সমরদাও চলে গেলেন: এবার কাকে বলব?

শান্তনু চক্রবর্তী

 


সমরদার কথা মনে হলে, অনেকগুলো কথা একসঙ্গে মনে আসে। অবিশ্বাস্য জীবনীশক্তি, আশ্চর্য জীবনানন্দ, সজাগ বুদ্ধি, সতেজ স্মৃতি, এবং ছোঁয়াচে আবেগ ও উৎসাহ। ঘুরেফিরে মনে পড়ে তাঁর স্নেহপ্রবণ মনের কথা, হৃদয়স্পর্শী উষ্ণতার কথা, নিরলস দায়িত্ববোধের কথা। এছাড়াও, বিশেষ করে চোখে পড়ত, কারও গুণে মুগ্ধ ও অভিভূত হতে পারা, মন খুলে প্রশংসা করতে পারা, এবং সাধারণভাবে পরনিন্দা এড়িয়ে চলা

 

সমর বাগচি চলে গেলেন। ২০২৩ সালের ২০ জুলাই। সময় সকাল ৭টা ৪৫।

তার আগের এক মাস খুব অসুস্থ ছিলেন। পরিস্থিতি ক্রমে কঠিনতর হচ্ছিল। স্বজন-বন্ধু-অনুরাগীদের অবুঝ মনও বুঝতে পারছিল, এবারের কষ্টের পর্বই হয়তো তাঁর শেষ ভোগান্তির পালা।

যেদিন গেলেন, শুনে মনে হল যাক, তাঁর যন্ত্রণার অবসান হল। তার পরেই মনে হল, সবকিছুরই অবসান হল। আর কাউকে তাঁর সুখ-দুঃখ স্বস্তি-অস্বস্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন হবে না। সেবা শুশ্রূষা যত্নের গণ্ডি তিনি অতিক্রম করেছেন।

নয় দশকের বেশি জীবনে অনেক দেখেছেন, অনেক করেছেন। রোগ, সন্তাপ, ব্যক্তিগত অসুবিধা কোনও কিছুকে সেই নিরলস কাজ করে যাওয়ার অন্তরায় হতে দেননি।

মাইনিং ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। কিছুদিন কয়লাখনিতে চাকরির পরে ১৯৬২ সালে বিড়লা ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড টেক্‌নোলজিক্যাল মিউজিয়াম (বিআইটিএম)-এ মাইন্‌স অ্যান্ড মেটালার্জি শাখার কিউরেটর হিসাবে যোগ দেন। ১৯৭৯-তে বিআইটিএম-এর ডাইরেক্টর হন। ১৯৯১-তে অবসর গ্রহণ করেন।

সফল ও জনপ্রিয় মিউজিয়াম ডাইরেক্টর ছিলেন। নানাভাবে মিউজিয়ামকে সকল স্তরের মানুষের কাছে আকর্ষণীয় করবার ও তাদের নাগালের মধ্যে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর আমলে বিআইটিএম-এর জনপ্রিয়তা বাড়ে। ১৯৮০-র দশকে তাঁর পরিকল্পিত ও দূরদর্শনে প্রদর্শিত ‘কোয়েস্ট’ প্রোগ্রাম ইতিহাস হয়ে আছে।

১৯৯১ সালে অবসরপ্রাপ্তির পর বিজ্ঞান-কারিগরি মিউজিয়াম বিশেষজ্ঞ হিসাবে ও নানা কমিটির সদস্য হিসাবে নানা জায়গায় পরামর্শ দিয়ে, বিজ্ঞানের ক্লাস নিয়ে, বিজ্ঞান শিক্ষা এবং বিজ্ঞান-কারিগরির ইতিহাস নিয়ে লেখালেখি করে ও বক্তৃতা দিয়ে জীবন কাটাতে পারতেন। তাতে তাঁর খ্যাতি-পরিচিতির অভাব হত না। কিন্তু সমর বাগচি সেই কিসিমের মানুষ ছিলেন না। অবসর গ্রহণের পর থেকে হাতেকলমে বিজ্ঞান শিক্ষার একজন দারুণ জনপ্রিয় প্রশিক্ষক হওয়ার পাশাপাশি একজন নিষ্ঠাবান সমাজকর্মী ও পরিবেশকর্মী হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠলেন। নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের জবরদস্ত সমর্থক, ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অফ পিপ্‌ল্‌স মুভমেন্ট-এর সংগঠক, অকল্যাণকর ‘উন্নয়ন’-এর কঠোর সমালোচক, পরমাণু শক্তির মতো হানিকর ও বিপজ্জনক প্রযুক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সদা সামিল, ঠুড়গা প্রোজেক্ট বা দেউচা পাচামির মতো প্রকল্পের বিরুদ্ধে সরব, সবরকম অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে এবং প্রচলিত-অপ্রচলিত সবরকম সাধু প্রয়াসের পাশে সর্বদা উপস্থিত। শুধু প্রতিবাদ বা প্রতিরোধ নয়। নির্মাণের কাজেও একইরকম আগ্রহী। দরিদ্র এলাকায় দরিদ্র মানুষের জন্য একাধিক স্কুল গড়ে তোলার পেছনে সমরদার উদ্যোগ অপরিহার্য ছিল। এছাড়াও কত ছোট বড় উদ্যোগে সাহায্য করেছেন, তার হিসাব রাখা মুশকিল।

শুধু গোষ্ঠী বা সমষ্টির ইস্যুতে নয়। ব্যক্তিগত বিপদেও সমরদাকে পাশে পাওয়া যেত। শুধু একটা ফোন করে বলার অপেক্ষা। সকলে জানত তাঁর সাধ্যের মধ্যে তিনি চেষ্টা করবেন। তাঁর অনেক যোগাযোগ ছিল। মানুষের বিপদেআপদে প্রয়োজনে সেই যোগাযোগের সদ্বব্যবহার করতে কোনও দ্বিধা ছিল না। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে কোনও বিরক্তি ছিল না। আর, সর্বোপরি, কিছু করতে পারার আনন্দ ছিল, কিন্তু অহঙ্কার ছিল না। দম্ভের তো প্রশ্নই ওঠে না।

আরও যাঁদের উপর আমরা নির্ভর করতাম, আজ তাঁদের অনেকেই নেই। সুজয় বসু নেই। মেহের ইঞ্জিনিয়ার নেই। এখন সমরদাও চলে গেলেন। কিন্তু, বিপদগুলো রয়ে গেল। বিপদগুলো বোধহয় বাড়ছে।

বড় ভাবনা হয়, এবার কাকে ডাকব, কাকে বলব।

 

সমরদা

বয়সের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়। সমরদারও হয়েছিল। সাম্প্রতিক কথা, যাকে শর্ট টার্ম মেমরি বলে, তার ক্ষেত্রে বেশ ঘাটতি হত বলে মনে হয়। কিন্তু পুরনো স্মৃতিতে মরচে বোধহয় কমই পড়েছিল। কথায় কথায় দেশ-বিদেশের ঘটনা, তথ্য, পরিসংখ্যান নিখুঁতভাবে উল্লেখ করতে পারতেন। বয়সের কান মলে দিয়ে অনায়াসে বহুকাল আগে পড়া কবিতা গড়গড় করে আবৃত্তি করে যেতেন। অরিন্দম রাণাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শুনতে পাই, নব্বই বছরের এক মানুষ কী অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধির চিঠি থেকে প্রায় হুবহু উদ্ধৃত করছেন এবং জীবনানন্দ ও ইয়েট্‌স থেকে গড়গড় করে আবৃত্তি করে চলেছেন। বিশ্বজোড়া ভয়াবহ অসাম্য, দুর্দান্ত পরিবেশ সঙ্কট, তীব্র সামাজিক অস্থিরতা ও অশান্তি এসবের পরিপ্রেক্ষিতে জীবনানন্দর সেই লাইনগুলো গড়গড় করে বলে গেলেন:

অদ্ভুত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,
যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দেখে তারা;
যাদের হৃদয়ে কোনও প্রেম নেই— প্রীতি নেই— করুণার আলোড়ন নেই
পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

প্রায় একই নিশ্বাসে স্মৃতি থেকে আবৃত্তি করলেন উইলিয়াম বাটলার ইয়েট্‌স-এর অবিস্মরণীয় লাইনগুলো:

Things fall apart; the centre cannot hold;
Mere anarchy is loosed upon the world,
The blood-dimmed tide is loosed, and everywhere
The ceremony of innocence is drowned;
The best lack all conviction, while the worst
Are full of passionate intensity.

কত সময়, অরুণ মিত্রের কবিতার পংক্তি মনের আনন্দে বলে যেতেন— এই কবি সম্পর্কে তাঁর মনে একটি বিশেষ জায়গা ছিল। রবীন্দ্রনাথের নানা কবিতা তো ছিলই।

সমরদার সাহিত্যপ্রেমের বিশেষ জায়গা ছিল কাব্যপ্রীতি। বিজ্ঞান ও বিজ্ঞানের ইতিহাস বিষয়ে যতটা আগ্রহ সহকারে কথা বলতেন, কবিতা নিয়ে তার বেশি বই কম নয়। জয়ন্ত স্থানপতি ও অরিন্দম রাণার নেওয়া দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকারেও এর ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জানতে পারি, মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার আগে স্কটিশ চার্চ কলেজে আইএসসি ও বিএসসি পড়েছিলেন (সেটা পঞ্চাশের দশকের গোড়ার দিকের কথা)। এই কলেজের বিজ্ঞানের অধ্যাপকদের সপ্রশংস উল্লেখ করেছেন (নির্দিষ্টভাবে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ডিপি রায়চৌধুরির এবং রসায়নবিদ্যার অধ্যাপক জ্যোতির্ময় চ্যাটার্জির কথা বলেছেন)। কিন্তু একই সঙ্গে, এবং বোধহয় আরও বেশি উৎসাহের সঙ্গে, উল্লেখ করেছেন স্কটিশ চার্চের বাংলার অধ্যাপক বিপিনবাবুর কথা। বলেছেন, কীভাবে পড়ানোর সময় বিপিনবাবু একের পর এক কবিতা আবৃত্তি করে যেতেন; শুধু বাংলা নয়, ইংরেজি কবিতাও অনর্গল আবৃত্তি করতেন আর তা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে হত।

সমরদার কথায় কাব্য প্রসঙ্গ যতটা আসত, সেই তুলনায় গল্প উপন্যাসের উল্লেখ বোধহয় ততটা আসত না। যেমন, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, গান ও প্রবন্ধে উল্লেখ কথায় কথায় করতেন, কিন্তু গল্প উপন্যাস নাটকের উল্লেখ প্রায় শুনিনি। অন্তত আমার তেমন মনে পড়ে না। বড়জোর রক্তকরবী বা মুক্তধারার উল্লেখ হয়তো এক-আধবার করেছেন। সিনেমা নিয়েও কখনও আলোচনা হয়েছে মনে পড়ে না। তবে, উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ভক্ত ছিলেন। নানা প্রোগ্রামের উল্লেখ করতেন। বাড়িতেও আসর বসত বলে শুনেছি।

 

বিজ্ঞান ও কারিগরির ইতিহাস

সমরদার সঙ্গে প্রথম পরিচয় দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ির ছাদে (৩ নং শম্ভুনাথ পণ্ডিত স্ট্রিট)। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে। দেবীপ্রসাদবাবুর মৃত্যুর কয়েক মাস পরে। দেবীপ্রসাদবাবুর বড় মেয়ে অদিতি পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। তখন সমরবাবু বিআইটিএম থেকে অবসরপ্রাপ্ত। কিন্তু শরীর সঞ্চালনে ধরন-ধারণ কথাবার্তায় বার্ধক্য দূরস্থান, যেন প্রৌঢ়ত্বের ছোঁওয়াও নেই। সেদিন বেশি কথা হয়নি।

এর পরে অনেকবার দেখা হয়েছে এশিয়াটিক সোসাইটিতে। ১৯৯৪ সালে সোসাইটিতে বিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে কোর্স চালু হয়। প্রথমে লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন বিষয়ের গবেষকদের জন্য বিজ্ঞানের ইতিহাসের আঙিনাটিকে উন্মোচন করা এবং বিজ্ঞানের ইতিহাসের চর্চাকে উৎসাহিত করা। তখন এক বছরের কোর্স চালু হয়েছিল। সমরদা ক্লাস নিতে আসতেন। ওঁর খুব পছন্দের বিষয় ছিল প্রাক-বিজ্ঞান বিপ্লব ইউরোপে (অর্থাৎ, ১৭ শতকের আগের ইউরোপের) কারিগরির বিকাশ ও পাশাপাশি বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের মানসিকতা ও পদ্ধতির বিকাশের গল্পটি বলা। একটি বছর মনে পড়ে, কী দারুণ উৎসাহের সঙ্গে ইউরোপে মধ্যযুগীয় প্রযুক্তির বিকাশের ক্ষেত্রে সিস্টারশিয়ান সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের অবদানের কথা আলোচনা করছেন, স্লাইড সহকারে। এক্সপেরিমেন্ট-ভিত্তিক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রবক্তা হিসাবে স্বাভাবিকভাবেই তাকিয়েছেন ইউরোপে পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরম্পরার দিকে। উইলিয়াম অফ ওক্যাম, রজার বেকন থেকে শুরু করে ফ্রান্সিস বেকন অবধি পর্যবেক্ষণ ও এক্সপেরিমেন্টের ধারণা ও দর্শনের আলোচনা করবার চেষ্টা করছেন। এই প্রসঙ্গে ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যের কাছে ইউরোপের ঋণের উল্লেখ করতে ভুলতেন না। ভুলতেন না আরব বৈজ্ঞানিক চর্চায় পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার গুরুত্বের কথা উল্লেখ করতে।

মনে আছে, একটা ব্যাপার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। জানতাম ওঁর বুনিয়াদি শিক্ষা কারিগরিবিদ্যায়। কিন্তু দেখেছিলাম মধ্যযুগীয় ইউরোপীয় মানসের আলোচনা প্রসঙ্গে উনি নানান খ্রিস্টীয় ধর্মীয় ধারার আলোচনা করছেন— ম্যানিকিয়ান, নেস্টোরিয়ান প্রভৃতি খ্রিস্টীয় হেরেসি (heresy)-র উল্লেখ করছেন। এগুলি সম্পর্কে বিজ্ঞান-কারিগরি জগতের মানুষদের জানকারি বা আগ্রহ সাধারণত কম হয়। বুঝেছিলাম, সমরদার আগ্রহের ব্যাপ্তি আছে। তবে, ব্যাপ্তির আন্দাজ পাওয়া আরও বাকি ছিল। পরবর্তীকালে দেখেছি বিজ্ঞানের ইতিহাস ও কারিগরির ইতিহাসের পাশাপাশি শিল্পকলার ইতিহাস, দর্শনের ইতিহাস প্রভৃতি সম্পর্কে পড়াশোনা করছেন।

যতদূর মনে পড়ে, ১৯৯৬ সালের পর থেকে এশিয়াটিক সোসাইটিতে বিজ্ঞানের ইতিহাসের এক বছরের পাঠক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ওর একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ চালু হয় এবং সমরদা সেখানে মাঝেমধ্যে পড়াতে আসতেন। কিন্তু তখন আমার নিজের সোসাইটিতে যাওয়া ক্রমশ ক্ষীণ হয়ে এসেছিল। সমরদার সঙ্গে সেই সময় কম দেখা হয়েছে।

 

বিজ্ঞানের ইতিহাস, বিজ্ঞান শিক্ষা, পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র, সভ্যতার সঙ্কট

বিখাত টেক্‌নোলজি অ্যান্ড কালচার পত্রিকার পুরনো সংখ্যা ঘাঁটলে ১৯৭৫ সালের অক্টোবর সংখ্যায় সমরদার একটি লেখা দেখতে পাই। প্রবন্ধটির নাম, সায়েন্স অ্যান্ড টেক্‌নোলজি মিউজিয়াম্‌স ইন ইন্ডিয়া (ভারতের বিজ্ঞান-কারিগরি মিউজিয়াম সমূহ)। পড়লে দেখা যাবে এখানে আধুনিক বিজ্ঞান-কারিগরি ও তার প্রয়োগ এবং বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও কাম্যতা সম্পর্কে লেখকের ধারণা প্রথাগত। কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির কাম্যতা ও দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে আধুনিক বৈজ্ঞানিক কারিগরির ব্যবহার বৃদ্ধির কথাই প্রাধান্য পেয়েছে। পাশাপাশি আছে বিজ্ঞান শিক্ষা ও বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসারে বিজ্ঞান ও কারিগরি মিউজিয়ামের গুরুত্বের কথা এবং আরও নানা প্রাসঙ্গিক কথা।

এর তেইশ-চব্বিশ বছর পরের কথা। যতদূর মনে পড়ে, ১৯৯৮ বা ১৯৯৯ সাল। সায়েন্স কলেজের রাজাবাজার ক্যাম্পাসে অধ্যাপকদের ওরিয়েন্টেশন প্রোগ্রাম। একদিন দেখলাম সমরদা আমদের ক্লাস নিতে হাজির। ক্লাস নিলেন। টেক্‌নোলজি অ্যান্ড কালচারের সেই প্রবন্ধের সাপেক্ষে সেদিনের সেই ক্লাসকে বিচার করলে বোঝা যাবে অনেকের মতো সমরদার ক্ষেত্রেও বিশ শতকের শেষ দুই দশক ভাবনাজগতে প্রকাণ্ড বদল এনেছিল। ওঁর স্বভাবসিদ্ধ আবেগদীপ্ত ঢঙে বললেন, মানবসভ্যতা তার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সঙ্কটের মুখোমুখি। পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র বিপন্ন। জলবায়ু পরিবর্তন ক্রমশ শঙ্কাজনক হয়ে উঠছে। আমাদের উন্নয়নের মডেল দুই দিক থেকে খুঁতে ভরা— প্রথমত, তা পরিবেশনাশী এবং দ্বিতীয়ত, তা অসাম্য বাড়ায়। আমাদের এই মডেল ত্যাগ করতে হবে। গান্ধি ও রবীন্দ্রনাথের প্রদর্শিত পথে চলতে হবে। মনে আছে, ১৯২৮ সালে গান্ধির ইয়ং ইন্ডিয়া থেকে নেওয়া নিম্নোক্ত উদ্ধৃতিটি উনি মুখস্থ পড়ে শুনিয়েছিলেন:

GOD FORBID that India should ever take to industrialism after the manner of the West. The economic imperialism of a single tiny island kingdom (England) is today keeping the world in chains. If an entire nation of 300 millions took to similar economic exploitation, it would strip the world bare like locusts.

রবীন্দ্রনাথের ১৯২৪ সালের সিভিলাইজেশন অ্যান্ড প্রোগ্রেস বক্তৃতা থেকে কয়েকটি পংক্তি উদ্ধৃত করলেন:

We have for over a century been dragged by the prosperous West behind its chariot, choked by the dust, deafened by the noise, humbled by our own helplessness, and overwhelmed by the speed. We agreed to acknowledge that this chariot-drive was progress, and that progress was civilization…Of late, a voice has come to us bidding us to take count not only of the scientific perfection of the chariot but of the depth of the ditches lying across its path.

উদ্ধৃতিগুলি সমরদার বন্ধু ও অনুরাগীরা সহজেই চিনতে পারবেন। সমরদার মতে, পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক মডেলের মূল কথা হল আরও আরও উৎপাদন করে চলা এবং এর ফলে এই অর্থনীতি ধাতুগতভাবে ধরিত্রীনাশী। প্রথাগত সমাজতান্ত্রিক মডেলের মধ্যেও কিন্তু তার প্রতিষেধক নেই কারণ সেই মডেলেও লাগাতার উৎপাদন বৃদ্ধির প্রতি আকর্ষণ লক্ষ করা যায়। দরকার এমন একটি আর্থ-সামাজিক মডেল যা সাম্যমূখী হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ-বাস্তুতন্ত্র-ধরিত্রী সচেতন। এই মডেলের সূত্রগুলি সমরদা খুঁজতে চেয়েছেন মার্ক্‌সের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজির ভাবনায়। সমরদার মতে, রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজির ভাবনায় যে ভোগবাদ-পরিপন্থী গ্রামভিত্তিক সমাজের রূপরেখা পাওয়া যায় সেটি মূলগতভাবে বাস্তুতন্ত্রমুখী। সেদিনের ওরিয়েন্টেশন কোর্সের সেই বক্তৃতার প্রধান কথাগুলি পরবর্তীকালে আরও স্পষ্ট ও আরও তথ্য-পরিসংখ্যানপুষ্ট হয়ে নানা রূপে হাজির হয়েছে সমরদার নানা লেখায় ও বক্তৃতায়। যেমন, তা খুঁজে পেলাম লিট্‌ল ম্যাগাজিন অনোআন-এর ২০০২ সালের জানুয়ারি সংখ্যায় সমরদার একটি প্রবন্ধে[1]। আবার, তার দুই দশক পরে, অনেকটা ভিন্ন সুরে হলেও, একই ঝোঁকের প্রকাশ গত বছরের ২১ সেপ্টেম্বর ও ২৫ সেপ্টেম্বর তারিখে একক মাত্রা অনলাইনপত্রে প্রকাশিত সমরদার প্রবন্ধে। তারই কাছাকাছি সময়ে, দ্য ডি গ্রোথ সংবাদমাধ্যমের তৈরি করা একটি ইউটিউব ভিডিওতে শুনতে পাই নবতিপর সমরদা কী আশ্চর্য স্পষ্টতার সঙ্গে উৎপাদন বৃদ্ধির অর্থনৈতিক স্বপ্নের বিপরীতে কল্যাণের অর্থনীতির পক্ষে সওয়াল করছেন।

 

সমরদা ও বিজ্ঞান শিক্ষা

হাতেকলমে বিজ্ঞান শিক্ষা, বিজ্ঞানের নিয়মগুলির বাস্তব প্রকাশকে প্রত্যক্ষ করবার মাধ্যমে বিজ্ঞান শিক্ষা, আকর্ষণীয়ভাবে ও সহজবোধ্যভাবে বিজ্ঞানের নিয়মগুলোকে উপস্থিত করা এবং বিজ্ঞানের বিষয়গুলিকে যথাসম্ভব যুক্তিপূর্ণভাবে বোঝা— এইসব বললেই সঙ্গে সঙ্গে মুখে এসে যায় সমর বাগচির নাম।

সমরদা হামেশা বলতেন, “I read I forget, I see I remember, I do I understand” (পড়লে ভুলে যাই, দেখলে মনে রাখি, করলে তবে বুঝি)। প্রবচনটির উৎপত্তি সম্ভবত বিশ শতকের ষাটের দশকে, যদিও তা কনফিউশিয়াসের নামে চলে[2]

বিজ্ঞানকে মুখস্থ না করে মনস্থ বা আত্মস্থ করবার ক্ষেত্রে হাতেনাতে করে দেখা যে জরুরি তা আমাদের সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান মনে হলেও, এই শেখানোর পদ্ধতি কম ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। এই “আবৃত্তি: সর্বশাস্ত্রাণাং বোধাদপি গরীয়সী”-র দেশে বিজ্ঞান পড়ে, তার সূত্রগুলি মনে রেখে ভাল নম্বর পাওয়াকেই বিজ্ঞান শিক্ষা বলে চালানো হয়। সমরদা বলতেন,

“নামকরা স্কুলের উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের জিজ্ঞাসা করি, হাত দিয়ে মোটামুটি দেখাও তো এক মিটার কত? জানো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখাতে পারে না। জিজ্ঞাসা করি, একটু নিজে চলে ত্বরণ (অ্যাক্সিলেরেশন)-এর উদাহরণ দেখাও তো? দেখাতে পারে না। অথচ আমাদের ‘খেলাঘর’-এ চলো। সেখানে তো হাতেকলমে বিজ্ঞান শেখানো হয়। দেখবে, গরিব ঘর থেকে আসা ক্লাস টু-থ্রির বাচ্চারা তোমাকে হাত দিয়ে আন্দাজমতো এক মিটার মাপ দেখিয়ে দেবে। উঁচু ক্লাসের বাচ্চারা নিজেদের হাঁটার গতিবেগ বাড়িয়ে ত্বরণের সহজ উদাহরণ দিয়ে দেবে।”

সারা রাজ্য জুড়ে শুধু নয়, সারা দেশ জুড়ে অসংখ্য ওয়ার্কশপে স্কুলের ছাত্র ও শিক্ষকদের হাতেকলমে শিখিয়ে বিজ্ঞানকে জীবন্ত প্রাণবন্ত করে তোলায় এমন খ্যাতি হয়েছিল সমরদার যে দেশের প্রায় যে-কোনও শহরে নানা প্রতিষ্ঠানে মানুষজন তাঁকে চিনত, সম্মান করত। ১৯৮০-র দশকে তাঁর উদ্যমে ও প্রয়াসে এবং কয়েকজন বিজ্ঞানী ও অধ্যাপকের সহায়তায় তৈরি হওয়া দূরদর্শনের ‘কোয়েস্ট’ প্রোগ্রামের দুর্দান্ত সাফল্য ও জনপ্রিয়তা তো সেই সময়ের বিজ্ঞানের ছাত্রদের সুপরিচিত।

একটি এক্সপেরিমেন্ট শুধু বইয়ে পড়া সূত্রকে জীবন্ত করে হাজির করে তাই নয়। হাতেনাতে জিনিসপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করলে, নিজেরা হাতে করে একটা এক্সপেরিমেন্ট সাজানোর চেষ্টা করলে, ছাত্রদের মধ্যে একটা অন্যরকম আগ্রহের উদ্রেক হয়। তাছাড়া, প্রদর্শনকারী যখন এমন একটি কাণ্ড দেখান যেটি সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত এবং যার আপাতভাবে ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না, তখন শিক্ষার্থীর কৌতূহল উদ্রেক হয়। ব্যাপারটা বোঝার আগ্রহ জন্মায়। এবার তাকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় তার কাণ্ডজ্ঞান বা তার বইয়ে পড়া কোন বিজ্ঞানের সূত্র এই ঘটনার ব্যাখ্যা করতে পারে, তখন ছাত্রের সামনে একটা ধাঁধার চ্যালেঞ্জ উপস্থিত হয়। সে যদি ভেবে বার করতে পারে তো কথাই নেই। কিন্তু যদি সে নিজে নাও পারে, তবুও শিক্ষক বা প্রদর্শনকারী যখন ব্যাখ্যা করে দেন, তখন বইয়ের বিষয়টিই শিক্ষার্থী আরও অনেক ভালভাবে বোঝে।

এখানে একটা প্রশ্ন— একদিকে সমরদার বিজ্ঞান ও কারিগরির ইতিহাসে আগ্রহ, তাঁর আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষা ও নির্দিষ্টভাবে এক্সপেরিমেন্টের ব্যবহারভিত্তিক বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারে দুর্দান্ত উৎসাহ ও উদ্দীপনা, আর অন্যদিকে তাঁর প্রকৃতি-পরিবেশ-সাম্যমুখী সমাজভাবনা, এই দুইয়ের মধ্যে কোনও সচেতন যোগাযোগ কি লক্ষ করা যেত? এর উত্তর হল, যেত। সম্প্রতি সমরদা তাঁর আগ্রহের এই দুইটি দিকের মধ্যে সম্পর্ক খানিকটা বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করেছেন একটি জায়গায়— অরিন্দম রাণাকে দেওয়া তাঁর সাক্ষাৎকারে। বিজ্ঞান শিক্ষার প্রয়োজন শুধু মনের ঠুলিগুলো খোলার এবং প্রকৃতিকে সঠিকভাবে বুঝে মানুষের কাজে লাগানোর জন্য নয়, তা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে গভীরভাবে বোঝার জন্য এবং প্রকৃতি-পরিবেশ অনুকূল কারিগরি এবং অর্থনীতি গড়ে তোলার জন্য। তাই বিজ্ঞান শিক্ষার অন্যতম প্রধান লক্ষ হবে আজকের ছাত্রদের, অর্থাৎ ভবিষ্যতের নাগরিক, বিজ্ঞানী ও কারিগরদের সমাজমুখী ও পরিবেশসচেতন করে গড়ে তোলা। সেক্ষেত্রে হয়তো বিজ্ঞানের ইতিহাস ও বিজ্ঞানের দর্শনকে বোঝার ক্ষেত্রেও অনেকটা নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দরকার হবে, কিন্তু সেই বিষয়ে সমরদা কতদূর কী ভেবেছিলেন আমার জেনে ওঠা হয়নি। উনি ‘মেকানিস্টিক’ ও ‘রিডাক্‌শনিস্ট’ বিজ্ঞানের দর্শনকে পরিত্যাগ করবার কথা বলতেন। কিন্তু সেই ‘অ্যান্টি-মেকানিস্টিক’ ও ‘অ্যান্টি-রিডাক্‌শনিস্ট’ বিজ্ঞানের দর্শনের অবয়ব কী বা সেই দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞানের যাত্রাপথের কাহিনিটিকে কীভাবে বর্ণনা করা যায় সেই ব্যাপারে খুব কিছু লেখার বা বলার অবকাশ পেয়েছিলেন বলে মনে হয় না।

সেসব পাননি কারণ অবশ্য তাঁর খুব সময় ছিল না। নিজেকে দেখতেন একজন শিক্ষাকর্মী, সমাজকর্মী ও পরিবেশকর্মী হিসাবে। যারা নিজেদের এই জাতীয় কাজে নিযুক্ত করেছে তাদের প্রতি ছিল তাঁর দারুণ শ্রদ্ধা ও ভালবাসা। অ্যাক্টিভিস্ট তরুণদের ডাকে সব কিছু ফেলে ছুটে গিয়েছেন, তা সে পুলিশি অত্যাচার, সরকারি অবিচার, কিংবা জলবায়ু বদলের ইশ্যুতে পরিবর্তনকামী ছাত্রদের মিটিং-মিছিল, যাই হোক না কেন। অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে অন্য বিখ্যাত মানুষরা বড়জোর স্বাক্ষর দিতেন, আর সমরদা স্বাক্ষর জোগাড় করতে নেমে পড়তেন।

 

মার্ক্‌স, গান্ধি, গ্রামীণ সমাজ, নর্মদা বাঁচাও, এনএপিএম

১৯৯৪ সাল। বোধহয় নভেম্বর মাস। সন্ধ্যা ছটা নাগাদ। সমরদার ডাকে তাঁর সঙ্গে এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে বেরিয়ে ধর্মতলা যাচ্ছি। সোসাইটির গেট থেকে বেরিয়ে ডানদিকে ঘুরে ফুটপাথ দিয়ে এগিয়ে, রাস্তা পেরিয়ে মাঠের দিকে এলাম। মনে পড়ছে, সন্ধ্যায় ছটাতেই অন্ধকার হয়ে আসছে। শীতের দোরগোড়ায়। তখনও জলবায়ু বদলের গুঁতো সাধারণের জীবনে টের পাওয়া যায়নি। ঋতুর ছিরিছাঁদ তখনও আছে। কলকাতায় শীতের কাছাকাছি সন্ধ্যাবেলায় ঠান্ডার আমেজ পুরোদস্তুর। সমরদার গায়ে একটা কালো কোট। যতদূর মনে পরে, হাতে একটা কালো রঙের চামড়ার ব্যাগ। ধর্মতলার দিকের একটা বাস এগোচ্ছে। তখনও স্পিড তোলেনি। সমরদা বাঁ হাতে ব্যাগ নিয়ে দৌড়ে গিয়ে ডান হাতে বাসের হাতল ধরে তড়াক করে পাদানিতে উঠলেন। ষাটোর্ধ্ব সমরদার ক্ষিপ্র স্বচ্ছন্দ সচলতা অবাক করেছিল।

এসপ্ল্যানেড ইস্টে গেলাম। অবস্থান চলছিল ঠিকই, কিন্তু টিমটিম করে। বক্তৃতাও কেউ দিচ্ছিলেন না। খানিকক্ষণ থেকে চলে এলাম।

আজ লিখতে বসে পুরনো একটি বই খুলে দেখতে পাচ্ছি, ১৯৯৪ সাল ছিল নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের উপর সরকারি নিপীড়নের দিক থেকে একটি মার্কামারা বছর। লাগাতার ধরপাকড় ও যাচ্ছেতাই জুলুম চলছিল। নভেম্বর মাসে মেধা পাটকর সহ নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের চার কর্মী অনশন ধর্মঘট শুরু করেন। অনশনের বিংশতিতম দিনে তাঁরা গ্রেফতার হন এবং তাঁদের ‘ইন্ট্রাভেনাস ফিডিং’ চালু হয়। বোধহয় সেই সময়ই কলকাতায় তাঁদের আন্দোলনের সপক্ষেই এসপ্ল্যানেড ইস্টে অবস্থান চলছিল। পুরনো অ্যাক্টিভিস্টদের এই বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেছি। তাঁরা এতদিন পরে নিশ্চিত হয়ে বলতে পারেননি। সেই সময়ের কাগজপত্রও হয়তো এখন আর নেই।

সমরদা নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের সঙ্গে ঠিক কবে এবং কীভাবে যুক্ত হলেন? গান্ধি ও রবীন্দ্রনাথের সমাজভাবনার প্রতিই বা আকৃষ্ট হলেন কবে? সেই সময়ে যাঁরা সমরদার কাছাকাছি ছিলেন এবং পশ্চিমবঙ্গে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের সপক্ষে সমর্থন জোগাড়ে সক্রিয় ছিলেন তাঁরা খুব নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি। তবে, তাঁদের কথা থেকে যা জানতে পেরেছি এবং সমরদার দুটি সাক্ষাৎকার থেকে যতটুকু ইঙ্গিত পেয়েছি তাতে আমার মনে একটা গল্প তৈরি হয়েছে। সেটি এইরকম:

স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াকালীন সমরদা মার্ক্‌সীয় দর্শন ও সমাজভাবনার দ্বারা প্রভাবিত হন। তবে, সম্ভবত কখনও সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক কাজকর্মে যুক্ত হননি। বিআইটিএম-এ চাকরি করার সময় গ্রামের জীবনকে কাছ থেকে দেখার খানিকটা সুযোগ বোধহয় এসেছিল ১৯৬৫ সালে, যখন তদানীন্তন ডিরেক্টর সরোজ ঘোষের উদ্যোগে শুরু হল মোবাইল বিজ্ঞান একজিবিশন। একটি ছোট্ট ভ্যান নিয়ে গ্রামে ও ছোট-বড় শহরের স্কুলগুলিতে বিজ্ঞানের বিভিন্ন প্রদর্শনী ও এক্সপেরিমেন্টের সরঞ্জাম নিয়ে যাওয়া শুরু হল। তবে, আরও ভালভাবে দেখার সুযোগ বোধহয় হল ১৯৭৯ সালে বিআইটিএম-এর ডাইরেক্টর হওয়ার পরে। জয়ন্ত স্থানপতিকে দেওয়া সমরদার সাক্ষাৎকার থেকে জানতে পারি ১৯৮০-র দশকের গোড়ায় জেলা বিজ্ঞান মিউজিয়ামগুলির সূত্রপাত হয়। সেই সময় জাতীয় স্তরে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল যে জেলা মিউজিয়ামগুলি শুধু বিজ্ঞান প্রদর্শনীর জায়গা হবে না, সেগুলি জেলার আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশেষভাবে সহায়তা করবে। এক্ষেত্রে, অমলেন্দু রায়ের নেতৃত্বে পুরুলিয়া জেলা বিজ্ঞান কেন্দ্র একটা দারুণ কাণ্ড ঘটায়। অমলেন্দুবাবু নিজে গ্রামের ছেলে। ছোটবেলা থেকেই সম্ভবত খানিকটা চাষবাসের অভিজ্ঞতা ছিল। তিনি নানারকম কৃষির উপকরণ রাখা শুরু করেন এবং আঞ্চলিক সাঁওতালরা যখন বিজ্ঞান কেন্দ্র দেখতে আসতেন তখন তাঁরা আগ্রহী হলে সেই উপকরণ তাঁদের দিয়ে দেওয়া হত। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর জেলার সবচেয়ে গরিব জনগোষ্ঠী খেড়িয়া শবররা আসতে শুরু করেন। মিউজিয়ামের টাকায় কেনা বা তৈরি করা কৃষি উপকরণ তাঁদের ব্যবহার করা শেখানো হয় এবং নিখরচায় দিয়ে দেওয়া হয়। এর সুফল হাতেনাতে দেখা যায়। সংবাদমাধ্যমের নজরে আসে। মহাশ্বেতা দেবী এই বিষয়টি নিয়ে লেখেন ইকনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলি-তে (১৯৮৩ সালে)। এর পরে, বিআইটিএম রাঁচিতে জেভিয়ার ইন্সটিটিউট অফ সোশ্যাল সার্ভিসের সঙ্গে কাজ করে ওই অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে চাষবাসের নানারকম পদ্ধতির প্রসার ঘটায়।

যতদূর মনে হয় ১৯৮০-র দশকেই গ্রামের মানুষের মধ্যে যথার্থ উন্নয়নধর্মী কাজের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ হয়েছিল সমর বাগচির। আর, এই ১৯৮০-র দশকেই সম্ভবত তিনি ও অজিত নারায়ণ বসু গান্ধির ভাবনার সংস্পর্শে আসেন এবং হয়তো ৮০-র দশকের শেষের দিকেই নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন সম্পর্কে ভালভাবে জানার সুযোগ হয়। ১৯৯১ সালে সমরদা অবসর নেওয়ার পর এই সুযোগ আরও বাড়ে। ওই সময় পশ্চিমবঙ্গে ফ্রেন্ড্‌স অফ নর্মদা বাঁচাও আন্দোলন নামে একটি মঞ্চ তৈরি হয়। তাতে সমরদা ও অজিত নারায়ণ বসু ছাড়াও ছিলেন মণীন্দ্রনারায়ণ বসু, সন্মথ ঘোষ, সুখেন্দু ভট্টাচার্য, অজিত নারায়ণ বসু, নিরঞ্জন হালদার, অভিজিৎ বর্ধন, তপন চট্টোপাধ্যায় এবং আরও কয়েকজন। ইতিমধ্যে, নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনকে ভিত্তি করে ন্যাশনাল অ্যালায়েন্স অফ পিপ্‌ল্‌স মুভমেন্ট (এনএপিএম)-এর সূত্রপাত হয় ১৯৯২ সালে এবং তা একটি সর্বভারতীয় মঞ্চ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৬ সালে। এর পরে তৈরি হয় এনএপিএম পশ্চিমবঙ্গ। যতদূর মনে পড়ে মহারাষ্ট্র নিবাসে দুই দিন ব্যাপী একটা মিটিং-এর মধ্যে ওর জন্ম হয়। এই মিটিং সংগঠন ও তাকে সফল করবার ক্ষেত্রে সমরদার একটি বিশেষ ভূমিকা ছিল।

 

শেষ দুই দশক

একুশ শতকে এসে বিশ্বজোড়া পরিবেশ সঙ্কট আরও বেশি করে ঘনীভূত হতে থাকল। পাশাপাশি বাড়তে থাকল জমি জল জঙ্গলের উপর আক্রমণ। পশ্চিমবঙ্গে ২০০৬ সাল থেকে সিঙ্গুর নন্দীগ্রাম হরিপুরের আন্দোলন নাগরিক সমাজে আলোড়ন তুলল। সমরদার কাজ বাড়ল। হরেক রকমের নাগরিক উদ্যোগে তিনি উপস্থিত থেকেছেন, সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন, বিভিন্ন ধরনের সম্পর্ক ও যোগাযোগের সংঘটক কিংবা অনুঘটক হয়েছেন। এইসময়ই পশ্চিমবঙ্গে এনএপিএমের কাজের পরিধি বেড়েছে। যেমন অমিতাভ মিত্রর কাছে জানতে পারি, ২০১৬ সালে উত্তরবঙ্গে বন্ধ হয়ে থাকা চা বাগানে শ্রমিকদের মধ্যে তারা কাজ শুরু করে।

পাশাপাশি অব্যাহত থেকেছে সমরদার শিক্ষাসংক্রান্ত কাজগুলি। তাঁর জীবনের শেষ বছরেও তিনি নতুন উদ্যোগে অংশগ্রহণ করেছেন। যেমন, শিবতোষ মুখার্জি সায়েন্স সেন্টার যখন স্কুলের বিজ্ঞানশিক্ষকদের মধ্যে হাতেকলমে বিজ্ঞান শিক্ষাকে উৎসাহিত করবার প্রয়াসে হাত দিল, সমরদা হলেন সেই প্রয়াসের বর্শামুখ।

 

প্রতীক্ষায়

সমরদার কথা মনে হলে, অনেকগুলো কথা একসঙ্গে মনে আসে। অবিশ্বাস্য জীবনীশক্তি, আশ্চর্য জীবনানন্দ, সজাগ বুদ্ধি, সতেজ স্মৃতি, এবং ছোঁয়াচে আবেগ ও উৎসাহ। ঘুরেফিরে মনে পড়ে তাঁর স্নেহপ্রবণ মনের কথা, হৃদয়স্পর্শী উষ্ণতার কথা, নিরলস দায়িত্ববোধের কথা। এছাড়াও, বিশেষ করে চোখে পড়ত, কারও গুণে মুগ্ধ ও অভিভূত হতে পারা, মন খুলে প্রশংসা করতে পারা, এবং সাধারণভাবে পরনিন্দা এড়িয়ে চলা। কত সময় কত কথা হয়েছে, হয়েছে ব্যক্তিগত কথাও। কিন্তু, সাধারণভাবে, ব্যক্তিনিন্দা করতে শুনিনি। আচরণে দুঃখ পেলে তা উল্লেখ করেছেন, কিন্তু সে-প্রসঙ্গ থেকে দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হয়েছেন। অভব্য আচরণ মনে না রাখার চেষ্টা করেছেন। ক্ষমার অভ্যাস তাঁকে চর্চা করে আয়ত্ত করতে হয়নি, হৃদয়ের স্বাভাবিক প্রসার তাঁকে সহজে ক্ষমাশীল করেছে। অনেকসময়ই কারও মতামত সম্পর্কে জোরালো আপত্তি থাকত, কিন্তু মতের অমিলকে মনের অমিলের কারণ হতে দেননি। তাই, এই মানুষটিকে শেষ পর্যন্ত সবাই ভালবাসতে, কদর করতে শিখেছে।

এই অভাব বোধহয় যাবে না। হাতেকলমে বিজ্ঞান শিক্ষার শিক্ষক হয়তো পাওয়া যাবে, হয়তো ভবিষ্যতে আরও অনেক ভাল শিক্ষক তৈরি হবে। কিন্তু মনুষ্যত্বের ও হৃদয়বৃত্তির শিক্ষা কার কাছ থেকে পাব? সকালবেলায় ঘুম চোখে ফোন ধরে কার স্নেহমাখা স্বর শুনে মন ভাল হয়ে যাবে? কার উপর যে-কোনও সময়, যে-কোনও প্রয়োজনে, অসঙ্কোচে দাবি করব?

জীবন থেমে থাকবে না। আমাদের বড় দেশ। অনেক মানুষ। অনেক শিশু এখনও বেড়ে ওঠার অপেক্ষায়, অনেক কিশোর যৌবনের প্রান্তে। তাদের মধ্যে কি উচ্চ মানবিক হৃদয়বৃত্তিসম্পন্ন আরও কয়েকজনকে পাওয়া যাবে না!

প্রতীক্ষায় থাকতে দোষ কী?

 

তথ্যসূত্র:

  • Sthanapati, Jayanta. Retrospection of Shri Samar Bagchi — Excerpt of an interview with the pioneer science museum professional. Researchgate. Dec, 2020.
  • Bagchi, Samar K. Science and Technology Museums in India. Technology and Culture. Vol.16, No.4. pp.607-614. Oct, 1975.
  • বাগচি, সমর। ভারতের উন্নয়ন: এক বিকল্প পরিকল্পনা। অনোআন— মানুষ, প্রকৃতি পরিবেশ সংখ্যা। পৃঃ ৭-১১। জানুয়ারি, ২০০২।
  • বাগচি, সমর। ভারতবর্ষ কোন পথে, প্রথমদ্বিতীয় পর্ব। একক মাত্রা। স্বাধীনতার ৭৫ বছর বিশেষ ব্লগ।
  • Rowell, Andrew. Green Backlash, Global Subversion of the Environmental Movement. London and New York: Routledge. 1996. p.285.
  • National Alliance of People’s Movements.
  • লেখকের ব্যক্তিগত স্মৃতি
  • সুখেন্দু ভট্টাচার্য, মাধব ব্যানার্জি, অভিষেক রায়, অমিতাভ মিত্র, এবং বীরেন্দ্রনাথ দাসের সঙ্গে কথোপকথন এবং শিঞ্জিনী সান্যালের পাঠানো কয়েকটি সাল তারিখ।

[1] ভারতের উন্নয়ন— একটি বিকল্প পরিকল্পনা
[2] শুধু ‘আই রিড আই ফরগেট’-এর বদলে লেখা হয় ‘আই হিয়ার আই ফরগেট’।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...