দেউচা-পাচামির লড়াই আমাদের সকলের

মলয় তিওয়ারি

 



রাজনৈতিক কর্মী

 

 

 

বীরভূম জেলায় প্রস্তাবিত কয়লাখনি প্রকল্প রাজ‍্যে নতুন রাজনৈতিক সংঘর্ষের মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে। দেউচা-পাচামি এলাকায় মাটির নীচে অনেকটা কয়লা সঞ্চিত আছে। ভারতের ভূতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণ বিভাগ গত শতকের আশির দশকে একবার কিছু কুয়ো খুঁড়ে দেখেছিল। কিন্তু সেই কয়লা তুলে আনার কাজ ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্থা বারবার বাতিল করে এসেছে। ওখানকার বাসিন্দাদের ভবিষ‍্যৎ কী হবে সে চিন্তা করে বা পরিবেশের ওপর বিপুল প্রভাবের কথা ভেবে বাতিল করেছে তা নিশ্চয় নয়। কারণটা অন‍্য। কারণ হল, এখানে কয়লা আছে অনেক গভীরে। মাটির অনেকটা নীচে প্রথমে আছে অতীব শক্ত পাথরের পুরু স্তর। পাথরের এই স্তর ভূতত্ত্ববিদ‍্যায় রাজমহল ট্র‍্যাপ নামে চিহ্নিত। এই স্তর প্রায় দুশো-আড়াইশো মিটার পুরু। এর তলা থেকে কয়লা খুঁড়ে আনার প্রযুক্তি আমাদের দেশে নেই এবং তা আমদানি করা ও প্রয়োগ করা এক বিপুল ব‍্যায়সাধ‍্য ব‍্যাপার। এবং ভূ-সর্বেক্ষণ বিভাগের নিরীক্ষা থেকে জানা গেছে যে জমা থাকা কয়লার মান অত‍্যন্ত নিম্ন। ওই কয়লাতে ছাইয়ের শতাংশ অনেক বেশি। সব মিলিয়ে, যদি এই কয়লা পুড়িয়ে বিদ‍্যুৎ উৎপন্ন করা হয় তাহলে সেই বিদ‍্যুতের একক প্রতি মূল‍্য দাঁড়াতে পারে চলতি তাপবিদ‍্যুতের মূল‍্যের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। আদিবাসীদের জীবনজীবিকা বা পরিবেশের কথা ভেবে নয়, আর্থিক লাভক্ষতির হিসাব কষেই বারবার পিছিয়ে আসা হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে টিএমসি সরকার আসার পর আগ্রহ দেখালে কেন্দ্র সরকার আরও পাঁচটি রাজ‍্যকে সংযুক্ত করে একটি সংস্থা গড়ে উত্তোলনের বরাত দেয়। কিন্তু অন‍্যান‍্য রাজ‍্যগুলিও একে একে সরে পড়ে। তবু মমতা ব‍্যানার্জি এই খনিকে রাজ‍্যের স্বপ্ন প্রকল্প হিসেবে তুলে ধরে এগিয়েছেন, এগোচ্ছেন।

মুখ‍্যমন্ত্রী বিধানসভায় দাঁড়িয়ে গত ৯ নভেম্বর ২০২১ এই কয়লাখনির ঘোষণা করেন। প্রায় ১৪ বর্গ কিলোমিটার বা ৩,৪০০ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম, এই কয়লাখনি প্রকল্পের জন‍্য ১০ হাজার কোটি টাকার পুনর্বাসন প‍্যাকেজ সহ মোট ৩৫ হাজার কোটি টাকা সরকারি বিনিয়োগের ঘোষণা করে মমতা ব‍্যানার্জি বলেন, “দেওচা-পাচামি সিঙ্গুর হবে না। সিঙ্গুরে যা ঘটেছিল আমরা তা করব না। আমরা সরকারের হাতে থাকা জমিতে প্রকল্পের কাজ শুরু করব। আমরা জনমুখী সরকার। আমরা বলপ্রয়োগ করে কোনও কিছু করায় বিশ্বাসী নই।” কিন্তু মুখ‍্যমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে মিথ‍্যা প্রমাণ করে গত ২৩ ডিসেম্বর দেওয়ানগঞ্জে পুলিশ নির্মম লাঠি চালায় প্রতিবাদী মহিলাদের ওপর। গুলি চলেনি, কিন্তু প্রাণহানি ঘটে গেছে। একজন আদিবাসী নারী তাঁর গর্ভস্থ সন্তানকে হারিয়েছেন। পুলিশ তাঁর তলপেটে ও নিম্নাঙ্গে লাঠির ডগা দিয়ে তিনবার প্রবল জোড়ে খোঁচা মারে। মোট পঁচিশজন মহিলা কমবেশি আহত হন এবং তাঁদের মধ‍্যে কয়েকজন শারীরিক সম্ভ্রম অবমাননা করার অভিযোগও তুলেছেন। একদিকে এই হামলা, অন‍্যদিকে গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক মামলাও করেছে টিএমসির সরকার। গত ১৮ ডিসেম্বর দেওয়ানগঞ্জে কয়লাখনির বিরুদ্ধে যারা বাইক মিছিল সংগঠিত করেছিলেন তাঁদের ওপর “বিপর্যয় মোকাবিলা” আইনে কেস দিয়েছে সরকার। সিঙ্গুর হবে না বললেও সিঙ্গুরের পথেই এগোচ্ছে দেউচা-পাচামি। এখানেও সরকার সম্মতির প্রশ্নে নির্ভর করতে চাইছে অ্যাবসেন্টি ল‍্যান্ডলর্ডদের ওপর। সিঙ্গুরে যেমন ৮০ শতাংশ ইচ্ছুক চাষির কথা তুলে ধরেছিল তৎকালীন সরকার, তেমনই আমরা এখন শুনছি দেউচা-পাঁচামির মানুষেরা নাকি সানন্দে জমি দিয়ে দিচ্ছেন। সর্বশেষ খবরে প্রকাশ, সরকার দাবি করেছে ১৩১৪ জন জমিমালিক সম্মতি দিয়েছেন এবং এঁদের মোট জমির পরিমাণ ৬০০ একর। সরকার এই দাবির সপক্ষে কোনও তথ‍্য হাজির করেনি। এর আগে এবিষয়ে করা আরটিআই আবেদন বীরভূম জেলাশাসক এড়িয়ে গেছেন। গ্রামের আদিবাসীরা বারবার জানাচ্ছেন যে তাঁরা কেউ কয়লাখনি চান না, তাঁরা জমি দেননি, তাঁরা প্রতিরোধ করবেন।

সবচেয়ে তীব্রভাবে রুখে দাঁড়াচ্ছেন মহিলারা। তাঁরা স্পষ্টতই দেখতে পাচ্ছেন, বলছেন, এই প্রকল্প তাঁদের জীবন তছনছ করে দেবে। এই বিশাল উন্মুক্ত পরিসরের গাছপালা, গরুছাগল, চাষবাস, জাহের থান, কবরস্থান খনিগর্তে বিলীন করে দিয়ে সরকার কেন তাঁদের তাড়িয়ে দিতে চাইছে তা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছেন না তাঁরা। বাইরের কিছু মানুষ ভাবছেন যে এই এলাকা পাথর খাদানের ফলে ইতিমধ‍্যেই শেষ হয়ে গেছে, এখানে চাষবাস নেই। কিন্তু বাস্তবে এখানকার প্রতিরোধের মূল শক্তি আদিবাসী কৃষকসমাজ। ক্রমপ্রসরমান পাথর খাদান নিয়েও তাঁরা উদ্বিগ্ন। গ্রামবাসীদের নিয়মিত কিছু ডোল ছুড়ে দিয়ে ক্রমশ খাদানের হা-মুখ প্রসারিত হয়ে চলেছে বেআইনিভাবে। চাষজমি গ্রাস হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তা এখনও অল্প এলাকায়। কয়লাখনি মানে তো সব শেষ হয়ে যাওয়া। অধিকাংশ জমি একফসলি, অল্প কিছু জমিতে একাধিক চাষ হয়। কিন্তু একবারের চাষেই এখানে লাভ যথেষ্ট। বৃষ্টিজলে চাষ, সেচের ব‍্যাপার নেই। এবং সার ও কীটনাশকের খরচ এখনও অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত। সরকারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী জমির দাম ও একটা চাকরি পেলেও তা তাঁদের পরিবারগুলিকে জীবনে ও জীবিকায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না। ফলত তাঁরা প্রতিরোধ গড়তে চাইছেন।

কিন্তু সরকার জানে, একবার খননকার্য শুরু হলে খোলামুখ খনি নিজের গতিতেই জমি গ্রাস করতে করতে এগোবে। সরকার তাই নিজের হাতে থাকা সরকারি জমিতে প্রকল্প শুরু করবে বলেছে। সরকারের এই নিজের জমি আসলে বনবিভাগের জমি। বনের জমিতে কয়লাখনি হবে। কারও কোনও সম্মতির প্রয়োজন নেই! প্রকল্প এলাকার বাইরের মানুষের কি বলার কিছু নেই!

ধীরে ধীরে, কিন্তু অবধারিতভাবে, ধ্বংসের মুখে পড়বে প্রকল্প এলাকার চারপাশের সমগ্র জীবন। একদম লাগোয়া গ্রামগুলি বেশিদিন টিঁকে থাকবে না, ব্লাস্টিঙের ভূকম্প ও পাথরগুঁড়োবৃষ্টি জীবন দুর্বিষহ করে তুলবে। অভাবনীয় পরিমাণে মাটিপাথর সরিয়ে রাখতে যে ঢিবি পাহাড়গুলি গজিয়ে উঠবে তা বৃষ্টিতে ধুয়ে, বাতাসে উড়ে, নদীবাহিত হয়ে জমা হতে থাকবে বিস্তীর্ণ এলাকার কৃষিক্ষেত্রের উপরিতলে, চাষযোগ‍্য ভূত্বকের রাসায়নিক প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে তুলবে। ভূত্বকের গভীর থেকে যে সালফারযুক্ত মাটি উপরিতলে জমা হবে তা বিস্তীর্ণ এলাকার জলধারাকে অ‍্যসিডপূর্ণ করে তুলবে। গভীর থেকে গভীরতর হতে থাকা খাদান থেকে যত জল ছেঁচে ফেলা হবে তত নীচে নামতে থাকবে বিস্তীর্ণ এলাকার ভূগর্ভস্থ জলস্তর। দ্বারকা নদী সহ নালাগুলি শেষ হয়ে যাবে। হালকা কয়লাধূলা বাতাসে মিশে আরও বৃহত্তর পরিধির গ্রামগঞ্জ ও শহরের শ্বাসনালী ও ফুসফুসে পৌঁছে যাবে, বিশেষত বিপন্ন হবে শিশুসন্তানেরা।

এইসব আশু ধ্বংস ছাড়াও দীর্ঘকালীন নিরিখে অপূরণীয় ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের জলবায়ু। সমস্ত জীবাশ্ম জ্বালানিই গ্রিনহাউস গ‍্যাস নিঃসরণ করে। তার মধ‍্যে কয়লার নিঃসরণ হার সর্বাধিক। এই নিঃসরণের সঙ্গে বিশ্ব উষ্ণায়ন ও জলবায়ু সঙ্কট যে প্রত‍্যক্ষভাবে সম্পর্কযুক্ত সে বিষয়ে বিজ্ঞানবিশ্বে এখন আর কোনও বিতর্ক নাই। বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে উদ্ভূত জলবায়ু সঙ্কটও এখন সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতাতেই অনুভূত হতে শুরু করেছে। আকস্মিক সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড় বা হঠাৎ বৃষ্টির মত এলোমেলো প্রাকৃতিক পরিঘটনাগুলিকে আর অস্বাভাবিক নয় বরং নিয়ম বলে মনে হতে শুরু করেছে। হিমবাহ গলে গিয়ে নদীধারা প্রভাবিত হচ্ছে, ঘন ঘন প্লাবন। বনাঞ্চল সঙ্কুচিত হচ্ছে অতিদ্রুত। দুনিয়ার সব মরুভূমি সীমানা বাড়াচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে ডুবে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে আছে উপকূল এলাকার জনজীবন। এই সমস্ত বিপদ মাথায় নিয়ে আরও একশো বছর কয়লা পোড়ানোর পরিকল্পনাকে উন্নয়ন বলে তুলে ধরা নিছক আহাম্মকি নয়, আগামী সমস্ত প্রজন্মের প্রতি নিষ্ঠুর অপরাধ।

এই আহাম্মকি পরিকল্পনা, ভবিষ‍্যৎ প্রজন্মের প্রতি এই নিষ্ঠুর অপরাধ কেন করছি আমরা? জীবাশ্ম জ্বালানি না পুড়িয়ে সৌরকিরণ থেকে বিদ‍্যুৎ উৎপন্ন করা যায়। বায়ুপ্রবাহ থেকে করা যায়। বিশ্বের বহু দেশের মত আমাদের দেশেও তা হয়। কিন্তু তা দিয়ে সবটা চলে না। এক মুহূর্তে সব তাপবিদ‍্যুৎ কেন্দ্র তাই বন্ধ করার কথা কেউ ভাবছে না। কিন্তু বিকল্প ছাড়া গতি নেই। এখুনি কয়লা পোড়ানো সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে না আমাদের। কিন্তু, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়েও, আমাদের বর্তমান শক্তিচাহিদার জোগান বজায় রেখেও, আমরা দ্রুত কমিয়ে আনতে পারি আমাদের কয়লা পোড়া নিঃসরণ। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার সেই মর্মে আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষরও করেছে। আগামী একশো বছরের পরিকল্পনা যদি করতে হয়, যদি ৩৫ হাজার কোটি টাকা সরকারের তহবিল থেকে খরচ করতে হয়, তাহলে সৌরশক্তির ব‍্যবহার ও সৌর কারিগরির বিকাশেই আমাদের সম্পদ ও উদ‍্যোগ বিনিয়োগ করা প্রয়োজন। এই মুহূর্ত থেকে। বৃহৎ উৎপাদনকেন্দ্রের থেকেও অধিক বিদ‍্যুৎ উৎপন্ন করতে পারি আমরা অসংখ‍্য ক্ষুদ্র উৎপাদনকেন্দ্রের সমাহার ঘটিয়ে। বস্তুত কোনও একটি ধরনের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে, যেখানে যেরকম সুবিধা সেই অনুযায়ী সাজিয়ে নিয়ে শক্তির সবুজ সঙ্কেতে পৌঁছানো সম্ভব। বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা বারবার এই আকুল আবেদন জানাচ্ছেন। আমরা কেন সেই দিশায় আমাদের শক্তি উৎপাদন নীতিকে চালিত করব না? আমরা চাইলে দেউচা-পাচামির লড়াই সেই পথে সংগ্রামের মঞ্চ হয়ে উঠতে পারে।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3775 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...