লেডি গন্ধেশ্বর

সৌগত ভট্টাচার্য

 

“পভু মুই তোমারই… তোমার জয় পরাজয় মোর। সেন্দুরের দিব্যি দিয়া কছ…” নদীর ধারে দাঁতন করতে করতে একাই সংলাপ বলে আর পায়চারি করে গন্ধেশ্বর। সকাল থেকে হিম পড়ছে ক্ষেতের ওপর। দূরের গাছপালা বাঁশঝাড়ে হিম পড়লে আবছা সাদা-সবুজ রং ধরে। কোন গাছটা ইন্ডিয়ার, কোনটা বাংলাদেশের, সেটা গন্ধেশ্বর রায় চেনে। মেঘলা সকালে আকাশ মাঠ গাছের রং এক হয়ে নতুনরকম একটা রং ধরে দফাদারপাড়ায়। পাঙ্গা নদীর ওপার থেকে খয়েরবাড়ি বিএসএফ ক্যাম্পকে ঝাপসা দেখায়, নদীর জল ধোঁয়া হয়ে থাকে। একটা সংলাপ শেষ করে হঠাৎ থেমে যায় গন্ধেশ্বর। নদীর পাড়ের কাঁটাতারের দিকে তাকায়, ওপার থেকে সম্রাট অজিতের উত্তরের জন্য। তারপর আবার শুরু করে, “সম্রাট, তোক এই যুদ্ধ জয় করিবার নাগিবেই, তুই না ফেরা পরজন্ত মুই জল নারিম না!” চারদিক কুয়াশা বিছানো সাদা-সবজে মাঠ গাছ পাটক্ষেত আর দাঁড়িয়ে গন্ধেশ্বর একটার পর একটা সংলাপ বলে চলছে কুয়াশায় আবছা পাঙ্গা নদীর দিকে তাকিয়ে, শিশিরের ফোঁটা লাগা কাঁটাতারের দিকে তাকিয়ে… এই সময়টুকুই তার নিজের রিহার্সালের সময়। এরপরই চাষের জন্য তাকে মাঠে যেতে হবে।

সম্রাট অজিতকে চায়ের দোকানে বসার জায়গা ছেড়ে দেওয়া হয়। পূজার পর এই দুই মাস মানিকগঞ্জ এলাকায় অজিতের খাতির বেড়ে যায়। “এইবারও তোমরা সম্রাটের রোল ধরিসেন?” অজিতকে জিজ্ঞেস করে বিশারু। অজিত চায়ে চুমুক দিয়ে বলে, “মুই ছাড়া আছে কে এই তল্লাটে? একটা নাম ক দেখি!” বুধারু অজিতের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলে, “এই কাথাখান ঠিক কইসেন, অজিতমামা ছাড়া সম্রাটের রোল আর কাহক না মানায়! অজিতমামা পারমেন্ট সম্রাট… সম্রাট অজিত!” চায়ের কাপ নামিয়ে সম্রাট অজিত নিড়ানি আর খুরপি হাতে মাঠের দিকে রওনা দেয়। লম্বা, দশাসই অজিতের গলার আওয়াজ আর চেহারার জন্য সারা বছরই মানিকগঞ্জের লোক ওকে সম্রাট অজিত বলে ডাকে।

যাত্রার অধিকারী এমএলএ-র সঙ্গে দরবার করে আগেও একই কথা বলেছে। সেদিন আবার বলে, “গন্ধেশ্বরকে নিয়াই তো পবলেমে পড়ছি, ওর বাড়ি দফাদারপাড়া, বিএসেফ ছয়টা না বাজিতে বাজিতেই বর্ডারের গেট নাগে দেয়… মানষিটা চাষ করিবে কখন আর রিয়ারসাল করিবে কখন আর পালাই বা হবো ক্যামতন করি!” এমএলএ উত্তর দেয়, “সবই জানি অধিকারী, কিন্তু এইখানে তো মোর হাতপা বান্ধা, তোমরাও জানেন, এগিলা অনেক উপরের অর্ডার। মোর কিছু করার নাই!”

গন্ধেশ্বরের বাড়ি দফাদারপাড়ায়, পাঙ্গা নদীর ওই পারে। এই পারে একটা বিএসএফ ক্যাম্প আর ছোট একটা ব্রিজ। ব্রিজ দিয়ে যাতায়াত করতে হয় দফাদারপাড়ার মানুষকে। সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা, ব্যস. তারপর বন্ধ হয়ে যায় বর্ডার, আবার পরদিন সকলে খোলে। “তাও একটু কয়া দ্যাখেন না কিছু করা যায় কী না, পূজার পর তো এই কয়টা দিন!”

এমএলএ উত্তর দেয়, “মুই এই কথাখান বিধানসভায় তুলছিনু, কিন্তু গলদখান তো গোড়ায় নাগিসে। দ্যাশভাগের সময় হোমরাচোমরালা দিল্লিতে বসি বর্ডার টানিল আর বেরুবাড়ির কয়েকটা মৌজা চলি গেল ওই দ্যাশে! এই কথা কায় কবে কন দেখি!” অধিকারী কাচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।

গন্ধেশ্বর রায় এই তল্লাটে একজনই আছে যে পুরুষ কিন্তু নারীর ভূমিকায় অভিনয় করে। গন্ধেশ্বরের ফর্সা গাল টানা টানা চোখ আর চিকন গলার স্বরের জন্য সম্রাট অজিতের উল্টোদিকে রানির ভূমিকায় সকলে চায়। অন্য গ্রামের লোকে ফিসফিস করে বলে, “এইটা ব্যাটাছেলে না মেয়েছেলে!” অধিকারী এমএলএ-র কাছে দরবার করতে এসেছে যাতে গন্ধেশ্বরকে রিহার্সালের জন্য কয়টা দিন ছেড়ে দেওয়া হয়। “এই যে পাঁচ সাড়ে পাঁচ কিমি কাঁটাতারের চ্যাগার এইটা যদি দফাদারপাড়াকে গোল করি ঘিরে দিত তাইলেই তো ঝঞ্ঝাট থাকে না, কিন্তু তা না করি দফাদার পাড়ার বাইরে দিয়া নদীবরাবর সোজা বর্ডার টানি দিল্ বড়কর্তারা দিল্লি বসি! পাঙ্গার ওই পারৎ ইন্ডিয়ার দফাদারপাড়া একা হয়া গেল্! আর পিছে বাংলাদ্যাশের সাথে না আছে বর্ডার না আছে খুঁটি!”

অধিকারী বলে, “সবই জানি। কিন্তু কার্ডটা ইন্ডিয়ার ভোটটাও ইন্ডিয়ার, ভোটখান তো উমরা তোমাকেই দেয়!” “আরে অধিকারী তোমরা অ্যাডভার্স পজেশন বোঝোন? এইখানটাই তো সমস্যা! ল্যান্ড ইন্ডিয়ার মানষিগুলা ইন্ডিয়ার কিন্তু বর্ডারের ওই পারে! বর্ডারটা পাঁচ কিমি একটু ব্যাকায় দিলেই দফাদারপাড়া গ্রাম ইন্ডিয়ার মেনল্যান্ডে চলে আইত, মানিকগঞ্জের মত। সেইটা না করি, না বুঝি সোজা বর্ডার টানি দিল। বোঝেন কি না! মানষিগুলা না হইল ওই দ্যাশের আবার এই দ্যাশের সিটিজেন হয়্যাও পুরোপুরি না হইল্!”

এই কথাগুলো অধিকারী অনেকবার শুনেছে, সে সবটা জানে। বেরুবাড়ি আন্দোলনে ওর বাপ গেছিল মিছিলে। ১২ নম্বর বেরুবাড়ি ইউনিয়নের কথা মানিকগঞ্জের লোক হেন কেউ নাই যে জানে না, সকলেই জানে। গন্ধেশ্বর এতক্ষণ হাত কচলাচ্ছিল অধিকারীর পাশে দাঁড়িয়ে, “তোর পালাখান এইবার মুই দেখিত যাম বুঝিসেন!” এমএলএ বলে। গন্ধেশ্বর মাথা নেড়ে মিহি সুরেলা গলায় বলে, “আবাদী করির পারো না, এক করিত এই দিক আসি পারো না, বিএসেফ ধমকায়। কাঁটাতারের ভিতরে যে কী জ্বালা কী জ্বালা, গরু ছাগল বিক্কির করিত হাটে আসি পারো না! আপনি এর একটা বিহিত করি দ্যান!”

“কতটুক জমিন আছে তোর?” এমএলএ জিজ্ঞেস করে। “দ্যাড় বিঘা…” হাতটা নাড়িয়ে গন্ধেশ্বর উত্তর দেয়। গ্রামের মহিলারাও বলে, “গন্ধেশ্বরের শরীলের ভাব ন্যাকা মেয়েমানুষের মত!” সে মাথাটা ঘুরিয়ে উঁচু করে বলে, “বুধারু বিয়া করি কাঁটাতারের ভিতরত আসিছে বউ নিয়া, বুধারুর বাপ মায়ের আগে নয়া বউটাক দ্যাখে ফেলিল বিএসেফ। কী কাণ্ড! যা তা! মোক তো উমরা আগত লেডিস নাম দিল, মুই কিছু মনে ধর নাই… কী বিরাট উঁচা লম্বা লোক ওরা!” কথা শেষ হওয়ার আগে সন্ধ্যা নেমে আসে। খয়েরবাড়ি বিএসএফ ক্যাম্পের বর্ডারের গেট বন্ধ হওয়ার সময় হয়ে যায়।

শুধু বিএসএফ না, গ্রামের লোকজনও তাকে মিস গন্ধেশ্বরী লেডিস বলে ডাকাডাকি করে। একবার গন্ধেশ্বর প্রধানের কাছে অভিযোগ করতে গেছিল, “বিএসেফগুলা মোর বাপ মাতর দেওয়া নামখান পাল্টি লেডিস ডাকায়! মুই মেয়েছেলে সাজি কয়াই কি লেডিস হয়া গেলাম, এর একখান বিহিত করি দ্যান!” গন্ধেশ্বরের কথায় প্রধানও বিরক্ত হয়ে মনে মনে বলেছিল, “ভুল আর কী, ঠিকই তো কছে, লেডিসকে লেডিস কইবে না তো কী কবে…” গন্ধেশ্বরের ভেতরে মানুষটি কী বলতে চেয়েছিল প্রধান বুঝতে পারেনি! ইদানীং সম্রাট অজিত আর মানিকগঞ্জের লোকজনও মিস গন্ধেশ্বরী লেডিস লেডি গন্ধেশ্বর এসব বলে গন্ধেশ্বরকে ডাকাডাকি করে। কিছুদিন হল এই নামের ডাকগুলোতে মনে মনে কোথায় যেন তৃপ্তি পায় গন্ধেশ্বর। সে নিজের মধ্যে যাত্রাপালার নারীটিকে খুঁজে পায়। এই গোপন তৃপ্তির কথা সে কাউকে বলতে পারে না। শুধু কাঁটাতারের ভেতর থেকে ওইপারের ইন্ডিয়ার মানিকগঞ্জের দিকে তাকিয়ে সম্রাট অজিতের নায়িকা হয়ে যাত্রাপালার সংলাপ বলে যায়।

বিডিও অফিসে কয়েকদিন ঘোরাঘুরি করেছে গন্ধেশ্বর কৃষিঋণের জন্য। মহড়ায় শুনেছে, সম্রাট অজিত ও অনেকেরই লোন হয়ে গেছে। “শুনেন, আপনারা কৃষি লোন পাবেন না। মানিকগঞ্জের যারা কৃষি লোন পাইসে তাদের সক্কলের পর্চা আছে। আপনাদের তো জমির পর্চা নাই, দফাদারপাড়ার সব জমি অ্যাডভার্স পজেশনের জমি. জানেন তো এই জমির দাগ খতিয়ান পর্চা থাকে না, সরকারকে কন গিয়া!” একই জেলায় থেকে দফাদারপাড়ার জমির পর্চা নাই কারও, তাই দফাদারপাড়ার কেউ সরকারি লোন পাবে না। সম্রাট অজিতরা লোন পায়, ওরা ইন্ডিয়ার মানিকগঞ্জে থাকে তাই ও সম্রাট। গন্ধেশ্বর লোন ফরমটা হাতে নিয়ে অধিকারীর বাড়ির দিকে যায়। আজ বলেকয়ে সকালবেলায় মহড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে, অনেকেই মাঠে যায় নাই হাল কৃষি করতে। পালার আর বেশি দিন নাই। অধিকারীর বাড়ি যাত্রার মহড়া হলে গন্ধেশ্বরের মন ভালো হয়ে যায়।

মানিকগঞ্জ বাজারে অধিকারীর বাড়ির পেছনে একটা বড় পুকুরের ধারে মহড়া শুরু হয়। সম্রাট অজিত বসে বসে বিড়ি টানছে আর গন্ধেশ্বর তাকে দেখছে। অজিতের হাত সার ছেটানোর পর লাল হয়ে আছে। অধিকারী তপনকে বলে, “না না, এমতন করি হছে না। আরও উঁচা গলায় তোমাক কাথা কবার নাগে, মুই জমিন ছাড়িবার নাহম তুই যত বড়ই রাজা হইস না কেনে…. এইভাবে জোর গলায় বল, যাতে লাস্টে পোয়ালে বসি থাকা মানষিটারও মনে গাঁথি যায় তোর ডাইলগখান!” অজিত বিড়ি নিভিয়ে উঁচু গলায় বলে “মুই মুই মুই শ্যাষ কাথা…. যুদ্ধ চাইলে ওইটাই হোবে…”

মহড়ার সময় অজিতকে এক মনে দেখে গন্ধেশ্বর। মাঝেমাঝে নিজের সংলাপ বলতে ভুলে যায়। তারপর হুঁশ ফিরে আসলে আবার নিখুঁত অভিনয়ে সম্রাট অজিতের রানি হয়ে ওঠে সে। গন্ধেশ্বরের পার্টের সময় সে কৃষিলোনের ফরমটাকে মাটিতে রেখে বলে, “ওগো ওগো মুই তোর সুখে দুঃখে জয় পরাজয় সোগোলঠে আছ… মোক নিয়া চল!” বলে গন্ধেশ্বর পুকুরপাড়ের মহড়ায় নিজেকে উজাড় করে দিতে চায়। “কিন্তুক মোক এঠে থাকি নিয়া চল সম্রাট…” গন্ধেশ্বর সংলাপে নিজের সুবিধামত করে শব্দ বসিয়ে নিয়েছে। মাটিতে লুটিয়ে সম্রাট অজিতের পা ধরে… যাত্রার বিবেক এসে উপস্থিত হয়। গন্ধেশ্বরের দফাদারপাড়ায় ঢুকে পড়ার সময় হয়। সে বলে, “মোক তো আবার তারকাঁটায় ঢুকিবার নাগে। তোমরা মানিকগঞ্জের মানষি এই জ্বালা আর কী বুঝবেন!”

বর্ডারলাগা গ্রাম মানিকগঞ্জকেই গন্ধেশ্বর দুনিয়ার সবচেয়ে সুবিধা-সম্পন্ন জায়গা বলে মনে করে। মানিকগঞ্জে মোবাইলে কথা বলা যায়, যখন খুশি যেখানে খুশি যাওয়া যায়, লোন পাওয়া যায়, সবচেয়ে বড় কথা যাত্রার মহড়া করা যায়। মানিকগঞ্জ ছেড়ে গন্ধেশ্বর তাড়াতাড়ি হাঁটতে থাকে নইলে বর্ডারের গেট বন্ধ হয়ে যাবে। কে যেন পাশ থেকে বলে, “গন্ধেশ্বরী এক কাপ চা খায়ে যাও!” মুখ ফিরিয়ে দেখে রজনী ডাকছে। “মোক তো যাবার নাগে, মুই তো আর তোমরালার মতন ইন্ডিয়ার মানিকগঞ্জৎ না থাকি!” গন্ধেশ্বর বলে। রজনী বলে, “কি পাইস এই দিক ওই দিক কইরে দৌড়াদৌড়ি করে যাত্রা করতে, বিএসেফের গালি আর প্যাদানি ছাড়া?”

গন্ধেশ্বরের এক হাতে লোনের ফরম যেটা থেকে কখনওই সে লোন পাবে না, সেটাকে শক্ত করে ধরে রজনীর দিকে একবার তাকিয়ে ঠোঁট বেঁকিয়ে মুচকি হেসে সামান্য বেঁকে হেঁটে দফাদারপাড়ার যাওয়ার জন্য খয়েরবাড়ি ব্রিজের দিকে রওনা হয়। পাশ দিয়ে পাঙ্গা আর কাঁটাতারও সমান্তরালভাবে চলতে থাকে। “মুই থাকি আর না থাকি এই রাইজ্য থাকিবে এই সম্রাট থাকিবে…” হাঁটতে হাঁটতে গন্ধেশ্বর মনে মনে যাত্রার সংলাপ বলতে থাকে। ওপারের বাংলাদেশের ভাষা এপারের মানিকগঞ্জের উচ্চারণ জলপাইগুড়ি টাউনে কাজ করতে যাওয়ায় মানিকগঞ্জের মানুষের মুখের ভাষা আর যাত্রার সংলাপ পাঙ্গার জলে মিলে মিশে এক হয়ে যায়। ওকে সন্ধ্যার আগে পাঙ্গার ওপরের ব্রিজ পেরিয়ে কাঁটাতারের ভেতরের ইন্ডিয়ায় ঢুকে পড়তে হবে, দফাদারপাড়ার ইন্ডিয়ার সঙ্গে বেরুবাড়ি মানিকগঞ্জের ইন্ডিয়ার কোনও সম্পর্ক নেই, যেন আলাদা একটা গোল মতো ভূখণ্ড যেখানে গন্ধেশ্বররা পঞ্চাশ ঘর মানুষ থাকে। পাঙ্গার এপারে মানিকগঞ্জের ইন্ডিয়ায় সম্রাট অজিত থাকে।

“ঝন্টুকে উয়ার ইস্কুলের ছাওয়ালরা কছে তোর বাপ তো মেয়েছেলে লেডিস!” মালা গন্ধেশ্বরকে রাতে খেতে বসে বলে। গন্ধেশ্বর বলে, “উয়ার কথাৎ তোমরা কান না দ্যান! উমরালা বাপ মা মোর একটিং দ্যাখে মোক লেডিস কয়!” প্রথমে মানিকগঞ্জের লোক ওকে মিস গন্ধেশ্বরী বলত, এখন দফাদারপাড়ারও সকলে তাই বলে। হালকৃষি করা মানুষ কী করে যাত্রায় রানি সেজে অভিনয় করে বুঝেই উঠতে পারে না ওর পাড়ার লোকজন। রাত নামে দফাদারপাড়ায়। অন্ধকার হলে বিএসেফের সার্চলাইট অন্ধকারকে ফালাফালা করে কেটে বেরিয়ে যায় বাংলাদেশের দিকে। গন্ধেশ্বরের ঘুম পায়। মালার পাশে শুয়ে কী সে সম্রাট গন্ধেশ্বর হয়ে উঠতে চায়!

ভোর হতে না হতেই কুয়াশার মধ্যে একটা আলোয়ান জড়িয়ে পাঙ্গার ধারে চলে আসে গন্ধেশ্বর। আলোয়ানটা শাড়ির আঁচলের মত করে জড়িয়ে যাত্রার সংলাপ বলতে থাকে আর আকাশের দিকে তাকিয়ে সূর্য দেখে ক্ষেতে যাওয়ার সময় বুঝতে চায়। নদীর পাশেই ক্ষেত। ধানের ক্ষেতে বসে কাজ করতে করতে উঠে দাঁড়ায় গন্ধেশ্বর। ওর সঙ্গে আর যারা মাঠে কাজ করছিল সকলেই উঠে দাঁড়ায় অ্যানাউন্সমেন্ট শুনে। কাঁটাতার আর পাঙ্গার ওই পারে একটা চলন্ত ভ্যান রিকশায় অ্যানউন্স হয়, “সারা রাত ব্যাপী বিরাট যাত্রাপালা… বিরাট যাত্রাপালা… ১৯ পৌষ রবিবার মানিকগঞ্জের ফুটবল খেলার মাঠে… টিকিট মূল্য…” অ্যানউন্সমেন্টের আওয়াজটা শীতের দুপুরে কুয়াশার মতো মিলিয়ে যায়। সাতকুড়া নগর বেরুবাড়ি কাদোবাড়ি ঘুঘুডাঙা হলদিবাড়ি কাশিয়াবাড়ি সব জায়গায় যাত্রার পোস্টার পড়েছে। পোস্টারে অজিতের নামের পাশে সম্রাট লেখা, গন্ধেশ্বরের নামের পাশে লেখা মহারানি। একদিন মানিকগঞ্জে মহড়ায় গিয়ে পোস্টারে নিজের নাম ছাপা অক্ষরে দেখে বেশ লজ্জা পায় গন্ধেশ্বর। যদিও প্রতিবার সে একবার করে দেখে নিজের নামটা। একবার একটা পোস্টার সে বাড়িতে এনেছিল। মালা সেটা যত্ন করে রেখে দিয়েছে।

আজ সকালবেলায় নিখুঁতভাবে দাড়ি কেটে চুলে সাবান দিয়ে চান করে গন্ধেশ্বর। একটা বাজারের থলির মধ্যে একটা জড়িপাড় লাল শাড়ি একটা লাল ব্লাউজ বুক উঁচু করার জন্য গামছা এক শিশি আলতা সামান্য পাউডার ভরে খয়েরবাড়ি চেকপোস্টের দিকে রওনা হয়। পালা শুরুর আগে সে রানির পোশাক পরে নেবে।

চেকপোস্টে পৌছেই সে বুঝতে পারে, কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। কানাঘুষো শুনছিল বটে কাল রাত থেকে। এখন বোঝা গেল কাল গভীর রাত থেকে বর্ডার সিল করে দিয়েছে বিএসেফ। “আজি রোববার মোক বেরুবাড়ি হাট যাবার নাগে। হেই কতক্ষণ ধরি দাঁড়ি আছু!” নগেন বলে। গন্ধেশ্বর ফিসফিস করে বলে, “কী হইল?” সোলমন বলে, “মুই কি জানি নাকি রে ন্যাকা!” আজ ১৯শে পৌষ, ঠান্ডার মধ্যেও দরদর করে ঘামতে থাকে গন্ধেশ্বর। “কুঠে বোমা ফাটিল আর দফাদারপাড়ার বর্ডার সিল করি দিল!” এতক্ষণে গন্ধেশ্বর কথাবার্তায় বুঝেছে, দিল্লি বা বোম্বাইতে কাল সন্ধ্যায় বোমা ফেটেছে তাই ওপরের অর্ডারে বর্ডার সিল করে দিয়েছে বিএসেফ, ভীষণ কড়াকড়ি চলছে। গন্ধেশ্বরের কথা ছিল দুপুরের মধ্যে বর্ডারের গেট পেরিয়ে মানিকগঞ্জ চলে যাবে, সারারাত পালা করে সে অধিকারীর বাড়িই থেকে যাবে। কিন্তু রাতে থাকা তো পরের কথা, এখন সে বের হতেই পারছে না দফাদারপাড়া থেকে।

“কি গন্ধেশ্বর, তোর মেয়েছেলে সাজার কী হল আজকে? তোর তো আজকেই পালা!” গন্ধেশ্বরের মুখে কোনও কথা নেই। বাজারের থলিতে ভরা কস্টিউম হাতে সে থরথর করে কাঁপছে। নদীর ওপারে তাকিয়ে সে বোঝার চেষ্টা করছে যে আজ পালা হবে কী না! কিন্তু তাঁকে যেন কানা হুলায় ধরেছে, মুখ দিয়ে কথা বেরোচ্ছে না। কে যেন পিছন থেকে বলে যাচ্ছে, “দিল্লিত বসি দফাদারপাড়ার মানষিগুলার পাছত যে বাঁশখান গুঁজি দিল্, তার জন্যই তো আজি কুঠে বোমা ফাটে আর আমাদের নদী পারায় ওই পারে যাওয়া বন্ধ হই যায়, বর্ডার সিল কইরা দেয়। এই দ্যাশ, এই মানিকগঞ্জ য্যান মোর দ্যাশ না হয়!” দীপেন বলে, “১৪ নাম্বার বেরুবাড়ি ইউনিয়ন কেস দেখাইসে আমাগো…” সুখেন ছাগল নিয়ে বেরুবাড়ি হাটে যাচ্ছিল, যেতে না পেরে বলে, “হামরালা অবস্থা হসে গন্ধেশ্বরের মত, মানষিটা ব্যাটাছেলে কিন্তু মেয়েছেলের ভাব। ইন্ডিয়ার সিটিজেন কিন্তু তারকাঁটার এই পারে। মানিকগঞ্জের লোকগুলা তো দফাদারপাড়ার লোকগুলাক আপন করি নেয় নাই, পর রাখিছে!” নিজের নামটা সুখেনের গলায় শুনে হুঁস ফেরে গন্ধেশ্বরের। সে কাগজে লিখে আনা নম্বর লাগিয়ে পাগলের মতো এর ফোন তার ফোন থেকে করার চেষ্টা করে যে আজ পালা হবে কী না! দফাদারপাড়ায় বেশিরভাগ সময় ইন্ডিয়া বা বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক কাজ করে না।

বিকেলের আলো বলছে সন্ধ্যা নামতে আর বেশি দেরি নাই। পাঙ্গার শিরশিরে হাওয়ায় ঠান্ডা লাগছে গন্ধেশ্বরের চোখেমুখে। তার দমটা যেন আঠার মতো আটকে আছে কলিজায়, গলা শুকিয়ে কাঠ। গন্ধেশ্বরের কাছে দিল্লি বোম্বে কলকাতা না, মানিকগঞ্জই একমাত্র ইন্ডিয়া, একমাত্র শহর, যেখানে সে যাত্রাপালার অভিনয় করতে যেতে চায়। পাঙ্গা নদী পেরিয়ে বর্ডার পেরিয়ে সে নিজের দেশ থেকে নিজের দেশেই যেতে পারে না। দিল্লিতে বোমা ফাটলে কয়েক হাজার মাইল প্রান্তের গ্রাম মানিকগঞ্জে কেন যাত্রাপালায় অভিনয় করা যাবে না, গন্ধেশ্বর বুঝে উঠতে পারে না।

কস্টিউমের ব্যাগ হাতে নিয়ে সে নদী বরাবর হাঁটা দেয়। সকালে দাঁতন করতে করতে পালার রিহার্সাল করে যেখানে সেখানে পৌঁছে যায়। গন্ধেশ্বর ওর ঠাকুরদা আমাসু রায়ের থেকে শুনেছিল, প্রথমে কোচবিহারের সঙ্গে রংপুরের পাশাখেলায় মৌজা বাজি ধরলে অনেক গ্রাম পূর্ব পাকিস্তান আর ভারতের মধ্যে এদিক চলে যায়। পরে স্বাধীনতার সময় কেষ্টবিষ্টু যারা দিল্লিতে বসে দেশ ভাগ করেছিল, ওরা বেরুবাড়ি মানিকগঞ্জ বাংলাদেশকে চিলপাখির মত উপর থেকে দেখে ছুড়ি দিয়ে বর্ডার এঁকে দিয়েছিল। একবার ছোঁ মেরেছিল ইন্ডিয়ায়, একবার বাংলাদেশে। আজও যেন সেই চিলপাখির চোখে দেখা পাঙ্গা নদী, কাঁটাতারের পিছনে ঘোড়ার খুরের মতো গোল দফাদারপাড়াকে ওপর থেকে যাত্রাপালার গোল মঞ্চের মতই দেখায়! মঞ্চের সমানে কাঁটাতারের ওইপারে নগর বেরুবাড়ি খারিজা বেরুবাড়ি সাকাতি কাশিয়াবাড়ি মানিকগঞ্জ দেওয়ানগঞ্জ ঘুঘুডাঙা দিল্লি বোম্বাই আর গোটা ইন্ডিয়া দেশটা যেন এই পালার দর্শক। সদ্য সাবান লাগানো লম্বা চুল খুলে হেটো ধুতির কোঁচা খুলে শাড়ির কুঁচি দিয়ে পরে গায়ের আলোয়ানটাকে শাড়ির আঁচলের মত জড়িয়ে গন্ধেশ্বর নারীর সাজে চিকন গলায় একটার পর একটা সংলাপ বলে যায় সম্রাট অজিতের উদ্দেশে, দফাদারপাড়া থেকে।

গন্ধেশ্বর বলছে, “ওগো মুই তোরমাই পভু… তোমার জয় পরাজয় মোর… সেন্দুরের দিব্যি, মুই তোর তামান সুখ দুঃখ জয় পরাজয় সোগোলঠে আছ… মোক নিয়া চলো…”

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...