কাশ্মিরের ভারতে অন্তর্ভুক্তির প্রকৃত ইতিহাস

শান্তনু দত্ত চৌধুরী

 



প্রাবন্ধিক, ‘সপ্তাহ’ পত্রিকার সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য

 

 

 

 

১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যে রাজ্যটি নিয়ে সব চাইতে বেশি সমস্যা উদ্ভূত হয় সেটি হচ্ছে ‘কাশ্মির’। প্রকৃতপক্ষে কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল তার সমাধান এখনও পর্যন্ত হয়নি এবং অদূর ভবিষ্যতেও তা হওয়ার কোনও সম্ভাবনা আছে বলে প্রতীয়মান হয় না। এই নিবন্ধে ১৯৪৭-এর পরিস্থিতি ও প্রকৃত ঘটনাবলির বিষয়ে সংক্ষেপে তথ্যসূত্র সহ বিবৃত করা হয়েছে।

দেশ যখন স্বাধীন হয়, ওই সময় দেশীয় রাজন্য বিভাগের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ছিলেন সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল। কাশ্মিরের ভারতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে তাঁর কী মনোভাব ছিল সে সম্পর্কে বর্তমানে অধিকাংশ মানুষই অবহিত নন। দেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ প্রায়শই বলে থাকেন যে সর্দার প্যাটেল ১৯৪৭ সালে প্রধানমন্ত্রী হলে কাশ্মির সমস্যার সৃষ্টিই হত না। তাঁদের এই বক্তব্যের ভিত্তি কী তা অবশ্য কখনওই তাঁরা ব্যাখ্যা দেননি।

কাশ্মির নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক শাসক-ইসলামিক মৌলবাদী শক্তি জোটের বক্তব্য: ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে ভারত সৈন্য পাঠিয়ে এই রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান প্রজার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বলপূর্বক কাশ্মির দখল করে নেওয়ায় এই সমস্যার উদ্ভব হয়েছে।

এদেশের হিন্দুত্ববাদী মৌলবাদীদের বক্তব্য: নেহরুর একার ভুলের জন্য সমগ্র কাশ্মির ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি, কেননা তিনিই সমস্যাটি রাষ্ট্রপুঞ্জে নিয়ে যাওয়ায় যুদ্ধবিরতি হয়ে যায় এবং কাশ্মিরের কিছু অংশ পাকিস্তানের দখলে থেকে যায়। নতুবা ভারত অনায়াসে গিলগিট ও বাল্টিস্তানসহ পাক-অধিকৃত কাশ্মির দখল করে নিতে পারত।

উপরোক্ত বক্তব্যগুলি সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরার জন‍্যই এই নিবন্ধের অবতারণা।

 

মুঘল সম্রাট আকবরের কাশ্মির অধিকার

দেশের একদম উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত ‘কাশ্মির’ যা ভূস্বর্গ বলে পরিচিত, সেই অঞ্চলটি চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত বৌদ্ধ ও হিন্দু রাজবংশগুলির দ্বারা শাসিত ছিল। কলহন রচিত ‘রাজতরঙ্গিণী’ উপাখ্যানে এ বিষয়ে বিস্তৃত বিবরণ আছে। ষোড়শ শতাব্দীর শুরু থেকে ১৫৮৭ সাল পর্যন্ত কাশ্মিরে স্থানীয় মুসলমান নবাবদের শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিল। সম্রাট আকবরের সময় কাশ্মির মুঘল সাম্রাজ্যের অধীনে আসে। পরবর্তী প্রায় দুশো বছর কাশ্মির ছিল মুঘল সম্রাটদের গ্রীষ্মকালীন আবাস।

 

মুঘল শাসনের বিলুপ্তি

১৭০৭ সালে আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। ১৭৫২ সালে আহম্মদ শা আবদালি (পাঠান) দুর্বল মুঘল সম্রাটদের হাত থেকে কাশ্মির দখল করে নেয়। পরবর্তী প্রায় ষাট সত্তর বছর কাশ্মির ছিল পাঠান শাসকদের অধীনে, যারা কার্যত কাশ্মিরে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করত। ১৮১৯ সালে পরাক্রমশালী শিখ নৃপতি রণজিৎ সিংহ (১৭৮০-১৮৩৯) কাশ্মির জয় করেন এবং ১৮৪৬ সাল পর্যন্ত কাশ্মির শিখ রাজা রণজিৎ সিংহ ও তাঁর ছেলে খড়্গ সিংহের অধীনে ছিল।

 

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও ১৮৪৬ সালের অমৃতসর চুক্তি

১৮৪৬ সালে প্রথম ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধে শিখরা পরাজিত হওয়ার পর রণজিৎ সিংহের দক্ষ ও কুশলী ডোগরা রাজপুত সেনাপতি গুলাব সিংহ দুই শক্তির মধ্যে সন্ধি স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতা করেন। চুক্তিতে স্থির হয় রাজা খড়্গ সিংহকে ১ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ও পাঞ্জাবের সমতলের বিরাট পরিমাণ এলাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে চলে যাবে।

এই ১ কোটি টাকা ক্ষতিপুরণ দেওয়া শিখ রাজার পক্ষে অসম্ভব হওয়াতে আবারও শিখ সাম্রাজ্যের অধীনস্থ বিপাশা নদী থেকে সিন্ধুনদ পর্যন্ত জম্মু-কাশ্মির সহ বিস্তৃত পার্বত্য অঞ্চল (যার মধ্যে বর্তমান হিমাচল প্রদেশও আছে) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে চলে যায়। সেই সময় গভর্নর জেনারেল লর্ড হার্ডিঞ্জ মনে করেন যে এই বিস্তীর্ণ পার্বত্য অঞ্চল ইংরেজ কোম্পানির শাসনে রাখা যুক্তিযুক্ত হবে না। তাঁর যুক্তি ছিল এই অঞ্চলের মধ্যে জম্মু ও কাশ্মির উপত্যকা ছাড়া অধিকাংশ এলাকা অগম্য, বরফাচ্ছাদিত, অনুৎপাদক এলাকা। ব্রিটিশ শাসকরা মনে করেছিল সীমানা বৃদ্ধি এবং সামরিক শক্তি বাবদ বাড়তি খরচ করার কোনও প্রয়োজন নেই। এই অংশ কোম্পানির শাসনাধীনে এলে নতুন নতুন স্বার্থের সংঘাতে তাদের জড়িয়ে পড়তে হবে বলে হার্ডিঞ্জ মত প্রকাশ করেছিলেন। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সেই গুলাব সিংহ এগিয়ে আসেন।

এই গুলাব সিংহের দক্ষতার জন্য মহারাণা রণজিৎ সিংহ তাঁকে আগেই জম্মু ও কাশ্মিরের গভর্নর করেছিলেন। তিনি জানালেন, ক্ষতিপূরণের ১ কোটি টাকা দিতে তিনি প্রস্তুত আছেন। কিন্তু বিনিময়ে তাকে জম্মু ও কাশ্মিরের স্বাধীন রাজা বলে ঘোষণা করতে হবে। ১৮৪৬ সালের ১৬ মার্চ ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে গুলাব সিংহের ‘অমৃতসর চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। গুলাব সিংহ জম্মু ও কাশ্মিরের রাজা বলে ঘোষিত হন এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা করেন।

গুলাব সিংহ

এই চুক্তির ফলেই জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যের এক পৃথক রাজনৈতিক স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হল। গুলাব সিংহ তাঁর রাজ্যের মধ্যে পেলেন সিন্ধুনদ ও রাভিনদের মধ্যে অবস্থিত সমস্ত পার্বত্য অঞ্চল যথা জম্মু ও কাশ্মির উপত্যকা, লাদাখ ও গিলগিট। পেলেন না বর্তমান হিমাচল প্রদেশ যথা চাম্বা উপত্যকা, কুলু ও লাহল উপত্যকা। যার জন্য ওই ১ কোটি টাকা থেকে বাদ গেল ২৫ লক্ষ টাকা। সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বলে এই অঞ্চলগুলি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নিজেদের হাতে রাখল। ফলে গুলাব সিংহকে দিতে হল ৭৫ লাখ টাকা। মহারাজা গুলাব সিং ১৮৫৭ সালে মারা যান। কিন্তু সিপাহি বিদ্রোহের ওই বছরে তিনি তাঁর বাহিনির শিখ ও ডোগরা রাজপুত সৈন্যদের পাঠিয়ে বিদ্রোহ দমনে ইংরেজদের প্রভূত সহায়তা করেন। ১৮৫৭ সালে কাশ্মিরের রাজা হন তাঁর পুত্র রণবীর সিংহ। ১৮৮৫ সালে রণবীর সিংহের মৃত্যুর পর রাজা হন পুত্র প্রতাপ সিংহ। এই রাজা মৃত্যুর আগে তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র হরি সিংহকে উত্তরাধিকারী করে যান, যিনি ১৯২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সিংহাসনে আরূঢ় হন। এই রাজার শাসনামলেই ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টের আগে থেকেই কাশ্মির সমস্যার সূত্রপাত হয়।

দেশ যখন স্বাধীন হল এবং দেশভাগ হল তখন কাশ্মিরের তিনদিকেই ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সীমানা। এর পূর্বে তিব্বত, উত্তর-পুবে চিনের সিনকিয়াং প্রদেশ, উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তানের একটি সরু ফালি ওয়াখান অঞ্চল এসে গিলগিটের ঠিক মাথার ওপরে অবস্থান করছে। আর সামান্য দূরেই রাশিয়ার তুর্কিস্থান, পশ্চিমে পশ্চিম পাঞ্জাব, যা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

 

গিলগিট

এবার ‘গিলগিট’ সম্পর্কে বলা প্রয়োজন। ১৮৪৬ সালের চুক্তি অনুযায়ী এই অঞ্চলটিকে জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যের মধ্যে দেওয়া হয়। কিন্তু ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারত সরকার এই অঞ্চলের গুরুত্ব অনুভব করে ‘গিলগিট এজেন্সি’ গঠন করে। এই এজেন্সির জন্য একজন পলিটিক্যাল এজেন্ট নিয়োগ করা হয়, যার ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেওয়া হয় জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যে নিযুক্ত ব্রিটিশ রেসিডেন্ট কমিশনারকে। আবার ১৯৩৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে সোভিয়েত রাশিয়া চিনের সিনকিয়াং প্রদেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ কায়েম করলে, ভারত সরকার জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যের হাত থেকে ষাট বছরের চুক্তিতে গিলগিট এজেন্সির শাসন ক্ষমতা অধিগ্রহণ করে। ‘গিলগিট স্কাউট’ নামে সামরিক বাহিনি গঠন করা হয়, যার সামরিক অফিসাররা অধিকাংশই ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক। ওই এলাকার সমগ্র অসামরিক শাসন ও সামরিক প্রতিরক্ষার দায়িত্ব ভারত সরকার গ্রহণ করে, যা ছিল ওই দুর্গম ও সুউচ্চ এলাকায় খুবই কঠিন কাজ। অর্থাৎ কার্যত কোনও সময়েই কাশ্মিরের মহারাজার গিলগিটের ওপর কোনওই নিয়ন্ত্রণ ছিল না।

১৯৪৭-এর ৩ জুন যখন দেশভাগের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তখন ব্রিটিশ-ভারত সরকারের ‘রাজনৈতিক বিভাগ’ গিলগিট এজেন্সির শাসনক্ষমতা কাশ্মিরের মহারাজাকে পুনরায় ফিরিয়ে দেয়। গিলগিট স্কাউটও মহারাজের হাতে সমর্পণ করা হয় এবং মহারাজা হরি সিংহ অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে এই প্রত্যর্পণ গ্রহণ করেন।

মহারাজা, ঘানসাড়া সিং নামে একজনকে গিলগিটের গভর্নর নিযুক্ত করেন। এই গভর্নরকে নিয়ে কাশ্মির রাজ্যের সামরিক বাহিনির প্রধান মেজর জেনারেল এইচ এল স্কট ৩০ জুলাই, ১৯৪৭ গিলগিটে পৌঁছন। সেখানে গিয়ে তাঁরা দেখলেন ওখানকার সমস্ত ব্রিটিশ-ভারতের শ্বেতাঙ্গ অফিসাররা পাকিস্তানের অধীনে কাজ করতে চান বলে প্রস্তাব দিয়েছেন। রাজ্যের কোনও অফিসার নেই যাঁরা এঁদের হাত থেকে প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন। গিলগিট স্কাউটও পাকিস্তানের সঙ্গে যেতে চায়। এই স্কাউট ছাড়াও অবশ্য তখন ওখানে ৬ নম্বর জম্মু ও কাশ্মির পদাতিক ব্যাটালিয়ানের (অর্ধেক মুসলমান ও অর্ধেক শিখ) জওয়ানরা কর্মরত ছিল। এর কমান্ডার ছিলেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মজিদ খান। গিলগিট স্কাউট ১ নভেম্বর, ১৯৪৭ রাতে গভর্নরের বাসভবন ঘিরে ফেলে। ২ নভেম্বর সকালে গভর্নর ঘানসাড়া সিং গ্রেপ্তার হন ও বিদ্রোহীরা একটি অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করে। রাজ্যের বাহিনির অধিকাংশ মুসলিম অফিসার ও জওয়ানরা বাহিনি ত্যাগ করে। যারা মহারাজার অনুগত তাদের মধ্যে অনেকে নিহত হয়। যারা আত্মরক্ষা করতে সমর্থ হয় তারা পালিয়ে গিয়ে স্কার্দু বলে একটা জায়গায় কাশ্মির রাজ্যের একটি বাহিনির সঙ্গে যোগ দেয়। ৪ নভেম্বর গিলগিট স্কাউটের ব্রিটিশ কম্যান্ডার মেজর ব্রাউন গিলগিটে পাকিস্তানের পতাকা উত্তোলন করেন। নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে পাকিস্তান নিযুক্ত পলিটিক্যাল এজেন্ট এসে গিলগিটের শাসনভার গ্রহণ করেন। ইনি একদা ছিলেন আজাদ হিন্দ সরকারের মন্ত্রী ও অন্যতম সেনাপতি মহম্মদ জামান কিয়ানি। যাই হোক কার্যত বিনা বাধায় গিলগিট-বালটিস্তান পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।

 

সিয়াচেন গ্লেসিয়ার

তবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে চিন গত শতকের সাতের দশক থেকে তাদের সিনকিয়াং প্রদেশ থেকে গিলগিটের উত্তরে বরফাচ্ছাদিত অঞ্চল দিয়ে পাকিস্তানের সহায়তায় ওই দেশের অভ্যন্তর পর্যন্ত ‘কারাকোরাম সড়ক’ নির্মাণ করছিল। এই সড়ক ভারতের প্রতিরক্ষার পক্ষে বিপজ্জনক হতে পারে বিবেচনায় ইন্দিরা গান্ধির শাসনকালে ১৯৮৪ সালের ১৩ এপ্রিল ভারতীয় সেনাবাহিনি ‘অপারেশন মেঘদূত’ নামক সামরিক অভিযান চালিয়ে গিলগিট-বালটিস্তানের পূর্বদিকে অবস্থিত ‘সিয়াচেন গ্লেসিয়ার’ দখল করে নেয়। প্রকৃতপক্ষে এটি ভারতেরই এলাকা ছিল।

এরপর গত প্রায় চার দশক ধরে বারবার প্রচেষ্টা চালিয়েও পাকিস্তান সিয়াচেন গ্লেসিয়ার পুনরুদ্ধার করতে পারেনি। এই গ্লেসিয়ারের উচ্চতা গড়ে ১৮ হাজার ফুট থেকে ২৩ হাজার ফুট।

 

স্বাধীনতার সময় কাশ্মিরের রাজনৈতিক অবস্থা

জম্মু ও কাশ্মিরের জনসংখ্যার অধিকাংশ মানুষই ছিলেন ইসলাম ধর্মাবলম্বী। কাশ্মির উপত্যকায় বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমান। লাদাখে বৌদ্ধদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। আর জম্মুতে হিন্দু জনসংখ্যা যথেষ্ট হলেও ১৯৪৭ সালেও জম্মুতে শতকরা তিপ্পান্ন ভাগ ছিলেন মুসলমান। যদিও ১৯৪৭ সালে দেশভাগ ও ব্যাপক দাঙ্গার ফলে পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে প্রচুর হিন্দু ও শিখ এসে জম্মুতে আশ্রয় গ্রহণ করতে থাকে। ফলে সম্মিলিতভাবে এরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায়।

জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও প্রশাসন ও সামরিক বাহিনির অধিকাংশ পদে হিন্দুরা নিযুক্ত ছিল। ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘অল জম্মু অ্যান্ড কাশ্মির মুসলিম কনফারেন্স’, যার মূল নেতা ছিলেন শেখ মহম্মদ আবদুল্লা ও গুলাম আব্বাস। শেখ আবদুল্লা আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন, কিন্তু কোনও সরকারি চাকরি না পেয়ে তিনি শিক্ষকতা শুরু করেন। প্রথমে তিনি পড়ুয়াদের ক্লাব সংগঠন করেন। ১৯৩১ সালে মহারাজের সঙ্গে একটি প্রতিনিধিদল নিয়ে সাক্ষাৎ করতে চান। কিন্তু এই দলের একজনকে পুলিশ গ্রেফতার করলে তার মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। পুলিশ বিক্ষোভের ওপর গুলি চালালে ২১ জন নিহত হয়। জনসাধারণের বিক্ষোভে নেতৃত্বদান ও বাগ্মিতার জন্য শেখ আবদুল্লা দ্রুত জনপ্রিয় হন।

 

প্রজা আন্দোলন ও পণ্ডিত নেহরু

১৯৩৯ সালে পূর্বোক্ত সংগঠন মুসলিম কনফারেন্স তার ধর্মীয় পরিচয় মুছে ফেলে এবং সংগঠনের নতুন নাম হয় ‘ন্যাশনাল কনফারেন্স’। বলা হয়, হিন্দু ও শিখরাও এই সংগঠনের অন্তর্ভুক্ত হবেন। সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচিত সরকারের দাবিতে এই সংগঠন আন্দোলন শুরু করে। একই সঙ্গে তারা ‘অল ইন্ডিয়া স্টেট পিপলস কনফারেন্স’-এর অনুমোদন গ্রহণ করে, যার সভাপতি ও প্রধান সংগঠক ছিলেন জওহরলাল নেহরু। এই সংগঠন দেশীয় রাজ্যগুলির রাজা, নবাবদের বিরুদ্ধে প্রজা আন্দোলনকে সমর্থন করত। শেখকে বারংবার গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৬ সালে তিনি ব্রিটিশ অনুগত মহারাজার বিরুদ্ধে ‘কুইট কাশ্মির’ আন্দোলন শুরু করলে তাঁকে আবার গ্রেফতার করে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

জহরলাল নেহরু ও শেখ আবদুল্লা

জওহরলালের সঙ্গে শেখ আবদুল্লার যে ব্যক্তিগত সখ্য গড়ে ওঠে তার ভিত্তি ছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের আদর্শের প্রতি বিশ্বাস’। ন্যাশনাল কনফারেন্সের আন্দোলনকে সমর্থন করতে এই সময় নেহরু কাশ্মির আসেন। কিন্তু তাঁকে গ্রেফতার করে পরে ব্রিটিশ ভারতে ফেরত পাঠানো হয়। পরবর্তী সময়ে যখন শেখ আবদুল্লার বিচার চলছে, তখন নেহরু মহারাজার শাসনের ওপর বিরূপ হয়ে আবার কাশ্মির রাজ্যে আসেন। তাঁকে বিচারালয়ে শেখ আবদুল্লার বিচার চলাকালীন সময়ে উপস্থিত থাকতে দেওয়া হয়, কিন্তু শর্ত আরোপ করা হয় যে তিনি কাশ্মিরে কোনও সভা-সমাবেশ-মিছিল করতে পারবেন না। নেহরু ও কংগ্রেসের সঙ্গে শেখ আবদুল্লা ও ন্যাশনাল কনফারেন্সের এই সম্পর্কের জন্য অপর নেতা গুলাম আব্বাস ক্ষুব্ধ হয়ে এক অংশ মুসলমানদের নিয়ে পৃথক সংগঠন ‘মুসলিম কনফারেন্স’ গড়ে তোলেন। এই গুলাম আব্বাস পরবতী সময়ে পাক-অধিকৃত কাশ্মির অঞ্চলের ভারতভুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেন।

এই কালপর্বে মহারাজা হরি সিংহ কী করছিলেন? তিনি বিলাসব্যসনে অভ্যস্ত ব্যক্তি ছিলেন। রাজ্যে তিনি খুবই কম থাকতেন। তাঁর অধিকাংশ সময়ই কাটত বোম্বাইয়ের রেসের মাঠে আর বিদেশে। রাজ্য চালাতেন দাপুটে প্রধানমন্ত্রী কাশ্মিরি ব্রাহ্মণ রামচন্দ্র কাক। রাজার অপশাসনের বিরুদ্ধে জনসাধারণের ক্ষোভ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে লাগল। এদিকে দেশ স্বাধীন হতে চলেছে ও দেশভাগ হবে। জম্মু ও কাশ্মির কোনদিকে যোগ দেবে অনিবার্যভাবে এই প্রশ্ন উঠতে লাগল। এই সময়ে শেখ আবদুল্লা কারারুদ্ধ। কিন্তু তাঁর দল গণতন্ত্র ও নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছিল। দেশভুক্তির বিষয়ে ওই দল তখনও কিছু বলেনি। প্রজা আন্দোলনের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করতে হবে এটাই ছিল তাদের অন্যতম দাবি। এই অবস্থায় নেহরু আবার প্রজা আন্দোলনের সমর্থনে ও অচলাবস্থা ভাঙবার জন্য কাশ্মির যাওয়ার উদ্যোগ নিলেন। কিন্তু মহারাজার তীব্র আপত্তি ও অন্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যস্ত থাকায় নেহরু কাশ্মির যেতে পারলেন না। তার পরিবর্তে ১৯৪৭ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে গান্ধিজি কাশ্মিরে যান। মহারাজা তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন যেন তিনি কোনও জনসভায় ভাষণ না দেন। তিনি কোনও সভায় ভাষণ না দিলেও অসংখ্য সাধারণ মানুষ তাঁর সঙ্গে দেখা করে। গান্ধিজির এই সফর নিয়ে পরে উল্লেখ করা হবে।

 

মাউন্টব্যাটেনের কাশ্মির যাত্রা

হিন্দু রাজা অথচ প্রজাদের অধিকাংশই মুসলমান। তাদের বৃহৎ অংশ আবার শেখ আবদুল্লার ন্যাশনাল কনফারেন্সের অনুগামী। তারা কখনওই মুসলিম লিগের সঙ্গে কোনও আত্মীয়তা বোধ করেনি। তাদের সখ্য কংগ্রেস ও নেহরুর সঙ্গে। কিন্তু মহারাজা হরি সিংহ ভারতে যোগ দেওয়ার কথা ভাবতেও পারলেন না, তার প্রধান কারণ যদি হয় শেখ আবদুল্লা ও নেহরুর কংগ্রেসের প্রতি তাঁর বিরূপ মনোভাব, তবে দ্বিতীয় কারণ হল তাঁর রাজ্যের বাইরের দুনিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান সড়ক পশ্চিম পাঞ্জাবের রাওয়ালপিন্ডি হয়ে গিয়েছে। রাজ্যের প্রধান আয়ের উৎস ‘কাঠ’ নদনদী বাহিত হয়ে পাকিস্তানের মধ্যে দিয়েই বিপণন হয়। পাকিস্তানে যোগ দেওয়াও মহারাজার পক্ষে সম্ভব নয়। এর কারণ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লাদাখ ও হিন্দু অধ্যুষিত জম্মু এবং সর্বোপরি বৃহৎ সংখ্যক মুসলমান শেখ আবদুল্লার ন্যাশনাল কনফারেন্সের অনুগামী যারা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে।

হরি সিংহ

মাউন্টব্যাটেন দীর্ঘদিন ধরেই মহারাজা হরি সিংহের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। ১৯২১-২২ সালে প্রিন্স অব ওয়েলস-এর ভারত ভ্রমণের সময় দুজনেই একত্রে তাঁর ব্যক্তিগত বাহিনিতে ছিলেন। মহারাজা দীর্ঘদিন ধরেই মাউন্টব্যাটেনকে তাঁর রাজ্যে আসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলেন। গান্ধিজি ও নেহরু কাশ্মির যাওয়ার আগেই মাউন্টব্যাটেন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে ১৯৪৭-এর জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে কাশ্মির গেলেন। মাউন্টব্যাটেন চারদিন কাশ্মির ছিলেন। তাঁর সঙ্গে মহারাজা ও প্রধানমন্ত্রী রামচন্দ্র কাকের দীর্ঘ আলোচনা হয়।

দেশীয় রাজ্য বিভাগের সচিব ভি পি মেনন তাঁর Integration of Indian States গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মাউন্টব্যাটেন অন্যান্য দেশীয় রাজ্যের রাজা ও নবাবদের ক্ষেত্রেও যেমন বুঝিয়েছিলেন তেমনি হরি সিংহকেও বোঝালেন যে তাঁকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ভারত বা পাকিস্তান একটি দেশের সঙ্গে যোগ দিতেই হবে। তিনি বললেন, কাশ্মির স্বাধীন দেশ হিসাবে অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে না। ব্রিটিশ সরকারও এই রাজ‍্যকে স্বীকৃতি দেবে না।

বড়লাট তাঁকে আরও বললেন যে তিনি যদি কাশ্মিরের পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তাহলেও ভারত ক্রুদ্ধ হবে না। এ বিষয়ে স্বয়ং সর্দার প্যাটেল তাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’

 

কাশ্মিরের পাকিস্তানভুক্তি: প্যাটেলের আপত্তি ছিল না

সর্দার প্যাটেলের জীবনীকার রাজমোহন গান্ধি ‘প্যাটেল: এ লাইফ’ গ্রন্থে লিখেছেন যে সর্দারের ‘কাশ্মিরের পাকিস্তান অন্তর্ভুক্তিতে আপত্তি ছিল না। পরে অবশ্য তিনি মত পরিবর্তন করেন।’

মাউন্টব্যাটনের প্রেস সেক্রেটারি অ্যালেক ক্যাম্বেল জনসন তাঁর ‘ভারতে মাউন্টব্যাটেন’ গ্রন্থে (Mountbatten in India) গ্রন্থে লিখেছেন যে বড়লাট লর্ড মাউন্টব্যাটেন মহারাজা হরি সিংহ ও প্রধানমন্ত্রী রামচন্দ্র কাক-কে বলেছিলেন সদ্য প্রতিষ্ঠিত ‘দেশীয় রাজ‍্য বিভাগ’-এর ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী সর্দার প্যাটেল, মহারাজাকে এই প্রতিশ্রুতি দিতে প্রস্তুত আছেন যে কাশ্মির যদি পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হবার ইচ্ছা ঘোষণা করে, তবে সে ঘোষণাকে ভারত সরকার একটা বন্ধুত্ববিরোধী কাজ বলে মনে করবেন না।

যাই হোক, মাউন্টব্যাটেন কাশ্মির অবস্থানের শেষ দিন মহারাজা ও তাঁর প্রধানমন্ত্রী রামচন্দ্র কাককে নিয়ে সমগ্র বিষয়টি নিয়ে আবারও বিস্তৃত আলোচনা করবেন সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে মহারাজা জানালেন যে তিনি পেটের ব্যথায় শয্যাশায়ী তাই তিনি আলোচনায় বসতে পারছেন না। দোদুল্যমান মহারাজার এটাই ছিল সাধারণ প্রবণতা। তিনি ততক্ষণে ভাবতে শুরু করেছেন যে কাশ্মির স্বাধীন থাকবে। কারও সঙ্গেই যাবে না।

ভি পি মেনন তাঁর ওই গ্রন্থেই লিখেছেন, কাশ্মির রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কাক যখন দিল্লিতে আসেন, তখন দেশীয় রাজন্য বিভাগ আয়োজিত দেশীয় রাজা ও নবাবদের সভায় তাঁকে আসতে বললেও তিনি আসেননি। মেনন তাঁর সঙ্গে দেখা করে জানতে চান মহারাজা হরি সিংহ ভারত বা পাকিস্তান কোন দেশের সঙ্গে যোগ দেবেন? কাক এর কোনও সুস্পষ্ট জবাব দেননি। যদিও কাক সর্দার প্যাটেলের সঙ্গে দেখা করেন। একই সঙ্গে কাক মাউন্টব্যাটনের ব্যবস্থাপনায় জিন্নার সঙ্গেও দেখা করে দীর্ঘ আলোচনা করেন। মেনন লিখেছেন, ‘অন্যান্য রাজ্যসমূহের ভারতে যোগদানের বিষয়টি নিয়ে আমরা এতটাই ব্যস্ত ছিলাম যে আমরাও কাশ্মির নিয়ে ভাববার কোনও সময় পাইনি।’ আর কাশ্মির পাকিস্তানে যোগ দিলেও সর্দার প্যাটেলের কোনও আপত্তি ছিল না।

 

গান্ধিজির কাশ্মির আগমন

গান্ধিজি আগস্ট, ১৯৪৭-এর প্রথম সপ্তাহে কাশ্মিরে আসেন। তাঁর কাছে এসে অসংখ্য মানুষ মহারাজার অপশাসন ও তাঁর প্রধানমন্ত্রী রামচন্দ্র কাকের সম্পর্কে অভিযোগ জানায়। শেখ আবদুল্লা তাঁর আত্মজীবনী ‘আতিশ-ই-কাশ্মির’ গ্রন্থে লিখেছেন, রাজ্যের মহারানি তারা দেবী খালি পায়ে সোনার থালাতে করে ফুল, মিষ্টি ইত্যাদি নিয়ে গান্ধিজির সঙ্গে দেখা করতে যান। গান্ধিজি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন ‘বেটি ইসমে ক্যায়া হ্যায়?’ এর উত্তরে তারা দেবী তাঁকে বলেন ‘রাজ্যে কোনো পুন্যাত্মা ব্যক্তি এলে প্রথা অনুযায়ী রাজ্যের রানি খালি পায়ে তাঁর কাছে গিয়ে ফল, মিষ্টি এইসব ভেট দেয়।’ স্মিত হেঁসে গান্ধিজি মহারানিকে বলেন:

‘বেটি, যে রাজ্যের প্রজারা দুঃখী, গান্ধি সেই রাজ্যের রানির ভেট গ্রহণ করতে অপারগ।’

 

১৯৪৭-এর ১৫ আগস্টের পর কাশ্মির

১৫ আগস্টের পর যখন দেশ স্বাধীন হল তখন কাশ্মির পাকিস্তানের সঙ্গে একটি স্থিতাবস্থার চুক্তি (Standstill Agreement) করল।

কিন্তু ভারত পরিস্থিতি কোনদিকে গড়ায় তার ওপর কড়া নজর রাখল ও কাশ্মিরের সঙ্গে এই ধরনের কোনও চুক্তিতে সই করল না। কিন্তু পাকিস্তানের সঙ্গে এই চুক্তি সই করা সত্ত্বেও ওই দেশের সঙ্গে কাশ্মিরের সম্পর্ক ক্রমশ অস্বাভাবিক হতে শুরু করল। কাশ্মিরে খাদ্য, পেট্রোল ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহের পথ তখনও ছিল পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে। কাশ্মির যাতে পাকিস্তানে যোগ দিতে বাধ্য হয় তার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে পাকিস্তান এই সরবরাহ পথ আংশিক বন্ধ করে দিয়ে সঙ্কট সৃষ্টি করল। এই সময়ে মহারাজা হরি সিংহ রামচন্দ্র কাককে সরিয়ে দিয়ে তাঁর জায়গায় জনক সিংহ বলে একজন সেনা অফিসারকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেন। কিছুদিন পর আবার এই ব্যক্তিকে সরিয়ে দিয়ে মেহেরচাদ মহাজন, যিনি পাঞ্জাব হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারক, এঁকে প্রধানমন্ত্রী পদে নিযুক্ত করা হয়।

 

নেহরু ও প্যাটেলের মতৈক্য

প্রধানমন্ত্রী নেহরু বরাবরই চেয়েছিলেন কাশ্মির ভারতের অন্তর্ভুক্ত হোক। কাশ্মিরের প্রজা আন্দোলনের প্রতি, যাতে সব বর্ণের মানুষ যোগ দিয়েছিলেন এবং এর নেতা শেখ আবদুল্লাকে নেহরু সব সময়েই সমর্থন দিয়ে এসেছেন। তিনি মনে করতেন যে কাশ্মিরের ভারতভুক্তি কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির জয়ের এক উজ্জ্বল স্মারক হয়ে থাকবে। ৪৭-এর ২৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নেহরু সর্দার প্যাটেলকে এক দীর্ঘ চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে তিনি বলেন যে কাশ্মিরের পরিস্থিতি উত্তরোত্তর খারাপ হচ্ছে। নেহরুর কাছে খবর ছিল যে পাকিস্তান কাশ্মিরে অনুপ্রবেশকারী ঢুকিয়ে দিয়ে কাশ্মিরকে তাদের সঙ্গে যোগ দিতে বাধ্য করবে। কাশ্মিরের মহারাজার একার শক্তিতে এই আক্রমণ ঠেকানোর ক্ষমতা নেই। তাই মহারাজার উচিত ন্যাশনাল কনফারেন্সের সঙ্গে হাত মেলানো, শেখকে জেল থেকে মুক্তি দেওয়া। নেহরু চিঠিতে বললেন, এর ফলে কাশ্মিরের ভারতভুক্তির ক্ষেত্রে সুবিধা হবে।

২৯ সেপ্টেম্বর শেখ আবদুল্লাকে জেল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কারামুক্তির পর আবদুল্লা হজরতবাল মসজিদ প্রাঙ্গণে এক বিরাট জনসভায় বলেন, ‘জনগণের হাতে সমস্ত ক্ষমতা তুলে দিতে হবে। জনগণের প্রতিনিধিরাই ঠিক করবে কাশ্মির ভারত না পাকিস্তান কোন দিকে যোগ দেবে। নতুন সরকার হবে হিন্দু, মুসলমান, শিখ সম্প্রদায়ের সরকার।’ আর তার জন্যই তিনি আজীবন লড়াই করছেন।

অক্টোবরের প্রথম দিকে সর্দার প্যাটেল নেহরুকে এক চিঠিতে জানান যে কাশ্মিরের পলিসি সংক্রান্ত বিষয়ে নেহরুর সঙ্গে তাঁর আর কোনও নীতিগত মতপার্থক্য নেই। সর্দার প্যাটেল ততদিনে তাঁর মত পরিবর্তন করেছেন। এর কারণ গুজরাতের দেশীয় রাজ্য জুনাগড়ের নবাব মানুষের মতামতের বিরুদ্ধে গিয়ে পাকিস্তানে যোগ দেওয়ায় প্যাটেল খুবই রুষ্ট হয়েছিলেন।

বল্লভভাই প্যাটেল ও জহরলাল নেহরু

এই সময়েই ৪৭-এর ১২ অক্টোবর জম্মু ও কাশ্মিরের উপপ্রধানমন্ত্রী দিল্লিতে এসে বলেন ‘ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের সঙ্গেই তাঁরা ভাল সম্পর্ক রেখে চলতে চান। ভারত বা পাকিস্তান কোনও দেশেই যোগ দেওয়ার কোনও ইচ্ছা তাদের নেই। মহারাজা হরি সিংহ চান কাশ্মির হবে নিরপেক্ষ, প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড।’

৪৭-এর ১৫ অক্টোবর কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রী মেহেরচাঁদ মহাজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে এক চিঠি দিয়ে অভিযোগ করেন যে পাকিস্তান স্থিতাবস্থার চুক্তিভঙ্গ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। শুধু তাই নয় শিয়ালকোট থেকে জম্মুর রেলপথ একতরফাভাবে পাকিস্তান বন্ধ করে দিয়েছে। এই চিঠির কোনও উত্তর গ্রেট ব্রিটেন দেয়নি। চিঠিতে এই অভিযোগও করা হয়েছিল যে সমস্ত সীমান্ত নিয়েই অনুপ্রবেশের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে এবং পুঞ্চে ইতিমধ্যেই অনুপ্রবেশ শুরু হয়ে গিয়েছে। ১৮ অক্টোবর কাশ্মির, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল জিন্না ও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলির কাছেও স্থিতাবস্থা চুক্তি ভঙ্গ করার জন্য অভিযোগ জানিয়ে চিঠি দেয়। ২০ অক্টোবর জিন্না এর রাগত উত্তরে কাশ্মিরের প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর চিঠির ভাষা ও প্রবণতা সম্পর্কে আপত্তি জানিয়ে বলেন, পূর্ব পাঞ্জাবে গণ্ডগোলের জন্য ও যোগাযোগব্যবস্থা বিপর্যস্ত হবার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করা বিঘ্নিত হচ্ছে।

২২ অক্টোবর থেকে কাশ্মির সীমান্তে ব্যাপক অনুপ্রবেশ ও আক্রমণ শুরু হয়। অন্তত ২০০ থেকে ৩০০ লরিতে করে পাঁচ সহস্রাধিক সশস্ত্র পাঠান যার মধ্যে ছিল আফ্রিদি, ওয়াজির, মাহমুদ, সাথী প্রভৃতি উপজাতি এবং পাকিস্তানি সেনা উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের অ্যাবোটাবাদ থেকে ঝিলাম ভ্যালি রোড দিয়ে কাশ্মিরে প্রবেশ করে। ২৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় মহারাজা হরি সিংহ এক আকুল আবেদনে ভারত সরকারের কাছে এই আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য সাহায্য চান।

 

হানাদারদের কাশ্মির আক্রমণ ও কাশ্মিরের ভারতে অন্তর্ভুক্তি

১৯৪৭-এর ২৫ অক্টোবর জরুরি ভিত্তিতে জেনারেল মাউন্টব্যাটেনের সভাপতিত্বে ভারত সরকারের ডিফেন্স কমিটির সভা হয়। ভারত ও পাকিস্তানের সম্মিলিত সেনাবাহিনির সুপ্রিম কমান্ডার ফিল্ড মার্শাল অকিনলেক সভায় জানান, কাশ্মিরে হানাদাররা অনুপ্রবেশ ও আক্রমণ চালাচ্ছে। এরকম পরিস্থিতিতে আরও তথ্য সংগ্রহ ও রাজধানী শ্রীনগরের পরিস্থিতি জানবার জন্য সভা থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে ভি পি মেননকে তৎক্ষণাৎ শ্রীনগর যেতে বলা হয়। একটি বিওএসি-র চার্টার্ড বিমানে কয়েকজন সামরিক অফিসারকে নিয়ে মেনন সঙ্গে সঙ্গেই শ্রীনগর রওনা হয়ে যান। বিমানবন্দরে পৌঁছে তিনি দেখেন সেখানে শ্মশানের নিস্তব্ধতা। শহরে পুলিশ বা প্রশাসনের কোনও চিহ্নমাত্র নেই। কেবলমাত্র ন্যাশনাল কনফারেন্সের কর্মীরা রাস্তাঘাটে পাহারা দিচ্ছে ও গাড়িগুলি তল্লাশি করে ছাড়ছে। তাদের হাতে শুধুমাত্র লাঠি। মেনন সরাসরি প্রধানমন্ত্রী মেহেরচাঁদ মহাজনের বাড়িতে গিয়ে উপস্থিত হন। উদ্বিগ্ন মহাজন মেননকে নিয়ে রাজপ্রাসাদে মহারাজা হরি সিংহর কাছে যান। দেখা গেল মহারাজা অতিশয় বিচলিত বোধ করছেন। তিনি নিতান্তই অসহায় এবং কী করবেন তাও জানেন না। শোনা গেল, হানাদাররা বারমুলা শহরের কাছেপিঠে চলে এসেছে। বারমুলায় কিছু কাশ্মিরের সৈন্য আগেই গিয়েছিল। জ্বালানি তেলের অভাবে কোনও গাড়ি চলছে না। মেনন মহারাজাকে পরামর্শ দেন এই অবস্থায় শ্রীনগরে না থেকে তার এখনই জম্মুতে চলে যাওয়া উচিত। মহারাজা কোনওরকমে তাঁর রানিদের ও পুত্রকে নিয়ে ওইদিন সন্ধ্যায় কয়েকটি গাড়ি নিয়ে জম্মুতে রওনা হয়ে যান।

প্রায় সারারাত প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেরে ২৬ অক্টোবর সকালবেলায় যখন মেনন বিশ্রাম নিতে গেস্ট হাউসে গিয়েছেন, তখনই প্রধানমন্ত্রী মহাজন তাঁকে ফোনে বলেন যে তাঁদেরও এখনই শ্রীনগর ত্যাগ করতে হবে, কেননা হানাদাররা শ্রীনগরের কাছে এসে পড়েছে বলে শোনা যাচ্ছে। একটি বিশেষ বিমানে করে তাঁরা দিল্লি চলে আসেন। ওই বিমানে তাঁদের সঙ্গে গাদাগাদি করে বেশ কিছু শ্বেতাঙ্গ নর-নারীও শ্রীনগর ত্যাগ করেছিলেন।

ভি পি মেনন

দিল্লিতে নেমেই মেনন মহাজনকে নিয়ে সোজা ডিফেন্স কমিটির সভায় গিয়ে উপস্থিত হন। মেননের বর্ণনার পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়। কাশ্মিরকে এই আক্রমণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য অবিলম্বে ভারতের সেনাবাহিনি প্রেরণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী নেহরু এবং দেশীয় রাজন‍্য বিভাগ বিষয়ক মন্ত্রী সর্দার প্যাটেল একমত হন। কিন্তু মাউন্টব্যাটেন বলেন, যেহেতু কাশ্মির এখনও পৃথক রাজ্য সেখানে ভারতীয় সেনা প্রেরণ করলে তা সঠিক কাজ হবে না। সর্বপ্রথম যে কাজটি করতে হবে, তা হল মহারাজা হরি সিংহকে ভারতীয় রাষ্ট্রে যোগ দিতে হবে। তা যদি হয় তখন কাশ্মির ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হবে ও ভারতীয় সেনা প্রেরণ তখন যুক্তিসঙ্গত হবে। একথাও বলেন, বর্তমানে কাশ্মির ভারতে যোগ দিলেও ওই রাজ্যের জনসংখ্যার ধর্মীয় বিন্যাস অনুযায়ী ভবিষ্যতে হানাদাররা বিতাড়িত হলে এবং শাস্তি প্রতিষ্ঠিত হলে, ওখানকার জনসাধারণের ইচ্ছা কী তা জানবার জন্য গণভোট নেওয়া হবে। মাউন্টব্যাটেনের এই বক্তব্য সঙ্গে সঙ্গেই নেহরু, প্যাটেল ও অন্যান্য মন্ত্রীরা সর্বসম্মতিক্রমে গ্রহণ করেন।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গেই বিশেষ বিমানে মেনন ও মহাজন জম্মুতে চলে যান। সারারাত পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে মহারাজা হরি সিংহ তখন ঘুমোচ্ছিলেন। মেনন তাঁকে ঘুম থেকে ডেকে তোলেন এবং জানান যে ভারতীয় প্রজাতন্ত্রে অন্তর্ভুক্তির চুক্তিতে সই না করলে ভারত সরকারের পক্ষে আক্রমণ প্রতিহত করতে সেনা পাঠানো সম্ভব নয়।

মহারাজা সঙ্গে সঙ্গেই এই চুক্তিতে সই করেন। মেনন দেখেন প্রাসাদে অত্যন্ত মূল্যবান জিনিসপত্র যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়ে আছে। মহারাজা মাউন্টব্যাটেনকে একটি চিঠি দেন। তাতে তিনি লেখেন তিনি প্রধানমন্ত্রী মহাজনের সঙ্গে শেখ আবদুল্লাকে যুগ্ম দায়িত্ব দিয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার করতে প্রস্তুত আছেন। মেনন যখন চলে আসছেন তখন মহারাজ তাঁকে বলেন, ঘুমোতে যাওয়ার আগে তিনি তাঁর এডিসিকে এই মর্মে নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন যে মেনন যদি ফেরত না আসেন তাহলে তাঁকে ঘুম থেকে ডাকবার দরকার নেই। কারণ তার অর্থ ভারত সরকার কাশ্মিরকে রক্ষা করবে না এবং সব কিছুই শেষ হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে যেন তাঁকে ঘুমের মধ্যেই গুলি করে হত্যা করা হয়।

 

ভারতীয় সেনা প্রেরণ

মেনন যখন সন্ধ্যায় দিল্লি পৌঁছন সর্দার প্যাটেল তাঁর জন্য বিমানবন্দরেই অপেক্ষা করছিলেন। দুজনে সরাসরি এই সন্ধ্যায় ডাকা ডিফেন্স কমিটির সভায় উপস্থিত হন। দীর্ঘ আলোচনার পর জম্মু ও কাশ্মিরের ভারতে অন্তর্ভুক্তির আবেদন গৃহীত হয়। একই সঙ্গে সিদ্ধান্ত হয় স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে এলে ওই রাজ্যে গণভোট নেওয়া হবে। অবিলম্বে কাশ্মিরে সেনা পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। শেখ আবদুল্লা তখন দিল্লিতে। তাঁকেও এই সভায় ডাকা হয়। তিনি অত্যন্ত জোরের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত সমর্থন করেন।

[যদিও এই সিদ্ধান্তে আসার পরও মাউন্টব্যাটেন ও ইন্ডিয়ান আর্মি, এয়ারফোর্স ও নেভির তিনজন ব্রিটিশ কমান্ডার-ইন-চিফ সেনা পাঠানোর মধ্যে প্রবল ঝুঁকির সম্ভাবনার বিষয়টি উল্লেখ করেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী নেহরু অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলেন যে সেনা না পাঠালে হানাদাররা শ্রীনগরে রক্তাক্ত হত্যালীলা চালাবে। বহু নরনারীর সঙ্গে ওখানে যে শ্বেতাঙ্গরা আছেন তারাও হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের শিকার হবেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সারা দেশজুড়ে সাম্প্রদায়িকতার বাতাবরণ তৈরি হবে। পাকিস্তানে আর্মির ব্রিটিশ কমান্ডার-ইন-চিফ গ্রেসি বা সুপ্রিম কমান্ডার অকিনলেক কেউই নরনারীদের রক্ষা করতে পারবেন না।

পণ্ডিত নেহরুর এই বক্তব্য সকলেই মেনে নেন।]

২৭ অক্টোবর সকাল থেকে ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্সের কয়েকটি বিমান সহ প্রায় একশোটি ভাড়া করা বিমানে অনবরত ভারতীয় সেনাদের শ্রীনগরে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি চলতে থাকে। সেনাবাহিনির ব্রিটিশ ও ভারতীয় অফিসাররা ঘড়ির কাঁটা ধরে সমানে কাজ করতে থাকেন। মেনন তাঁর উপরোক্ত গ্রন্থে লিখেছেন যে আধুনিক যুদ্ধের ইতিহাসে এরকম দ্রুততার সঙ্গে এত সৈন্যকে বিমানের সাহায্যে এরকম প্রতিকূল জায়গায় অতীতে কখনও পৌঁছনো হয়নি। শত্রুর শক্তি ছিল অজানা। উপযুক্ত সামরিক গোয়েন্দা তথ্য ছিল অনুপস্থিত। মাউন্টব্যাটেন যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ব্রিটিশ বাহিনির সর্বাধিনায়ক ছিলেন তিনিও বলেন যে তাঁর যুদ্ধের অভিজ্ঞতায় এত অল্প সময়ের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ সৈন‍্যকে বিমানের সাহায্যে কোথাও পৌঁছতে দেখেননি।

একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। ভারতীয় সেনা যখন শ্রীনগর পৌঁছায় তখন জিন্নার সেক্রেটারি খুরশিদ আহমেদ শ্রীনগরে ছিলেন। বিষয়টি সন্দেহজনক। তাঁকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

আক্রমণকারী হানাদাররা ইতিমধ্যে গারছি ও ডোমেল দখল করে মুজফফরাবাদে পৌঁছে গিয়েছে। জায়গাটি এখন পাক-অধিকৃত কাশ্মিরে। কাশ্মির সেনাবাহিনির একটি ব্যাটেলিয়ান এখানে লেঃ কর্নেল নারাইন সিং-এর কম্যান্ডে মোতায়েন ছিল। বাহিনির অর্ধেক মুসলমান ও অর্ধেক ডোগরা রাজপুত সৈন্য ছিল। এর কিছুদিন আগে মহারাজা হরি সিংহ, নারাইন সিংকে জিজ্ঞাসা করেন যে তিনি মুসলমান সৈন্যদের আনুগত্যের ওপর আস্থাশীল কিনা। উত্তরে নারাইন সিং বলেছিলেন যে ডোগরাদের থেকেও বেশি। কিন্তু হানাদাররা উপস্থিত হলে অধিকাংশ মুসলমান সৈন্যবাহিনি ত্যাগ করে চলে যায়। অনেকে হানাদারদের সঙ্গে যোগ দেয়। লেঃ কর্নেল ও তাঁর রক্ষী নিহত হন। বাকি সৈন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। হানাদারদের লক্ষ্য উরি, বারমুলা হয়ে শ্রীনগর দখল। রাজ্যের সেনাবাহিনির অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার রাজিন্দার সিং ১৫০ জনের সৈন্যদল নিয়ে বারমুলা ছাড়িয়ে উরিতে আক্রমণকারী হানাদারদের বাধা দেন। তিনি উরিতে উত্তরদিক থেকে প্রবেশের সেতুটি উড়িয়ে দিলেন। কিন্তু হানাদাররা ঘুরপথে এসে আক্রমণ করলে কাশ্মির সেনারা দুদিন মরণপণ প্রতিরোধ চালিয়েছিলেন। ব্রিগেডিয়ার সিং ও অধিকাংশ কাশ্মিরি সৈন্য নিহত হন। হানাদাররা বারমুলার দিকে এগিয়ে ২৪ অক্টোবর মাহুতার জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রটি দখল করে নিলে শ্রীনগর সহ সমগ্র উপত্যকা অন্ধকারে ডুবে গেল। ২৫ অক্টোবর হানাদাররা পৌঁছে গেল বারমুলার উপকণ্ঠে। এখানে হানাদাররা শুরু করল লুঠতরাজ, হত্যা ও ধর্ষণ। হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে মানুষ অত্যাচারিত হল। এমনকী খ্রিস্টান মিশনারি সন্ন্যাসিনীরাও রেহাই পেল না। প্রতিরোধ করতে গিয়ে বীরের মৃত্যুবরণ করলেন ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা মকবুল শেরওয়ানি।

২৭ অক্টোবর লেঃ কর্নেল দেওয়ান রণজিৎ রাই-এর নেতৃত্বে একটি শিখ ব্যাটেলিয়ন বেলা ১০:৩০টায় প্রথম শ্রীনগরে অবতরণ করে। লেঃ কর্নেল জানতে পারলেন হানাদাররা বারমুলা দখল করে নিয়েছে। তিনি তখনই বারমুলার পথে এগিয়ে শত্রুসৈন্যকে বাধা দিতে চাইলেন। কারণ উপত্যকার সমতলে নেমে আসার আগেই তাদের আটকাতে হবে। কিন্তু যানবাহন ও তেলের প্রচণ্ড অভাব। কিন্তু এসব কিছুর ব্যবস্থা করলেন ন্যাশনাল কনফারেন্সের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা বকসি গুলাম মহম্মদ। শেখ আবদুল্লা তখন দিল্লিতে। কিন্তু যুদ্ধে নেমে লেঃ কর্নেল বুঝতে পারলেন যে শত্রুসেনা সংখ্যায় যথেষ্ট, আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ও যুদ্ধকৌশল তাদের ভালই রপ্ত আছে। বীরত্বের সঙ্গে পাটান বলে একটি জায়গায় তুমুল যুদ্ধের পর লেঃ কর্নেল রাই নিহত হন।

 

জিন্নার প্রতিক্রিয়া ও ফিল্ড মার্শাল অকিনলেকের বক্তব্য

জিন্না তখন করাচি ছেড়ে লাহোরে এসে অবস্থান করছেন। ভারতীয় সৈন্যের কাশ্মিরে প্রবেশের খবর শুনে ক্ষিপ্ত জিন্না পাকিস্তান সেনাবাহিনির কমান্ডার-ইন-চিফ গ্রেসিকে নির্দেশ দেন অবিলম্বে কাশ্মির আক্রমণ করতে। গ্রেসি জানালেন, তিনি সুপ্রিম কমান্ডার (ভারত ও পাক উভয় সেনাবাহিনির সেনানায়ক) ফিল্ড মার্শাল অকিনলেকের নির্দেশ ছাড়া কাশ্মির আক্রমণ করতে পারবেন না। ২৮ অক্টোবর অকিনলেক উড়ে গিয়ে লাহোরে জিন্নার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বললেন, যদি পাকিস্তানি সেনা কাশ্মির আক্রমণ করে, যা এখন আইনত ভারতের অংশ, সেটা হবে আগ্রাসন, সঙ্গে সঙ্গে পাক সেনাবাহিনির সমস্ত ব্রিটিশ অফিসারদের প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। এই কথা শুনে জিন্না দমে যান। পরিবর্তে তিনি অকিনলেকের মাধ্যমে ভারতের গভর্নর জেনারেল মাউন্টব্যাটেন ও প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে আলোচনার জন্য লাহোরে আমন্ত্রণ জানান।

সর্দার প্যাটেল এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করার বিষয়ে আপত্তি জানান। তিনি বলেন, বকলমে পাকিস্তানই আক্রমণকারী। দরকার মনে করলে জিন্নাই দিল্লিতে আসুন। মাউন্টব্যাটেন এই আলোচনায় যাওয়া উচিত বলে মনে করেন। নেহরু বলেন বিষয়টিকে ভারতের সম্মানের সঙ্গে জড়িত করে দেখা উচিত নয়। বিষয়টি নিয়ে দুজনের (নেহরু ও প্যাটেল) মধ্যে মতপার্থক্য হওয়ায় গান্ধিজির মতামত চাওয়া হয়। ভি পি মেনন লিখেছেন, ২৯ তারিখ রাতে তাঁকে টেলিফোন করে গান্ধিজির সচিব তখনই বিড়লা ভবনে চলে আসতে বলেন। তিনি সেখানে গিয়ে দেখেন যে নেহরু ও প্যাটেল দুজনেই গান্ধিজির কাছে বসে আছেন। গান্ধিজি মেননকে জিজ্ঞাসা করেন যে প্রধানমন্ত্রীর লাহোরে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর (মেননের) মত কী? মেনন লিখেছেন, তিনি গান্ধিজিকে বলেন, যখন গভর্নর জেনারেল তাঁকে মত দিতে বলেছিলেন, তখনই তিনি বলেছিলেন, এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করা উচিত নয়। মেনন লিখেছেন আলোচনা চলতে চলতে দেখলাম নেহরুকে খুবই ক্লান্ত ও অবসন্ন দেখাচ্ছে। দেখা গেল যে তার প্রবল জ্বর এসেছে। এরপরেই তিনি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় তাঁর লাহোর যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। সিদ্ধান্ত হয় মাউন্টব্যাটেন একাই যাবেন।

ইতিমধ্যে মহারাজা হরি সিং শেখ আবদুল্লাকে জরুরি ভিত্তিতে কাশ্মিরে অন্তবর্তী সরকার গঠনের জন্য আহ্বান জানান। আবদুল্লা এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে সরকার গঠন করেন। তাঁর ন্যাশনাল কনফারেন্স ভারতীয় সৈন্যবাহিনিকে সবরকম সহায়তা করতে থাকে। জম্মু ও কাশ্মিরে সবধর্মের মানুষ হিন্দু, মুসলমান, শিখ ও খ্রিস্টানরা শ্রীনগর সহ সর্বত্র স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে পালন করতে থাকে। বারমুলা ও উরি পুনরায় শত্রুমুক্ত হয়।

 

নেহরু ও ভারত সরকারের অবস্থান

২ নভেম্বর, ১৯৪৭ তাঁর বেতার ভাষণে নেহরু বলেন, সমস্ত দিক সম্পর্কে গভীরভাবে চিন্তা করে কাশ্মির সম্পর্কে প্রতিটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে তরবারির আইন, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ ও নরহত্যার কাছে কাপুরুষের মতন আত্মসমর্পণ করা হত এবং তা হত কাশ্মিরের জনসাধারণ আমাদের প্রতি যে বিশ্বাস স্থাপন করেছিল তার প্রতি চূড়ান্ত বিশ্বাসঘাতকতা। তিনি বলেন, কাশ্মিরের সংগ্রাম, এই ভূখণ্ডের জনপ্রিয় নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত জনসাধারণের, আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম। তিনি বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে কাশ্মিরে আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ সংস্থার অধীনে তিনি গণভোট করতে প্রস্তুত। ৩ নভেম্বর প্যাটেল ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলদেব সিং পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে শ্রীনগর যান। তাঁরা কাশ্মিরে মন্ত্রিমণ্ডলীর সঙ্গে কথা বলেন। তাঁরা ভারতীয় সেনাবাহিনির কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার লাওলেন প্রতাপ সেনের কাছ থেকে সামরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন। তাঁরা ৪ নভেম্বর দিল্লিতে ফিরে আসেন।

 

জিন্না ও মাউন্টব্যাটেনের আলোচনা

ওদিকে ১ নভেম্বর মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে জিন্নার আলোচনায় ফলপ্রসূ কিছু বেরিয়ে আসেনি। জিন্নার বক্তব্য ছিল হিংসার সাহায্যে ভারত কাশ্মিরকে অধিকার করেছে। উত্তরে মাউন্টব্যাটেন বলেন, ঘটনা এর বিপরীত, অনুপ্রবেশকারী হানাদাররা হিংসা ছড়িয়েছে। জিন্না বলেন, এখনই উভয়পক্ষ একই সঙ্গে সৈন্য সরিয়ে নিক। মাউন্টব্যাটেন জিন্নাকে প্রশ্ন করেন, এই উপজাতি হানাদারদের কীভাবে সরিয়ে নেওয়া হবে। উত্তরে জিন্না বলেন, ভারতীয় সেনা সরে গেলে তিনি সেই ব্যবস্থা করবেন। মাউন্টব্যাটেন বলেন, কাশ্মিরে ভারতীয় সেনা না এলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাষ্ট্রপুঞ্জের তত্ত্বাবধানে কাশ্মিরে গণভোট হতে পারে। জিন্না বলেন কাশ্মিরে ভারতীয় সেনার উপস্থিতি ও শেখ আবদুল্লা ক্ষমতায় থাকলে কখনওই মানুষ নির্ভয়ে পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেবে না। তিনি প্রস্তাব দেন যে দুই গভর্ণর জেনারেলের তত্ত্বাবধানে গণভোট অনুষ্ঠিত হোক।

জিন্না ও মাউন্টব্যাটেন

এর উত্তরে মাউন্টব্যাটেন বলেন, জিন্না যেমন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল তেমনই তিনি মুসলিম লিগেরও সভাপতি যার জন্য পাকিস্তানে তার একটি বিশেষ স্থান আছে। কিন্তু মাউন্টব্যাটেন নিজে কোনও দলের সঙ্গে যুক্ত নন এবং ভারতে তাঁর কোনও বিশেষ স্থান নেই। মাউন্টব্যাটেন একথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে মহারাজা হরি সিংহ অন্তর্ভুক্তির চুক্তিতে সই করার পরই ভারত কাশ্মিরে সেনা পাঠিয়েছে, কেননা আইনত কাশ্মির এখন ভারতের অংশ। এই আলোচনা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। জিন্নাও অসুবিধায় পড়েন, কেননা জুনাগড়ের ক্ষেত্রে তিনি বলেছিলেন, দেশীয় রাজ্যের প্রজারা নয়, তাঁর রাজ্য কোন দিকে যাবে, সেই রাজ্যের রাজা বা নবাবই তা ঠিক করার অধিকারী। আর কাশ্মিরের ক্ষেত্রে মহারাজা এবং অধিকাংশ প্রজাই ভারতের সঙ্গে থাকতে চেয়েছিলেন। রাজতন্ত্রবিরোধী আন্দোলনের মাধ্যমে কংগ্রেসের সঙ্গে প্রজাদের অত্যন্ত সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। যার অন্যতম স্থপতি ছিলেন পণ্ডিত নেহরু ও শেখ আবদুল্লা।

 

ভারত ও পাকিস্তানের আলোচনা

নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ও ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে দিল্লিতে ভারত ও পাকিস্তানের জয়েন্ট ডিফেন্স কাউন্সিলের দুটি সভা হয়। প্রথমটিতে পাক প্রধানমন্ত্রী লিয়াকৎ আলি আসেননি। পরিবর্তে এসেছিলেন আবদুর পর নিস্তার ও মহম্মদ আলি, পাকিস্তান সরকারের সেক্রেটারি জেনারেল। দ্বিতীয় সভাটিতে এসেছিলেন পাক প্রধানমন্ত্রী লিয়াকৎ আলি। লিয়াকৎ আলি দিল্লি আসার আগে নেহরুকে প্রেরিত টেলিগ্রামে শেখ আবদুল্লা সম্পর্কে অত্যন্ত বিরূপ মন্তব্য করেন। এর ফলে নেহরু প্রথমে লিয়াকৎ-এর সঙ্গে আলোচনায় বসতে চাননি। মাউন্টব্যাটেনের প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা লর্ড ইসমে, ভি পি মেনন ও মহম্মদ আলি আলোচনা করে দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার বিষয় ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে একটি খসড়া তৈরি করেন। এই খসড়ার ভিত্তিতে দুই প্রধানমন্ত্রীর আলোচনাতে নেহরু অবশেষে রাজি হন। এই খসরাতে অবিলম্বে হানাদার বাহিনির অপসারণ, অপসারণ সাপেক্ষে গুরুত্বপূর্ণ চৌকিগুলি ব্যতীত অন্যান্য স্থান থেকে ভারতীয় সেনা সরিয়ে নেওয়া, জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে গণভোট করা, হানাদার আক্রমণে যারা কাশ্মির ছেড়েছে তাদের ফিরিয়ে এনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দেওয়া, রাজবন্দিদের মুক্তি ও অবাধে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর অধিকার ইত্যাদি ছিল।

ইতিমধ্যে সর্দার প্যাটেল ও বলদেব সিং আবার কাশ্মির ঘুরে এসে জানালেন, সীমান্ত জুড়ে হানাদারদের তৎপরতা চলছে। প্রধানমন্ত্রী নেহরুর কাছেও অন্য সূত্রে একই সংবাদ ছিল। এ জন্য ভারত সরকার আরও কঠিন মনোভাব গ্রহণ করল। তা সত্ত্বেও যখন লিয়াকৎ আলি নেহরুকে আলোচনার জন্য আমন্ত্রণ জানালেন, তখন নেহরু সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন ও ৮ ডিসেম্বর জয়েন্ট ডিফেন্স কাউন্সিলের সভায় লাহোর গেলেন। লর্ড মাউন্টব্যাটেনও ওই সভায় যোগ দেন। ৮ ডিসেম্বর আলোচনায় কোনও অগ্রগতি হল না। নেহরু জানিয়ে দিলেন ভারত সরকার কখনওই সমগ্র সেনা প্রত্যাহার করবে না। তা করলে কাশ্মিরের মানুষ হানাদারদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। নিরপেক্ষ প্রশাসন বিষয়ে নেহরু বলেন, বিষয়টি একান্তভাবে কাশ্মিরের জনসাধারণের সিদ্ধান্তসাপেক্ষ। শেখ আবদুল্লা ও তাঁর সহযোদ্ধারা গত ১৫ বছর ধরে ওই রাজ্যে একটি দায়িত্বশীল সরকারের জন্য সংগ্রাম করছেন ও তার জন্য কারাবাস ভোগ করেছেন। ওই রাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক সংগঠন ন্যাশনাল কনফারেন্স। এই প্রথম ওই রাজ্যে একটি দায়িত্বশীল সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তিতে মহারাজার স্বৈর শাসনের অবসান হয়েছে। অতএব ওই সরকারের শাসন অবসানের কোনও প্রশ্নই ওঠে না। নেহরুর এই দৃঢ় মনোভাবের জন্য ‘৪৭-এর ৮ ডিসেম্বরের ওই আলোচনা ব্যর্থ হয়।

 

কাশ্মির নিয়ে জাতিসঙ্ঘে আলোচনা

এই পরিস্থিতিতে মাউন্টব্যাটেন গান্ধিজি ও প্রধানমন্ত্রী নেহরুর কাছে জাতিসঙ্ঘের মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের জন্য প্রস্তাব দেন। প্রথমে আপত্তি থাকলেও অবশেষে নেহরু বিষয়টি জাতিসঙ্ঘের কাছে নিয়ে যেতে সম্মত হন। মন্ত্রিসভার বৈঠকে কোনও কোনও সহকর্মীর এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সংশয় থাকলেও প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

ভি পি মেনন লিখেছেন, প্যাটেল ও শ্যামাপ্রসাদ এই প্রস্তাবের আদৌ কোনও বিরোধিতা করেননি। ১৯৪৮-এর জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে রাষ্ট্রসঙ্ঘের কয়েকটি বৈঠকে কাশ্মির নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও আলোচনা হয়। ভারতীয় প্রতিনিধিদলে শেখ আবদুল্লা ছিলেন। ৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৪৮-এ জাতিসঙ্ঘে তাঁর তীব্র আক্রমণাত্মক ভাষার বক্তৃতায় শেখ বলেন ‘পৃথিবীতে এমন কোনও শক্তি নেই যা আমাকে, কাশ্মিরে আমার জায়গা থেকে সরাতে পারে। যতদিন জনগণ আমার সঙ্গে আছে, ততদিন আমি সেখানে থাকব।’ জাতিসঙ্ঘের অধিবেশনগুলিতে পাক প্রতিনিধি দলের নেতা স্যার জাফারুল্লা খান ভারতে ও কাশ্মিরে মুসলমানদের ওপর অত্যাচারের তথাকথিত অভিযোগ তুলে উপজাতি হানাদারদের আক্রমণকে যুক্তিসঙ্গত বলে বর্ণনা করলেন। আর অধিবেশনগুলিতে ব্রিটিশ ও মার্কিন প্রতিনিধিরা সর্বদাই পাকিস্তানকে সমর্থন করেন। জাতিসঙ্ঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করে ও জাতিসঙ্ঘের প্রেরিত প্রতিনিধিদের তদারকিতে ভবিষ্যতে গণভোটের আয়োজন হবে বলে  সিদ্ধান্ত হয়।

পরবর্তী সময়ে নেহরু জাতিসঙ্ঘে বিষয়টি নিয়ে যাওয়ার জন্য আফশোস করেন। এর জন্য তিনি মাউন্টব্যাটেনকেও কিছুটা অভিযুক্ত করেছিলেন ও বলেছিলেন, “জাতিসঙ্ঘ নৈতিকতার বদলে ক্ষমতার রাজনীতি দ্বারা চালিত হচ্ছে। নেহরু বলেন, ওই সঙ্ঘ এখন পুরোপুরি আমেরিকার কব্জায় চলে গেছে এবং ব্রিটিশদের মতন আমেরিকানরাও কোনওরকম রাখঢাক না করেই পাকিস্তানের পক্ষে তাদের সহানুভূতি ব্যক্ত করছে।

যদিও যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গৃহীত হয় কিন্তু গোটা ১৯৪৮ সাল জুড়েই সীমান্ত সংঘর্ষ চলতে থাকে। ১৯৪৮-এর জুলাইয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনি, ব্রিগেডিয়ার ওসমানের নেতৃত্বে নৌসেরা সংলগ্ন অঞ্চলগুলি হানাদারদের হাত থেকে মুক্ত করে। ব্রিগেডিয়ার ওসমান এই যুদ্ধে বীরের মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে পরিণত হন। ১৯৪৮-এর নভেম্বরে কারগিল ও দ্রাস হানাদারদের হাত থেকে মুক্ত করা হয়। এর ফল লাদাখ ও তার সদর ‘লে’ বিপদমুক্ত হয়।

কিন্তু উত্তরে সুউচ্চ বরফে ঢাকা গিলগিট ও বালটিস্তান এবং পশ্চিমে মুজফ্ফরাবাদ মুক্ত করার জন্য আরও যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া উচিত হবে না বলে ভারতীয় সেনাবাহিনির প্রধান জেনারেল রয় বুচার ও অন্যান্য ভারতীয় সেনাধ্যক্ষরা মত প্রকাশ করেন। ভি পি মেনন যিনি দেশীয় রাজাগুলির অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত বিভাগের সচিব ছিলেন, তিনি গিলগিট কী করে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল সে কাহিনি লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। এই নিবন্ধের প্রথম অংশে তা উল্লেখ করা হয়েছে। ব্রিটিশরাও কোনওদিন গিলগিটের শাসনভার নিজেদের হাতে রাখেনি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে তারা ওই জায়গার শাসনভার হাতে নেয়, আবার বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে কাশ্মিরের ভারতীয মহারাজাকে তা ফেরত দিয়ে দেয়। বরফে ঢাকা ওই অঞ্চল বছরে ৬ মাস অগম্য থাকে।

পশ্চিমে বর্তমান পাক-অধিকৃত কাশ্মির বলে পরিচিত যে সরু ও লম্বা ভূখণ্ডটি আছে সেখানে বরাবরই মুসলিম কনফারেন্স, যারা শেখ আবদুল্লার চরম বিরোধী, তারাই আধিপত্য করে রেখেছিল। মহারাজার শাসনে ওই অঞ্চলের মানুষ বরাবরই ক্ষুব্ধ ছিল, যার সুযোগ নিয়েছিল সাম্প্রদায়িক শক্তি, উপজাতি হানাদাররা। প্রকৃতপক্ষে ভি পি মেনন এই গ্রন্থে (Integration of Indian states) একথাও বলেছেন যে ভারতের কোনও এলাকা অধিকারের কোনও মানসিকতাই ছিল না। কাশ্মির এককভাবে স্বাধীন থাকলেও কোনও আপত্তি ছিল না। পাক মদতপুষ্ট হানাদার আক্রমণের নৃশংসতার পরই ভারত তার মনোভাব পরিবর্তন করে। এমনকী মাউন্টব্যাটেন ভারত ত্যাগের আগে বলেছিলেন, যা মেনন উক্ত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, “ভারত সরকারের পক্ষ থেকে পূর্ণ কর্তৃত্ব নিয়ে আমি মহারাজা হরি সিংহকে বলেছিলাম যে আপনি পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হবার জন্য স্বাক্ষর করলেও ভারত সরকার আপত্তি করবে না।” প্রকৃতপক্ষে এটাই ছিল প্যাটেলের অধীনস্থ দেশীয় রাজন্য বিভাগের মত। সুভদ্র নেহরু এই বিষয়ে প্যাটেলের সঙ্গে কোনও বিতর্কে যাননি। কিন্তু পাক হানাদারদের আক্রমণ, কাশ্মির নিয়ে নেহরুর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ইচ্ছা, যার ভিতর ছিল পরবর্তীকালের আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ভাবনা, তা কার্যকর করার পথ খুলে দেয়। একই সঙ্গে তা হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তানের সঙ্গে চিরকালীন দ্বন্দ্বের উৎপত্তিস্থল। কিন্তু যে উপত্যকার জনসাধারণ পাক মদতপুষ্ট হানাদারদের প্রতিরোধ করার জন্য একদা ভারতীয় সেনাবাহিনির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন, তাঁদের কেন ভারতবিরোধী বলে চিহ্নিত করার এই প্রচেষ্টা? কেন কাশ্মিরের ভারতভূক্তি সম্পর্কে প্রকৃত ইতিহাসকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিকৃত করা হয়? যারা এই কাজ করে তাদের ১৯৪৭-৪৮ সালে কী ভূমিকা ছিল?

কাশ্মিরের ভারতে অন্তর্ভুক্তি গায়ের জোরে হয়নি। ওই সময় কাশ্মিরের অধিকাংশ মানুষ ভারতে থাকতে চেয়েছিলেন। এর জন্য প্রধান অবদান পণ্ডিত নেহরু ও শেখ আবদুল্লার। পণ্ডিত নেহরু কাশ্মিরের জনগণের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ রাখতেন। আর কোনও জাতীয় নেতার কাশ্মিরের সঙ্গে বিন্দুমাত্র যোগাযোগ ছিল না। এই সত্যটি বেমালুম চেপে গিয়ে গত ৭৫ বছর ধরে ক্রমাগত পণ্ডিত নেহরু-বিরোধী মিথ্যা প্রচার চালানো হয়েছে, যার বিন্দুমাত্র সারবত্তা নেই। এই নিবন্ধে তথ্যসূত্র সমেত প্রকৃত সত্য তুলে ধরা হল। আশা করি পাঠকরা এই নিবন্ধটি পড়ে প্রকৃত সত্য জানতে পারবেন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4506 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...