শহিদবেদি

সাধন দাস

 

মাঝে মাঝে ফদেচাচার নেড়িকুত্তা হতে সাধ যায়। যখন শহরের রাস্তায় পেট্রলের গন্ধ ছড়িয়ে মটরগাড়ি ছোটে, ফদেচাচার নেশা হয়। নেড়িকুত্তা আর ফদেচাচা গন্ধওয়ালার পেছনে দৌড়োয়, পারলে কামড়ে দেয়। ঘেউ ঘেউ চিল্লিয়ে দুজনে শহিদবেদির মোড় ফাটিয়ে ফেলে। পেট্রোবাবুদের কেউ, কোনওদিন নেড়ির পেটে লাথি মেরেছিল। খালি পেটে লাথি হজম হয়নি। রাগে গরগর করে। মটরবাইক, চারচাকার গন্ধ পেলেই ছুটে যায়। ফদেচাচারও পেট খালি। পেটের মধ্যে খিদে গরগর করে। ক্রুদ্ধ চাচা এবং নেড়ি ঘেউ ঘেউ করে ডাকে, ডাকতে ডাকতে ছুটে যায় পেট্রল গন্ধের পিছনে। গাড়ি অনেক দূর চলে গেলে, দুজনে গলা উঁচু করে তারস্বরে ডাকে— ঘে…উউউ ঘেউ..উউউউ…

পথচলতি মানুষ অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। তখন ফদেচাচা কুকুর থেকে মানুষ হয়ে ওঠে, আর হাত পাতে। কেউ চাচার হাতে টাকাটা সিকেটা ধরে দেয়। কেউ ঘেন্নার ছ্যাপ ছুড়ে চলে যায়। তবু চাচা হাসে। বুকের ভিতর পেট্রলের আগুন জ্বলে। আগুনের কান্না প্রতিবাদ জানায়— কেঁ…উ…কেঁ…উ..

ফদেচাচা হরবোলা।

বটের ছায়ায় শহিদবেদির মোড়। বেদির দু ধাপ উপরে শ্বেতপাথরের মেঝে। মাঝখানে একটা নকল বন্দুক দাঁড় করানো। বন্দুকের মাথায় মিলিটারি টুপি। সৈনিকের কোনও মূর্তি নেই। দেখলে মনে হয়, সৈনিক ঘাড় হেঁট করে দাঁড়িয়ে আছে। দেশ পাহারার যুদ্ধে মৃত এবং একটু ক্লান্ত। হাজার মহানব্রতী হোক, মানুষ তো! ক্ষুধা ক্লান্তি তাবৎ প্রাণীরই থাকে। টুপিতে মুখখানা আড়াল করে যেন এক পলক ঝিমিয়ে নিচ্ছে। যেমন ফদেচাচা, বন্দুকের নিচে বসে নেড়িকুত্তার মতো গোল পাকিয়ে যখন জিরোয়, মানুষ বলে কেউ গ্রাহ্যই করে না।

বেদির ঠিক নিচে, প্রথম ধাপে ছড়িয়েছিটিয়ে হরেকদাদার দোকান। বাবা ছেলে নাতি এ-গঞ্জে তিনপুরুষের দাদা হরেক। ছ-ঘরে ময়দানের মুখে লম্বা লাঠি হাতে ব্যবসা করে, স্বাধীনতার দিন থেকে, চল্লিশ বছর, হরেক ব্যবসা।

সে এমন ভয় জীবনে পায়নি। রাস্তার ধারে ফেলে ছড়িয়ে আজকাল বিক্রি করে বিডি মাল। ব্যাখ্যা করে বলে, বিডি মানে বাংলাদেশি চোরাই বর্ডার ভায়া আমেরিকান সেকেন্ডহ্যান্ড শার্ট প্যান্ট কোট সোয়েটাআআআর। কেউ বলে, মরা মেমসাহেবদের ড্রেস। ড্রেসের ভিতরে, মেমসাহেবদের ভূতপেত্নিরা বাস করে। সক্কালবেলা, চারে মানে দোকানে, দু-চারটে মুরগি মানে খরিদ্দার জমতে শুরু করেছে। হরেকদাদা লম্বালাঠির আগায় জংলিছাপা মিলিটারি প্যান্টখানা শূন্যে তুলে খরিদ্দারকে বোঝাচ্ছে, এটা খোদ গোলা-বারুদের কারখানা থেকে সদ্য বেরিয়েছে। এখনও ধোঁয়ার গন্ধ লেগে আছে। ঠিক তখনই গর..র..র..র ঘ্যাঁক। পায়ের গোড়ালিতে কুকুরের কামড়। হরেকদাদা আচমকা বাবা রে মা রে… চেঁচিয়ে লাফিয়ে উঠল শূন্যে। মুহূর্তে সামলে পা ছুড়ে মারল নেড়ির মুখে। কেঁউ কেঁউ করে কেঁদে উঠল ফদেচাচা। হরেকদাদা পিছন ফিরে হাতের লাঠি চাপিয়ে দিলে ফদেচাচার ঘাড়ে।

–হারামির বাচ্চা, মুশকো, বদমাশ, মশকরা মারার জায়গা পাসনে! কলজেটা ধড়ফড়িয়ে লাফাচ্ছে, আর একটুতে ফেল মেরে যেত।

ফদেচাচা লাঠির বাড়িকেই পুরস্কার ভেবে নেড়িকুত্তার মতো জুলজুল চোখে চেয়ে রইল মিলিটারি প্যান্টশার্ট জোড়ার দিকে।

প্যান্টশার্টখানা ঝুলে থাকে হরেকদাদার দোকানে। মাথার উপরে বটগাছ। গাছের ডালে দড়িতে বাঁধা হ্যাঙারে। হাওয়ায় ফুলে ওঠে। বাতাসে দোল খায়। বায়ুতে খেলা থাকলে শার্টের বুকে হাতায় প্যান্টের পায়ায় নেইমানুষের ফাঁকে হাওয়া ঢুকে পড়ে। ভরদুপুরে খরিদ্দার না থাকলে হরেকদাদার ঝিমকুনি আসে। তখন পোশাকখানা জ্যান্ত হয়ে ওঠে। হরেকদাদা ঠিক করতে পারে না, মানুষটা খানসেনা, না ইন্ডিয়ান মিলিটারি, নাকি আমেরিকান সাহেব! হ্যাটম্যাটখ্যাট ঢুকে বসে থাকে। হাতে ক্যাটক্যাটক্যাট ফর্টিসেভেন, এই বুঝি গুলি চালিয়ে দিল। চোখের সামনে দিয়ে লাটবেলাট বস্তাবন্দি জামাপ্যান্ট আসছে যাচ্ছে, বুড়ো হয়ে মরতে বসেছে, হরেকদাদা এমন ভয়ে কখনও পড়েনি। হাত পা শক্ত হয়ে আসে, বটগাছের ফুরফুরে দখিনার নিচে ঘেমেনেয়ে জবজবে। লজ্জার কথা, দু-একদিন টুল থেকে পড়েও গেছে। প্যান্টশার্টখানার ভিতরে হাওয়া ঢুকলে এমন বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, ফর্টিসেভেন উঁচানো মিলিটারি মনে হয়। পোশাকজোড়া যেদিন দোকানে ঢুকেছে, উৎপাত নিয়েই ঢুকেছে। মাঝে মাঝে ক্যাটক্যাট গোঙানি আর্তনাদ শোনা যায়। ও-দুটো বিদেয় করতে পারলে বাঁচে। সাক্ষাৎ আপদ। এমন ডাকসাইটে চেহারা, কারও গায়ে খাটেও না, জবরজং, কেউ পছন্দও করে না। কারও পয়সা সস্তা হয়নি, ভূতের নামে উড়িয়ে দিয়ে যমের ফেউ কিনবে!

পোশাকজোড়া বিক্রিও হয় না, চুরিও হয় না। বটের দড়িতে দুলে দুলে ভয় দেখায়। হরেকদাদা জিজ্ঞেস করে— নিবি নাকি, প্যান্টশার্টজোড়া?

মার খেয়ে ফদেচাচা গোঙাচ্ছিল। মুখ দিয়ে ভাষা বেরুল না। ঘাড় নাড়িয়ে বলে ওঠে— গোঁ… গোঁ…

মানে নেবে। হরেকদাদা আপদকে দিয়ে ভূতের হাত থেকে রেহাই পায়। হাঁফ ছাড়ে। মনে মনে ফদেচাচাকে বলে— আমাকে ভয় দেখানো, এবার বুঝবি ঠেলা, ভয় কাকে বলে?

হরেকদাদা দিয়ে বাঁচে। পোশাকখানা পেয়ে ফদেচাচা ভাবে, বওরূপী হলে মন্দ হয় না।

ফদেচাচার শরীরে বিশ্রীরকমের ঢলঢলে হল পোশাকখানা। তা হোক। নেইমামার চে কানামামা ভালো। বাতাসের চে হাড়প্যাকাটি শরীর ভালো। রাজকীয় পোশাক বলে কথা। একটা গোঁ আছে না! লিকপিকে ফদেচাচাকে পেয়ে পোশাকখানা সত্যি সত্যি জ্যান্ত আর ফিটফাট হয়ে উঠল।

হরেকদাদার দিকে পিছন ফিরে, ভীষণ ‘ইস্মাট’ আর গম্ভীর চালে চলে যাচ্ছে পোশাকখানা। হরেকদাদা মাথায় দিয়ে বসে ছিল টুপিটা। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, আপদের একটুকরো রয়ে যাচ্ছে। হুড়মুড় করে আবার ছুটল। পিছন থেকে ফদেচাচার মাথায় টুপিখানা পরিয়ে জন্মের মতো হাঁফ ছাড়ল। ভাগ্যিস মনে পড়েছিল! নইলে ভূতের টুপিখানা কী খেল দেখাত কে জানে? ল্যাংপ্যাং রাজারাজা, এইবার পেয়াদা পেয়াদা পোশাকখানা হাঁটতে হাঁটতে চলে যাচ্ছে চোখের বাইরে। এক্কেবারে ‘সিবিল-লাইপে’ মিলিটিরি চ্যাপলিন। দু হাত কপালে তুলে তাবৎ মানুষকে স্যালুট ঠুকতে ঠুকতে আর হাত পাততে পাততে যাচ্ছে। চ্যাপলিনসাহেব জীবনে যা করেননি। ফদেচাচাকে যারা চেনে, আর যারা চেনে না, কপালে হাত-ঠোকা আর হাত-পাতার বহর দেখে সিকেটা আধুলিটা দিচ্ছে। হরেকদাদা যতদূর চোখ যায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। পয়সা পাওয়ার বহর দেখে হিংসেও হল। ভাবল, পোশাকজোড়া ফ্রি না দিয়ে ভাড়ায় দিলেই ঠিক হত। মানুষ দেখা যায় না, পোশাকের মধ্যে সেঁধিয়ে থাকা চ্যাপলিন নয়, এই সেই আসল মিলিটারি ভূত, বটগাছ থেকে ঝুলেঝুলে তাকে ভয় দেখাত।

পোশাকখানা ঢুকে পড়ল জয়ন্তিপুর হাটে। ঘুরেঘুরে পকেট ভারি করে, হাট থেকে যখন বেরিয়ে বাড়ির পথ ধরল, হাতে একখানা ঠ্যা ঠ্যা ঠ্যা ঠ্যা…, প্লাস্টিকের একে ফর্টিসেভেন। এতক্ষণে পোশাকখানা আস্ত হল। ফদেচাচা গাঁয়ের পেয়াদাদের মতো হেসে উঠল— খ্যাক খ্যাক খ্যাক খ্যাক…

ফদেচাচা বহুরূপী।

ওপারে বাংলাদেশ। হরিদাসপুর বর্ডারে, মুচিপাড়ায়, বারোমাস পেয়াদা পেয়াদা পোশাকগুলো, বুনো ঝোপ-জঙ্গলের আড়ালে ছোপছাপ নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। বগলের নীচে কালো বেঁটে আসল বন্দুক। মাঠেঘাটে আনাচেকানাচে হুপহাপ গজিয়ে ওঠে। জংলার গায়ে সেঁধিয়ে থাকে চেনা যায় না। চাষ করে, ছাগল চড়িয়ে, বাসন মেজে শান্তি নেই। বাড়ি থেকে বেরুলেই ভয়। বিটাছেলে-মেয়েছেলে সব্বাই সারাবছর সিঁটিয়ে থাকে। বডারে বাস করার এ যে কি যন্তোন্না! বডার যারা তৈরি করেছেন, বাবুরা কেউ ইখেনে থাকেন না, থাকলে বুঝতেন কটা ধানে কটা চাল! দিনরাত জান মান শিকেয় তুলে টিঁকে থাকা। হাড়ে হাড়ে বুঝতে বুঝতে খেঁদিসুন্দরী ছুটছে। উলঙ্গ। চষা মাঠ, ঢেলা মাটি, ঠেলতে ঠেলতে ছুটছে। হুটরে হুটরে পড়ছে, উদলা গায়ে ছাল-ব্যাকলা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। রক্ত ঝরছে। দৌড়োচ্ছে, আর পেছন ফিরে দেখছে। বুকদুটো দু হাতে চেপে ধরে আছে। নইলে যা ঝকর ঝকর, শত্তুরের মতো ঝাঁপাচ্ছে। দৌড়ুতে দিচ্ছে না। পরনে কিছু না থাকায় ছুটতে সুবিধে হচ্ছে। সায়া তো জন্মে জোটে না, শাড়ি থাকলেও পায়ে পায়ে বেঁধে, হুমড়ি খেয়ে পড়ত, পেয়াদার পোশাক পরা মিলিটারিটা ওকে পেড়ে ফেলত। এ গাঁয়ে উলঙ্গ থাকায় মঙ্গল।

আর এক জানোয়ার প্যায়দা বুঁচিকে টেনে নিয়ে গেছে রক্ষেকালী মন্দিরের পেছনে। রক্ষেকালী যদি বাঁচিয়ে না থাকে, এতক্ষণে শাড়ি খোলার হ্যাপা ওকেও পোহাতে হচ্ছে। বুঁচি নয় বেধবা। সাতকুলে কেউ নেই। ভিক্ষে করে। সমাজের ধার ধারে না। খেঁদির তো ঘরে মানুষ আছে। সমাজ আছে। যদি বাদ দে দেয়, কে ঠেকাবে? ভাগ্যিস, থাবা মেরে ধরার সময় মিলিটারি কুত্তার চোখে-মুখে শাড়ি খুলে উড়িয়ে দেয়ছিল। দিনের আলোয় অন্ধকার দেখে উল্টে পড়েছে। হাঁচড়পাঁচড় মারাচ্ছে। ভাবছে, ওর নাগালে খেঁদিসুন্দরীও গড়াগড়ি দিচ্ছে। হ্যাহ, সে গুড়ে বালি। হাতের ডগায় পেইছিল এঁটেলমাটির ড্যালা। চত্তির মাস। পাথরের চেয়ে দড়ো। দিয়েছে মাথায় চাপিয়ে। বোঝ, শালা হারামির বাচ্চা, খেঁদিকে চিৎ করা অত সহজ নয়। ত্যালপানা কলের গান পাওনি। খেঁদি হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরের উঠোনে এসে দড়াম করে পড়ল। আর অজ্ঞান হয়ে গেল।

সারা গাঁ রাষ্ট্র হয়ে গেছে, খেঁদি আর বুঁচি দুই সখীতে কলমিশাক তুলতে গেছিল, পগারে। বুঁচির খোঁজ নেই। খেঁদি অজ্ঞান। বিটাছেলেরা একদল গেছে বুঁচির পাত্তা নিতে আর একদল পল্টনের তাঁবুতে, বিচার চাইতে।

হাঃ! ভাত দেবার ভাতার নয়, কিল মারার গোঁসাই। বিচারের পরে কী হবে, হুশ আছে? ভয়ে গাঁ সুদ্ধু মেয়েছেলেরা বস্তার মধ্যে সেঁধিয়ে পড়েছে। এ গাঁয়ে প্রত্যেক ঘরদোরে যে কজন ফ্যামিলি মেম্বার সেই ক-খান বস্তা চৌকির নীচে রাখতেই হয়।

তাঁবু থেকে বিএসএফ শ্যাল-কুকুরেরা একখান হুড়কো দিলে মদ্দা মানুষেরা কোমরের কষি ছিঁড়ে পালাবার দিশে পাবে না। গেছে বিচার চাইতে! মধ্যি পড়ে মেয়েছেলেদের জান-মান নিয়ে কামড়াকামড়ি। জেরবার। মরদগুলো ঠাঙানির ভয়ে দিনরাত পোড়া কয়লা হয়ে সিঁটিয়ে থাকে। পল্টন পজ্জন্ত যাবেই না। সমাজে রীতি আছে, অবলাদের দুর্দিনে মদ্দামানুষদের লড়তে হয়। রীতি ফ্যালনা নয়, তাই গেছে। কে যাচ্ছে দেখতে, ওরা কতদূর যেছে! একা একাই খেঁদির জ্ঞান ফিরে এল। সাঁঝ নামলে উঠোনে শুয়ে শুয়ে ভাবছিল।

মনে পড়ে গেল, মিনসে আসার সময় হয়েছে। বস্তার মধ্যে উপুড় দিয়ে থাকলে চলবে না। দিনে তার একবারই হাঁড়ি চড়ে। সকালে চাট্টি চাল ভিজিয়ে খেয়েছিল। দু কোটোর থনে হাফকোটোতে মিটে গেছে। উঠোনে কাঁঠালগাছের আড়ে কাঠের উনুনে চারকৌটো চাল চাপিয়ে দিল। মানুষটা আসছে।

ভাতে সোঁ সোঁ আওয়াজ নিচ্ছে। এখুনি ফুট ধরবে। হাতে কুটনো। আধখানা বেগুন। একটু অবসর। এখন বুঁচিটার জন্যে বুকের মধ্যে হু হু জানান দিয়ে উঠল। কুথায় মরে পড়ে থাকবে হদিশ হবে না। হুদলামুচির বৌকে তিনদিন পর পাওয়া গেল, বাঁশতলার নয়ানজুলিতে, ফুলে ঢোল।

মেয়েমানষের হাতের মাটির ঘা। বেঁহুশ আর কতক্ষণ! খেঁদিকে ও হারামি ছাড়বে না। খেঁদির নাম এককালে রাজকুমারী ছেলো। সে কি আর এমনি এমনি! শরীলে এখনও নালঝোল খানিক পড়ে আছে। শালা, কুত্তার বাচ্চাদের কৈ মাছের জান। মাঠের মধ্যি কি আর পড়ে থাকে? এতক্ষণে ঠেলে উঠে পড়েছে। হাঁউ মাঁও খাঁও। তাকে ঢুঁড়তে লেগেছে! উনুনে আগুনের চোখে চোখ রেখে ও কেঁপে উঠল। একটু একটু ভয় করছে। কুটনো কোটার বঁটি নেই। একখানা হেঁসো। ওটা দিয়ে ঘাস কাটে, ওটা দিয়েই কুটনো কাটে। প্যায়দার যম আসুক, ওটা দিয়েই আজ মুন্ডু নামাবে। হাতের কাছে উনুনের চ্যালাকাঠ তো আছেই। ঘরের চালে খুশ খুশ আওয়াজ হচ্ছে। আজকাল ভামের যাতায়াত খুব বেড়ে গেছে। সন্ধে না হতেই কাঁঠালগাছ হয়ে, খেঁদির ঘরের চাল দিয়ে বুঁচির ঘরের দিকে যায়। বুঁচির শুন্যি ঘরখানা কাঁদছে। বুকের ভিতর হু হু জানান দেয়। বেগুন দিয়ে তেলাকুচোশাকের ঝোল মিনসের খুব পছন্দ। ময়লামুচির বেড়ায় শাকগুলো খুব কচি কচি পেয়ে গেছে।

–কেডা?

একপাল ভাম সারবন্দি যায়। একটা টাল খাওয়া জানোয়ার মনে হচ্ছে আড়া ফসকে নিচে পড়ে গেল। অত জোর শব্দ হল কিসের? মর্‌ মর্‌! পিছন ফিরেই খেঁদির চক্ষু চড়কগাছ। হারামির হাড়, মিলিটারি, শালা কুত্তার বাচ্চা, টালির চাল বেয়ে নামছে। ভেবেছে টের পাব না। চেঁচিয়ে উঠল খেঁদি— আয়, তোর একদিন কি আমার একদিন। শালা ভাদুরে কুত্তা, তোর জন্মের সাধ মিটিয়ে দেব।

হাতে হেঁসো নিয়ে রণমূর্তি খেঁদি। ওতেও নিজেকে পুরোপুরি হিংস্র মনে হল না। শাড়ি তুলে নিল হাঁটুর উপরে। উনুন থেকে জ্বলন্ত একখানা চ্যালাকাঠ বের করে নিল অন্য হাতে। ঘরের চালের নিচে দাঁড়িয়ে লাফাতে লাগল। আর কুত্তার বাচ্চাকে ডাকতে লাগল,

–আয় শ্লা, সুমুন্দির পো, নেমে আয়, তোর হাড়-মাস যদি আলাদা না করিছি তো আমার নাম খেঁদি চামারিই না।

হম্বিতম্বির তোড়ে হাত ফস্কে সুমুন্দির পো টালির চাল বেয়ে হুড়মুড় করে গড়িয়ে পড়ল নিচে। খেঁদিও চাপিয়ে দিল এক কোপ। সুমুন্দির পোর মাটিতে পড়ে তখনও গড়িয়ে যাওয়া শেষ হয়নি। হেঁসোর কোপখানা অর্ধেক পড়ল পিঠে অর্ধেক উঠোনে। হেঁসো গেঁথে গেল মাটিতে। গলগলিয়ে রক্তে ভিজে গেছে মাটি। টেনে তুলতে সময়ের ফাঁক লাগল। লাফ মেরে দাঁড়িয়ে গেল পেয়াদাদের জংলি পোশাকখানা। ভয়ে কুত্তার রা বেরুচ্ছে না। মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল— গোঁ… গোঁ… গোঁ…

মাটিতে গড়ানোর ঝোঁক সামলাতে আর এক পাক খাওয়া হল না। মিলিটিরি জামা-প্যান্টের ভিতর সেঁধিয়ে থাকা কুত্তাবাবাজি ধড়াস করে লাফিয়ে উঠে, পিছন ফিরতে যেটুক সময়, ছুট ছুট ছুট।

খেঁদিও ছুটছে। হাতে আকাশমুখো হেঁসো। কুত্তাকে এলাকা পার করেই ছাড়বে। পাড়া আগুন হয়ে আছে। এক-একজন করে মানুষ ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। খেঁদির পিছন পিছন ওরাও ছুটছে। ছুটতে ছুটতে ছড়ানো ছেটানো গাঁ একখান আস্ত হয়ে গেল।

–হা রে রে রে……

পগার পার হতে গিয়ে কোন আঁধারে কোথায় তলিয়ে গেল জানোয়ারটা গাঁয়ের লোক মালুম করতে পারতে পারল না। ভয়ে সাহসে দৌড়ে হাঁফিয়ে খেঁদি নিজেই চেপে ধরল নিজের মুখ। যেন কেউ জানতে না পারে। অন্ধকারে তালগোল পাকানো মানুষটা পালিয়ে যাওয়ার সময় হরবোলার মতো নেড়িকুত্তার গলায় কেঁদে উঠেছিল— কেঁউ… কেঁউ…

পীরবাবার দোহাই খোয়াবখানা মিছে হোক।

যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সৈনিকদের স্ট্রেচারে নিরাপদ জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। আহত এক সৈনিক নেড়িকুত্তার মতো চার হাতপায়ে পেটের উপর পিঠটাকে চাপিয়ে ছুটছে। মিলিটিরি পোশাকে সেঁধিয়ে ফদেচাচার খুব আনন্দ হয়েছিল। ভেবেছিল, জয়ন্তিপুর হাটে টু পাইস ভালোই ইনকাম হয়েছে। বউয়ের সাথে একটু খুনসুটি, মশকরা, একটু বওরূপী করবে। উল্টে কচু গাল ধরেছে। ভাগ্যিস, পোশাকখানা দারুণ শক্ত-পোক্ত। কাটাছড়া বিশেষ হয়নি। মাত্তর পিঠখানা দিয়ে ‘অক্ত’ ঝরছে। হাঁটু একখানা জবর জখম হয়েছে। আঁধারে হাত বুলিয়ে বুঝল, ভিজে ভিজে। আর বিশেষ কিছু না। কিসে যে কী হল, চাচা বুঝতে পেল না। বৌ কেন হেঁসো নিয়ে তেড়ে এল! ইকেন থিকে মারনু তীর লাগনু কলাগাছে, হাঁটু বেয়ে অক্ত ঝরে বউ নে গেল কাকে।

রান্নাঘর, উনুনের পাড় থেকে শহিদবেদির মোড় পর্যন্ত বেঁচে থাকার সমস্ত পথ জুড়ে রক্তক্ষরণ হতে হতে একসময় যোদ্ধা পৌঁছে গেল শহিদবেদির মোড়ে। খোঁড়াতে খোঁড়াতে এসে জড়িয়ে ধরল বন্দুক। মাথার কাছে দাঁড়িয়ে গেল টুপি। ভোরের শহরে দোকান সাজানোর ফাঁকে হরেকদাদা দেখেছিল, মরা সাহেবের সৈনিক পোশাকে চাচা দেশের সৈন্যবাহিনির ফাঁকা জায়গা পূরণ করে দাঁড়িয়ে আছে। গলগলিয়ে পড়া রক্তের সাথে পোশাকের ভিতর থেকে কখন চাচা টুপ করে খসে পড়েছে কেউ জানে না। বেদির নিচে শুয়ে অনেকক্ষণ শুনতে পেয়েছিল, বৌ খেঁদি কাঁদছে। কেঁউ…কেঁ…উ… ফিরে আয় আমার হরবোলা… আমার বওরূপী…

ফদেচাচা নেই। সৈনিকের পোশাকখানা হরেকদাদা বন্দুকের টুপির নিচে ঝুলিয়ে রাখে। সম্মানের শ্রদ্ধার শহিদবেদি। কেউ কেউ টাকাটা সিকেটা বেদিতে ছুড়ে দিয়ে যায়।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...