প্রসঙ্গ ভারতের সভাপতিত্ব এবং জি-২০

প্রসঙ্গ ভারতের সভাপতিত্ব এবং জি-২০ | সৌরীশ ঘোষ

সৌরীশ ঘোষ

 


একটি ফোরাম হিসেবে জি-২০র বেশ কিছু ত্রুটি রয়েছে। এর ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলা কঠিন। ফোরামটির সবচেয়ে বড় ত্রুটি হল যে এটি সম্পূর্ণভাবে উন্নত দেশগুলির দিকে ঝুঁকে আছে এবং এদের স্বার্থ আর উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবার জন্যে সভাপতির দায়িত্বটিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রায়শই সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত উন্নতিশীল দেশগুলিতে বর্তে দেওয়া হয়

 

এই লেখাটি সেপ্টেম্বরে দিল্লিতে ঘটে যাওয়া জি-২০ অধিবেশনের আগে লেখা হয়েছিল, তাই অধিবেশনের পরের কিছু ঘটনা উল্লেখ করার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমেই এটা বলে রাখা ভাল যে চিন এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রপতি শি জিংপিং এবং পুতিনের অনুপস্থিতি এই অধিবেশনের গরিমা খানিক ম্লান করে দিয়েছে, তবে শেষ হাসি পুতিনই হেসেছেন কারণ ইউক্রেন যুদ্ধের বিষয়ে জি-২০ দেশগুলি রাশিয়াকে সরাসরি আক্রমণ করা থেকে বিরত থেকেছে যা তারা এতকাল যাবত করে চলেছিল। বলাবাহুল্য, ইউক্রেন এই মনোভাবের ঘোরতর নিন্দা করেছে, তবে এই যুদ্ধ যে ধীরে ধীরে একাধিক দেশের কাছে গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে, তা সহজেই বোঝা যাচ্ছে। চিন বরাবর জি-২০ নিয়ে বিরূপ মনোভাব পোষণ করে, তার মতে এই সংগঠন মার্কিনপন্থী এবং বেশিরভাগ দেশ মার্কিনি বক্তব্যকেই তুলে ধরে। তবে এই অধিবেশনের সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হল, মার্কিন রাষ্ট্রপতি জো বিডেনকে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হতে না দেওয়া। একাধিক সূত্রের খবর অনুযায়ী, মার্কিন প্রশাসন বারবার আর্জি জানানোর পরেও সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়ার অনুমতি দেয়নি ভারত, এর ফলে ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি যে ক্ষুণ্ণ হয়েছে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যদিকে অধিবেশনের পরেই কানাডার রাষ্ট্রপতি অভিযোগ করেন যে ভারতের গুপ্তচর সংগঠন তাদের মাটিতে তাদেরই এক নাগরিককে হত্যা করেছে এবং কানাডার সার্বভৌমত্বের উপর আক্রমণ হেনেছে। কানাডা জি-২০-র এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং মার্কিন-বন্ধুও বটে, এই টানাপোড়েন অবশ্যই ভারতের জন্যে চিন্তার বিষয় হতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তবে এত নেতিবাচক দিকের মধ্যে একটি বিষয়ে ভারতের লাভ হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। ভারত, সৌদি আরব, আরব আমিরশাহী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি মৌ-চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে যে চুক্তিতে বলা হচ্ছে চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের বিপক্ষে তারা ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ মিলিয়ে একটি অর্থনৈতিক করিডোর তৈরি করবে। এই করিডোর যদি তৈরি হয় তাহলে তা ভারতের জন্যে অর্থনৈতিক বিকাশের পথ খুলে দেবে। তবে এখানে একটি ‘যদি’ রয়েছে, এতগুলি দেশ মিলে এই ভাবনাটিকে বাস্তবায়িত করতে পারে কি না তা এখন দেখার বিষয়। মোদি অবশ্য অন্য একটি বিষয়ে নিজেকে বিশ্বগুরু ভাবতেই পারেন, কারণ ভারত তার সভাপতিত্বকে হাতিয়ার করে আফ্রিকান ইউনিয়নকে জি-২০ সদস্য করার প্রস্তাব দিয়েছ যা হয়তো অন্য দেশদের আগেই করা উচিত ছিল। এর ফলে অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করেছে যে ভারতের এই ভূমিকা তাকে দক্ষিণ গোলার্ধের নেতা হিসেবে নিজেকে প্রচার করতে সাহায্য করবে।

এই বিষয়গুলি নিয়ে আমরা পরে হয়তো কখনও বিস্তারিত আলোচনা করব। আপাতত জি-২০ বস্তুটিকে একটু খতিয়ে দেখা যাক।

জি-২০ কুড়িটি দেশের গ্রুপ (জনপ্রিয় অভিধায় যা জি-২০ নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯৯ সালে। পৃথিবীর কুড়িটি সর্ববৃহৎ অর্থনীতির এক সমাবেশ একত্রে বসে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি এবং অর্থকরী বিষয়াবলি নিয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখবার লক্ষ্যে আলোচনা করে।

এই জি-২০ দেশগুলির মধ্যে রয়েছে আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, রাশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ কোরিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চিন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ), জার্মানি, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, জাপান, টার্কি, ইউনাইটেড কিংডম এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। কৌশলগত দিক থেকে স্পেন এই গ্রুপের অংশ নয়, তবে চিরকালীন অতিথির ক্ষমতাবলে অংশগ্রহণ করতে পারে।

দুনিয়ার সর্ববৃহৎ এই ফোরাম একত্রে পৃথিবীর মোট দেশীয় পণ্যের (জিডিপি) ৮০ শতাংশ, পৃথিবীব্যাপী বাণিজ্যের ৭৫ শতাংশ এবং মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের হিসাব বহন করছে। জি-২০ যে এত খ্যাতি পেয়েছে, তার কারণ এটি সারা পৃথিবী জুড়ে গঠিত বহুপাক্ষিক ফোরামগুলির মধ্যে অন্যতম প্রথম ফোরাম যা উন্নত এবং উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলিকে একই মঞ্চে সমান জায়গা দিয়েছে।

কিন্তু বাস্তবে কি তাই ঘটেছে? সত্যিই কি জি-২০ উন্নতিশীল দেশগুলির চিন্তা ব্যক্ত করবার জন্যে একটি মুক্তাঙ্গন হয়ে উঠতে পেরেছে? এর উত্তর পেতে হলে অন্বেষণ প্রয়োজন।

 

জি-২০র সভাপতিত্বে ভারত এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের লক্ষ্য

জি-২০তে ভারতের সভাপতিত্বের পর্ব শুরু হয় ২০২২-এর ডিসেম্বরে এবং আগামী নভেম্বর ২০২৩ অবধি তা চলবে। ক্ষমতাসীন বিজেপি মরিয়া হয়ে এই সভাপতিত্বকে তার ব্যক্তিগত অর্জন হিসেবে জাহির করতে চাইছে। চিত্তাকর্ষক ব্যাপারটি হল এরা নিজেদের দলের চিহ্ন (একই সঙ্গে জাতীয় ফুল) পদ্মফুলকে জি-২০র প্রতীক চিহ্নে বিন্যস্ত করতে উন্মুখ। এর থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে জি-২০কে বিজেপি গ্রাস করে নিতে চাইছে।

তবে এই আগ্রাসী মনোভাবের প্রসঙ্গটিকে সরিয়ে রাখলেও দিল্লিতে জি-২০ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার আগে যে প্রশ্নটি সামনে চলে আসছে তা হল, ভারত এখানে কী নিয়ে আলোচনা করতে চাইছে? ভারত কি ‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ (এক পৃথিবী, এক পরিবার এবং এক ভবিষ্যৎ)-সহ LIFE (Lifestyle for Environment বা পরিবেশ রক্ষার্থে জীবনশৈলী)-এর ঘোষিত লক্ষ্যপূরণে আংশিকভাবেও সফল হতে পেরেছে?

ইন্দোনেশিয়ার থেকে ভারতের হাতে সভাপতিত্বের ভার নেওয়ার সময়ে নরেন্দ্র মোদি বলেছিলেন, ‘আবহাওয়া পরিবর্তন, আতঙ্কবাদ এবং অতিমারির যে চ্যালেঞ্জগুলি আমাদের সামনে রয়েছে, তা একে অপরের সঙ্গে লড়াই করে নয়, এক অপরের সহযোগে যুঝতে হবে।’ উষ্ণায়নকে কমানোর ক্ষেত্রে নেট জিরো বা শূন্যবৃদ্ধির লক্ষ্যকে ২০৫০ সাল অবধি পুনর্জীবিত করবার জন্যে অন্য উন্নতিশীল দেশগুলি থেকে ভারতের উপর যথেষ্ট কূটনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও ভারত কিন্তু এখনও ২০৭০ সালটাকেই ধরে বসে আছে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর প্রয়োজনীয়তাকে এভাবে অস্বীকার করবার ভারতের এই অবস্থানটাই জি-২০র মূল লক্ষ্যের পরিপন্থী। ব্যাপারটি ভাল করে বুঝতে হলে এই নেট জিরো লক্ষ্য বলতে কী বোঝায় তার আলোচনাটা প্রয়োজনীয়। ‘নেট জিরো’ বলতে উষ্ণায়নের জন্যে দায়ী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যকে বোঝায় যাতে সেগুলি বাতাবরণে মিশে কার্বন সিঙ্ক হিসেবে জমা হওয়ার মধ্যে একটা ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। একে ‘কার্বন নিউট্রালিটি’ বা ‘ক্লাইমেট নিউট্রালিটি’-ও বলা হয়ে থাকে।

২০১৮ সালে ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) ঘোষণা করেছিল যে ২০৫০ সাল নাগাদ পৃথিবী নেট জিরো পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যদি তা প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী উষ্ণায়নের মাত্রাটিকে ১.৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের লক্ষ্যে বেঁধে রাখতে পারে। ২০৫০ সালের ডেডলাইনটি ২০২১ সালে অনুষ্ঠিত সিওপি২৬-এর চুক্তির অংশ হিসেবে গ্লাসগো ক্লাইমেট প্যাক্ট-এও অন্তর্ভুক্ত হয়।

অথচ ভারত এবং চিন এই প্যাক্টে স্বাক্ষর করেনি, তার বদলে দিল্লি দাবি করে ডেডলাইনটিকে ২০৫০ সাল থেকে পিছিয়ে ২০৭০ সাল করা হোক, কারণ ততদিন অবধি পর্যায়ক্রমে কয়লা ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব হবে না। তাছাড়াও, ভারত তাৎক্ষণিক বনসৃজনের নীতিটি সমর্থন করেনি, উন্নত দেশগুলি যা গ্রহণ করেছে। ভারত উল্টে উন্নত দেশগুলির ক্লাইমেট ফান্ড থেকে এক ট্রিলিয়ন ডলার দেওয়ার জন্যে দাবি জানিয়েছে।

অনেক পরিবেশবিদ বিশ্বাস করেন ভারত সহজে ফসিল ফুয়েল (দূষণের প্রধান উৎস) থেকে কিছুতেই নড়বে না কারণ বৈদ্যুতিক শক্তি উৎপাদনের অত্যন্ত বেশি চাহিদা ভারতকে মেটাতে হয় এবং ভারতের অর্থনীতি এত বড় পরিবর্তনের ধাক্কা সামলাতে পারবে না। এই কথাও সত্যি যে ভারতের পুঁজিপতিশ্রেণির পক্ষ থেকেও খনি পদ্ধতি চালিয়ে যাওয়া নিয়ে সরকারের উপর প্রচণ্ড চাপ দেওয়া হচ্ছে।

এই সেপ্টেম্বর মাসে ভারত জি-২০ সম্মেলনের আয়োজন করায় আশা করা হচ্ছিল মোদি ২০৫০ সালের ডেডলাইন প্রসঙ্গে কিছু বলতে পারেন, তবে ২০৭০ সাল থেকে ডেডলাইনকে এগিয়ে নিয়ে আসবার ব্যাপারে ভারত যে আগ্রহী হবে এমন আশা কম ছিল। ভারতের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনেকেই মনে করেন ভারত এমন একটা অবস্থায় আছে যে ২০৫০ সালের ডেডলাইনটি স্বীকার করে নিতে পারে, তবে পুঁজিপতিশ্রেণির বিশাল চাপের কারণেই মোদি সরকার এই ডেডলাইন স্বীকার করবে না।

তদুপরি, ভারতের দাবি অনুযায়ী ২০৫০-এর ডেডলাইনটি পশ্চিমি-ঘেঁষা এবং উন্নতিশীল দেশগুলি, যারা ফসিল ফুয়েলের উপর নির্ভরশীল, তারা এর ব্যবহার কমাতে পারবে না। এমন যুক্তিগুলি পেশ হচ্ছে বলেই জি-২০ বিষয়ে সারা বিশ্বে সমালোচনা চলছে যে দক্ষিণ গোলার্ধ থেকে যে নতুন সদস্যরা এতে যোগ দিয়েছে তারা এই উপর থেকে চাপানো পশ্চিমি-ঘেঁষা পদ্ধতি এবং সমাধানসূত্রগুলিকে আড়াল করতে পারছে না। তবে ভারতের অবস্থান এই লক্ষ্যের পরিপন্থীই শুধু নয়, জি-২০ সম্বন্ধে যে প্রাথমিক ধারণা বিশ্ববাসীর আছে, সেই ধারণাটাকেও চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে ভারত।

 

অন্যান্য লক্ষ্য

এই লক্ষ্যগুলির মধ্যে রয়েছে ‘ত্বরান্বিত, অন্তর্ভুক্তিকর এবং স্থিতিস্থাপক বৃদ্ধি’ যেখানে বিশ্ববাণিজ্যে ক্ষুদ্র এবং মধ্য-মাপের উদ্যোগগুলির প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হবে, যাতে শ্রম-অধিকার এবং শ্রম-কল্যাণ সহ অন্তর্ভুক্তিকর কৃষিজ মূল্যশৃঙ্খল এবং খাদ্যব্যবস্থা তৈরি করা যায়। এই লক্ষ্যের বাস্তবোপযোগিতা দুর্ভাগ্যবশত, ভারতের অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ভারতের বৃদ্ধিমাত্রা হ্রাস পাওয়ার কারণে এমনকি মোদিশিবিরের অর্থনীতিবিদেরাও যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী হয়ে সবাই মিলে একটিমাত্র নির্দিষ্ট বৃদ্ধিমাত্রা ঘোষণা করবার অবস্থায় নেই। আমাদের অর্থমন্ত্রী মাঝেমধ্যে শুধু এখানে-ওখানে উল্লেখ করেন ভারতে বৃদ্ধির মাত্রা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে বেড়েই চলেছে বিশ্বব্যাপী আর্থিক মন্দা সত্ত্বেও।

জি-২০র একটি লক্ষ্য ছিল শ্রম-অধিকার এবং কৃষি— সত্যি ছিল বুঝি? যখন দেশের এক সরকারই পুঁজিপতিশ্রেণির সুবিধার্থে শ্রমিক আইন বদলে দেয় এই অজুহাতে যে অতিমারির মধ্যেও বিনিয়োগকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে এবং যখন কৃষকেরা এক বছর ধরে প্রতিবাদ এবং বিক্ষোভ জানাতে জানাতে মৃত্যুর সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও ‘গোদি’ মিডিয়া, বিজেপির মন্ত্রীসমূহ ও বিজেপির আইটি সেল দ্বারা পদে পদে লাঞ্ছিত হন, তখন কৃষিক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তিকর বৃদ্ধির দাবি শূন্যগর্ভ শোনায়।

অন্য লক্ষ্যমাত্রাগুলির মধ্যে রয়েছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) এবং ‘প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং ডিজিটাল পাবলিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ নির্মাণ। এগুলি বাস্তবায়ন করাই যায়, তবে এইসব হতে প্রচুর পরিমাণ অর্থ ধার্য করা প্রয়োজন। এখন ‘টাকা নেই’-এর নাকিকান্না শুনে যদি পশ্চিমি কোনও জি-২০ সদস্য অনুদান তহবিল ভরে তবে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা যেতে পারে।

ভারতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে কোভিড-এর অভিঘাত নিরীক্ষণের প্রতি বিশেষ নজর দেবে। নজর দেওয়াটা অপরিহার্য, কারণ কোভিড দিয়েই যে অতিমারি-অভিজ্ঞতা শেষ হয়ে গেল, এমন কথা কেউ বলছেন না। বরং ভাইরাসবিদ এবং পরিবেশবিদরা বারবার বলছেন, আরও অতিমারি জর্জরিত করবে এই পৃথিবীকে। তার প্রধান কারণ হবে পরিবেশের চূড়ান্ত অবনতি। অতিমারির বিরুদ্ধে ভারত সরকারের যে সক্রিয়তা ছিল, তা গড় মাত্রার বেশ নিচে।

‘একবিংশ শতাব্দীর জন্যে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান’ ধরনের অন্য লক্ষ্যগুলির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে ভারত বহুপাক্ষিকতা সংস্কারের প্রচেষ্টার পরিকল্পনায় যত্নশীল হয়ে ব্যাখাসাধ্য, অন্তর্ভুক্তিকর এবং প্রতিনিধিত্বমূলক একটি ব্যবস্থা বানিয়ে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করতে চাইছে। এবং এই সবকিছু ঘটছে রাশিয়া-ইউক্রেনের লড়াইয়ের প্রেক্ষাপটে, যা লাগাতার চলছে তো চলছেই। এর পরিণামে বিশ্ব-অর্থনীতির উপর চরম অভিঘাত তো ঘটছেই, তার সঙ্গে প্রচুর মানুষও হতাহত হচ্ছেন।

রাশিয়ার রাষ্ট্রপতির বৃত্ত থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, পুতিন আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে দিল্লিতে আয়োজিত জি-২০ সম্মেলনে উনি অংশগ্রহণ করবেন না। ফলে অবধারিতভাবে জি-২০র ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, কারণ ভারত এবং চিন নিজেদের সুবিধার্থে পরোক্ষে রাশিয়ার পক্ষ নিয়ে এসেছে। এবং একথাও সত্যি যে রাশিয়াকে একা দোষের ভাগিদার করা যায় না, কারণ ‘রাশিয়া বিনা ইউরোপ’ এবং ন্যাটো-কে গ্লোবাল ন্যাটো করবার পরম লক্ষ্য নিয়ে আমেরিকা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর জন্যে প্ররোচিত করেছে। পশ্চিমি দুনিয়া থেকে লাগাতার অস্ত্র সরবরাহের সূত্রে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার উৎসাহ দেওয়ার বদলে সম্প্রীতির কোনও সূত্রকেই সামনে আনতে দেওয়া হচ্ছে না।

সবার উপরে ইয়েমেন সঙ্কটে দেখা যাচ্ছে ইয়েমেনের উপর লাগাতার সৌদি আক্রমণের পরিণামে যে মানবিক সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের একেবারেই নজর নেই। এমনকি ভারত নিজেকে দক্ষিণ গোলার্ধের নেতা হিসেবে নিজেকে ভাবা সত্ত্বেও কোনও কড়া পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে কারণ, সৌদিদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সৌহার্দ্যের।

এমন সব প্রেক্ষাপটগুলির নিরিখে আমরা কী করে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের পুনর্গঠনের কথা ভাবতে পারি? এমনটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক পুনর্গঠন করাই যায় না কারণ এর প্রকৃতির মধ্যেই যে অরাজক, যুদ্ধমুখী প্রবণতা রয়েছে তা পশ্চিমি দুনিয়াই নিয়ন্ত্রণ করে।

শেষ লক্ষ্য হিসেবে ভারত উপস্থাপন করেছে ‘নারীর নেতৃত্বে উন্নয়ন’ যার মধ্যে দিয়ে নারীর ক্ষমতায়ন এবং প্রতিনিধিত্বের প্রতি নজর দেওয়া হবে আর্থিক-সামাজিক উন্নতির স্বার্থে। ২০২১ সালে আল জাজিরা দ্বারা প্রকাশিত এক তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে নির্বাচিত মহিলা প্রতিনিধিত্বের শতকরা হিসেবে ১৯৩টি দেশের তালিকায় ভারত ১৪৮তম স্থানে রয়েছে। ফলে এই বিল পাশ করানোর জন্য সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকার তাগিদটাও স্পষ্ট। কিন্তু ২০১৪ এবং ২০১৯-এর নির্বাচনী ইস্তেহারে বিজেপি ফলাও ঘোষণা সত্ত্বেও এই ব্যাপারে সক্রিয় হতে হতে কেন ২০২৪-এর ভোটও চলে এল সে-প্রশ্ন অমূলক হবে না নিশ্চয়ই।

সর্বোপরি, দ্য হিন্দু প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বলছে প্রতি বছর ৪০,০০০ মহিলা এবং শিশু অপহরণ এবং পাচার হচ্ছে এবং গড়ে প্রতিদিন ৮৬টি ধর্ষণের অভিযোগ রুজু হচ্ছে। দয়া করে ‘রুজু’ শব্দটি অবধাবন করুন। প্রচুর অভিযোগ কখনও রুজুই হয় না। মহিলাদের গণধর্ষণ এবং বিবস্ত্র করে ঘুরিয়ে ছবি তুলে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা মণিপুরে এবং মধ্যপ্রদেশে এক দলিত মহিলাকে বিবস্ত্র করে জনসমক্ষে ঘোরানোর মতো জাতির বিবেক নাড়িয়ে দেওয়া ঘটনাও ঘটে গেছে সাম্প্রতিক কালেই।

 

জি-২০র ভবিষ্যৎ

একটি ফোরাম হিসেবে জি-২০র বেশ কিছু ত্রুটি রয়েছে। এর ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু বলা কঠিন। ফোরামটির সবচেয়ে বড় ত্রুটি হল যে এটি সম্পূর্ণভাবে উন্নত দেশগুলির দিকে ঝুঁকে আছে এবং এদের স্বার্থ আর উদ্দেশ্য চরিতার্থ করবার জন্যে সভাপতির দায়িত্বটিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রায়শই সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত উন্নতিশীল দেশগুলিতে বর্তে দেওয়া হয়। চিন এবং ভারত উভয়েই জি-২০ ফোরামটিতে ভারসাম্য আনবার চেষ্টাটা করেছে কিন্তু এযাবৎ সেই চেষ্টা ফলপ্রসূ হয়নি। সত্যি কথা বলতে কি, ভারত এবং চিন যেভাবে পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাস প্রদর্শন করে চলেছে, তার ফলেই তারা দক্ষিণ গোলার্ধকে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হয়েছে, যার ফলে ফোরামে ভারসাম্য আনতে পারেনি।

ভারতের অনেকগুলি সুশীল সমাজ গ্রুপ তর্ক তুলছে যে জি-২০ সম্পূর্ণভাবেই নব্য-উদারপন্থী পশ্চিমি ধারায় চালিত একটি ডিফল্ট ব্যবস্থা যা স্ব-ঘোষিত লক্ষ্য নিয়ে বিশ্বব্যাপী সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চাইছে। সত্যিটা এই যে, এই ফোরামে শক্তিশালী কর্পোরেট লবিগুলির অনুপ্রবেশ ঘটেছে যারা নানান ধরনের নীতিগুলির ক্ষেত্রে ফোরামের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে চলেছে।

জি-২০ টেকসই উন্নয়ন, যার মধ্যে আবহাওয়া পরিবর্তন এবং অর্থ-সামাজিক অসাম্যের প্রতি নজর দেওয়ার চেয়েও আর্থিক বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেয়। আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে কোনদিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে সেই বিষয় নিয়ে ফোরামটি ইতিমধ্যেই বিভক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে দুর্বল এবং অ-অংশমূলক এক কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। নিয়ন্ত্রণ রদ করা এবং বাণিজ্য উদারীকরণের প্রতি ফোরাম যে নীতি নিয়ে নজর দিচ্ছে, তাকে পশ্চিম-কেন্দ্রিক পদ্ধতি হিসেবেই দেখা হচ্ছে, যা উন্নত দেশগুলির পক্ষেই সুবিধা সৃষ্টি করছে এই চিন্তা ব্যতিরেকেই যে এই সব নীতি কার্যায়নের পরিণতি উন্নতিশীল দেশগুলির ক্ষেত্রে কতটা নেতিবাচক হতে পারে।

 

উপসংহার

জি-২০র সভাপতি হিসেবে ভারতের অবস্থানটিকে বিজেপি এমনভাবে দেখাতে চাইছে যেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এটি ব্যক্তিগত কৃতিত্বে অর্জন করেছেন। ভাবটা এমন যে অন্য কোনও ব্যক্তি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলে এই সভাপতির পদাধিকারটিকে ফোরাম যেন গ্রাহ্যই করত না।

ভারতের ক্ষেত্রে বরাবরই সমস্যা একটাই— শাসকশ্রেণি ঘরোয়া রাজনীতি এবং নির্বাচন নিয়ে এতটাই মশগুল থাকে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং কূটনীতি বিষয়ে তাঁদের ধারণাগুলিও ঘরোয়া নীতির ত্রিপার্শ্ব কাচের মধ্যে দিয়ে দেখে তৈরি হয়ে এসেছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিষয়ে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গিতে দূরদর্শিতার অভাবই প্রকট হয়ে উঠেছে। এমনকি কংগ্রেসও বহুবার এই একই দোষে দোষী।

কেউ বলতেই পারেন জি-২০ একটি আলঙ্কারিক গ্রুপ ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ফোরাম থেকে কোনও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

তবে ভারতের পক্ষে দুটি বিপ্রতীপ দিকের মধ্যস্থতা এবং পুনর্মিলন ঘটানো উপর্যুপরি কঠিন হয়ে উঠেছে। তাই আমাদের একটা কথা স্পষ্ট বোঝা উচিত। জি-২০র নেতৃত্ব ভারতবাসীর জন্যে যতই গর্বের কারণ হোক, বাস্তবে কিন্তু এর থেকে কোনও নিস্পত্তিমূলক ফলাফল পাওয়া যাবে না।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...