প্রাপ্তি ও হারানোর গল্প

একা কুরনিয়াওয়ান

 

ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: নাহার তৃণা

একা কুরনিয়াওয়ান (Eka Kurniawan) একজন ইন্দোনেশিয়ান কথাসাহিত্যিক, চিত্রনাট্যকার। ইন্দোনেশিয়ার সাহিত্যজগতে তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি সম্মানজনক ‘ম্যান বুকার ইন্টারনেশন্যাল প্রাইজ’-এর জন্য ২০১৬ সালে মনোনীত হন। পশ্চিম জাভার তাকিসমালায়াতে ১৯৭৫-এর ২৮ নভেম্বর তিনি জন্মগ্রহণ করেন। দর্শনশাস্ত্রের ছাত্র একা কুরনিয়াওয়ান সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন। ছোটগল্প, উপন্যাস, চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য ইত্যাদি তাঁর লেখালেখির পছন্দের মাধ্যম। এ পর্যন্ত প্রায় ২৪টির বেশি ভাষায় তাঁর সাহিত্য অনূদিত হয়েছে।

তাঁর লেখা আন্তর্জান্তিক সাহিত্য মহলে বিপুল প্রশংসা কুড়িয়েছে। একা কুরনিয়াওয়ান রচিত বিশ্বব্যাপী খ্যাতিপ্রাপ্ত উপন্যাস ‘বিউটি ইজ অ্যা উন্ড’ (Beauty is a Wound) দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ১০০টি উল্লেখযোগ্য বইয়ের তালিকায় স্থান পেয়েছে। উপন্যাসটিতে তিনি যে ভঙ্গিতে জাদুবাস্তবতা (magic realism)-র ব্যবহার করেছেন সেটিকে অনেক সাহিত্যবোদ্ধা গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের সঙ্গে তুলনীয় বলে উল্লেখ করেন। একা কুরনিয়াওয়ানের সাহিত্যে সামাজিক নানা বিষয় এবং দ্বন্দ্ব জাদুবাস্তবতা বা হাস্যরসের মোড়কে পরিবেশিত হয়, তাঁর এই স্টাইল বা ভঙ্গি অনেক পাঠককে হারুকি মুরাকামির কথা স্মরণ করায়। ইন্দোনেশিয়ান খ্যাতনামা সাহিত্যিক প্রমোদেয় অনন্থ টোয়ের (Pramoedya Ananta Toer)-এর পর একা কুরনিয়াওয়ানকে এখন পর্যন্ত ইন্দোনেশিয়ার উল্লেখযোগ্য লেখক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। “বিউটি ইজ অ্যা উন্ড”, “ম্যান টাইগার” ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য রচনা।

বর্তমান গল্পটি তাঁর Acceptance and Loss গল্পের ভাষান্তর।

 

ফজরের নামাজের ঠিক আগে আমি বাড়িতে এসে পৌঁছলাম। কিছুক্ষণ পর ছোটবোনটাও এসে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে ভেতরে ঢুকেই সে প্রশ্ন করে—

—বাবা আর নেই?
—এখনও প্রাণ আছে। আমি উত্তর দিলাম।
—ডাক্তার বলেছেন এ অসুখে মানুষ বাঁচে না।

বাবা এখনও বেঁচে আছেন। যদিও তিনি প্রায় মৃতের মতো অসাড় অবস্থায় বিছানায় শুয়েছিলেন। এ দৃশ্য দেখে বোনের ফোঁপানি খানিকটা থিতিয়ে এল। বোন বলল মায়ের ফোন পেয়েই সে ছুটে এসেছে। এরপর সে যা বলল সেই একই কথা মা আমাকেও বলেছেন— সম্ভব হলে বাড়িতে এসো, যে নার্স তোমার বাবার দেখাশোনা করেন তিনি জানিয়েছেন তোমার বাবার কিডনি বিকল হতে বসেছে। এখানে আসবার পথে ছোটবোনটা ক্যাম্পাসের স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ডাক্তার দেখিয়ে এসেছে। ওর চোখে অসহ্য চুলকানি হচ্ছিল।

চোখ পরীক্ষার পর বোন ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেছিল, আচ্ছা কারও কিডনি বিকল হলে কী হয়?

প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতেই ডাক্তার উত্তর দিয়েছিলেন, দুটো কিডনি বিকল হলে মানুষটা মারা যায়।

উত্তর শুনে আমার বোনটা তীক্ষ্ণ চিৎকার করে ওঠে। ডাক্তারকে ভড়কে দিয়ে সে কান্নায় ভেঙে পড়ে। তারপর বহু কষ্টে নিজেকে সংবরণ করে ওখান থেকে বেরিয়ে এলেও, বাড়ি আসবার পুরোটা পথে সে কান্না থামেনি। তার মনে হয়েছে বাবা বুঝি এর মধ্যেই মারা গেছেন।

আমি নিশ্চিত বাবা যদি আমাদের দু-ভাইবোনের এই কথপোকথন শুনতে পেতেন, তবে হেসে আকুল হতেন। বাবা হাসতে খুব পছন্দ করতেন। হয়তো বাবা আমাদের আলাপ ঠিকই শুনছেন, যেহেতু তাঁর নড়াচড়ার ক্ষমতা নেই, তাই হাসতে পারছেন না, ঠোঁট টিপেও তাঁর পক্ষে হেসে ওঠা সম্ভব হচ্ছে না। এই অবস্থাতেও যদি বাবার শোনার ক্ষমতা থাকে, তবে নিঃশব্দে মনে মনেই তিনি আমাদের কাণ্ডকীর্তিতে হেসেছেন। হাসির ভেতর বাবা ঘুমিয়ে পড়েন।

আমরা সবাই বাবার চারপাশে জড়ো হয়েছি। মা, ছোটবোন সূরা ইয়াসিন পড়ছিল। আমি ওদের সঙ্গে যোগ দিতে পারিনি। কোরান শরীফ আমি পড়তে পারি, কিন্তু ওদের মতো অতটা সাবলীলভাবে আর দ্রুত পারি না; তাই চুপচাপ ওদের পাঠ শুনছিলাম। আমার অন্যান্য ছোট ভাইবোনেরাও আমার মতো এ বিষয়ে লবডঙ্কা।

বাবা নিজেই আমাদের নামাজ আর কোরান শরীফ পড়তে শিখিয়েছিলেন। যদ্দূর মনে পড়ে, আমি তিনবার কোরান খতম করেছিলাম। আমাদের বাড়ির পেছনে বাবা ছোট একটা মক্তব খুলেছিলেন। যেখানে তিনি পাড়াপড়শির ছোট ছোট বাচ্চাদের নামাজ এবং কোরান শরীফ পড়তে শেখাতেন। শুক্রবার মসজিদে বাবা খুতবা দিতেন। প্রতি শুক্রবার সকালে খুতবায় কী বলবেন সেটা খুব যত্ন নিয়ে বাবাকে লিখতে দেখতাম। পাড়ার মসজিদের মোয়াজ্জেনের মৃত্যুর পর তাঁর জায়গায় বাবা নিযুক্ত হন।

মসজিদটা মোহাম্মাদিয়া সম্প্রদায়দের হওয়ার কারণে অনেকেই মনে করেছিলেন বাবাও বুঝি ওদের সম্প্রদায়ভুক্ত। ওরকম ভাবনা বাবাকে খুব একটা বিচলিত করেনি; রোজা ও ঈদের নামাজের জন্য বাবা বরং মোহাম্মাদিয়া ক্যালেন্ডার অনুসরণ করতেন এবং এগারো রাকাত তারাবিহের নামাজ আদায় করতেন। দরকার পড়লে তিনি নাহদলাতুল উলামার লোকদের সঙ্গেও তারাবিহর নামাজ পড়তেন। যেমন আমার নানাজান, যিনি সবসময় তেইশ রাকাত তারাবিহ পড়ার জন্য জোর দিতেন। তা নিয়েও বাবা কখনও আপত্তি তোলেননি।

আমি বাবার মাথার কাছে বসে তাঁর দিকে তাকিয়ে মনে মনে ভাবলাম, আচ্ছা, বাবা কি এমনটা চেয়েছিলেন যে তাঁর সন্তানদের কেউ তাঁর মতো মোয়াজ্জেন হোক?

—তুমি কীভাবে খুতবা দিতে যাও বুঝি না বাপু! নামাজটা ঠিকভাবে পড়ো কিনা সন্দেহ।

মা প্রায়ই এভাবে কথা শোনাতেন বাবাকে। উত্তরে বাবা কিছু বলতেন না, শুধু মুখ ভরে হাসতেন।

মা কেন ওরকম বলতেন জানি না। তবে বাবা ধর্মীয় বিষয়ে মোটেও গোঁড়া ছিলেন না। তিনি আমাদের পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়াশোনার বিষয়ে কখনও বাধা দেননি। বাবা যদি চাইতেন আমাকে মাদ্রাসায় পাঠাতে পারতেন। কিন্তু সেটা না করে তিনি আমাকে কলেজে পড়তে পাঠালেন; যেখানে আমার মূল পাঠ্যবিষয় ছিল দর্শন, এটা জেনেও বাবার পক্ষ থেকে কোনও আপত্তি ওঠেনি, যে অদূর ভবিষ্যতে তাঁর ছেলের নামাজ-রোজা ছেড়ে দেওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তৃতীয় সেমিস্টারের পর যখন আমি বাড়ি এসেছিলাম, তখন আমার পরনের টি-শার্টে লেনিনের ছবি দেখে মা প্রায় বিলাপের সুরে বলে উঠেছিলেন, দেখো, তোমার ছেলে কমিউনিস্ট হয়ে গেছে! (মা অবশ্য কমিউনিস্ট উচ্চারণ করতে পারেননি, তিনি সেটাকে বলেছিলেন কামিউনিসট।) শুনে বাবা বরাবরের মতো খুব হেসেছিলেন।

আমার ছোটভাইয়ের পড়াশোনা নিয়েও বাবা কোনও আপত্তি তোলেননি। পশুপালন বিষয়ে সে পড়াশোনা করে, এবং বিভিন্ন জাতের মুরগির উপর কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সে চার্লস ডারউইনের তত্ত্বের সঙ্গে সহমত জানিয়ে ঘোষণা করে, মানুষ আর বানরের পূর্বসূরি এক, আদম-হাওয়া তাদের পূর্বসূরি নন। তার এহেন মতামতকে পাত্তা দেওয়ার কোনও প্রয়োজন দেখাননি বাবা, বরং পোলট্রি ফার্ম ব্যবসা আরম্ভের প্রাথমিক খরচাবাবদ টাকাটা বাবাই তাকে দিয়েছিলেন।

১৯৯৯ সালের নির্বাচনে, মা ক্রিসেন্ট স্টার পার্টিকে ভোট দিয়েছিলেন (বাবাও তাই, মাসিউমিকে বছরের পর বছর ভোট দেওয়ার পরে ইউনাইটেড ডেভেলপমেন্ট পার্টি) এবং নতুন করে আবারও তাঁর বিলাপ শুরু হয়েছিল। কারণ গোটা গ্রামের ভেতর একজনই ছিল, যে কিনা পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির পক্ষে ভোট দিয়েছিল। সবাই জানতেন সেটা আর কেউ নয়, আমার ছোটভাই, মুরগির খামারি। একমাত্র সেই তাদের হয়ে প্রচারণা চালিয়েছিল এবং তাদের পোস্টার সামনের উঠোনে টাঙিয়েও রেখেছিল। যেখানে লেখা ছিল “তোমার পুত্রদের মধ্যে আরও একজন কমিউনিস্ট”।

এই ঘটনা নিয়েও বাবা যথারীতি হেসেছিলেন। আমি জানতাম বাবা তাঁর কোন ছেলে লেনিনের ছবিওয়ালা টি-শার্ট পরল, বা কোন ছেলে পিডিপিকে ভোট দিল, সে চিন্তা বাদ দিয়ে তিনি বরং প্রতিবেশীর পুকুর থেকে ছেলের মাছ চুরির বিষয়টা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন থাকতেন।

এমনকী আমার ছোট যে বোনটা এখন মায়ের সঙ্গে সূরা ইয়াসিন পাঠ করছে— তার খুব ইচ্ছা ছিল জার্কাতার স্টেট ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক কলেজ থেকে ধর্ম নিয়ে পড়াশোনা করে শিক্ষক হবে।

কিন্তু বাবা মোটেও চাননি বোনটা ধর্মশিক্ষক হোক। বাবা বরং তখন আমাকে বলেছিলেন,

—ওর উচিত এসব চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে পছন্দমতো একজন বর খুঁজে নেওয়া।

আমার সেজবোন, যে চোখের ডাক্তার দেখাতে গিয়ে বাবার অসুখের ভয়াবহতায় কেঁদেছিল, তার পড়াশোনা ইন্দোনেশিয়ান সাহিত্য নিয়ে। চতুর্থ বোন ম্যানেজমেন্টে ডিগ্রি লাভ করেছে। আমাদের সবচেয়ে ছোটভাইটা এখনও কলেজের চৌকাঠে পা রাখেনি। এখন সে পায়ের উপর পা তুলে আমাদের সঙ্গে বসে আছে। পা নাচাচ্ছে অস্থিরভাবে। তাকে দেখে বুঝতে সমস্যা হচ্ছে না, সে এখানে মোটেও স্বস্তিতে নেই; বরং এখান থেকে পালিয়ে নিজের ঘরে গিয়ে প্লেস্টেশন খেলার প্রতিই তার যত আগ্রহ। বড়ভাই হিসেবে তাকে এই অস্বস্তি থেকে উদ্ধারে একটা ভূমিকা আমি রাখতেই পারি, সে অধিকার থেকে ওকে নিজের ঘরে চলে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলাম।

—ও কিন্তু লুকিয়েচুরিয়ে প্রেম করছে। সূরা ইয়াসিন পাঠ শেষে ছোটবোনটা জানান দেয়— দুদিন আগে বাসে এক মেয়েকে দেখে আমাদের ভাই দেওয়ানা হয়ে গেছে।
—মেয়ে?
—উহহু। ভাই বলেছে মেয়েটি নাকি ওর দিকে চেয়ে চোখ টিপেছিল।
—আচ্ছা। তারপর? বাকি কাহিনি জানার জন্য সেজবোন হাঁসফাঁস করে ওঠে।
—তারপর আর কী, দিল মে চাক্কু! তখন নাকি ভাইয়ের হৃদস্পন্দন কিছুক্ষণের জন্য এক্কেবারে থেমে গিয়েছিল। বাকিটা পথ ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও চোখ তুলে মেয়েটার দিকে তাকাতে পারেনি। তার খুব ইচ্ছে করেছিল কাছে গিয়ে মেয়েটার সঙ্গে আলাপপরিচয় করে, কিন্তু ডরপুকের সাহসে কুলায়নি। বলা শেষ করে ছোটবোন হেসে উঠল।
—তারপর কী হল?
—তারপরের অংশটা শুনলে হেসেই খুন হবে। বাস শেষমেশ ভাইয়ের স্টপেজে এসে পড়ে। তখন নাকি ওর ভয় হয় মেয়েটার সঙ্গে তার হয়তো জিন্দেগিতে আর দেখা হবে না। সে কারণে সাহসে ভর করে সে মেয়েটার দিকে সোজাসাপ্টা তাকায়, মেয়েটা তখনও তার দিকেই তাকিয়েছিল। শেষমেশ বাস থেকে নামার সময় ভাই মেয়েটার দিকে তাকিয়ে চোখ টেপে। তারপর হুড়মুড়িয়ে নামতে গিয়ে কোথায় পা ফেলছে ঠাহর না পেয়ে রাস্তার পাশের খাদে গিয়ে পড়েছে।

এবার আমিও হেসে উঠলাম।

মৃত্যু নিয়ে যদি বাবার আফসোস থাকে, তবে তা হবে তাঁর ছোটছেলের বড় হওয়া এবং আমাদের সবার মতো পড়াশোনা-ক্যারিয়ারের খাতিরে বাড়ি ছেড়ে যাওয়াটা তিনি স্বচোখে দেখতে পারলেন না সেটা নিয়ে। তিনি হয়তো আমাদের ছোটভাইয়ের কাণ্ডকীর্তির গল্প শুনতে পেয়েছেন। যদি শুনে থাকেন, আমি নিশ্চিত বাবা হাসছেন। হয়তো বাবার সেই মৃদু হাসি তাঁর হৃদয়ের গভীরে স্বস্তি ছড়িয়ে তাঁকে দীর্ঘ ঘুম ঘুমিয়ে পড়তেও সাহায্য করবে।

তিনি এই ভেবে শান্তি পাবেন, তাঁর ছোট ছেলে এখন আর শিশুটি নেই, সে বড় হয়েছে। যে কিনা এরই মধ্যে চলন্ত বাসে কোনও এক মেয়েকে চোখ টিপে ইশারা করেছে।

তারুণ্যের প্রাথমিক ধাপে, আমার অন্যান্য বন্ধুদের মতো শনিবার বলে বিশেষ কোনও রাত আমার বরাদ্দে ছিল না। কোনও মেয়েবন্ধুও ছিল না, যে কারণে গিটার বাজানোর মাঝখানে ‘পার্টি ডল’ বলে হিল্লোল তোলার তাগিদ জাগেনি কখনও (তাতে কোনও সমস্যা হয়নি, কেননা তখন বা তার কয়েক বছর পরও রোলিং স্টোন এবং মিক জ্যাগার আমার পছন্দের তালিকায় ছিল না), টেলিভিশন দেখার বালাইও ছিল না তখন; ওসবের পরিবর্তে বাবা আমাকে সূরা আবৃত্তি করতে নিয়ে যেতেন।

এভাবে বাবার সঙ্গে দোয়া-দরুদের আসরে যাওয়ার ব্যাপারটা তখন আমার খুব খারাপও লাগত না। পাড়ার এক কসাইয়ের বাড়িতে দোয়া দরুদ পড়ার আসর বসত। আসর শেষে (যেটার অপেক্ষায় আমি সবচেয়ে বেশি উদগ্রীব থাকতাম) বিশেষ ভোজের আয়োজন থাকত, তাতে গরুর গোশত দিয়ে তৈরি বিভিন্ন পদের সুস্বাদু খাবার পরিবেশন করা হত। আজ আর আমার মনে নেই ওই আসরে যে ওস্তাদজি আমাদের কোরান শিক্ষা দিতেন তিনি কোত্থেকে এসেছিলেন, তবে এটুকু মনে আছে তিনি কোরান শরীফের সব আয়াত আরবি ভাষায় মুখস্থ করেছিলেন, এবং সেসবের অর্থও তাঁর আত্মস্থ ছিল। কোরান পড়তে গিয়ে কেউ কোনও সমস্যা নিয়ে তাঁর কাছে গেলে তিনি চট করে নির্দিষ্ট অধ্যায় বা আয়াত উল্লেখ করে সমস্যার সমাধান দিতে পারতেন। প্রত্যেকের যার যার কোরান শরীফ নিয়ে আসতে হত, ইন্দোনেশিয়ান ভাষায় অনূদিত আয়াতগুলো নির্ভুল কিনা তিনি তা খুঁটিয়ে দেখে দিতেন। কোরান শরীফের প্রথম পাতায় লেখা বহুল পরিচিত শব্দগুলো ছিল, “সমস্ত উত্তর এই বইতে পাওয়া যাবে।”

কোরান পাঠের পর ওস্তাদজি বক্তব্য রাখতেন। তিনি তাঁর কথা শুরু করতেন এভাবে— আমার আফগানিস্তানের ভাই ও বোনেরা। ঠিক মনে নেই, ওই বিষয়ে তাঁর বক্তব্য কতক্ষণ ধরে চলত, মনে হয় ধারাবাহিকভাবে এক সপ্তাহ ধরে তিনি আফগানিস্তান সম্পর্কে আলোচনা করতেন।

এক রাতে, আমি বাবাকে বললাম, আমি আফগানিস্তানে যেতে চাই।

বাবা সে কথার কোনও উত্তর দেননি। ওরকম বলার ফল হল পরের সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহগুলোতে বাবা আর আমাকে ওসব অনুষ্ঠানে নিয়ে যাননি। তিনি নিজে সেখানে যাওয়া বন্ধ করেছিলেন কি করেননি সেটা আমার মনে নেই। তারপর তো আমি বাদে গোটা বাড়ির মানুষ চিকেন পক্সে আক্রান্ত হল। বাবা তখন আমাকে বলেছিলেন, আমি যেন কিছুদিনের জন্য মামার বাড়িতে গিয়ে থাকি। আমি বাধ্য ছেলের মতো মামার বাড়ি চলে গিয়েছিলাম।

মামার বাড়িতে আমাকে একটা রেডিও শুনতে দেওয়া হয়েছিল। তারপর থেকে শনিবারের রাতগুলো রেডিওর নব ঘুরিয়ে নানা অনুষ্ঠান শুনে কাটিয়েছি। আমার নিচের ক্লাসের এক মেয়ের সঙ্গে তখন মাত্রই আমার পরিচয় ঘটে। অনুরোধের আসরে তার নামে একটা গান উৎসর্গ করে চিঠি পাঠিয়েছিলাম। বিনিময়ে সে কখনও আমাকে কিছু পাঠায়নি। আমি কিন্তু তখনও তার পিছু ছাড়িনি। মাসের পর মাস ধরে মেয়েটির পেছনে ঘোরাঘুরির ঝোঁকে আমার মাথা থেকে কখন জানি না আফগানিস্তান যাওয়ার ভূত নেমে গিয়েছিল।

বিছানায় নিথর শুয়ে থাকা বাবার দিকে তাকিয়ে, বারবার বিগত দিনের স্মৃতিতে ফিরে যাচ্ছিলাম। আমাকে তখন আফগানিস্তানে যেতে না দেওয়ার জন্য বাবার প্রতি কৃতজ্ঞ হব কিনা তা নিয়ে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই। তবে তখন যেতে দিলে বাবার মৃত্যুশয্যার পাশে থাকা আমার পক্ষে আজ আর সম্ভব হত না, এ কথা সত্যি। হয়তো ওখানকার কোনও গির্জা বা হোটেল উড়িয়ে দেওয়ার কারণে শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে ধরিয়ে দেওয়ার তালিকায় আমারও নাম থাকত। অথবা তারচেয়ে আরও খারাপ কিছু হতে পারত। যেহেতু আমার ধারণা অধিকাংশ লোকের তুলনায় আমি অনেক তুখোড়, কাজেই আমার পরিকল্পনাগুলোও মামুলি কিছু না হয়ে চরমমাত্রার কিছু হত আর তার পরিণামও পাল্লা দিয়ে সেই মাত্রার খারাপ হত। সম্ভবত আমার পরিণতির শেষ গন্তব্য হয়তো হত গুয়ান্তানামো… কে জানে!

আমি বাবার দিকে তাকালাম। যদি তিনি এখনও সুস্থ থাকতেন তবে আমার মনটা সহজেই পড়ে ফেলতে পারতেন, আর দুচোখ জলে উপচে না পড়া পর্যন্ত বাবা ভুবনমোহিনী সেই হাসিটা হাসতেন। এমনটা কখনওই ঘটত না!— বাবা একথাই বলতেন। তুমি বুদ্ধিমান, কিন্তু  তোমার সাহস নেই। তুমি একটা ভীতুর ডিম, সে কারণে তুমি আফগানিস্তান যাওনি। সৈন্য বা পুলিশ দেখলে তোমার আত্মা খাঁচাছাড়া হওয়ার জোগাড় হয় অথচ ভাব দেখাও তুমি জাহান্নামকেও তোয়াক্কা করো না।

অবশেষে, আমি বাড়ি আসার দ্বিতীয় রাত গড়িয়ে ফজরের নামাজের ঠিক আগে বাবা মারা গেলেন। তাঁর বয়স হয়েছিল তেষট্টি বছর, প্রায় চৌষট্টিই বলা যায়। এই বয়সে মৃত্যুবরণ করে বাবা নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট, যেহেতু আমাদের নবিজি(সাঃ)ও একই বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। আমার মায়ের মনও সন্তুষ্টিতে ভরে ছিল, কারণ বাবা মারা যাওয়ার আগে তাঁর মুখে শেষ যে কথাটি মা শুনেছিলেন সেটা হল ‘আল্লাহ’।

মা বললেন, মারা যাওয়ার কয়েকদিন আগে থেকেই বাবা কোনও শব্দ করেননি, নড়াচড়াও না। কিন্তু মারা যাওয়ার আধঘন্টা আগে বাবা গোঙানি শুরু করেন। তখন তিনি বহু কষ্টে ছোট ছোট নিশ্বাস ফেলছিলেন। নানা-নানির মৃত্যুশয্যার পাশে থাকার অভিজ্ঞতা থেকে মা বুঝতে পারেন বাবার সময় ফুরিয়েছে। মৃত্যুর নিজস্ব একটা গন্ধ আছে। তুমি সে গন্ধ শুঁকে বুঝতে পারবে— মা আমাদের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো বলেন। তোমার বাবার শেষ সময়ে পাশে বসে সে গন্ধটা আবারও পেয়েছি আমি। নতুন শিশু জন্মের সময় তার শরীরে যেমন গন্ধ থাকে ঠিক তেমন। বাবার পাশে একটা প্লেটে গ্রাউন্ড কফি এনে রাখেন মা। আমি এয়ার ফ্রেশনার ছিটিয়ে দিই।

আমার এক মামার সঙ্গে আমরাও বাবার কানে আল্লাহর নাম ফিসফিস করে বলতে থাকি। অবশেষে বাবাও বলতে সক্ষম হন— আল্লাহ… আল্লাহ… আল্লাহ। এরপর বাবা মারা যান। দীর্ঘদিনের সঙ্গী হারিয়ে শোকাতুরা মা চোখের জলে ভাসলেন। মামাজান বাবার চোখ দুটো আলগোছে বন্ধ করে দেন। আমার ছোট ভাই-বোনেরা সবাই আমাদের সঙ্গেই ছিল। বাবার মৃত্যুর খবরটা আমার স্ত্রীকে দেওয়ার জন্য ফোন করি। ও আসতে পারেনি, জাকার্তাতে রয়ে গেছে।

বিশ্বাস করুন চাই না করুন, আমি সবসময়েই ভেবে এসেছি আমার বাবার ভাগ্য আর ইন্দোনেশিয়ান জাতির ভাগ্যে কোথাও একটা যোগসূত্র রয়েছে। বাবা ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার একমাস পর জন্মগ্রহণ করেছিলেন, এবং চিনা জ্যোতিষশাস্ত্র অনুযায়ী বাবার এবং ইন্দোনেশিয়া প্রজাতন্ত্রের জাতকচিহ্ন ছিল এক, কাঠখোদাই করা এক পক্ষীবিশেষ— তাদের ভাগ্যে খুব একটা হেরফের হয় কী করে।

উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা পরিষ্কার হবে: ২৮ নভেম্বর ১৯৭৫ সালে আমি জন্মগ্রহণ করি। যেদিন ফ্রেটিলিন পূর্ব তিমুরের স্বাধীনতা ঘোষণা করল, তারপরেই ইন্দোনেশিয়া সেটা দখল করে নিল। এতে করে বাবার এবং ইন্দোনেশিয়ার, দুই পরিবারেই নতুন সদস্যের আবির্ভাব হয়েছিল। এরপরে, বাবার ব্যবসার প্রচেষ্টা (নানা ধরনের) সফলতার মুখ দেখেছিল। ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধির চূড়ান্তে থাকার সময় হঠাৎই বাবা সব খুইয়ে বসেন, দেউলিয়া হয়ে যান। ইন্দোনেশিয়ার হালও তখন তাই হয়েছিল— ঠিক না? বাবার একটা স্ট্রোক হয়, পরবর্তীতে বাবা আর কখনও পুরোপুরি সেরে ওঠেননি। ১৯৯৯ সালে, বাবা হাঁটাচলার জন্য ক্রাচ নিয়ে চলাফেরা শুরু করেন। এবং সেই একই বছর ইন্দোনেশিয়ার নেতৃত্বে ছিলেন গাস দ্যুর, যিনি চলাফেরার সুবিধার্থে লাঠি ব্যবহার করতেন।

বাবা মারা গেছেন, ইন্দোনেশিয়া প্রজাতন্ত্রের আয়ুও কি তাহলে ফুরিয়ে যাবে? বিষয়টা নিয়ে আমি যথার্থই চিন্তিত। তবে এসব অদ্ভুতুড়ে ভাবনায় সময় ব্যয় না করে আমার বরং বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া যেন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার। বাবাকে তাঁর শাশুড়ি, মানে আমার নানির পাশে কবরস্থ করা হবে। মাটি থেকে জন্ম নেওয়া মানুষ মাটিতেই মিশে যাবেন। কবর খোঁড়ার জন্য চারজন গোরখোদক ছিলেন তাঁদের টাকাপয়সা দেওয়া, বাবাকে দেখতে আসা লোকদের স্বাগত জানানো, অনেক আত্মীয়স্বজন আছেন, তাঁদের মৃত্যুর খবরটা দেওয়া— এক হাতেই সব সামাল দিতে হচ্ছিল।

চারদিন পর, আমি রাতের বাসে জার্কাতায় ফিরে যাচ্ছিলাম। সাত ঘন্টার ভ্রমণ শেষে আমি কাম্পুং রামবুতানে পৌঁছে যাব। আমি যেখানে বসেছিলাম ঠিক মাথার উপর এসি গুনগুন শব্দ করছিল। এতটা পথ এই শব্দ সহ্য করতে হবে, নিরুপায় আমি অগত্যা নিজের সিটটা ঝেড়েঝুড়ে বসলাম। এরপর প্রায় একঘন্টা কী এক চিন্তায় হারিয়ে গিয়েছিলাম— খেয়াল নেই।

কন্ডাক্টারকে এগিয়ে আসতে দেখে আমি প্যান্টের পকেট হাতড়ে ওয়ালেটটা বের করায় ব্যস্ত হলাম। লোকটা আমার পাশে এসে থামলেন এবং আমার দিকে তাকালেন। আমি মুখ তুলে তার দিকে তাকালাম। কন্ডাক্টারকে কেমন একটু সচকিত দেখাল, মুহূর্তকাল থমকে থেকে আমাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন— কেমন আছেন?

সত্যি বলতে কী, আমি তাকে চিনতে পারিনি।

আমি মুখ খোলার সুযোগ পেলাম না, তার আগেই তিনি বললেন, আপনার বাবার মৃত্যুর খবর শুনেছি, সমবেদনা জানাচ্ছি।

মাথা খানিকটা নুইয়ে বললাম, আপনাকে ধন্যবাদ। আমি মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করার চেষ্টা করতেই তিনি আমার হাত দ্রুত ঠেলে দিয়ে বললেন— দরকার নেই।

তারপর তিনি আমায় বললেন বছর কয়েক আগে একবার তার দাঁতে প্রচণ্ড ব্যথা হয়েছিল। ওষুধে কোনও কাজ হচ্ছিল না। এদিকে দাঁতের ব্যথা না কমলে ডেন্টিস্ট দাঁত তুলতে রাজি ছিলেন না। শেষমেশ কেউ তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি মক্তবের এক ওস্তাদকে (kyai কেয়াই) দেখাতে পারেন। তার পড়া পানি খেলে ব্যথা উপশমে কাজ দেবে। পরামর্শমতো তিনি এক ওস্তাদের শরণাপন্ন হন। ওস্তাদ তাকে রান্নাঘরের ট্যাপ থেকে সাধারণ পানি এনে খেতে দেন। পানি খেয়ে আশ্চর্যজনকভাবে তার দাঁতের ব্যথা উবে যায়। তারপর ডাক্তার তার দাঁত তুলে দেন।

—ওই কেয়াই (ওস্তাদ) ছিলেন আপনার বাবা, কন্ডাক্টার বললেন।

লোকটার কথা শুনে আমার ভীষণ অবাক লাগল। সত্যি বলতে, বাবা সম্পর্কে এমন গল্প আমি আগে কখনও শুনিনি।

কন্ডাক্টার আমার কাঁধে মৃদু একটা চাপড় দিয়ে অন্য যাত্রীদের ভাড়া আদায় করতে এগিয়ে গেলেন।

পকেটে মানিব্যাগটা রেখে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে চলে যেতে দেখা ছাড়া সেই মুহূর্তে আমার আর কিছুই করার ছিল না। বাবার মৃত্যুর পরও আমার মনে হচ্ছিল বাসভাড়াটা বাবাই দিয়ে দিচ্ছেন। আমি নীরবে হাসলাম এবং আবার সিটে হেলান দিয়ে শরীর এলিয়ে বসলাম।

আইপডটা বের করে টেরি জ্যাকের ‘সিজন ইন দ্য সান’ গানটা চালিয়ে কানে ইয়ারফোন গুঁজে চোখ বন্ধ করে গানে ডুবে গেলাম।

গমগম করে গান বেজে চলেছে—

‘গুডবাই পাপা, ইটস হার্ড টু ডাই…

গান শুনতে শুনতে এক সময় আমি ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Comment

আপনার মতামত...