তারান্তিনো, সিজন দুই — চব্বিশ

প্রিয়ক মিত্র

 

পূর্ব প্রকাশিতের পর

একটা বন্ধ বাঙ্কারে হাঁসফাঁস করছিল লোকটা। ওকে বেঁধে রাখেনি। শুধু একটা আশ্চর্য নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। কোথাও থেকে কোনও আলো আসছে না, নিশ্বাস নেওয়ার কোনও অবকাশ নেই। তবে তার চেয়েও বেশি অসুবিধে হচ্ছে লোকটার, এই ঘরটা চূড়ান্ত নিস্তব্ধ। পিন পড়ার শব্দও নেই। মাঝেমধ্যে চিৎকার করে, নিজে বকবক করে এই নিস্তব্ধতা কাটাচ্ছে লোকটা। এমনিতে ও শান্ত হয়ে রয়েছে। জানে, এখান থেকে বেরোনোর উপায় এখনই ওর হাতে নেই। কিন্তু শব্দহীন হয়ে থাকাও ওর পক্ষে সম্ভব নয়। তাই এই পদ্ধতিটা সাহায্য করছে খুব। নিজের মনেই বকবক করে চলেছে শাহিদ ইলিয়াস। এছাড়া তার বেঁচে থাকার কোনও রাস্তা নেই।

শাহিদের ওর চাচার কথা খুব মনে পড়ে। শাহিদ কতটুকু দেখেছে ওর চাচাকে? ছোটবেলায় কিছুটা সময়। নেতাজির ফৌজে যোগ দিয়েছিল চাচা। তারপর বর্মা থেকে পালিয়ে প্রথমে আফগানিস্তান, তারপর সোভিয়েতে চলে যায় ওর চাচা। মিড ফিফটিজ পর্যন্ত সেখানেই থাকে। তারপর চলে আসে কলকাতায়, ভবানীপুরে তাদের আদি বাড়িতে, যা তার দাদা (ঠাকুরদা) শাজাহান ইলিয়াস উপহার পেয়েছিল কলকাতা পুলিশের থেকে, বীরত্বের পুরস্কার হিসেবে। সেখানেই আমৃত্যু ছিল। শাহিদ ছোটবেলায় কত শুনত, ওর আব্বুর কাছে, ওর চাচার যুদ্ধে যাওয়ার গল্প। চাচা ফিরলে ছোট্ট শাহিদ হামলে পড়েছিল তার ওপর। যুদ্ধের গল্প শুনবে বলে। চাচা শুধু তার মাথায় হাত বুলিয়েছিল। চোখভর্তি ছিল জল। কোনও কথা বলতে পারেনি।

চাচা কোনও কথা বলত না অনেকদিন। তারপর চাচার সঙ্গে একসময় বন্ধুত্ব হল শাহিদের। তখন শাহিদ বড় হয়েছে একটু। চাচা ওকে নেতাজির কথা বলত। বলত নিজের কথাও। বলত, অক্ষশক্তির সঙ্গে মিলে যুদ্ধ করলেও আসলে তার মন পড়েছিল সোভিয়েতে। হিটলারের পরাজয় তাদের জন্য ধাক্কা ছিল, কিন্তু চাচা একদম খুশি না হয়েও থাকতে পারেনি। তাই পালিয়ে সোভিয়েতেই গিয়েছিল চাচা। কিন্তু যে দেশের জন্য এত লড়াই, সেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, দু-টুকরো হয়ে যাওয়ার পর কী দাঁড়াল জন্মভূমির অবস্থা, দেখতে চলে এসেছিল চাচা।

–কেমন দেখলে চাচা এই দেশটাকে?

প্রশ্ন করত শাহিদ। উত্তর দিত না চাচা। শুধু শূন্যদৃষ্টিতে ভবানীপুরের বাড়ির খড়খড়ি দেওয়া জানলা দিয়ে বাইরে চেয়ে বলত— হুকুমৎ-এ-আজাদ হিন্দ কি সত্যিই ফিরবেন?

তখনও অনেক ভারতীয় দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করত, নেতাজি একদিন ফিরে আসবেন। চাচা, যে অত কাছ থেকে নেতাজিকে দেখেছে, সে কি সত্যিই এমনটা বিশ্বাস করত? না, বোধহয়। তবে হ‍্যাঁ, স্বপ্ন হয়তো দেখত।

শাহিদ জানত ওর দাদা (ঠাকুরদা) পুলিশে ছিল। চাচার থেকেই শুনেছিল শাহিদ, ওর দাদা, শাজাহান ইলিয়াস ছিল স্বদেশিদের ত্রাস! তারপর একসময় হঠাৎই স্বদেশি ধরার কাজে কিছুটা ক্ষান্ত হয় শাজাহান। বাঁকুড়ার কাছে একটি গ্রাম থেকে এক ভয়াবহ খুনিকে পাকড়াও করার পর তার পদোন্নতি হয়। তাই একটি স্বদেশি দলকে হাতের নাগালে পেয়েও ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে যখন ওঠে, এবং সেই এনকোয়ারি কমিশনের মাথায় থাকেন স্বয়ং টেগার্ট, তখনও পুলিশবিভাগ, এবং শাজাহানের ওপরতলার কর্তারা, বিশেষ করে বড়বাবু উডপেক সাহেব শাজাহানের পাশেই থাকেন। কিন্তু একটা আশ্চর্য অভিযোগ টেগার্টের কানে গিয়ে পৌঁছেছিল, সেই প্রশ্নটা শাজাহানকে একটু অস্বস্তি দিলেও সে টলেনি। অভিযোগটা এমন, স্বদেশিরা একটি জিনিস ঘুষ হিসেবে দিয়েছে শাজাহানকে। একটি আশ্চর্য, আকাশি রঙের হিরে।

এই অভিযোগ থেকে শাজাহান মুক্তি পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ওর মনে পড়েছিল সনাতন হাজরার কথা। বংশানুক্রমে ওই হিরের জন‍্যই অনেক বদনাম বয়ে যেতে হয়েছিল তাঁকে, ওই হিরেই তিনি তুলে দিয়েছিলেন শাজাহানের হাতে। শাজাহান একবার ভেবেছিল, ওই হিরে অভিশপ্ত। কিন্তু এসবে বিশ্বাস করত না শাজাহান। তাই ওই হিরেটা তুলে দিয়েছিল তার বড় ছেলে মহম্মদের হাতে। যদি নেতাজির যুদ্ধে কাজে লাগে! মনে মনে নেতাজিকে বিশ্বাস করত শাজাহান।

ছেলে বেঁচে আছে না মরে গেছে খবর না পেয়েই চলে যেতে হয় শাজাহানকে। কিন্তু সে শান্তি পেয়েছিল এই ভেবে যে, একটা বড় ধাক্কা ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া গেছে। আজাদ হিন্দ-এর বিচারাধীন বন্দিদের মধ্যে মহম্মদের নাম আছে কি না, তা শাহিদের আব্বুকে খুঁজে দেখতে বলেছিল একবার। কিন্তু খবরের কাগজে কোথাও মহম্মদ ইলিয়াসের নাম ছিল না।

শাজাহানের মন পালটে গিয়েছিল। সে মনেপ্রাণে চেয়েছিল দেশ স্বাধীন হোক, কিন্তু আপস করে নয়, যুদ্ধ করে। তার ছেলে বেঁচে থাকুক বা মরে যাক, তার উদ্যোগ সার্থক যেন হয়। শাজাহান জানতে পারেনি, নৌ-বিদ্রোহের সময় চুপিচুপি ভারতে আসার কথা ভেবেছিল মহম্মদ। ব্রিটিশ ইউনিয়ন জ‍্যাক নামিয়ে উড়ছে ভারতের পতাকা! এও সম্ভব? কিন্তু সোভিয়েতে বসেই জানতে পেরেছিল মহম্মদ, ভেতরের বিশ্বাসঘাতকতা কীভাবে কুরে কুরে খেয়েছিল ভারতের বুকে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে বড় যুদ্ধটাকে। বেইমানি করতে দেশের লোকের জুড়ি ছিল না কোনওদিন! সান দিয়েগো থেকে জার্মানদের মদতে একটা গোটা অস্ত্রবোঝাই জাহাজ আনছিল বাঘাযতীনরা। খেপে যাওয়া সৈন্যদের হাতে সেই অস্ত্র দিতে পারলে কী হত, ভেবেই আশ্চর্য হত মহম্মদ। কিন্তু হল না, কোনও এক ‘সি’-এর জন্য। কোনও এক রহস্যময় ‘সি’ ফাঁস করে দিল খবরটা ইংরেজ সরকারের কাছে। সেই সি আসলে ছিল একজন বাঙালি!

ওই হিরেটা কিন্তু শত কিছুর মধ্যেও গোপন এবং নিজের কুক্ষিগত রেখেছিল মহম্মদ। হারাতে দেয়নি কিছুতেই। হিরে-জহরতের ওপর লোভ ছিল না কোনওদিনই, কিন্তু ওটাই মহম্মদের কাছে ওর আব্বুর, ওর জীবনের যাবতীয়র, ওর শেকড়ের, ওর দেশের চিহ্ন। এরপর যখন শাহিদ বাইরে যাবে ঠিক হল, তখন ওই হিরেই মহম্মদ তুলে দিয়েছিল শাহিদের হাতে। যেন এটাই নিয়ম, ইলিয়াস পরিবারের যে ঘরছাড়া হবে, সে ওই হিরেটা বহন করবে।

কিন্তু এখন তো আজীবন বিজ্ঞানকে সঁপে দেওয়া শাহিদের কাছে এই হিরের মূল্য অনেক! এ তো সাধারণ কোনও হিরে নয়! এই হিরের ভেতরে যা পেয়েছে শাহিদ, তা সে কল্পনাও করতে পারেনি! এমনকী, তার প্রাণের সঙ্গী মৌলিনাথকেও সেকথা জানায়নি শাহিদ। মৌলিনাথ বিশ্বাস করতে চাইবে না। কিন্তু ও স্পেস স্টেশনে যা খুঁজবে বলে যেতে চাইছে, তা তো তাদের হাতের মুঠোর মধ্যে! শাহিদ ছাড়া, এবার কী করবে মৌলিনাথ?

হঠাৎ সরিৎ-এর কথা মনে হল শাহিদের। মনে করতেই গা জ্বলে গেল যেন।

সরিৎ সেন ছিল বহুদিন পর্যন্ত শাহিদের ল‍্যাব অ্যাসিস্ট‍্যান্ট। বিজ্ঞানপিয়াসী পড়ুয়া এই ছেলেটাকে কাজের সুযোগ দিয়েছিল শাহিদই। আর ছেলেটা কী করল? ফাঁস করে দিল এতবড় কথাটা, তাও কয়েকটা বেনিয়ার কাছে? ছেলেটাকে বিশ্বাস করে কতটা ভুল করেছে শাহিদ, মাঝেমধ্যে ভাবে সে। মৌলিনাথকেও যা বলল না শাহিদ, সরিৎকে তা বলে দিল!

শাহিদকে দিয়ে জোর করে যে চিঠিটা লিখিয়েছে ওরা, তাতে যদিও শাহিদ কিছুটা ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করেছে মৌলিনাথকে, সঙ্কেতে। কিন্তু মৌলিনাথ তা বুঝবে কি? কী জানি কী ভাবছে ও! ল‍্যাবের চাকরিটাও বোধহয় যাবে।

এসব ভাবতে ভাবতেই একটা শব্দ হল।

ডাক্তারি ছাড়াও, তাদের কাজেও সোনোগ্রাফি এবং আলট্রাসাউন্ডের অন্য মূল্য আছে। তাই তো হিরেটার থেকে ওই শব্দতরঙ্গ ধরতে পেরেছিল শাহিদ, তার আলট্রাসোনিক রেকর্ডারে।

শব্দ শাহিদকে টানে নেশার মতো!

খুট করে দরজা খুলল।

ঘরে ঢুকল কালো সাফারি সুট, প‍্যান্ট আর কালো চশমা পরা বজ্জাতটা। ওর চশমার আড়ালে চোখটা কেমন, জানতে ইচ্ছে করে শাহিদের।

তার পেছন পেছন ঘরে ঢুকল বদ জলহস্তিটা।

হ্যাঁ, ওই নামই দিয়েছে শাহিদ রডরিগেজ নামক এই সাক্ষাৎ শয়তানটাকে।

 

[আবার আগামী সংখ্যায়]

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3960 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...