকি! চিন্তায় পড়ে গেছিলাম রীতিমতো।
–ধ্যাৎ! এখানে আবার কী হবে আমার? আমি তো তোমার জন্য একটা চিরকুট রেখে এসেছিলাম।
–চিরকুট? কই? পাইনি তো!
–রেখে এসেছিলাম, যাতে তুমি চিন্তা না করো।
–কোথায় রেখে গেছিলে? কী লিখেছিলে তাতে?
–আমার অত মনে নেই, মিস্টার গার্ডনারকে একটু বিরক্ত শোনায়, এমনি একটা চিরকুট, যেমন রাখি আমি, বলেছিলাম যে সিগারেট কিনতে বের হচ্ছি আমি।
–তা তুমি ওখানে কি সিগারেট কিনছ?
–না না। আমি ঠিক করেছি আজ তোমায় গান শোনাব।
–ফাজলামি হচ্ছে নাকি?
–না, সত্যি। মজা করছি না আমি। এই ভেনিস শহরে এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারে?
–এখানে আমি দাঁড়িয়ে থাকতে পারব না। খুব ঠান্ডা।

মিস্টার গার্ডনার একটি দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। তারপর বললেন, ঠিক আছে। তুমি ঘরে গিয়ে বসো। জানলাটা খোলা রাখো। ওখান থেকেও শুনতে পারবে।

মিসেস গার্ডনার কিছু না বলে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন মিস্টার গার্ডনারের দিকে। তারপর ধীরে ধীরে জানলা থেকে অদৃশ্য হয়ে গেলেন ঘরের মধ্যে। মিস্টার গার্ডনার একটু মনঃক্ষুণ্ণ হলেন বোধহয়। যদিও এমনটা যে হতে পারে, তার জন্য উনি প্রস্তুতই ছিলেন। তবুও দেখলাম মাথা নামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। ওকে এমন মুষড়ে পড়তে দেখে আমিই বললাম, চলুন মিস্টার গার্ডনার, শুরু করি আমরা? বাই দ্য টাইম আই গেট টু ফিনিক্স?

বলে আমি নিজেই গানের মুখরার দু কলি বাজিয়ে ফেললাম। চেষ্টা করলাম আমেরিকান স্টাইলটা বজায় রাখার— ধু ধু রাস্তার পাশের একলা পানশালার মতো উদাস, বিমর্ষ একটা ভাব। আমার মনের মধ্যে আমার মায়ের কথা আসছিল বারবার— বিষণ্ণ, ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো এমনই একটা ফাঁকা আমেরিকান হাইওয়ের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকা আমার উদাসী মায়ের কথা ভেবেই গিটারের কর্ড ধরলাম। যেন আজ, এখানে মা থাকলে গিটারের এই আওয়াজকে অতলান্তিকের ওপারের ওই দেশ যার কথা ওই রেকর্ডের ওপরে লেখা থাকত সেখানকার সঙ্গীত বলে চিনে নিতে পারত সে।

আমি বুঝে ওঠার আগেই গান ধরলেন মিস্টার গার্ডনার— আমি তখনও বিট ধরিনি। ভাসমান নৌকার ওপরে টলোমলো পায়ে দাঁড়িয়ে উনি। দেখে মনে হচ্ছে এই বুঝি উল্টে পড়লেন জলের মধ্যে। কিন্তু গলার আওয়াজে কোনও হেরফের নেই— ছেলেবেলার গ্রামোফোন রেকর্ডের মত সেই এক বলিষ্ঠ অথচ শান্ত কণ্ঠস্বর। এত জোরালো যে মনে হচ্ছে সামনে বুঝি একটা অদৃশ্য মাইক্রোফোন রাখা আছে। আর সমস্ত বিখ্যাত আমেরিকান গায়কদের মতই ওরও গলার মধ্যে কোথাও এক অতলান্ত বিষাদের পাশাপাশি নিজের হৃদয়কে প্রকাশ করার প্রতি যেন কিঞ্চিৎ দ্বিধার সুর।

গানের মধ্যে দিয়ে ভেসে চললাম আমরা। এই গান এক বিদায়গাথা। এক আমেরিকান তার প্রেয়সীকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এই যাত্রাপথের সমস্ত শহরগুলো তার স্মৃতিতে উজ্জ্বল— ফিনিক্স, ওকলাহোমা, আলবুকার্ক। লম্বা নির্জন হাইওয়ে দিয়ে চলছে তার গাড়ি ঠিক যেমনটা আমার মা বরাবর চাইত। সব ছেড়ে যদি আমরা চলে যেতে পারতাম ও দেশে। মা নিশ্চয়ই চাইত সেটা, তবু পারেনি কোনওদিন— শিকড় ছিঁড়ে যাওয়ার জন্য বুঝি প্রয়োজন হয় আরও বড় কোনও দুঃখতাপের।

গান শেষ করে আমরা ধরলাম পরের গান— ‘আই ফল ইন লাভ টু ইজিলি।’

এই গানটা নিয়ে কিছুক্ষণ আগেই মিস্টার গার্ডনার তার জীবনের গল্প বলেছেন আমায়। ফলে, কিছুটা কৌতূহল নিয়েই মাঝে মাঝে ওপরের জানলার দিকে তাকাচ্ছিলাম আমি। কিন্তু সেখানে আবছায়া অন্ধকারে কোনও স্পন্দন নেই। নেই কোনও শব্দও। পাশের একটা বাড়ির জানলা খুলে দিল কেউ— বোধহয় আরও ভালোভাবে শোনার জন্য। কিন্তু আমাদের মাথার ঠিক উপরের জানলাটা রয়ে গেল একই রকম নিস্পন্দ।

‘ওয়ান ফর মাই বেবি’ খুব ধীর লয়ে করলাম আমরা। শেষ হওয়ার পর ফের নিস্তব্ধতা। ওপরের জানলাতেও কোনও সাড়াশব্দ নেই। প্রায় মিনিট খানেক পরে একটা শব্দ ভেসে এল সেখান থেকে। খুব মৃদু হলেও আমাদের কারও বুঝতে অসুবিধা হল না যে ওটা মিসেস গার্ডনারের ফুঁপিয়ে কান্নার আওয়াজ।

আমি ফিসফিস করে বললাম, আমার মনে হয় আমরা সফল। আপনার গান ওর মন ছুঁয়েছে।

মিস্টার গার্ডনার কিছু উত্তর দিলেন না। মুখের রেখায় খুশির ভাবও প্রকাশ পেল না। ভিত্তোরিওকে শুধু বললেন, চলো, এবার ফেরা যাক। আমায় ওপাশে নিয়ে গিয়ে নামিয়ে দাও।

ভিত্তোরিও গন্ডোলা ঘুরিয়ে নিয়ে এগিয়ে চলল। মিস্টার গার্ডনার অন্যদিকে তাকিয়ে অপরাধীর মত মুখ করে বসে রইলেন। আমি জানি না কেন, আমার মনে হল আজকের এই পুরো ব্যাপারটার মধ্যে কোথাও একটা প্রবল তিক্ততা প্রচ্ছন্ন ছিল। এই গানগুলোর প্রতিটাই যে মিসেস গার্ডনারের কাছে অর্থবাহী স্মারক— সেটুকু আমি বুঝেছি। গিটারটা পাশে নামিয়ে রেখে আমি একটু মনভার করেই বসে রইলাম।

দাঁড় বেয়ে ভিত্তোরিও আমাদের একটা চওড়া খালের মধ্যে এনে ফেলল। পাশ দিয়ে একটা জল-ট্যাক্সি হুশ করে বড় বড় ঢেউ তুলে চলে গেল। আমরা মিস্টার গার্ডনারের পালাৎজোর মূল ফটকের কাছাকাছিই পৌঁছে গেছিলাম। আমি নীরবতা ভেঙে বললাম, মিস্টার গার্ডনার, হয়ত আজকের পর আপনার সঙ্গে আমার আর এ জীবনে কখনও দেখা হবে না। একটা প্রশ্ন রয়ে গেল মনের মধ্যে। শুধু এটুকুই জানতে চাই আপনার কাছে, এটা কি মিসেস গার্ডনারের খুশির অশ্রু নাকি দুঃখের কান্না?

ভিত্তোরিও নৌকাখানা পাড়ের কাছে এনে দড়ি দিয়ে নোঙর করছিল। সামনে অন্ধকার আবছায়াতে মিস্টার গার্ডনারের অবয়বটুকুই আমার চোখে পড়ছিল। নৌকার মুখটাতে এক ধ্যানস্থ মূর্তির মত উপবিষ্ট। আমি ভাবিনি আমার এই কথার উত্তর পাব।

–আমাকে আজ এভাবে গাইতে শুনে লিন্ডি যে খুশি হয়েছে, তাতে আমার কোনও সন্দেহ নেই। তবে মন আমাদের দুজনেরই আজ বড় খারাপ। দীর্ঘ সাতাশ বছর আমরা একসঙ্গে থেকেছি। আর আজকের পর আমরা যে যার পথে হাঁটব। আমাদের বিচ্ছেদের আগে এটাই আমাদের শেষ একসঙ্গে বেড়াতে আসা।
–ওহ, আমি সত্যিই খুব দুঃখিত, মিস্টার গার্ডনার। বিয়ে ভেঙে যাওয়া নতুন কিছু নয়— সাতাশ বছরের মত দীর্ঘ সময় পরেও বিচ্ছেদ হয়। কিন্তু কজন আপনাদের মত হয়— এভাবে ভেনিসের মত রোম্যান্টিক শহরে ছুটি কাটিয়ে, আধো রাতে গন্ডোলার থেকে গান গেয়ে বিদায় জানানো। আমি দেখেছি বেশিরভাগ মানুষই বিচ্ছেদের মুহূর্তে দাঁড়িয়ে ন্যূনতম শিষ্টতাটুকুও রক্ষা করতে পারে না।
–কেন পারে না? আমি তো এটাই বুঝি না যে বিচ্ছেদ কেন সৌজন্যবর্জিত হবে? আমরা একে অপরকে ভালোবেসেছিলাম। দীর্ঘ এত বছরের একসঙ্গে জীবনযাপন— সেটা মিথ্যা হয়ে যায় কীভাবে? আমি তো আজও, এই বিচ্ছেদের মুহূর্তে দাঁড়িয়েও লিন্ডিকে ভালোবাসি। লিন্ডিও যে আমাকে ভালোবাসে তার প্রমাণ ওর ওই কান্না।

ভিত্তোরিও জেটিতে নৌকাটা বেঁধে ফেলেছিল। অন্ধকারে অপেক্ষা করছিল আমাদের জন্য। আমরা একইভাবে তখনও বসে। আমি অপেক্ষা করছিলাম টোনি গার্ডনারের মুখ থেকে আরও কিছু শোনার। কয়েক মুহূর্ত পর তিনি আবার বললেন,

–জানেন, লিন্ডির চোখের দিকে প্রথমবার তাকিয়ে আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম। ও তখন আমার প্রেমে পড়েনি। আমি একজন তারকা গায়ক— এটাই হয়ত ওর মনে কাজ করেছিল। ওর সেই উচ্চাভিলাষের লক্ষ্য ছিল আমার মত একজনের স্ত্রী হওয়া। ‘ভালোবাসা’ বিষয়টাই ওকে ভাবায়নি কখনও। কিন্তু, সাতাশ বছরের বিবাহিত জীবন তো অনেক পরিবর্তন আনে। অনেক যুগল একে অন্যকে সত্যি সত্যি ভালোবাসতে শুরু করে। আবার অনেকে একে অন্যের প্রতি বিরক্ত হয়ে যায়। লিন্ডি কিছু বছরের মধ্যে আমায় ধীরে ভালোবাসতে শুরু করল। সত্যি বলতে, আমার প্রথম প্রথম বিশ্বাস হত না। কিন্তু আস্তে আস্তে আমিও বুঝতে শুরু করলাম। আমি আবিষ্কার করলাম যে আমরা দুজন দুজনের সুখ দুঃখের সাথী হয়ে পড়েছি, একে অন্যের জন্য দুশ্চিন্তা করছি, যত্ন নিচ্ছি। আমাদের মধ্যে একটা ভালোবাসার বন্ধন তৈরি হয়েছে। এবং এখনও সে বন্ধন অচ্ছেদ্য আছে।
–আমি বুঝলাম না, মিস্টার গার্ডনার, তাহলে আপনারা কেন বিবাহবিচ্ছেদের পথে হাঁটছেন?

আবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন মিস্টার গার্ডনার। তারপর বললেন, সে আপনাকে কী করেই বা বোঝাই, বন্ধু? তবে আজ আপনি আমায় যা সাহায্য করেছেন তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। তাই একবার চেষ্টা করি আপনাকে বোঝানোর। আপনি আমাকে যাই মনে করুন না কেন, সত্যিটা হল যে আমি এখন আর সেই তারকাদের দলে পড়ি না। আপনি প্রতিবাদ করবেন, আমি জানি। কিন্তু এটাই ঘটনা। আমি হলিউডের একজন কেউকেটা নই আর। অতীতের ছায়ামাত্র। তবে আমি এটা বিশ্বাস করি না যে আমি সম্পুর্ণ নিঃশেষিত। চেষ্টা করলে হয়ত আবার ফিরে আসতে পারি। ফিরে আসা যে সম্ভব তা অনেকেই প্রমাণ করেছে। কিন্তু সে পথ সহজ নয়— বড় বন্ধুর। অনেকখানি পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে। খুবই কঠিন।

–কিন্তু, এই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে আপনার আর মিসেস গার্ডনারের বিচ্ছেদের কী সম্পর্ক?
–নতুন করে নিজের ক্ষেত্রে পুনঃপ্রবেশ করেছে যারা তাদের দিকে তাকান একবার। সকলের দুই-তিনজন স্ত্রী। আমার মত বয়সে এসে সদ্যযৌবনা স্ত্রী-এর হাত ধরে তারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেখানে আমি আর লিন্ডি এত বছর পার হয়ে এসেছি, দুজনেই প্রৌঢ়। হলিউডের ওই চকচকে গ্ল্যামারের দুনিয়াতে অনেকটাই দলছুট, সকলের কাছে হাস্যস্পদ। তাছাড়া, সত্যি বলতে একজন তরুণীর প্রতি কিছুদিন ধরে আমি একটু আকর্ষণ অনুভব করছি। লিন্ডির সঙ্গে এ ব্যাপারে কথাও হয়েছে আমার। আর আমরা দুজনেই এটা স্বীকার করেছি যে এবার আমাদের দুজনার দুটো পথকে দুটো দিকে নিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে।
–আমি তবুও বুঝলাম না, মিস্টার গার্ডনার। যে গানগুলো আপনি এই এত বছর ধরে গেয়েছেন, রেকর্ড করেছেন সেগুলো তো এই পৃথিবীর প্রতিটা কোণের প্রতিটা মানুষের জন্য সত্যি! এমনকি আমার যে দেশ, সেখানেও। আপনি বা মিসেস গার্ডনার তো গ্রহান্তরের মানুষ নন। তাহলে আপনার গানে যে বারবার বলেছেন, সম্পর্কে ভালোবাসা না থাকলে তাদের পৃথক হওয়া মানায়, কিন্তু ভালোবাসা থাকলে তাদের একসঙ্গে থাকাতেই ভালোবাসার সার্থকতা— এটা কেন আপনার নিজের জন্য সত্যি হবে না?
–আমি বুঝতে পারছি আপনার কথা। হয়ত আমাদের এই ব্যবহার আপনার একটু অদ্ভুত লাগছে, জানি। কিন্তু এখানে লিন্ডিরও ভূমিকা আছে। ওকে তো দেখেছেন আপনি। এখনও একইরকম সুন্দর, আকর্ষণীয়। ও কেন আবার নতুন করে একটা সম্পর্ক শুরু করার সুযোগ পাবে না, বলুন? নতুন করে ভালোবাসবে কাউকে খুব বেশি দেরি হয়ে যাওয়ার আগে।

মিস্টার গার্ডনারের কথা শুনে ভাবছিলাম যে কী বলি। উনি হঠাৎ আমার আস্তিন খামচে ধরে বললেন, আপনি যে আপনার মায়ের কথা বলছিলেন, উনি নতুন জীবন শুরু করতে পেরেছিলেন কি?

–না, আমি কয়েক মুহূর্ত ভেবে উত্তর দিই, মা পারেনি। আসলে মা অতদিন বাঁচেইনি।
–আহা। উনি যে কদিন বেঁচে ছিলেন, আমার গান যে তাকে বাঁচতে সাহায্য করেছিল— যদি সত্যিই তাই হয়ে থাকে তাহলে এটা আমার অনেকখানি পাওয়া। উনি যদি আবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারতেন তাহলে ভালো হত। আমি লিন্ডির সঙ্গে এটা হতে দিতে চাই না। লিন্ডি নতুন করে আবার জীবন শুরু করুক, এটাই চাই।

আমাদের নৌকাটা জলের ঢেউয়ে অল্প অল্প দুলছিল। ভিত্তোরিও জেটির ওপরে থেকে আমাদের উঠে আসার জন্য হাত বাড়িয়ে দিল। মিস্টার গার্ডনার উঠে দাঁড়ালেন। তারপর ভিত্তোরিওর হাত ধরে উঠে গেলেন জেটিতে। আমিও তাকে অনুসরণ করলাম।

ভিত্তোরিওর চোখ মুখ টাকা পেয়ে খুশিতে ঝলমল করে উঠল। বুঝলাম আশাতিরিক্ত ভাড়াই পেয়ে গেছে। বিদায় জানিয়ে সে গন্ডোলা নিয়ে চলে গেল।

এবার আমার বিদায়ের পালা। মিস্টার গার্ডনার এক গোছা নোট বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। আমার প্রাণপণ নিষেধ সত্ত্বেও সেগুলি আমার হাতে গুঁজে দিলেন। যেন টাকার গোছার বিনিময়ে আজকের এই সন্ধ্যায় আমার কাছে ওর যা ঋণ সেসব চুকিয়ে আমার হাত থেকে কোনওভাবে নিষ্কৃতি পেতে চান। তারপর পিছন ফিরে হাঁটতে থাকলেন পালাৎজোর দরজার দিকে। আধো অন্ধকারের মধ্যে কয়েক পা এগিয়ে থমকে দাঁড়ালেন টোনি গার্ডনার। পিছন ফিরে একবার তাকালেন আমার দিকে। এই ছোট্ট রাস্তা, পাশে বয়ে চলা অন্ধকার মাখা খাল সব তখন এক অপার নিস্তব্ধতায় ভরা। শুধু বহুদূরে কোথাও থেকে একটি টেলিভিশনের শব্দ ভেসে আসছে।

–আপনি অপূর্ব গিটার বাজিয়েছেন, মিস্টার গার্ডনারের কথা শুনতে পেলাম, আপনার খুব ভালো হাত।
–ধন্যবাদ, মিস্টার গার্ডনার। আপনার গানের কথা তো আর নতুন করে বলার কিছু নেই।
–আশাকরি ভেনিস ছেড়ে যাওয়ার আগে আবার আসব আপনাদের অর্কেস্ট্রা শুনতে।
–নিশ্চয়ই আসবেন।

 

আমাদের কথা ওখানেই শেষ হয়। আমি আর কোনওদিন টোনি গার্ডনারকে দেখিনি। কয়েকমাস পরে ফ্লোরিয়ানের এক ওয়েটারের মুখে জানতে পারি গার্ডনার দম্পতির বিবাহ বিচ্ছেদের কথা। আমার সেদিনের সেই সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে। হয়ত ওদের ভালোবাসার কাহিনিটা আমাদের মত ছাপোষা সাধারণ বাজিয়ের কাছে অদ্ভুত, একটু বিচিত্র তার প্রকৃতি, চলার পথ। কিন্তু এতে তো কোনও সন্দেহ নেই যে টোনি গার্ডনারের মত এমন অমায়িক ভদ্র মানুষ, তিনি আবার নতুন ভাবে জনপ্রিয়তার নিরিখে ফিরে আসুন বা নাই আসুন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ কয়েকজন গায়কের মধ্যে চিরকালের জন্যই তার আসনটি পাকা হয়ে থাকবে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3553 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...