প্রশাসন, সংবিধান ও আজাদির মহোৎসব

অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 



গদ্যকার, প্রযুক্তিবিদ্যায় স্নাতকোত্তর

 

 

 

 

অনেককাল আগে আমাদের দেশের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশেষ একটি বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছিলেন, “আপ ক্রনোলজি সমঝিয়ে”। সময়ানুসারে ঘটে চলা কিছু ঘটনাকে, সময়ানুবর্তীভাবে বুঝে দেখতে বলেছিলেন। অথচ সময়, ইতিহাস, এবং সংখ্যা— বর্তমান সরকারের পক্ষে ভারী অপছন্দের জিনিস। সংখ্যা বস্তুটি অথবা সংখ্যাতত্ত্বের বিষয়টি বারেবারেই এই সরকারকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

আমাদের দেশে এখন উৎসবের মরসুম। স্বাধীনতার ৭৫তম বর্ষ উদযাপন আসন্ন। এছাড়াও এদেশে এখন দিবসের ছড়াছড়ি। সংবিধান দিবস থেকে শুরু করে স্বচ্ছতা দিবস, যোগ দিবস, একতা দিবস, আরও কত নতুন দিবসেরই যে ইদানীং কালে ঘোষণা হয়েছে, তার ইয়ত্তা মিলছে না। সংবিধান ও দেশপ্রেমের বিষয়ে আমাদের দেশের মাননীয় সরকারের প্রতিনিধি-বাহাদুরেরাও তো সকলেই এখন অধিক মাত্রাতে সচেতন হয়ে উঠেছেন। প্রধানসেবক তো বলেই দিয়েছেন, গত আট বছরে নাকি তাঁদের সরকার এমনই কাজ করেছে, যে লজ্জায় কখনও এই দেশকে কারও কাছে মাথা ঝোঁকাতে হয়নি। এছাড়াও সংবিধানের প্রধান রক্ষক ও সমর্থক হিসেবে তাঁদের সরকার যে নিরন্তর প্রয়াস জারি রেখে চলেছে এই বিষয়েও প্রচারের কোনও বিরাম নেই। সংবিধানের সুরক্ষা ও গৌরব নিয়ে খালি এই বিরোধীদেরই যত হট্টগোল। সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও সংবিধান-কর্তৃক নির্দিষ্ট ‘জাতীয়’ কর্তব্য পালনে এই সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তা অবিশ্যি সংখ্যালঘু রাজ্যসভাতে মার্শাল ডাকিয়ে এনে বিরোধীদের একাংশকে কার্যত বলপূর্বক বাইরে পাঠিয়ে ধ্বনিভোটের মাধ্যমে কৃষিবিল পাশ করানোর সময়েতেই বোঝা গিয়েছিল, এবং আমাদের বিরোধী দলগুলিরও ভয়ানক ‘ঐক্যবদ্ধ-জোটবদ্ধ’, বিজেপিই প্রধান ও একমাত্র শত্রু-মার্কা, ‘দুর্ধর্ষ’ চেহারাটিও ঠিক তখনই প্রস্ফূটিত হয়েছিল— কিন্তু সে অন্য প্রসঙ্গ। সংখ্যা ও তথ্যের নিরিখে আমাদের দেশের সংবিধান ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার চেহারাটি এখন ঠিক কোন জায়গাতে দাঁড়িয়ে, তা একটিবারে ফিরে দেখা যাক চলুন।

আলোচনার প্রয়োজনে কয়েকটি সাল-তারিখ জানিয়ে দিই— ২০০৪ সাল থেকে ২০০৯ সাল অবধি আমাদের দেশে চতুর্দশ লোকসভার মেয়াদ জারি ছিল, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৪ সাল অবধি ছিল পঞ্চদশ লোকসভার কার্যকাল, এবং এই নিয়মেই ২০১৪ থেকে ২০১৯ ও ২০১৯ থেকে বর্তমান কাল অবধি যথাক্রমে ষোড়শ ও সপ্তদশ লোকসভার কার্যকালের মেয়াদ জারি রয়েছে।

আমাদের আইনসভা দুটিতে কোনও প্রস্তাবিত বিলকে কখনও আইন হিসেবে পাশ করাতে গেলে মূলত যে পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় সেটি অনেকাংশে এইরকম— বিলটি কোনও সদস্যের মাধ্যমে প্রস্তাবিত হওয়ার পর তার গুরুত্ব ও পরিসর বুঝে নির্দিষ্ট কিছু স্ট্যান্ডিং কমিটি থেকে তার প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকরিতাকে যাচাই করিয়ে আনা হয়। এর পরবর্তীতে সেটিকে লোকসভা ও রাজ্যসভার সদস্যদের কাছে বিবেচনার জন্য পেশ করা হয়ে থাকে। স্ট্যান্ডিং কমিটিতে যাচাই করিয়ে আনার সময় এই বিলটির বিষয়ে কমিটির সদস্যের অভ্যন্তরে স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘ আলোচনা হয়ে থাকে এবং নানা সংশোধন, পরিমার্জন অথবা প্রস্তাবের মাধ্যমে তার গুণগত মানকে আরও বাড়িয়ে তোলার বিষয়ে একটা প্রচেষ্টা থেকে যায়। সংবিধানের প্রবর্তক ও সেই সময়ের জনপ্রতিনিধিরা কিছুটা হলেও এই উদ্দেশ্যেই এমন নীতি বা কার্যাভ্যাসকে প্রণয়ন করেছিলেন। পঞ্চদশ লোকসভার তথ্য অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, সদস্যদের দ্বারা প্রস্তাবিত বিলের ৭১ শতাংশকেই এই পদ্ধতি মেনে স্ট্যান্ডিং কমিটির মাধ্যমে বিবেচনার জন্য ঘুরে আসতে হয়েছিল। ষোড়শ লোকসভার আমলে কোনও বিলকে স্ট্যান্ডিং কমিটির মাধ্যমে যাচাই করিয়ে আনার ক্ষেত্রে সংখ্যাটি কমে দাঁড়িয়েছে ২৭ শতাংশে। বর্তমান লোকসভায় তা মাত্রই ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ কিনা সদস্যসংখ্যার গা জোয়ারিতে যে কোনও প্রস্তাবিত বিলকেই আইন হিসেবে পাশ করিয়ে আনাটা এখন কার্যত এই সরকারের কাছে ছেলেখেলায় পর্যবসিত হয়েছে। তার জন্য কোনও আলোচনা, অথবা বিলগুলির ক্ষেত্রে সেগুলির কোনও গুণাগুণ বিচারেরও নূন্যতম প্রয়োজন পড়ছে না। একেও কি তবে আমরা এক-ব্যক্তি-নির্ভর, একদলীয় শাসন বলে সমালোচনা করব না?

এভাবে কেবল সংখ্যার জোরে একের পর এক বিলকে আইনে রূপান্তর করাই নয়, সংবিধানের ১২৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমাদের সরকারকে কেবলমাত্র তখনই অর্ডিন্যান্স প্রয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়েছে যখন কিনা তা কেবলই অত্যন্ত জরুরি কোনও বিষয় অথবা তাৎক্ষণিক কোনও প্রশাসনিক প্রয়োজনের ভিত্তিতে জারি করা দরকার বলে সরকার মনে করবে। ২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ সালের এই সময়কালের ভিতরে জারি করা অর্ডিন্যান্সের সংখ্যা ছিল ৬১, বছরে গড়ে ৬টি করে অর্ডন্যান্স জারি করা হত। ২০১৪ থেকে ২০২২, আজকের সময় অবধি এই সরকারের তরফে জারি করা অর্ডিন্যান্সের মোট সংখ্যা ৮০, গড়ে বছরে ১০টি করে এমন পদক্ষেপ। সত্যি করেই যদি বা বলতে হয়, মোদি-শাহের নেতৃত্বে একেবারে ফাস্ট ফরোয়ার্ড মোডেই এগিয়েছে আমাদের দেশ। ৭৫এর স্বাধীনতার এক রুদ্ধশ্বাস উদযাপন!

বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে, এমনতরো অভিযোগ মাঝেমধ্যেই আমরা শুনতে পাই। সংসদের ভিতরে (বা বাইরে) বিরোধী ঐক্য থাকুক বা না থাকুক, পর্যাপ্ত সংখ্যায় বেশ কিছু সদস্য সংসদে রয়েছেন। আমাদের সরকার কি দরকারি সমস্ত বিষয়েই আলোচনায় আগ্রহী? তথ্য কী বলছে? তথ্য বলছে চতুর্দশ ও পঞ্চদশ লোকসভার সময় যেখানে বিভিন্ন বিষয় মিলিয়ে মোট ১১৩টি স্বল্প সময়ের আলোচনা করা হয়েছিল, ষোড়শ ও সপ্তদশ লোকসভার সময়ে সেই সংখ্যাটি কমে দাঁড়িয়েছে ৪২। বিভিন্ন মন্ত্রকের মন্ত্রীদের উদ্দেশ্যে দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাবের সংখ্যা চতুর্দশ ও পঞ্চদশ লোকসভার আমলে ছিল ১৫২টি, ষোড়শ ও সপ্তদশ লোকসভার আমলে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৭। আলোচনার কোনও অবকাশই নেই কোথাও। প্রধানসেবক বিরামহীন চিত্তে দেশমাতৃকার চরণে নিজেকে সঁপে দিয়েছেন, কাজেই বিকাশেরও বুলডোজার চলছে রোজ। লোকসভা অথবা রাজ্যসভাতে (লোকসভার রুল বুক অনুযায়ী নিয়ম ৫৫, ও রাজ্যসভার রুল বুক অনুযায়ী নিয়ম ৬০ অনুসারে) আধঘন্টা অথবা তার চেয়েও বেশি সময়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনও বিষয়কে নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। চতুর্দশ ও পঞ্চদশ লোকসভার আমলে ২১টি এমন আলোচনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিগত দুটি লোকসভার আমলে এই সংখ্যাটিও ক্রমশ কমতে কমতে একেবারে ৫-এর কোঠায় এসে দাঁড়িয়েছে। সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে মত আদানপ্রদানের ক্ষেত্রে এক (নি)দারুণ উদাহরণই বটে। ২০০৪ সাল থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে সংসদের বিভিন্ন আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রক অথবা মন্ত্রীদের তরফে দেওয়া নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ও নির্দেশগুলির মধ্যে ৯৯.৩৮ শতাংশই কার্যকর করা হয়েছিল। বিগত দুটি লোকসভার ক্ষেত্রে এই প্রতিশ্রুতি পালনের হার যথাক্রমে ৭৯ শতাংশ ও ৩০ শতাংশে নেমে এসেছে।

ভক্তেরা প্রশ্ন করতেই পারেন এই সমস্ত তথ্যের উৎস কী? কোন দস্তাবেজ থেকেই বা আমি এমন সমস্ত সংখ্যাকে উদ্ধৃত করে চলেছি। তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাইব, কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে প্রকাশিত ‘স্ট্যাটিস্টিক্যাল হ্যান্ডবুক ২০২১’-এর তথ্যভাণ্ডার থেকেই এই সমস্ত তথ্যের বিষয়ে হিসেব পাওয়া গিয়েছে। কাজেই নেহরুজির প্রেতাত্মাকে বোধহয় এই সমস্ত বিষয়গুলির ক্ষেত্রেও আগাগোড়া দোষারোপ করাটা ‘সাংবিধানিকভাবে’ সমীচীন হবে না কোনওভাবেই…

প্রথা অনুযায়ী লোকসভায় ডেপুটি স্পিকার হিসেবে একটি পদ নির্দিষ্ট রয়েছে, এবং সাধারণভাবে ঐতিহ্য ও অভ্যাসের দিক থেকেও বর্ষীয়ান কোনও বিরোধী সাংসদকে এই দায়িত্বভার দেওয়া হয়ে থাকে। অন্যান্য সকল লোকসভার ক্ষেত্রে এতদিন অবধি এই অভ্যাসটিই নিয়ম হিসেবে পালিত হয়ে এলেও, নয়া ভারতে বিগত তিনবছর ধরে ডেপুটি স্পিকারের আসনটি খালিই থেকে গিয়েছে। কংগ্রেস অন্ধপ্রদেশের একটি রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণ দেখিয়ে সেই পদটিকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে এসেছে। বিজু জনতা দলের কোনও প্রতিনিধিকে প্রাথমিকভাবে পদটি দেওয়ার কথা ভাবলেও, পরবর্তীতে ওড়িশার রাজ্য-রাজনীতিতে বিজেপির সঙ্গে তাদের দূরত্ব বাড়তে থাকায় পদটি তাদেরকে ‘দেওয়া যায়নি’। অন্যান্য বিরোধী দলগুলির ক্ষেত্রেও সরকার উদাসীন হয়ে থেকেছে। সাংবিধানিক সমস্ত ঐতিহ্য, প্রথা, নিয়মকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে বর্তমানে এই সরকার যে চরম একেকটি অগতান্ত্রিক দৃষ্টান্তকে প্রকাশ্যে স্থাপন করে ফেলেছে এবং নিয়মিতভাবেই তা করে চলেছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের গণতান্ত্রিক কাঠামোটি যে ভিতরে ভিতরে কতখানি দুর্বল হয়ে দাঁড়াবে সেই কথাকে ভাবতে গিয়েও শিউরে উঠি এখন।

সংসদ ভবনের অভ্যন্তরে সাংবাদিকদের ঘোরাফেরার ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ জারি হয়ে রয়েছে। অথচ এই সংসদ ভবনেই, নিজের মন্ত্রকের বিষয়ে কোনও প্রশ্ন না থাকলেও, কোয়েশ্চেন হাওয়ারে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর উপস্থিতিও একসময়ে নিত্যদিনকার স্বাভাবিক ঘটনা বলেই বিবেচিত হতে পারত। আর এখন! প্রধানমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলন— এই শব্দবন্ধটিই গত আট বছর যাবৎ মিউজিয়মের সুদৃশ কোনও শোকেসেই ঠাঁই করে নিতে পেরেছে। ঘাড় ঘোরালেই কেবল শুনতে পাওয়া যাচ্ছে, “কোনও প্রশ্ন নয়!”

ফুটনোটে বলতে চাইব, ফ্যাসিস্ট এই সরকার যে অবিরত প্রচেষ্টার মাধ্যমে আমাদের দেশের সংবিধান ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে তিলে তিলে অবলুপ্তির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তা বোধ করি আজ আর আমাদের কাছে কোনও অস্বাভাবিক তথ্য নয়। কিন্তু চিন্তার বিষয়টি হল, এই অবনমন রাতারাতি ঘটেনি। বিরোধী দলগুলির মধ্যকার যে অনৈক্য, তাকে সুকৌশলে ব্যবহার করেই কিন্তু আজকের এই পরিস্থিতি তৈরি করা গেছে। বৃহত্তর বিরোধী আন্দোলন তো দূরে থাক, সামান্য সংসদ ভবনের অভ্যন্তরেও বিরোধী ঐক্যের ছিঁটেফোঁটাও কারও নজরে আসছে না। সামাজিক মাধ্যমে সুললিত বাণী বিতরণ-ভিন্ন তাঁদের লড়াইয়ের আর বড় কোনও একটা চিহ্নও কোথাও দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। একথা তাদেরও মনে রাখা উচিত, ট্যুইটারের হ্যাশট্যাগে সংবিধানের গুরুত্ব প্রচার করা চলে, তাকে রক্ষা করা চলে না। ঐক্য এবং সার্বিক গণআন্দোলন ভিন্ন এই সংবিধান অথবা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সদর্থে রক্ষা করারও কোনও উপায় আর অবশিষ্ট আছে বলে তো মনে হচ্ছে না কারও। দেশের স্বার্থে, সংবিধানের স্বার্থে ঐক্যেরই বড় প্রয়োজন এখন। কেউ কি সেকথা আমাদের বিরোধী নেতৃবৃন্দকে কোনওভাবে স্মরণ করিয়ে দেবেন?


ঋণ স্বীকার: দ্য লিফলেট

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...