গুজরাত গণহত্যার বিচার হয়নি: সতীশচন্দ্র ভার্মার কথা

প্রদীপ দত্ত

 


২০০৪ সালের জুন মাসে আমেদাবাদের কাছে ইশরাত জাহান হত্যাকাণ্ডের পর গুজরাত হাইকোর্টের নির্দেশে তা খতিয়ে দেখতে সতীশ ভার্মাকে নিয়ে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (সিট) গঠিত হয়। তিনি বুঝেছিলেন যে মুম্বাইয়ের তরুণী এবং অন্য আরও তিনজনকে যে গুলি চালিয়ে মারা হয়েছে, তা ছিল পূর্বপরিকল্পিত বিচারবহির্ভূত হত্যা। তাঁর নেতৃত্বে সিটের সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে হাইকোর্ট ডিসেম্বর মাসে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়। তাঁর তদন্তেই জানা যায় ওই মিথ্যা এনকাউন্টারের পুলিশ দলে ছিলেন উঁচু পদের চারজন পুলিশ অফিসার। ইসরাত জাহান হত্যা মামলার তদন্তকারী দলে (সিট) থাকা, পরে কোর্টের নির্দেশে সিবিআই তদন্তকারী দলে থাকার পর থেকেই তিনি গুজরাত সরকারের বিষনজরে পড়েন

 

পূর্ব-প্রসঙ্গ: রজনীশ রাইয়ের কথা

পোরবন্দরের সমাজবিরোধীদের দমন করে সতীশের সুখ্যাতি হয়েছিল। দাঙ্গার পর গুজরাত যখন ঝিমোচ্ছে সেই সময় সতীশকে আমেদাবাদের এনে সবচেয়ে হিংসাদীর্ণ অঞ্চল নারোদা পাটিয়া, নারোদা গাম এবং গুলবার্গ সোসাইটি অঞ্চলের দায়িত্ব দেওয়া হয়। গুজরাত হিংসা থামাতে পঞ্জাবের বিখ্যাত আইপিএস কেপিএস গিলকে গুজরাতে নিয়ে আসা হলে তিনিই এই স্থানান্তরের নির্দেশ দিয়েছিলেন।

২০০২ সালের ১ মার্চ দুটি মুসলমান যুবককে হত্যা করা এবং দাঙ্গার জন্য বিজেপি এমএলএ শঙ্কর চৌধরিকে গ্রেফতার করে দুদিন পুলিশের জিম্মায় রাখার আদেশ দিয়েছিলেন সতীশ।

২০০৪ সালের জুন মাসে আমেদাবাদের কাছে ইশরাত জাহান হত্যাকাণ্ডের পর গুজরাত হাইকোর্টের নির্দেশে তা খতিয়ে দেখতে তাঁকে নিয়ে স্পেশাল ইনভেস্টিগেশন টিম (সিট) গঠিত হয়। সতীশ বুঝলেন যে মুম্বাইয়ের তরুণী এবং অন্য আরও তিনজনকে যে গুলি চালিয়ে মারা হয়েছে, তা ছিল পূর্বপরিকল্পিত বিচারবহির্ভূত হত্যা। হাইকোর্টে হলফনামা দিয়ে জানালেন, কথিত জঙ্গি হিসাবে ইসরাত জাহানকে বিচারবহির্ভূত হত্যা করা হলেও বাস্তবে সে জঙ্গি ছিল না। ২০১১ সালের নভেম্বরে সতীশ ফের হলফনামা দিয়ে জানান অনেক সাক্ষীকে জোর করে সাক্ষ্য বদলাতে বাধ্য করা হয়েছে। তাঁর নেতৃত্বে সিটের সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে হাইকোর্ট ডিসেম্বর মাসে সিবিআই তদন্তের নির্দেশ দেয়। নির্দেশে সিবিআই যেন সতীশের সাহায্য নেয় বলে হাইকোর্ট মন্তব্য করেছিল।

তাঁর তদন্তেই জানা যায় ওই মিথ্যা এনকাউন্টারের পুলিশ দলে ছিলেন উঁচু পদের চারজন পুলিশ অফিসার। সিবিআই জানিয়েছিল, উনিশ বছরের ইসরাত জাহান, তাঁর বন্ধু জাভেদ শেখ এবং দুই পাকিস্তানি নাগরিককে আহমেদাবাদের শহরতলিতে সাজানো এনকাউন্টার করে খুন করা হয়। সিবিআই ওই পুলিশ অফিসারদের অভিযুক্ত করে গুজরাত সরকারের কাছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুমতির আবেদন করেছিল। কিন্তু ‘বৃহত্তর স্বার্থে’ সেই অনুমতি দেওয়া হয়নি। তাই ২০১০ সালে চার্জশিটে জাল এনকাউন্টার বলার পরও বিচার শুরু হয়নি। পরে দিল্লির বিশেষ সিবিআই আদালতে সেই মামলা চালু হয়।

ইসরাত জাহান হত্যা মামলার তদন্তকারী দলে (সিট) থাকা, পরে কোর্টের নির্দেশে সিবিআই তদন্তকারী দলে থাকার পর থেকেই তিনি গুজরাত সরকারের বিষনজরে পড়েন। রাজ্য সরকার সতীশের পদোন্নতি আটকে রাখে। অজুহাত ছিল, তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

২০১২ সালে তিনি যখন ইসরাত জাহানের মামলা তদন্ত করছেন, সেই সময়ে পোরবন্দরের এসপি থাকাকালীন (১৯৯৬) পুলিশি এনকাউন্টারে জাসু গগন শিয়ালের মৃত্যুর জন্য সতীশের বিরুদ্ধে গুজরাত হাইকোর্ট ফের মামলা চালু করার আদেশ দেয়। এরপর সতীশকে গ্রেফতারের তোড়জোড় শুরু হলে, সুপ্রিম কোর্ট সেই তদন্ত চালু রেখে সতীশের গ্রেফতারে স্থগিতাদেশ দেয়। এরই মধ্যে, ২০১৩ সালের জুন মাসে সতীশ হাইকোর্টকে জানান যে, ইসরাত জাহান জাল এনকাউন্টারের সাক্ষ্য যে হার্ড ডিস্কে ছিল ফরেন্সিক ল্যাবরেটরি থেকে তিনি তা কব্জা করেছেন— এই অভিযোগে রাজ্য সরকার ভাদোদরার পুলিশ কমিশনার রাকেশ আস্থানা[1]-র নেতৃত্বে তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। তিনি জানান, ওই ল্যাবরেটরি হার্ড ডিস্কটি লুকিয়ে রেখেছে।

এরপর তাঁকে ফের জুনাগড়ের পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে স্থানান্তর করা হয়। এর আগে ২০০৫ সালে তাঁকে শাস্তিমূলক পোস্টিং দিয়ে জুনাগড় স্পেশাল রিজার্ভ পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে পাঠানো হয়েছিল। তিন মাসের মধ্যে গুজরাত সরকার তাঁকে জুনাগড় ট্রেনিং সেন্টারে যোগ দিতে কেন দেরি করেছেন সেই প্রশ্নে মেমো দেয়।

২০১৩ সালে সিট ও সিবিআই তদন্তের ভিত্তিতে ইসরাত জাহান মামলায় চারজন আইপিএসকে চার্জশিট দেওয়া হয়েছিল। ওই চারজন হলেন— পিপি পান্ডে, ডিজি বানজারা, জিএল সিঙ্ঘাল এবং রাজিন্দার কুমার।

 

পড়ুন, ইলেকশন এক্সপ্রেস ২০২৪

 

এরই মধ্যে আগে সতীশ আদালতে জানিয়েছিলেন যে, বিচার যাতে ব্যর্থ হয় তার জন্য প্রচেষ্টা চলছে। সেই লক্ষ্যে তদন্তে যে-সব সাক্ষ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল তা দুর্বল করা বা অস্বীকার করানোর তোড়জোড় চলছে। এই অবস্থায় তিনি চার্জশিটের সার্টিফায়েড কপি হাতে পাওয়ার আবেদন করেন। ২০১৬ সালে সিবিআই আদালত তাঁকে ইসরাত জাহান চার্জশিটের সার্টিফায়েড কপি দেওয়ার আবেদন মঞ্জুর করে। সরকার সিবিআই আদালতের ওই নির্দেশের বিরুদ্ধে গুজরাত হাইকোর্টে আবেদন করলে হাইকোর্ট সিবিআই আদালতের রায় বাতিল করে।

সরকার সতীশকে গুজরাতে রাখতে চায়নি। ২০১৪ সালে তাঁকে উত্তর-পূর্ব ভারতে ডেপুটেশনে পাঠানো হয়েছিল। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালে তিনি যখন নর্থ-ইস্ট ইলেকট্রিক পাওয়ার কর্পোরেশনের (নিপকো) চিফ ভিজিলেন্স অফিসার হিসাবে শিলঙে ছিলেন অরুণাচল প্রদেশের জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বড়সড় বেনিয়ম তাঁর নজরে এল। দেখলেন কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রমন্ত্রী কিরেন রিজিজু[2] এবং তাঁর আত্মীয়রাও সেই বেনিয়মে জড়িয়ে রয়েছেন। কাজেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক তাঁকে তিনবার অভিযুক্ত করে চার্জশিট দিল। ২০১৬-র মে এবং ২০১৮-র আগস্ট মাসে সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বলে দুবার, ২০১৮-র সেপ্টেম্বর মাসে ভিজিলেন্স রিপোর্ট দেরিতে পাঠিয়েছেন বলে একবার। তিনি সবকটি বিভাগীয় চার্জশিটই সেন্ট্রাল অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ট্রাইবুনালে (ক্যাট) চ্যালেঞ্জ করেন। এরপর সুপ্রিম কোর্টে এক আবেদনে সতীশ জানিয়েছিলেন, তিনি যখন নিপকোর ভিজিলেন্স ইনভেস্টিগেশনের ব্যাপারে আরও রিপোর্ট তৈরি করছেন সেই সময়, ২০১৬-র জুলাই মাসে, কেন্দ্রের ক্যাবিনেটের নিয়োগ কমিটি রাতারাতি তাঁকে নিপকো থেকে সরিয়ে সিআরপিএফে পাঠায়। উদ্দেশ্য, তিনি যেন আর দুর্নীতির রিপোর্ট পাঠাতে না পারেন। ওদিকে উত্তর-পূর্বে যেসব আইপিএসের পোস্টিং হয়েছে তাঁদের দুটি করে আবাস দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি আমেদাবাদের সরকারি বাড়ি থেকে পাততাড়ি গোটানোর নির্দেশ পেলেন।

২০১৪ সালে আদালতে এক আবেদনে তিনি জানান ইসরাত জাহান মামলায় তদন্তের দায়িত্বে থাকার পর থেকেই (২০১০ সাল) থেকে তাঁকে ক্রমাগত প্রতিকূল অবস্থায় ফেলা হচ্ছে। আইপিএস পিপি পান্ডে খুনের দায়ে দেড় বছর জেলে থাকার পর ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে জামিন পেয়ে যাঁর তদন্তের ফলে জেলে ছিলেন সেই সতীশ ভার্মার বিরুদ্ধেই তদন্তের দায়িত্ব পেলেন। পান্ডে ২০১৬ সালের এপ্রিলে গুজরাত পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল হন। ভারতে সেই প্রথম কোনও পুলিশ অফিসার খুনের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে জামিনে থাকা অবস্থায় এত বড় দায়িত্বশীল পদ পেয়েছিলেন।

২০১৫ সালে সতীশকে বাদ দিয়ে তাঁর ব্যাচের সবাই অ্যাডিশনাল ডিজিপি পদে প্রোমোশন পেলেন। ১৯৮৬ ব্যাচের এই আইপিএস যখন আইজি পদে রয়েছেন, ১৯৮৭ ব্যাচের জুনিয়ররা ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ পদ পেয়েছেন। ২০১৭-র অক্টোবরে তাঁকে পাঠানো হয় কোয়েম্বাটোরে সিআরপিএফের সেন্ট্রাল ট্রেনিং কলেজের প্রিন্সিপাল[3] হিসাবে।

এরপর চাকরি থেকে তাঁর অবসর নেওয়ার একমাস আগে, ২০২২ সালের ৩০ অগস্ট স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করে। সেই নির্দেশে মন্ত্রক অভিযোগ করে: তিনি ২০১৬ সালে সংবাদমাধ্যমে ইশরাত জাহান বিচারবহির্ভূত হত্যা নিয়ে কথা বলেছেন। তাছাড়া নিপকোর যে বিষয় তাঁর এক্তিয়ারে পড়ে না তা নিয়ে অননুমোদিতভাবে কথা বলেছেন। এই ধরনের বিবৃতি কার্যত কেন্দ্রীয় সরকার ও রাজ্য সরকারের ক্ষতিকর সমালোচনা। এবং তাতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হতে পারে। এমনকি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।

দিল্লি হাইকোর্ট গত বছর (২০২৩) কেন্দ্রের সতীশকে বরখাস্তের নির্দেশ বজায় রাখে। তার আগে তাঁকে বরখাস্ত করা নিয়ে কেন্দ্রের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলে তিনি সুপ্রিম কোর্টে বলেছিলেন, গুজরাত সরকার তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে। উদাহরণ হিসাবে তাঁর বিরুদ্ধে এক পুরনো মামলা নতুন করে জাগিয়ে তোলার কথা বলেছিলেন। সুরাহা পাননি।

 

References:

 

[পরের পর্ব- রাহুল শর্মার কথা]


[1] গুজরাত সরকারের এই প্রিয় আইপিএস পরে সিবিআইয়ের প্রধান পদে বসেছিলেন।
[2] পরে আইনমন্ত্রী হয়েছিলেন।
[3] আইজিপি-র সমতুল্য পদ।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4673 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

1 Trackback / Pingback

  1. গুজরাত গণহত্যার বিচার হয়নি: রাহুল শর্মার কথা – ৪ নম্বর প্ল্যাটফর্ম

আপনার মতামত...