“ইট ওয়জ দ্য বেস্ট অফ টাইম্‌স, ইট ওয়জ দ্য ওয়র্স্ট অফ টাইম্‌স”— ওভাল অফিসে রাষ্ট্রপতি বাইডেনের প্রথম বছর

শুভাশিস ঘোষাল

 



লেখক নর্থ ক্যারোলাইনা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে রাশিবিজ্ঞানের অধ্যাপক

 

 

 

গত বছরের ২০ জানুয়ারি আমেরিকার রাষ্ট্রপতিপদে জো বাইডেন কাজ শুরু করেন। সময়টা খুব সহজ ছিল না। নভেম্বর ২০২০-তে নির্বাচনে পরাস্ত হবার পর পূর্ববর্তী রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প দু মাস ধরে একনাগাড়ে নির্বাচনের ফল নিয়ে মিথ্যা প্রচার করে গিয়েছেন ও আদালতে ফল উল্টে দেওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন। তাই শুধু নয়, আমেরিকার গণতন্ত্রকেই এক বিরাট সঙ্কটের মুখে ফেলে দিয়েছিলেন গত বছরের ৬ জানুয়ারি— একদল সমর্থককে ক্ষেপিয়ে আইনসভার উপর হামলা করতে প্ররোচিত করে— যাতে সেখানে বাইডেনের জয়কে আনুষ্ঠানিক শংসাপত্র দেওয়া না-হয়। এ হেন ট্রাম্প সাধারণ সৌজন্যবিধি মেনে পরবর্তী প্রশাসনের জন্য কোনও সহযোগিতা তো করেনইনি, বরং পদে পদে বাধার সৃষ্টি করে গিয়েছেন। তার উপর দেশে তখন কোভিড সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল, প্রায় চার হাজারের মতো মানুষ প্রতিদিন মারা যাচ্ছিলেন। ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতিদিনের এলোমেলো, দিশাহীন কাজকর্মে দেশের মানুষ শঙ্কিত। অর্থনীতিতেও অজস্র সমস্যা, বিশেষ করে কাজ হারানো মানুষদের তখন আশু সাহায্য প্রয়োজন। সেখানে ট্রাম্পের বিপরীত চরিত্রের মানুষ বাইডেনের প্রথম কাজ ছিল প্রশাসনে নিয়মশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, দেশের মানুষের আবার প্রশাসনের উপর ভরসা ফেরানো, কোভিড সমস্যাকে নিয়ন্ত্রণে আনা, কাজ হারানো মানুষদের সাহায্য পৌঁছে দেওয়া।

বাইডেন কাজ শুরু করেন দেশের অর্ধেকের বেশি মানুষের সমর্থন পেয়ে, যা রাষ্ট্রপতিরা শুরুতে পেয়ে থাকেন। হোয়াইট হাউসের কাজকর্মে বিতর্ক আর সেই দিশেহারা ভাবটা বন্ধ হয়। দেশে টিকাকরণে ব্যাপক সাফল্য আসে, দশ কোটি লোককে তিনমাসের মধ্যে যে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল, অনেক আগেই সে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়। কোভিড সংক্রমণের দৈনিক সংখ্যা হু হু করে নেমে আসে, সেই সঙ্গে মৃত্যুর সংখ্যাও। অর্থনীতিকে চাগাতে মার্চ মাসে প্রায় দু লক্ষ কোটি ডলার মূল্যের কোভিড রিলিফ প্যাকেজ রাষ্ট্রপতি বাইডেন অনুমোদন করেন। কোভিডের ফলে ধুঁকতে থাকে আমেরিকান পরিবারগুলিকে সরাসরি অর্থসাহায্য করা হয়। কাজ হারানো মানুষদের প্রতি সপ্তাহে তিনশো ডলার করে বেকার ভাতা দেওয়ার মেয়াদ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হয়। এর ফলে অনেক পরিবারকে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া থেকে বাঁচানো যায়। বিশেষ করে ‘সিঙ্গল পেরেন্ট’রা, যারা কোভিডের জন্য বাচ্চা বাড়িতে থাকার ফলে কাজে যেতে পারছিলেন না, তারা বিশেষ উপকৃত হন। টিকা দেওয়ার জন্য বাড়তি অর্থও বরাদ্দ করা হয়। বাইডেন আশ্বাস দেন গ্রীষ্মকাল থেকেই আবার মানুষের জীবন পুরো ছন্দে ফিরে আসবে।

তবে টিকাকরণের সাফল্য একসময় থমকে যায়, কারণ দেশের তিরিশ শতাংশেরও বেশি মানুষ টিকা নেওয়ার ঘোর বিরোধী। আর্থিক পুরস্কার দিয়েও তাদের রাজি করানো যায় না। সেই সঙ্গে দক্ষিণপন্থী সংবাদমাধ্যম ও ছদ্মসংবাদগুলোর লাগাতার টিকাবিরোধী বিভ্রান্তিমূলক প্রচার চলতে থাকে। এমন সময় আঘাত হানে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভেরিয়ান্ট। দৈনিক আক্রান্ত আর মৃতের সংখ্যা আবার বেড়ে যায়। গ্রীষ্মে যে জনজীবন পুরো স্বাভাবিক হতে পারবে না, তা পরিষ্কার হয়ে যায়।

এরপর আগস্ট মাসে আফগান সমস্যা দেখা দেয়। প্রতিশ্রুতিমতো আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়া শুরু করলে আফগান সরকারের পতন ঘটে। তালিবানরা দেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, এক হৃদয়বিদারক মানবিক সঙ্কট দেখা দেয়। বাইডেন সরকারের দেওয়া আশ্বাস ছিল যে আফগানিস্তানের সরকারি বাহিনি যথেষ্ট প্রস্তুত, তা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ হয়। তবে আফগান সমস্যার জন্য বাইডেনকে দায়ী করা সমস্যার অতিসরলীকরণ। বাইডেন বরঞ্চ পূর্ববর্তী ওবামা ও ট্রাম্প সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি শেষপর্যন্ত পালন করার সাহস দেখিয়েছেন, ব্যাপারটার এখানেই নিষ্পত্তি করতে চেয়েছেন। এইসময় থেকে বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায় যে আমেরিকার জনসাধারণের মধ্যে বাইডেনের অনুমোদন পড়তে থাকে। সেটা বাইডেনের পক্ষে সেই মুহূর্তে তেমন কোনও চিন্তার বিষয় ছিল না, কারণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন তো বটেই, মধ্যবর্তী নির্বাচনেরও অনেক দেরি। আমেরিকার সাধারণ মানুষ, যারা আফগানিস্তান দেশটা সম্পর্কে বিন্দুবিসর্গও জানে না, তারা সেই দেশের বিশৃঙ্খল অবস্থাকে বহুদিন বাদে হওয়া নির্বাচনে বিষয় করবে, এমনটা আমেরিকার রাজনীতিতে হয় না। তা ছাড়া আফগানিস্তান থেকে সৈন্য সরানোতে সাধারণ মানুষের সমর্থনই ছিল। কাজেই এই অনুমোদন কমে যাওয়াকে সংবাদমাধমের প্রভাবে হওয়া একটা সাময়িক ব্যাপার বলে ধরে নেওয়া যেত।

কিন্তু বাইডেনের অনুমোদনে কোনও ঊর্ধ্বগতি ফিরে আসে না, বরং তা আরও পড়তে থাকে। সেটা সাধারণত হয় অর্থনীতির অবস্থা খারাপ হলে। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে সেটা অবশ্য একটা ব্যতিক্রম ছিল, অর্থনীতি ভালো চললেও বিভাজনকারী বিতর্কিত ট্রাম্পের অনুমোদন কখনওই প্রায় চল্লিশ শতাংশের উপরে ওঠেনি। বাইডেন ট্রাম্পের মতো বিতর্কিত চরিত্র নন, বরঞ্চ দীর্ঘ পঞ্চাশ বছরের রাজনীতিতে তিনি মধ্যপন্থী ও ‘বাইপার্টিজান’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর সময়ে অর্থনীতির হালকে খারাপ তো বলা যায়ই না, বরঞ্চ বেশিরভাগ পরিমাপ অনুযায়ী তা মাত্রাতিরিক্ত রকমের ভালো। গত পঞ্চাশ বছরে কোনও রাষ্ট্রপতির প্রথম বছরে দেশের অর্থনীতি এতটা শক্তিশালী অবস্থায় থাকেনি। অর্থনীতির বৃদ্ধি এই সময় ৫ শতাংশ, যা আগামী বছরে ৫.৬ শতাংশ হওয়ার আশা। একটা উন্নত অর্থনীতির জন্য সেটা খুবই ভালো, আধুনিক আমেরিকায় গড় বৃদ্ধির আড়াই গুণেরও বেশি। এই এক বছরে বেকারত্বের হার ৬.২ শতাংশ থেকে মাত্র ৩.৯ শতাংশে নেমে এসেছে। ঘন্টাপ্রতি মজুরিতে কাজ করা মানুষেরা এর সুফল পাচ্ছেন আয়বৃদ্ধিতে। শেয়ার বাজারে পাঁচশো প্রধান কোম্পানির শেয়ারদরের গড়ের সূচক S&P500 এই সময় প্রায় রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি হয়। আমেরিকান কোম্পানিদের রেকর্ড কম ঋণের অনুপাত ও রেকর্ড মুনাফা বৃদ্ধি এর কারণ। এছাড়াও উৎপাদন শিল্পে চাকরি, কোম্পানিতে কর্মচারি নিয়োগ এবং ডলারের মূল্যে উল্লেখযোগ্য উন্নতি চোখে পড়ে। অবশ্য এটা ঠিক যে এই বৃদ্ধির কারণ মূলত কৃত্রিমভাবে অর্থনীতিতে অর্থের জোগান দিয়ে চাহিদা বাড়ানো ও বাজারে খুব কম সুদের হার থাকা। এর ফলে যে জাতীয় ঋণ অনেক বেড়ে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য।

গত সত্তর বছরে বিভিন্ন রাষ্ট্রপতির সময়ে আর্থিক বৃদ্ধির তুলনামূলক রেখচিত্র

বিশেষজ্ঞদের হিসেবে অর্থনীতিতে জোয়ার চলছে, অথচ সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে যে ষাট শতাংশ মানুষ মনে করছেন দেশের অর্থনীতির অবস্থা খুবই খারাপ, দেশ ভুল পথে চলছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে যে এর কারণ কী?

কোনও রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার পর কিছুদিন একটা ‘হানিমুন পিরিয়ড’ চলে। তারপর লোকে রূঢ় বাস্তবে ফেরে, রাষ্ট্রপতিরও জনপ্রিয়তা কমে আসে, কারণ যেই ক্ষমতায় থাকে, আমেরিকার মানুষ তাকেই অপছন্দ করে। তবে এত হঠাৎ করে এই পতন যে এটাকেই শুধু কারণ হিসেবে ভাবলে ভুল হবে। আফগানিস্তান সঙ্কট থেকে বাইডেনের জনপ্রিয়তায় ভাঁটা শুরু হলেও আফগানিস্তান কখনওই আমেরিকান ভোটারদের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে না। কোভিড সমস্যা অবশ্যই একটা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বাইডেনের উপর লোকে ট্রাম্পের থেকে অনেক বেশি আস্থা রেখেছিল কোভিড নিয়ন্ত্রণ করার ব্যাপারে। বাইডেন যথেষ্ট চেষ্টা করেননি এমন কথা বলা যাবে না, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। কিছুক্ষেত্রে টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা বা মুখোশ পরার বিধি চাপানো অনেকেরই অপছন্দ। তবে আসল কারণগুলোর প্রধান একটা হল যে মুদ্রাস্ফীতি এখন ৪.১ শতাংশে পৌঁছেছে। গত প্রায় চল্লিশ বছর ধরে এমন উঁচুহারে মুদ্রাস্ফীতি আমেরিকার মানুষ দেখেনি। পেট্রল পাম্প, মুদিখানা বা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে গেলেই লোকে বুঝতে পারে আগের থেকে দাম অনেক বেড়ে গেছে, বাড়তি মজুরির টাকা তাতেই চলে যাচ্ছে। অর্থনীতিতে কৃত্রিমভাবে অর্থ জোগানো যে এর মূল কারণ তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্ক ফেডেরাল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের এখনই সুদের হার বাড়ানো উচিত, একথা অনেকেই বলছেন, তবে মন্দার আশঙ্কায় পাওয়েল তা করছেন না। এ ছাড়া ‘সাপ্লাই-চেন’ সমস্যার জন্য অনেককিছু পাওয়া যাচ্ছে না। আমেরিকার মানুষ প্রাচুর্যে অভ্যস্ত, পয়সা দিলেই জিনিস পাওয়া যায় জানে। ‘সাপ্লাই-চেন’ সমস্যাটা বিশ্বজনীন হলেও দায়ভাগটা দেশের প্রশাসনের ঘাড়েই এসে পড়ে।

তবে বাইডেনের জন্য একটা সমস্যা তাঁর ভাবমূর্তি। যে মধ্যপন্থী ভাবমূর্তি তাঁকে জিততে সাহায্য করেছিল, এখন তা-ই তাঁর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রগতিশীলরা মনে করেন বাইডেন বড্ড মধ্যপন্থী, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলি পালনে যথেষ্ট উদ্যোগ নিচ্ছেন না। মধ্যপন্থীরা মনে করেন তিনি অতিরিক্ত উদারপন্থী, সংস্কারের ব্যাপারে বেশি তাড়াহুড়ো করছেন, সরকারের খরচ অতিরিক্ত বাড়াচ্ছেন, জনজীবনে নাক গলাচ্ছেন। ট্রাম্পবিরোধী যে সব রিপাবলিকানরা তাঁকে নির্বাচনে সমর্থন করেছিল, ট্রাম্পকে সরানোর পর তাদেরও বাইডেন সম্পর্কে উৎসাহ কমে গেছে। আর সাধারণ রিপাবলিকানদের তো কথাই নেই। সেই ওবামার সময় থেকেই জনমত খুব পার্টিজান হয়ে গেছে। এখন এক দলের সমর্থক অন্যদলের রাষ্ট্রপতির কোনও কাজই অনুমোদন করে না। তার উপরে ট্রাম্প, দক্ষিণপন্থী সংবাদমাধ্যম ও ছদ্মসংবাদ টানা প্রচার করে গেছে যে বাইডেন নির্বাচনে কারচুপি করে জিতেছেন (অনেক ভোট ডাকযোগে দেওয়া হওয়ায় এবং ভোটকেন্দ্রে দেওয়া ভোট আগে গোনায় শুরুতে ট্রাম্প এগিয়ে ছিলেন বলে), আসলে বৈধ জয়ী ট্রাম্প। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে রিপাবলিকান ভোটারদের ৬০ শতাংশ, অর্থাৎ মোট ভোটারের ২৭ শতাংশের কাছাকাছি মানুষ তা বিশ্বাস করে, যদিও আদালতে ট্রাম্পের করা সব আপত্তিই ভিত্তিহীন বলে খারিজ হয়ে গেছে। যারা বাইডেনের নির্বাচনের বৈধতাতেই বিশ্বাস করে না, তারা যে তাঁর কাজ অনুমোদন করবে না, তা বলাই বাহুল্য। সাধারণ ভোটারদের কাছে বাইডেনের ভাবমূর্তি অত্যধিক বয়স্ক ও অনাকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব বলে। চিনের মতো প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধে বাইডেনের নেতৃত্ব দুর্বল, ট্রাম্প বেশি একরোখা ছিলেন, সাধারণের মধ্যে এরকম একটা ধারণাও ছড়ানো হয়, বাস্তবে যদিও ট্রাম্পের বসানো শুল্কতে চিনের থেকে আমেরিকার অর্থনীতিরই বেশি ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রপতির কাজের অনুমোদনে এইসব ধারণার প্রভাব পড়ে। এ ছাড়া যা হয়েছে, প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবের তফাত। বাইডেনের নির্বাচনী ইস্তাহারে ‘বিল্ড ব্যাক বেটার’ স্লোগানে পরিকাঠামোর উন্নয়ন ও করব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কারসহ অনেক বড় বড় সরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনার ঘোষণা ছিল, যেসব রূপায়িত হলে বাইডেনের প্রশাসন আধুনিককালের সবথেকে প্রগতিশীল প্রশাসন হত। মুশকিল হল বাইডেনের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে যে সব প্রকল্পের কথা বলা হয়েছে, তার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তার অল্প কিছু বিশেষ প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে চালু করলেও উচ্চাকাঙ্খী পরিকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পগুলি আইনসভার অনুমোদন ছাড়া সম্ভব নয়। মার্কিন আইনসভার নিম্নকক্ষ, হাউসে, ডেমোক্র্যাট দলের অল্প সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। উচ্চকক্ষ সেনেটে সমান সমান— উপরাষ্ট্রপতি কমলা হ্যারিসের কাস্টিং ভোটে চুলচেরা গরিষ্ঠতা। বিল্ড ব্যাক বেটারের প্রকল্পগুলির জন্য করব্যবস্থার সংস্কার করে অর্থের জোগান দিতে হবে, যাতে ধনী ও কর্পোরেশনদের উপর কর বাড়বে। এর জন্য সেনেটে রিপাবলিকানদের কয়েকজনের ভোটও দরকার, বা নিদেনপক্ষে সমস্ত ডেমোক্র্যাটদের এককাট্টা হয়ে ভোট দেওয়ার দরকার। রিপাবলিকানদের কাছ থেকে কোনও সাহায্য পাবার আশা নেই, কারণ তাদের রাজনীতি ওবামার সময় থেকেই পুরোপুরি বাধা দেওয়ার পার্টিজান রাজনীতি হয়ে উঠেছে। ধনী ও কর্পোরেশনদের উপর বাড়তি করের প্রস্তাবে তো তারা পুরোপুরি বাধা দেবে। কিন্তু এ ব্যাপারে ডেমোক্র্যাটদের নিজেদেরই ঐক্য নেই। দুই রক্ষণশীল সেনেটর ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার জো ম্যানসন আর অ্যারিজোনার কির্স্টেন সিনেমা প্রায় যে কোনও প্রস্তাবেই বাধা দিচ্ছেন নানা অজুহাতে। রক্ষণশীল দরিদ্র রাজ্য ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার অর্থনীতিতে ওখানকার কয়লাখনির গুরুত্ব আছে, আর ম্যানসন কোল প্ল্যান্ট থেকে প্রচুর অর্থও পান নির্বাচনী তহবিলে। সেই জন্য পরিবেশবান্ধব অপ্রচলিত শক্তির প্রসারের প্রকল্পগুলোতে বাধা দিচ্ছেন। তাঁর আর সিনেমার বাধায় বাইডেন প্রতিশ্রুত যে দুই হাজার ডলারের ‘স্টিমুলাস চেক’ আমেরিকান পরিবারদের দেওয়ার কথা ছিল, তা কমিয়ে চোদ্দশো করতে হয়েছে। পুলিশি ব্যবস্থার সংস্কার আর ভোটের অধিকারকে সুনিশ্চিত করার যে বিলগুলি হাউসে পাশ হয়ে গেছে, তাও এঁদের বাধায় আইনে পরিণত হতে পারেনি। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতে বাইডেনের করা ‘ভ্যাক্সিন ম্যান্ডেট’, যা বড় কোম্পানিগুলোর কর্মচারীদের টিকা নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল, খারিজ হয়ে গেছে। পরিকাঠামো নির্মাণ বিলে যে সাড়ে তিন লক্ষ কোটি ডলার খরচ করার প্রস্তাব ছিল, তা কমিয়ে এক-তৃতীয়াংশ করতে হয়েছে। অবস্থা যেরকম দাঁড়িয়েছে, তাতে এই দুজনকে বুঝিয়ে একটা বড়সড় কিছু প্রকল্প চালু করতে না পারলে বাইডেনের পক্ষে কোনওরকম উল্লেখযোগ্য কৃতিত্ব দাবী করা দুরূহ হয়ে যাবে। তার প্রভাব আইনসভার মধ্যবর্তী নির্বাচন, এমনকি তিন বছর বাদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেও পড়তে পারে।

মোটামুটি নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে বাইডেনের শাসনকালে সাফল্য আর ব্যর্থতা দুইই রয়েছে। অর্থনীতির গতি বাড়ানো ছাড়াও প্রায় দু লক্ষ কোটি ডলারের কোভিড রিলিফ বিল চালু, কুড়ি লক্ষ মানুষকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় ফিরিয়ে আনা, ছাত্রঋণের বেশ কিছু মকুব করা, প্যারিস পরিবেশচুক্তিতে আমেরিকাকে আবার ফিরিয়ে আনা, বন্ধুরাষ্ট্রগুলির সঙ্গে আবার সহায়তা ও সুসম্পর্ক ফিরিয়ে এনে বাকি বিশ্বের কাছে আমেরিকার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো, এগুলো বাইডেনের সাফল্য। আবার কিছু ব্যাপারে তিনি স্পষ্টতই নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। ট্রাম্পের সময় যেরকম মেক্সিকো সীমান্তে আশ্রয়প্রার্থীদের খাঁচায় পুরে রাখা ধরনের অমানবিক আচরণের অভিযোগ ছিল, সেইরকম ঘটনা আবার ঘটেছে, যা বাইডেনের নির্বাচনী আশ্বাসের পরিপন্থী। সম্প্রতি হাইতিতে রাষ্ট্রপতিকে হত্যার ফলে যে রাজনৈতিক সঙ্কট শুরু হয়েছে, সেইজন্য চলে আসা শরণার্থীদের ক্যাম্পগুলোর করুণ অবস্থা প্রগতিশীলদের বিচলিত করেছে। আর এ ব্যাপারে উপরাষ্ট্রপতি কমলা হ্যারিসের বিতর্কিত ভূমিকাও যথেষ্ট নিন্দিত হয়েছে। উল্টোদিকে রিপাবলিকান ভোটারদের কাছে এটা প্রতিপন্ন করা হচ্ছে যে সীমান্তে একটা অভূতপূর্ব সঙ্কট চলছে, দলে দলে বেআইনি অনুপ্রবেশকারীরা দেশে ঢুকে পড়ছে। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বাইডেনের যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল নানা দেশের যুদ্ধ থেকে আমেরিকা নিজের বাহিনি সরিয়ে নেবে, তা আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে মানলেও সিরিয়া, ইরাক বা সোমালিয়ায় মানা হচ্ছে না। ইউক্রেন সমস্যায় রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধান বার করাও বাইডেনের কাছে একটা চ্যালেঞ্জ। জাপান, অস্ট্রেলিয়া আর ভারতকে নিয়ে ‘কোয়াড অ্যালায়েন্স’ গড়ে তোলাতে চিনের সঙ্গেও ভবিষ্যতে বিরোধ বাড়বে মনে করা হচ্ছে। তবে রাশিয়া আর চিনের সঙ্গে বিরোধ থাকলে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কিছুটা সুবিধা পাওয়া যায়।

অবশ্য কিছু ব্যর্থতা আর কম অনুমোদন মানেই সবকিছু শেষ নয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের এখনও প্রায় তিন বছর বাকি, এর মধ্যে অনেক কিছু পরিবর্তন হতে পারে। কোভিড সমস্যার প্রায় নিশ্চিতভাবেই সমাধান হয়ে যাবে ততদিনে। ওবামা, জর্জ ডব্লিউ বুশ, ট্রাম্প— এঁদের কাজের অনুমোদন অনেক সময়েই চল্লিশ শতাংশ বা তার কম ছিল। এঁদের প্রথম দুজন পুনর্নিবাচিত হয়েছেন, ট্রাম্প না পারলেও এবং মোট হিসেবে প্রচুর ভোটে হারলেও এক হিসেবে জয়ের বেশ কাছাকাছিই ছিলেন— মাত্র তিন-চারটি বিশেষ রাজ্যে পনের-কুড়ি হাজার করে ভোট বাড়াতে পারলেই (যা দেশের মোট ভোটের অনুপাতে খুব অল্প) আবার নির্বাচিত হতে পারতেন। পুনর্নিবাচিত হওয়ার জন্য বাইডেনের দরকার মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ কর্মীদের আয় বাড়ানো, অর্থনীতিতে গতি বজায় রাখা, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোর মোটামুটি পালন এবং সঠিক কৌশলে প্রচার। বাইডেন যেসব ভোটারদের আস্থা হারিয়েছেন, তারা মূলত প্রগতিশীল, ডেমোক্র্যাট বা ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সমর্থক দলনিরপেক্ষ ভোটার। এদের সমর্থন ফিরে পাওয়াটা তুলনায় অনেক সহজ। উল্টোদিকে ২০২৩-২০২৪ সাল নাগাদ যদি অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয় (এরকম পূর্বাভাষ আছে— আমেরিকার অর্থনীতি এক দশকের উপর ধরে ভালো চলছে করোনাভাইরাসের প্রাথমিক পর্যায়ে হওয়া স্বল্পসময়ের মন্দা বাদ দিলে— মন্দার চক্র শুরু হতে পারে স্টিমুলাসের অর্থনীতির উপর লোকের বিশ্বাসে টাল খেলে বা ঋণ সমস্যা বড় হয়ে দেখা দিলে), তাহলে বাইডেনের পরিণতি একমেয়াদের রাষ্ট্রপতি জিমি কার্টার বা জর্জ এইচ ডব্লু বুশের মতো হতে পারে।

ডেমোক্র্যাটিক দলের সমর্থক আর ডেমোক্র্যাটদের দিকে ঝুঁকে থাকা দলনিরপেক্ষ ভোটারদের মধ্যে ২০২৪-এর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বাইডেনকে সরিয়ে অন্য কারুকে প্রার্থী করার ব্যাপারে আধাআধি বিভাজন রয়েছে। এমনিতেই বাইডেনের তখন বিরাশি বছর বয়স হবে, যা রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর ক্ষেত্রে রেকর্ড। প্রথম মেয়াদের ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে না দাঁড়ালে প্রার্থী হিসেবে স্বভাবতই উপরাষ্ট্রপতির কথা মনে আসে। তবে উপরাষ্ট্রপতি কমলা হ্যারিসের জনপ্রিয়তা খুব কম, তাঁর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জেতার ক্ষমতা আছে কিনা সন্দেহ। এ ছাড়া তাঁর নিজের অফিসেরই ছন্নছাড়া অবস্থা, কর্মীরা অনেকেই ইস্তফা দিয়েছেন। বিভিন্ন উদ্যোগে হ্যারিসের উপস্থিতি প্রায় কারওই চোখে পড়ে না। হিলারি ক্লিন্টনেরও লড়াইয়ের ময়দানে ফেরার কথা শোনা যাচ্ছে, তবে হিলারিও প্রচুর মানুষের বিরাগভাজন ছিলেন, তাঁর জেতার ক্ষমতা প্রশ্নাতীত নয়। ডেমোক্র্যাটদের নতুন প্রজন্মের মধ্যে সেরকম জনপ্রিয় কোনও নেতাকে এখনও চোখে পড়েনি। এদিকে সুযোগ বুঝে ট্রাম্প আবার ময়দানে ফেরার চেষ্টা করতে পারেন। এতে ট্রাম্প আবার নির্বাচিত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকলেও, ট্রাম্পের প্রতি বহু মানুষের তীব্র বিরাগের কারণে, প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ট্রাম্পের উপস্থিতি হয়তো বাইডেনকে আবার জিততে সাহায্যই করতে পারে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4007 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...