অভিন্ন নাগরিক বিধি: যুক্তি, প্রতিযুক্তি ও অন্যান্য

অর্ধেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়

 



প্রবন্ধকার

 

 

 

পৃথিবীর সর্ববৃহৎ গণতন্ত্রের সংবিধানটিকে যদি ত্রুটিহীন বলে ধরে নেওয়াও হয়, তা হলেও তাকে পরস্পরবিরোধিতার অভিযোগ থেকে রেহাই দেওয়া কঠিন। পাড়া মহল্লা গ্রাম মফস্বল নগর মহানগর প্রভৃতির অন্তর্গত ভিন্নতর দ্বন্দ্বের বিন্যাসে বিন্যস্ত সমাজের সম্মিলিত সত্তা হল ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থার আধার। আর এই সমাজের শরীরে ধর্ম ও প্রথার বিবিধতাই নির্দিষ্ট করে থাকে নীতির স্বরূপ। কিন্তু এইসব বিবিধতার মধ্যে নিহিত ঐক্যটি আবার নির্ধারণ করে ধর্ম, প্রথা, লিঙ্গ, বর্ণ, ভাষা ও শ্রেণিনিরপেক্ষ ন্যায়, স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের পরাকাষ্ঠাটিকে। যদি সেখানে কোনও আপস সংগঠিত হয় তবে তা যুগ-যুগ ধরে কিছু অব্যবস্থার ক্ষত বহন করতেই থাকে। অভিন্ন নাগরিক বিধি বা ইউনিফর্ম সিভিল কোডও তাই স্বাধীনতার সত্তর বছর পরে বিতর্কিত অবস্থানেই কায়েম আছে। সম্প্রতি দিল্লির উচ্চ-আদালত মীনা সম্প্রদায়ভুক্ত এক দম্পতির ডিভোর্সের মামলায় আরও একবার অভিন্ন নাগরিক বিধি কার্যকর করার পক্ষে সওয়াল তুলে বলেছে,

আধুনিক ভারতীয় সমাজ ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায়ের বাধা কাটিয়ে ধীরে-ধীরে সমজাতীয় হয়ে উঠছে, তাই অভিন্ন নাগরিক বিধিকে আর শুধুমাত্র আশা হিসাবে রেখে দেওয়া উচিত হবে না।

অভিন্ন নাগরিক বিধি যাকে লিঙ্গসাম্য, জাতীয় ঐক্য ও আধুনিকতা রক্ষার প্রধানতম পন্থা হিসাবে মান্যতা দেওয়া হয় তা আসলে সংবিধান প্রদত্ত অধিকারগুলির মধ্যেই পরস্পরবিরোধিতার বীজ বপন করে রেখেছে। আর তাই এই বিতর্কজনিত গড়িমসি। নির্দেশমূলক নীতি আর্টিকেল ৪৪ যেখানে বলছে যে, ‘রাজ্য ভারতের সমস্ত অঞ্চলে নাগরিকদের জন্য একটি অভিন্ন নাগরিক বিধি সুরক্ষিত করার চেষ্টা করবে’, সেখানেই আর্টিকেল ১৪, ১৫ ও ২৫ থেকে ২৮ ভারতের নাগরিকদের সাম্য, বৈষম্যহীনতা, ধর্ম পালনের স্বাধীনতা ও বহুত্ববাদের মৌলিক অধিকারগুলিকে বহাল করেছে। ফলে বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, শিশু এবং অপ্রাপ্তবয়স্কের অধিকার, দত্তক, উইল, উত্তরাধিকার, যৌথ পরিবার নীতি ও আলাদা হয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যখন হিন্দু-মুসলমান-শিখ-খ্রিস্টান ইত্যাদি ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত মানুষরা নিজস্ব বিধি পালন করেন তখন বহুক্ষেত্রে রাষ্ট্রকে এক যাত্রায় পৃথক ফলের মতো একই সময়ে নানান অবস্থান গ্রহণ করতে হয়। অর্থাৎ একই প্রকৃতির দুটি মামলায় যখন কোনও একটি ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ আইনবলে বঞ্চনার শিকার হয়, তখনই আবার অন্য কোনও ধর্মসম্প্রদায়ভুক্ত মানুষ নায্য অধিকার অর্জনে সফল হয়। এক্ষেত্রে শাহবানু মামলা কিংবা সরলা মুদ্গল মামলার কথা উদাহরণ হিসাবে উঠে আসে। এরপরেও বহু মামলা হয়েছে এবং সুপ্রিম কোর্ট থেকে গণমাধ্যম সর্বত্র বিতর্কও কম হয়নি।

অবশ্য এই বিতর্ক আজকের নয়, সংবিধান প্রণয়নের সময় থেকেই এটা চলছে। কেননা গলদটার সূত্রপাত তো সেই প্রাথমিক অবস্থান থেকেই। ১৯৪৭ সালে যখন অভিন্ন নাগরিক বিধি কার্যকর করার বিষয়টিকে বিতর্কের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল তখনই দেশের মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত প্রতিনিধিরা প্রবল আপত্তি তুলেছিলেন। মহম্মদ ইসমাইল খান বলেছিলেন,

The right to follow personal law is part of the way of life of those people who are following such laws; it is part of their religion and part of their culture. If anything is done affecting the personal laws, it will be tantamount to interference with the waibidy of life of those people who have been observing these laws for generations and ages. This secular State which we are trying to create should not do anything to interfere with the way of life and religion of the people.

আরেক প্রতিনিধি মেহবুব আলি বেগ সাহেব বাহাদুর বলেছিলেন,

People seem to think that under a secular State, there must be a common law observed by its citizens in all matters, including matters of their daily life, their language, their culture, their personal laws. That is not the correct way to look at this secular State. In a secular State, citizens belonging to different communities must have the freedom to practice their own religion, observe their own life and their personal laws should be applied to them.

নাজিরুদ্দিন আহমদ আরও এক কদম এগিয়ে গিয়ে বলেছিলেন,

That this is not a matter of mere idealism. It is a question of stern reality which we must not refuse to face and I believe it will lead to a considerable amount of misunderstanding and resentment amongst the various sections of the country. What the British in 175 years failed to do or was afraid to do, what the Muslims in the course of 500 years refrained from doing, we should not give power to the State to do all at once.

এই তীব্র বিরোধিতার মধ্যে কিন্তু কে এম মুন্সী স্পষ্টভাবেই সেদিন বলেছিলেন,

When you want to consolidate a community, you have to take into consideration the benefit which may accrue to the whole community and not to the customs of a part of it. It is not therefore correct to say that such an act is tyranny of the majority. If you will look at the countries in Europe which have a Civil Code, everyone who goes there from any part of the world and every minority, has to submit to the Civil Code. It is not felt to be tyrannical to the minority. The point however is this, whether we are going to consolidate and unify our personal law in such a way that the way of life of the whole country may in course of time be unified and secular. We want to divorce religion from personal law, from what may be called social relations or from the rights of parties as regards inheritance or succession.

তবে তাঁর কথা ভোটাভুটির রায়ে পরাজিত হয়েছিল, বিরোধীরা জয়ী হয়েছিলেন। আর এখনও সেই একই যুক্তিতে বিরোধিতার হাওয়া পালে লেগেই আছে। একথা মাঝেমধ্যে যেন প্রতিভাত হয়, অভিন্ন নাগরিক বিধি নিয়ে মুসলমান সমাজের বিরোধিতার কারণ আসলে না ছিল রাজনৈতিক না সামাজিক, তা যেন অস্তিত্বরক্ষার সূচকে পরিণত হয়েছিল। ইসলামি নিয়মকানুনের বদলে যদি দেশের অভিন্ন নাগরিক বিধি মুসলমান জীবনেও কার্যকর হয় তবে তা তাদের ক্ষমতার বিন্যাসকে প্রভাবিত করে তাদের মতামতের গুরুত্বকে লঘু করে দেবে— এমন একপ্রকারের ধারণা যেন বদ্ধমূল হয়েছিল। তবে পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে যখন সংবিধানে ‘সেক্যুলারিজম’ ও ‘সোশ্যালিজম’-কে অন্তর্ভুক্ত করা হয় তখন অনেকে প্রত্যাশা করেছিল যে এইবার অভিন্ন নাগরিক বিধির পক্ষে কাজ করা হবে। কিন্তু তা না হয়ে আরেকটি বিতর্ক তখন দানা বেঁধে উঠেছিল যে, ভারত রাষ্ট্র হিসাবে কোন্‌ ধরনের ‘সেক্যুলারিজম’-কে মান্যতা দেবে? পাশ্চাত্যকে অনুসরণ করে রাষ্ট্র কি সমস্ত প্রকারের ধর্ম থেকে নিজেকে পৃথক করে নেবে নাকি, ভারতের নিজস্ব সংস্করণ হিসাবে ‘সর্ব ধর্ম সম্বন্বয়ের’ পথ ধরবে? বলাই বাহুল্য ভারত সমস্ত ধর্মকেই অর্থাৎ হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-শিখ-পার্শি-জৈন ইত্যাদি সবকটিকেই সমান প্রাধান্য দেওয়ার নীতি অনুসরণ করেছিল।

এ-প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৫১ সালে নেহেরু সমাজ সংস্কারের দোহাই দিয়ে হিন্দুদের ধর্মনীতিতে থাকা বহুবিবাহ, কৌলিন্যপ্রথা ইত্যাদিকে আইনত দণ্ডনীয় অপধারের তকমা প্রদান করে ‘হিন্দু কোড বিল’ প্রয়োগ করেছিলেন। তখন কিন্তু একই সমাজ সংস্কারের যুক্তিগুলি মুসলমান-খ্রিস্টান-শিখ-পার্শি ইত্যাদি ধর্মসম্প্রদায়ের মানুষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়নি। অর্থাৎ হিন্দু ছাড়া বাকিরা নিজেদের প্রাচীন ধর্মনীতি অনুযায়ীই জীবনযাপন করার অধিকার পেয়েছিল। ১৯৭৬ সালের পরে অর্থাৎ সেক্যুলারিজমের ধারণার প্রয়োগের পরবর্তীকালেও এ-বিষয়ে কোনও পরিবর্তন আনা হয়নি— না হিন্দু কোড বিল বাতিল করা হয়েছিল না অভিন্ন নাগরিক বিধি কার্যকর হয়েছিল। যার অর্থ এই যে, সমাজ সংস্কারের দায় শুধু হিন্দুসমাজের ওপরেই ন্যস্ত হয়ে থেকেছিল, বাকিদের ধর্মানুযায়ী প্রাচীন নিয়মনীতি চালু রাখার স্বাধীনতা বহাল ছিল। এমনকি ১৯৮৫ সালে যখন শাহবানু মামলাটি আদালতে ওঠে ও আদালত একটি নজিরবিহীন রায়দান করে তখনও তৎকালীন সরকার ভোটের রাজনীতির মোহে বিতর্কিত মুসলিম উইমেন অ্যাক্ট (১৯৮৬) কার্যকর করে ব্যাপারটাকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। এটাকে একপক্ষের তোষণ ছাড়া আর কীইবা বলা যায়! এটা আসলে গদি হারানোর ভয়ে করা ভোটের রাজনীতি ও তুষ্টিকরণের চেয়ে বেশি কিছুই নয়।

সম্প্রতি বিজেপি অভিন্ন নাগরিক বিধির পক্ষে সমর্থন জাহির করেছে। তিন তালাক ও ৩৭০ ধারা বাতিলের পরে যদি এখন তারা এই কাজটিও করে দেখায় তবে তাদের সাম্প্রদায়িক তকমা দিয়ে আটকানোর যুক্তি কী হবে, তা নিয়ে অনেকেই বিচলিত। কংগ্রেসের পাপস্খালন যদি বিজেপি করতে চায় তাহলে তো সেখানে কোনও যুক্তিই খাটে না। তবে ১৯৫৪ সালে কিন্তু নেহেরু বলেছিলেন,

Well, I should like a civil code which applies to everybody, but…wisdom hinders…if anybody else brings forward a Civil Code Bill, it will have my extreme sympathy. But I confess I do not think that at the present moment the time is ripe in India for me to try to push it through. I want to prepare the ground for it.

আর আচার্য জে বি কৃপালনী এই মনোভাবকে বলেছিলেন সাম্প্রদায়িক ও কাপুরুষোচিত, তিনি তীব্রভাবে এর নিন্দা করে বলেছিলেন,

We call our state a secular state- A secular state goes neither by scripture nor by custom. It must work on sociological and political grounds. If we are a democratic state, I submit we must make laws not for one community alone. Today the Hindu community is for monogamy…. Will our government introduce a bill for monogamy for the Muslim community? Will my dear law minister apply the part about monogamy to every community in India?… I tell you this is the democratic way. It is not the Mahasabhaites alone who are communal; it is the government also that is communal, whatever it may say. It is passing a communal measure. You shall be known by your acts, not by your profession. You have deluded the world so often with words. I charge you with communalism because you are bringing forward a law about monogamy only for the Hindu community. You must bring it also for the Muslim community … the Muslim community is prepared to have it but you are not brave enough to do it.

মুসলমান ভোটব্যাঙ্ক ও সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার কারণে ভীত কংগ্রেস সরকার সত্তর বছরে যা করতে পারেনি, বিজেপি যদি এখন ‘সংকল্প পত্র ২০১৯’ অনুযায়ী সাহস দেখিয়ে অভিন্ন নাগরিক বিল কার্যকর করে দেয় তবে তার বিরোধে প্রায় কোনও যুক্তিই দাঁড় করানো সম্ভব হবে না। অতীতে পোঁতা সাম্প্রদায়িকতার যে বীজটি আজ মহীরুহ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেটাকে যে নাশ করতে চাইবে তাকে কীভাবে আটকানো যায়, আরও একটা সাম্প্রদায়িকতার যুক্তি তো সেখানে খাটে না।

তবে এসব বিতর্ক যাই হোক, একথা তো সত্য যে ভারত ভিন্ন ভিন্ন ধর্মসম্প্রদায় ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি দেশ যেখানে প্রত্যেকেরই নিজস্ব নিজস্ব নিয়মনীতি আছে। সেগুলির ঐতিহাসিক ভিত্তি ও যাপনের সত্তাও নেহাত মামুলি নয়। কিন্তু সেখানে একথাকেও মান্যতা দিতে হবে যে প্রাচীন যা কিছু তা সবই ভালো এবং অপরিবর্তনীয় নয় এমনটা ভাবা ঠিক নয়। ১৯১১ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের ভাষণটির কথা এখানে স্মরণ করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন,

“একথা মনে করার কোনও কারণ নেই প্রাচীন ভারতবর্ষে সবাই ছিলেন সম্পূর্ণ নির্ভুল ও আদর্শ মানুষ, তাঁরাই শিল্প ও বিজ্ঞানের আবিষ্কার করেছিলেন সর্বপ্রথম আর পুরানো যুগ ছিল সোনায় গড়া, ক্ষুন্নিবৃত্তির জন্য ছিল সুমিষ্ট ফল আর কূপে ছিল অমৃত।”

তাই রাজতন্ত্র কিংবা সামন্তযুগের যে সমাজ যেখানে নারী-পুরুষ, উঁচুজাতি-নীচুজাতি প্রভৃতি নানান বৈরিতার নিয়ম ছিল, সেসব কিছুকে আধুনিক গণতান্ত্রিক যুগেও টিঁকিয়ে রাখা যায় না। সেগুলিকে বহাল রাখার অর্থ হয়ে দাঁড়ায় রাষ্ট্রের সংহতি, সাম্য ও ঐক্যের নীতিতে আপস করা। দেশেরই বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মানুষের ক্ষেত্রে বিশেষ বিশেষ অবস্থানে রাষ্ট্র কিছুতেই ভিন্নতার নীতি অবলম্বন করতে পারে না। তাকে কোথাও গিয়ে উন্নয়ন ও প্রগতির পথ ধরে সমধারার ব্যবহার নিশ্চিত করতে হয়। তাতে কিছু প্রাচীন প্রথা অবলুপ্ত হয়, বদলে নতুন কিছুর আগমন হয়। সেটা সকলকেই মেনে নিতে হবে। আর সেই কারণেই সংবিধানের হোতারা সেদিন অভিন্ন নাগরিক বিধির উল্লেখ করেছিলেন।

কিন্তু দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতাদখলের কৌশল ও লোভের কারণে আজও তা কার্যকর করা যায়নি। ফলে আজও ভারত পূর্ণ রাষ্ট্রের দর্শনে বিশ্বাসী না হয়ে কয়েকটি প্রদেশ ও কয়েকটি সম্প্রদায়ের আখ্যান হয়ে থেকে গিয়েছে। অথচ এই দেশেই কিন্তু অপরাধের ক্ষেত্রে অভিন্ন আইন কার্যকর করা গিয়েছে, সেখানে বাধা থাকেনি। আবার  ভারতের পশ্চিমপ্রান্তের একটি রাজ্য গোয়াতেই প্রচলিত আছে অভিন্ন নাগরিক বিধি। সেটা অবশ্য কিছুক্ষেত্রে যেমন সাম্যের নিদর্শন রেখেছে, তেমনই কিছুক্ষেত্রে আবার অসাম্যের প্রতিভূও হয়ে থেকে গিয়েছে (গোয়ার কথা ধরলে সেখানে যেমন লিঙ্গ-ধর্ম-বর্ণ নিরপেক্ষভাবে সকলকেই বিবাহ, বিবাহবিচ্ছেদ, দত্তক ও উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে একই নিয়ম পালন করতে হয়, আবার সেখানেই একজন হিন্দু দ্বিতীয়বার আইনগতভাবে বিবাহ করতে পারে যদি তার স্ত্রী ২৫ বছর বয়সের মধ্যে সন্তান দিতে না পারে অথবা ৩০ বছর বয়সের মধ্যে পুত্রসন্তানের জন্ম দিতে না পারে। কিন্তু দেশের অন্যান্য অংশে হিন্দুদের এই অধিকার নেই, অথচ গোয়া ব্যতীত অন্যান্য অংশে মুসলমান পুরুষরা (নারীরা নয়) বহুবিবাহ করার স্বধীনতা অর্জন করে)। ফলে একই দেশে একই বিষয়ে এরকম ভিন্ন নীতি থাকা মোটেই নৈতিকভাবে বাঞ্ছনীয় নয়।

দেশের সমস্ত রাজনৈতিক দল ও মানুষকে এব্যাপারে একমত হতেই হবে যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভিন্নজনে ভিন্ন নিয়মে চলতে পারে না। দুনিয়ার বহু দেশেই অভিন্ন নাগরিক বিধি কার্যকর আছে, এমনকি বহু ইসলামিক রাষ্ট্রেও নানান প্রকারের আধুনিক বিধি কার্যকর করা হয়েছে। এদেশকেও তাই প্রগ্রতিশীল ভূমিকা গ্রহণ করতেই হবে। একথা ভুলে গেলে চলবে না যে, এককালে এই দেশেই রামমোহন-বিদ্যাসাগরের প্রচেষ্টাতে জনমতের বিরোধে গিয়েই সতীদাহ ও বাল্যবিবাহ বন্ধ হয়েছিল, বিধবাবিবাহ চালু হয়েছিল। সেদিন যদি তাঁরা বিরোধিতা ও হুজ্জুতের ভয়ে পিছিয়ে যেতেন তাহলে আজ দেশের হিন্দু নারীদের অবস্থা যে কতটা ভয়াবহ হত তা কল্পনা করা কঠিন নয়। একুশ শতকে পৌঁছে সকলের মঙ্গলের জন্য রাষ্ট্রকে এটুকু সাহস ও দৃঢ়তা দেখাতেই হবে। কিন্তু একথাও বিস্মৃত হলে হবে না যে, অভিন্ন নাগরিক বিধি যেন দেশের কোনও কোনও বিশেষ ধর্মসম্প্রদায়কে উৎপাত করা ও দমন করার বিধিতে পরিণত না হয়। শান্তির সঙ্গে জনমত অর্জন করেই যেন তা প্রয়োগ করা হয়। রাষ্ট্র যেন সেখানে নিজেকে ব্যক্তিসত্তা থেকে আলাদা করে বস্তুনিষ্ঠ নিরপেক্ষতা অর্জন করে এটাই প্রত্যাশা। নীরদচন্দ্র চৌধুরী হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে থাকা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ বিদ্বেষের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। আজও সমাজে হিন্দু ও মুসলমানকে প্রতিপক্ষ হিসাবেই টিঁকিয়ে রেখে অনেক স্বার্থসিদ্ধির প্রচেষ্টা চলে, এই বিষয়ে সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি রক্ষার দায় দেশের নাগরিকদেরই। হিন্দুরা যেহেতু দেশের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তাই গুরুভাগকেই বেশি দায়িত্ব পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে এই দেশেই হিন্দুদের থেকে প্রায় সম্পূর্ণ পৃথক বহু ধর্ম সম্প্রদায়ভুক্ত (উদাহরণ হিসাবে যদি ধরে নেওয়া যায় শিখ সম্প্রদায়ের কথা, তাহলে তারা তো এককালে ঘোষণাই করেছিল ‘আমরা হিন্দু নই’। এমনকি ভাষার ভিত্তিতে পৃথক রাজ্য শুধু নয়, স্বশাসিত ‘খলিস্তান’-এর দাবিও তাদের মধ্যে ছিল) মানুষরা দেশের গৌরব ও অহঙ্কার হিসাবে বসবাস করেন। তাদের প্রতি হিন্দুরা যেমন ভ্রাতৃত্বভাবের প্রদর্শন করে তেমনই অভিন্ন নাগরিক আইন বলবৎ হলে সব ধর্মের ক্ষেত্রেই সেই মনোভাবই পরস্পর সকলকে পালন করতে হবে। নইলে এই আইন দেশে আরেক অরাজকতার জন্ম দেবে যা ভবিষ্যতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রেও অন্তরায় হিসাবে দেখা দেবে। মনে রাখতে হবে সেই প্রাচীন গল্প, অনেকগুলি কাঠি যদি একত্রে থাকে তবে তাকে ভেঙে ফেলা সহজ হয় না, আলাদা থাকলে যে কেউ ভেঙে ফেলতে পারে। দেশের নাগরিকদেরও তাই সংঘবদ্ধ থেকে সকলের মঙ্গলের জন্য ঐকমত্য হতেই হবে। না হলে শতাব্দি এগিয়ে যাবে আর দেশ পিছিয়ে যাবে।

 

সূত্রনির্দেশ:

  1. Flavia Agnes – The Supreme Court, the Media, and the Uniform Civil Code Debate in India
  2. Aashish Kumar Shukla – Political resistance to social reforms: The case of uniform civil code in India
  3. Harish K. Puri – The Scheduled Castes in the Sikh Community – A Historical Perspective
  4. Others
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3695 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...