মতুয়ারা কি দেশের নাগরিক নন?

অনুপ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়

 



প্রাক্তন অধ্যাপক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়

 

 

 

ভারতবর্ষ পৃথিবীর বৃহৎ গণতন্ত্রগুলির মধ্যে অন্যতম। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভ করে এবং তার প্রায় দু বছর পরে ভারতীয় সংবিধান গৃহীত হয়। এটি ভারতের সর্বোচ্চ আইন যা সরকারি প্রতিষ্ঠানের মৌলিক রাজনৈতিক সংজ্ঞা, কাঠামো, পদ্ধতি, ক্ষমতা এবং কর্তব্যগুলিকে চিহ্নিত করে এবং মৌলিক অধিকার, নির্দেশমূলক নীতি এবং নাগরিকদের কর্তব্য নির্ধারণ করে। অন্য যে কোনও দেশের তুলনায় এটি দীর্ঘতম শাসক-দলিল। যেহেতু ভারতীয় সংবিধান সংসদের পরিবর্তে একটি গণপরিষদ দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল এবং এর প্রস্তাবনাতে একটি ঘোষণা “WE, THE PEOPLE OF INDIA, having solemnly resolved to constitute India into a SOVEREIGN SOCIALIST SECULAR DEMOCRATIC REPUBLIC and to secure to all its citizens” আছে, তাই এটি সংসদীয় আধিপত্য নয়, সাংবিধানিক আধিপত্য নিশ্চিত করে। অর্থাৎ সংসদ সংবিধানকে লঙ্ঘন করতে পারে না। এটি ২৬ নভেম্বর ১৯৪৯ তারিখে ভারতের গণপরিষদ দ্বারা গৃহীত হয় এবং ২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ তারিখে কার্যকর হয়। সংবিধান দেশের মৌলিক শাসকদলিল হিসাবে ভারত সরকার আইন ১৯৩৫-কে প্রতিস্থাপিত করেছে এবং ভারতীয় অধিরাজ্যকে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে পরিণত করেছে। সাংবিধানিক স্বতঃস্ফূর্ততা নিশ্চিত করার জন্য, এর প্রণেতারা ৩৯৫ অনুচ্ছেদে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের পূর্বের আইন বাতিল করে। ভারতবর্ষ ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র দিবস হিসাবে তার সংবিধানকে মান্যতা দেয়।

সংবিধান অনুযায়ী ভারতবর্ষ একটি গণতান্ত্রিক দেশ তাই সেই দেশের প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দেশ শাসন করবেন। এই কথাটি খুব পরিষ্কার করে ৩২৬ ধারায় লেখা রয়েছে। পরের আলোচনায় এই ধারাটি আমাদের কাজে লাগবে তাই এখানে আইনটি উদ্ধৃত করলাম।

326. Elections to the House of the People and to the Legislative Assemblies of States to be on the basis of adult suffrage. The elections to the House of the People and to the Legislative Assembly of every State shall be on the basis of adult suffrage; that is to say, every person who is a citizen of India and who is not less than [eighteen years] of age on such date as may be fixed in that behalf by or under any law made by the appropriate Legislature and is not otherwise disqualified under this Constitution or any law made by the appropriate Legislature on the ground of non-residence, unsoundness of mind, crime or corrupt or illegal practice, shall be entitled to be registered as a voter at any such election.

এবারে প্রশ্ন হল কারা নাগরিকের মর্যাদা পাবেন? স্বাধীনতার সময় দেশ ভাগ হয়েছে। শুধু মাত্র ধর্মের কারণেই এপারের মানুষ ওপারে গেছেন, ওপারের মানুষ এপারে এসেছেন। স্থিতাবস্থা আসতে সময় লেগেছে বেশ কিছুদিন, তাই কে নাগরিক এটা ঠিক করতে সেই কদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। তারপরে যাঁরা এ দেশে বাস করেন তাঁরাই নাগরিক এই নীতি ব্যবহার করেই বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হয়েছে। সমস্যাটা খুব সহজ ছিল না তবু সেদিনের আইনপ্রণেতারা কখনওই ধর্মকে নাগরিকত্বের পূর্বশর্ত ভাবেননি এবং পরবর্তীতেও সেইরকমটা হতেও দেননি। ১৯৭১-এর যুদ্ধের পরে পরে আবার কিছু ওপারের মানুষ এপারে এসেছেন। সমস্যা কিছু হয়েছে আবার থিতিয়েও গেছে। দেশে যে থাকছে সেই নাগরিক এমন একটা চিন্তাধারাই সব কিছু বিভ্রান্তির সমাধান করতে সাহায্য করেছে। সবকিছু ঠিকঠাক চলে যাচ্ছিল এবং এই ভাবনাকে ভিত্তি করেই ভারতবর্ষে প্রথম নির্বাচন শুরু হল ২৫ অক্টোবর ১৯৫১ এবং শেষ হল ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২। সময় যত এগিয়ে চলল নাগরিকত্বের একটি ঠিকঠাক সংজ্ঞার প্রয়োজন দেখা দিল আর তাই ১৯৫৫ সালে তৈরি হল নাগরিকত্ব আইন।

নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা বাড়তে লাগল তাই আরও শক্তপোক্ত আইনের প্রয়োজন দেখা দিল। ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস (NRC) হল সমস্ত ভারতীয় নাগরিকদের একটি তালিকা (নাগরিকপঞ্জি) যেটা ২০০৩ সালে তৈরি করা হয়, এবং ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধনী দ্বারা বাধ্যতামূলক করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সমস্ত বৈধ নাগরিকদের নথিভুক্ত করা যাতে অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করা যায়। ধর্মের জন্য না হলেও অর্থনৈতিক কারণে নানা জায়গায় ভাষার ভিত্তিতে অসন্তোষ হতে লাগল। এই কারণেই ২০১৩-১৪ সালে অসম রাজ্যে এটির প্রয়োগ শুরু করা হয়, এবং পরবর্তীতে দেশের বাকি অংশে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়।

এর মধ্যে ২০১৪ সালে একটি হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক দল অনেক আসন পেয়ে দেশের শাসনভার পেল আর সঙ্গে সঙ্গে ধর্মনিরপেক্ষতা তাদের কাছে আর প্রয়োজনীয় রইল না। ভারতকে হিন্দুরাষ্ট্র করে তোলার চিন্তা শুরু এদের আমলেই। হিন্দুরাষ্ট্রের ভাবনাটা এই দলটার কাছে অনেক পুরনো। কিন্তু তাকে বাস্তবে রূপ দিতে পারার মতন ক্ষমতা এল এই সময়েই। প্রমাণস্বরূপ বলতে পারি রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের দ্বিতীয় সঙ্ঘগুরু গোলওয়ালকর তাঁর We or Our Nationhood defined বইটিতে বলেছিলেন,

…. the foreign races in Hindusthan must either adopt the Hindu culture and language, must learn to respect and hold in reverence Hindu religion, must entertain no idea but those of the glorification of the Hindu race and culture, i.e., of the Hindu nation and must lose their separate existence to merge in the Hindu race, or may stay in the country, wholly subordinated to the Hindu Nation, claiming nothing, deserving no privileges, far less any preferential treatment— not even citizen’s rights.[1]

পাঠক দেখুন কী ভয়ঙ্কর কথা। হিন্দু না হলে নাগরিকত্বের সুবিধাটুকুও মিলবে না। সাভারকার ১৯৩৭ সালে আমেদাবাদে হিন্দু মহাসভার সভাপতি হিসাবে তাঁর ১৯তম বক্তৃতায় বললেন,

Therefore the Hindu Mahasabha that has, as formulated in its current constitution, set before itself the task of ‘the maintenance, protection and promotion of the Hindu race, culture and civilization for the advancement and glory of “Hindu Rashtra’ is pre-eminently a national body represent the Hindu Nation as a whole.[2]

আগেই বলেছি নাগরিকপঞ্জি তৈরির প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল অসম রাজ্য থেকে, অন্য রাজ্য থেকে আসা মানুষজনকে বিতাড়নের উদ্দেশ্যে। বহিরাগত বলতে প্রথমে প্রধানত বাঙালি হিন্দু এবং মুসলমান জনগণকে বোঝালেও নেপালি এবং হিন্দিভাষী মানুষদেরও এই তালিকায় সামিল করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে বিজেপি তার হিন্দুত্ব ধারণাটিকেও এই প্রকল্পের সঙ্গে জুড়ে দেয় এবং অচিরেই “বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী” বলে মুসলমানদের নিশানা করা হয়। ক্রমে কেবলমাত্র মুসলমানেরাই হয়ে উঠলেন এদের একমাত্র লক্ষ্য, খ্রিস্টান বৌদ্ধ শিখ এই সমস্ত ধর্মগুলো সম্পর্কে তেমন কোনও আপত্তি রইল না। শাসক দলের ধ্যানজ্ঞান হয়ে উঠল মুসলমান বিতাড়ন, যার ফলশ্রুতি নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA)।

সবই তো ঠিকঠাক চলছিল তবে গোলটা বাধল কোথায়? চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগেই আন্দাজ করা গিয়েছিল যে বহু বাঙালি হিন্দুর নাম বাদ যাবে এবং শেষকালে তাই হল। এই ঘটনা দলের ঘোষিত নীতির ওপর একটা বড় ধাক্কা ছাড়াও, তার ভোটব্যাঙ্কের পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিরাট ক্ষতি। কারণ বাঙালি হিন্দুরাই অসমে ভোটের ক্ষেত্রে বিজেপির একটি বড় ভরসাস্থল। ব্যাপারটা আর একটু বিশদে দেখা যাক।

গত ৩০ আগস্ট ২০১৯ অসমে চূড়ান্ত নাগরিকপঞ্জি প্রকাশিত হল। প্রথম তালিকায় প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ পড়েছিল, পরের তালিকায় বাদ পড়া নামের সংখ্যা কমে দাঁড়াল ১৯ লক্ষ। এ ব্যাপারে আর কোনও মন্তব্য করবার আগে আমরা এই কাজে কত খরচ হয়েছে সেটা দেখে নিই। তার আগের চার বছর ধরে প্রায় ৫২০০০ রাজ্য সরকারের কর্মচারী এই কাজে শ্রম দান করেছেন এবং তার জন্য খরচ হয়েছে মোটামুটি ১৩০০ কোটি টাকা। আগের তালিকায় যে ৪০ লক্ষ মানুষ বাদ পড়েছিলেন তাঁরা প্রত্যেকে আইনি কারণে প্রায় ১৯০০০ টাকা করে খরচ করেছেন যেটা একত্র করলে দাঁড়ায় ৭৬০০ কোটি টাকা। এবারে, অর্থাৎ কিনা নতুন নাগরিকপঞ্জির পরিপ্রেক্ষিতে যে মানুষেরা বাদ পড়েছেন তাঁদের কিঞ্চিৎ বেশি পরিমাণ খরচ করতে হবে। এই বাবদ প্রত্যেকের খরচের পরিমাণ হবে ৫০০০০ টাকার কিছু বেশি, অর্থাৎ একত্র করলে দাঁড়াবে ৯৫০০ কোটি টাকা।

এত দামী প্রকল্প তবু প্রায় কাউকেই খুশি করা গেল না। অথচ কেন্দ্রের শাসক দল ভেবে রেখেছিল যে অসমের পরে দিল্লি, পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, বিহার, মধ্যপ্রদেশ এবং ঝাড়খণ্ডেও এই একই প্রক্রিয়া প্রয়োগ করা হবে। স্থানীয় নেতৃত্ব এখনও সেই দাবী মাঝেমাঝেই জানিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিমবাংলায় লোকসভা ভোটে কিছু বেশি আসনে জয়ী হবার ফলে উৎসাহ যেন আরও বেড়ে গেছিল। “ঘুসবৈঠি” বিতাড়নের জুজু মাঝে মাঝেই দেখানো হচ্ছিল। কিন্তু বিধি বাম, মরজিমাফিক ফল যে পাওয়া যাবে না সেটা ফল প্রকাশের আগেই বোঝা গিয়েছিল আর তাই আবার প্রতিপাদনের (reverification) জন্য সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদনও করা হয়েছিল। সে আবেদন নাকচ হয়ে যায়। অসমের একজন বরিষ্ঠ বিজেপি নেতা হিমন্ত বিশ্বশর্মা ফল প্রকাশের দিন সকালবেলায়ও চূড়ান্ত তালিকার ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং ফল প্রকাশের অব্যবহিত পরেই এ ব্যাপারে লাগাতার আন্দোলনের সপক্ষে বিবৃতি দেন।

সোজাসুজি মুসলমান বলে তাড়ানো মুশকিল। তাই নাগরিকত্বের নিয়মকানুনগুলো আরও অনেক জটিল করে তোলা হল। এই জটিলতা কিন্তু কাজে লাগল না। আগেই বলেছি যে অসমে মুসলমান তাড়াতে গিয়ে নাগরিকত্ব হারানোর দোরগোড়ায় এসে দাঁড়ালেন প্রচুর হিন্দু জনগণ। এমন অবস্থার কারণ, সরকার এমন কোনও নিয়ম তৈরি করতে পারল না যা দিয়ে বেছে বেছে মুসলমান তাড়ানো সম্ভব। একজন মানুষকে ভারতের নাগরিক হতে গেলে তার কাছে ঠিক কোন কোন কাগজ থাকা দরকার সেটা ঠিক করা গেল না। এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে নতুন আইনে যারা আইন প্রণয়ন করেছেন তাঁরাও বে-নাগরিক হয়ে যেতে পারেন।

বিজেপি বুঝতে পেরেছে যে এই আইন দিয়ে আর বিশেষ কিছু হবে না। অথচ অসমে বে-নাগরিক হওয়া ১৯ লক্ষ হিন্দুকে ভোটের স্বার্থে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। তাই বিজেপি সরকার নাগরিকত্ব নিয়ে আর একটি সংশোধনী (CAA) আনল। সেই সংশোধনীর ফলে আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্শি এবং খ্রিস্টান উদ্বাস্তুরা ভারতীয় নাগরিকের মর্যাদা পেতে পারবেন। এখানেও সচেতনভাবে মুসলমানদের বাদ দেওয়া হল। পাঠক চাতুরিটা অনুধাবন করবার চেষ্টা করুন। অসমে যাঁরা নাগরিক ছিলেন, যাঁদের কাছে আধার কার্ড ভোটার কার্ড সব ছিল তাঁদের কলমের এক খোঁচায় বে-নাগরিক করে দেওয়া হল। এবার তাঁদের বলতে হবে “আমরা কোনওদিন নাগরিক ছিলাম না, আমরা উদ্বাস্তু। আমাদের নতুন আইনে নাগরিকত্ব দাও।” এর জন্য খরচ হবে এবং সময় নষ্ট হবে। মনে হয় এই প্রক্রিয়াটির যে প্রবল ক্ষমতা সেটি বিজেপি অনুধাবন করতে পেরেছে। কী সেই ক্ষমতা, লেখাটির পরের অংশে আমরা সেই কথাটাই একটি উদাহরণের সাহায্যে বোঝাবার চেষ্টা করব। আমরা মতুয়া সম্প্রদায়ের কথা বলব। তাই আগে এই মানুষদের ইতিহাস একটু জেনে রাখা ভালো।

মতুয়ারা, অর্থাৎ সাধারণভাবে ‘চণ্ডাল’ নামে পরিচিত অবিভক্ত বাংলার নমঃশূদ্ররা, হিন্দু সমাজের ঐতিহ্যগত চতুর্বর্ণ ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন। এঁরা প্রধানত অবিভক্ত বাংলার পূর্বাঞ্চলের ছয়টি জেলা, যশোর, খুলনা, ফরিদপুর, ঢাকা এবং ময়মনসিংহের প্রান্তিক অংশে বাস করতেন। নিজেদের ভরণপোষণের জন্য তারা নৌকার মাঝি, কৃষক এবং কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। ১৯৩১ সালের আদমশুমারি অনুসারে বাংলার পূর্বাঞ্চলে নমঃশূদ্ররা সমগ্র হিন্দু জনসংখ্যার ১৮.৯৪ শতাংশ ছিলেন। তবুও তাঁরা ছিলেন তৎকালীন বর্ণ-ভিত্তিক সমাজে সামাজিকভাবে প্রত্যাখ্যাত। নমঃশূদ্রদের হিন্দু মন্দিরে যাওয়ার অনুমতি ছিল না, এবং ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা তাদের সামাজিক-ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে কোনওরকম সাহায্য করতে পারতেন না।

ফরিদপুরের এক নমঃশূদ্র পরিবারের হরিচাঁদ ঠাকুর (১৮১২-১৮৭৮) এবং তাঁর পুত্র গুরুচাঁদ ঠাকুর (১৮৪৭-১৯৩৭) এই ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে ‘মতুয়া’ নামে পরিচিত একটি নতুন ভক্তি বা ভক্তিভিত্তিক ধর্মীয় দর্শন প্রতিষ্ঠা করেন। মতুয়া-নমঃশূদ্ররা ঠাকুর পরিবারের নির্দেশনায় তাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন ছিল এবং ১৯১৫ সালে তারা ফরিদপুরের ওড়াকান্দিতে ‘শ্রী শ্রী হরিচাঁদ মিশন’ তৈরি করে। ১৯৩২ সালে সংগঠনটির নামকরণ করা হয় ‘মতুয়া মহাসংঘ’ এবং গুরুচাঁদ ঠাকুরের নাতি প্রমথ রঞ্জন ঠাকুরের সভাপতিত্বে তা নিবন্ধিত হয়। ‘হাতে কাম মুখে নাম’, বর্ণপ্রথা প্রত্যাখ্যান এবং ‘গুরুবাদ’ হল এর ধর্মীয় বিশ্বাসের মূল কথা। মতুয়া মহাসংঘ পূর্ববাংলার নিম্নবর্ণের মানুষদের, বিশেষ করে নমঃশূদ্রদের একত্রিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। তাঁরা উচ্চবর্ণের, দেশপ্রেমিক হিন্দু জমিদারদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের কট্টর সমর্থকও ছিলেন এবং সরকারের সক্রিয় সমর্থনে একটি পৃথক রাজনৈতিক শ্রেণি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। দেশভাগের সময়, নমঃশূদ্র-অধ্যুষিত জেলাগুলি পূর্ব পাকিস্তানেই থেকে যায়। ফলে এই সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ সদস্যদের প্রাথমিকভাবে অর্থনৈতিক অবস্থার ভয়ঙ্কর অবনতি হয়। ১৯৪৭ সালে বাংলা ভাগ হলে নমঃশূদ্র এবং রাজবংশীদের শক্তিশালী বর্ণ-ভিত্তিক আন্দোলন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানে মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বৃদ্ধির কারণে নমঃশূদ্র, যেমন রাজবংশী এবং মতুয়ারা, আন্দামান, অসম, দণ্ডকারণ্য এমনকি মহারাষ্ট্রে চলে যেতে বাধ্য হন। তাঁদের অনেকেই পরে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসেন এবং পূর্ব পাকিস্তান, বর্তমানে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। প্রমথরঞ্জন ঠাকুর ১৯৪৭ সালে ভারতে আসেন, এবং এক বছর পরে, তিনি এবং তার স্ত্রী, বীণাপাণি দেবী (বড় মা), উত্তর ২৪ পরগণা অঞ্চলে ঠাকুরনগর শহর প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে হাজার হাজার দেশভাগের উদ্বাস্তু, বেশিরভাগই হরিজন গোষ্ঠীর, বসতি স্থাপন করেন। পরে মতুয়া অনুগামীরা পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন এবং সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে বসতি স্থাপন করেন, সাংগঠনিক শক্তি এবং জনসংখ্যাগত শক্তির কারণে তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাবও প্রতিষ্ঠা হয়। ঠিক এইজন্যেই মতুয়ারা প্রায় সমস্ত রাজনৈতিক দলের কাছে ভোটের নিরিখে মহার্ঘ্য হয়ে ওঠেন, কারণ তাঁরা ভোটদানের অধিকারী ছিলেন।

২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের বেশ কিছু আগে থেকেই বিজেপি ওপার থেকে আসা মানুষজনকে নাগরিকত্ব নিয়ে ভয় দেখাতে শুরু করে। নাগরিকত্ব নিয়ে পাইয়ে দেওয়ার রাজনীতি শুরু হল। মতুয়াদের ইতিহাস থেকে আমরা জেনেছি যে তাঁরা উচ্চবর্ণের মানুষদের কাছ থেকে অনেক অপমান সহ্য করেছিলেন, দেশভাগের ফলে অর্থনৈতিক দুরবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন আর তাই নাগরিকত্বের ব্যাপারে অনিশ্চয়তা মেনে নিতে ভয় পাচ্ছিলেন। ঠিক এই রকম সময়ে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন তোমরা বিজেপিকে ভোট দাও, আমি তোমাদের নাগরিকত্ব দেব।[3] পাঠক একটু মন দিয়ে ভাববার চেষ্টা করুন। ভোটদানের অধিকারী কিছু মানুষকে বলা হচ্ছে তোমরা আমাদের ভোট দিলে আমি তোমাদের নাগরিকত্ব দেব। আগেই আমরা দেখেছি যে ভারতীয় সংবিধানের ৩২৬ নম্বর ধারায় লেখা আছে যে ২১ বছর বা তার থেকে বেশি বয়সের নাগরিক হলে তবেই ভোট দেওয়া যায়। তাহলে ভোট দেওয়ার অধিকার আছে মানে তিনি নিশ্চয় নাগরিক। একজন নাগরিককে আবার নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা কি বলা যায়? আর মতুয়ারা যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথামতো নাগরিক না হন তাহলে ভোট দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কোনটা ঠিক তা পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন। দেশের সংবিধান নিয়ে এইরকম অনিশ্চয়তা কখনওই অভিপ্রেত নয়।


[1] Golwalkar, M. S. We or Our Nationhood defined. p 105.
[2] Savarkar, V. D. Hindu Rashtra Darshan. p 7.
[3] ET Online. 16 Apr 2021.

 

*নিবন্ধটি জনস্বার্থ বার্তা-র ২৯ জানুয়ারি ২০২২-এ প্রকাশিত “প্রশ্ন নাগরিকত্ব” শিরোনামের নিবন্ধটির একটি পরিমার্জিত এবং বর্ধিত সংস্করণ

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4007 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...