বিষাদকালের কথকতা: বাঙালি হইয়া থাকিব, না বঙ্গভাষী অসমিয়া হইয়া মরিব?

সঞ্জীব দেবলস্কর

 


পরিস্থিতির চাপে পড়ে বাঙালিকে দেশবিভাজন মেনে নিতে হয়েছে, এখন কি খণ্ডিত জাতিসত্তাও মেনে নিতে হবে? মনে রাখা প্রয়োজন অখণ্ড ভারতে স্বাধীনতার প্রথম বাণী তাঁদের কণ্ঠেই উচ্চারিত হয়েছে, জাতীয় সঙ্গীতের সর্বজনগ্রাহ্য বয়ানও বাঙালির মানসপ্রসূত। বাঙালিকে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার প্রাথমিক প্রয়াস হিসেবে এদের "বাংলাভাষী '(তবে)' অসমিয়া" বলিয়ে নেওয়ার প্রয়াস নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক। এ পরিকল্পনার পেছনে সঙ্কীর্ণ রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই নেই

 

সম্প্রতি অসমে পত্রপত্রিকা, টিভির টক-শো এবং সামাজিক মাধ্যমে ‘বাংলাভাষী অসমিয়া’ শব্দবন্ধটি বেশ শোনা যাচ্ছে। এটা একেবারে নতুন কোনও সৃষ্টি (coinage) নয়। রাজনৈতিক অভিসন্ধি-প্রসূত বৃহত্তর অসমিয়া জাতিগঠনের প্রয়াস হিসেবে ‘অসমিয়া’র সংজ্ঞায়ন ইত্যাদি নিয়ে যে অনুশীলন চলছে কয়েক বছর ধরে এরই ধারাবাহিকতায় শব্দবন্ধটি নতুন করে প্রচারের আলোয় এল। এতে অবশ্য অসমের সর্বজনস্বীকৃত তাত্ত্বিক পণ্ডিতদের অর্থাৎ যাঁরা এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান, তাঁদের কোনও মতামত নেই। এর সমর্থনে কতিপয় সুযোগসন্ধানী বয়ানসর্বস্ব সামাজিক মাধ্যমে বিচরণকারী (এরা আবার বাঙালিও)— এদের কণ্ঠস্বরই কথঞ্চিত উচ্চগ্রামে শোনা যাচ্ছে।

বিশেষ লক্ষণীয় হল, এ মহৎ প্রয়াসে নিজের পরিচিতিটি পালটে ফেলার জন্য পরামর্শটি এসেছে কেবলমাত্র একটি জনগোষ্ঠীর জন্যই। অসমে বসবাসকারী অপরাপর ভাষিকগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচিতিতে স্থিত থাকতে বোধহয় কোনও অসুবিধা নেই, তাও বেশ বোঝা গেল। বাঙালিকেই বুঝি নতুন পরিচিতি ধারণ করে জাতে উঠতে হবে, এটাই যেন আপাতত প্রধান দাবি।

এ বিষয়ে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই বলতে হয়, বাংলাভাষী-অসমিয়া একটি অবাস্তব কষ্টকল্পিত ধারণা। যে রাজ্যে অনন্দরাম বরুয়া, সূর্যকুমার ভুঁইয়া, হেমচন্দ্র গোস্বামী, বাণীকান্ত কাকতি, বিরিঞ্চিকুমার বরুয়া, কালিরাম মেহেদি, কৃষ্ণকান্ত সন্দিকৈ, পদ্মনাথ বিদ্যাবিনোদ, রাজমোহন নাথ, মহেশ্বর নেওগের মতো বিশিষ্ট পণ্ডিত, ভারততত্ত্ববিদগণ ইতিহাস-ভাষাতত্ত্ব-প্রত্নতত্ত্ব-নৃতত্ত্বের উপর আলোকপাত করে গেছেন এখানে এ ধরনের অনুশীলন রাজ্যের বৌদ্ধিক ঔজ্জ্বল্যকে কিঞ্চিৎ ম্লান করে দেয় বই কি।

বাঙালি বা যেকোনও জাতিই খণ্ডিত পরিচিতি নিয়ে বাঁচতে পারে না। হয় তাঁকে জন্মসূত্রে এবং ঐতিহ্য  পরম্পরাসূত্রে প্রাপ্ত পরিচিতি ঘুচিয়ে নতুন পরিচিতি গ্রহণ করতে হবে (এটা কয়েক শতাব্দ বা সহস্রাব্দের প্রক্রিয়াতেই সম্ভব, এটা বোঝার মতো নৃতাত্ত্বিক জ্ঞান অসমে অপ্রতুল নয়), নয়তো সাংবিধানিক, মানবিক অধিকার অনুযায়ী তাকে নিজস্ব অস্তিত্বেই স্থিত হতে হবে। এর কোনও মধ্যপন্থা নেই।

মুখের ভাষা বা মাতৃভাষা এমন এক জিনিস যা সচেতন প্রয়াসেও নিশ্চিহ্ন করা যায় না। কোনও না কোনওভাবে সংস্কার ও সংস্কৃতির সঙ্গে মুখের ভাষাটিও টিকে থাকে। উদাহরণ আমাদের সাগরদাড়ির কবি শ্রী মধুসূদন। তিনি দেশবাড়ি, আত্মীয়স্বজন, এবং মাতৃভাষা পরিত্যাগ করে দৈবের বশে কতই না দেশে প্রবাসে বিচরণ করেছেন, পৈতৃক ধর্ম ছেড়ে বাইবেলীয় মাইকেল উপাধিও ধারণ করলেন, কিন্তু হায়! এহেন প্রতিভাশালী ব্যক্তিরও শেষ আশ্রয় হল মাতৃভাষা। তাঁরও শেষ অনুভব ‘মাতৃকোষে রতনের রাজি’।

ধর্ম পালটানো যায়, কিন্তু ভাষা? এত সহজ নয়। প্রমাণের জন্য বেশি দূরে যেতে হয় না। অসমেই দেখেছি গত শতকের পাঁচের দশকে সরকারি খাতায় হাজারে হাজারে (না লক্ষে লক্ষে) বাঙালি মাতৃভাষা পরিত্যাগ করে ভিন্নতর পরিচিতি লিখিয়েছিলেন, ‘লেইখ্যা লইন আসাইম্যা’। ফলত রাজ্যে যে একটা বিস্ময়কর কাগুজে জনস্ফীতি— ‘biological miracle’[1] দেখা গিয়েছিল, এ নিয়ে সাতকাহনে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। নব্য-অসমিয়া হিসেবে এই বাঙালিমূলের অভিবাসীরা দিন কয়েকের জন্য উষ্ণ অভ্যর্থনাও লাভ করেছিলেন আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। কিন্তু এদেরই তাজা রক্তে কিছুদিন পরই রচিত হল মর্মান্তিক ইতিহাস। ১৯৬০ সালের ২০ জুন থেকে মরিয়ানি, অতঃপর শিবসাগর, লামডিং, ডিব্রুগড়, গোলাঘাট, তিতাবর, পাণ্ডু, যোরহাট, নাহারকাটিয়া, আমগুড়ি নওগা, গোরেশ্বরে প্রাণ গেল বাঙালির। এহ বাহ্য, ১৯৮৩ সালে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গোরেশ্বর, খৈরাবাড়ি, শিলাপাথার, চামারিয়া, ধুলা, সিপাহঝার, জামাগুড়িহাটে গণহত্যা এবং ১৮ ফেব্রুয়ারি সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত নওগা জেলার চালখোয়া, নেলি, গহপুর-সহ বেশ কয়েকটি গ্রামে শিশু, বৃদ্ধ, নারী পুরুষের ঘাড়ের উপর জাতীয়তাবাদের খড়্গ উঠে শতাব্দীর অভাবনীয় গণহত্যার নজির সৃষ্টি করল। শিশু যেমন মাকে প্রাণভয়ে আঁকড়ে ধরে তেমনি নতুন ভাষাকে আঁকড়ে ধরেও এদের নিস্তার হল না। সরকারি খাতায় লেখা নবপরিচিতি কোনও সুরক্ষা দিতে পারল না। শুধু কি তাই? এর চারটি দশক পরও এই অত্যাচারিত, ভাষাহারা মানুষগুলোর অবশিষ্ট উত্তরসূরিদের পিঠে জুড়ে বসল কতকগুলো তকমা, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ ‘বাংলাদেশি’ ইত্যাদি। অরণ্যময় অসমে প্রতিকূল প্রকৃতির বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করে এদের প্রপিতামহের দল যখন অরণ্যাচ্ছাদিত অ-কর্ষিত ভূমি আর জলমগ্ন চর-চাপরি অঞ্চলকে কৃষির আওতায় আনলেন, তখন অবশ্য বাংলাদেশ নামক বিদেশি রাষ্ট্রটির কথা কারও কল্পনায়ও আসেনি।

 

দুই.

বাঙালিদের নিজেদের জাতিগত পরিচিতিটি বিকৃত করে ‘বাংলাভাষী অসমিয়া’ পরিচিতি গ্রহণ করার পরামর্শের পরিপ্রেক্ষিতে বলতে হয় এ ভূমিতে বাঙালির অস্তিত্বেরও একটা যুক্তিগ্রাহ্য ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। বিষয়টিকে একটু বড় প্রেক্ষাপটে দেখাও বোধহয় প্রয়োজন।

বাংলাভাষার (অসমিয়ারও) উৎপত্তির অনেক অনেক আগে থেকেই বাংলা বা বঙ্গ-ভূমিতে[2] বসবাসকারী কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন মানবপ্রজাতির শাখা পূর্বমুখী প্রব্রজনের (eastern migration) সূত্রে এদিকে এসে বসতি করেছে। তাছাড়াও এদেরই আরেকটি দল প্রত্যক্ষ রাজানুকূল্যে ‘কামরূপ রাজ্যে’ এসে বসতি করেছে[3]। ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় বাংলাভাষা-সংস্কৃতির ধারক এদেরই উত্তরসূরিরা মধ্যযুগ থেকে আধুনিক কালে অসমের বাসিন্দা হয়েছে। বঙ্গীয় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় এদের মুখে উচ্চারিত হয়েছে বাংলাভাষা (প্রাকৃত, সন্ধ্যাভাষার স্তর পেরিয়েই)। পরবর্তী দিনে আবার এদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কোচ এবং আহোম রাজসভার আনুকূল্যে আগত ব্রাহ্মণ সহ বিভিন্ন বর্গের বাঙালি। এসব আগন্তুকদের সম্বন্ধে ঐতিহাসিক হেড়ম্বকান্ত বরপূজারী মহোদয় লিখেছেন— Brahmins were, however, settled in Assam from very early times, from fifth century if not earlier, and they were imported from time to time not only from Bengal but Upper India also by the Koch and Ahom rulers…[4]। বরপূজারী মহোদয়ের বাক্যটি লক্ষণীয়, তিনি বলছেন খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দীই নয় এরও আগে বাংলার মানুষ অসমে এসেছেন। এরপর আহোমরাজ শিব সিংহের (১৭১৪-৪৪) সময়কালে নবদ্বীপ থেকে আমন্ত্রিত মহন্ত কৃষ্ণরাম ভট্টাচার্য প্রসঙ্গে অধ্যাপক বরপূজারী বলেন তাঁর মাধ্যমে ষোড়শ শতকে অসমে নৈয়ায়িক স্মার্ত রঘুনন্দনের স্মৃতির প্রচলনও ঘটেছে।

এমতাবস্থায় ত্রয়োদশ শতকে (১২২৮) দক্ষিণপূর্ব এশিয়া থেকে একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীর আগমনের পূর্বেকার অর্থাৎ খ্রিস্টীয় পঞ্চম-ষষ্ঠ শতক (বা তারও আগে) থেকে আগত বঙ্গদেশীয় অভিবাসীদের স্থানীয় হিসেবে বৈধতা কোনওক্রমেই কম হতে পারে না। এরা এসেছে ভারতীয় উপমহাদেশের মূলভূমি থেকে, ভারতীয় মানচিত্র-বহির্ভূত কোনও বিদেশ থেকে নয়।

এই দীর্ঘ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় যারা পূর্বপুরুষের ভাষিক পরিচিতি ঘুচিয়ে অসমিয়া সমাজদেহে লীন হয়ে গেছে (ঈশ্বর তাদের মঙ্গল করুন), আর যারা বঙ্গীয় উত্তরাধিকার নিয়ে নিজ ভাষায় স্থিত রয়ে গেছে (অর্থাৎ অসমিয়া জাতিসত্তার সঙ্গে যাদের লীন হয়ে ওঠা হয়নি, ঈশ্বর তাদেরও মঙ্গল করুন), এরা উভয়েই কিন্তু অসমের আদি বাসিন্দা। প্রথমোক্তদের মুখে অসমিয়া বুলি ফুটলেও জিনগতভাবে (genetically) এরা বাঙালিই (নৃতাত্ত্বিকরা এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত বলতে পারবেন)।

আজ ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে উচ্চারিত হচ্ছে ‘অসমের মাটি থেকে উঠে আসা ভাষা হচ্ছে অসমিয়া’। এতে অবশ্য এতটুকুও অতিশয়োক্তি নেই, এবং এতে কারও দ্বিমত করার কোনও কারণ নেই। তবে বাংলাও যে অসমের মাটি থেকে উঠে আসা আরেকটি ভাষা, এ কথাটিও যে উপেক্ষা করা যায় না। গাঙ্গেয় (বঙ্গ) সমভূমিতে (সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে বিলগ্ন নিম্ন এবং দক্ষিণ অসমে) বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ ও বিবর্তনের যে-প্রক্রিয়াটি পূর্ববঙ্গসহ অখণ্ড বাংলার ভৌগোলিক অঞ্চলে ক্রিয়াশীল ছিল, ওই একই প্রক্রিয়াই প্রাচীন, মধ্যযুগ থেকে প্রাগাধুনিককাল পর্যন্ত সচল ছিল নিম্ন অসম এবং কাছাড়সহ বিস্তৃত সমভূমিতেও। এ ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার স্বরূপ উপলব্ধির দায় জাতীয়তাবাদী শিবিরের উপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না, কিন্তু অসমের বাঙালির এটা উপেক্ষা করা আত্মঘাতেরই নামান্তর। সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, দীনেশচন্দ্র সেন আর নীহাররঞ্জন রায়ের গ্রহণযোগ্যতা অসমে বেশি বই কম নয়।

বরাকসহ নিম্ন অসমের সঙ্গে সুদূর অতীতকাল থকে গাঙ্গেয় সমভূমির ভৌগোলিক সম্পর্ক, এবং এ ভূখণ্ডে সমাজ ও জাতিগঠন, জনবিন্যাস এবং রাষ্ট্রনৈতিক সংগঠনেও এর প্রভাব নিয়ে কাজ করেছেন বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ, সমাজ বিজ্ঞানী অধ্যাপক সুজিত চৌধুরী, অসম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ইতিহাসবিদ, অধ্যাপক জয়ন্তভূষণ ভট্টাচার্য, উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন অধ্যাপক, বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী বাণীপ্রসন্ন মিশ্র ছাড়া আরও অনেকে। প্রাগৈতিহাসিক পর্বে যে-প্রক্রিয়ায় বঙ্গদেশে ইন্দো-মঙ্গোলীয় বা অস্ট্রিক-ভোটব্রহ্ম মানবগোষ্ঠীর সংমিশ্রণে বাঙালি জাতিসত্তার উদ্ভব (ও বিকাশ) ঘটেছে— আমাদের বর্ণিত অঞ্চলটি এই প্রক্রিয়ারই অন্তর্গত অঞ্চল, তা এঁদের গবেষণায় উঠে এসেছে।

পরিস্থিতির চাপে পড়ে বাঙালিকে দেশবিভাজন মেনে নিতে হয়েছে, এখন কি খণ্ডিত জাতিসত্তাও মেনে নিতে হবে? মনে রাখা প্রয়োজন অখণ্ড ভারতে স্বাধীনতার প্রথম বাণী তাঁদের কণ্ঠেই উচ্চারিত হয়েছে, জাতীয় সঙ্গীতের সর্বজনগ্রাহ্য বয়ানও বাঙালির মানসপ্রসূত। এ জাতির প্রতি কবিগুরুর সম্পর্কধন্য এহেন আচরণে অতি অবশ্যই রাজ্যের সব মানুষের আন্তরিক সমর্থন থাকবে না। বাঙালিকে অস্তিত্বহীন করে দেওয়ার প্রাথমিক প্রয়াস হিসেবে এদের “বাংলাভাষী ‘(তবে)’ অসমিয়া” বলিয়ে নেওয়ার প্রয়াস নিতান্তই দুর্ভাগ্যজনক। এ পরিকল্পনার পেছনে সঙ্কীর্ণ রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই নেই।

বড়ো, মিসিং, কার্বি, মণিপুরি, ডিমাসা কিংবা মাড়োয়ারি, বিহারি, নেপালিদের নিজস্ব ভাষিক পরিচিতি যেমন এক, অখণ্ড এবং অবিভাজ্য, তেমনি বাঙালিরও প্রথম এবং শেষ পরিচয় বাঙালি– তা সে বাঙালি বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা কিংবা ইংল্যান্ড-আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়া-আফ্রিকা বা অসম– যেখানেই থাকুক না কেন। তাঁর জাতিসত্তার পেছনে রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। এ ঐতিহ্যকে অস্বীকার করে যারা বেঁচে থাকতে চায় এরা অন্তর দিয়ে যেমন নিজেকে ভালবাসতে পারে না, তেমনি অসমকে ভালবাসতে পারে না। সুযোগসন্ধানী, পরগাছা, আত্মপরিচয়বিহীন এ শ্রেণি অসমিয়াদের কাছে কোনও সম্ভ্রমও দাবি করতে পারে না। এরা যে অসমের প্রকৃত সম্পদ নয়, ইতিহাসই একদিন এর প্রমাণ দেবে। অসমিয়া প্রতিবেশীর ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক সম্পদ বাঙালি প্রাণের টানেই আত্মস্থ করেছে, করবেও, যেমন নিজের ভাষিক সত্তাকে খণ্ডিত না করেও এতকাল করে আসছে।

সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন “বাঙ্গালার ইতিহাস চাই। নইলে বাঙ্গালী কখনও মানুষ হইবে না।” এ কথাটি আজ অসমের, বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বাঙালির উপলব্ধি করার সময় এসেছে। এদের মনে রাখা প্রয়োজন, বাংলাভাষা এ রাজ্যে উড়ে এসে জুড়ে বসা বা আকাশ থেকে খসে পড়া কোনও কিছু নয়, এ ভাষাও এ মাটি থেকে উঠে আসা জীবন্ত ভাষা। এ কথাটি যে-বাঙালি উপলব্ধি করতে পারে না সে দুর্ভাগা। আলাদা করে মেঘনা উপত্যকার উত্তরাংশ, বরাক-সুরমা উপত্যকার কথা উঠলে, এখানকার সমাজ এবং জনবিন্যাস বিষয়ে কাছাড়ের জননেতা রাশিদ আলী লস্কর গত শতকের দুইয়ের দশকে বিধান পরিষদে উত্থিত এক প্রশ্নের উত্তরে যে কথাটি বলেছিলেন সেটাও বিশেষ করে স্মর্তব্য: ‘আপনারা যারা প্রশ্ন তুলেছেন কাছাড়ে বাঙালি কবে থেকে বাস করছে, তাঁদের আমি একটি পালটা প্রশ্ন করি— রোমক জাতি কবে থেকে রোমের বাসিন্দা হয়েছে?’[5] সেদিন তিনি দৃপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন— ‘কাছাড়ে বাঙালিরা আকাশ থেকে নেমে আসেনি, বৃক্ষ থেকেও নয়, নয় অসম ভ্যালি থেকেও; এরা সিলেট সহ বঙ্গভূমির স্বাভাবিক উত্তরাধিকারী, এ মাটিরই সন্তান।’

এরই সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আজও বলা যায় অসমে বাঙালিরা হিমালয়ের ওপার থেকে আসেনি, ভারত মহাসাগর পেরিয়েও আসেনি, এরা এসেছে আদি অনাদি ভারতবর্ষের মূলভূমি— গৌড়বঙ্গ, বারেন্দ্রভূমি, উত্তরবঙ্গ কিংবা হরিকেল-সমতট-গঙ্গারিডি-নিধনপুর-ভাটেরার ঐতিহ্য বহন করেই। ভারতের মানচিত্র-বহির্ভূত কোনও বিদেশভূমি থেকে কদাপিও নয়।

 

তিন.

ফিরে আসি মূল প্রসঙ্গে, সাক্ষীসাবুদ নিয়ে একখানা দলিলে সই দিলে বা কিছু শাস্ত্রীয় আচার আচরণ পালন করলে অবশ্যই ধর্মীয় পরিচিতি পালটে যায়— মুসলিম থেকে হিন্দু, হিন্দু থেকে খ্রিস্টান ইত্যাদি। কিন্তু অ্যাফিডেবিট করে একজন ওড়িয়ার বাঙালি হয়ে যাওয়া, অথবা একজন মিজোর বিহারি কিংবা অসমিয়ার বাঙালিতে রূপান্তরের কথা নিতান্তই অবাস্তব, হাস্যকরও বটে। হাজার বছরের বিবর্তনে যদি অসমের সব বাঙালি একদিন অসমিয়া হয়ে যায়, বা সব অসমিয়া হয়ে যায় বড়োতে রূপান্তরিত, সে অন্য কথা। কিন্তু সভা সমিতি করে, আইনি বা প্রাশাসনিক চাপ সৃষ্টি করে বা সাময়িক প্রলোভন দেখিয়ে কোনও জাতির ভাষিক রূপান্তর, এ বিষয়টি আপাতত মহাকালের হাতেই থাকুক।

ভাষাহারা, আত্মপরিচয় পরিচয়ত্যাগী অন্তঃসারশূন্য একটা উদ্ভট জনগোষ্ঠী অসমের মতো বহুভাষিক রাজ্যের সম্পদ হয়ে উঠতে পারে না। প্রত্যেকটি জাতির সৃজনশীলতা, বৌদ্ধিক বিকাশ এবং কর্মদক্ষতার প্রাথমিক সোপানই তার মাতৃভাষা।

আমরা দেখেছি হেমাঙ্গ বিশ্বাস বাঙালিত্বে স্থিত থেকেও অসমিয়া কাব্য, সঙ্গীত (এবং সাম্যবাদী আন্দোলনে) বিশেষ অবদান রেখেছেন, ভূপেন হাজারিকা অসমিয়া ভাষিক সত্তায় স্থিত থেকেও বাংলা গানের এক যুগান্তকারী স্রষ্টা।

নিজেদের ভাষিক অস্তিত্বের প্রতি আস্থাশীল হওয়াটা কোনও দেশদ্রোহিতা নয়। এ নিয়ে অপপ্রচার আর হিংসা ছড়ানোটাই দেশদ্রোহিতা। বাঙালি মনীষীরা উনবিংশ শতাব্দী থেকে অসমের ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজ অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছেন। যারা অসমিয়া-বাঙালির ফারাক করেন, তাদের উপর শুধু রাজ্যের একজন মাত্র মন্ত্রীর কেন, অসমে বসবাসকারী সমগ্র বাঙালিজাতিরও সম্মিলিত ধিক্কার বর্ষিত হোক্।

শেষ কথা হচ্ছে, বাঙালির পরিচিতির মধ্যে যেকোনও ধরনের অস্পষ্টতা সর্বতোভাবে প্রতিহত করা চাই। বাঙালি জাতিবাচক শব্দটির সঙ্গে অতিরিক্ত কতকগুলো নির্দেশক বা সংযোজক-শব্দগুলো আপাতত নির্দোষ মনে হলেও এ শব্দ প্রয়োগের পেছনে দুরভিসন্ধি আজ স্পষ্ট। ‘বাঙালি জনগোষ্ঠী’, ‘ভাষাগোষ্ঠী’, কিংবা ‘বঙ্গীয়সমাজ’— কর্ণপীড়াদায়ক এ শব্দগুলো বর্জন করাই প্রয়োজন। বাঙালি তো বাঙালিই, তার সঙ্গে কোনও prefix বা suffix লাগানোর প্রয়োজন নেই। নৃতত্ত্ববিদ অতুল সুর, রমাপ্রসাদ চন্দ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, অক্ষয়কুমার মিত্র, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, নগেন্দ্রনাথ বসু, দীনেশচন্দ্র সরকার, কিংবা ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, দীনেশচন্দ্র সেন, সুকুমার সেন থেকে সমসাময়িক বিদ্বজ্জনেরা বাঙালিকে বাঙালি বলেই সংজ্ঞায়িত করেছেন। আজ যদি অন্ধমোহ এবং আত্মবিস্মৃতিতে বাঙালিরা এদিকে উদাসীন থাকেন তবে এটা তাঁদের দুর্ভাগ্য।


[1] যেমন বলেছিলেন RB Bhagaiwalla, Superintendent of Census Operation, 1951.
[2] মনে রাখা প্রয়োজন, ভোটব্রহ্ম বা অস্ট্রিক ভাষার ‘হা-বাংলা’ থেকে উৎপন্ন বঙ্গ বা এর সংস্কৃতায়িত রূপ ‘বঙ্গলম’ শব্দটির অর্থ হল পূর্ণতার দেশ— the land of plentifulness. Dr. Halzesh এ দেশকে বলেছেন ‘the land where rainfall never ends’, দ্রষ্টব্য হরিচরণ বন্দ্যোপাধায়, বঙ্গীয় শব্দকোষ, সাহিত্য অকাদেমি ২০১১ সংস্করণ।
[3] ৩৫০ থেকে ১১৪০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে– তখনও আসাম নামটির উদ্ভব হয়নি।
[4] Comprehensive History of Assam, Government of Assam, 2004, p153.
[5] ০৭/০১/ ১৯২৬, অসম বিধান পরিষদ, কার্যবিবরণী দ্রষ্টব্য।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...