পুঁজিবাদ পৃথিবীকে ধ্বংস করছে— এই আত্মধ্বংসী যজ্ঞ থেকে নিজেদের বিরত রাখার সময় এসেছে

জর্জ মঁবিও

 



জর্জ মঁবিও দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার একজন কলামনিস্ট এবং ফেরাল, রিজেনেসিস এবং আউট অফ দ্য রেকেজ: আ নিউ পলিটিক্স ফর অ্যান এজ অফ ক্রাইসিস গ্রন্থের প্রণেতা। বর্তমান নিবন্ধটি গার্ডিয়ান পত্রিকায় গত ৩০ অক্টোবর ২০২১-এ প্রকাশিত হয়। লেখকের সহৃদয় অনুমতিক্রমে আমরা লেখাটি বাংলায় অনুবাদ করে প্রকাশ করলাম। অনুবাদ করেছেন অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায়

 

 

 

মানবপ্রজাতি সম্পর্কে একটি মিথ দীর্ঘকাল ধরে বাজারে প্রচলিত রয়েছে, বাস্তব তথ্যপ্রমাণ যতই উল্টো কথা বলুক না কেন। মিথটি হল, আমরা নাকি সবসময়ই নিজেদের অস্তিত্বরক্ষাকে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব দিয়ে থাকি। অন্যান্য সমস্ত সজীব প্রজাতির ক্ষেত্রে এ-কথা সত্যি। যখনই তারা কোনও অস্তিত্বসঙ্কটে পড়বার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়, যেমন কিনা শীতকাল, তারা তখনই তাদের অধীত সম্পদ অথবা বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অস্তিত্বরক্ষার ক্ষেত্রে সচেষ্ট হয়— পরিযায়ী পাখিরা উড়ে যায় দূর বিদেশের কোনও উষ্ণতর স্থানের সন্ধানে, অথবা আরও কোনও প্রজাতি শীতঘুমে নিজেদেরকে সরিয়ে নেয়। একমাত্র ব্যতিক্রম এই মানুষ!

যখনই আমরা (মানুষ) আসন্ন অথবা ধারাবাহিক কোনও সঙ্কটের মুখোমুখি হই— যেমন কিনা পরিবেশগত পরিবর্তন অথবা বাস্তুতন্ত্রের আসন্ন ভেঙে পড়ার কোনও সম্ভাবনা— আমরা নিজেদের গণ্ডি ছেড়ে বেরিয়ে প্রথমেই সেই সঙ্কটের সঙ্গে নিজেদের অস্তিত্বরক্ষার প্রক্রিয়াটিকে কোনওভাবে আপস করিয়ে নেওয়ার এক অদ্ভুত প্রচেষ্টায় সামিল হই। নিজেদেরকে বোঝাতে চেষ্টা করি, এ এমনটাও কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। এমনকি আদৌ সেই সঙ্কট আসন্ন কিনা, অথবা ঘটমান কিনা— সে বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করি। এমনভাবে আমরা ধ্বংসের প্রক্রিয়াটিকেই ক্রমশ ত্বরান্বিত করি— সাধারণ গাড়ির বদলে আরও মজবুত এসইউভি গাড়িতে চাপতে শুরু করি, লম্বা উড়ানে হারিয়ে যাই কোনও অজানা দ্বীপপুঞ্জের ঠিকানায়। শেষ উল্লাসে সমস্ত কিছুকেই পুড়িয়ে ছাই করে ফেলার বহ্ন্যুৎসবেই মেতে উঠি যেন। আমাদের অবচেতনে তখন কেউ যেন ফিসফিস করে বলে চলে— এই সঙ্কট যদি ততটাই গুরুতর হত, তবে কেউ নিশ্চয়ই আমাদের থামাত! যদিও বা আমরা এমন সমস্ত সঙ্কটের সামান্য কোনও মোকাবিলা করতে কোনওভাবে সচেষ্টও হই, তাহলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা হয় হাস্যকরভাবে প্রতীকি, এবং সেই সঙ্কটের বিশালত্বের সামনে দাঁড়িয়ে এক ক্ষুদ্রের চেয়েও ক্ষুদ্রতর প্রয়াস। আমাদের অস্তিত্বরক্ষার স্বাভাবিক প্রবৃত্তির মিথের বিপরীতে এই ঘটনাগুলিকে লক্ষ করলে খেই হারানো ভিন্ন আর কোনও উপায় থাকে না।

এখন আমরা যা জানি, সেই বিষয়ে দু-এক কথা বলা যাক। আমরা জানি যে আমাদের নিজেদের অস্তিত্ব অত্যন্তরকম জটিল কিছু প্রাকৃতিক নিয়ম, প্রক্রিয়া বা সিস্টেমের উপর সম্পূর্ণভাবে নির্ভরশীল। এগুলি হল, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল, সামুদ্রিক স্রোতের ব্যবস্থা, মাটি অথবা ভূ-স্তরীয় বিন্যাস, এবং পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গার জটিল সমস্ত বাস্তুতন্ত্রের উপস্থিতি অথবা অস্তিত্ব। যাঁরা এমন সমস্ত জটিল নিয়ম[1] বা প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করেন, তাঁরা লক্ষ করে দেখেছেন এমন সব প্রক্রিয়াগুলিই নিজেদের মধ্যে এক সুসামঞ্জস্য বজায় রেখে কাজ করে। তা কোনও ব্যাঙ্কিং পরিচালন ব্যবস্থাই হোক, কোনও রাষ্ট্র অথবা রাজ্যের পরিচালন ব্যবস্থাই হোক, অথবা কোনও চিরসবুজ বনভূমি কিংবা আন্টার্কটিক প্রান্তরের কোনও বিস্তৃত হিমবাহের উপস্থিতি ও তার বাস্তুতন্ত্রের বিন্যাস এবং অস্তিত্বই হোক, এরা প্রত্যেকেই কিছু নির্দিষ্ট গাণিতিক নিয়ম[2] বা মডেলের দ্বারা পরিচালিত হয়। স্বাভাবিক অবস্থায় এরা সামগ্রিক একটি ভারসাম্য বজায় রাখতে চেষ্টা করে, কোনওভাবে সেই ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে পরে সংশোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সেই ভারসাম্যকে ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হয়। কিন্তু সেই ক্ষতি সহ্য করারও এক সীমা আছে। সেই সীমারেখাকে অতিক্রম করলে, পূর্ববর্তী সাম্যাবস্থাটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সেই সিস্টেম বা প্রক্রিয়াটি তখন নতুন এক সাম্যাবস্থায় নিজেকে মানিয়ে নিতে শুরু করে। যেখান থেকে আর পূর্বের অবস্থায় প্রত্যাবর্তন অসম্ভব।

মানবসভ্যতা বর্তমান স্থিতাবস্থাগুলির উপর নির্ভর করে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, সারা পৃথিবীতেই অত্যন্ত জরুরি প্রক্রিয়াগুলির স্থিতাবস্থা চূড়ান্ত ভাঙনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। যদি এগুলির মধ্যে কোনও একটি প্রক্রিয়াও ভেঙে পড়ে, প্রতিক্রিয়াতে সে আরও একটি প্রক্রিয়ার ভাঙনের কারণ হবে, এবং তার থেকে আরও একটি— এভাবেই একের পর এক প্রক্রিয়ার ভাঙন আর রোধ করা যাবে না। চরম এক বিশ্বব্যাপী ভাঙনের মিছিলে একের পর এক স্থিতাবস্থাকে, সুস্থিত প্রক্রিয়াকে আমরা তখন ভেঙে পড়তে দেখব। তৈরি হবে এক বিশৃঙ্খল প্রবাহ, যার নাম ধারাবাহিক পরিবেশ বিপর্যয়। পূর্ববর্তী গণবিলুপ্তিগুলির[3] সময়েও এই একই ঘটনা পরিলক্ষিত হয়েছিল।

ব্রাজিলের সেরাডো অঞ্চলের অরণ্য-ধ্বংস: যদি কোনও সিস্টেম ভেঙে পড়ে, তা অন্য সিস্টেমগুলিকেও ভেঙে ফেলতে চায়, তৈরি হয় এক বিশৃঙ্খল প্রবাহ, যার নাম ধারাবাহিক পরিবেশ বিপর্যয়। ছবি: ইন্টারনেট

যে অসংখ্য-রকমভাবে এগুলি হোয়া সম্ভব, তার মধ্যে একটি বলি। উদাহরণের মাধ্যমে বোঝানো যাক। মধ্য ব্রাজিলের এক বিস্তীর্ণ সাভানা বনভূমি রয়েছে, যা সেরাডো নামে পরিচিত। এর যে শ্যামলিমা, তা নির্ভর করে নিয়মিতরূপে এই অঞ্চলে শিশির সৃষ্টির উপর। এই শিশির সৃষ্টির বিষয়টি আবার নির্ভর করে এই সাভানা অঞ্চলের বড় বড় বৃক্ষগুলির ওপর— তারা তাদের মাটির গভীরে প্রোথিত শিকড় দিয়ে জমি থেকে জল শুষে নেয় এবং পাতার মাধ্যমে তাকে আবার পরিবেশে ছড়িয়ে দেয়। কিন্তু বিগত বেশ কিছু বছর ধরে এই সেরাডো অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার ঘাসজমিকে ও বনভূমিকে কেটে নির্মূল করে ফেলা হয়েছে[4] সয়া এবং সমতুল শস্য চাষের জন্য। সারা পৃথিবীর পোল্ট্রিজাত মুরগি ও শূকরদের খাদ্য জোটানোর জন্য এইসব ফসল প্রপ্যোজন। যতই এখানকার গাছগুলিকে কেটে ফেলা শুরু হয়েছে, ততই এখানকার বায়ুতে জলকণার পরিমাণ, আর্দ্রতার পরিমাণ কমে আসতে শুরু করেছে। বাতাস শুষ্ক হয়ে উঠেছে। এরফলে ছোটছোট গাছগুলিও আরও দ্রুত মারা যাবে, এবং গাছের মাধ্যমে বাতাসে জলের প্রবাহ বা জোগান আরওই কমে আসতে থাকবে। এরই সঙ্গে রয়েছে বিশ্ব উষ্ণায়ন। বিশেষজ্ঞেরা অনেকেই মনে করছেন সেরাডো অঞ্চলের এমন একটা বিষাক্ত চক্র কার্যকর থাকলে, অচিরেই এবং আচমকাই, এই সমগ্র অঞ্চলটি মরুভূমিতে পরিণত হবে।[5]

মনে রাখতে হবে, উত্তরমুখে প্রবাহিত হয়ে আমাজন অববাহিকাতে গিয়ে পড়া বেশ কিছু নদী সহ দক্ষিণ আমেরিকার একাধিক অতি-গুরুত্বপূর্ণ নদীরও উৎস এই সেরাডো অঞ্চল। এই নদীগুলিতে জলের পরিমাণ কমে যাওয়ার সরাসরি প্রভাব পড়বে ব্রাজিল ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে থাকা চিরহরিৎ অরণ্য-অঞ্চলের উপর। এই চিরহরিৎ অরণ্যভূমি ইতিমধ্যেই বৃক্ষছেদন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে অস্তিত্বের চরম সঙ্কটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। যার কারণে একের পর এক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার স্থিতাবস্থাও চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।[6] সেরাডো অঞ্চল এবং এই চিরহরিৎ বনভূমি অঞ্চল একত্রে “আকাশে নদী”[7]— অর্থাৎ বাতাসে তৈরি হওয়া এবং নির্দিষ্ট অভিমুখে নির্দিষ্ট নিয়মে প্রবাহিত হয়ে চলা এক আর্দ্র বায়ুস্রোত নির্মাণ করে, যে আর্দ্র বায়ুস্রোত কিনা পক্ষান্তরে সারা পৃথিবীর বৃষ্টিপাতের পরিমাণকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং সারা পৃথিবীর অন্যান্য বায়ুস্রোত ও সামুদ্রিক স্রোতের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে।

সারা বিশ্বে এই যে বায়ুস্রোত ও সামুদ্রিক স্রোতের চলন, তার স্থিতাবস্থাও ইতিমধ্যেই এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির সম্মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আটলান্টিক মেরিডিওনাল ওভারটার্নিং সার্কুলেশন বা এএমওসি[8] নামের যে সামুদ্রিক স্রোত নিরক্ষীয় অঞ্চল থেকে মেরু অঞ্চলের অভিমুখে তাপ প্রবাহে সহায়তা করে, সুমেরু অঞ্চলের বরফ গলে চলার কারণে ইতিমধ্যেই তার শক্তিক্ষয় হতে শুরু করেছে।[9] এই পরিবহনব্যবস্থা ভেঙে পড়লে বৃহত্তর ব্রিটিশ দ্বীপভূমি অঞ্চলের জলবায়ু খুব শীঘ্রই চিরতুষারাবৃত সাইবেরীয় অঞ্চলের মতো হয়ে পড়বে।

এই এএমওসি-র দুইটি স্থিতাবস্থা আছে। সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় অবস্থা। বর্তমান সময় থেকে ধরলে, ইতিপূর্বের প্রায় ১২০০০ বছর ধরে এটি সক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। আর তার আগে, ১২৯০০ থেকে ১১৭০০ বছর পর্যন্ত, অর্থাৎ প্রায় ১০০০ বছর সময়কাল ধরে এটি এক নিষ্ক্রিয় অবস্থার— ইয়ঙ্গার ড্রায়াস— মধ্যে দিয়ে গিয়েছিল এবং সারা পৃথিবীর আবহাওয়ার উপর তার এক বিধ্বংসী প্রভাব পড়েছিল। আমরা যা কিছু ভালোবাসি, যে সহনশীল পরিবেশ আমাদেরকে বাঁচিয়ে রাখে তার প্রায় সম্পূর্ণটাই এই এএমওসি ব্যবস্থার সক্রিয় অস্তিত্বের উপরে নির্ভরশীল।

যত জটিল ব্যবস্থাই অধ্যয়ন করা হোক না কেন, সেটি তার চরম সীমার দিকে অগ্রসর হচ্ছে কিনা তা বোঝবার সাধারণ একটি নিয়ম রয়েছে। লক্ষ করতে হবে সেই ব্যবস্থাটির যে কাজ, সেই কাজে অনিয়মিত বাধা বা বিচ্যুতি লক্ষ করা যাচ্ছে কিনা।[10] যতই ব্যবস্থাটি সার্বিক ভাঙনের দিকে এগোবে, ততই তার কাজের মধ্যে এই বাধা বা বিচ্যুতির ঘটনা ক্রমশ আরওই নিয়মিত হয়ে উঠবে। এই বছরে আমরা সারা পৃথিবী জুড়েই এমন অনেক বিচ্যুতি, বা বলা যেতে পারে এক সার্বিক বিশ্বব্যাপী বিচ্যুতি লক্ষ করে চলেছি। সারা পৃথিবীর একাধিক সাম্যাবস্থাই আজ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে প্রবল দাবদাহের প্রাদুর্ভাব, সেখানে একের পর এক দাবানলের ঘটনা, এমনকি সাইবেরিয়া ও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলেও প্রবল তাপপ্রবাহ, জার্মানি, বেলজিয়াম, চিন ও সিয়েরা লিওনে ভয়াবহ বন্যা— এমন প্রত্যেকটি ঘটনাই আমাদেরকে জানিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে, বিপদ আসন্ন! আমরা ঘোরতর বিপর্যয়ের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছি।

বুদ্ধিমান যে কোনও প্রজাতির কাছ থেকেই আমরা আশা করতাম যে, এমন সমস্ত সঙ্কেতকে সে দ্রুত উপলব্ধি করবে, পরিবেশের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের একটি পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নে সচেষ্ট হবে এবং ক্ষিপ্র প্রতিক্রিয়াতে নিজের কার্যকলাপকে নিয়ন্ত্রণ করে সাম্যাবস্থা ফেরাতে সচেষ্ট হবে। কিন্তু মানুষ সেভাবে কাজ করছে না। আমাদের এতদিনকার অধীত জ্ঞান, অধীত বুদ্ধি, যা আমাদের একসময় অনেক দূর এগিয়ে দিয়েছিল— সেসব আজ আমাদেরই বিরুদ্ধে কাজ করে চলেছে।

 

‘অ্যালবার্ট’ নামের একটি মিডিয়া সাস্টেনেবিলিটি গ্রুপের পক্ষে চালানো একটি সমীক্ষা[11] থেকে দেখা যাচ্ছে, ২০২০ সালে ব্রিটিশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠানগুলিতে ‘আবহাওয়া পরিবর্তন’ এই শব্দবন্ধটির বিপরীতে ‘কেক’ শব্দটি অন্তত ১০ গুণ পরিমাণে বেশি ব্যবহার করা হয়েছে। ‘বাস্তুবৈচিত্র’ শব্দটির বিপরীতে ‘স্কচ-এগ’ শব্দটি অন্তত দ্বিগুণ পরিমাণে ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ব্যানানা ব্রেড’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ‘বায়ুশক্তি’ ও ‘সৌরশক্তি’ এই শব্দদুটি একত্রে যতবার ব্যবহার হয়েছে তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি পরিমাণে।

অবশ্যই আমি এটা মনে করি যে সমাজ মানেই সংবাদমাধ্যম নয়, এবং টেলিভিশন-কর্তাদের তরফে সার্কাস অথবা ব্যানানা-ব্রেডের প্রচার সবসময়েই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের মনে হয় এই বিষয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার আছে, পরিবেশ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের বিপরীতে কতখানি দূর অবধি সংবাদমাধ্যম বা টেলিভিশনের কেক-সম্পর্কিত প্রচার চালিয়ে যাওয়ার নৈতিক অধিকার রয়েছে? আমার কিন্তু আশঙ্কা হয়, যতরকমভাবেই আমরা পরিবেশ ধ্বংস প্রতিরোধে সচেষ্ট হই করি না কেন, এই ‘কেক-পরিবেশ পরিবর্তন’ অনুপাতটি এক্ষেত্রে নির্ণায়ক হয়ে উঠবার ক্ষমতা রাখে।

বর্তমানে সেই নির্ণায়ক অনুপাতটি সুনির্দিষ্টভাবেই বুঝিয়ে দিচ্ছে যে বিশ্বব্যাপী পরিবেশ বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়েও আমরা তাকে সচেতনভাবে অস্বীকার করে চলতে কতটা বদ্ধপরিকর। যে কোনও সময়ে, যে কোনও রেডিও স্টেশন অথবা সমতুল মাধ্যমে আপনি কান পাতুন, আপনি নিশ্চিত করেই এই বহমান উদাসীনতার মনোভাবকে উপলব্ধি করতে পারবেন। যে সময়ে দাঁড়িয়ে সারা পৃথিবীতেই দাবানলের বহ্ন্যুৎসব জারি রয়েছে, দেশের পরে দেশ বন্যায় বিধ্বস্ত হয়ে চলেছে, অথবা ক্ষেতের পরে ক্ষেতের ফসল অনাবৃষ্টির কারণে শুকিয়ে যাচ্ছে, সেই সময়ে দাঁড়িয়েও আপনি শুনতে বাধ্য হবেন মোজা পরবার সময়ে উঠে দাঁড়ানো উচিত কি নয় সেই বিষয়ে গুরুগম্ভীর দীর্ঘ আলোচনার অনুষ্ঠান, অথবা বিস্মিত হয়ে শুনবেন পোষ্য সারমেয়দের পরিচর্যার বিষয়ে আরও কোনও দীর্ঘ জ্ঞানগর্ভ বক্তব্যকে। আমি মোটেই এসমস্ত উদাহরণকে বানিয়ে বানিয়ে আপনাদের সামনে তুলে ধরছি না। নির্দিষ্টভাবে আলোচিত বিপর্যয়গুলির সময়েই আমি টেলিভিশন অথবা রেডিওর বিভিন্ন চ্যানেলগুলিকে ঘুরিয়ে দেখতে গিয়ে বারংবার এমন সমস্ত আলোচনারই মুখোমুখি হয়েছি। কাজেই, বিশাল কোনও গ্রহাণু অথবা উল্কাপিণ্ডকেও যদি বা পৃথিবীর দিকে ছুটে আসতে দেখা যায়, আপনি নিশ্চিত করেই টেলিভিশন খুললে পরে শুনতে পাবেন, “আজকের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়— কাবাব খাওয়ার সময়ে আপনি ঠিক কতরকম ভাবে হাস্যকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন?”

কাজেই কাবাবেই বাঁচুক পৃথিবী, ‘বিস্ফোরণে মৃত্যু’র ‘খবর’ কখনও সত্যি নয়!

অভূতপূর্ব এই বিপর্যয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমরা কেবলই হাবিজাবি শব্দগুঞ্জনে নিজেদেরকে ব্যস্ত রেখে চলেছি। সামাজিক জীবনযাপনের বিভিন্ন বিশেষত্বকে আমরা ক্রমশই তরল থেকে আরওই তরলীকৃত করে চলেছি। কাজেই আলোচনার সময়ে সেই তারল্যই আমাদের বক্তব্য অথবা বিষয়-নির্বাচনের ক্ষেত্রে নির্ণায়ক হয়ে উঠেছে। আমি একথা বলছি না যে সবসময়েই আমরা কেবল আসন্ন বিপর্যয়কে নিয়েই আলোচনা করব, লঘু বা তরল বিভিন্ন বিষয়গুলিও আমাদের সমাজেরই অঙ্গ। কিন্তু আমার বিরোধিতা সেই তারল্যকেই আমাদের আলোচনার একমাত্র বিষয়বস্তু করে ফেলাতে।

কেবল সঙ্গীত অথবা বিনোদনমূলক চ্যানেলগুলিতেই যে এমনতরো আলোচনা জারি রয়েছে এমনটা ভাবলে ভুল ভাবা হবে। রাজনৈতিক খবরের চ্যানেলগুলিও যেন-বা কেবলই বটতলার আড্ডার জায়গাতে পর্যবসিত হয়েছে। কে কোন দলে এল, কেই-বা কোন দল থেকে চলে গেল, কোন নেতা কাকে উদ্দেশ্য করে কী বলল— এইগুলিই সব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভিতরের সমস্ত খবরকে এরা সচেতনভাবে এড়িয়ে চলে। কালোটাকা, বেআইনি টাকার উৎস, দুর্নীতি, ক্ষমতার গণতান্ত্রিক পরিসর থেকে মানুষকে ক্রমশ অপসারণ করে চলা, অথবা এই ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়— এই সবকিছুই কেবল এড়িয়ে চলার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে।

আমি নিশ্চিত যে সমাজের এই সার্বিক মনোভাব ইচ্ছাকৃত বা পরিকল্পিত নয়। আমার মনে হয় না বিষয়টা এমন যে, কেউ আসন্ন পরিবেশ বিপর্যয়ের কোনও খবর পাওয়া মাত্র “আসুন আমরা সারমেয় পরিচর্যার বিষয়ে আলোচনা করি” বলে আলোচনার অভিমুখকে পালটানোর চেষ্টা করবে। বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়েও গভীর সঙ্কটজনক। আমাদের অবচেতন এই ক্ষেত্রে আমাদের সক্রিয় প্রত্যক্ষ কার্যকলাপসমূহের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের অবচেতনের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়াগুলিই এখন আমাদের সঠিক, অন্তরতম, সৎ মনস্তত্ত্বের পরিচায়ক। রেডিও থেকে ভেসে আসা কিচিমিচি শব্দগুলোকে, বহু আলোকবর্ষ দূরেকার এক মৃতপ্রায় তারার শেষ গুঞ্জন বলেই যেন-বা মনে হতে থাকে আমার…

 

ক্যাডিসফ্লাই নামে মাছিদের কিছু প্রজাতির অস্তিত্ব একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। বিষয়টি হল, নদীর উপরিত্বকের আচ্ছাদনটিকে ভেঙে জলের অভ্যন্তরে প্রবেশ করার ক্ষমতা। এই প্রজাতির মেয়ে মাছিরা জলের সেই উপরি-আচ্ছাদনটিকে ভেঙে তার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে (অমন ক্ষুদ্র এক প্রাণীর পক্ষে যা কিনা মোটেই সহজ কোনও ব্যাপার নয়), এবং জলস্তরের একেবারে নিচে পৌঁছে নদীতলের মাটির ওপরে ডিম পাড়ে। যদি সেই মেয়ে মাছিরা নদীর উপরিত্বকের আচ্ছাদনটিকে ভাঙতে কখনও কোনওভাবে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাদের জীবনচক্র আর সম্পূর্ণ হতে পারবে না, সেই মাছিদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মও আর কোনওদিনই সূর্যালোক দেখবে না। প্রজাতিটির অস্তিত্বই বিনষ্ট হয়ে যাবে।

মানুষের ক্ষেত্রেও সেই একই ঘটনা। আমরা যদি আমাদের চারপাশের এই লঘু আলোচনার কাচের দেওয়ালটিকে ভেঙে তার অভ্যন্তরে পৌঁছতে না পারি, আমরা কখনওই আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্ব অথবা নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে পারব না। প্রজাতি হিসেবে আমাদের সার্বিক অস্তিত্বও সঙ্কটের মুখে পড়বে। কিন্তু কোনওভাবেই যেন আমরা সেই দেওয়ালটিকে ভেঙে বেরোতে পারছি না। আমরা যেন বা সেই বালির মধ্যে মুখ গুঁজে থাকা উটপাখিটির মতোই বৈজ্ঞানিক সত্যকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করতে চাইছি।

এই মনোভাবেরই প্রকাশ ঘটে যখন আমরা আমাদের জীবনদায়ী ব্যবস্থাগুলির ধ্বংস হয়ে যাওয়া প্রতিরোধ করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলি। আমরা যেসব জিনিসে গুরুত্ব আরোপ করি আমার মতে সেগুলিকে আমাদের গ্রাহকসুলভ মনস্তত্ত্বের কিছু গিমিক (Micro Consumerist Bollocks বা MCB) বলা চলে।[12] আমরা কিছু ছোটখাট জিনিস, যেমন প্লাস্টিকের কফি কাপ অথবা প্লাস্টিক স্ট্রয়ের ব্যবহারের বিষয়ে মেতে উঠছি। উদাসীন থাকছি সেই বৃহত্তর কারণগুলি নিয়ে যেগুলি আমাদের এই বিপর্যয়ের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। ইদানীংকালে আমরা প্লাস্টিক ব্যাগ বন্ধ করার জন্য অত্যন্তরকম সক্রিয় হয়ে উঠেছি। আমরা ভাবছি এর পরিবর্তে জৈবিক পদ্ধতিতে তৈরি পরিবেশ-বান্ধব ব্যাগগুলিকে ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা পরিবেশের দারুণ একটা উপকার করে ফেলছি। কিন্তু আমরা একবারের জন্যও কি ভেবে দেখছি অমন একটি কাপড়ের অর্গ্যানিক ব্যাগ তৈরি করতে গিয়ে আমরা ২০০০০ সংখ্যক প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরির সমতুল দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছি![13]

সেই সি-হর্সটির লেজে জড়িয়ে থাকা কটন বাডের ছবি[14] দেখে আমরা সকলেই সঠিকভাবেই কমবেশি আতঙ্কিত হয়েছি, কিন্তু ফিশিং ইন্ডাস্ট্রিগুলির দৌলতে আজ যে সমগ্র সাগরের বাস্তুতন্ত্রটিই বিলুপ্ত হতে বসেছে[15]— সেই বিষয়ে আমরা কয়জনে ওয়াকিবহাল? আমরা মাথা নাড়ি, হতাশার ভান করি, তারপর আবারও সুস্বাদু চিংড়ি অথবা আরও কোনও সি-ফুডের থালাতেই মুখ নামাই। এমনটাই তো অবস্থা আমাদের।

সম্প্রতি ‘সোলটেয়ার পাওয়ার’ নামে একটি সংস্থাকে নিয়ে মিডিয়ায় খুব হইচই হচ্ছে। সংস্থাটির দাবি, তারা নাকি অফিসকর্মীদের শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে সংরক্ষণ করে “পরিবেশ পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই” করছে। মনে রাখতে হবে তাদের এই কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণের জন্য নির্মিত টাওয়ারটি ইস্পাত ও কংক্রিট দ্বারা নির্মিত, এবং অত্যাধুনিক ইলেকট্রনিক্সের মাধ্যমে পরিচালিত, যা কিনা অবশ্যই পরিবেশের পক্ষে নানাভাবে ক্ষতিকারক। তদুপরি এই বিশাল প্রকল্পটি প্রতি আট ঘন্টায় মাত্র এক কিলোগ্রাম পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড শোষণ ও পরিশোধনের ক্ষমতা রাখে।[16] একই সময়ে মানবসভ্যতা, বিশেষ করে জীবাশ্ম জ্বালানি দহন করে, ৩২ বিলিয়ন টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন করে।[17]

আমার মনে হয় এমন ছোট ছোট একেকটি বিষয়ের উপর আমাদের অতিরিক্ত নজর দেওয়ার এই যে প্রবণতা, তা অজান্তে হলেও কোনওভাবেই কাকতালীয় নয়। আমরা সবসময়েই নিজেদের ভালো কাজগুলির মাধ্যমে নিজেদের অন্যায়গুলিকে ঢেকে দেওয়ার কাজটি সচেতনভাবেই করে চলি। ধনী ব্যক্তিরা সবসময়েই এই বলে নিজেদেরকে সান্ত্বনা দিয়ে থাকেন যে, তাঁরা যথোপযুক্ত পরিবেশ সচেতনতার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন কারণ তাঁরা সামগ্রীর পুনর্ব্যবহারে বিশ্বাসী। অন্যদিকে তাঁরা এই বিষয়টিকে বিস্মৃত হন যে তাঁদের অধিকাংশেরই দ্বিতীয় আরেকটি করে বাসগৃহ রয়েছে, যা কিনা বিপুল পরিমাণে প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করে, হয়তো বা একাধিক পরিবারকে উচ্ছেদ করেই নির্মিত। অন্যদিকে, প্লাস্টিক স্ট্র অথবা কফি কাপ নিয়ে মজে থাকা আমরাও অবচেতনে ভেবে নিতে শুরু করি, সমাধান যদি এতই সহজ হয় তাহলে সেই সমস্যাটিও নিশ্চয়ই ততটাও বড় কিছু নয়— যতখানি আমরা ভেবেছিলাম।

আমি একবারের জন্যও বলছি না যে এই সমস্ত ছোট ছোট বিষয়গুলি গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু ছোট ছোট এমন বিষয়গুলিকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে আমরা যেন বৃহত্তর বিষয়গুলিকে বিস্মৃত না হই। প্রতিটি ছোট পদক্ষেপই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেগুলি ছোটই। আমাদের তৎপরতা বাড়ানোর সময় এসেছে।

 

আমাদের এই MCB-র প্রতি মনোযোগ আদতে এক বৃহৎ কর্পোরেট ষড়যন্ত্রের অংশ। বৃহত্তর বিষয়টিকে আমাদের বুঝতে না দেওয়ার একের পর এক এ-সমস্ত ষড়যন্ত্রের মধ্যে প্রথমটির সূচনা হয়েছিল সেই ১৯৫৩ সালে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘কিপ আমেরিকা বিউটিফুল’ প্রচার আন্দোলনের মাধ্যমে।[18] সুবৃহৎ এক প্যাকেজিং কোম্পানির মাধ্যমে এই প্রচার আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, যে কোম্পানির মূল উদ্দেশ্যই ছিল পুনর্নবীকরণযোগ্য বাজারের ব্যাগ, অন্যান্য প্যাকেজিং দ্রব্য ইত্যাদিকে হটিয়ে দিয়ে কেবল নিজেদেরই তৈরি ব্যবহার-মাত্রই-ফেলে-দেওয়া-যায়-এমন (ডিজপোজেবল) প্লাস্টিক ব্যাগকে বাজারে আনা এবং বাজার দখল করা। সর্বোপরি তারা চেয়েছিল আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে কাচের বোতলকে ফেলে না দিয়ে তাকে পুনর্ব্যবহারের যে সমস্ত নীতি বা আইন সেসময়ে চালু ছিল, সেগুলির সম্পূর্ণ বিলোপ। এর ফলে যে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্যের উৎপত্তি হল, ‘কিপ আমেরিকা বিউটিফুল’-এর পৃষ্ঠপোষকতায় তার দায় চাপানো হয়েছিল ‘লিটার বাগ’ বলে কোনও এক অজানা শব্দবন্ধের উপর।

এর পরবর্তীতে ২০১১ সালে ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জে শুরু হয় ‘লভ হোয়্যার ইউ লিভ’[19] আন্দোলন। এই আন্দোলনেও ‘কিপ ব্রিটেন টাইডি’ গোষ্ঠী, ইম্পেরিয়ল টোব্যাকো, ম্যাকডোনাল্ডস এবং মিষ্টদ্রব্য বিক্রেতা রিগলে কোম্পানি একই ধরনের ভূমিকা পালন করে। এই আন্দোলনের আরও একটি ফায়দার বিষয় ছিল। যেহেতু এই প্রচার আন্দোলনটি মূলত বিভিন্ন স্কুলে চালানো হয়েছিল, ইম্পেরিয়ল টোব্যাকো কোম্পানি এই প্রচারের মাধ্যমে সরাসরি তাদের উপস্থিতিকে ইংল্যান্ডের স্কুলছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল।[20]

‘লিটার’ বা বর্জ্যদ্রব্যের বিষয়ে এই সুনির্দিষ্ট কর্পোরেট প্রচার সংবাদমাধ্যমের সাহায্যে আরওই ফুলেফঁপে ওঠে এবং পরিবেশ সংক্রান্ত মূল বিষয়গুলি থেকে আমাদের নজর ঘুরিয়ে দিতে সক্ষম হয়। যেমন সাম্প্রতিক একটি সমীক্ষা[21] থেকে জানা যাচ্ছে বেশিরভাগ মানুষই বিশ্বাস করেন বর্জ্যদ্রব্য ও প্লাস্টিক থেকেই যাবতীয় নদীদূষণ বা জলদূষণের উৎপত্তি হয়। আদতে যেখানে কিনা, জলদূষণের সবচাইতে বড় উৎস হল কৃষি[22] ও নিকাশিব্যবস্থা। বর্জ্যদ্রব্যজনিত দূষণের স্থান, জলদূষণের মূল বা প্রধান কারণগুলির তালিকাতে অনেকটাই নীচে। একথা বলছি না যে প্লাস্টিক দূষণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিষয়টি হল, আমরা কেবল প্লাস্টিককেই দূষণের একমাত্র কারণ বলে ধরে নিয়েছি।

কিপ ব্রিটেন টাইডি-র মতো কিপ আমেরিকা বিউটিফুল প্রচার অভিযানও বড় কর্পোরেশনগুলির থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল। ছবি: ইন্টারনেট

২০০৪ সালে বিজ্ঞাপন কোম্পানি ওগিলভি অ্যান্ড ম্যাদার, যারা সুবৃহৎ তেল-কোম্পানি ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম বা বিপি-র হয়ে কাজ করত, ‘পার্সোনাল কার্বন ফুটপ্রিন্ট’[23] আবিষ্কার করে এই প্রচার আন্দোলনকে সম্পূর্ণ একটি অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। আবিষ্কারটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এর মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির প্রধান উৎপাদকদের দিক থেকে রাজনৈতিক চাপ জ্বালানির সাধারণ গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তেল কোম্পানিগুলি এখানেই থেমে থাকেনি। ২০১৯ সালে তেল কোম্পানি শেল-এর সর্বময় কর্তা বেন ভ্যান ব্যয়র্ডেনের একটি বক্তৃতায় আমি এই প্রচারের নগ্নতম উদাহরণটি লক্ষ করি। সেই বক্তৃতায় ভ্যান ব্যয়র্ডেন আমাদের “মরসুমি খাবার খেতে ও পুনর্নবীকরণযোগ্য বস্তুর ব্যবহার বাড়াতে” উৎসাহ দেন, ও প্রকাশ্যে তাঁর গাড়িচালককে জানুয়ারি মাসে স্ট্রবেরি কেনার জন্য ভর্ৎসনা করেন।[24]

কর্পোরেটদের পৃষ্ঠপোষকতায় বিগত পঞ্চাশ বছরে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিসরে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে, তা আমাদের বাধ্য করেছে সমস্যার কারণকে সমষ্টিগতভাবে নয় ব্যক্তিগতভাবে খুঁজতে ও একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দিতে। অন্যভাবে দেখতে গেলে, আমরা নাগরিক থেকে গ্রাহক বা কনজিউমারে পরিণত হয়েছি। কেন এমন করা হল তার কারণ বোঝাটা খুবই সহজ। নাগরিক হিসেবে একত্রিত হলে পরে আমরা রাজনৈতিক পরিবর্তন চাইতে পারি, তখন আমরা যথেষ্ট ক্ষমতাশালীও বটে। কিন্তু গ্রাহক হিসেবে আমাদের প্রায় কোনও ক্ষমতাই থাকে না।

ভ্যাসিলি গ্রসম্যান তাঁর বই ‘লাইফ অ্যান্ড ফেট’-এ মন্তব্য করেছেন, যখন স্তালিন ও হিটলার ক্ষমতায় ছিলেন, “মানবতা তার এক আশ্চর্য বৈশিষ্ট্যের প্রকাশ ঘটিয়ে ছিল, তার নাম আনুগত্য।” অস্তিত্ব রক্ষার চেয়েও তখন আনুগত্যের প্রবৃত্তিই অধিকতর হয়ে প্রকাশ পেয়েছিল। এককভাবে, ব্যক্তি হিসেবে আমরা যখন নিজেদেরকে দেখি, আশু পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা সত্ত্বেও আমরা তখন কেবল গ্রাহকসুলভ মনস্তত্ত্বে নিজেদের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র গিমিকগুলিতেই নিজেদেরকে মগ্ন রাখতে চেষ্টা করি, এও একধরনের আনুগত্য বই তো নয়। আমরা বরং সভ্যতা হিসেবে শেষ হয়ে যাব, কিন্তু অপ্রিয় বিষয়গুলিকে নিয়ে আলোচনা করে সামাজিক হেনস্থার মুখোমুখি হব না। রাজনৈতিক বিতর্ক তুলে শক্তিশালী প্রতিপক্ষেরও মুখোমুখি হতে চাইব না। এই আনুগত্যই আজ আমাদের সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

যদি আমরা কখনও এই ওপরের দেওয়ালটাকে ভেঙে ভিতরে উঁকি দিতে সক্ষম হই— কী দেখব? প্রথম যা আমাদের সামনে হাজির হবে তা আমাদের সমস্ত বুদ্ধিবৃত্তিকে অবশ করে রীতিমতো ভয় পাইয়ে দেবে। সেই বস্তুটি হল বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক বৃদ্ধিকে সারা পৃথিবীতেই নেকনজরে দেখা হয়ে থাকে। প্রতিটি সরকার তাদের সাফল্যকে এই আর্থিক বৃদ্ধির মাপকাঠিতে ফেলেই প্রচার (ও বিচার) করতে চায়। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়েই এক মুহূর্ত একটু ভেবে দেখুন। ধরা যাক, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাঙ্কের কথামতো আমরা গড়ে বছরে সারা পৃথিবীতে ৩ শতাংশ আর্থিক বৃদ্ধির হারকে সুনিশ্চিত করলাম। এর প্রতিক্রিয়াতে আমরা দেখব আমাদের চারপাশেকার সমস্ত আর্থিক কার্যকলাপ এবং তৎসহ তাদের কারণে হওয়া পরিবেশগত বিপর্যয়ের পরিমাণ[25] আগামী ২৪ বছরে (অর্থাৎ কিনা ২০৪৫ সাল নাগাদ) দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়াবে। ২০৬৯ সালের মধ্যেই তা হয়ে দাঁড়াবে আরও দ্বিগুণ, ২০৯৩-তে আবার তারও দ্বিগুণ। এ যেন সেই হ্যারি পটার অ্যান্ড দি ডেথলি হ্যালোজ-এর জেমিনো কার্স! যে অভিশাপের ফলে লেস্ট্রাঞ্জ ভল্টের গুপ্তধন ক্রমশ গুণিতক হারে বাড়তে বাড়তে হ্যারি ও সঙ্গীদেরকেই চেপে মারতে বসেছিল। বিশ্বের অর্থনৈতিক কার্যকলাপগুলি দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেলে আমরা আজ যেসব বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে চাইছি, সেগুলি করাও আরও দ্বিগুণ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, এবং তারপর আরও দ্বিগুণ, আরও দ্বিগুণ।

এই কি তবে এমন সমস্ত পরিবেশগত বিপর্যয়গুলির ক্ষেত্রে সবচাইতে ভয়ানক ঘটনা? সবচাইতে ভয়ঙ্কর পূর্বাভাস? তাও নয়। এই জেমিনো-অভিশাপ আদতে এক বৃহত্তর বিষয়েরই সামান্য একটি অংশ, সামান্যতর প্রভাব মাত্র। এককালে আমরা ঈশ্বরের নাম নিতে ভয় পেতাম, তেমনই এখন ভয় পাচ্ছি সেই শব্দটি উচ্চারণের ক্ষেত্রে। সেই শব্দটিই এই জেমিনো-অভিশাপের জন্মদাতা— পুঁজিবাদ।

বেশিরভাগ মানুষই যে প্রক্রিয়া বা সিস্টেম আমাদের সামাজিক অস্তিত্বকে নির্ধারণ করে, তার সংজ্ঞা দিতে ব্যর্থ হয়। যদি তাদের একান্তভাবেই জোর করা হয়, তারা তখন মিনমিন করে পরিশ্রম, উদ্যোগ, ব্যবসা ও কেনাবেচার গুরুত্ব ইত্যাদি নিয়ে দু-এক কথা বলেই কোনও মতে সরে পড়তে চায়। পুঁজিবাদের প্রভুরা চায় আমাদের উপলব্ধিটা যেন এরকমই থাকে। কারণ পুঁজির এই যে বৃহৎ সম্পদ, তা কখনই পরিশ্রম, উদ্যোগ, বা বেচাকেনার মাধ্যমে আসেনি। তা এসেছে যুগ যুগ ধরে লুঠতরাজ[26], একচেটিয়া ব্যবসা, সম্পত্তিগ্রাস[27] ও উত্তরাধিকার সূত্রে।

একটি হিসেব অনুযায়ী, ভারতবর্ষে তাদের কমবেশি ২০০ বছরের শাসনকালে ব্রিটিশ সরকার সেই দেশ থেকে মোট ৪৫ ট্রিলিয়ন পাউন্ড পরিমাণ সম্পদ লুঠ করে নিয়ে এসেছে।[28] এই লুঠ করা সম্পদের মাধ্যমে তারা নিজেদের দেশে শিল্পপ্রসার ঘটিয়েছে, আরও অন্যান্য উপনিবেশ স্থাপন করেছে এবং তাদের থেকেও আরও সম্পদ লুঠ করে এনেছে।

কেবল ভৌগোলিক পরিসরেই নয়, সময় ধরে ধরে, যুগ ধরে ধরে এই লুঠতরাজ চলেছে। এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের আর্থিক বৃদ্ধির হার আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের কাছ থেকে আমরা কী পরিমাণে প্রাকৃতিক সম্পদ লুঠ করে নিচ্ছি, তার সঙ্গে সমানুপাতিক। আমরা তাদের ভবিষ্যৎ লুঠ করে নিয়ে নিজেদের আর্থিক বৃদ্ধি সুনিশ্চিত করছি। এই কারণেই, তেল কোম্পানিগুলি, বা অন্যান্য বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি আমাদেরকে গ্রাহকসুলভ গিমিকে মগ্ন থাকতে উৎসাহ দিচ্ছে। কার্বন ফুটপ্রিন্ট মাপার নেশায় মেতে থাকতে আহ্বান জানাচ্ছে। ভবিষ্যৎকে লুঠ করাই আজকের এই অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি। কোনও মূলধারার অর্থনীতিবিদ পুঁজিবাদকে যতই সুন্দর, সুললিত বিষয় বলে বর্ণনা করুন না কেন, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের দিক দিয়ে দেখলে পরে এক বিশাল ধ্বংসের পিরামিড ছাড়া তা আর কিছুই নয়।

আমরা কি এখনও নদীর একেবারে তলদেশে পৌঁছতে পারলাম? এখনও নয়। পুঁজিবাদ আসলে আরও বৃহৎ একটি বিষয়ের সন্ধান করে ফেরে— তাকে সঞ্চয় করতে, মজুত করতে সচেষ্ট হয়। তা হল সম্পদ।

তুমি কতখানি পরিবেশবান্ধব হতে পারলে অথবা হলে, তাতে কিছু এসে যায় না। পরিবেশের ওপর তোমার প্রভাব তোমার মনোভঙ্গির ওপর নির্ভর করে না। তুমি কীভাবে কেনাকাটি করছ, তুমি কী পছন্দ করছ— এগুলি কিছুই এ-প্রসঙ্গে বিবেচ্য নয়। বিবেচ্য বস্তুটি হল— তোমার অর্থ।[29] তোমার হাতে যদি উদ্বৃত্ত অর্থ থাকে তুমি তা খরচা করবে। তুমি যতই নিজেকে একজন বড়সড় গোছের পরিবেশবান্ধব উপভোক্তা হিসেবে প্রতিপন্ন করতে চাও না কেন, আসলে তুমি স্রেফ একজন বড়সড় উপভোক্তা।[30] তুমি তেমনভাবেই পরিবেশধ্বংসে অংশীদার হবে। যে কারণে পরিবেশধ্বংসের পিছনে বড়লোকদেরই সবচেয়ে বেশি করে অংশীদারিত্ব রয়েছে।

বার্ষিক উষ্ণতা বৃদ্ধির পরিমাণ ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়সের তলায় বেঁধে রাখতে চাওয়ার অর্থ হল গড়ে বছরে মানুষ-পিছু অনধিক ২ টন কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদন। অথচ, সারা পৃথিবীর ধনী মানুষদের মধ্যে সবচেয়ে উপরদিককার ১ শতাংশ মানুষ গড়ে বছরে মাথাপিছু ৭০ টনেরও বেশি করে কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করে থাকেন।[31] একটি সূত্র থেকে আনুমানিক জানা যাচ্ছে, বিল গেটসের ক্ষেত্রে বছরে এই কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদনের পরিমাণ ৭৫০০ টনেরও বেশি,[32] এর কারণ মূলত তাঁর প্রাইভেট জেটগুলিতে চড়ে বিশ্বভ্রমণ। একই সূত্র বলছে, রোমান আব্রামোভিচ গড়ে বছরে ৩৪০০০ টন পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড উৎপাদন করেন, তাঁর বিলাসবহুল প্রমোদতরীতে চড়ে ঘুরে বেড়াবার কারণে।

বিশাল বড়মাপের এই সমস্ত ধনী মানুষদের ঘরবাড়িগুলিতে সোলার প্যানেল লাগানো থাকতেই পারে, তাঁদের গাড়িগুলিও হতে পারে অত্যাধুনিক ইলেক্ট্রিক গাড়িসমূহেরই নানাবিধ সংস্করণ, এমনকি তাঁদের ব্যক্তিগত বিমানগুলিও বায়োকেরোসিনের দ্বারা চালিত হতে পারে, কিন্তু সার্বিকভাবে তাঁদের ক্রিয়াকলাপের কারণে পরিবেশের উপরে যে ধ্বংসাত্মক প্রভাব— এসব কিছুতে তার কোনও ইতরবিশেষ হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাঁদের এই সবুজ-সেনানী-মার্কা কাজের মাধ্যমেই এই ধ্বংসাত্মক প্রভাব আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে। যেমন ধরুন, বিল গেটসের জৈব-জ্বালানি-প্রীতি।[33] এই জৈব-জ্বালানির জোগান দিতে গিয়ে, কাঠের টুকরো[34] ও অন্যান্য পরিবেশবান্ধব তরল-রাসায়নিক[35] উৎপাদনের জন্য বিপুল পরিমাণে বনজঙ্গল ধ্বংস করা শুরু হয়েছে। মাইলের পর মাইল জমির মাটিকে নষ্ট করে ফেলা হচ্ছে বায়োমিথেন[36] তৈরির কারণে।

কিন্তু নিজেদের ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে পরিবেশে ধ্বংস করাই নয়, তার চেয়েও বড় কথা হল নিজেদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রভাব খাটিয়ে এই সমস্ত বিরাট বড়লোকেরা সত্যিকারের কোনও গঠনমূলক পরিবর্তনের প্রয়াসটুকুকেই দাবিয়ে দিতে চাইছে। নষ্ট করে দিতে চাইছে।[37] তাঁদের সাংস্কৃতিক প্রভাব আদতে এক ভারী সুন্দর সম্মোহনী রূপকথার জগৎ গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। পুঁজিবাদ আমাদের মনে এক ভ্রান্ত ধারণা জন্মিয়ে দিতে চায়, যেন বা আমরাই— আমরাও সেই দ্বিধাগ্রস্ত, পরিবেশ নিয়ে চিন্তিত কোটিপতি মানুষদের মধ্যে একেকজন। এজন্যই আমরা এই প্রচারকে মেনে নিতে শুরু করি। বাস্তবে, কিছু কিছু মানুষ আজ কোটি-কোটিপতি কারণ, বাকি আরও অনেক অনেক মানুষ দারিদ্রের প্রবলতর অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়েছে। বিপুল সম্পদ আসে কেবল বিপুলতর শোষণের মাধ্যমেই। আমরা সকলেই যদি কোটিপতি হতাম, তাহলে সকলে মিলেই এই পৃথিবীর ভুষ্টিনাশ করে ফেলতে আমাদের এতটুকুও সময় লাগত না। কিন্তু সেই দিনটি— সেই স্বপ্নের দিনটি আসবেই, যেদিন আমরা সকলেই কোটিপতি হয়ে যাব— এই রূপকথা দিয়েই আমাদের আনুগত্য আদায় করে নেওয়া হয়েছে।

আসল কথা হল, বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশকে ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাতে হলে আমাদের নিচের দিকেই নামতে হবে। বেলজিয়ান দার্শনিক ইনগ্রিড রবেইনস যাকে লিমিটেরিয়ানিজম বা পরিমিতিবাদ[38] বলেছেন, সেটাই এখন আমাদের পাথেয় হতে হবে। যেমন একটি দারিদ্রসীমা রয়েছে, যার নিচে কোনও মানুষকে নামতে দেওয়া উচিত নয়— তেমনই একটি ব্যক্তিগত ধনসীমাও তৈরি করা উচিত যার ওপরে কোনও মানুষের ব্যক্তিগত সম্পদকে কখনও বাড়তে দেওয়া যাবে না। কার্বন-শুল্কের চাইতেও আমাদের বেশি প্রয়োজন এখন সম্পদ-শুল্ক। এক্সনমোবিল যে কার্বন-শুল্ককে সমর্থন করে, তাতে কিন্তু আশ্চর্যের কিছু নেই।[39] এ-ও এমসিবি-রই এক রূপ। বহুমুখী পরিবেশ বিপর্যয়ের কেবল একটি বিশেষ দিককেই এই শুল্ক লাগামে বাঁধতে চায়, আর চায় ব্যক্তিবিশেষের (পড়ুন ধনী ব্যক্তিবিশেষের) কৃতকর্মের ভার জনসাধারণের সবার ওপরে চাপিয়ে দিতে। এই শুল্ক ভয়ানক রকমেই ক্ষতিকর ও পশ্চাদমুখী এক পদক্ষেপ, এর ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গরিব মানুষেরা বাধ্য হয়ে পড়বে ধনীদের চেয়েও অনেক বেশি পরিমাণে শুল্কের ভার বহন করতে।

কিন্তু সম্পদ-শুল্ক এই সমস্যার একেবারে হৃদয়ে আঘাত হানতে সক্ষম। এই শুল্কের হার জোরদার হতে হবে— যাতে মজুতদারির সিঁড়িটা ভেঙে দেওয়া যায় এবং মুষ্টিমেয় ধনীদের হাতে পুঞ্জীভূত হয়ে থাকা সম্পদের পুনর্বণ্টন ঘটে। এই পুনর্বন্টিত সম্পদকে এমনভাবে ব্যবহার করা হোক যাতে আমাদের গতিপথটাই পালটে যায়— আমি যাকে বলতে চাই “ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং সমষ্টিগত স্বাচ্ছন্দ্য”। পৃথিবীতে এমন পরিমাণে সম্পদ নেই বটে, যাতে কিনা সমস্ত মানুষকেই চরম ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্য দেওয়া সম্ভব; কিন্তু পৃথিবীতে যা আছে তার মাধ্যমে সমষ্টিগত ক্ষেত্রে নূন্যতম একটি স্বাচ্ছন্দ্যের পরিবেশকে খুব সহজেই সুনিশ্চিত করা যেতে পারে। গড়ে উঠতে পারে সুন্দর সমস্ত পার্ক অথবা হাসপাতাল, আর্ট গ্যালারি, সুইমিং পুল, টেনিস কোর্ট, গণপরিবহণ ব্যবস্থা, খেলার জন্য মাঠ অথবা সুসজ্জিত কমিউনিটি সেন্টার। আমরা প্রত্যেকে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক নিরাপত্তা ভোগ করব। নিজস্ব একটি নিরাপদ পরিসর থাকবে। আর আমরা স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করব অপরের সম্বল লুঠ না করে।

আমাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক একেকটি প্রক্রিয়া বা সিস্টেমকে ধ্বংস করে চলার অনুমতি দিয়ে, আমরা কেবল সেই বিরাট মাপের ধনী মানুষদেরই স্বার্থসিদ্ধি ও উদরপূর্তি করে চলেছি। তাঁদের প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও শক্ত ভিতের উপরে প্রতিষ্ঠা করছি। এমসিবি-র মতো ফাঁদে আচ্ছন্ন হয়ে থেকে আমরা আদতে এই সমস্ত বৃহৎ পুঁজিবাদী প্রতিষ্ঠানগুলিকেই পরিবেশ ধ্বংস করে চলার বিষয়ে বারংবার সামাজিক ছাড়পত্র প্রদান করে চলেছি।

আমরা টিঁকে থাকব একমাত্র তখনই, যখন আমরা এই আনুগত্যের বাইরে বেরোতে পারব। অসম্মতি জানাতে এতটুকুও ভয় পাব না। ঊনবিংশ শতকের বিপ্লবীরা এই মন্ত্রকে বুকে নিয়েই এগিয়েছিলেন, এই মন্ত্রেই বিশ্বাসী ছিলেন সাফ্রোগেটের মহীয়সীরা, গান্ধি এই মন্ত্র উপলব্ধি করেছিলেন, উপলব্ধি করেছিলেন মার্টিন লুথার কিং। এই মুহূর্তে যে সমস্ত পরিবেশ আন্দোলনকারীরা সামগ্রিক পটপরিবর্তনের বিষয়টিকেই তুলে আনতে চাইছে, তারাও এই মন্ত্র উপলব্ধি করেছে। ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’, ‘গ্রিন নিউ ডিল রাইজিং’, ‘এক্সটিংশন রেবেলিয়ন’ ও আরও এমন অন্যান্য পরিবেশ আন্দোলনের মঞ্চগুলিতে আমরা সেই সমস্ত মানুষদেরই— বিশেষ করে যুবসম্প্রদায়কে— দেখতে পারছি, যারা অসম্মতি জানাতে ভয় পায় না। তারা ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটিকে আহরণ করতে পেরেছে।

এখন কেবল অবাধ্যতাতেই আমাদের অস্তিত্ব সুরক্ষিত থাকবে!


[1] May, Robert et al. Complexity theory and financial regulation. Science. Feb 19, 2016.
[2] Horstmeyer, Leonhard et al. Predicting collapse of adaptive networked systems without knowing the network. Scientific Reports, Nature. Jan 27, 2020.
[3] Feng, Zhuo et al. From rainforest to herbland: New insights into land plant responses to the end-Permian mass extinction. ScienceDirect, Science. May, 2020.
[4] Hughes, John. Rare wildlife in Brazil’s savannah is under threat— we are all responsible. UNEP-WCMC. Oct 29, 2019.
[5] Hofmann, Gabriel S. et al. The Brazillian Cerrado is becoming hotter and drier. Wiley, DOI: 10.1111/gcb.15712. 2021.
[6] Marengo, Jose A. et al. Changes in Climate and Land Use Over the Amazon Region: Current and Future Variability and Trends. Frontiers. Dec 21, 2018.
[7] Pearce, Fred. Rivers in the Sky: How Deforestation is Affecting Global Water Cycles. Yale Environment 360. July 24, 2018.
[8] What is the Atlantic Meridional Overturning Circulation? Met Office.
[9] Boers, Niklas. Observation-based early-warning signals for a collapse of the Atlantic Meridional Overturning Circulation. Nature.
[10] Wang, Rong et al. Flickering gives early warning signals of a critical transition to a eutrophic lake state. Nature.
[11] Carrington, Damian. ‘Cake’ mentioned 10 times more than ‘climate change’ on UK TV— report. Sep 15, 2021.
[12] Frankie Boyle’s New World Order. George Monbiot on Climate Breakdown. BBC TWO. Apr 16, 2019.
[13] Schlanger, Zoe. Your cotton tote is pretty much the worst replacement for a plastic bag. Quartz. Apr 2, 2019.
[14] Keefe, Alexa; photographs: Hofman, Justin. This Heartbreaking Photo Reveals a Troubling Reality. National Geographic. Sep 19, 2017.
[15] Monbiot, George. Seaspiracy shows why we must treat fish not as seafood, but as wildlife. The Guardian. Apr 7, 2021.
[16] Soletair Power Indoor CO2 Capture Unit.
[17] Ritchie, Hannah and Roser, Max. CO2 emissions. Our World in Data.
[18] Dunaway, Finis. The ‘Crying Indian’ ad that fooled the environmental movement. Chicago Tribune. Nov 21, 2017.
[19] Love Where You Live and Get Involved. Keep Britain Tidy.
[20] CSR: Imperial and Love Where You Live. Tobacco Tactics, University of BATH.
[21] Troubled Waters. Storymaps.arcgis.com.
[22] Water Qualty. www.parliament.uk.
[23] Kaufman, Mark. The Carbon Footprint Sham. Mashable India.
[24] Pohle, Richard. Eat seasonally and recycle more to cut emissions, says Shell. The Times. Jun 11, 2019.
[25] Hickel, Jason.; Kallis, Giorgos. Is Green Growth Possible? Taylor & Francis Online. Apr 17, 2019.
[26] Monbiot, George. Trashing the planet and hiding the money isn’t a perversion of capitalism. It is capitalism. The Guardian. Oct 6, 2021.
[27] Christophers, Brett. The PPE debacle shows what Britain is built on: rentier capitalism. The Guardian. Aug 12, 2020.
[28] Sreevatsan, Ajai. British Raj siphoned out $45 trillion from India: Utsa Patnaik. Livemint.com. Nov 21, 2018.
[29] Lynch, Michael J. et al. Measuring the Ecological Impact of the Wealthy: Excessive Consumption, Ecological Disorganization, Green Crime, and Justice. Sage Journals. May 15, 2019.
[30] Nassen, Jonas. et al. Explaining the Variation in Greenhouse Gas Emissions Between Households: Socioeconomic, Motivational, and Physical Factors. Wiley Online Library. Sep 26, 2014.
[31] UNEP; UNEP-CCC. Emissions Gas Report 2020. UN environment programme. Dec 9, 2020.
[32] Wilk, Richard & Barros, Beatriz. Private planes, mansions and superyachts: What gives billionaires like Musk and Abramovich such a massive carbon footprint. The Conversation. Feb 16, 2021.
[33] Gates, Bill (interview). Bill Gates on the climate crisis: ‘I can’t deny being a rich guy with an opinion’. The Guardian. Feb 13, 2021.
[34] Sheffield, Hazel. ‘Carbon-neutrality is a fairy tale’: how the race for renewables is burning Europe’s forests. The Guardian. Jan 14, 2021.
[35] Llamas, Alberto. et al. Biokerosene from coconut and palm kernel oils: Production and properties of their blends with fossil kerosene. ScienceDirect; Science. Dec, 2012.
[36] Monbiot, George. How a false solution to climate change is damaging the natural world. The Guardian. Mar 14, 2014.
[37] Harvey, Fiona. Climate Crisis: Borris Johnson ‘too cosy’ with vested interests to take serious action. The Guardian. Apr 14, 2021.
[38] Robeyns, Ingrid. What, if Anything, is Wrong with Extreme Wealth? Taylor & Francis Online. Jun 24, 2019.
[39] McGreal, Chris. ExxonMobil lobbyists filmed saying oil giamt’s support for carbon tax a PR ploy. The Guardian. Jun 30, 2021.

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. পরিবেশ ও পুঁজিতন্ত্র — ষষ্ঠ বর্ষ, তৃতীয় যাত্রা – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...