জেমসের দূরবীন

তপারতি গঙ্গোপাধ্যায়

 



গবেষক, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজ্ঞান লেখক, প্রসারভারতী

 

 

 

হোয়াটস ইন এ নেম?

জেমস এডুইন ওয়েব। ১৯০৬ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার জন্ম। অসম্ভব বর্ণময় এবং কিছুটা বিতর্কিত জীবন। জীবনের শ্রেষ্ঠ মুহূর্তগুলি জেমস কাটিয়েছেন যুদ্ধে, যুদ্ধের বিজ্ঞান নির্মাণে এবং পরবর্তীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ভারসাম্যের প্রচেষ্টায়। ১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি তাঁকে নাসার ডেপুটি হিসেবে নিয়োগ করেন। ১৯৬৯ সালে তাঁর অবসর এর প্রাকমুহূর্ত অবধি নাসার ৭৫টি স্পেস মিশন এবং বিশেষ করে চন্দ্র অভিযানের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন। জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ শুরু হয়েছিল নেক্সট জেনারেশন স্পেস টেলিস্কোপ নামে। ২০০২ সালে নাসা এই টেলিস্কোপ তাঁর নামে উৎসর্গ করে।

 

বড়দিন!

১৯৯৬ সালে নেক্সট জেনারেশন স্পেস টেলিস্কোপ প্রজেক্ট শুরু হয়। ২০০৭ সালে উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বিভিন্ন বাধা পেরিয়ে এবং টেলিস্কোপের ডিজাইনের বড়সড় কিছু পরিবর্তনের পরে ২০০৫ থেকে ২০১৬-তে নতুনভাবে কাজ হয় এবং মূল টেলিস্কোপটি গড়ে ওঠে। তারপর শুরু হয় ব্যাপক পরীক্ষানিরীক্ষা। দীর্ঘ পঁচিশ বছরের অজস্র ভাঙাগড়ার হিসেব পেরিয়ে অবশেষে ২০২১ এর ২৫ ডিসেম্বর কোরু, ফ্রেঞ্চ গিয়ানা থেকে একটি আরিয়ান ৫ রকেটে জেমস ওয়েব মহাকাশে রওনা দেয়। পৃথিবী থেকে অনেক অনেক দূরে, ১৫ লক্ষ কিলোমিটার পেরিয়ে সৌরজগতের এক গুরুত্বপূর্ণ ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট এর কক্ষপথে স্থাপিত হয় জেমসের দূরবীন। এই কক্ষপথে সে সূর্যের অতি উজ্জ্বল আলোর থেকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারবে, পৃথিবীর সঙ্গে আপেক্ষিক দূরত্বও বজায় রাখা সম্ভব হবে।

এখানে জানাই ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট কি। মহাকাশ প্রযুক্তির ভাষায় এটি এমন এক বিন্দু যেখানে কোনো বস্তুকে স্থাপন করলে তার অবস্থান ভারসাম্যে থাকবে। অর্থাৎ কক্ষীয় গতির ক্ষেত্রে দুটি ভারী বস্তু যখন একে অপরের চারপাশে ঘোরে, তখন যে বিন্দুতে ওই দুই বস্তুর সম্মিলিত মহাকর্ষ বল সেই বিন্দুতে রাখা তৃতীয় এবং অপেক্ষাকৃত অনেক ছোট কোনও বস্তুর অভিকেন্দ্র বলের সমান হয়, তাকে বলে ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট। কোনও মহাকাশযান বা টেলিস্কোপকে এমন বিন্দুতে স্থাপন করলে জ্বালানি খরচ অনেক কম হয়। পৃথিবী এবং সূর্যের ক্ষেত্রে এমন পাঁচটি বিন্দু আছে। এর মধ্যে তিনটি পরিবর্তনশীল এবং দুটি স্থির। L2 একটি পরিবর্তনশীল ল্যাগ্রাঞ্জ পয়েন্ট।

L2 বিন্দুতে উইলকিনসন মাইক্রোওয়েভ অ্যানাইসোট্রপি প্রোব স্থাপিত হয়েছিল। ইউরোপের প্ল্যাঙ্ক স্পেস টেলিস্কোপ এবং নাসার জেমস ওয়েব এই মুহূর্তে সেখানে অবস্থিত। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ এই কক্ষপথে ১১৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে।

 

ওয়েবের সাজসরঞ্জাম

৬২০০ কিলোগ্রাম ওজন, ৮ মিটার দৈর্ঘ্য, ৬.৬ মিটার-এর প্রাইমারি মিরর। ওয়েব টেলিস্কোপের মূল দক্ষতা হল, এর আয়নায় ০.৬ থেকে ২৮.৮ মাইক্রন এর দৃশ্যমান থেকে অবলোহিত আলোর যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করে তাকে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিভিন্ন রিসেপ্টরে পৌঁছে দেওয়া। মাইক্রন হল এক মিটারের ১০ লক্ষ ভাগের এক ভাগ দৈর্ঘ্য। ১৮টি ষড়ভুজ আয়নায় মোট ২৫ বর্গমিটার ক্ষেত্রফলে দূরতম, ক্ষীণতম উৎসের আলোকে আটকে ফেলে, ব্রহ্মাণ্ডের আদিতম উৎস সন্ধানের গভীরতা বিজ্ঞানীদের সমস্ত প্রত্যাশাকে ছাপিয়ে গেছে।

Integrated Science Instrument Module (ISIM): এখানেই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ চারটি জিনিস আছে।

Near-Infrared Camera বা NIRCam: এই সেই ক্যামেরা, যাতে ইনফ্রারেড আলো ধরা পড়ে। ০.৬ থেকে ৫ মাইক্রন তরঙ্গদৈর্ঘ্য নিয়ে এই ক্যামেরা কাজ করে। অ্যারিজোনা বিশ্ববিদ্যালয় এই ক্যামেরার কারিগর।

NIRCam

Near-Infrared Spectrograph বা NIRSpec: অর্থাৎ ইনফ্রারেড আলোর বর্নালিবীক্ষণ যন্ত্র। এর সাহায্যে বিভিন্ন আলোর শক্তি এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য পরীক্ষা করা হয়, কত দূর থেকে আলো আসছে, তার রেডশিফ্ট কী, উৎস কত পুরনো, সব কিছু এই যন্ত্রের সাহায্যে বোঝা যায়। ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি এবং নাসা গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই স্পেক্ট্রোগ্রাফ।

Mid-Infrared Instrument বা MIRI: ইনফ্রারেড আলোর বিস্তার বেশ অনেকটা। বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের জন্য বিভিন্ন মানের ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়। যেমন এই বিস্তারের মাঝামাঝি স্থানে যে উৎস আছে তার জন্য দরকার মিড ইনফ্রারেড ক্যামেরা। এই ক্যামেরায় ৫ থেকে ২৮ মাইক্রন তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো ধরা পড়ে। MIRI ইউরোপিয়ান স্পেস এজেন্সি এবং নাসা জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির তৈরি।

Fine Guidance Sensor/Near InfraRed Imager এবং Slitless Spectrograph বা FGS/NIRISS: গাইডেন্স সেন্সর টেলিস্কোপকে লক্ষ্যবস্তু বা টার্গেট এর উপর নিখুঁত ফোকাস করতে সাহায্য করে। স্পেক্ট্রোগ্রাফ ০.৬ থেকে ৫ মাইক্রন অবধি আলোর বর্ণালী থেকে মহাবিশ্বের প্রথম আলো, এক্সোপ্ল্যানেট সন্ধানের কাজ করে। এই অংশটি কানাডিয়ান স্পেস এজেন্সির তৈরি।

এছাড়া Optical Telescope Element (OTE), যেখানে আয়না এবং তার ব্যাকপ্লেন আছে, এবং the Spacecraft Element, যেখানে মহাকাশযান এবং সানশিল্ড আছে। সানশিল্ড খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটি টেলিস্কোপের এর উষ্ণ এবং শীতল অংশকে ভাগ করে। তাপকে পাঁচটি স্তর ভেদ করে টেলিস্কোপ অবধি পৌঁছতে হয়। এর ফলে ইনফ্রারেড বিকিরণ থেকে টেলিস্কোপ সুরক্ষিত থাকে।

সানশিল্ড

 

তুমি কি কেবলই ছবি?

১৮টি ষড়ভূজ আয়নার প্রত্যেকটি একটি স্বতন্ত্র টেলিস্কোপের মত কাজ করে। বিভিন্ন কৌণিক দিক থেকে আলো এসে একের পর এক ডিটেক্টরে জমা হয়। একে বলে ইমেজ স্ট্যাকিং। তারপর এই প্রতিটি সেগমেন্টের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য এবং দশাকে কোর্স ফেজিং-এর মাধ্যমে একত্রিত করে গাণিতিক সিমুলেশন রকে একটি সম্পূর্ণ প্রাথমিক আয়নার মতো কাজ করতে সাহায্য করে। এরপর ফাইন ফেজিং-এর মাধ্যমে বিভিন্ন কম্পোনেন্ট অর্থাৎ প্রাইমারি ইমেজার, নিয়ার ইনফ্রারেড ক্যামেরা এবং অবজারভেটরির আয়নাকে অ্যালাইন করা হয়। গত কুড়ি বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে ছবির সূক্ষ্মতা, তার ডিটেইলিং-এর সমস্ত উচ্চতা এবং মাইলস্টোন ছাপিয়ে গেছে জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ।

মূলত যে ছবি এসে পৌঁছায় তা সাদা কালো। বিভিন্ন শক্তি, তীব্রতা এবং তরঙ্গদৈর্ঘ্য অনুসারী রঙের ব্যান্ড ব্যবহার করা হয়, সেইমত একটি কম্পোজিট ইমেজ তৈরি হয়।

প্রাইমারি মিরর

 

প্রথম আলোয় পাঁচটি তারার তিমির

১৮০০ সালে উইলিয়াম হার্শেল প্রিজম প্রতিসরণের সাহায্যে ইনফ্রারেড আলো আবিষ্কার করেন। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বপরিচয় প্রবন্ধে আল্ট্রাভায়োলেট এবং ইনফ্রারেড-এর বড় সুন্দর দুটি নাম দিয়েছেন। বেগনি পারের আলো এবং লাল উজানি আলো। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের মূল লক্ষ্য এই লাল উজানি আলোয় ব্রহ্মাণ্ডের আদিমতম মুহূর্তের সন্ধান করা। ইনফ্রারেড তরঙ্গদৈর্ঘ্যের বিস্তার o.৭৫ থেকে কয়েকশো মাইক্রন। যে উৎসের রেডশিফট যত বেশি, সেই উৎস তত দূরের বা তত পুরনো। এখানে একটু বুঝিয়ে দিই রেডশিফট কী। এই ব্রহ্মাণ্ড যখন তৈরি হয়েছিল, তখন খুব ঘন অবস্থায় ছিল। আলো সেই ঘনত্ব ভেদ করতে পারত না। ইনফ্লেশন শুরু হওয়ার পরে প্রসারণ শুরু হয়। এবং সেই প্রসারণের ফলে মহাজাগতিক বস্তুরা একে অপরের থেকে দূরে চলে যেতে শুরু করে। একটা বেলুনে কিছু ডটস এঁকে তাকে ফোলাতে থাকলে সেই বিন্দুগুলি একে অপরের থেকে দূরে সরে যায়। ব্রহ্মাণ্ড প্রসারণও ঠিক তেমনই। একে comoving distance বলে। এর ফলে সেসব উৎস থেকে আলো আসতে অনেক বেশি পথ অতিক্রম করতে হয়, আলোর শক্তি কমতে থাকে। এনার্জির সঙ্গে তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সম্পর্ক আমরা মোটামুটি জানি। আবার তরঙ্গদৈর্ঘ্যের সঙ্গে রঙের একটা সম্পর্ক আছে। শক্তি কমতে থাকলে তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাড়বে। ফলে রং লালের দিকে সরতে থাকবে। একেই বলে রেডশিফট। যার রেডশিফট যত বেশি, সেই উৎস তত দূরের, এবং হতে পারে সেই উৎস অনেক পুরনো। উচ্চ রেডশিফট খুঁজে পাওয়ার উপায় হল ইনফ্রারেড ক্যামেরা। সেই আলোয় ব্রহ্মাণ্ডের ধূলিকণা সরিয়ে আমাদের চেনা পাঁচটি ছবিকে অন্য আলোয় উদ্ভাসিত করেছে জেমস ওয়েব।

এই ঘন আবরণ উঠে গেলে
অবিচ্ছেদে দেখা দিবে
দেশহীন কালহীন আদিজ্যোতি
শাশ্বত প্রকাশ পারাবার।

–“রোগশয্যায়” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

ওয়েবের প্রথম ডিপ ফিল্ড

লাল উজানি আলোয় মহাবিশ্বের সৃষ্টির আদি মুহূর্তের রূপ ফুটে উঠল, জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের নিয়ার ইনফ্রারেড ক্যামেরা বা NIRCam-এ। এই ছবির উইন্ডোটি দৃশ্যমান ব্রহ্মাণ্ডের কতটা জায়গা জুড়ে আছে? আঙুলে একটি বালির দানা নিয়ে চোখ থেকে এক হাত দূরত্বে যদি রাতের আকাশের দিকে তুলে ধরি, তাহলে আকাশের যেটুকু অংশ ওই বালির দানায় আটকা পড়বে, সেইটুকু! সেই আণবিক প্যাচ স্কাই-এর মধ্যে দেখা যাচ্ছে অন্তত কয়েক হাজার ছায়াপথ। ছবির মাঝামাঝি দেখা যাচ্ছে দক্ষিণ গোলার্ধের ছায়াপথগুচ্ছ বা গ্যালাক্সি ক্লাস্টার SMACS 0723। আশেপাশে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য ক্ষীণ রক্তিম আলোর উৎস একটু বেঁকে, একটু লম্বাটে আকারে ছড়িয়ে আছে। এর কারণ গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং। একটু বুঝিয়ে দিই। প্রতি বস্তুর মহাকর্ষ থাকে যা বস্তুর ভরের উপর নির্ভর করে। কিন্তু মহাকর্ষ বল খুব দুর্বল। তাই বস্তুর ভর খুব বেশি না হলে এর প্রভাব বোঝা যায় না। এবার খুব বেশি ভরের বস্তু তার চারপাশের যে স্পেস বা স্থান, তাকে বেঁকিয়ে ফেলে। যেমন, খুব টানটান কাপড়ে একটা ভারী ধাতব বল রাখলে সেই কাপড়টা আর সোজা থাকবে না। বলের ভারে চারপাশ একটা বক্রতা তৈরি হবে। একে বলে কার্ভড স্পেস। এবার কোনও ছোট্ট বস্তুকে ওই স্পেসে রাখলে সে ওই কার্ভ অনুযায়ী চলবে। তেমনই আলো ওই স্পেসে চলাচল করলে তাকেও বেঁকে যেতে হয়, ফলে সময় বেশি লাগে, পথও আলাদা হয়। লেন্সের মধ্যে দিয়ে আলোর পথ যেমন বেঁকে যায়, তেমনই। একেই বলে গ্র্যাভিটেশনাল লেন্সিং। এর ফলে অনেক মজার জিনিস ঘটে। যেমন কোনও স্টার ক্লাস্টার বা গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের পিছনে যদি কোনও নক্ষত্র বা অন্য ছায়াপথ থাকে তার আলো এভাবে লেন্সড হয়ে বস্তুকে অনেকটা ম্যাগনিফাই করে, এবং বেশ ডিস্টর্টও করে ফেলে। সেই সময় কোনও ভালো রেজোলিউশনের টেলিস্কোপের দৃষ্টিপথে থাকলে ধরা পড়ে যায়। এই ছবিতে সামনের গ্যালাক্সি এবং ডার্ক ম্যাটার মিলে কসমিক টেলিস্কোপের মতো কাজ করছে। পিছনের গ্যালাক্সিগুলি প্রতিফলিত এবং লেন্সড হয়ে জেমস ওয়েব ডিপ ফিল্ড-এ ধরা দিচ্ছে। দেখা যাচ্ছে SMACS 0723-এর আশেপাশে আরও অনেক পুরনো আলো, ওয়েবের বর্ণালীবীক্ষণ থেকে জানা যাচ্ছে তারা প্রায় ১৩১০ কোটি বছরের পুরনো।

ডিপ ফিল্ড খুব দীর্ঘ এক্সপোজারে মহাকাশের ছবি তোলে। তার ফলে অনেক ক্ষীণ আলোর উৎস ধরা পড়ে। ১৯৯০ থেকে বিভিন্ন টেলিস্কোপ ব্রহ্মাণ্ডের অসংখ্য ডিপ ফিল্ড ছবি তুলেছে। সময়ের সঙ্গে ক্যামেরা রেজোলিউশন বেড়েছে, ইনফ্রারেড অ্যাস্ট্রোনমির সাহায্যে অনেক দূরের, অনেক পুরনো আলোর উৎস ধরা পড়েছে। প্রায় সাড়ে বারো ঘণ্টার এক্সপোজারে, বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্যে, আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগে SMACS 0723-73-এর যে চেহারা, সেটাই ফুটে উঠেছে জেমস ওয়েবের ক্যামেরায়। অসংখ্য নক্ষত্র এবং ছায়াপথের আলোয় ভেসে যাচ্ছে এই ৫ আলোকবর্ষ জোড়া আকাশ। এই ডিটেইলিং অবিশ্বাস্য, অভূতপূর্ব!

জাগিয়া চাহিয়া ছিনু আঁধার আকাশ জুড়ি
সমস্ত নক্ষত্র নিয়ে, তোমারে লুকায়ে বুকে।

–“শেষ উপহার”, মানসী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

কসমিক ক্লিফস, কারিনা নেবুলা

চাঁদের আলোয় ধুয়ে যাচ্ছে ধবল চূড়া, নক্ষত্রের আলোয় হীরে বোঝাই আকাশ। এমনটাই মনে হয় এই কসমিক ক্লিফ-এর দিকে তাকালে। ৭৬০০ আলোকবর্ষ দূরের তরুণ NGC 3324-এর গ্যাসীয় অঞ্চল। কারিনা নক্ষত্রপুঞ্জের এই ছায়াপথ প্রথম নথিভুক্ত করেন জেমস ডানলপ, ১৮২৬ সালে। যে বাষ্পের উঁচুনিচু পাহাড়চূড়া, তা আসলে আয়নিত গ্যাসের প্রবাহ। এখানে তারাদের জন্ম হচ্ছে প্রতিনিয়ত, আল্ট্রাভায়োলেট আলোর বিকিরণের সঙ্গে দুর্দান্ত গতিশীল স্টেলার উইন্ড, অত্যন্ত উত্তপ্ত সদ্যোজাত তারার আলোয় ভরে আছে। নিয়ার ইনফ্রারেড ক্যামেরায় অসংখ্য লুকিয়ে থাকা তারা এবং ছায়াপথের সেই আশ্চর্য দৃশ্য ধরা পড়েছে। ছবিতে যে অঞ্চল দেখা যাচ্ছে, সেটি ১৬ আলোকবর্ষ বিস্তৃত।

স্টার ফর্মেশনের একদম প্রথম মুহূর্ত টেলিস্কোপে তুলে আনা প্রায় অসম্ভব। কারণ এই অবস্থা মাত্র ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ বছর স্থায়ী হয়। হ্যাঁ, ব্রহ্মাণ্ডের নিরিখে তা কয়েক মুহূর্ত মাত্র। কিন্তু জেমসের দূরবীনের অসীম ক্ষমতা এবং নিখুঁত রেজোলিউশন সেই বিরল মুহূর্তের সাক্ষী করে রাখল আমাদের।

 

স্টেফানস কুইন্টেট

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের তোলা এখনও অবধি সবথেকে বড় ছবি। ১০০০টি ছবি জুড়ে এই ১৫ কোটি পিক্সেল-এর ছবিটি তৈরি করা হয়েছে। ২৯ কোটি আলোকবর্ষ দূরের পেগাসাস নক্ষত্রপুঞ্জে এই পাঁচটি ছায়াপথের অবস্থান। স্টেফানস কুইন্টেট আবিষ্কার করেন এডুয়ার্ড স্টেফান, ১৮৭৭ সালে। একে Hickson Compact Group বা HCG 92-ও বলা হয়। একদম নিচে NGC 7317, তার ঠিক উপরে ডানদিকে NGC 7318A, NGC 7318B, একদম উপরে NGC 7319, এই চারটি ছায়াপথ একে অপরের খুব কাছাকাছি, এবং বাঁদিকে NGC 7320 বেশ কিছুটা দূরের। এদের মধ্যে উপরের NGC 7319 ছায়াপথের কেন্দ্রে রয়েছে একটি অতিকায় কৃষ্ণগহ্বর, যার ভর সূর্যের আড়াই কোটি গুণ বেশি, ঔজ্জ্বল্য সূর্যের ৪০০০ কোটি গুণ। মিড ইনফ্রারেড ক্যামেরায় সেই অসম্ভব উজ্জ্বল অ্যাক্টিভ গ্যাল্যাক্টিক নিউক্লিয়াস ধরা পড়েছে, তার সঙ্গে চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য আদিম ছায়াপথ।

নিয়ার এবং মিড ইনফ্রারেড ক্যামেরায় পাঁচটি গ্যালাক্সির বিস্তারিত ছবি ধরা পড়ছে। এর মধ্যে চারটি গ্যালাক্সির নিজেদের মধ্যে ভর আদানপ্রদান এবং সংঘর্ষের প্রমাণও পাওয়া গেছে। এই অদ্ভুত ডিটেইলিং আগে কখনও দেখা যায়নি। অসংখ্য নতুন নক্ষত্রপুঞ্জ, তারার জন্ম এবং বিস্ফোরণ ঘটছে। কৃষ্ণগহ্বরের মহাকর্ষ বলের প্রভাবে বিভিন্ন ছায়াপথ থেকে তারা, গ্যাসীয় এবং ধুলোর স্তর প্রবেশ করছে NGC 7319 ছায়াপথে। এর মধ্যে মিড ইনফ্রারেড ক্যামেরায় ধরা পড়ছে NGC 7318B থেকে আসা শক্তিশালী শক ওয়েভ। ছায়াপথ মধ্যবর্তী গ্যাসীয় অঞ্চলের সংঘর্ষের ফলে তৈরি হচ্ছে এই অনন্য ঢেউ।

ছায়াপথের একে অপরের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া, এবং আদানপ্রদান ছায়াপথের বিবর্তনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এই সূক্ষ্মতার সঙ্গে দুটি ছায়াপথের বিক্রিয়ার সঙ্গে নতুন তারার জন্মের যোগাযোগ, বিন্যাস এবং পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানের পক্ষে নিঃসন্দেহে যুগান্তকারী।

 

সাদার্ন রিং নেবুলা

পৃথিবী থেকে ২৫০০ আলোকবর্ষ দূরের ভেলা নক্ষত্রপুঞ্জের এই নীহারিকা আসলে দুটি তারা, ধুলোর আস্তরণে ঢাকা। এটি একটি প্ল্যানেটারি নেবুলা। এই ধরনের নেবুলা আয়নিত গ্যাসের খোলসে ঢাকা থাকে এবং আলো নির্গত হয়। সাধারণত খুব বড় তারাদের জীবনের শেষ পর্যায়ে এই ধরনের নীহারিকা তৈরি হয়। উইলিয়াম হার্শেল ১৭৮০ সালে এই নেবুলা আবিষ্কার করেন। সাদার্ন রিং নেবুলার পোশাকি নাম NGC 3123। সূর্যের মতো এই তারাটি মৃতপ্রায়, শ্বেতবামন বা হোয়াইট ডোয়ার্ফ-এ পরিণত হচ্ছে, এবং নিয়মিত ভর এবং শক্তির আস্তরণ নির্গত হচ্ছে, মূলত নীল, সবুজ, লাল, হলুদ এবং সায়ান আলোর আভা। একে এইট বার্স্ট নেবুলাও বলা হয়। কারণ কয়েক হাজার বছরের মধ্যে আটটি গ্যাসীয় স্তরের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে এই নেবুলা।

তবে এতদিন বোঝা যায়নি আসলে এরা দুটি তারা। ডানদিকের মিড ইনফ্রারেড ছবিতে আরও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, আসলে দুটি তারা একটি বাইনারি সিস্টেমে আবদ্ধ। চারপাশের ধুলোর আস্তরণে দ্বিতীয়, অপেক্ষাকৃত কম উজ্জ্বল তারাটি ঢেকে ছিল। হাজার হাজার বছর ধরে এই ছোট তারাটি আয়নিত গ্যাস থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভিন্ন দিকে আলো ছড়িয়েছে। এই প্রথম জেমস ওয়েবের মিড ইনফ্রারেড ক্যামেরায় এই রহস্য উন্মোচিত হল। এদিকে নিয়ার ইনফ্রারেড ক্যামেরায় প্রকাশিত হল উজ্জ্বলতর তারাটির স্টেলার বিবর্তনের একদম প্রথম দশা। সে তার সঙ্গী শ্বেত বামন তারার চারপাশে ঘুরে আয়নিত গ্যাসের নিঃসরনে সাহায্য করছে। সাদার্ন রিং নেবুলার চারপাশের লাল অংশটি জুড়ে রয়েছে অসংখ্য দূরবর্তী ছায়াপথ।

 

এক্সোপ্ল্যানেট WASP 96B

সূর্য ছাড়া অন্যান্য তারাদের ঘিরে যে গ্রহরা প্রদক্ষিণ করে তাদের এক্সোপ্ল্যানেট বলে। পৃথিবী থেকে ১১২০ আলোকবর্ষ দূরে ফিনিক্স নক্ষত্রপুঞ্জে হলুদ বামন তারা WASP 96-কে ঘিরে আবর্তিত হয় WASP 96b গ্রহটি। বৃহস্পতির প্রায় অর্ধেক ভরের এই এক্সোপ্ল্যানেট আবিষ্কৃত হয়েছে ২০১৩ সালে। নয় বছর পরে নিয়ার ইনফ্রারেড স্পেকট্রোগ্রাফের ট্রান্সমিশন স্পেকট্রাম থেকে WASP 96b-র আবহাওয়ায় জল এবং মেঘের সন্ধান পেল জেমস ওয়েব।

ট্রান্সমিশন স্পেকট্রামের মাধ্যমে কোনও একটি নক্ষত্রের আলোর বৈশিষ্ট্য তাকে প্রদক্ষিণ করা কোনো গ্রহের উপস্থিতির কারণে কিভাবে পরিবর্তিত হয়, সেটা তুলনা করে। গ্রহের আবহাওয়া তারার আলোকে শোষণ করে প্রতিফলিত করে। সেই বর্ণালী থেকে বোঝা যায় গ্রহটির আবহাওয়ায় কী ধরনের গ্যাসীয় পদার্থ আছে। এছাড়াও ট্রানজিট লাইট কার্ভ থেকে দেখা যাচ্ছে নক্ষত্রের কতটা আলো গ্রহের আড়ালে ঢাকা পড়েছে। সেখান থেকেও গ্রহের আবহাওয়ায় থাকা পদার্থের রাসায়নিক বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করা যায়। এটা অদ্ভুত এক পর্যবেক্ষণ। ১৪১টি ডেটা পয়েন্ট বিশ্লেষণ করে WASP 96b এক্সোপ্ল্যানেটের আবহাওয়ায় জলীয় বাষ্প এবং মেঘের অস্তিত্ব প্রমাণ করা সম্ভব হল। ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধান, সূর্যের আবহাওয়া বিশ্লেষণ এবং অ্যাস্ট্রোবায়োলজির ক্ষেত্রে একটি মাইলস্টোন।

 

মহাবিশ্বে মহাকাশে

যে ছবিগুলি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ প্রকাশ করেছে, সবগুলি ছবিই হাবল, স্পিৎজার এবং অন্যান্য টেলিস্কোপ এর আগে বিভিন্ন সময়ে তুলেছে। সূক্ষ্মতা এবং এক্সপোজারের পার্থক্য বিশাল। কোনও ছবির ক্ষেত্রে হাবল-এর এক্সপোজার টাইম যেখানে সাত থেকে দশ দিন, সেখানে জেমস ওয়েব মাত্র ১০ থেকে ১২ ঘণ্টায় সেই ছবি তুলে আনছে যার রেজোলিউশন হাবল-এর প্রায় ১০০০ গুণ বেশি। ফলে প্রতি সপ্তাহে নতুন তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। যে পরিমাণ অজানা তথ্য সংগ্রহ করছে জেমস ওয়েব, তা অবিশ্বাস্য। হাবল পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে ৫৫০ কিলোমিটার দূরের কক্ষপথ থেকে। জেমস ওয়েব ১৬ লক্ষ কিলোমিটার দূরের কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করছে। সুতরাং তার অভাবনীয় পরিধি সম্পর্কে সামান্য অনুমান করা যায়। অবশ্যই ব্রহ্মাণ্ড পর্যবেক্ষণের প্যারাডাইম শিফ্ট। অবশ্যই পথপ্রদর্শক হাবল।

কার্ল সাগানের পেল ব্লু ডট মহাকাশের নিরিখে আমাদের ক্ষুদ্র তুচ্ছ এক অবস্থানের সাক্ষী করে রেখেছিল। সাগান বলেছিলেন, আমাদের জিনের নাইট্রোজেন, আমাদের দাঁতের ক্যালসিয়াম, আমাদের রক্তের আয়রন, এসবই মৃত তারাদের শরীরের সংশ্লেষ। আমরা আসলে তারারই গুঁড়ো। জেমসের দূরবীন আমাদের যে অবিশ্বাস্য অসীমের সামনে এনে ফেলেছে, আমাদের সভ্যতার এই টাইমফ্রেম, আমাদের বিবর্তনের ভালোমন্দ, সবকিছু ছাপিয়ে যাচ্ছে আমাদের তুচ্ছতার ধারণা। আরও বিস্ময় হল, সেই রহস্য উন্মোচনের কারিগরও সেই মানুষই।

অধিক গভীরভাবে মানবজীবন ভালো হ’লে
অধিক নিবিড়তরভাবে প্রকৃতিকে অনুভব
করা যায়। কিছু নয়— অন্তহীন ময়দান অন্ধকার রাত্রি নক্ষত্র—
তারপর কেউ তাকে না চাইতে নবীন করুণ রৌদ্রে ভোর;
অভাবে সমাজ নষ্ট না-হ’লে মানুষ এইসবে
হ’য়ে যেত এক তিল অধিক বিভোর।

–সূর্য, রাত্রি, নক্ষত্র; জীবনানন্দ দাশ

 

তথ্যসূত্র এবং ছবি:

নাসা, জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ, স্পেস টেলিস্কোপ সাইন্স ইনস্টিটিউট

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

  1. অতীব সুলিখিত, বিষয়-্নিবদ্ধ। একই সঙ্গে প্রাঞ্জল অথচ গভীর। এই ধরণের লেখায় আমাদের মতো সাধারণ পাঠকের খুব কাছে চলে আসে বিজ্ঞান, বিষয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়, আরো পড়ার, আরো জানার আগ্রহ জাগে।
    কবিতার অংশগুলি বাদ দিলেও চলত- ব্যক্তিগত মতামত অবশ্যই।

  2. খুব ভালো লাগল৷ সহজ ভাষায় এই কর্মযজ্ঞের ছবি তুলে ধরা হয়েছে৷ একটা বিষয় বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে৷ আপনি লিখেছেন, স্টিফান কুইন্টেট এর একটা ছায়াপথের কেন্দ্রীয় কৃৃৃৃৃৃৃষ্ণগহ্বরটি সূর্যের তুলনায় ৪০০০ কোটি গুণ উজ্জ্বল৷ কৃৃৃৃৃষ্ণগহ্বরের ঔজ্ঝল্য কিভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় যদি বলেন৷ কারণ কৃৃৃৃৃৃষ্ণগহ্বর তো কোন আলো বিকিরণ করে না৷

Leave a Reply to ইন্দ্রাণী দত্ত Cancel reply