প্রযুক্তি তক্কো গপ্পো— শঙ্খদীপ ভট্টাচার্যের প্রবন্ধের ক্যানভাসে মুক্তবাজারের পাঁচালি

সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়

 

এই একবিংশ শতাব্দীর আঘাটায় তথাকথিত মান এবং হুঁশ সম্পন্ন স্যাপিয়েন্স উপপ্রজাতির গন্তব্য কীভাবে চালিত হচ্ছে তথ্যবিস্ফোরণ নামে মুক্তবাজারের আয়ুধের কাছে তার এক আনুপূর্ব বয়ান উঠে এসেছে শঙ্খদীপ ভট্টাচার্যের লেখা ‘প্রযুক্তি তক্কো গপ্পো’ শীর্ষক প্রবন্ধ সঙ্কলনে। এই প্রজাতির প্রতিটা গতিবিধিকে রাষ্ট্র এবং তার দোসর বাজার কীভাবে পণ্যায়িত করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নামক রাশিবিজ্ঞানের ফুসমন্তরে তাকে চমৎকারভাবে ধরেছেন লেখক তাঁর আঠেরোটা প্রবন্ধের অক্ষরযাত্রায়। অন্তর্জালের অন্ধিসন্ধিতে মুসাফির হয়ে চলা আমাদের ডিজিটাল সাক্ষরের প্রতিটা লবজ পড়ে ফেলতে পারে ওয়েব মাইনিং নামক রাষ্ট্রের তথ্য সারমেয়। তারপর যে গাণিতিক মডেলে সেই তথ্যের সার অর্থাৎ আমাদের মেধা-মননের ছিন্নপত্রকে আমাদেরই ওপর প্রয়োগ করা যেতে পারে তার একটা সরস ব্যাখ্যা আছে ‘কৃত্রিম বুদ্ধি: ক-য়ে কৃত্রিম, ব-য়ে বুদ্ধি’ শীর্ষক প্রবন্ধের মধ্যে। আমাদের স্পৃহার গোপন স্তরগুলো যে সংখ্যাতত্ত্বের অবয়বে বাজারের জ্বালানি হয়ে দেখা দেয় সেটা ফুটিয়ে তোলার জন্য খুব প্রাণবন্ত একটা ন্যারেটিভ বিন্যাস করেছেন লেখক সেখানে যেমন আছে দর্শনের ডিসকোর্স আবার নাগরিক তেমনই আছে মিথ ও মিথ্যের খোসা ছাড়ানোর প্রমিত ভাষ্য। সফট কম্পিউটিং নামের আধুনিক যন্ত্রগণন প্রযুক্তি যার মধ্যে ফাজি সেট, নিউরাল নেটওয়ার্ক এবং জেনেটিক অ্যালগোরিদমের মত তথ্য বিশ্লেষক গণিত এই ভাষ্যের প্রধান লিপি যে লিপি পাঠের প্রাথমিক চিহ্নগুলো তুলে ধরেছেন শঙ্খদীপ। লেখকের সরস বয়ান এই ভাষ্যের অনধিকারীকেও খেই ধরিয়ে দিতে পারবে এই নতুন দিনের নাগরীলিপির। আবার ‘ভাবের ঘরে চুরি: নজরদারির সাতকাহন’ এর মত প্রবন্ধে ব্যক্তির ওপর ব্যষ্টি তথা রাষ্ট্রিক কাঠামোর এক সর্বাত্মক সার্ভেইলেন্সের একটা ঐতিহাসিক রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে, যে নজরদারি একটা অন্য মাত্রা পেয়েছে ডিজিটাল আতসকাচের তলায়। এই প্রবন্ধের সূত্রপাতে গুপ্তচরবৃত্তি সম্পৃক্ত দেড়শো বছরের পুরনো গদ্যাংশের  উল্লেখ সামগ্রিক চলনের প্রকৃষ্ট এক নান্দীমুখ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই নজরদারির একটা অনুলম্ব সূচিমুখ হল বিভিন্ন ব্যবসায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত ফিজিবিলিটি এবং রিস্ক অ্যানালিসিস। সময়সরণির পথে আজন্মলালিত অর্থনৈতিক কাঠামো কীভাবে ভেঙে পড়ছে এই জটিল গণিত নির্ভর বিতংসে, সেই আঁশ ছাড়িয়ে ভেতরের কঙ্কাল তুলে ধরেছেন লেখক।

বিশ্বজোড়া ফাঁদ পেতেছ, কেমনে দিই ফাঁকি—
আধেক ধরা পড়েছি গো, আধেক আছে বাকি

এই বিশ্ব আসলে বিশ্ববাজারের সমার্থকে এসে ঠেকেছে এই ঘটমান বর্তমানে। মধ্যবিত্তের সোনার ডিম সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং নামক নটা-ছটার পাপক্ষয়ের আড়ালে সস্তায় বুদ্ধিশ্রমিক শোষণের নীল নকশা আঁকা আছে। নিবিড় পাঠে মানবিক মনোবৃত্তিগুলো সম্পূর্ণ উবে গিয়ে যন্ত্রমানবে পরিণত হওয়ার একটা ছাঁচ দেখতে পাওয়া যাবে। এই বীক্ষায় সাহায্য করবে প্রাবন্ধিক শঙ্খদীপের বয়ান। এই আপাত ডিস্টোপিক বহমানতা ছাড়াও ‘কোয়ান্টাম কম্পিউটিং: বেড়াল থেকে কিউবিট’ শীর্ষক প্রবন্ধে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আধুনিক ভাষ্যের বয়ান করা হয়েছে। সার্চ ইঞ্জিনের গাণিতিক মডেল যে ভাষ্যের বলে মুহূর্তে খুঁজে আনবে প্রার্থিত তথ্য প্রায় এই গ্রহের অর্ধেক সফর করে। এমনকি কিউবিটের সাহায্যে খুব কম সংখ্যক জায়গার মধ্যেও কী করে অযুত-নিযুত পরিমাণ তথ্যভাণ্ডার এঁটে যাবে খুব কম মেমোরি বা যন্ত্রগণকের স্মৃতির ভাঁড়ারে যার কব্জা নেয়ার জন্য নাকি রাষ্ট্র থেকে কর্পোরেশন সবাই মুখিয়ে আছে। প্রযুক্তির এই কাঠামো গড়ে ওঠার পেছনে বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিদ্যা এবং গণিতের যে গবেষণার ইতিহাস আছে সেটা লেখক উল্লেখ করেছেন এই প্রসঙ্গে। ক্লাসিক্যাল পদার্থবিদ্যার প্রতিস্পর্ধায় যে কোয়ান্টাম যাত্রাপথে পৌঁছেছে মানুষের বীক্ষা। আলবার্ট আইনস্টাইন, নিলস বোর, ভার্নার হাইজেনবার্গ প্রমুখ বিজ্ঞানীদের গবেষণার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে এই বিষয় উল্লেখে। লেখকের কলমের সাবলীলতায় বিষয়ের দুরূহতা নাগরিক অ্যানেকডোটের আখ্যানমঞ্জরীতে একটা স্বাদু গদ্যের রূপ নিয়েছে।

এই প্রবন্ধ সঙ্কলন আসলে মুক্ত বাজারের একটা দেখতে না চাওয়া আরশি। আমাদের ভেতর ঘরের নিগড়ে রয়ে যাওয়া অমলকান্তির মুখ দেখতে পাওয়া যায় সেই আয়নায়, যে অমল ক্রমশ স্যাঁতসেঁতে একটা ঘরে আটকা পড়েছে যেখানে রোদ্দুরের চিঠিও যায় না।

প্রযুক্তি তক্কো গপ্পো
লেখক: শঙ্খদীপ ভট্টাচার্য
প্রকাশক: সোপান
বিনিময়: ২০০ টাকা

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 5420 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.