মহাকর্ষীয় তরঙ্গ, আইনষ্টাইন ও নোবেল প্রাইজ

সোমদেব ঘোষ

 

জিওমেট্রি!

মাণিকজেঠু ক্ষমা করবেন। আপনার স্টাইলেই লেখাটা শুরু করলাম। আসলে ছোটবেলায় লোনির বই ঘেঁটে প্রচুর রাইডার এক্সট্রা থিওরেম করেছি তো, সেই জ্যামিতিই যে এত গোল বাঁধাবে কে বা জানত!

পুজোহপ্তা শেষ। কলকাতা তথা বাংলার মানুষ ঘেমে নেয়ে বা বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে ঠাকুর দেখেছেন… থুড়ি, প্যান্ডেল হপিং করেছেন। করে কারুর কারুর হুপিং কাশি হয়নি। কলকাতা থেকে এখন বিশ্বমিডিয়ার (হ্যাঃ হ্যাঃ) ফোকাস শিফ্ট হয়ে হাজার হাজার মাইল দূরে গিয়ে পড়েছে সুইডেনের স্টকহোম শহরে। সেখানে এখন নোবেল প্রাইজ অ্যানাউন্স হচ্ছে। ২০১৭ সালে সোনার মেডেল কাদের কাদের গলায় ঝুলবে, বব ডিলানের পরে কি এবার পল সাইমন [[১]] সাহিত্য নোবেল [[২]] পাবেন, এইসব প্রশ্নে সরগরম বিশ্বমিডিয়া। নোবেল প্রাইজ নিয়ে প্রতি বছর একটা টানটান উত্তেজনা থাকে। এবারও ছিল। ফিজিক্স বাদে। পদার্থবিদ্যায় কে বা কী এবার নোবেল পাবেন সেটা সব্বাই জানত। সব্বাই বলতে যারা বিজ্ঞান নিয়ে চর্চা করে বা বিজ্ঞানের জগতের খবর রাখে তারা। আমরাও এবার জেনে নিই, কী বলেন?

২০১৭ সালে পদার্থবিদ্যায় নোবেলপ্রাইজ পেলেন রাইনার ওয়াইস, কিপ থর্ন, এবং ব্যারি ব্যারিশ। পেলেনfor decisive contributions to the LIGO detector and the observation of gravitational waves। অর্থাৎ, লিগো মানমন্দির রূপায়ণে সাহায্য করে এবং তা ব্যবহার করে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খুঁজে পাওয়ার জন্য এই তিনজনকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হল।

২০১৭ সালের পদার্থবিদ্যায় নোবেলপ্রাইজ পেলেন রাইনার ওয়াইস (বাঁদিকে), কিপ থর্ন (মধ্যে) ও ব্যারি ব্যারিশ (ডানদিকে)

ইয়ে, মানে, স্লাইট বদহজম হয়ে গেল স্যার। তার চেয়ে বোধহয় ডিলানই ভাল ছিল। এসব মহাকর্ষণীয় ব্যাপারস্যাপার ঠিক বুঝি না, আসি, বুঝলেন।

বিষয়টাকে আরেকটু সহজপাক করতে চলুন আমরা গেছোদিদির [[৩]] পিঠে চেপে আটানব্বুই বছর পিছিয়ে যাই, গিয়ে পড়ি সোজা প্রেসিডেন্সি কলেজের ফিজিক্সের স্টাফরুমে। ২৬ বছর বয়সি দুই তরুণ বাঙালি বিজ্ঞানী বসে আছেন। অফ পিরিয়ড, তাই চা আর আড্ডা চলছে।

“নমস্কার! আমি জনৈক বাঙালি, ২০১৭ সাল থেকে আসছি। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ নোবেল পেয়েছে!”

দুই বিজ্ঞানী চা ফেলে লাফিয়ে উঠে আগে একটু কোলাকুলি সেরে নিলেন। তারপর খানিকক্ষণ নেচেটেচে ফের চা নিয়ে বসে মুখেচোখে গ্র্যাভিটি আনার চেষ্টা করলেন।

এগোবার আগে ঝটপট আলাপটা সেরে রাখি। বাঁদিকে যিনি বসে আছেন, সরু গোঁফ, শার্প সুপুরুষ চেহারা, ইনি মেঘনাদ সাহা। ডানদিকে যিনি বসে আছেন, মোটা চশমা, বয়স হলে বেশ মাইডিয়ারদাদু গোছের দেখতে হবেন, ইনি সত্যেন্দ্রনাথ বসু।

সাহা : তাই নাকি? এতো দারুণ খবর! আজই এটা নিয়ে বলাবলি করছিলাম, তাই না সতু?

বোস : অ্যামেজিং কেস! কী কাকতাল! ভেবে দেখ নাদু, গতকালই অনুবাদটা [[৪]] বেরোল, আর আজই কিনা নোবেলের খবরটা এল।

সাহা : তা ভাই, খুব ভাল খবর দিলেন। কিন্তু মানে আপনি এত কষ্ট করে টাইম ট্র্যাভেল করে… আচ্ছা সতু, টাইম ট্র্যাভেল কি সম্ভব?

বোস : হরগিজ নহী। হের প্রফেসর আইনষ্টাইন নিজেই বলে গেছেন…

থামাতে হল। গেছোদিদি তাতাবাবু কল্পম্যাজিক ইত্যাদি বলেকয়ে শান্ত করলাম দু’জনকে। বললাম, “আমি এসেছি একটাই কারণে। ২০১৭ সালে বাংলাভাষায় বিজ্ঞানের অবস্থা নিতান্তই করুণ। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ জিনিসটা কী, সেটা খুঁজে পাওয়াটা এতটা সাংঘাতিক কেন, নোবেলই বা কেন, এসব স্পষ্ট ভাষায় বোঝাবে এমন লোক খুব কমই আছে। এদিকে আমাদের চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবম্যাগের পাঠক হাপিত্যেশ করে বসে আছেন। আপনারা যদি একটু বুঝিয়ে বলেন…মানে আপনারাই তো আইনস্টাইনের রিলে…”

সাহা : বুঝেছি। ঠিক আছে। সতু, তুই শুরু করবি না আমি?

বোস : ধরুন আপনি পুকুরপারে মাছ ধরছেন—

থ্যাঙ্কস টু গেছোদিদি, আমরা তিনজন মানুষ এবং একজন কল্পম্যাজিক প্রাণী মুহূর্তের মধ্যে টেলিপোর্ট হয়ে একটা মেছো পুকুরের সামনে পৌঁছে গেলুম। তিনটে বেতের চেয়ার, তিনটে ছিপ, একটা ছোট টেবিল, একপট চা, একটা শাদা তোয়ালে।

সাহা : তাতাবাবুর জবাব নেই!

বোস (উঠে দাঁড়িয়ে পুকুরপাড় থেকে দুটো পাথর কুড়িয়ে) : এদিকে আসুন। পুকুরের জলটা শান্ত দেখছেন, তাই তো? এবারে আমি যদি এই ইঁটের টুকরোটা…

মেঘনাদ সাহা (বাঁদিকে) ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু (ডানদিকে)

সাহা : ওটা পাথরের টুকরো, সতু, ইঁট নয়।

বোস : …এই ইঁটের টুকরোটা যদি জলে ফেলি, কী হবে?

“পুকুরের জলে ঢেউ খেলবে,” ভয়ে ভয়ে বললাম।

বোস : দেখাই যাক! (পাথরটা পুকুরের জলে আলতো করে ফেললেন, ছোট ছোট ঢেউ উঠল) ভেরিফায়েড! আপনি ভুল বলেননি। এবার দ্বিতীয় টুকরোটা যদি খুব জোরে ফেলি কী হবে?

“যেখানে ফেললেন সেখানে জল লাফিয়ে উঠবে, আর বড় বড় ঢেউ খেলবে,” অনেক বেশি বিশ্বাসের সঙ্গে বললাম।

বোস (সর্বশক্তি প্রয়োগ করে পাথরটা জলে ছুঁড়ে মারলেন, জল অনেকটা লাফিয়ে উঠল, পুকুরপাড়ে বসা একটা মাছরাঙা পাখি ভিরমি খেয়ে উল্টে পড়ল) : একদম ঠিক! আপনার কমন সেন্স ঠিকঠাক ক্যালিব্রেট করা আছে। নাদু, থিওরিটা কি তুই…?

সাহা (টী পট থেকে চা ঢেলে তোয়ালেটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে) : মুছে ফেলুন। যা ওয়েদার, নিউমোনিয়া হয়ে যাবে। গরম চা খান। ব্যাপারটা কী হল বোঝার চেষ্টা করা যাক। সতু যে পাথরের টুকরোটা জলে ফেলল, সেটার জলে পড়ার আগে তার একটা গতি ছিল, তাই তো? প্রথম টুকরোটার গতি কম ছিল, পরেরটার বেশি। ঠিক? এবার, জলে ধাক্কা খেতে কী হল? দুটো টুকরোর গতিই হ্রাস পেল…

বোস : আঃ, নাদু, অত ভারী বাংলা না। ২০১৭। সহজ করে বোঝা।

সাহা : বেশ। গতি কমল। এবার, কোনও বস্তুর গতি থাকা মানে কী? তার গতিজাড্য থাকবে, গতিশক্তি থাকবে [[৫]], তাই তো? গতি কমার সঙ্গে সঙ্গে পাথরের টুকরোর গতিজাড্য ও গতিশক্তি, দু’টোই কমল। কিন্তু গতিজাড্যের নিত্যতা ও শক্তির নিত্যতা সূত্র [[৬]] অনুযায়ী, গতিজাড্য বা শক্তি সৃষ্ট বা ধ্বংস হতে পারে না।

বোস : সুতরাং, সোজা বাংলায়, ইঁটের জাড্য ও শক্তি যতটা কমল, ঠিক ততটাই জলে গেল, গিয়ে চারদিকে ছড়িয়ে গেল। অনেকটা কালিপটকার মত। ভেতরে রাসায়নিক শক্তি, সলতে দিলেই দড়াম! ফেটে চৌচির।

সাহা : এবং এই ছড়িয়ে যাওয়াটা আমরা স্পষ্ট দেখতেও পেলাম। ঢেউ বা তরঙ্গের মাধ্যমেই জলের মধ্যে পাথরের টুকরোটার বাড়তি শক্তিটা ছড়িয়ে গেল।

বোস : আপনি গান করতে পারেন?

সঙ্গীতচর্চাটা কোনওকালেই করা হয়নি, গলা শুনলে হাঁড়িচাচার লিভারে হার্ট্ অ্যাটাক হবে। দুঃখের সঙ্গে মাথা নাড়লাম।

বোস : থাক, লাগবে না। এই যে আমরা তিনজনে কথা বলছি, সেটা কীভাবে সম্ভব হচ্ছে?

সাহা : আমাদের স্বরযন্ত্র হাওয়ায় কম্পনের সৃষ্টি করছে, সেই কম্পন আপনার কানের পর্দায় গিয়ে ঠেকছে। বাকি কাজটা আপনার মস্তিষ্ক সারছে।

বোস : এখানেও তরঙ্গ, এখানেও সেই শক্তিরই প্রবাহন, যদিও শব্দতরঙ্গের সঙ্গে জলতরঙ্গের কিঞ্চিৎ তফাত আছে।

সাহা : জলে তরঙ্গ প্রবাহিত হচ্ছে মানে জলের স্তর ওঠানামা করছে। হাওয়ায় শব্দ প্রবাহিত হচ্ছে মানে হাওয়ার স্তর আয়তনে বাড়ছে বা প্রসারিত হচ্ছে, অথবা ছোট হচ্ছে বা সঙ্কুচিত হচ্ছে। এটা একটা প্রেশার ওয়েভ।

এতকিছু হজম করছি, এমন সময়ে হঠাৎ সব অন্ধকার হয়ে গেল। বুঝলাম গেছোদিদির কাণ্ড।

বোস : ওপরে তাকান।

অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি, ও মা, কত তারা, তারা কত উজ্জ্বল। ২০১৭ সালে এত উজ্জ্বল আকাশ…

বোস : এত অন্ধকারেও আপনি তারাদের দেখতে পাচ্ছেন, তাই তো? কীভাবে? নাদু, এটা একেবারে তোর নিজস্ব বিষয়।

সাহা (গলা খাঁকরে) : আলো। তারাদের মধ্যে তুমুল শক্তি নিহিত আছে, কোনও অজ্ঞাত উপায়ে তারা এই শক্তি আলোয় রূপান্তরিত করছে [[৭]]। সেই আলোকশক্তি লক্ষ কোটি আলোকবর্ষ পেরিয়ে আমাদের চোখের রেটিনাতে এসে পড়ছে, বাকি কাজটা আপনার মস্তিষ্ক সারছে।

বোস : এখানে একটা ছোট মুশকিল আছে। জলে ইঁট ফেললে জলে ঢেউ ওঠে, হাওয়ায় সারেগামা গাইলে হাওয়ায় ঢেউ ওঠে, যদিও তা আমরা দেখতে পাই না। কিন্তু ওই দূর-দূরান্তের তারা, তার আর আপনার চোখের রেটিনার মধ্যে মহাকাশ ছাড়া তো কিছু নেই—

সাহা : এখানেই আলো অন্যদের চেয়ে আলাদা। আলোর তরঙ্গ যেমন হাওয়া বা জলের মধ্যে দিয়েও যেতে পারে, তেমন মহাশূন্যে ভ্যাকুয়ামের মধ্য দিয়েও যেতে পারে। ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব অনুযায়ী, আলো হল তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। চলাফেরা করার জন্য এদের কোনও মাধ্যম লাগে না।

ওপরে জলে তরঙ্গ। নীচে বাঁদিকে অালো, যা একধরনের তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ (electromagnetic wave)। নীচে ডানদিকে শব্দ, যা একধরনের চাপতরঙ্গ (pressure wave)

বোস : মহাশূন্য ছাড়া।

সাহা : হ্যাঁ, মহাশূন্য, বা, আইনষ্টাইনের ভাষায় স্পেসটাইম, সেটা ঠিক মাধ্যম না হলেও—

বোস : একেবারে পাতি প্যাসিভ ব্যাকগ্রাউন্ডও যে নয়, সেটাও হের প্রফেসর আইনষ্টাইনই বলে গেছেন।

সাহা (আমার দিকে তাকিয়ে) : ভদ্রলোক মনে হয় কূল পাচ্ছেন না। একটু পিছিয়ে গেলে— সতু, ট্রিনিটি না বার্লিন?

বোস : বার্লিন। ট্রিনিটি গেলে অনেক ঘুরপথ। ফিল-ইন-দ্য-গ্যাপ্স আমরাই করে দেব। গেছোদিদি, একটু যদি…

নিমেষে সিন পরিবর্তন হল। ১৯১৫ সাল, বার্লিন, প্রুশিয়ান অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্সেস। নভেম্বর মাস, শীত প্রচণ্ড, আমরা একটা লেকচার হলের পেছনের সিটে বসে আছি। হল কানায় কানায় ভর্তি। হলের সামনে ব্ল্যাকবোর্ডে লেকচার দিচ্ছেন যিনি তাঁর পরনে কালো স্যুট, মাথায় কাঁচাপাকা ঝাঁকড়া চুল, মুখে কালো গোঁফ, বয়স আন্দাজ ৩৬।

বোস (হাত তুলে) : উই বিট্য, হের প্রফেসর আইনষ্টাইন, আবের ওয়াস ইস্ট ডি রাউমজাইট?

আইনষ্টাইন (পেছনের সিটে বোস আর সাহাকে দেখতে পেয়ে) : আরে, কী খবর ভায়া? তোমরাই তো আমার পেপারগুলো ইংরিজিতে অনুবাদ করেছিলে না? কী সৌভাগ্য কী সৌভাগ্য! কিন্তু বোস, স্পেসটাইম কী সেটা নিশ্চয় তুমি জানো।

বোস : অবশ্যই, হের প্রফেসর। কিন্তু আমাদের সঙ্গের এই ভদ্রলোক ২০১৭ সাল থেকে এসেছেন। আপনি যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের কথা বলে গেছেন, তা যন্ত্রে ধরা পড়েছে! ২০১৭ সালে তা নোবেল প্রাইজও পাচ্ছে!

আইনষ্টাইন (পাহাড়ি সান্যালের মতো ভীষণ ব্যস্ত হয়ে) : তাই নাকি তাই নাকি? ইয়ে, তাহলে তো…

সাহা (হাত তুলে) : হের প্রফেসর, স্পেসটাইম কী, গ্র্যাভিটি কী, আর গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভসও বা কী, সেটা বুঝতেই আমরা এসেছি।

আইনষ্টাইন (পাহাড়ি সান্যালের মতো হেসে) : অবশ্যই অবশ্যই। আজকের এই সেমিনার তো সেইজন্যই। প্রথম কোনটা জিজ্ঞেস করলে? স্পেসটাইম? খুব ভাল খুব ভাল। কয়েক বছর আগে অবধিও সবাই ভাবতেন স্পেস আর টাইম বুঝি দুটো আলাদা জিনিস। আমার স্পেশাল রিলেটিভিটি তত্ত্ব থেকে সুর টেনে ১৯০৮ সালে প্রফেসর মিনকোয়স্কি দেখান যে স্পেস আর টাইম একই জিনিসের দুই রূপ। সেই জ্যামিতিক চিত্রকে আমরা এখন স্পেসটাইম বলি।

বোস (আমার কানে ফিসফিস করে) : প্রফেসর হার্মান মিনকোয়স্কি, জুরিখে আইনষ্টাইনের অঙ্কের প্রফেসর ছিলেন।

আইনষ্টাইন : আমাদের এই পৃথিবী, তার পাশে চাঁদ, সূর্য, সৌরজগতের সবক’টা গ্রহ— বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে যা কিছু আছে, সবই এই স্পেসটাইমের মধ্যে বসে আছে। এই যে আমি বক্তৃতা দিচ্ছি, তোমরা শুনছ, সবই স্পেসটাইমের মধ্যে ঘটছে। এর বাইরে কিছু নেই।

সাহা : আর গ্র্যাভিটি?

আইনষ্টাইন (হাতের চকটা টেবিলের ওপর ফেলে) : চকটা টেবিলে পড়ল কেন? মাধ্যাকর্ষণ। পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘুরছে কেন? সেটাও মাধ্যাকর্ষণ। নিউটন আমাদের তাই বলে গেছেন। কিন্তু যেটা বলে যাননি— কিন্তু চেষ্টা করেছেন— সেটা হল, এই মাধ্যাকর্ষণ আসে কোত্থেকে? সাহা, বোস, তোমাদের সাহায্য লাগবে।

সাহা ও বোস দুজনেই ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন। আইনষ্টাইন একটা ভাঁজ করা রবারের শীট বের করে দু’জনের হাতে ধরিয়ে দিলেন, দিয়ে পকেট থেকে কয়েকটা মার্বেল বের করলেন।

আইনষ্টাইন (রবারের শীটের দিকে দেখিয়ে) : ওটা স্পেসটাইম। স্পেসটাইম আসলে ত্রিমাত্রিক, কিন্তু ডেমনস্ট্রেশনের জন্য দ্বিমাত্রিক ভেবে নিতে আপত্তি নেই আশা করি। এবারে আমি ওটার ওপর এই মার্বেলগুলো রাখলাম— সাবধান বোস, গড়িয়ে না পড়ে যায়। সাহা, অ্যাডজাস্ট প্লীজ, খুব টেনে ধরো না, তাহলে…রাইট। এই মার্বেলগুলো হল তারা বা গ্রহ বা উপগ্রহ। ধরে নেওয়া যাক এটা সৌরজগতের ভেতরটা। ওটা বুধ, ওটা শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল। ঠিক আছে?

সাহা ও বোস বাদে সকলেই মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললেন।

আইনষ্টাইন (টেবিলের ওপর থেকে একটা বড় কাঁচের পেপারওয়েট তুলে) : এবার ধরা যাক, এটা সূর্য। এটা যদি আমি ওই শীটের ওপর আ-লতো করে বসাই—

সাহা ও বোসের শত চেষ্টা সত্ত্বেও বড় পেপারওয়েটটা গড়িয়ে একেবারে শীটের মাঝখানে চলে এল। তার টানে মার্বেলগুলোয় গড়িয়ে মাঝখানে এসে বসে গেল।

আইনষ্টাইন (মার্বেল, পেপারওয়েট, ও রবার শীট তুলে রেখে) : থ্যাঙ্ক ইউ সাহা অ্যান্ড বোস। তাহলে কী বুঝলাম আমরা? ওই রবার শীট হল স্পেসটাইম, তার ওপর ভর বা মাস রাখলে সেই ভরের চারপাশে রবারটা বসে যাবে, আর বেশি ভরের কিছু আনলে ছোট ভরগুলো সোজা গিয়ে বেশি ভরের কাছে গিয়ে পড়বে। গ্র্যাভিটি!

সাহা (ফিরে এসে আমার পাশে বসে ফিসফিস করে) : মার্বেল বা পেপারওয়েটের বসালে রবারের শীটটা যেমন বসে যাচ্ছে, স্পেসটাইম বা স্থানকালে কোনও ভর-ওয়ালা বস্তু থাকলে সেটাও টেনেবেঁকে যায়। কাছাকাছি আরেকটা বস্তু আনলে সেটা এই বাঁকা স্থানকালের জালে পড়ে সেই ভরবস্তুর দিকে আসতে থাকবে। এই বাঁকাকে বলে কার্ভেচার বা বক্রতা।

ওপরে সূর্য ও পৃথিবীর ভরের জন্য স্থানকালের বক্রতা (spacetime curvature) দেখা যাচ্ছে, যদিও স্থানকালকে এখানে দ্বিমাত্রিক (2D) দেখানো হয়েছে। নীচে দু’টো কৃষ্ণগহ্বর (black hole) একে অপরের চারপাশে ঘুরছে, মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সৃষ্টি হচ্ছে (শিল্পীর কল্পনা)

আইনষ্টাইন : যত ভর বেশি, তত বেশি তার আশেপাশের স্থানকালের বক্রতা বাড়বে, তত বেশি তার মাধ্যাকর্ষীয় শক্তি। গ্র্যাভিটি ইজ নাথিং বাট দ্য লোকাল কার্ভেচার অফ স্পেসটাইম ডিউ টু মাস।

মাথাটা গুলিয়ে গেল। তার মানে পৃথিবীর মাটি যে নিউটনের আপেলকে কাছে টানছে, তার মধ্যে এক মিডলম্যান বা মিডিয়াম আছে। সেই মাধ্যমের নাম স্পেসটাইম। পৃথিবীর ভরের কারণে আশেপাশের স্থানকালের বক্রতাও বেশ বেশি, আর সেই বাঁকা স্পেসটাইমের ঢালু দিয়ে নিউটনের আপেল—

বোস : গড়িয়ে পড়ছে। কারেক্ট!

আইনষ্টাইন : এবার ধরো, এই স্পেসটাইমের মধ্যে প্রায় কিছুই স্থির নেই, তাই তো? চন্দ্র-সূর্য-পৃথিবী-বৃহস্পতি ইত্যাদি সবই বনবন করে কিছু না কিছুর চারদিকে ঘুরছে। ঘুরছে মানে সোজাপথে চলছে না, তার মানে তার অ্যাক্সিলারেশন আছে। আর ত্বরণ থাকা মানে…?

সাহা (হাত তুলে) : তার এনার্জি কমছে, রেডিয়েট করে বেরিয়ে যাচ্ছে। শক্তির বিকিরণ।

আইনষ্টাইন : একদম! পুকুরের জলে পাথর বা ইঁটের টুকরো ফেললে যেমন তার গতিশক্তির বিকিরণ ঘটে, ঠিক তেমনই কোনও ত্বরাণ্বিত ভর যদি…

বোস (ফিসফিস করে) : সোজা বাংলায়, কোনও ভারী জিনিস যদি গতি পাল্টায়, তাহলে তার শক্তি কমবে। কীভাবে কমবে, সেটাই দেখার।

আইনষ্টাইন : পুকুরের জলে পাথর ফেললে জলে তরঙ্গ তৈরি হয়, সেই তরঙ্গ বেয়ে পাথরের গতি জলের মধ্যে ছড়িয়ে যায়। মহাশূন্যে কি জলের মতো কোনও মাধ্যম আছে? থাকার কি দরকার আছে? নেই, কেননা মহাশূন্য বা স্থানকাল নিজেই একটা মাধ্যম। রবারের মতো একে টেনে বড় করা যায়, আবার চেপে ছোটও করা যায়।

সাহা (অন্য কানে ফিসফিস করে) : শব্দ যখন হাওয়ার মধ্যে দিয়ে যায়, তখন হাওয়া যেমন প্রসারিত ও সঙ্কুচিত হয়, ঠিক তেমনই গ্র্যাভিটেশনাল এনার্জি যখন স্পেসটাইমের মধ্য দিয়ে যায়, তখন এই স্থানকালও একইভাবে প্রসারিত ও সঙ্কুচিত হয়।

আইনষ্টাইন : আর এই প্রসারণ-সঙ্কোচন থেকেই সৃষ্টি হয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গের।

এতক্ষণে ব্যাপারটা কিছুটা হলেও মাথায় ঢুকছে। স্থানকাল অনেকটা পিয়ানো অ্যাকর্ডিয়ানের মতো। তাকে টেনে বাড়ানো যায়, আবার চেপে ছোট করা যায়। বারবার পরপর টানা-চাপা করলে তরঙ্গ তৈরী হয়। এভাবেই তাহলে গ্র্যাভিটেশনাল এনার্জি যাতায়াত করে?

বোস (মাথা নেড়ে) : একদম ঠিক!

আইনষ্টাইন : কিন্তু এই তরঙ্গের মাত্রা অত্যন্ত ক্ষুদ্র হওয়া উচিত। যন্ত্রে ধরা পরা তো সোজা কথা নয়। সেটা কীভাবে হল?

প্রশ্ন করামাত্র হুউউস করে একটা আওয়াজ হল, আর বেশ গরম লাগতে লাগল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি, একটা সুদৃশ্য অফিসে বসে আছি। সামনে একটা বড় ডেস্ক, তার ওপর ল্যাপটপ, অন্য একটা ছোট টেবিলে একটা বড় আধুনিক ডেস্কটপ কম্পিউটার। এসি ঘর, ছিমছাম। বুঝলাম গেছোদিদি আমাদের বর্তমানে নিয়ে এসেছেন।

ডেস্কের ওপারে এক ছিমছাম সুপুরুষ ভদ্রলোক বসে আছেন। বয়স বছর পঞ্চান্ন হবে, যদিও দেখলে চল্লিশের বেশি মনে হয় না। চোখে চশমা, মুখে হালকা হাসি, কুচকুচে কালো চুল। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে আমাদের চারজনকে (প্লাস গেছোদিদিকে) অভিবাদন করলেন।

রায়চৌধুরী : আসুন আসুন, গেছোদিদির কাছ থেকে খবর পেয়ে আমি আপনাদের অপেক্ষাতেই ছিলাম। এটা পুণের ইন্টার-ইউনিভার্সিটি সেন্টার ফর অ্যাস্ট্রনমি অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোফিজিক্স। আমি এখানকার ডিরেক্টর, সোমক রায়চৌধুরী।

নামটা চেনা চেনা লাগল। আপনিই তো প্রেসিডেন্সির…

রায়চৌধুরী (দুঃখিত গলায়) : হ্যাঁ, প্রেসিডেন্সির পদার্থবিদ্যার ডিপার্টমেন্ট হেড ছিলাম। সে যাকগে… আজ আমার বড়ই সৌভাগ্য। বসুন বসুন। চা? কফি?

সাহা (বেশ অবাক হয়ে) : কিন্তু হঠাৎ এখানে…?

রায়চৌধুরী : লিগো।

বোস : লিগো?

রায়চৌধুরী : Laser Interferometer Gravitational-Wave Observatory (LIGO)। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই মানমন্দিরেই প্রফেসর আইনস্টাইনের গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভস ধরা পড়ে।

আইনষ্টাইন : আইনষ্টাইন, বিট্য। স্টাইন নয়। কিন্তু আমি— মানে, কীভাবে? এত উইক ওয়েভস…

রায়চৌধুরী : হ্যাঁ। বহু বছর ধরেই একে পাকড়াও করার চেষ্টা চলছে বটে। খুবই কঠিন কাজ, সন্দেহ নেই। আইনস্ট…থুড়ি, প্রফেসর আইনষ্টাইনের জীবিতকালে সেই প্রযুক্তিই তৈরি হয়নি। প্রফেসর সাহা, আপনারও—

বোস (হাত তুলে) : বুঝেছি। প্রযুক্তিটা কী? লেজার?

ওপরে : মহাকর্ষীয় তরঙ্গের রূপরেখা। মাঝে : লিগো (LIGO) কীভাবে কাজ করে তার রূপরেখা। তলায় : লিগো যেভাবে মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে ডিটেক্ট করে

রায়চৌধুরী (অবাক হয়ে, তারপর গেছোদিদির দিকে তাকিয়ে) : আই সী।

বোস : এটাও কিন্তু হের প্রফেসর বলে গিয়েছেন।

আইনষ্টাইন : লেজার? মানে স্টিমুলেটেড এমিশন?

রায়চৌধুরী : হ্যাঁ, আপনার ১৯১৭ সালের পেপার। লিগোতে লেজার ইন্টারফেরোমিটার ব্যবহার করা হয়েছে।

সাহা : দেখো ছোকরা, ইন্টারফেরোমিটার আমাদের সময়ে ছিল না বলছো? মিকেলসন আর মরলি তাহলে—

বোস : আঃ, নাদু, ও লেজার ইন্টারফেরোমিটারের কথা বলছে। অবশ্য ইন্টারফেরোমিটার কী জিনিস সেটা বোধহয় আমাদের সঙ্গী ঠিক জানেন না।

রায়চৌধুরী (আমার দিকে তাকিয়ে) : তার চেয়ে লিগো-টা কী সেটা আগে টুক করে বলে নিই? সেখান থেকেই স্পষ্ট হবে আশা করি। ২০০২ সালে আমেরিকার দুই প্রান্তে দু’টো যন্ত্র বসানো হয়। একটা ওয়াশিংটন রাজ্যের [[৮]] হ্যানফোর্ডে, অন্যটা তার ৩০০০ কিলোমিটার দূরে লুইজিয়ানা রাজ্যের লিভিংস্টোনে।

আইনষ্টাইন : এত দূরে কি যাতে একসঙ্গে…?

রায়চৌধুরী : ঠিক তাই। মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এতটাই ক্ষীণ, এবং তাকে খুঁজে পাওয়ার যন্ত্র এতটাই সেনসিটিভ, যে দূর থেকে একটা ট্রাক গেলেও সেই কম্পন যন্ত্রে ধরা পড়বে।

“সিজমোগ্রাফের মতো কিছু?” জিজ্ঞেস করলাম।

রায়চৌধুরী : না, ওর চেয়ে অনেক বেশি গোলমেলে। ছবিটা দেখছেন তো? ঘড়ির কাঁটার মত নব্বুই ডিগ্রী অ্যাঙ্গেলে দু’টো শাখা বেরিয়ে গেছে, প্রতিটার দৈর্ঘ্য ৪ কিমি। প্রত্যেক শাখার শেষে একটা করে আয়না আছে। কেন্দ্রটা যেখানে, মানে যেখানে শাখাদুটো মিলছে, তার একদিকে একটা লেজার আছে, অন্যদিকে একটা ফোটোডিটেক্টর। আলো পড়লে জানান দেওয়াই তার কাজ। একদম কেন্দ্রতে একটা বীম স্প্লিটার। লেজার বীমকে দু’ভাগে ভাগ করা বা দরকার মতো জুড়ে দেওয়াই তার কাজ।

সাহা : তার মানে দুই বাহু বরাবর দুটো ৪ কিমি লম্বা লেজার বীম…

আইনষ্টাইন : পার্ফেক্টলি সিনক্রোনাইজড কোহিরেন্ট আইডেন্টিকাল বীম…

বোস : একইসঙ্গে ডিটেক্টরে এলে…

রায়চৌধুরী : আলো বেড়ে যাবে, জানি। না, একটা বীমের ফেজ উল্টে দেওয়া হয়েছে। ১৮০ ডিগ্রী আউট অফ ফেজ। অর্থাৎ…

সাহা : সাধারণ ক্ষেত্রে ডিটেক্টরে কিছুই দেখা যাবে না, তাই তো?

রায়চৌধুরী : তাই।

বোস : কিন্তু, মহাকর্ষীয় তরঙ্গ এলে দুটো বাহুর দৈর্ঘ্য একটু হলেও পাল্টাবে। তাহলে আর ১৮০ ডিগ্রী থাকবে না…

আইনষ্টাইন (লাফিয়ে উঠে) : অর্থাৎ আলো দেখা গেলে বোঝা যাবে আমার অনুমান নির্ভুল!

সবাই হো হো করে হেসে উঠল। একটা ফোঁৎ-ফোঁৎ আওয়াজ শুনে পেছন ফিরে দেখি গেছোদিদিও হাসছে। কীভাবে হাসছে বোঝাতে পারব না, তবে হাসছে যে সন্দেহ নেই।

সাহা : দু’টো ডিটেক্টর রাখার কারণ যাতে ভূমিকম্প বা ট্রাকের যাতায়াত ইত্যাদির জন্য ভুল সিগনাল না পাওয়া যায়, তাই তো? সতু?

বোস : ৩০০০ কিমি মানে আলোর গতিতে ১০ মিলিসেকেন্ড।

সাহা : তার মানে দু’টো ডিটেক্টরে যদি একই সিগনাল আসে, এবং সেই সিগনালের মধ্যে সময়ের পার্থক্য থাকে ১০ মিলিসেকেন্ড…

বোস : অবশ্যই ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ বাদ দিয়ে…

সাহা : তাহলেই কেল্লা ফতে! হের প্রফেসর আইনষ্টাইনের অনুমান প্রমাণিত হবে।

রায়চৌধুরী : এবং হয়েওছে। ২০১৫ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর, সকার ১১:৫০ নাগাদ মার্কো ড্রেগো নামে এক পোস্ট-ডক জার্মানীর হ্যানোভারে একটা ইমেল পায়। ইমেলটা এসেছিল হ্যানফোর্ড ও লিভিংস্টোনের ডিটেক্টরগুলো থেকে। তলায় ছবিটা।

“ইমেলটা কে পাঠিয়েছিল?” জিজ্ঞেস করলাম।

ওপরে : লিগোর হ্যানফোর্ড ডিটেক্টরে যে সিগনাল ধরা পড়ে। মাঝে : লিগোর লিভিংস্টোন ডিটেক্টরে যে সিগনাল ধরা পড়ে। তলায় : দুটো সিগনালকে এক করলে বোঝা যায়, দুটোর উৎপত্তি একই স্থান, একই ঘটনা থেকে

রায়চৌধুরী : অটোম্যাটিকালি জেনারেটেড। কোনও অদ্ভুত ব্যাপার হলে যন্ত্রই ইমেল পাঠায়।

বোস : এই তো, স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, গ্র্যাভিটি ওয়েভস!

রায়চৌধুরী : না, কিন্তু ব্যাপারটা অতটা সোজা নয়। এর পর অনেক পরীক্ষা করতে হয়েছে, এটা ভুলভাল সিগনাল কিনা সেটা দেখতে হয়েছে। মোটকথা অনেক ঝামেলার পর শেষে ২০১৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী অ্যানাউন্স করা হয়।

সাহা : এই তরঙ্গগুলো সৃষ্টি হয়েছে কীভাবে?

রায়চৌধুরী : দুটো কৃষ্ণগহ্বর থেকে।

আইনষ্টাইন (ফের উত্তেজিত হয়ে) : ব্ল্যাক হোল? সো আই ওয়াজ রাইট! ইখ হাট্টে রেখ্ট!

রায়চৌধুরী : হ্যাঁ, এই দু’টো ব্ল্যাকহোল একে অপরকে প্রদক্ষিণ করতে করতে শেষে এক হয়ে যায়। ব্ল্যাকহোলের গ্র্যাভিটি প্রচণ্ড, তাই এতে সেরকম শক্তিমান তরঙ্গও সৃষ্টি হয়।

বোস : শক্তিমান বলতে? কতটা শক্তি?

রায়চৌধুরী : গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে প্রতি সেকেন্ড যতটা শক্তি ক্ষয় হচ্ছে, তার ৫০ গুণ।

সাহা : হুম। আর এতে বাহুর দৈর্ঘ্য ঠিক কতটা বাড়ল বা কমল?

রায়চৌধুরী : পরমাণুর নিউক্লিয়াসের ব্যাসের হাজার ভাগের এক ভাগ।

আমি তো থ! বলে কী? চার কিলোমিটার লম্বা দুটো শাখা, তার দৈর্ঘ্যের—

বোস : ০.০০০০০০০০০০০০০০০০০০০২৫ %। ডেসিমালের পরে উনিশটা শূন্য।

আমি ধপ করে বসে পড়তে গিয়ে বুঝলাম, বসেই ছিলাম।

সাহা : ব্ল্যাকহোল দু’টো কতদূরে ছিল?

রায়চৌধুরী : পৃথিবী থেকে মোটামুটি এক বিলিয়ন লাইট ইয়ার দূরে। অর্থাৎ প্রায় ১০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০০ কিমি দূরে। একের পরে বাইশটা শূন্য।

আমি চেয়ারে আরেকটু লেতিয়ে গেলাম।

বোস : তার মানে এবার বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে চেনার জন্য আমাদের হাতে একটা নতুন হাতিয়ার এল।

সাহা : তা তো বটেই। আলো, এক্স-রে, গামা রে সবই তড়িৎচুম্বকীয় তরঙ্গ। এ দিয়ে তো আর ডার্ক ম্যাটার বা ডার্ক এনার্জির খোঁজ পাওয়া যায় না, তাই না?

রায়চৌধুরী (মিচকি হেসে) : সে তো বটেই। ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ দিয়ে শুধু কাজ করলে ইউনিভার্সের অনেকটাই আমাদের সামনে আড়াল হয়ে থাকে। কিন্তু এখন সব উন্মুক্ত। উদার!

আইনষ্টাইন (উঠে দাঁড়িয়ে সোমক রায়চৌধুরীর হাতটা ধরে জোরে ঝাঁকিয়ে) : তোমার জেনারেশনের বৈজ্ঞানিকদের আমার ধন্যবাদ! দুর্ধর্ষ অবিশ্বাস্য একটা কাজ করেছ তোমরা। ডাঙ্কেশয়েন!

রায়চৌধুরী (বিগলিত হয়ে) : থ্যাঙ্ক ইউ! আমার জেনারেশনের হয়ে আপনার আশীর্বাদ মাথা পেতে নিচ্ছি।

বোস : এই লিগো আবিষ্কারে ভারতবর্ষের কোনও ভূমিকা ছিল না?

রায়চৌধুরী : ছিল বৈকি। ফিজিকাল রিভ্যু লেটারে যে মূল পেপারটি বেরোয়, তাতে ন’টি ভারতীয় প্রতিষ্ঠান থেকে মোট সাঁইত্রিশজন ভারতীয় বৈজ্ঞানিক কো-অথার ছিলেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য― সঞ্জীব ধুরন্ধর, সিভি বিশ্বেশ্বর ও বালা আইয়ার।

সাহা : আর বাঙালি?

রায়চৌধুরী (হেসে) : কলকাতার আইজারের দু’জন― ডঃ রাজেশ কুম্বলে নায়ক এবং শ্রীমতী অনুরাধা সমাজদার।

আইনষ্টাইন : আর আপনি?

রায়চৌধুরী (একটু লজ্জা পেয়ে) : আমি ইন্ডিগোর লোক।

সবাই (অবাক হয়ে) : ইন্ডিগো?

রায়চৌধুরী : IndIGO বা Indian Initiative in Gravitational-wave Observations। সবকিছু ঠিকঠাক চললে ২০২২ সালের মধ্যে ভারতের মাটিতেও মহাকর্ষীয় তরঙ্গ খোঁজা শুরু হয়ে যাবে।

আইনষ্টাইন : খুবই ভালো খবর! আই লুক ফরওয়ার্ড টু দ্যাট। প্রফেসর রায়চৌধুরী, লিগোর ব্যাপারটা বোঝানোর জন্য ফের ডাঙ্কা। সাহা, বোস, তোমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগল। প্রুশিয়ান অ্যাকাডেমিতে আমার সেমিনারটা বাকি আছে। ওটা শেষ না করলে এতসব—

বলতে না বলতেই পট করে শব্দ হল, দেখলাম আইনষ্টাইন নেই। গেছোদিদি মুচকি মুচকি হাসছেন।

সাহা : প্রফেসর রায়চৌধুরী, বাংলার, ভারতের ও বিজ্ঞানের ভার আপনার জেনারেশনের ঘাড়েই থাকল তাহলে। সতু?

বোস (আমার দিকে ফিরে) : আসি তাহলে। খুব ভালো লাগল। কিছু না বুঝলে গেছোপোস্ট করবেন, কেমন?

পট! পট!

প্রফেসর রায়চৌধুরী আমার দিকে ফিরে হেসে বললেন, “ভাবা যায়? মেঘনাদ সাহা, সত্যেন বসু, আর অ্যালবার্ট আইনস্টা…আইনষ্টাইনের কাছ থেকে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শিখলেন? আপনি তো ভাগ্যবান লোক মশাই। চা চলবে তো?”

সবই জিওমেট্রির দয়া!

প্রান্তটীকা

[[১]] : সাইমন অ্যান্ড গার্ফাঙ্কালের পল সাইমন। “সাউন্ড অফ সাইলেন্স” গানের গীতিকার।

[[২]] : নাঃ। হারুকি মুরাকামিও পেলেন না। পেলেন আরেক জাপানী, কাজুও ইশিগুরো। “দ্য রিমেইন্স অফ দ্য ডে” তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস।

[[৩]] : গেছোদাদা রিটায়ার করেছেন। ফ্যামিলি বিজনেস গেছোদিদি সামলাচ্ছেন।

[[৪]] : আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি ও অন্যান্য পেপার জার্মান ভাষায় লেখা হয়েছিল। পৃথিবীতে প্রথম তার ইংরিজি অনুবাদ করেন মেসার্স সাহা এন্ড বোস, ১৯১৯ সালে।

[[৫]] : গতিজাড্য = momentum; গতিশক্তি = kinetic energy

[[৬]] : গতিজাড্যের নিত্যতা সূত্র = Law of conservation of momentum; শক্তির নিত্যতা সূত্র = Law of conservation of energy

[[৭]] : মনে রাখতে হবে, এটা ১৯১৯ সাল। হাইড্রোজেন ফিউশন হয়েই যে তারারা “জ্বলে”, সেটা লোকে এখনও জানে না।

[[৮]] : ওয়াশিংটন আর ওয়াশিংটন ডিসি আলাদা। প্রথমটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিমে একটা রাজ্য, অন্য পুবে একটা শহর, দেশের রাজধানী। ডিসি মানে ডিস্ট্রিক্ট অফ কোলাম্বিয়া।

তথ্যসূত্র

(1) Nobel Prize in Physics 2017 :https://www.nobelprize.org/nobel_prizes/physics/laureates/2017/press.html

(2) IndIGO :https://en.wikipedia.org/wiki/Indian_Initiative_in_Gravitational-wave_Observations

(3) LIGO :https://en.wikipedia.org/wiki/LIGO

(4) Gravitational Wave Detection Heralds New Era :http://www.skyandtelescope.com/astronomy-news/gravitational-wave-detection-heralds-new-era-of-science-0211201644/

(5) Gravitational Waves and Experimental Tests of General Relativity (by Kip Thorne) :http://www.pmaweb.caltech.edu/Courses/ph136/yr2012/1227.1.K.pdf

(6) Einstein’s waves win Nobel Prize in physics :http://www.bbc.com/news/science-environment-41476648

(7) A Brief History of Gravitational Waves :https://arxiv.org/pdf/1609.09400.pdf

(8) Gravitational waves: breakthrough discovery after a century of expectation :https://www.theguardian.com/science/2016/feb/11/gravitational-waves-discovery-hailed-as-breakthrough-of-the-century

ছবিসূত্র

Header : Einstein and GravWaves : http://s.hswstatic.com/gif/now-J2b6iiIO-gravitationalwavesjpg-1210-680.jpg

How LIGO Works :https://www.theguardian.com/science/2016/feb/11/gravitational-waves-discovery-hailed-as-breakthrough-of-the-century

LIGO observation of gravitational waves :https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/thumb/d/db/LIGO_measurement_of_gravitational_waves.svg/1211px-LIGO_measurement_of_gravitational_waves.svg.png

Gravitational Waves and Gravity :http://image.guardian.co.uk/sys-images/Observer/Pix/pictures/2012/04/14/guGravwaves.jpg

LIGO measurement of gravitational waves :https://www.ligo.caltech.edu/system/avm_image_sqls/binaries/45/jpg_original/ligo20160211a.jpg?1455158181

Spacetime Curvature :https://www.ligo.caltech.edu/system/avm_image_sqls/binaries/49/jpg_original/ligo20160211e.jpg?1455160282

Blackholes Collapsing (Artist’s conception) :https://www.nasa.gov/sites/default/files/thumbnails/image/ns_gw_art.jpg

Water drop waves :https://cdn.pixabay.com/photo/2016/10/22/03/35/water-1759703_960_720.jpg

Sound waves :https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/thumb/8/82/CPT-sound-physical-manifestation.svg/2000px-CPT-sound-physical-manifestation.svg.png

Light Waves :https://i.stack.imgur.com/KBaHl.png

Meghnad Saha :https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/thumb/2/27/SahaInBerlin.jpg/220px-SahaInBerlin.jpg

S N Bose :https://upload.wikimedia.org/wikipedia/commons/f/fe/SatyenBose1925.jpg

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3248 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

5 Comments

  1. খুব সুন্দর করে মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে বোঝানো হয়েছে৷ বলার ভঙ্গীটাও চমৎকার৷ এরকম জটিল বিষয় সহজবোধ্য ঢঙে উপস্থাপন করা রীতিমত কঠিন কাজ৷ খালি ঐ রবারের শীট দিয়ে স্পেসটাইম জিওমেট্রির ডেমনস্ট্রেশন নিয়ে আমার একটু আপত্তি আছে, যদিও জেনারেল রিলেটিভিটি সংক্রান্ত পপুলার লেখায় এই উপমাটির ব্যবহার বহুল প্রচলিত৷ মার্বেলগুলো কাঁচের পেপারওয়েটের দিকে চলে গেল তার কারণ কিন্তু এটা নয় যে চাদরটা বক্রতল হয়ে গেছিল৷ এই ঘটনার জন্য দায়ী পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ বল, যেটাকে পেপারওয়েট, মার্বেল আর রবারের শীট নিয়ে গঠিত সিস্টেমের সাপেক্ষে এক্মটার্নাল ফোর্স বলতে পারি৷ সূর্যের চারদিকে গ্রহসমূহের গতি ব্যাখ্যা করারজন্য এধরণের কোন এক্সটার্নাল ফোর্সের প্রয়োজন পড়ে না৷

    • হয়ত ব্যাপারটা অামি ভাল করে ব্যাখ্যা করতে পারিনি। অাইনষ্টাইনের তত্ত্ব অনুযায়ী, অন্তত যতটা অামি বুঝেছি, মাধ্যাকর্ষণ বল ও স্থানকালের বক্রতা একটা সমীকরণের দু’দিক মাত্র। অাইনষ্টাইনের ফীল্ড ইকুয়েশন মনে করুন : বাঁদিকে রিকি কার্ভেচ্যর টেন্সর R_{\mu \nu} ও মেট্রিক টেন্সর g_{\mu /nu}, অন্যদিকে গ্র্যাভিটেশনাল কনস্টান্টের সঙ্গে স্ট্রেস-এনার্জি টেন্সর G T_{\mu \nu}। বাঁদিকে দুটো টার্মই জিওমেট্রিক প্রপার্টি অফ স্পেসটাইম, ডানদিকেরটা মাধ্যাকর্ষণ বল (GMm মনে করুন)। বাঁদিকটা নন-জিরো হলে গ্র্যাভিটি অাছে, জিরো হলে নেই, অ্যান্ড ভাইসি-ভার্সা।

      এবার অাসি রবারের শীটে। হ্যাঁ, উদাহরণটা প্রায় সমস্ত পপুলার সায়েন্সের লেখাতেই অামরা পাই। তার কারণ এইভাবে বক্রতা ও মাধ্যাকর্ষণ বোঝানো সহজ। টাইম-টেস্টেড বলতে পারেন। মার্বেলগুলো যে পেপারওয়েটের দিকে যাচ্ছে, তার কারণ অবশ্যই পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ; ISS-এ গেলে এটা কখনই হবে না। এটা এক ধরণের ডেমনস্ট্রেশন, যা থেকে বোঝানোর চেষ্টা হচ্ছে কীভাবে মহাশূন্যে R_{\mu \nu} – (1/2) R g_{\mu \nu} + \Lambda g_{\mu \nu} = (8 \pi G / c^4) T_{\mu \nu} সমীকরণটাকে ভাবা যেতে পারে।

      • না না আপনি খুবই সুন্দরভাবে বুঝিয়েছেন পুরো বিষয়টা৷ খালি ঐ রবারের চাদরের উপমাটা থেকে সাধারণ পাঠকের ভুল বোঝার অবকাশ থেকে যায় বলে আমার ব্যক্তিগত মত৷

        • মুশকিল হচ্ছে, মানুষের পক্ষে ত্রিমাত্রিক কিছু কল্পনা করাটাই খুব একটা সহজ কাজ নয়। চতুর্মাত্রিক তো একেবারেই নয়। ত্রিমাত্রিক কল্পনা যদি করাও যায়, তাহলে সেই ত্রিমাত্রিক ম্যানিফোল্ডে বক্রতা বোঝানো ভগবানের জ্যাঠামশাইয়েরও অসাধ্য। এডউইন অ্যাবটের “ফ্ল্যাটল্যান্ড” বইতে যেমন দ্বিমাত্রিক বিশ্বব্রহ্মান্ড ব্যবহার করে বহু জ্যামিতিক ও পদার্থবিদ্যার তথ্য ও তত্ত্ব বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই, স্থান-কালের বক্রতা বোঝাতে সাধারণত রবারের শীটের উদাহরণই ধরা হয়। তবে কী, ক্লাসরুমে বোঝাতে গেলে (বা ইউটিউব ভিডিওতে) চোখের সামনে রবারের শীটটা দেখা যায়, এবং যিনি বোঝাচ্ছেন তিনিও হাত নেড়ে বুঝিয়ে দেন যে রবারের শীট ব্যাপারটা অাসলে কীসের প্রতীক। সেটা লেখাতেও বোঝানো সম্ভব বৈকি, কিন্তু তার জন্য ছবি-ডায়াগ্রাম ইত্যাদি লাগবে। তাই অতনুবাবু, অামার উত্তর হল, পরের এডিশনে শুধরে নেব। 🙂

আপনার মতামত...