এ সফর সুফিয়ানা

অরুণপ্রকাশ রায়

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

অষ্টম পর্ব

লখনউয়ের এক বিয়েবাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে দেখেছিলাম, কেটারারের সাঙ্গপাঙ্গরা ফুটপাথ খুঁড়ে ফেলে এক সুগভীর তন্দুর বানাচ্ছে শিরমাল ও কাবাবের জন্য। তা দেখে যারপরনাই আনন্দিত যেমন হয়েছিলাম তেমনই মনটা একটু খচখচও করে উঠেছিল। কাবাবের জন্য তন্দুর বানাতে হবে এতে আর অন্যায় কী, কিন্তু তাই বলে পথচারীদের এতখানি অসুবিধের মধ্যে ফেলা কি যুক্তিসঙ্গত? পরে ভেবে দেখেছিলাম, গাইতে বসে ওস্তাদ সুফি কাওয়ালেরাও তো ঠিক এই কাজটাই করে থাকেন! গাইতে গাইতে সঙ্গীত ও ভক্তিরসের সাগরে ডুবে গিয়ে তাঁদের প্রায়ই হুঁশ থাকে না যে, শ্রোতৃমণ্ডলীর কত শতাংশ সত্যিই সমঝদার আর কতজন নিছক সোশ্যালাইট। ঘটনাটার উল্লেখ করলাম, কারণ সেদিনই সন্ধেবেলা লখনউয়ের গোমতীনগরের তাজ হোটেলে একটি সুফি কথকের অনুষ্ঠানে গিয়ে প্রায় একইধরনের একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সে আসরের শিল্পী অত্যন্ত পরিচিত, বলা যায় এই ডান্স ফর্মটির তিনিই প্রবর্তন করেছেন বছর পনেরো আগে। চৌক থেকে এসে সপরিবার হায়দর বখ্‌শ কাওয়াল হারমোনিয়ামে সুর ধরেছেন, সন্ধে সাড়ে সাতটা নাগাদ ধরলেন আমির খুসরোর ‘মন কুন্ত মৌলা’। দ্রুতলয়ে পৌঁছে ‘তানা না না রে তানানানা তানা না না রে’-র প্রতীক্ষায় বসে আছি, নৃত্যরতা শিল্পী টার্কির কোনিয়া শহরে দেখা সেমাজেন-দের অনুকরণে হোয়ারলিং দরবেশ হয়ে বনবন করে স্টেজ-এ ঘুরপাক খাচ্ছেন, আলো আর শিল্পীর ঘূর্ণায়মান শারারা চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছে আপামর দর্শকের, এ সময় হঠাৎ নাচ থেমে গেল। শুরু হল আরেকটি ঢিমে তালের গান ও সঙ্গে বিলম্বিত লয়ের নৃত্য। ডিনারের সময় হায়দর বখ্‌শ সাহেবকে কানে কানে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘লয়-টা বাড়ালেন না কেন?’ তা তিনি একটা নীহারির নলির হাড্ডি সশব্দে চুষতে চুষতে জবাব দিলেন, ‘ম্যায় অগর লয় বাড়্‌হা দেতা, লড়কি দম না তোড় দেতি?’ আমি হাসতে গিয়ে গম্ভীর হয়ে গিয়েছিলাম এক পৃষ্ঠপোষককে আমার দিকেই হাসিমুখে এগিয়ে আসতে দেখে। হায়দর বখ্‌শ সাহেব পণ্ডিত মানুষ, তাই ওঁর ইশারা বুঝতে আমার সেদিন কোনও অসুবিধা হয়নি। গত বছর ওঁর একটা ছোট্ট youtube ক্লিপ দেখেছিলাম, কাওয়ালির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সপাট ন্যারেটিভ।

একটা একটু অপ্রাসঙ্গিক ঘটনা মনে পড়ল। বিগত পাঁচ-ছয় বছর ধরে পাকিস্তানি শিল্পীদের ভারতে আসা বন্ধ বললেই চলে। বাহাউদ্দিন কাওয়াল, মুন্সি রাজিউদ্দিন, মনজুর নিয়াজি, ইফতিকার নিজামী, সমস্ত দিকপাল কাওয়ালের উত্তরসূরিরা ভারতে, বিশেষ করে নিজামুদ্দিন দরগায় হাজরি না দিতে পেরে ভারী আশাহত, দুঃখিত। ফরিদসাব তো সেদিন আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললেন, ‘অরুণ, ইয়ার, তুম মুঝে হাফতাভর কে লিয়ে বেঙ্গালুরু বুলা হি লো, ম্যায় অর তুমহারি চাচী তুমহারে সাথ চলে চলেঙ্গে তিরুপতি মন্দির, জিয়ারত কে লিয়ে।’ আমি আর হাসি চাপতে পারিনি, ‘তিরুপতি মন্দির মে জিয়ারত’ শুনে। ভাবা যায়, উদাত্তকণ্ঠে ফরিদ আয়াজ তিরুপতি মন্দিরের প্রাঙ্গনে বসে ‘সখী কা সে কহুঁ মোহে লাজ লাগে’ গাইছেন? ২০০৬ সালে দিল্লি হাট-এ ফরিদসাব একটি সংস্কৃত ‘বিষ্ণুবন্দনা’ গেয়েছিলেন প্রায় নিখুঁত উচ্চারণে, সেটার এক টুকরো নিচে রাখলাম। তিরুপতির লম্বা লাইনে পাঁচ মিনিটে আমি শ’ আটেক লোককে পার হয়ে আমার শশ্রুমাতাকে পঞ্চাশ মিনিটে ভিভিআইপি দর্শন করিয়ে দিয়েছিলাম ২০১৭ সালে, তারস্বরে ‘মুকুন্দ মাধব গোবিন্দ বোল’ গেয়ে। জনতা হইহই করে সাইড দিয়ে দিয়েছিল পথ খালি করে, হয়তো এই ভেবে যে, এই দরের ভক্ত আজকাল আর সচরাচর দেখা যায় না। ছন্নুলাল মিশ্রজিও এ ব্যাপারে একমত। ‘যেখানে ঠিক সুরে ও লয়ে আরাধ্যকে উপাসনা করা হয়, সেখানেই ঈশ্বরের বাস।’ পণ্ডিতজি বলেছিলেন বটে বহুকাল আগে।

নিজামুদ্দিন দরগায় শেষ যাওয়া ডিসেম্বর ২০১৯-এর এক সন্ধেয়। সর্পিল গলির শেষে চটি রাখার জায়গায় কুশলবিনিময় করে ঢুকতেই যাব, দেখি হজরত আমির খুসরোর দরগার সামনে একটি পরিচিত মুখ, একগাল হাসি নিয়ে পাঙ্খাবরদার নিজাম। আমি আঁতকে উঠে বললাম, ‘এ কি? তুমি না মরে গেছ?’ সে হতভাগা আমার আস্তিন ছুঁয়ে দাঁত বের করে বলল, ‘না গো, খবরে ভুল দিয়েছে, আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছিলাম বটে, তবে ঠিক মরিনি।’ আমি আনন্দের চোটে তাকে বুকে টেনে নিই, কারণ এই মানুষটির মতো সমঝদার কাওয়ালির শ্রোতা আজকের দিনে বিরল। আরেকটু এগোতেই দেখা হল কাওয়াল হাসান নিজামীর সঙ্গে। হাসানের বুকপকেটে কিছু টাকা আগাম গুঁজে দিয়ে বললাম, ‘বোসো তো বাপু, দলবল নিয়ে গাইতে’ আর তৎক্ষণাৎ হাসা, ইমরান ও বাকি ভাইয়েরা মিলে হারমোনিয়াম ও তবলা, ঢোলক ইত্যাদি মিলিয়ে নিয়ে গাইতে বসে গেল। গত কয়েক সপ্তাহ যাবৎ আবার দরগায় কাওয়ালি শুরু হয়েছে, ধীরে ধীরে পরিযায়ী পাখিদের মতো ফিরে আসছে কাওয়ালের দল। বড় নিশ্চিন্দির খবর, আমার জন্য। এতদিন দুশ্চিন্তায় থাকতাম কীভাবে ওদের দিন চলছে এই ভেবে, এবার আশা করি ওরা একটু সামলে নেবে।

কাল সকালে উঠে বিলায়েত খাঁসাহেবের ‘ছাপ তিলক সব ছিনি’ শুনে থেকে থেকে খালি কাজে মন বসছে না, মনে হচ্ছে পত্রপাঠ দিল্লি চলে যাই কাজকম্মো ছেড়ে, আর নিজামুদ্দিন দরগার চাতালে বসে অনামী কাওয়ালের দলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে গেয়ে উঠি, ‘তেরী রে ম্যায় তো চরণণ লাগি, পীর নিজামুদ্দিন, খাজা নিজামুদ্দিন’। খানদানি কাওয়ালরা এই কাওয়ালিটির সঙ্গে খুসরোর দুটি বয়েৎ জুড়ে দিয়ে থাকেন ‘হর কৌম রাস্ত রাহে দিন-এ-ওয়া কিবলা গাহে। মান কিবলা রাস্ত কারদাম বার সামত কাজকুল্লাহে।’ কথিত আছে যে, একবার যমুনার তীরে খুসরো ও তাঁর পীর ও মুর্শিদ খাজা নিজামুদ্দিন আউলিয়া বসে দেখছিলেন একটি মন্দিরে ভক্তরা একটি সোজা লাইন ধরে পুজো দিতে যাচ্ছেন। তাই দেখে নিজামুদ্দিন নাকি বলেছিলেন, ‘দেখেছ খুসরো, প্রত্যেকটি ধর্ম বা দীন বা ইমানের একটা সোজা রাস্তা চোখের সামনে দিয়ে চলে গেছে, সেরাস্তায় টিঁকে থাকলে সাধনায় সিদ্ধি অনিবার্য (হর কৌম রাস্ত রাহে দিন-এ-ওয়া কিবলা গাহে)।’ খুসরো রিপোর্টেডলি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ মুচকি হাসিটি হেসে বলেছিলেন, ‘আমি কিন্তু আমার পীরের ঈষৎ বাঁকা টুপির দিকে সোজা চলে যাওয়া রাস্তায় একমাত্র বিশ্বাস রাখি (মান কিবলা রাস্ত কারদাম বার সামত কাজকুল্লাহে)।’ ফার্সিতে বাঁকা টুপিকে ‘ক্কাজ’ বলে। খানসাহেবের ‘ছাপ তিলক’ আর বাহাউদ্দিন কাওয়ালের গাওয়া ‘তেরী রে ম্যায় তো’ শুনলে কাজে মন না বসা গ্যারান্টিড। ছুটির দিন দেখে শোনাটা অনেক বেশি যৌক্তিক, আমার মতে।

বছর সাত আগে আব্দুল্লাহ নিয়াজিসাব নিজামুদ্দিন দরগায় হাজরি দিতে এসেছিলেন, ছেলে ওয়াকাসকে সঙ্গে নিয়ে, অপূর্ব গেয়েছিলেন খুসরোর এক-একটি কলাম। পোস্ট-প্যান্ডেমিক পাকিস্তানে সেদিন একটি ফেসবুক লাইভ দেখতে গিয়ে মাঝপথে বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলাম, আব্দুল্লাহসাবের ঘামে ভেজা সিল্কের পাঞ্জাবিতে আটকে গেছে একটা জিন্নার ছবিওয়ালা মস্ত বড় কারেন্সি নোট, আর উনি মাথা নিচু করে নৃত্যরত জনতার উদ্দেশ্যে গেয়ে চলেছেন পরের পর জনপ্রিয় কাওয়ালি বা ফিল্মি কলাম, ‘সাঁসও কি মালা মে বা দুলহে কা সেহরা’ যা এককালে নুসরাত ফাতেহা আলী খানের স্বাক্ষর ছিল। একটা ক্লিপ নিচে শেয়ার করলাম আব্দুল্লাহসাবের, অসম্ভব সুরে ঋদ্ধ গলা। গুরুগ্রামে ডিএলএফ-এর কেপি সিংহ আব্দুল্লাহসাবকে বারকয়েক নিজের জন্মদিনে গাইবার জন্যে আমন্ত্রণ করে নিয়ে এসেছিলেন, পরবর্তীকালে তাঁর সঙ্গীতের রুচি শাকিরা এবং বোনো-তে পরিবর্তিত হয়ে যায়, আব্দুল্লাহসাব একদিন দুঃখ করে আমাকে বলেছিলেন।

আজকের ভারতবর্ষে দুটি সুফি মিউজিক ফেস্টিভ্যাল গত দু দশক ধরে খুব বিখ্যাত। দিল্লির জাহান-এ-খুসরো আর সর্বভারতীয় ‘রূহানিয়াত’। প্রথমটির উদ্যোক্তা প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক মুজাফ্ফর আলী। একবার নিজামুদ্দিন দরগার পীরজাদা আলতামাশ নিজামীকে তিনি অনুরোধ করেছিলেন অনুষ্ঠান শুরুর আগে কিছু বক্তব্য রাখতে। স্পষ্টবক্তা আলতামাশভাই মুজাফ্ফর আলীসাহেবকে সটান বারণ করে দিয়েছিলেন এই বলে যে, ‘হাজরাত আমির খুসরো কা জাহান কৌন থে য়ে আপকো পাতা ভি হ্যায় মুজাফ্ফারসাব?’ মুজাফ্ফর আলী কোনওমতে পালিয়ে বেঁচেছিলেন। রূহানিয়াত গত বছর অনলাইন হয়েছে বোধহয়। এককালে বেশ ভালো আর্টিস্ট লাইন-আপ ছিল এই ফেস্টিভালটির, ফরিদসাবও গেয়ে গেছেন এখানে।

এই পর্ব শেষ করব এক অখ্যাতনামা কবির কবিতা দিয়ে। খুব সম্ভবত ‘বাগ-এ-বেদিল’ এ প্রকাশিত হয়েছিল এই কবিতাটি ২০১৩-তে। আগেও বোধহয় উল্লেখ করেছি, তাও আরেকবার।

কভি নিজামুদ্দিন আউলিয়া কে দরগাহ মে যাও তো দেখিয়ো!
এক গুঙ্গা গায়ক হারমোনিয়াম বাজাতা তন্ময়তা সে গাতা হোগা
বহ আপনে সুর অর খুসরো কে কলাম সে ভিজতা রেহতা হ্যায়
কভি উসকি আওয়াজ উসকি পলকন পর ছল্ছলা আতি হ্যায়
আইসা মন্ত্রমুগধ মার্মিক মৌন গায়ন
সুন্কর লাগতা হ্যায়
কি ‘আওয়াজ ভি এক জাগাহ হ্যায় ‘
অর য়ে ভি মনুষ্যতা কা এক ঠিকানা হ্যায়।

যদি কখনও দিল্লিতে যাওয়া হয়, সন্ধের দিকে কোনও এক বৃহস্পতিবার সময় করে মেট্রো, উবের বা অটো ধরে না হয় একবার আমার কথাটুকু যাচাই করার জন্যই না হয় একবার ঢুঁ মারবেন উল্লিখিত আস্তানায়, হয়তো বা দেখা হয়ে যাবে কবিতার মৌন গায়ক, বা সদাহাস্যময় পাঙ্খাওয়ালা নিজাম, বা সাইয়াদ আলতামাশ নিজামীকে দেখতে পাবেন সযত্নে দরগার প্রদীপগুলিকে এক এক করে তেল ঢেলে জ্বালিয়ে দিতে, আলতামাশভাইয়ের মুখময় অযত্নবর্ধিত দাড়ি, ভারী পবিত্র একটি হাসি। চারপাশ ভরে রয়েছে সদ্যোপ্রজ্জ্বলিত প্রদীপের আলোর ছটায়।

 

[ক্রমশ]

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. এ সফর সুফিয়ানা – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...