জীবনের গন্ধ

মলয় রায়চৌধুরী

 

মলয় রায়চৌধুরীর চলে যাওয়ার খবর যখন পেলাম, একটা গোলমেলে মিটিংয়ের মধ্যে। ফলে মাথা ব্যস্ত ছিল অন্যত্রে। অফিস ফিরে মেসেঞ্জার খুলে দেখতে গিয়ে কত কী যে ফিরে এল! ২০১১ থেকে ২০১৫ ওঁর সঙ্গে নিয়মিত কথাবার্তা টানা, প্রতি সপ্তাহে, প্রতিদিন। তারপর কথাবার্তা কমতে থাকে নানা কারণে। ওঁরও আমার প্রতি আগ্রহ কমে গিয়ে থাকবে। আমারও হয়তো সেই কলেজজীবন থেকে বয়ে বেড়ানো ওঁদের নিয়ে মুগ্ধতা কিছুটা ঝরে যায়। তবে সবসময়ই মলয়দাকে ধারাবাহিক পড়ে গিয়েছি ভাষার অগ্ন্যুৎপাত শেখার জন্য। আমার একটি কবিতা পড়ে মলয়দা কমেন্টে লিখেছিলেন, ‘এতদিনে তুমি তোমার আঙুলে চলে এসেছ অগ্নি’, আমার আমরণ মনে থাকবে। আর মনে থাকবে সদ্য মোদির চিতা আনয়ন সংক্রান্ত একটি লেখা পড়ে, মেসেজ করলেন ‘চিতা আর চিতাবউ দুই-ই আছেন, সেটা তো লেখোনি!’

সে যাই হোক। আজ যেটা বলার তা হল, ওই সময়েরই একটা পর্যায়ে নবারুণদাকে (ভট্টাচার্য) প্রস্তাব দিই, মলয়দার একটা ধারাবাহিক হোক না ভাষাবন্ধনে। তখন ওই পত্রিকাটিই আমার কবিতা প্রকাশের মুখ্য জায়গা। নবারুণদার সঙ্গে যোগাযোগও গভীর। উনি শুনে, স্বাভাবিকভাবেই এক কথায় রাজি। বললেন, ‘মলয়দাকে বল, ছবি পাঠাতে সঙ্গে।’ জানালাম ওঁকে। মলয়দা জানালেন, “জীবনের বিশেষ করে পটনা শহরের সময়টা নিয়ে লিখব, যখন এরকম সামাজিক বাধানিষেধ ছিল না।" এর কিছুদিন পর মেসেঞ্জারে লিখলেন, “দুটো কিস্তি পাঠিয়েছি (মেল-এ)। নবারুণকে জিজ্ঞাসা করে জানিও পরের কিস্তিগুলো পাঠাতে থাকব কিনা। বিভিন্ন গন্ধের স্মৃতি নিয়ে লিখব প্রতিবারে।"

আমার মেল-এ ছবি এল, লেখাও। পর পর তিনটি। কিন্তু এরপর নবারুণদা অসুস্থ হতে শুরু করলেন। বারবার শরীর খারাপ হয়। সেই লেখা আর ছাপা হয়ে ওঠে না সে-সময়ে। আমারও আর তা নিয়ে কথা বলার মতো পরিস্থিতি ছিল না নবারুণদার সঙ্গে। মলয়দাও ফেরত চাননি সেই লেখা। এরপর ক্রমে আমার সঙ্গেও মলয়দার সেই নিয়মিত সংযোগ কমে আসে। তবে কখনও কখনও কোনও বিষয়ভিত্তিক কথা হত।

মলয়দা যাওয়ার পর এই গোটা বৃত্তান্ত আমি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করি। সর্বাগ্রে এবং এখনও পর্যন্ত একমাত্র, চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম ওয়েবপত্রিকা, লেখাগুলি চান। বাংলাভাষার এবং ভারতের দুই মেজর লেখকের মাঝে আমি হাইফেন হয়ে এই সিরিজটি শুরু করাতে পেরেছিলাম মাত্র। শেষ হয়নি। ওঁরা দুজনেও কলম নামিয়ে রেখে চলে গিয়েছেন।

চার নম্বর প্ল্যাটফর্মকে ধন্যবাদ, এই লেখা পাঠকের সামনে নিয়ে আসার সুযোগ করে দেওয়ার জন্য।

—অগ্নি রায়

 

রামচন্দর বুঢ়উ: কাঁচা বাঁশ-কাটার গন্ধ

 

আমার জীবনে সব গন্ধেরই একটা বহুরৈখিক ইতিহাস আছে। নানারকমের গন্ধ নিয়ে গড়ে উঠতে পারে আমার জীবনী। কেবল গন্ধ কেন, আমার স্পর্শের ইতিহাস নিয়ে লেখা যেতে পারে জীবনী। বিভিন্ন খাবার খাওয়া নিয়ে স্বাদের জীবনী। সারা জীবন যা-যা দেখেছি সেগুলো নিয়ে ধারাবাহিক জীবনী। ছোটবেলা থেকে প্রতিটি ইন্দ্রিয়ের ধারাবাহিক অনুক্রম গড়ে ফেলা যায়। অথচ আমরা ধারাবাহিক অনুক্রম গড়ে তুলি সবকটি ইন্দ্রিয় থেকে জড়ো-করা অভিজ্ঞতা দিয়ে। এবার একটা অনুক্রম গড়ার চেষ্টা করছি কেবল বিশেষ গন্ধজনিত স্মৃতি নিয়ে।

নাকে বিশেষ কোনও গন্ধ এলেই স্মৃতি তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে খুলতে আরম্ভ করে ঘটনাবলির উলের বল-বুনোন। আজকে বলছি বাঁশঝাড় কাটার সবুজ গন্ধ নিয়ে।

নেদারল্যান্ডসের রানির ডেন হাগ প্রাসাদের পেছনের ‘হুতলান্দ’ জঙ্গলের মাঝ দিয়ে যে কাঁকুরে কাঁচা লালচে রাস্তাটা ব্রিটিশ স্কুল থেকে চলে গেছে ইয়োসেফ ইজর‌্যাল্সপ্লিন ক্যাথলিক ক্যাথিড্রালের দিকে, সেই পথে, নাতনিদের স্কুল থেকে নিয়ে ফিরছিলুম আমি আর আমার স্ত্রী। আমি এমনিতেই শীতকাতুরে, তার ওপর উত্তর-ইউরোপের উত্তর-সমুদ্রের ধারের শহরে ফুরিয়ে আসা শীতের হাওয়া বইছে। ঘন জঙ্গল। তবে অন্ধকারাচ্ছন্ন নয়। গাছে-গাছে কচি পাতার নানা শেডের সবুজ আলো। জন্তু-জানোয়ার বলতে কেবল খরগোশ বেড়াল আর অজস্র পাখি। রাস্তার দুপাশে ফুটে আছে নানা রঙের ছোটছোট ফুল। নাতনিরা আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছিল ওদের পরিচিত ফুলগুলো আর গাছগুলোর নামের সঙ্গে। পপি, লিলি আর ড্যাফোডিলসদের চিনি। এক ফার্লং অন্তর একটা করে ডাচ ভাষায় লেখা বোর্ড আর তার তলায় ডিবে ঝোলানো। নাতনিরা জানাল যে ওগুলো কুকুরের গু ফেলবার জন্য। কুকুরকে জঙ্গলে বেড়াতে নিয়ে এলেও কুকুরটি যদি হাগে তাহলে মালিক তার গু কাগজ দিয়ে তুলে ওই ডিবেটিতে ফেলবেন। নোংরা ফেলবার জন্যও তৈরি করা আছে নানা আকারের বাক্স। জঙ্গল হলেও তাকে নোংরা করা চলবে না। কাঁচা মাটির পথটিতে ঝরা-পাতা তেমন নেই। সকালবেলায় শ্রমিকরা পরিষ্কার করে দিয়ে গিয়ে থাকবেন। মাঝখানে একটা ঝিলের ওপরের সাঁকো পেরোলুম; ঝিলে কালো আর সাদা হাঁসের সঙ্গে অন্যান্য অচেনা জলচর পাখি।

এই জঙ্গলটা শহরের একেবারে মাঝখানে, ম্যালেভেল্দ থেকে পাশের শহর ওয়াসেনার পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি নেদারল্যান্ডসের সবচেয়ে প্রাচীন জঙ্গল। কলকাতা শহরের মাঝখানে একটা জঙ্গল, ভাবা যায়! অথচ এককালে জঙ্গল তো ছিল। তাকে ঘিরে গড়ে উঠতে পারত কলকাতা শহরটা। একাদশ শতক থেকে এই হুতলান্দ জঙ্গলের দেখাশোনার ভার রাষ্ট্র নিজের দায়িত্বে নিয়েছিল। আগে এটার নাম ছিল ‘দিয়ে হুত’ বা স্রেফ জঙ্গল। সরকারি দায়িত্বে আসার পর এর নাম হয়েছে হুতলান্দ বা জঙ্গলভূমি বা ‘হাগজে বস’। বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মান সৈন্যরা এই জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে ভি-ওয়ান আর ভি-টু রকেট দাগত বিভিন্ন ইউরোপীয় দেশগুলোয়। রাজা দ্বিতীয় উইলিয়াম ত্রয়োদশ শতকে, আর তারপর কাউন্ট ফ্লোরিস পঞ্চম, জঙ্গলের এলাকা সঙ্কুচিত করতে থাকেন, শহরে লোকেদের বসতি বাড়াবার উদ্দেশ্যে। সে-সময়ে জঙ্গলের মাঝে যে গ্রামটি ছিল সেটিই পরবর্তীকালে দেন হাগ শহরে রূপান্তরিত। ষোড়শ শতক থেকে গথিক স্থাপত্যের বাড়ির সারি গড়ে উঠতে থাকে, যার মাঝখানে আজকের ডাচ পারলিয়ামেন্ট। মধ্যযুগেও জঙ্গলের গাছ কাটার ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তার কারণ কাউন্টরা এখানে শেয়াল শিকার করতে আসতেন। ষোড়শ শতক জুড়ে স্পেনের সঙ্গে আশি বছর ধরে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তখনও যুদ্ধের প্রয়োজনে গাছ কাটার ফলে জঙ্গল কিছুটা সঙ্কুচিত হয়েছিল। সে-সময়ে বিশেষ করে কাটা হয়েছিল ওকগাছ।

ওকগাছের গন্ধ নিয়ে আমার এক ভিন্ন স্মৃতিধারা আছে যে-প্রসঙ্গ এখানে তুললে বাঁশের গন্ধটা হারিয়ে যেতে পারে বলে তাতে যাচ্ছি না আপাতত। আমার ক্যাথলিক স্কুলের সিস্টার আইরিন আয়ারল্যান্ড থেকে এনে দিয়েছিলেন ওকফল আর ওকগাছের পাতা।

১৮৯৯ সাল থেকে হুতলান্দ জঙ্গলের দায়িত্ব ও মালিকানা তুলে দেওয়া হয়েছে ন্যাশানাল ফরেস্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেশান বা স্তার্তবোসবেহের-এর ওপর। তাদের নির্দেশ ছাড়া কোথাও কোনও গাছ কাটা যায় না। শহরের মাঝখান বলে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে দুটো পিচরাস্তা আছে, মোটরগাড়ি যাতায়াতের জন্য। ১৯১১ সালে বহু গাছ বিধ্বংসী ঝড়ে পড়ে গিয়েছিল। তাই বহু গাছ নতুন করে বসানো। নতুন করে বসাবার দরুন একটা প্যাটার্নে গড়ে উঠেছে জঙ্গলটা। প্রায় তিনশো রকমের গাছপালা আছে। ইউরোপে হয় না এমন গাছও আছে, উপনিবেশ থেকে আনা। অনেক ধরনের মাশরুম হয়, বাচ্চা ছেলে-মেয়েরা সেগুলো কাঁচাই খেয়ে নেয় দেখেছি। আবার রেঁধে খাবার জন্য তুলে নিয়ে যান কেউ কেউ।

এক জায়গায় এসে থামলুম আমরা, জঙ্গলের প্রায় মাঝামাঝি। কাঁচা পথের ওপরে ঝুঁকে পড়েছে ঝাড় থেকে কয়েকটা বাঁশ। বাঁশগুলোকে সোজা করার কাজে ব্যস্ত কয়েকজন দশাসই শ্রমিক যাঁরা সকলেই বিদেশি, হয় আফ্রিকা থেকে নয়তো তুরস্ক থেকে। পশ্চিমবঙ্গে নালি-নর্দমার কাজে যেমন বাঙালিরা আর হাত দেন না, বিহার কিংবা ওডিশার লোকেরা ম্যানহোল পরিষ্কার করে দ্যায়, সেরকম ইউরোপেও শারীরিক শ্রমের, যে-কাজগুলোকে ইউরোপীয়রা নোংরা মনে করেন, সে-কাজগুলো চলে গেছে কালো ও বাদামি মানুষের জিম্মায়।

একটা বাঁশ, যদিও কাঁচা, এতই হেলে পড়েছিল যে সেটা কাটতে শ্রমিকরা বোধহয় বাধ্য হয়ে পড়েছিলেন। মেশিন-করাত দিয়ে তাঁরা বাঁশটিকে যতটা ওপর থেকে কাটা যায় গাড়ির ওপর বসানো মইয়ে চেপে সেখান থেকে কাটছিলেন। কোন বাঁশ জানি না, কেননা বাঁশ সম্পর্কে যেটুকু জ্ঞান তা গ্রামোন্নয়নের চাকরিতে ভারতের বিভিন্ন গ্রামে ঘোরাঘুরি করে পাওয়া। ১৮ সেপ্টেম্বরকে ‘বিশ্ব বাঁশ দিবস’ হিসেবে পালন করেন কৃষি বিভাগের কর্মীরা, দেশে-দেশে। আমাদের দেশের রাজনীতিকদের কাজ-কারবার দেখে মনে হয় এ-দেশে বছরে তিনশো পঁয়ষট্টি দিন ‘বাঁশ দেওয়ার দিবস’। পূর্বভারতে বাঁশ একসঙ্গে দশ থেকে আশিটা হয় এক-একটা ঝাড়ে। মুলি, তল্লা, বরাক, তুলা, চাইনিজ ইত্যাদি বাঁশের কথা জানি। নেদারল্যান্ডসের জঙ্গলে এসে হয়তো চেহারা কিছুটা পালটে ফেলে থাকবে বাঁশের ঝাড়টা; জানি না এটা কোন উপনিবেশ থেকে আনা। কিন্তু গন্ধটা আমাদের দেশের কাঁচা কাটা-বাঁশের মতনই।

নেদারল্যান্ডসের জঙ্গলে স্ত্রী ও নাতনিদের সঙ্গে মলয়

কাঁচা বাঁশের গন্ধ নাকে আসতেই, হল্যান্ডের একটা জঙ্গলের মাঝ দিয়ে যেতে-যেতে, চলে গেলুম ছোটবেলার ইমলিতলা পাড়ায়, পঁষট্টি বছরেরও বেশি পেছনে। কাঁচা বাঁশ কাটার গন্ধ যখনই নাকে এসেছে আমি পৌঁছে গেছি পাটনা শহরের শৈশবের ইমলিতলার একটি ঘটনার স্মৃতিতে। পাড়ার নাম ইমলিতলা হলেও কবে যে ওই পাড়ায় ইমলি বা তেঁতুলগাছ ছিল তা কেউ জানে না। সম্ভবত বসতটা গড়ে ওঠার আগে ছিল। তেঁতুলগাছ কেটে বসত। বোধহয় টকমিষ্টি তেঁতুল ছিল কেননা পাড়াটার মানুষজনদের কাজ-কারবারও ছিল টকমিষ্টি। ছোটবেলায় অবশ্য অনেকে গপ্প করত যে পতঞ্জলি যে তেঁতুলগাছের তলায় বসে ‘মহাভাষ্য’ লিখেছিলেন সেই তেঁতুলগাছ ইমলিতলা পাড়ায় ছিল।

কাঁচা বাঁশ কাটার গন্ধের স্মৃতিটি ইমলিতলা পাড়ার এক বৃদ্ধের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে। ইমলিতলায় মৃত্যু ব্যাপারটা শোকের ছিল না। বলা যায় মৃত্যুকে সেলিব্রেট করা হত। আমার স্মৃতিতে কাঁচা বাঁশ কাটার গন্ধের সঙ্গে মৃত্যুকে সেলিব্রেট করার সংবেদন জড়িয়ে গেছে।

ইমলিতলা পাড়া আর সেই পাড়ায় আমাদের একান্নবর্তী পরিবারের কুড়িজন সদস্যের ব্যাখ্যার অযোগ্য উপস্থিতি বিশদ না করলে আন্দাজ করা যাবে না মৃত্যু কী করে উৎসব হতে পারে। ইমলিতলায় জমির দাম পাটনার অন্যান্য এলাকার চেয়ে অত্যন্ত কম ছিল বলে বড়-জ্যাঠামশায় ১৯৩৪-এর ভূমিকম্পের পর তৈরি করিয়েছিলেন, ধাপে-ধাপে, দোতলা। পাড়ার প্রধান বাসিন্দারা ডোম, চামার, কাহার, কুর্মি, দুসাধ, মুসহর, জোলা, ছুতোর, রজক, যাদব আর শিয়া মুসলমান পরিবার। লখনউতে ওয়াজেদ আলি শাহের আশেপাশের শিয়াদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছিল ইংরেজরা। ইমলিতলার শিয়ারা সেই ধ্বংসাবশেষের অত্যন্ত গরিব টুকরো ছিল। গরিব নিম্নবর্গ হিন্দু পাড়ায় তাদের খাপ খেতে অসুবিধা হয়নি। ওঁরা নিজের খন্ডহরে হাঁস মুরগি আর ছাগল পুষতেন; মহিলারা বিড়ি বাঁধতেন। ওঁদের বাড়ির ছেলে নাজিম আমার বন্ধু ছিল, পাড়াতুতো বন্ধু। আর ছিলেন কুলসুম আপা।

ইমলিতলা পাড়ায় আমাদের বাড়িটাই কেবল ছিল দোতলা। কুলসুম আপাদের খন্ডহরটা কখনও চুন-সুরকির একতলা বাড়ি ছিল। বাদবাকি সবকটা বাড়ি মাটির দেওয়ালের ওপর গোলটালির চালাঘর। আমাদের বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে বহু চালাঘরের ভেতরের উঠোন দেখা যেত; দেখা যেত পারিবারিক রহস্যগুলো। কোনও বাড়িতে ঘাস নেই, গাছ নেই। কানাগলির শেষে শুধু ছিল গাঁজাগাছের ঝোপ। আমাদের বাড়িটা পরিকল্পনাহীন সেকেলে বিহারি ঢঙে তৈরি। বারি পথ ধরে গান্ধি ময়দান থেকে এগোলে ডানদিকে দ্বিতীয় গলিটা চলে গেছে ইমলিতলায়। অত্যন্ত সরু গলিটা দক্ষিণে বাঁক নিয়ে যেখানে পূর্বদিকে বাঁক নিয়েছে, ঠিক ওই বাঁকের মাথায়, পাড়ার যাবতীয় আবর্জনা ফেলার স্তূপের কাছে বাড়িটা, যার বাইরের কালচে দেওয়ালে কখনও সম্ভবত হলদে চুনকাম ছিল। এত ঘিঞ্জি গলি যে রিকশ বা ঠেলাও ঢোকে না। যানবাহন ধরতে হয় বারি পথে গিয়ে। গলিতে বিজলিবাতির থাম ঢোকেনি বলে সবার বাড়িতে লন্ঠন বা কুপি জ্বলে। পূর্ণিমার, তা-ও শরতের, কয়েকটা দিন বাদ দিলে, সারা বছর ঘুটঘুটে। কারও বাড়িতে জলের কল ছিল না। রাস্তার একমাত্র কলে, যে কলতলাটি ছিল আমাদের বাড়ির ঠিক সামনে, সবাইকে জল ভরতে হত।

ইমলিতলা পাড়া বলতে অন্তত পঞ্চাশটি পরিবার। আধিকাংশ স্নান ওই কলতলায়, এমনকি মহিলারাও ওই কলতলায় স্নান করতেন। ফলে উলঙ্গ পুরুষ বা নারীর শরীর দেখতে কেমন সে রহস্য শৈশবেই খোলসা হয়ে গিয়েছিল। চোর-পুলিশ খেলার সময়ে যে-কোনও বাড়ির যে-কোনও ঘরে ঢুকে লুকোবার অবাধ অধিকার ছিল ছোটদের। কুলসুম আপাদের বাড়িতেও। আমাদের বাড়িতে মুরগির ডিম নিষিদ্ধ ছিল বলে কুলসুম আপাদের বাড়ি থেকে হাঁসের ডিম আনতে হত। আর সে-কাজটা আমার ওপরেই বর্তেছিল।

আমাদের বাড়ির ডানদিকে যেমন বারি পথ থেকে একটা গলি এসে ঢুকেছে, তেমনি বাড়ির বাঁদিকে এক গলি, কানা গলি, যার শেষে কাঁচা মাটির উঠোন ঘিরে কয়েকটা কুঁড়েঘর, যার বাসিন্দারা চুরি-পকেটমারি করে সংসার চালাত। প্রায়ই লালপাগড়ি পুলিশ আসত কাউকে না কাউকে পাকড়াও করতে। গাঁজার ঝোপ সে-সময়ে বেআইনি ছিল না, বেশ হাসতে হাসতে ফলাও করে ছড়িয়ে পড়ত আর ইমলিতলার নিবাসীদের নিয়ম উল্লঙ্ঘনের সেবায় লাগত। ওদের উঠোনের মাঝে একটা গর্ত ছিল প্রায় পাঁচ ফুট গভীর, যার ভেতর একটা শুয়োরকে চার-পা বেঁধে ফেলে দিয়ে লোহার শিক গরম করে ঢুকিয়ে কাটা হত, পাড়ার সবার মাংসভোজের ব্যবস্থা করার জন্য। কেউ মারা গেলে তার পরের দিন উৎসব পালন তো শুয়োরের মাংস আর তাড়ি বা ঠররা না খেয়ে হতে পারে না। কাঁচা বাঁশের গন্ধের সঙ্গে শুয়োরের মাংস খাওয়ার প্রথম স্মৃতিও জড়িয়ে আছে। তাড়ি বা ঠররা না জুটলে তখন গাঁজাপাতা বেটে খাওয়ার ধুম। পানের খিলিতে গাঁজা-পাতা বেটে।

শীতের এক সকালে, আমার বুতরু-বন্ধু কপিলের দাদু মরে গেছে রাত্তিরবেলায় জানতে পারলুম ইমলিতলার বাচ্চাদের শোরগোলে, যারা এক সঙ্গে কপিলের দাদুর লাশ গিরে নাচছিল আর চেঁচিয়ে-চেঁচিয়ে আওড়াচ্ছিল, ‘রামচন্দর বুঢ়ুয়া বন্দর খায় খেসারি হাগগে বেদানা’। কপিলের দাদুর নাম রামচন্দর হলেও কেউ ওই নামে ডাকত না ওঁকে। উনি ছিলেন কমবয়সিদের দাদু, আর বড়রা বলত বুঢ়উ অর্থাৎ বুড়ো। কপিলদের বাড়িটা ছিল আমাদের বাড়ির বাঁদিকের কোণে।

ইমলিতলা পাড়ায় কেউ মরে গেলে বিলাপ কান্নাকাটি বুক-চাপড়ানো এসবের রেওয়াজ ছিল না। শুধু বাচ্চা মারা গেলে কাঁদত, কেবল তার বাড়ির লোকজনই নয়, পাড়াসুদ্ধ সবাই, এমনকি আমার বড়জেঠিমা, যিনি একান্নবর্তী পরিবারের কর্ত্রী ছিলেন, তিনিও একফাঁকে গিয়ে কেঁদে দিয়ে আসতেন। আমরাই শুধু একমাত্র বাঙালি পরিবার ছিলুম ইমলিতলা পাড়ায়। অন্য পাড়ায়, জেঠা বা বাবা-কাকাদের বাঙালি বা অবাঙালি বন্ধুদের বাড়িতে কেউ মরে গেলে, তা সে যে-ই মারা যাক, বেধড়ক কান্নকাটির ব্যাপার দেখতুম। কেন আমাদের পাড়ার লোকেরা কাঁদে না তা জানতে পারি বেশ পরে, ছোটকাকার কাছ থেকে, যিনি বয়স কম হওয়ার কারণে নিজের দাদাদের দলেও ছিলেন না আবার আমাদের দলেও ছিলেন না বটে তবে আমরা ওঁর অনেক গোলমেলে ঘটনায় প্রিভি ছিলুম।

বয়ঃসন্ধির পর, মেয়েদের ঋতু আর ছেলেদের বীর্য তৈরি হওয়া শুরু হয়ে যাওয়ার পর শরীরে উৎসব ঘটে যায় আর সে উৎসব চলে সারাজীবন, সে উৎসব যৌনতার। তাই যাদের শরীর উৎসবে আক্রান্ত হয়ে গেছে, বাঁচার রহস্য খোদাই করা শুরু করে দিয়েছে, তারা কেউ মারা গেলে কাঁদবার কোনও প্রয়োজন নেই। যৌনতাকে অত্যন্ত স্বাভাবিক প্রক্রিয়া মনে করতেন ইমলিতলার মানুষ; ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের প্রভাবের বাইরে এক প্রাক-ঔপনিবেশিক মনন-জগৎ। প্রতিদিনের সমস্যার মাঝেই আনন্দ গড়ে ফেলার ট্রাইবাল খেলা। ইমলিতলা ছিল আমার ট্রাইব। বুঢ়উ ছিলেন এই ট্রাইবের প্রধান।

অমন কেউ মারা গেলে ইমলিতলায় শুরু হত উৎসব। রামচন্দর বুঢ়উ-এর মৃতদেহ ঘিরে বাচ্চাদের নাচানাচি দিয়ে আরম্ভ হয়েছে উৎসব। রাতে মৃত্যুর খবর পেয়েই ফুলচন্দ ডোম আর ফুলচন্দের ছেলে চলে গিয়েছিল পুনপুন নদীর তীরে বাচ্চাবাবুদের বাঁশবাগান থেকে কাঁচা বাঁশ চুরি করে আনতে। বাচ্চাবাবুদের স্টিমার চলত গঙ্গা পারাপারের জন্য। দুজনে কাঁধে বাঁশ চাপিয়ে হাঁই-হুই করে দৌড়তে-দৌড়তে একটা পোড়ো বাঁশ, গোড়া থেকে কাটা, এসে দিয়ে দিয়েছে দুসাধ কালুটুয়ার বাবাকে, যার কাজ হল ইমলিতলায় কেউ মারা গেলে বেশ যত্ন নিয়ে এক ঘন্টার মধ্যে অরথি বা শবখাট বানানো। শবখাট দেখতে অনেকটা মইয়ের মতন হলেও তার চার কোণে ধুনুচি বাঁধার জন্যে খাট ঘিরে রেলিং থাকত। মেজদা যখন মারা গেল, সম্ভবত ১৫-১৬ বছর বয়সেই মারা গিয়েছিল মেজদা, মৃত্যুর সংবাদ পেয়েই কাঁচা বাঁশ জোগাড় করতে চলে গিয়েছিল ফুলচন্দ ডোম। মেজদা আমার নিজের ভাই ছিলেন না; ওঁকে বড়-জ্যাঠামশায় কিনেছিলেন এক বেশ্যার কাছ থেকে।

খাট তৈরি হয়ে গেলে সাদা কোরা কাপড় পেতে তার ওপর শোয়ানো হল বুঢ়উ রামচন্দরকে। সধবারা মারা গেলে গোলাপি কাপড় পাতা হত। একেবারে ল্যাংটো। উনি একটা ধুতির মতন কিছু পরে বহুদিন চালিয়ে দিতেন বলে ওঁর জননেন্দ্রিয়টি ইমলিতলার জনগোচরে নতুন কোনও ব্যাপার ছিল না। সে ধুতি এত নোংরা আর তেলচিটে হয়ে থাকত যে দুর্গন্ধ বেরোত। শীতকালে উনি স্নান করতেন না বলা যায়। গরমকালে করতেন, পাড়ার কলতলায়। স্নানের সময়ে যে কাপড় পরে থাকতেন সেটা দিয়েই গা-মাথা পুঁছে নিতেন। তাই ওঁকে উলঙ্গ করে শোয়ানোতে কারও অসুবিধা হয়নি। রামচন্দর বুঢ়উ শীত আর বর্ষা ছাড়া সারা বছর রাতে শুতেন আমাদের বাড়ির বাইরের রকে, টানা কুড়ি ফিট লম্বা আর উঁচু আড়াই ফিট, লাল রঙের সিমেন্টে শান-বাঁধানো। ওঁর একটা তেলচিটে বালিশ ছিল যা এতই তেলচিটে যে মনে হত চামড়ার ওয়াড় পরানো। পাড়ার বাচ্চারা যারা অন্য ঋতুতে নালিতে হাগত তারা বর্ষাকালে আমাদের ওই রকে বসে হাগত।

কপিলের বাবা-কাকাদের সঙ্গে একবার ওঁর ঝগড়াঝাঁটি হতে, কলতলায় ল্যাংটো দাঁড়িয়ে নিজের শ্রীকৃষ্ণ ব্র্যান্ডের লিঙ্গের দিকে আঙুল দেখিয়ে চেঁচিয়েছিলেন, ‘এইটা দিয়ে যাদের জন্ম দিয়েছি তারা আমায় খেতে দ্যায় না।’ খেতে উনি পেতেন ঠিকই কিন্তু অত্যন্ত নেশা করতেন বলে, বিশেষ করে চরসের নেশা, ওঁর ছেলেরা চটে থাকত ওনার ওপর। তখনও চরস নিষিদ্ধ ছিল না, কয়েকটা সরকারি দোকানে নির্দিষ্ট মাত্রায় পুরিয়া পাওয়া যেত আর তা রামচন্দর বুঢ়উ-এর ছেলেরাই কিনে এনে দিত। চরস উনি ছিলিমে খেতেন। তাছাড়া তাড়ি খেয়ে ওঁর পেট ভরাই থাকত বলা যায়। আমাদের রকের ওপর তাড়ি পাড়ার মাটির ‘লমনি’ নিয়ে বসতেন আর ‘লমনি’ ঢাকা দেবার খুরিতে চুমুক দিয়ে খেতেন; খেতে-খেতে বিহারি লোকগীত ‘বিরহা’ গাইতেন। তারপর রকের ওপরই আরামে কাৎ।

ইমলিতলার ক্ষুদে বাচ্চাদের গালাগালি শেখাবার ক্লাস নিতেন রামচন্দর বুঢ়উ, আমাদের রকে বসে। আমাদের বাড়ির রক-সংলগ্ন ঘর দুটো সে-কারণে বন্ধ থাকত ওঁর টিউটোরোয়াল ক্লাসের সময়। পথচলতি মানুষ দেখলে বা কেউ কলে জল ভরতে এলে, উনি একজন ছাত্রকে বলতেন, ‘এই ওকে অমুক গালাগালটা দে।’ শিশুর মুখনিঃসৃত অত্যন্ত অবমাননাকর আর অশ্লীল গালাগালটি শুনে একযোগে অট্টহাস্য দিতেন রকের আড্ডাবাজ বয়স্করা, এমনকী কলতলার সোমথ্থ গৃহবধুরা। গালাগাল যে এনজয় করা যেতে পারে তা ওই ইমলিতলায় জেনেছিলুম। দু-তিনটি বাচ্চা নিজেরাই জিজ্ঞেস করত, ‘দাদু ওকে অমুক গালাগালটা দেব?’ বাচ্চাদের এক-আধ ঢোঁক তাড়ি বা ঠররাও গিলিয়ে দিতেন উনি। সুযোগ পেলে এদিক-ওদিক তাকিয়ে চরসের ছিলিম মুখের কাছে ধরে বলতেন, ‘দুধ খাওয়ার মতন করে টান।’ আমার, দাদার আর মেজদার প্রথম তাড়ি আর ঠররা-পান ওঁরই স্কুলে। মধ্যবিত্তরা যাকে অশ্লীল বলে মনে করেন তা ওঁর স্কুলেই শেখা। অশ্লীল বলতে বাঙালিরা এবং উচ্চবর্গ বিহারিরা যা বোঝেন, তার চূড়ান্ত হত দোল খেলার দিন, হত অশ্লীলতম যৌথ গান, ঢোলক ঢোলচি তুরতুরি বাজিয়ে। যৌন নিষেধ ভাঙার চূড়ান্ত হত সেদিন। কোনওরকম বাঁধন মানা হত না। যৌন স্বাধীনতা সেদিন সামাজিকভাবে স্বীকৃত ছিল। দোলের দিন সন্ধ্যার পর বাইরে বেরোনো নিষিদ্ধ ছিল আমাদের। তবুও দাদা, মেজদা আর আমি একফাঁকে ভিড়ে যেতুম কোনও মহিলাদলের অবাধ হর্ষোল্লাসে, আর তরুণী গৃহবধুদের হাতে মোলেস্টেড হওয়ার অপার আনন্দে ভুগে ফিরে আসতুম পা টিপে-টিপে।

ইমলিতলায় দোলখেলা নিয়ে ‘ফাড়ু শিকারিনী’ শিরোনামে একটা পদ্য লিখেছিলুম। পদ্যটা পড়লে দোলখেলার মস্তি আঁচ করা যাবে:

দোলের দিনে ইমলিতলায়
যেসব কিশোর ইসকুলে যায়
কৌতুহলী কেউটে গজায়
তারা এদিন শেকল-খোলা
নওশিখিয়া টাটকা-নোলা
কোন বউটি জাপ্টে ধরে
তুলবে নিয়ে গোয়ালঘরে
শিখিয়ে দেবে প্রণয়-প্রীতি
রামছাগলের নিয়মনীতি
বলবে এবার বের করে দে
কচি ছুরির প্রথম খিদে
হাঁপ ধরিয়ে কাজ ফুরোলে
ধুইয়ে দেবে তাড়ির জলে
থুতনি ধরে দেবে আদর
আনব তুলে পরের বছর
ঠররা দিয়ে মাংস খাব
খড়ের গাদায় বেহেস্ত যাব
বেহেড মাতাল বরেরা সব
নালির গবভে মহানুভব

সত্তর বছর আগে ইমলিতলায়। বালক তিনজন বাঁদিক থেকে মলয়ের দাদা সমীর, মাঝখানে মলয় ও মেজদা অরুণ। দুপাশে তরুণীরা বাঁদিক থেকে মলয়ের বড়দি সাবিত্রী ও ছোড়দি ধরিত্রী। মহিলারা বাঁদিক থেকে মলয়ের মেজজেঠিমা, বড়জেঠিমা ও মলয়ের মা

 

কাঁচা বাঁশ কাটার গন্ধ আমার বেশ মোহক লাগে, মৃত্যু-উৎসবের রেশ পাই। অবশ্য কাঁচা বাঁশের তৈরি শবখাটের গন্ধ, ইমলিতলা ছাড়ার পর, আর পাইনি। তারপর যেখানেই গেছি, রেডিমেড শবখাট, তা সে বাঁশের হোক বা কাঠের। মৃত্যুর গন্ধ যে আনন্দদায়ক সে-কথা প্রায় ভুলে গেছি। কাঁচা বাঁশের গন্ধের সঙ্গে হারিয়ে গেছে সে-আনন্দ। মৃত্যু ব্যাপারটা এখন হয়ে গেছে ফিউনারাল। যেমন-যেমন ইউরোপ ইমলিতলায় ঢুকেছে, কাঁচা বাঁশ কাটার গন্ধ উধাও হয়ে গেছে।

কপিলের দাদু ইমলিতলার মহীরুহ। ওনার মৃত্যু বলে কথা। যে-সে উৎসব তো আর হতে পারে না। কাঁচা বাঁশ কেটে শবখাট তৈরি হওয়ার পর বাঁশের ওপরের অংশটা সযত্নে রেখে দেওয়া হয়েছিল। দুসাধ-মুসহর গৃহবধুরা সেই কাঁচা বাঁশের খোলে শুয়োরের মাংসে পেঁয়াজ রসুন লঙ্কা নুন হলুদ তিলের তেল মাখিয়ে পোড়াবার ব্যবস্থা করে ফেলেছিলেন। শ্মশানঘাট থেকে ফিরে এসে সবাই যাতে ঠররা আর শুয়োরের মাংস খেয়ে যৌথ উৎসবে অংশ নিতে পারে। আমরা তিন ভাই শ্মশান পর্যন্ত যাইনি বটে তবে ভোজের সময়ে পৌঁছে গিয়েছিলুম। রামচন্দর বুঢ়উ-এর শব যখন কাঁধে তুলে সবাই গুলফি ঘাটের দিকে রওনা দিল তখন আমরা তিন ভাই তার সঙ্গে রওনা দিলুম। কপিলের বাবা ব্যান্ডপার্টিকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। সে-ব্যান্ডপার্টিও আরেক নিম্নবর্গ পাড়ার, তারাও মৃত্যু উৎসবে অংশ নিতে এসেছে। ঠররা আর শুয়োর মাংস খেয়ে বাড়ি ফিরবে।

শবযাত্রীরা সকলেই যে-যার ভাল পোশাকটি পরে বেরিয়েছে। কাঁধে গামছা। ন্যাড়া হয়ে গঙ্গায় স্নান করে ফিরবে। কপিলের বাবা, যিনি মুখাগ্নি করবেন, আমরা গোপালবাবু বলে ডাকতুম। উনি বাবু ডাকটা শুনতে চাইতেন কেননা চাপরাসির কাজ করতেন। শবযাত্রায় নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সরকারি চাপরাসির পোশাকটি যত্ন করে পরে নিয়েছিলেন, হাফপ্যান্টে গোঁজা খাকি শার্ট আর লাল বর্ডার দেওয়া টুপি। পায়ে মোজার বদলে জড়ানো খাকি ফেট্টি। বুট জুতো।

শবযাত্রা এগোল আমাদের ঘিঞ্জি গলি দিয়ে। কপিলের বাবা কোঁচড়ে খই, প্যাঁড়া, তামার পয়সা আর ফুল নিয়ে শবের পেছন-পেছন। কপিলের কাকা শবখাটের চারকোণে বাঁধা ধুনুচিতে ধুনো হুমাদ আর লোবান দিতে দিতে চলেছে। ব্যান্ডপার্টি শবযাত্রীদের সামনে-সামনে। আমরা তিন ভাইও সামনে সামনে। যারা সামনে তারা ব্যান্ডের তালে নাচতে-নাচতে চলেছে। আমরা তিন ভাইও পাড়ার অন্যান্য ছেলেদের সঙ্গে নাচতে-নাচতে চলেছি। দাদা আর মেজদা এর আগেও বহু শবযাত্রার সঙ্গী হয়েছে। আমি রামচন্দর বুঢ়উ-এর শবযাত্রার সঙ্গী হয়ে প্রথমবার নাচতে বেরিয়েছিলুম। সেটাই সম্ভবত কাঁচা বাঁশের সঙ্গে মৃত্যুর সম্পর্ক গড়ে ওঠার কারণ। কপিলের বাবা যতবার তামার পয়সা, প্যাঁড়া আর খই ছুড়ছেন, সবার সঙ্গে আমরাও কাড়াকাড়ি করে লুটছি।

শবদাহ করে ফিরে আসার সময়েও ব্যান্ডপার্টি ফিরেছে শবযাত্রীদের সঙ্গে, বাজাতে বাজাতে। কপিলের বাবা কাকা ভাইরা ফিরেছে ন্যাড়া মাথায় নাচতে নাচতে। সকলের মাথায় টিকি। তারপর সন্ধ্যা নামলে ঠররা, তাড়ি আর মাংস। মহিলারাও নিজেদের মহিলামহলে একইভাবে মাতোয়ারা।

ধুনো হুমাদ আর লোবানের ধোঁয়া ভেদ করে আমার নাকে আসছে কাঁচা বাঁশ কাটা গন্ধ। যে-গন্ধ আবার পাব ছয় দশক পর নেদারল্যান্ডসের জঙ্গলে। বিভিন্ন রকমের সবুজের সমারোহে।

বাঙালি সাহিত্যিকরা মারা গেলে দেখি গোমড়া-মুখে শোকসভার আয়োজন হয়। তাঁদের মৃত্যুতে কাঁচা বাঁশ কাটার গন্ধ পাই না। অনেকে কাঁদো-কাঁদো কণ্ঠে বলেন অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। অথচ সাহিত্যিক তো যা লেখার লিখে ফেলেছেন, আর সে-কারণেই সবাই একত্রিত হয়েছেন। উৎসবের বদলে অমন শোকের বাতাবরণকে বেশ বেমানান মনে হয় আমার। আমি মারা গেলে যাতে অমন নাটক না হয় তাই আমি ‘চলো গুল্ফিঘাট’ শিরোনামে একটা কবিতা লিখেছিলুম। কবিতাটা এখানে তুলে দিলুম:

কেউ মরলেই তার শব ঘিরে মৃত্যু উৎসব ছিল ইমলিতলায়
বয়ঃসন্ধির পর দেহের ভেতরে অহরহ উৎসব চলে তাই
তারা মারা গেলে কান্নাকাটি চাপড়ানি নয় বিলাপ কেবল
শিশুর জন্য করো বাচ্চা-বুতরুর জন্য কাঁদো যত পারো

শবখাটে চারকোণে মাটির ধুনুচি বেঁধে গুলফি ঘাটের সমসানে
ঢোলচি ঢোলকসহ সানাই বাজিয়ে নেচে আর গেয়ে পাড়ার ছোঁড়ারা
কুড়োতুম ছুড়ে-ফেলা তামার পয়সা প্যাঁড়া আম-লিচু আকন্দের মালা
ফিরে এসে বিকেলে রোয়াকে বসে বুড়ো বুড়ি কিশোর যুবক
তাড়ি বা ঠররা আর তার সাথে শুয়োরের পোড়া পিঠ-পেট
খেতে খেতে ঠহাকা-মাখানো হাসি মাথায় গামছা বেঁধে গান

আমি মরবার পর ছেরাদ্দ বা শোকসভা নয়; ইমলিতলার ঢঙে
উৎসব করার কথা ছেলেকে-মেয়েকে বলা আছে: মদ-মাংস খাও
স্বজন বান্ধব জ্ঞাতি সবাইকে বলো অংশ নিতে সমসানের পথে
বেহেড হুল্লোড় করে নাচতে গাইতে যেও ফিরো নেচে গেয়ে
মেটালিকা পাঙ্ক রক হিপ হপ সুমন শাকিরা ক্যাকটাস
বিটলস এলভিস কিশোর কুমার ও ইয়ুডলিঙে আরডি বর্মন

 

কুলসুম আপা: ফেরোমনের সুবাস

 

ঝুঁকে, একটা পমফ্রেটের পেট টিপে, বললুম, নরম হয়ে গেছে মনে হচ্ছে।

আমাকে দেখে কি তা-ই মনে হচ্ছে, নরম হতে পারে কি? মেছুনিটি বলেছিল। মেছুনিটির কাছে নদী-পুকুরের মাছ ছিল আর ছিল পমফ্রেট। পমফ্রেটের পাশে ছাড়ানো কুচো চিংড়ি দুশো গ্রাম করে ভাগ করা আর তার পাশে ঝিনুক, অজস্র কালচে ঝিনুক। বাঁদিকে একটা চুবড়িতে কাঁকড়া, সমুদ্রের কাঁকড়া, তবে বিশেষ বড় মাপের নয়।

আগেকার হিন্দি ফিল্মে, যখন তা আইটেম সঙে আক্রান্ত হয়নি, এই কোলি সম্প্রদায়ের মেছুনিদের যৌথ নাচ থাকত। এই মেছুনিটি হয়ত নাচতে জানে না, কিন্তু এর অঙ্গে যে নাচের গন্ধ লুকিয়ে আছে তা ওর মোনালিসা হাসিতে ঝিলিক দিচ্ছে। দাঁতগুলোও পরিষ্কার, এখনও জর্দা বা পান খাওয়া শুরু করেনি, ওর পাশের মোটা কালো বউটির মতন।

আমি স্তম্ভিত, থ। ঠিক কী বলব ভেবে পেলুম না। কিনতে এসেছি মাছ, সান্টাক্রুজ মাছের বাজারে, মুম্বাইতে পোস্টিঙের পর, প্রথমবার। ঘটনাটা প্রায় পঁচিশ বছর আগের।

মেছুনিটি যুবতী, খোঁপায় ফুলের মালা, চাঁপা ফুলের গন্ধ বেরোচ্ছে ফুলগুলো থেকে। গায়ের রং ময়লা হলেও পাশের বউটির মতো কালো নয়। মুখের ছিরিছাঁদ মন্দ নয়। ছিপছিপে। কিন্তু ওই ফুলের গন্ধ ছাপিয়ে আরেকটি তীব্র গন্ধ পাচ্ছি। মাছের গন্ধ নয়। মাছের বাজারে অঢেল মাছের সমারোহ। তা সত্ত্বেও আরেকটা উগ্র গন্ধ, যা এই মেছুনিটির দিকে আমাকে টেনে এনে থাকবে। এ এমনই এক গন্ধ যা একযোগে আকর্ষক আবার অসহ্য। জীবজগতে এই গন্ধের টানে পুরুষ হাতি, সিংহ, গন্ডার কয়েক কিলোমিটার হেঁটে চলে যায় প্রেয়সীর খোঁজে, যার গন্ধ তার নাকে পৌঁছেছে। জীবজগতে এইটিই যদি প্রেমের ডাক হতে পারে, মানুষেরও অমন গন্ধের ডাকে সাড়া দিতে ক্ষতি কি?

যুবতী মেছুনি সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে। ভাবলুম কেটে পড়ি। মেছুনিটির পাশে মোটামতন যে প্রৌঢ়া বসেছিলেন, দেখে মনে হল এই যুবতী মেছুনির শাশুড়ি। তিনি বললেন, দেখোই না নিয়ে, তুমি তো ওর কাছ থেকে মাছ কেনোনি কখনও। তারপর জানতে চাইলেন, নতুন এসেছ সান্টাক্রুজে? না ভিলে পার্লে থেকে কেনো?

বাঙালি ফিল্মস্টারদের বাড়িতে ভিলে পার্লের বাজার থেকে মাছ যায়। দাম নিশ্চয় বেশি হবে, তাই ওমুখো হইনি।

যুবতীর চোখ থেকে চোখ সরাবার সুযোগ পেয়ে গেলুম। প্রৌঢ়াকে উত্তর না দিয়ে, বললুম, এত বড় মাছ, আমি একটাই কিনব? কত দাম?

যুবতী মেছুনি বলল, জোড়া ভেঙে দিতে চাইছ কেন? তোমার মন ভাল নয়। জোড়া বেঁধে-বেঁধে সাজানো হয়েছে আর তুমি ওদের আলাদা করে দিতে চাইছ?

মিউনিসিপাল মার্কেটের সান্ধ্যবাজারে মাছ কিনতে এসেছি, অফিস থেকে ফিরে। সিমেন্টের উঁচু প্ল্যাটফর্মে পুরুষরা বড় বড় সুরমই ইত্যাদি সামুদ্রিক মাছ বিক্রি করছে বলে তাদের দিকে যাইনি। মাটিতে বসে থাকা মেছুনিদের দিকটাতেই এসেছিলুম। আর এই মেছুনি ফ্লার্ট করার মাধ্যমে বিক্রিটাকে মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজি করে ফেলেছে।

আমিও কি ফ্লার্ট করব? বেশ মুশকিল। প্রথম দিন। শেষে পালোয়ান পুরুষগুলো তেড়ে আসতে পারে। পাশে শাশুড়ি বা অমনই কেউ বসে আর এই মেছুনিটি ইশারা-ইঙ্গিতে কিনতে বাধ্য করে দিতে চাইছে।

অন্যটাও টিপে দেখতে পারো, বলল মেছুনিটি, যেটাই টেপো না কেন, মোটেই নরম পাবে না; একেবারে তাজা। তারপর যোগ করল, আমার মতন।

কত শহরে মাছের বাজারে গিয়ে মাছ কিনেছি, সান্ধ্যবাজারেও কিনেছি, কিন্তু এরকম সাজগোজ-করা, খোঁপায় সুগন্ধী ফুলের মালা, রঙিন ছাপা শাড়িতে, তাও বোধহয় স্নান করেই এসে থাকবে, মেছুনি দেখিনি। কোনও মেছুনিকে ফ্লার্ট করতেও দেখিনি।

বিব্রত লাগছিল বেশ। কী করা যায়!

পাশের প্রৌঢ়ার দিকে এগিয়েছিলুম, যুবতী বউটি বলল, এখানে টিপলে আবার ওদিকেও টিপতে যাচ্ছ কেন? একটা টিপে কি বুঝতে পারো না? ওরটা টিপলে বুঝতে পারবে যে ওরটা আমার চেয়ে অনেক নরম। প্রৌঢ়া সম্পর্কে এভাবে কথা বলছে যখন, তখন ওর আত্মীয়াই হবে, নয়তো ঝগড়া আরম্ভ করে দিত মোটা কাঁচাপাকা-চুল প্রৌঢ়া।

যুবতী মেছুনির দিকে ফিরলুম। মেয়েটি বলল, টিপে যখন দেখতে চাইছ দুটোই দেখতে পারো টিপে। দেখতে পাচ্ছ না তোমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে, আমার মতন?

কিনে নিলুম পমফ্রেট দুটো। কেটে ঝোলায় দিয়ে মেছুনিটি বলল, যখনই আসবে আমার কাছেই আসবে। সকালে এসো না, সন্ধ্যাবেলাতেই এসো; সকালে আমার এত কাজ যে স্নান করার চুল বাঁধার সময় হয় না।

এই মেছুনিটির বাঁধা খদ্দের হয়ে গেলুম। আমার এক ভায়রাভাই থাকেন সান্টাক্রুজে। তাঁর সঙ্গে মাছ কেনা নিয়ে কথাবার্তায় টের পেলুম যে যুবতী মেছুনিটি অ-মারাঠি ক্রেতা পেলেই তার সঙ্গে ফ্লার্ট করে। পাশে ওর শাশুড়িই বসে থাকে আর প্ল্যাটফর্মের ওপরে বসে ওর বর আর দেওর মারাঠি খদ্দেরদের জন্যে সামুদ্রিক মাছ বিক্রি করে।

বাঁধা খদ্দের হওয়ার পর আমি মেছুনিটিকে কমপ্লিমেন্ট দিতুম ওর রূপের বা ওর সাজগোজের প্রশংসা করে। আবার যখন মুম্বাইতে দ্বিতীয়বার পোস্টিং হয়েছিল, তখন আর খুঁজে পাইনি মেছুনিটিকে। আফশোস থেকে গিয়েছিল যে সাহস করে আমি মেছুনিটির নামটা ওর কাছ থেকে জেনে নিইনি। বিশেষ করে মেছুনিটিকে দেখতেই গিয়েছিলুম, মাছ কিনতে নয়, কেননা অবসরের পর সান্টাক্রুজের মতন জায়গায় থাকার খরচ অঢেল। বর্তমানে ওই অঞ্চলে একটা ফ্ল্যাটের দাম কয়েক কোটি টাকা।

প্রথমদিন মেছুনিটির যে শারীরিক গন্ধে আকৃষ্ট হয়েছিলুম সে-গন্ধটি আমার পরিচিত। বাল্যের স্মৃতি জড়িয়ে আছে ওই গন্ধের সঙ্গে। গন্ধটি কুলসুম আপার কাছাকাছি হওয়ার দরুন প্রথম পেয়েছিলুম, আর তা গিঁথে গেছে আমার স্মৃতিতে। এ-এমনই গন্ধ যে চাঁপাফুলের গন্ধ দিয়েও চাপা পড়ে না, মাছের গন্ধেও চাপা পড়ে না।

বাল্যের ইমলিতলা পাড়ার শিয়া পরিবারের মেয়ে ছিলেন কুলসুম আপা। কুলসুম আপা ছিলেন কালো মোটা গালফোলা। ওঁর ফোলা-ফোলা গালে আমার ঠোঁট ঠেকাবার ইচ্ছে হত। আসলে ওঁর মা ছিলেন কালো। নাজিমের আব্বুর অন্য বিবি ফর্সা ছিল। কুলসুম আপা আমার আর মেজদার বাল্যবন্ধু নাজিমের দিদি। ওয়াজিদ আলি শাহকে নিয়ে ইংরেজরা যখন কলকাতার মেটিয়াবুরুজে চলে গিয়েছিল তার আগে থেকেই লখনউ-ফয়জাবাদ হতে বহু শিয়া পরিবার, যারা নবাবদের দরবারি ছিল, বা হারেমের বিবিদের সন্তান ছিল, বা নবাবদের নানা ফ্যাঁকড়ার বংশধর ছিল, তারা ছিটকে চলে গিয়েছিল বিভিন্ন শহরে-গ্রামে। কুলসুম আপারা ছিলেন আসফ-উদ-দৌলার ভিন্ন একটি শাখার সন্তান-সন্ততি। আঠারো শতকের শেষদিকে যখন ওঁরা পাটনায় চলে আসেন তখন নিশ্চয়ই ওঁদের অবস্থা ভাল ছিল। ওঁদের বাড়িটা দেখে তাই মনে হত। যদিও আসফ-উদ-দৌলা ফয়জাবাদ থেকে লখনউতে রাজধানী সরিয়ে নেওয়ার পর অত্যধিক নবাবির কারণে ফতুর হয়ে গিয়েছিলেন। এতই ফতুর যে ইংরেজ রেসিডেন্টদের সঙ্গে ষড় করে ফয়জাবাদে তাঁর মা বহু বেগম উন্মাতুজ্জোহা বানো-র বাড়িতে ডাকাতি করে টাকা জোগাড় করতেন। সেই ডাকাতিতে অংশ নিতেন তাঁর অমাত্য। শেষবার তিনি নিজেই ডাকাতি করতে গিয়েছিলেন। ওয়ারেন হেস্টিংসের সায় ছিল তাতে।

লখনউয়ের নবাবরা দোল খেলতেন। আসফ-উদ-দৌলা দোল খেলার জন্য পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ করেছিলেন প্রতি বছর। আঠারো শতকের পাঁচ লাখ টাকা বোধহয় এখনকার পঞ্চাশ লাখ বা তার বেশি। ইমলিতলা পাড়ায় যে দোল খেলা হত তাতে স্বাভাবিকভাবেই অংশ নিত কুলসুম আপার বাড়ির লোকেরা, মহিলারাও। অমন সাংস্কৃতিক পরিবেশের কথা আর ভাবা যায় না; শিয়াদের মধ্যেও আর সে আগ্রহ নেই, এতই সাম্প্রদায়িক ভাগাভাগি হয়ে গেছে সংবিধান-উত্তর ভারতীয় সমাজে। এখন তো কোনও বাচ্চা ভুল করেও যদি রং দিয়ে ফ্যালে তো দাঙ্গা বেধে যাওয়ার সম্ভাবনা।

আমার শৈশবে কুলসুম আপাদের চুনসুরকির বাড়ি খন্ডহরের চেহারা নিয়ে ফেলেছিল। ফ্যাকাশে চুনসুরকির ধ্বংসাবশেষ। ওঁদের বাড়িতে ছিলেন দুই প্রৌঢ় ভাইয়ের একজনের দুটি এবং অন্যজনের তিনটি বউ আর অগুনতি বাচ্চা। আর ছিলেন নাজিমের প্রায়-অন্ধ নানি, যাঁকে ওঁরা বলতেন বড়ি-বি, দেখাদেখি আমরাও। ওঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মেশার পরেই শিয়া আর সুন্নি মুসলমানরা যে আলাদা, তাদের নামাজ পড়ার মসজিদ যে আলাদা হয়, তা জানতে পারি। ইমলিতলা পাড়া ঘিরে আরও মুসলমান পরিবার ছিল যারা সবাই শিয়া হলেও কেবল কুলসুম আপারাই ছিলেন লখনবি-ফয়জাবাদি নবাবের বংশধর। এরকমটাই দাবি করতেন কুলসুম আপার বাবা। তিনি বলতেন যে তাঁর পূর্বপুরুষরা ইরান থেকে এসেছিলেন, সৌদি আরব, তুরস্ক বা আফগানিস্তান থেকে নয়। বাল্যে এসব ব্যাপার তেমন বুঝতুম না। পরে বুঝলুম, যখন আমরা দরিয়াপুরে সুন্নি মুসলমান পাড়ায় থাকতে চলে গেলুম।

দুশো বছরে এতই গরিব হয়ে গিয়েছিল কুলসুম আপাদের পরিবার যে ওঁরা সংসার চালাতেন হাঁস-মুরগির ডিম বেচে, ছাগলের বাচ্চা বেচে আর বিড়ি তৈরি করে। হাঁসগুলো পাড়ার সমস্ত নর্দমা চষে বেড়াত। ওদের হাঁসের ডিম পাওয়া যেত বাজারের চেয়ে সস্তায়। হঠাৎ মা বা জেঠিমার আদেশে ডিম কিনতে দৌড়োতুম ওঁদের বাড়ি। কুলসুম আপা পরে এসে পয়সা নিয়ে যেতেন। একবার কিনতে গিয়ে, ওঁদের ছাগলের পরপর তিনটে বাচ্চা বিয়োনো দেখে ফেলি আর বড়ি-বির তিরস্কারে তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছিলুম। আর সেবার ভেবেছিলুম যে জন্তু মানুষ ডিম সবই পেছন দিক থেকে জন্মায়। ভুলটা ভেঙে দেন কুলসুম আপা, পরে, আরেকবার যখন ওঁদের ছাগলের বাচ্চা হচ্ছিল আর বাড়িতে বড়ি-বি বা বড়রা ছিলেন না; বিড়ি বিলি করতে গিয়ে থাকবেন। ঘটনাটা ‘রাবণের চোখ’ কবিতায় ধরে রেখেছি আমি:

শৈশবের কথা। সদ্যপ্রসূত কালো ছাগলের গা থেকে
রক্তক্বাথ পুঁছে দিতে-দিতে বলেছিল কুলসুম আপা
‘এ-ভাবেই প্রাণ আসে পৃথিবীতে। আমরাও এসেছি
একই ভাবে।’ হাঁস-মুর্গির ঘরে নিয়ে গিয়ে আপা
আমার বাঁ-হাতখানা নিজের তপ্ত তুরুপে চেপে
বলেছিল, ‘মানুষ জন্মায় এই অসীম দুয়ার খুলে ।’

রাবণের দশ জোড়া চোখে আমি ও-দরোজা
আতঙ্কিত রুদ্ধশ্বাসে দ্রুত খুলে বন্ধ করে দিই।

নাজিম আমার পাড়াতুতো বন্ধু ছিল। ও পড়ত মখতবে, মাথায় কুলসুম আপার কুরুশে-বোনা টুপি পরে কাঁখে একটা ছেঁড়া মাদুর নিয়ে মখতবে পড়তে যেত, শিয়াদের মখতবে। ওদের বাড়ির সামনে যে এঁদো গলিটা, সেখানে একটা শিয়া মসজিদ আছে। লুকোচুরি খেলার সময়ে মসজিদে গিয়ে লুকোলেও বকতেন না ইমামসাহেব, নামাজের সময় ছাড়া। নামাজ চলছে কিনা জানতে পারতুম মসজিদের বাইরে অজস্র জুতো দেখে। এখন তো হিন্দু ছেলেরা মসজিদের ভেতরটা কেমন হয় তা জানবারও সুযোগ পায় না।

কুলসুম আপা আর ওঁর আব্বু একটা গান প্রায়ই গাইতেন। এই গানটি শুনলেও আমার স্মৃতিতে ভেসে আসে কুলসুম আপার গন্ধ। আমার ছোটকাকা জানিয়েছিলেন যে গানটা, ভৈরবী ঠুমরি, কুন্দনলাল সায়গলের গাওয়া, রায়চাঁদ বড়ালের সুর দেওয়া, স্ট্রিট সিঙ্গার ফিল্মের, উনি দেখেছিলেন ফিল্মটা। পরে নাজিমের বাবার কাছ থেকেই জানতে পারি যে গানটা খোদ ওয়াজেদ আলি শাহ-এর লেখা, এবং ফারসিতে নয়, মূল গানটি অবধিতে লেখা:

বাবুল মোরা নৈহর ছুটো যায়
চার কাহার মিল, মোরি ডোলিয়া সজাবেঁ
মোরা অপনা বেগানা ছুটো যায়
বাবুল মোরা নৈহর ছুটো যায়
অঙ্গনা তো পর্বত ভয়ো অওর দেহরি ভয়ো বিদেস
জায়ে বাবুল ঘর আপনো ময় চলি পিয়া কে দেস
বাবুল মোরা নৈহর ছুটো যায়

অবধকে বিদায় জানাবার গান অথচ সেই গানে রয়েছে কুলসুম আপার গন্ধ। যখনই গানটা কাউকে গাইতে শুনেছি, ভেসে উঠেছে কুলসুম আপার কালো মোটা গালফোলা চেহারা আর ওই অসহ্য আকর্ষক গন্ধ। ওদের পরিবার শায়রির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল। কুলসুম আপার শায়রির প্রতি ভালবাসা এবং ওঁর কাছাকাছি যাওয়া নিয়ে আমার আরেকটা কবিতা আছে, ‘প্রথম প্রেম: ফয়েজ আহমদ ফয়েজ’ শিরোনামে:

গরমের ছুটিতে খালি গায়ে যখন নাজিমদের বাড়িতে

লুডো খেলতে যাই, কুলসুম আপা রাস্তা পেরোবার ঢঙে
বাঁদিক-ডানদিক তাকিয়ে দুহাতে দড়াম করে দরজা বন্ধ করে দ্যান
আমায় অন্ধকার স্যাঁতসেঁতে ঘরে এক হেঁচকায় টেনে নিয়ে।

আমি বলি, ‘ভোজপুরি বলবেন, আমি উর্দু বুঝতে পারি না।’
উনি বলেন, ‘তুই চোখ বোজ, তাহলেই বুঝতে পারবি,

এ তো খুব সহজ রে।’ আমি চোখ বুজে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি
একগাদা হাঁসমুর্গির মাঝে।

কুলসুম আপা বলেন, ‘মুঝে দে দে রসিলে হোঁঠ, মাসুমানা

পেশানি, হঁসি আঁখেঁ কে ম্যায় একবার ফির রঙ্গিনিয়োঁ মেঁ
ঘর্খ হো জাউঁ…’

আমি বলি, ‘ধ্যাৎ, কী করছেন কী, আমার লজ্জা করে।’
উনি ওনার কালো মোটা ঠোঁটে বলতে থাকেন, ‘মেরি হস্তিকো

তেরি ইক নজর আগোশ মেঁ লে লে হমেশা কে লিয়ে
ইস দাম মেঁ মহফুজ হো জাউঁ জিয়া-এ-হুস্ন সে জুম্মত-এ-দুনিয়া মেঁ
না ফির জাউঁ…’

আমি বলি, ‘আঃ, ছাড়ুন না, এরকম করছেন কেন আপা?’

উনি বলেন, ‘গুজিশতাঁ হসরতোঁ কে দাগ মেরে দিল সে
ধুল যায়েঁ…’

আমি বলি, ‘না না না…’
আপা ওনার ঘুমন্ত কন্ঠস্বরে, ‘ম্যায় আনে ওয়ালে গম কি

ফিকর সে আজাদ হো জাউঁ মেরে মাজি ও মুস্তকবিল সরাসর
মাভ হো যায়েঁ ওয়হ ইক নজর, ইক জাভেদানি সি
নজর দে দে।’

আমি বললুম, ‘রোজ রোজ এরকম করেন কেন?’
উনি বললেন, ‘তবে যে তুই বলছিলি উর্দু বুঝতে পারিস না।’

এখন আমি মুম্বাইতে যে বিল্ডিঙে থাকি তার লিফ্ট দিয়ে নামার সময়ে একদিন সকালবেলায় এক তরুণীর পারফিউমে আকৃষ্ট হলুম। পারফিউম সত্ত্বেও তার গা থেকে কুলসুম আপার সেই বিশেষ গন্ধটা নাকে এসে লাগল।

—নাইস পারফিউম, আমি বললুম।
—ইয়েস আঙ্কল, ফেরোমোন বেসড, গোইং ফর অ্যান ইনটারভিউ।
—বেস্ট অফ লাক, বলে তরুণীটিকে বিদায় জানিয়ে, মনে রেখেছিলুম, ফেরোমোন বেসড পারফিউমের কথা।

মুম্বাইয়ের সবচেয়ে বড় মল, যেখানে সাতটি সিনেমা হল আছে আর আছে পৃথিবীর প্রায় সব ব্র্যান্ডের দোকান, পারফিউমের দোকানে গিয়ে খোঁজ করে জানতে পারলুম যে ফেরোমোন তেল, ফেরোমোন রসায়ন থেকে তৈরি পারফিউম ‘প্যাশান কপুলিন কনসেনট্রেট’, ‘সেন্ট অব ইরস’ ইত্যাদি পাওয়া যায় পুরুষদের আকর্ষণ করার জন্য। বিস্ময়কর লাগল। কুলসুম আপার গন্ধ, সান্টাক্রুজের মেছুনিটির গন্ধ, এখন শিশিতে বিক্রি হচ্ছে। ইনটারভিউ দিতে যাচ্ছে মেয়েটি ওই পারফিউম মেখে কেননা যাঁরা ইনটারভিউ নেবেন তাঁদের আকর্ষণ করাটাও জরুরি কৌশল।

 

সেন্টুদা: রাক্ষসীর সুরভি

 

তুই মুখ বন্ধ করে হাসা প্র্যাকটিস কর। দাদা বললেন সেন্টুদাকে। সেন্টুদার নাম অজয় হালদার, আমার পিসতুতো দাদা। পিসেমশায়ের বড় ছেলে। এতগুলো পিসতুতো ভাইবোন যে গুলিয়ে যায়। সেন্টুদার পর বিজয়, সঞ্জয়, ধনঞ্জয়, বাবলি, টাবলি, গীতা আর খুকু। পারিবারিক কিংবদন্তি গড়তে সেন্টুদার পরেই গীতা, যে কিনা বরের ভাইপোর সঙ্গে পালিয়ে গিয়ে তখনকার দিনে লিভটুগেদার ফ্যামিলির পত্তন করেছিল, ঠাকুমা-দিদিমার ভূমিকা পালন করে নিমতলা হয়ে পগার পার। নিমতলায় বসে দুই অপত্নীক-বিপত্নীক বুড়ো বর কেঁদেছিল গলা জড়াজড়ি করে।

—হ্যাঁ, আপনি প্লিজ মুখ বন্ধ রাখবেন, আপনার দাঁত যে পোকায় খাওয়া তা তো পাত্রী আর পাত্রীর বাড়ির লোকেরা জেনে ফেলেছেন। কিন্তু মুখ খুললেই কেলেঙ্কারি, আপনার মুখ থেকে পুষে-রাখা রাক্ষসী বেরিয়ে পড়বে, আর ও-রাক্ষসীর গায়ে যা গন্ধ, মহাভারতের আসল রাক্ষসীরাও নাকে কাপড় চাপা দিয়ে পালাবে। কথাগুলো বললেন সেন্টুদার বাবা মিলন চক্রবর্তী।

অজয় হালদারের বাবা মিলন চক্রবর্তী। মিলনবাবুর আদিবাড়ি বরিশাল, ওঁর কথার ‘স’রা চলে যায় ‘ষ’-এর দিকে, ‘র’ চলে যায় ‘ড়’-এর দিকে। সেন্টুদারা কলকাতার আদিনিবাসী, ওঁর মুখে ‘শ’ আর ‘ষ’ দুটিই ‘স’, ‘খ’ চলে যায় ‘ক’-এর দিকে, ‘ও’ চলে যায় ‘উ’-এর দিকে।

দাদা সেন্টুদাকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বললেন, মনে থাকে যেন, যে লেখক বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় তোর শ্বশুরের আত্মীয়; উনিও বিয়েতে আসবেন শুনলুম। সেন্টুদা জিজ্ঞেস করলেন, উনি আবার কে? তারপর লেখক শুনে আশ্বস্ত হলেন, ওঃ, তোদের মতন লেকালিকি!

সেন্টুদার নাম উচ্চারণ করলেই রাক্ষসীর সুরভি ছেঁকে ধরে। ওঁর সঙ্গে-সঙ্গে থাকত ওই রাক্ষসী, ওঁর মুখগহ্বরে। যত ওঁর ববস বেড়েছে তত বেড়েছে মুখের ভেতর রাক্ষসীর গতর।

সেন্টুদার বিয়ে হচ্ছে দ্বারভাঙ্গার জেলাশহর লাহেরিয়া-সরাইতে। আমার দাদা সমীর রায়চৌধুরী তখন ওই জেলার মৎস্যবিভাগের দণ্ডমুন্ডের কর্তা। এখনকার মধুবনী জেলা তখন দ্বারভাঙ্গার মহকুমা ছিল। মধুবনী জেলা নেপালের লাগোয়া। দাদার অফিসের কোনও আধিকারিকের জিপগাড়ি নেপাল-সীমান্তের কাছাকাছি তদারকির কাজে গেলে, সেন্টুদাও সঙ্গী হতেন, টুক করে নেপালে সেঁদিয়ে পড়ার উদ্দেশ্যে। টুক করে শব্দটার টুক ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। টুক করে রাক্ষসীর সন্ধানে উধাও হতেন সেন্টুদা।

সেন্টুদা যাচ্ছেন বিয়ে করতে। বিয়ে করার জন্য পাত্রী খোঁজা চলছিল বেশ কয়েক বছর যাবত, কেননা সেন্টুদা প্রায়ই বলতেন, ‘আমার ধাতুরস শেষ হয়ে আসছে; এরপর কেনই বা বিয়ে করব? শেষে বংশরক্ষার জন্য নিয়োগপ্রথার আশ্রয় নিতে হবে। তোদের মধ্যেই কাউকে নিয়োগ করব; অন্তত জানতে তো পারব যে বংশের মুখ উজ্জ্বল হাতেই পড়েছিল।’ নারীর গোপনাঙ্গকে উনি বলতেন বংশের মুখ।

আমরা বলতুম তোমাদের হালদার বংশে তো ষাট বছর বয়সেও বাবা হওয়ার লিখিত নথিপত্র আছে। আর তুমি তো সবে চল্লিশ পেরিয়েছ; তাছাড়া তিনি ছিলেন কলকাতার বনেদি লম্পট।

আরে ও বাঞ্চোতটাই তো আমাদের ডুবিয়ে দিয়ে কেটে পড়েছে, নয়তো আজকের দিনে কোটি-টাকায় খেলতুম, বুঝলি। সেন্টুদার উক্তি। বনেদি শব্দটা শুনলেই সেন্টুদা চটে যেতেন। বলতেন, বনেদি আবার কী? আদি গোবিন্দপুরে হালদাররা ছিল টিকি নিয়ে, তারপর টিকির জোরে চাষি-টাষিদের বোকা বানিয়ে জমিজিরেত করে কালীঘাটের সেবায়েত হয়ে গেল। ইংরেজরা আসতেই টিকি লোপাট, টাকা শুরু। আর টাকা মানেই বনেদি, বনেদি মানেই মাগিবাজি, মাল-খাওয়া, পায়রা ওড়ানো, জুড়িগাড়ি, বুঝলি? সোনাগাছির কোনও ইতিহাস-টিতিহাস আছে? থাকলে দেখবি সেখানেও আমাদের ফ্যামিলিই প্রথম সেবায়েত।

বাঙালিজীবনে টিকির আগমন আর অন্তর্ধান নিয়ে কোনও গবেষণা-টবেষণা আছে নাকি, তোরা তো লেকালিকি করিস, এটা নিয়ে লেক না। করলে দেখতিস যে যবে থেকে বামুনরা খোলাখুলি মাগিবাজি শুরু করলে তবে থেকে টিকির অবসান হতে লাগল। টিকির বংশগৌরব একরকম আবার টাকার বংশগৌরব আরেকরকম। মাথায় টিকি নিয়ে লুকিয়ে যাকে-তাকে চুমু খাওয়া যেত, ইয়ে করা যেত। সকলের সামনে দিয়ে কোঁচা ঝুলিয়ে তো আর কোঁচা খোলার আসরে নরম-গরমে সাষ্টাঙ্গ-ক্যারদানি চলে না। ব্যস টিকিখানা ঘ্যাঁচ-গিলোটিনে গেল আর বউবাজারি বউ ধরার দৌড়ে ভেঙে পড়ল ব্যাসটিলের দেয়াল। তারপর আর দেখে কে! ফ্যালো রস, টেপো বেল।

কলকাতার শুরু থেকে ওঁরা কলকাতায়। সেই তখন থেকে ওঁদের মুখের ভেতর রাক্ষসীরা বাসা বেঁধেছে। কুড়িতে পৌঁছবার সময়-নাগাদই দাঁত কালো, পোকায়-খাওয়া। চল্লিশে পোঁছে ফোকলামি শুরু।

ওঁদের বিশাল বাড়ি ছিল আহিরিটোলায়। সেন্টুদার প্রজন্মে এসে, শরিকি খেয়োখেয়ি আর বহুবিবাহ আর গুচ্ছের বাচ্চার দৌলতে সেই বিশাল বাড়ি টুকরো-টুকরো হয়ে গোলকধাঁধার চেহারা নিয়ে ফেলেছিল। বেখাপ্পা ভাগাভাগির ফলে সেই বাড়ির দালানপথগুলো কোনও একজন হালদারের নামে নামাঙ্কিত হয়ে অমুক লেন-তমুক লেন হয়ে গিয়েছিল, সম্ভবত চিঠিপত্র প্রাপ্তির সুবিধার জন্য। এক-আধটা গলির, যদি তাকে গলি বলা যায়, মাথার ওপর আংশিক ছাদ ছিল, মারোয়াড়ি কমরেড-প্রেমিকদের নেকনজরে না পড়া পর্যন্ত। বাড়ির বাইরে বেরোবার জন্য অনেক শরিক গলির দিকের দেওয়াল কেটে দরজা বসিয়েছেন, কিংবা যেদিকে বেরোবার পথ বন্ধ হয়ে গেছে, সেদিকের দরজা উপড়ে এনে গলির দিকে বসিয়েছেন। কারও বাড়ির দরজা আর্চ-দেওয়া পেল্লাই সেকেলে, আবার কারও বাড়ির ছফুটিয়া একেলে।

সেন্টুদাদের বাড়ির দরজা ছিল সেকেলে, এত ভারি যে ভোরবেলা খোলার পর বন্ধ হত একবারই, রাতে, সবাই ফিরলে। যে ফিরত সে দরজায় লাথি মেরে জানিয়ে দিত যে বাড়িতে ঢুকেছে। প্রতিদিন লাথি খেয়ে সেকেলে ভারি দরজাও কাহিল হয়ে পড়েছিল। অনেক সময়ে খোলা থেকে যেত, কেননা কে ফিরেছে আর কে ফেরেনি তার জবাবদিহি নেওয়ার কেউ ছিল না। বাড়ি থেকে চুরি যাওয়ার মতন কিছু ছিলও না বলে বন্ধ করাটা, বনেদিয়ানা গিয়ে হাঘরেপনায় এসে মুখ থুবড়ে পড়ার কারণে, ক্রমশ ফালতু হয়ে গিয়েছিল। রাতে রাতগ্যাঁজামি কিংবা রাতখোলোশা করে কোনও সদস্যেরই দরজা বন্ধ করার কথা মনে থাকত না।

শরিকদের দেড়-দুঘরের বাসস্থানগুলোকে বাসিন্দারা নিজেরাই বাড়ি বলে মনে করত না। সেন্টুদাদের ছিল নিচের তলায় একটা ঘর, ঘুটঘুটে অন্ধকার, যেখানে রান্নাবান্না চলত। সামনে দিকে চৌবাচ্চা আর চৌবাচ্চার পাশে পায়খানা। সদর দিয়ে ঢুকতেই রান্নাঘরটা সামনে; পথচলতি লোকজন দেখতে পেত না তেমন ওই অন্ধকারের জন্য। রান্নাঘরে জানলা ছিল না। তিনদিকে অন্য শরিকদের দেওয়াল দিয়ে বন্ধ। কান পাতলে সে সব শরিকদের সাংসারিক কথাবার্তা, কুচুটে উক্তিসহ, দিব্বি শোনা যেত, আর শুনে অন্য শরিকদের কাছে এর-ওর হাঁড়ির কিংবা শোওয়ার ঘরের খবর পোঁছে দেওয়া যেত। রান্নাঘরে তেলচিটে একটা হলদেটে বালব জ্বলত একশো ওয়াটের। রান্নাঘরের ওপরের শরিকদের দাপাদাপিতে ছাদটা পড়ে যেতে পারে এই আশঙ্কায় কয়েকটা শালখুঁটির ঠেকনো দেওয়া ছিল, যাতে ভেঙে না পড়ে; শালখুঁটিগুলোয় পাতা লাগিয়ে সাজালে জঙ্গলের চেহারা নিতে পার ঘরটা। রান্নাঘরের ওপরের ঘরটা অন্য কোনও শরিকের; তার প্রবেশপথ আলাদা। সেন্টুদারা সিঁড়ি দিয়ে উঠে যে ঘরটায় যেতেন, শোওয়ার ঘর, সেটা অন্য শরিকের ঘরের ওপরে। কয়েকশো বছরের পুরনো বাড়িতে শরিকদের অমনই হিজিবিজি অবস্থা। যারা সুযোগ পেয়েছে তারাই দরজায় তালা ঝুলিয়ে কেটে পড়েছে। পিসেমশায় যতদিন বেঁচে ছিলেন, সেন্টুদারা কোথাও যেতে চাননি। সোনাগাছি তো অন্য কোথাও নেই, তাই। আর বাড়ির পাশেই সোনাগাছি, আসতে-যেতে পড়ে রাধারানির বাড়ি, চারুমতীর বাড়ি, সুখময়ীর বাড়ি, আনন্দময়ীর বাড়ি, ক্ষ্যামাঙ্করীর বাড়ি। তখনকার সোনাগছি ছিল অমন মাসিদের হোলসেলের ব্যবসা, এখনকার মাসিদের মতন রিটেল ট্রেড নয়।

দরজা দিয়ে ঢুকে বাঁদিকে ওপরে যাওয়ার সিঁড়ি। শরিকি ঘর ভাগাভাগির পর ওপরের ঘরে যাওয়ার জন্য রেলিংহীন সিঁড়িটা পরে বানানো হয়েছে, ধাপগুলো উঁচুনিচু, ইটের দাঁত বেরোনো, ওপরে ঋতু অনুযায়ী আকাশ। কলকাতার আকাশ তখনও ঋতুর নির্দেশ মেনে শরৎরাতের তারা বা গ্রীষ্মসকালের সূর্য দেখার সুযোগ দিত সেন্টুদাদের। সেন্টুদা বলতেন, শালা আকাশটাও জবরদখল হয়ে গেছে, ভোরে-ভোরে যে দুটো জবাকুসুম-জবাকুসুম আওড়াব তারও উপায় নেই। সিঁড়ির তলায় পায়খানা। পায়খানায় ঢুকতেও বেঢপ সিঁড়ি, পরে বানানো হয়েছে বলে, যার ওপর শ্যাওলা জমে-জমে সবুজ, যে-কারণে কলকাতার একেবারে মাঝখানে হাগতে বসেও গ্রামীণ বাদার সোঁদা গন্ধ পাওয়া যেত। রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে দরজার অবস্থা এমন কাহিল যে ছিটকিনি বা খিল খসে গেছে। পায়খানায় গেলে মগটা বাইরে সিঁড়ির ওপরে রাখতে হত যাতে বোঝা যায় ভেতরে কেউ আছে। বাথরুম ছিল না। পেচ্ছাপ পেলে পুরুষ সদস্যরা বিকে পাল অ্যাভেনিউতে গিয়ে কাজ সারত, পায়খানায় ঢোকার হ্যাঙ্গাম এড়াতে, তার কারণ পায়খানায় ঢোকার মুখেই স্নান করার জলের চৌবাচ্চা, যার চারপাশটা স্নান করে, কাপড় কেচে, বাসন মেজে এত পেছলা যে, পায়খানায় ঢুকতে হলে, যদি নিয়মিত অনুশীলন না থাকে, ভারসাম্য বজায় রেখে পা ফেলা কঠিন। একই কারণে, চৌবাচ্চা থেকে কাঁসার ঘটি ডুবিয়ে-ডুবিয়ে স্নান করা বেশ কঠিন। রপ্ত না থাকলেই কুপোকাৎ।

আট ছেলে-মেয়ে নিয়ে পিসিমা-পিসেমশায় ওপরের ছোট্ট ঘরটায় জীবন কাটিয়ে দিতে পেরেছিলেন। ওই একটিমাত্র ঘরেই সবকিছু। ঘুমোনো, অতিথি আপ্যায়ন, ঠাকুরদেবতা, আড্ডা এবং সন্তানোৎপাদন। ঘরের অর্ধেকটা জুড়ে বেশ উঁচু মেহগিনি কাঠের সেকেলে পালঙ্ক, যাতে দুজনের বেশি শোয়া ছিল অসম্ভব। সেন্টুদা বলতেন, খাটখানা টিকির যুগ থেকে চলে আসছে, বুঝলি, খাটটা যদি নিজের আত্মজীবনী লেখে তো কত বনেদি কেলেঙ্কারি যে ফাঁস হবে তার ইয়ত্তা নেই; আমি শালা এই খাটের ইতিহাসে যাচ্ছি না বাপু, ইতিহাস করার বয়সে পৌঁছোবার আগেই কাট মারব এখান থেকে।

ঘরের বাকি অর্ধেকটায় একটুখানি ফাঁকা জায়গা ছেড়ে দেওয়াল ঘেঁষে আলমারি, বাক্স-তোরঙ্গ, আলনা। উঁচু খাট বলে খাটের তলাতেও শোওয়ার ব্যবস্থা। মেঝের ওপর শোওয়ার দরুন খাটের তলাটা ঝকঝকে-তকতকে। দিনের বেলা ওইটুকু ঘরে গাদাগাদি এড়াতে ভাইবোনেরা যতটা পারা যায় বাড়ির বাইরে সময় কাটাত। সকালে জলখাবার খেয়েই সবাই ইদিক-উদিক হাওয়া। আবার দুপুরের খাওয়া সেরে ইদিক-উদিক হাওয়া। সেসময়ে আড্ডা দেওয়ার জন্য আহিরিটোলার বহু অ-হালদার বাড়িতেই ছিল একটি অবাধ-আশ্রমের ঘর। আড্ডা মারতে যাওয়ার পোশাকের মধ্যে ভাইরা অনেক সময়ে খালি গায়ে বোনেদের শায়া পরেই চলে যেত। ভাইরা স্নান করতে যেত আহিরিটোলা গঙ্গার ঘাটে। বোনরা সেই ফাঁকে চৌবাচ্চায় ঘটি ডুবিয়ে স্নান সেরে ফেলত। আড্ডা-ফেরত রাতের খাওয়া-দাওয়া সেরে যে-যার বাঁধা জায়গায় ঘুম।

শীতের মাস খানেক আর বর্ষা ছাড়া ভাইবোনেরা ছাদে শুতে চলে যেত। ঘরে শুতেন সেন্টুদার মা, মাদুরে, বালিশহীন। বালিশ রাখার জায়গা না থাকায় সকলেই বিনা বালিশে শুতে অভ্যস্ত ছিল। ছাদে শরিকানার দেওয়াল না থাকার দরুন ছাদটা ছিল বিশাল। এক শরিক অবশ্য অন্য শরিকের ছাদের এলাকায়, মোটামুটি অচিহ্ণিত হলেও, বড় একটা যেতেন না। বেশিরভাগ পরিবারে সদস্যদের সংখ্যার বাড়বাড়ন্তির ফলে ছাদ ভরে যেত রাতের বেলায়, একেবারে ফুটপাতের মতন গড়াগ্গড়। শরিকদের মধ্যে যাদের পারিবারিক অবনিবনা ছিল না, তাদের ছেলে-মেয়েরা সদর দিয়ে সেসব বাড়িতে যাওয়ার বদলে ছাদ দিয়ে চলে যেত। ফলে উঠতি ছোকরা-ছুকরিদের শর্ট-টার্ম প্রেম ঘটে যেত। এমনকী অনেক সময়ে অমুকের স্বামীর সঙ্গে তমুকের স্ত্রীর সম্পর্ক নিয়ে চেঁচামেচিও ঘটে যেত। সেন্টুদা এই পরিবেশ থেকে পালাতেন। পালিয়ে চলে আসতেন পাটনায় বড়জ্যাঠার বাড়িতে বা দরিয়াপুরে আমাদের বাড়িতে বা সবজিবাগে দিদিদের বাড়িতে বা উত্তরপাড়ার খন্ডহরে, যেখানে ঠাকুমা বারো-ঘর তিন সিঁড়ির বাড়ি একাই আগলাতেন। দাদা চাকরি পেয়ে যাওয়ার পর দাদার আস্তানায় পৌঁছে যেতেন, এক-কাপড়ে। বিয়ের আগে পর্যন্ত উনি দাদার শার্ট-প্যান্ট পরে কাজ চালিয়েছেন।

সঞ্জয় ছাড়া কেউই স্কুলের প্রাথমিক শিক্ষা পেরোবার আগ্রহ দেখায়নি। শিক্ষা বলতে আহিরিটোলায় টোটো। ফলে বাড়িতে বই বা পত্রিকার বালাই ছিল না, সংবাদপত্রেরও নয়। সংবাদ সম্পর্কেও কারও কোনও আগ্রহ ছিল না। সেন্টুদা জীবনে কখনও কোনও সংবাদপত্র পড়েননি। স্বাধীনতা, দেশভাগ, বাস্তুহারা, রাজনৈতিক পালাবদল, বামপন্থা ইত্যাদি কোনও ব্যাপারেই তাঁর জ্ঞানগম্যি ছিল না; যেটুকু জানতেন তা লোকমুখে শোনা। আলোচনা করলেও বলতেন, আরে ছাড় না ওসব তো চলতেই থাকে। তার চেয়ে লাইফকে ঘাঁটাঘাঁটি নিয়ে গপ্পো কর দিকিনি। লাইফ ঘাঁটাঘাঁটি অর্থে প্রধানত নারীদেহ নিয়ে আলোচনা। ওঁর ধারণা ছিল যে খাজুরাহোতে যে আদলের নারীমূর্তি আছে, পাতলা কোমর, ডবকা বুক আর ভারি পাছার মেয়েমানুষ, সারা ভারতে গিজগিজ করত এককালে। বিদেশিরা আসার ফলে রক্তের দোষে ভারতীয় মেয়েমানুষরা আদল পালটে ফেলেছে। আর অমন পাতলা কোমর ভারি পাছা আর ডবকা মাই তিনটেই একসঙ্গে কোনও মহিলার কাছে নেই। একটা থাকে তো অন্য দুটো থাকে না। বড় জ্যাঠা পাটনা মিউজিয়ামে ‘কিপার অব পেইনটিংস অ্যান্ড স্কাল্পচার’ ছিলেন। মিউজিয়ামে গিয়েও সেন্টুদা হাঁ-করে তাকিয়ে বসে থাকতেন পাথরের অমন মূর্তিগুলোর দিকে। একবার বড়জ্যাঠার কাছে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন কোনও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর চুকলিতে। বড়জ্যাঠা বুঝিয়েছিলেন যে ওসব কল্পনা দিয়ে তৈরি; তুইও ইচ্ছে করলে স্বপ্ন দেখার সময়ে অমন মেয়েমানুষ তৈরি করে নিতে পারিস। মাসখানেক পরে সেন্টুদার প্রতিক্রিয়া ছিল, ওরা কেউ আসেই না স্বপ্নে। দাদাকে বলেছিলেন, স্বপ্নে আসে বেগম পারা, কুলদীপ নায়ার, রেহানা, নিম্মি, শ্যামা, কাননদেবী, ভারতী দেবী, চন্দ্রাবতী, সন্ধ্যারানি— তাদের কারও বডিই খাজুরাহোর মূর্তিদের মতন নয়। মঞ্জু দে যদি আসত তাহলেও না হয় কথা ছিল।

বয়ঃসন্ধিতে পৌঁছোতেই পিসেমশায় সেন্টুদাকে মনোহরদাস কাটরার এক ব্যবসাদারের দোকানে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন পিসেমশায়। কাটরার মালিক দোকানে রাখতেন না কোনও বিক্রির মাল। তাঁর দোকানের সাইনবোর্ডে লেখা থাকত কী কী বিক্রি করেন আর শেষে যোগ করা থাকত ‘ইত্যাদি ইত্যাদি’। মালিকের ছিল কয়েকটা চাবির গোছা। কেউ কোনও কিছু কিনতে এলে চাবির গোছাটা সেন্টুদাকে দিয়ে মালিক বলতেন অমুক নম্বর গোডাউন থেকে মালটা নিয়ে আয়। দোকানটির কোনও গোডাউন ছিল না। চাবির গোছাটি নিয়ে হোলসেলারের কাছ থেকে কম দামে জিনিস কিনে বেশি দামে বেচে দেওয়া হত। একটিমাত্র দোকানে সব জিনিস পাওয়া যায় দেখে ক্রেতাদেরও সুবিধা হত। বাজারের নানা ধান্দাবাজি শিখে সেন্টুদা ঢুকে পড়লেন বাজারের গোলোকধাঁধায়। যারা বিহার, উড়িষ্যা, আসাম থেকে আসত তাদের সুযোগমতো আড়ালে ডেকে অর্ডার নিতেন আর নিজেই ব্যবসা করতেন। ধরা পড়ে গিয়ে চাকরি গেল বটে কিন্তু ঘাঁতঘোঁতের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সেন্টুদা নিজেকে সেলস রিপ্রেজেনটেটিভে পালটে ফেললেন। কলকাতা থেকে কিনে স্টক করতেন আমাদের উত্তরপাড়ার খন্ডহরে। সেখান থেকে সাপ্লাই দিতেন। মাঝে আয়নার ব্যবসা শুরু করলেন; আয়নার কাচে যেখানে-যেখানে ঢেউ খেলে গেছে বা কাচে বাবল, সেখানে-সেখানে ‘বেলজিয়ান গ্লাস’ বা ‘এক্সপোর্ট কোয়ালিটি’ লেখা সোনালি স্টিকার লাগিয়ে দিতেন। বেজির চুলের তুলিতে ছাপ মারিয়ে নিতেন ‘মেড ফ্রম স্কুইরল হেয়ার’। কিন্তু শেষপর্যন্ত সব কটাই যখন লাটে উঠে গেল তখন মামারবাড়িই হয়ে উঠল খাওয়া-পরা-থাকার আস্তানা।

আহিরিটোলা থেকে যাতায়াতের সময়ে সোনাগাছি দিয়ে শর্টকাট মারতে-মারতে সেন্টুদা সোনাগাছির সোহাগ কিনতে চলে যেতেন যখনই ইচ্ছা হত আর গ্যাঁটে কড়ি থাকত। একদিন কোনও সাবিত্রীরানি বা জ্ঞানদাবালার বাড়ির সিঁড়ি দিয়ে যখন পিসেমশায় অফিস-ফেরত ওপরে উঠছিলেন, তিনি দেখলেন সেন্টুদা দ্রুত তাঁর পাশ দিয়ে নেমে চলে গেল। সেন্টুদা সোজা বাড়ি ফিরে, সেলস রিপ্রেজেনটেটিভের টিনের সুটকেসখানা নিয়ে সেই যে আহিরিটোলা ছাড়লেন, তারপর ওমুখো হয়েছিলেন বহুকাল পরে, যখন গীতার ইলোপ করার খবর পেয়ে আহিরিটোলায় ধুন্ধুমার চলছে আর সবাই কী করা যায় তা নিয়ে চিন্তিত। সেন্টুদা কলকাতায় গিয়ে বোনকে তার দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে ঘরকন্না করার ব্যবস্থা করে দিলেন, আর বধূকে প্রেমিকগৃহে পৌঁছে দেওয়ার কাজটি বুঝিয়ে-সুজিয়ে করালেন প্রথম স্বামীকে দিয়ে।

সেন্টুদার নিজের বিয়েতে তাঁর বাবা-মা-ভাই-বোন কেউ যোগ দেননি। বাবা-মা আর এক ভাইয়ের মৃত্যু হয়ে গেছে। অন্যদের সম্পর্কে সেন্টুদার বিশেষ আগ্রহ ছিল না, যাতায়াত-মেলামেশা ছিল না। ওঁর মামার বাড়ির লোকেরাই ওঁর আত্মীয়, অন্তত বিয়ে হওয়া অব্দি। পাটনায় ইমলিতলায় বড়জ্যাঠার বাড়ি, দরিয়াপুরে আমাদের বাড়ি, সবজিবাগে দিদিদের বাড়ি আর দাদার যখন যেখানে পোস্টিং হত সেখানে, এইভাবে সারা বছর চালিয়ে দিতেন সেন্টুদা। অমন ঘোরাঘুরি না করে তিনি ঠিক করলেন যে কোথাও যদি শাঁসালো শ্বশুর ফাঁসানো যায় তাহলে ঘরজামাই হয়ে থেকে যাবেন। আর তা পেয়ে গেলেন দ্বারভাঙ্গায়।

শ্বশুরবাড়িতে যাতে তাঁর অতীত ফাঁস করে না দেওয়া হয় তাই উনি মামাদের-মামাতো ভাইদের এড়িয়ে চলতেন বিয়ের পর থেকে। পিসেমসায় দিশি মদ বা ধেনোকে বলতেন ধান্যেশ্বরী। অনেক টাকা রোজগার করলেও, ধেনো ছাড়া অন্য কোনও মদ খেতেন না। সেন্টুদার মতে টিকি থেকে টাকার দিকে যাওয়ার পথে তাঁদের পরিবারের কেউ একজন ধান্যেশ্বরীর ভক্ত হয়ে পড়ে। ব্যাস, তারপর থেকে ওটা উত্তরাধিকারসূত্রে পরের পর প্রজন্মে চলে এসেছে। হালদারবাড়ির মহিলারাও টিকি-পরবর্তী প্রজন্মে ধান্যেশ্বরীকে আরাধ্যা করে ফেলেছিলেন। সেকারণে মদ খাওয়া নিয়ে ট্যাবু ছিল না তাঁদের পরিবারে। তাঁদের পারিবারিক কিংবদন্তি অনুযায়ী অমুক বাড়ির রাঙাকাকিমা বা ফুলদিদা বোতলের ছিপি খুলে গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারতেন ধান্যেশ্বরীটি কোন চাল দিয়ে ‘তোয়ের’ হয়েছে— তা হাঁসকাটি, ঝিঙাশাল, বকুলফুল, ভাসামাণিক, লালঝুলুর, কনকচুর নাকি আটপৌরে। চালগুলো মায়ের এক-একটি রূপ, ধানের খোসা তাঁর পরিধান। ভাত হল শ্বেতাঙ্গিনী বিবস্ত্রা।

দ্বারভাঙ্গায়, দাদার বাড়িতে গিয়ে ঘাঁটি গাড়ার পরেই সেন্টুদার নামে ‘রাক্ষসীর গন্ধ’ লেবেলটা, ওঁর আয়নার সোনালি স্টিকারের মতনই, চেপে বসল। বাংলা ধেনো, মহুয়া, সোমরস, ঠররা, আরক ইত্যাদির প্রেমে পড়েননি সেন্টুদা। যদিও প্রতিদিন সন্ধ্যায় কোনও একটা না হলে তাঁর চলত না। দ্বারভাঙ্গায়, প্রেমে পড়লেন রাক্ষসীর। তার কারণ মধুবনি জেলার সংলগ্ন গ্রামগুলোয় তাঁর নিয়মিত যাতায়াত। আমরা ভাবতুম কোনও ব্যবসার ঘাঁতঘোঁতের জন্য তক্কেতক্কে আছেন। তা নয়। তিনি নিজেই বললেন একদিন যে তিনি যান রাক্ষসীর মোহে।

—রাক্ষসী? নেপালি মেয়েমানুষ?
—না রে। মহুয়ার ঠাকুরদা।

সংবাদ পেয়ে সেন্টুদার সঙ্গে রওনা দিলুম সীমান্তের গ্রামে। আমি ষাটের দশকে হিপিদের জমায়েতে কাঠমান্ডুতে থাকার সময়ে দিশি মদ ‘এলা’ আর ‘জাঁড়’ খেয়েছিলুম। সেন্টুদা নেশার এমন বর্ণনা দিলেন আর ওঁর গা থেকে যে-ধরনের সোঁদা-জংলা গন্ধ বের হওয়া আরম্ভ হয়েছিল, যে চোলাই করার পদ্ধতি না দেখে, আর না চেখে, থাকা গেল না। নেপালের গ্রামাঞ্চলে সে সময় চোলাই হত বাজরা থেকে তৈরি একরকমের দিশি মদ, কানট্রি লিকার, বা মুনশাইন লিকার, যার নেপালি নাম ‘রাকশি’। অক্টোবর-নভেম্বর নাগাদ ফসল তোলার সময়ে ‘রাকশি’ চোলাই করে সারা বছরের জন্য রেখে দিত যে যার পরিবারে। বাজরা সিদ্ধ করে ‘পা’ নামের একটা পাত্রে তিনদিনের জন্য ঝুলিয়ে রেখে পচানো হত। তারপর তাকে মাটির জালায় জল দিয়ে পচানো হত পনেরো দিন। তারপর ‘পা ঘায়া’ পাত্রে রেখে চোলাই করা হত। ফোঁটায়-ফোঁটায় চোলাই হওয়ার পর মদটা যে পাত্রতে রাখা হত তার নাম ‘পুজাই’। কেবল বাজরা থেকেই নয়, ‘রাকশি’ তৈরি হত গম, চাল, কিংবা ফলকে বাজরার সঙ্গে মিশিয়ে। ফলের মধ্যে জংলি তুঁতফলটাই বেশি মেশানো হত। মদের রং ভোদকা বা জিন-এর মতো পরিষ্কার। স্বাদ অনেকটা জাপানি মদ ‘সাকে’র মতন। গন্ধটা কিন্তু একটা বিশেষ ধরনের। যারা খেতে অভ্যস্ত তাদের গা থেকেও পাওয়া যায়। নেপালে মাওবাদী আন্দোলনজনিত পরিবর্তনের আগে ‘রাকশি’ খাওয়ার চল ছিল ধার্মিক আর সামাজিক অনুষ্ঠানে, মাটির গেলাসে বা ভাট্টি চুক্কড়ে। এখন বেআইনি হয়ে গেছে। অবশ্য বেআইনি হওয়ার ঠিক আগেই সেন্টুদা স্বর্গে বসে খাজুরাহোর মূর্তিদের কোলে বসিয়ে আদর করতে চলে গিয়েছিলেন, ফোকলা দাঁতে, পেল্লাই ভুঁড়ি নিয়ে, খালি গায়ে, ডোরাকাটা লুঙ্গি পরে।

রাক্ষসীতে আকৃষ্ট সেন্টুদা বেশ শাঁসালো শ্বশুর পেয়ে গেলেন দ্বারভাঙ্গায়। মেয়ে আর মেয়ের বাবার ব্যবসা দুই-ই সেন্টুদার পছন্দ। ঘি প্রস্তুতকারক জনৈক বাঙালি ব্যবসায়ী, বিজয় ব্যানার্জি, তাঁর বয়স্কা মেয়ের জন্য ঘরজামাই পাত্র খুঁজছিলেন। ঘিয়ের টিন সরবরাহ হত সারা দ্বারভাঙ্গায় এবং নেপাল সীমান্তের বাজারগুলোয়। বিয়ের জন্য সেন্টুদার বাড়ি থেকে আসার মতন কেউই ছিল না। কিন্তু পাত্রীপক্ষ চাইছিলেন যে সেন্টুদার বাড়ি থেকে বিয়ের দিন কেউ অন্তত আসুন। দাদার সঙ্গে আড্ডা দিতে আসতেন টাকমাথা যুবক সাহিত্যানুরাগী মিলন চক্রবর্তী। তাঁকে রাজি করানো গেল। তিনি সেন্টুদার বাবা সেজে যাবেন।

সেন্টুদাসহ আমরা বরযাত্রীরা সবাই যৎকিঞ্চিত রাক্ষসী পান করে নিয়েছিলুম যাতে বিহারি ঢঙে হইচই করে বিনা ইনহিবিশানে নাচতে-নাচতে যাওয়া যায়, ব্যান্ডের তালে তাল মিশিয়ে। মিলনবাবু যেহেতু পাত্রের বাবা তাই উনি একটু বেশিই রাক্ষসী-প্রেম করে ফেলেছিলেন। বিয়ের আসরে বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায় দাদাকে দেখে এগিয়ে এলেন সাহিত্যের নতুন খবরাখবরের জন্য। উনি জানতেন যে আমরা মদ খাই। আমাদের মুখ থেকে গন্ধ বেরোলেও নিজের প্রতিক্রিয়া জানতে দেননি। তারপর উনি পিসেমশায় অর্থাৎ মিলন চক্রবর্তীর সঙ্গে আলাপ করতে চাইলেন। মিলনবাবুর এত নেশা হয়ে গিয়েছিল যে তখন তাঁর মুখ দিয়ে বরিশালের ভাষায় বাংলা কথা নির্গত হচ্ছে। খাঁটি কলকাতার পাত্রের বাবার মুখে বরিশালের বাংলা! ধরা পড়ে যাওয়ায় দাদা ওঁকে অনুরোধ করলেন যে আপাতত পাত্রীর বাবা-মাকে ব্যাপারটা জানতে না দেওয়াই ভাল।

শ্বশুরের ব্যবসায় সেন্টুদা গ্যাঁট হয়ে বসার পর নিজেই শ্বশুরমশায়কে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তাঁর বাবা-মা গত হয়েছেন বহুদিন আগে আর বয়োজ্যেষ্ঠ বলতে দাদাই তাঁর অভিভাবক। কালক্রমে একেবারে বিহারি-মৈথিলি ঘিয়ের আড়তদারে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছিলেন সেন্টুদা। যারা নেপাল থেকে এসে ঘি নিয়ে যেত বা যারা বিক্রির জন্যে নেপালে যেত তারা সেন্টুদার জন্য কয়েক বোতল রাক্ষসী অবশ্যই নিয়ে আসত।

সেন্টুদা মারা গেছেন বছর দশেক আগে। ওঁর নামটা উচ্চারিত হলেই নাকে এসে লাগে রাক্ষসীর সোঁদা-জংলা সুবাস।


*ছবিগুলি অগ্নি রায়ের সৌজন্যে পাওয়া

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4710 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...