সমাপন অপেক্ষা করতে শিখে গেছে

প্রবুদ্ধ ঘোষ

 

কাঁটা ঘুরছে। দু-ঘণ্টায় চল্লিশ মুভ দিতে হবে। সবে পঁয়ত্রিশ। আরও পাঁচটা মুভ বাকি। পাঁচ মিনিটও নেই। চট করে ঘড়ির দিকে তাকিয়েই ডানদিকের রুকটাকে মাঝখানে টেনে নিল সমাপন। ভাখোলভ চিন্তা করুক। ও যতক্ষণ ভাববে, ততক্ষণ লাভ। ওই সময়টুকুতে পরের প্ল্যানটা করে নেওয়া যাবে। করে নিচ্ছে। কিং-সাইডে ব্রেক করার চেষ্টা করবে একটা? মোটামুটি ক্লোজড পজিশন। কিন্তু, দুটো নাইট আছে। নাঃ, ও ডিফেন্ড করে দেবে ওদিকে। তাহলে? যাঃ শ্লা, বিশপের মুভ? টাইম প্রেশার বাড়াতে চাইছে। রুক ডাবল। ট্যাক। ঘড়ির বোতাম টিপে দিয়েছে। দু-তিন মিনিট ভাবুক। আবার পরের প্ল্যান। একটা সলিড ব্রেক থ্রু বের করতেই হবে। উঁহু উঁহু, তাড়াহুড়ো না। শান্ত হতে হবে আরও। খুব শান্ত। আর, অপেক্ষা। একটা ছোট্ট ভুল হয়ে গেছে পঁচিশ নম্বর মুভে। সেটার জন্যই এই চাপ। ইশ্‌, কেন যে বিশপের মুভটা ক্যালকুলেট না করে এড়িয়ে গেল। বিপদ ওটার জন্যই এসেছে। এই গেমের ওপরে অনেক কিছু নির্ভর করছে। কিন্তু, না। চাপ নেওয়া যাবে না। গতকাল রাতেই আলোদার সঙ্গে কথা হয়েছে। বলেছে একদম চাপ নিবি না। ক্লোজড পজিশন এলে চুপচাপ অপেক্ষা করবি, শুধু সামান্য অ্যাডভান্টেজ নিয়ে পিষতে থাকবি। ও ভাঙবেই। কিন্তু চাপ নেবে না বললেই হয়? আঃ, কেরিয়ারের অনেকটা ঝুলছে এখন সুতোর ডগায়। সামলে পা না ফেললেই পড়ে যাবে। সেই খাদ। আর দুটো মুভ। key-স্ক্যোয়ারটা কী করে পাওয়া যাবে?

***

 

—হ্যাঃ? দাবা খেলা শেখে? দাবায় শেখার কী আছে? গজ কোণাকুণি, নৌকো সোজাসুজি এমনিই তো দান চেলে দেওয়া যায়!

অপুর মেয়ে শিখছে শুনে শ্রীধর অপুকে বলছিল। অপু পাত্তা না দিলেও, সুকান্তকে বড্ড বিঁধেছে কথাটা। সময়টা যেন বাগে আসছে না সুকান্তর। চারদিকে কেমন ছানা-কাটা অবস্থা। কোনওকিছুই জুতমতো হচ্ছে না। দাবায় ওপেনিংয়ে কয়েকটা অপরিকল্পিত দানের পরে মিডলগেমের শুরুটা যেমন অগোছালো লাগে, তেমন অবস্থা। ডিসেম্বরের শুরু। ১৯৯২। সুকান্ত আধা-সরকারি অফিসের আর্দালি। দাবার নেশা অনেক পুরনো। তবে, বড় টুর্নামেন্টে খেলেনি কখনও। একবার বাগবাজারের ঈশানী ক্লাবের টুর্নামেন্টে নাম দিয়েছিল। তাও পলাশ আর সন্তু জোর করেছিল বলে। ছেলে জন্মে গেছে তখন, বছর আড়াই বয়েস। শনি-রোববার দুদিনের খেলা। রোববার সকালে একটা রাউন্ড খেলতে পারেনি। বাজার করে আর মায়ের ডাক্তার দেখিয়ে পৌঁছতে পৌঁছতে ১১টা বেজে গেছিল। সব মিলিয়ে সাড়ে পাঁচ পয়েন্ট করেছিল। কুড়িটা প্রাইজ। বাইশ নম্বর হয়েছিল। তবে কুশলদা প্রশংসা করেছিল। সত্যিকারের প্রশংসা। আরেকবার অফিসের অ্যানুয়াল প্রোগ্রামে খেলেছিল। দিব্যি জিতে গেল চার রাউন্ড। ফিফথ রাউন্ডে বড়বাবুর সঙ্গে খেলা। তার স্ত্রী, কন্যা এসেছে। আর্দালির কাছে হেরে যাওয়া কি ভাল দেখায়? সুকান্ত কয়েক দানের পরেই বুঝেছিল বড়বাবু বাস্তবে যতটা ধূর্ত, দাবায় ততটাই বোকা। অফিসে বাজপাখির চোখে যেমন নজরদারি করেন, দাবার ছকে সহজ ফাঁদ এড়াতে জানেন না। তবে, সুকান্তকে একশো কুড়ি টাকা দিয়েছিলেন। সেকেন্ড প্রাইজে ছোট হটপট নেওয়ার সময় মঞ্চে উঠেছিল সুকান্ত। পিঠ চাপড়ে বড়বাবু গলা তুলে বলেছিলেন, হি প্লেজ ভেরি ওয়েল। অলমোস্ট ডিফিটেড মি বাট আই স্টাডি চেস গেমস অ্যান্ড থিওরিজ। সুকান্ত, টুকটাক খেলো কিন্তু, ছেড়ো না। সুকান্ত জানত ওসব ঢপবাজি। বাল বই বড়ে। যাকগে, একশো কুড়ি টাকা কম না। ধর্মতলার ফুটপাথ থেকে একটা এন্ডগেমের বই কিনল। প্রগ্রেস পাবলিশার্স। নিমজোউইশের ‘মাই সিস্টেম’ পেয়ে চোখ চকচক করে উঠেছিল। ছেলেটা বায়না করেছিল রোল খাবে। বাচ্চুর দোকানে বেশি দাম নেয়। পাড়ার মোড়ে একটাই দোকান, রোয়াব বেশি। মানিকতলা হকার্স কর্নারের পাশের দোকানটা থেকে একটা এগ রোল আর একটা চিকেন রোল নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল সুকান্ত। রীতা সেলাইমেশিন থামিয়ে অবাক চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়েছিল। মজা লেগেছিল সুকান্তর। এই দ্যাকো, মিলটনের! হটপটটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ঘারিয়ে দেখে রীতা বলেছিল, এটাতে নিয়ে যেও অ্যাকোন থেকে। ইস্টিলের কৌটোয় ভেপসে যায়। সুকান্ত লজ্জা পেয়ে বলেছিল ছেলের ইস্কুলের টিফিন দিতে। নাঃ, ওর তো ছোট টিপিনবাস্কো। রাতের দিকে বইদুটো খুলেছিল সুকান্ত। দশটার পরে একটু থামে গলিটা। ঝুপসি গলি, টালির চালের বস্তি বাড়ি। একটা কাঠের দোকান, একটা গুলি-ভাঙার মেশিন, দুটো গেঞ্জিকল। আর, অনবরত শব্দ-ছেটানো গাড়ি মেন রোড দিয়ে যাচ্ছে। আটটা থেকে আশেপাশের ঘরগুলোয় হাঁকডাক শুরু হয়ে যায়। খেতে বসে। ঝগড়া করে। বাসন পড়ার আওয়াজ হয়। টাকাপয়সা নিয়ে খিস্তাখিস্তি। কলতলায় কার বাসন আগে ধোবে, তাই নিয়ে চিল্লামিল্লি। দশটার পরে একটু আলগা হয় আওয়াজ। খেতে বসার আগে আর খাওয়ার পরে সুকান্ত বইটা নিয়ে বসে। পকেট ডিকশনারি কিনে রেখেছে। কোনও শব্দ বুঝতে না পারলে চট করে দেখে নেয়। এন্ডগেমের বইটা বেশ তো! নৌকা, গজ, বোড়ে সবগুলোর ওপর আলাদা আলাদা এন্ডগেম। অনেকগুলো ডায়াগ্রাম! দারুণ! অ্যান্টেনায় ধরছিল না সবটা। তবু বইয়ের দানগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে বোর্ডে দান দিচ্ছিল সুকান্ত। আঃ, অজয়দার কাছে এন্ডগেমে হেরে যাই খালি। বল্লভপাড়ার রকে গত বিষ্যুদবার কী অপমানটাই না হতে হল! এন্ডগেমে পিছোচ্ছি বুঝেও ভেবে ভেবে খেলছিলুম, ঢ্যাঙা সুনীলটা শালা আওয়াজ দিল— মরা ছেলে কোলে কতক্ষণ বসে থাকবে? ওঠো ওঠো, বোর্ডে বসতে দাও আমায়। কান-মাথা ঝাঁ-ঝাঁ করছিল। পরের দিন খেলতে বসুক না, দেখিয়ে দেব খেলা! আরেঃ, এই ত্তো, নৌকা আর বোড়ের ওই এন্ডিংটা! হুবহু! অজয়দা ধরে ধরে বুঝিয়ে দিয়েছিল, কীভাবে ব্রিজ বানাতে হবে নৌকা দিয়ে। আবার এতগুলো পয়সা নষ্ট করলে? কী গো তুমি? ওঠো, ওঠো। পিন্টুর ঘরে এই শাড়িগুলো দিয়ে এসো। পাড় লাগানো হয়ে গেছে। রীতার থেকে লুকিয়ে রেখেছিল বইদুটো। জানত বকাবকি করবে। ছেলের মুখের দিকে তাকাল সুকান্ত। ইশ, রাজ্যের ঘুম চোখে। ওর মাথা আছে। টুকটাক চাল দেখিয়েছিল, ঠিক সেগুলো মনে রেখেছে। পরশু ইচ্ছে করে নৌকা খেতে দিয়েছিল, খেলেই মাত করে দেবে। উঁহুঁ, খায়নি, দেখে নিয়েছে ধাপ্পাটা। রীতাকে বোঝাবে কী করে, এই বই আসলে ওর জন্যেই। সবে সাড়ে পাঁচ। একটা টুর্নামেন্টে নিয়ে গেলে কেমন হয়? নাঃ, এন্ট্রি ফি ভালই। টাকাটা নষ্ট হলে গায়ে লাগবে। আচ্ছা, ওই বটভিনিক ইস্কুল না কী, ওখানে ভর্তি করে দেব? বল্লভপাড়ায় সেদিন অপু বলছিল ওর মেয়েকে দাবার ইস্কুলটায় দিয়েছে। সেই মিন্টো পার্কের পাশে। রীতা কি পারবে সেলাইয়ের চাপ কমিয়ে নিয়ে যেতে? আমার ফিরতে ফিরতে সন্ধে কাবার। শনি-রোববার করে নিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু রোববার দুপুর থেকে ভোম্বলের দোকানে বসতে হয়। সাড়ে আটটা বেজে যায়। অল্প হলেও টাকা দেয় ভোম্বল। দাবার খরচ আছে, ওই বটভিনিক ইস্কুলে কত নেয় জিজ্ঞেস করে নেবে অপুকে। বাড়িতে যতটা বোর্ড চেনানো যায়, চিনিয়ে তারপর দিয়েই দেবে ইস্কুলটায়। রীতাকে রাজি করিয়ে নেবে ঠিক। লটারির ফর্ম তুলতে হবে পরের মাসে। তুলেই একেবারে বলবে রীতাকে। শনি-রোববার বিকেলে নিয়ে যাবে, ফেরার সময় সুকান্ত নিয়ে আসবে। কিন্তু, রাত্তিরে দেখা ওই পজিশনটা ঘাই মারছে মাথায়। সিসিলিয়ানে মন্ত্রীর দিকে ক্যাসল করে তেড়ে আক্রমণ করে সাদা। কী নাম, কী নাম? ইংলিশ? ঠিক, ইংলিশ অ্যাটাক! মনে পড়েছে। অজয়দার সঙ্গে হেরেছিলাম কালো নিয়ে। কিন্তু একদান আগেই যদি বোড়েটা বাড়িয়ে দিই? বি-ফাইভ? এতটা টুকুটুকু করে কিংয়ের পোঙ্গা সামলানো পোষায় না। পাল্টা মার না দিলে…

—এই এদের জন্য সব নষ্ট হয়ে গেল। বাঙালিদের আর কিচ্ছু থাকবে না। বুঝলেন?
—আরে মহাই, যাবেন না ওদিকে। ওরা অ্যাটাক করে পালাচ্ছিল, দুটোকে ধরে ফেলেচে। দেখুন না কী করে। সত্যিই অস্তর হাতে না তুললে উপায় নেই আর।

সুকান্ত দেখল কালোর ঘোড়া ফাঁদে পড়ে যাচ্ছে। এ-পাড়াটা শান্ত বরাবর। সুঠাম বোড়েদের ভিড়, কুশলদা যেমন সাজিয়ে নেয়, তেমনই ওয়াকফ এস্টেট, পীরের মাজার, বুড়োবাবার মন্দির শ-তিনশো মিটার পরপর। কুশলদা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, দু’বার রাজ্য দাবা জিতেছে। বল্লভপাড়ার রকে খেলতে আসে মাঝে মাঝে। এমন বোড়ে সাজায়, প্রথমে ধরা যায় না, কিন্তু এন্ডগেমে শেষমেষ ঠিক জিতে যায়। ঘোড়া ফাঁদে পড়ে গেছে। কোথায় পালাবে? দিনমজুরি করতে এসেছিল। লুঙ্গিতে কাদার ছোপ। গেঞ্জি ছিঁড়ে গেছে। হাতের ওপর দিকটা ছেঁচে গিয়ে রক্ত পড়ছে। হাতে হাতে রড আর লাঠি উঠে এসেছে। অশ্রাব্য খিস্তি। দু-তিনজন উসখুস করছে; ওদের দোষ নেই ওরা গরিব, কাজ খুঁজতে এসেছে— এসব বলতে চাইছে। ভয়ে বলতে পারছে না। সুকান্ত ভিড়ের মধ্যে ঢোকে। কুশলদা একটা পদ্ধতি বুঝিয়েছিল খেলে খেলে। বুঝলে সুকান্ত, পিস ট্র্যাপ হয়ে যেতে দেখলে দুটো জিনিস ভাববে। কাউন্টার অ্যাটাকে অপোনেন্টের অন্য পিসকে ব্যাতিব্যস্ত করে তুলবে। তারপর সুযোগ পেলেই নিজের ট্র্যাপড পিসটা সেভ করে নেবে। আর, একান্তই পিসটা বেরোতে না পারলে অপোনেন্টের দু-একটা পন মেরে মরবে। সুকান্তর মাথার ভেতর কী এক গোঁ ভর করেছিল সেদিন। ভিড়ের ভেতর ধাক্কা দিয়ে ঢুকে চেঁচিয়ে-মেচিয়ে বেশ কটা বাক্য ছুড়ে দিয়েছিল। ভাঙা ভাঙা বাক্য। একটাই আস্ত বাক্য সপাটে ছুড়ে দিয়েছিল। রোখ আর ভয় মেশানো কাঁপা গলায়। দুজন গরিব মানুষকে মেরে তোরা বালের বীরত্ব মারাবি। বটতলা মন্দিরের সামনে থেকে ওদের সরিয়ে আগলে নিয়ে এসেছিল। তারপর খোকার দোকানে চা-বিস্কুট খাইয়ে লাল ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছিল হাত আর ঘাড়ের কাটা জায়গায়। লালাবাগানের ভেতর দিয়ে গিয়ে খালপাড় ধরে অনেকটা হেঁটে ওদের শুঁড়ির বাগানের রাস্তা পার করে দিয়েছিল। পাঁচ মিনিট হাঁটলেই উল্টোডাঙা স্টেশন। ওদের দেখে হঠাৎ বড়জেঠুর মুখ ভেসে উঠেছিল মনে। সুকান্তর জেঠু, তখন বেশ বয়স হয়ে গেছে, সুকান্তকে দাবা খেলা শিখিয়েছিল। ডাকাবুকো ছিল। আধফোকলা দাঁতে গল্প করত— ওদের সাইজ করে দিইছিলুম। ট্যাঁ-ফোঁ করতে পারেনি কো। কাঁচা বয়েসে যুগল ঘোষ, বসন্ত কুস্তিগীরের শাগরেদ হয়ে গোয়াবাগানে দল বেঁধে দুজন ঠেলাওয়ালাকে খুন করেছিল। সুকান্তকে দাবার দান শিখিয়ে বলেছিল, সুকু, দেশি পদ্ধতিতে খেলবি সবসময়। বল্লভপাড়ার রকে গিয়ে সুকান্ত জেনেছিল, ওই পদ্ধতি বাতিল অনেকদিন। সাদা শুরুতে নিজের যে-কোনও বোড়ে একঘর বা দু-ঘর বাড়াতে পারে, কিন্তু একটাই দান দিতে পারে। আঃ, মাঝে মাঝে এমন ভেরিয়েশন এসে যায় কোনও মারকাটারি চালের মধ্যে! থমথমে পরিবেশ। বস্তিতে চাপা উত্তেজনা। মাজারের সামনে পার্টির কিছু ছেলে হাতে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মাঝে মাঝে হাসিঠাট্টা করছে, চা-সিগারেট খেয়ে নিচ্ছে। সুকান্ত সন্ধেবেলা এন্ডগেমটা নিয়ে বসেছিল। সাদার নৌকা আর বোড়ে। কালোর ঘোড়া আর বোড়ে। প্রায় দেড়ঘণ্টা লাগল একটা যুৎসই পাল্টা দান বের করতে। রাশিয়ান দাবাড়ু লেভেনফিশ। কালো নিয়ে হেরে গেছিল। বিপক্ষে পল কেরেস। ব্বাপরে! সেই ১৯৪০ সালে খেলা। তবে, ওই একটা বাঁচার উপায় ছিল। ৬৩ নম্বর দানে কালোর বোড়েটা বাড়িয়ে কিস্তি, তারপর বোড়েটা খেতে দিয়ে, তারপর কালোর ঘোড়াটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এফ-ফাইভ আর এইচ-সিক্সে নিয়ে আসতে পারলেই সাদার বোড়ে ঘ্যাচাং! ড্র! বইতে ছিল না এটা। সুকান্ত খুঁজে পেল। ছেলেকে বোঝাতে বসল। ও কি বুঝবে এখন? বুঝবে, আরেকটু বয়স বাড়লে দাবার বুদ্ধি পাকলে নিশ্চয়ই বুঝবে। অপোনেন্ট যত মারাত্মক হোক না কেন, তাকে আটকে দেওয়া যায়।

***

 

কী ব্ল্যাঙ্ক চোখ নিয়ে বসে আছিস? একটা সামান্য কম্বিনেশন দেখতে পাস না? এমনভাবে খেলবি, অপোনেন্ট যেন মাথা তোলার সুযোগ না পায়। গুঁড়িয়ে দিবি। বি রুথলেস। দেয়ার ইজ নো স্পেস ফর কমপ্যাশন, ছেঁদো ইমোশন। কী? কমপ্যাশন মানে? নরম হবি না অপোনেন্টের প্রতি। ড্র করলি কেন ওই গেমে? অরিত্র তোর বন্ধু? ত্তো? ওসব দাবার বাইরে। দাবার বোর্ডে কোনও বন্ধু নেই। সব্বাই শত্রু। শুধু ওই আটটা পিস আর আটটা পন তোর বন্ধু। না, ওগুলোও বন্ধু না। ওরা অস্ত্র, ওদের ব্যবহার করে নিতে হবে। যে-কোনও সময়ে ওদেরও স্যাক করতে হবে। আরও ভাল পজিশন, বেটার অ্যাডভান্টেজের জন্য। ভাল দাবাড়ু হতে চাইলে দাবার বোর্ডে সবচেয়ে খতরনাক যোদ্ধা হতেই হবে। এই কম্বিনেশনটা দেখ। পাঁচ মুভের কম্বিনেশন। প্রথমে রুক স্যাক, তারপর কুইন, তারপর আবার রুক। বিশপ আর নাইট দিয়ে চেকমেট। পন দিয়ে এসকেপ রুট বন্ধ করা আছে। কুইন, রুক যে-কোনও প্লেয়ারের সবচেয়ে প্রিয়। কিন্তু কী নিস্পৃহভাবে খেতে দিয়ে দিচ্ছে। তা না হলে ওইরকম ব্রিলিয়ান্ট চেকমেট হত? চেকমেট হচ্ছে না। এ কী, এটা কোন ওপেনিং? একের পর এক পিস চলে যাচ্ছে। রেজাল্টে ঝাড়। রেটিং কুড়ি কমল। আবার তেত্রিশ কমল। ভুল পিস টাচ হয়ে যাচ্ছে। অপোনেন্টের মুখটা খুব চেনা। কী নাম? ওই কথাগুলো কে বলছিল? অনুজস্যার? কিন্তু গলাটা এরম মোটা কেন? কান্তিস্যারের চোখ অতীশ দাশগুপ্তর চোখে বদলে যাচ্ছে। অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি। চোখ বন্ধ করে কথা বলে। লেট হিম ফল। ওর হবে না নর্ম। না, হয়নি। আর সুযোগ নেই। হেরে যাওয়ার একটা গন্ধ আছে। অবশ হয়ে যায় মাথা, ঘুম পায়। শরীর ছেড়ে দেয়। এই গন্ধটা সব রাস্তা বন্ধ করে দেয়। আঃ। কী বিচ্ছিরি স্বপ্ন। মুখের ভেতরে জল কাটছে। এবার উঠে পড়তে হবে। আজকের ম্যাচটার ওপরে অনেক কিছু নির্ভর করছে। পুরোটা মনে পড়ছে না স্বপ্নটা। কোন কম্বিনেশন? ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। বন্ধু-শত্রু কীসব যেন বলছিল? ধুস, ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে কথাগুলো। যাক গে। আজকের ম্যাচটা না জিততে পারলে?

 

দুই.

—ওর দ্বারা আর যাই হোক, দাবাটা হবে না, বুঝলেন? খেলছে ঠিক আছে, তবে বেশি আশা রাখবেন না।

সমাপনের চোখ থেকে অঝোরে জল পড়ছে তখন। কিছুতেই সহজ কম্বিনেশন ধরতে পারছে না। অনুজস্যার বেশি বকাঝকা করতেন না। সপ্তাহে দুদিন স্পেশ্যাল ক্লাস নিতেন নিজে। মনোতোষ স্যার যাদেরকে ঝাড়াইবাছাই করে ওপরের ঘরে পাঠাতেন, তাদেরকে স্পেশ্যাল ক্লাস দিতেন। সমাপন বিশপ নাইটের কম্বিনেশন পারছিল না। বিনীত, দত্তাত্রেয় আর নাদিম অনেকক্ষণ করে দিয়েছে। দশটা প্রবলেম। মাত্র পাঁচটা পেরেছিল সমাপন। তাও দত্তাত্রেয় একটার হিন্ট দিয়েছিল দুটো বিগ বাবুল কার্ডের বিনিময়ে। মাইকেল বিভানের কার্ডটা দেওয়ার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু এই প্রবলেমটা না পারলে অনুজস্যার অন্নপ্রাশনের ভাত বের করে দিত। ওরা আটটা করে দিয়েছিল। ক্লাস শেষের পরে বাবাকে ডেকে অনুজস্যার ওইসব কথা বলার পরে দাবা খেলাই ছেড়ে দেবে ভেবেছিল সমাপন। রেটিং টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে মিড টার্ম দেওয়া হয়নি। এজ গ্রুপের সেকেন্ড প্রাইজ পেয়েছে তবে একজন রেটেডকেও হারাতে পারেনি। নাদিম একজনকে হারিয়েছিল, আরেকজনের সঙ্গে ড্র। সমাপন পারেনি। বাবার মুখটা কালো হয়ে গেছিল আরও। বাড়িতে ফিরে মাকেও কিচ্ছু বলেনি। কী একটা সামান্য কথায় মায়ের সঙ্গে ঝগড়া লেগে গেছিল। অনেকক্ষণ চলেছিল। দাবা খেলতে মাথা লাগে, তোমাদের সবাই মাথামোটা; দাবা দাবা করে লাফালেই হয় না, কত খরচা লাগে জানো?; ফালতু যা বোঝো না, তা নিয়ে…; এর থেকে দুটো বেশি পয়সা রোজগার করলে ভাল হত, এই বস্তির ঘরে থেকে বেশি কপচানি… শোনো…। হেরে যেতে ভয় পেত সমাপন। ঠিক ভয় না, কেমন যেন ছোট লাগত নিজেকে, খুব লজ্জা করত। সব গেমে জেতা যায় না। তবু, কোনও গেমে হেরে যাওয়ার আগে, যখন বুঝত হার বাঁচানো অসম্ভব, পজিশন শেষ হয়ে গেছে, সেই মুহূর্তে গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে উঠত মনখারাপ। একটা আঁশটে বিষণ্ণ গন্ধ। মণিদিদার ঘরের ঘোলাটে বাল্বের মতো আলো। সমাপন হেরে গেলে মা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকত। ব্যথা। হতাশা। সমাপন অদ্ভুত মনখারাপ দেখত সেখানে। একবেলার সেলাইয়ের টাকা নষ্ট হওয়ার বিরক্তি। পরের দিন আবার নিয়ে যেত সমাপনকে। অন্য মা-বাবারা হাসি-গল্প করত। কে কোন কোচের কাছে শিখছে, কোন আরবিটারের ব্যক্তিগত কেচ্ছা রয়েছে, কারা পুরনো পাড়া ছেড়ে নতুন ফ্ল্যাটে যাচ্ছে, কোথাকার কোন মেহ্‌তা টাকার জালিয়াতি করেছে, ইংলিশ মিডিয়াম ইস্কুলে না পড়লে নাকি ভবিষ্যৎ অন্ধকার। মা চুপ করে এককোণে বসে থাকত। মাঝেমাঝে ওদের কথায় মাথা নাড়ত। বুঝে না-বুঝে। কখনও উল বুনত। ছোট্ট ব্যাগে লেচি আর কাঁটা নিয়ে যেত। সময়ে কাজ শেষ করার চাপ ছিল তো। সমাপন যেদিন জিতে বেরোত, মায়ের চোখে সেদিন দুনিয়ার খুশি। আদিকাকুর দোকান থেকে বাবুলগাম বা বাসের হকারের থেকে বাদামের ছোট প্যাকেট কিনে দিতই। হেরে গেলে ওই চোখের দিকে চোখ পড়লে কান্না পেত সমাপনের। বাড়ি ফিরেই বোর্ড নিয়ে হারা গেমের ভুল খুঁজতে বসে যেত। সেলাইমেশিনের ঘড়ঘড় শব্দ। বিকেলের কলের জল ফুরিয়ে যাওয়ার আগে বালতি, ডেকচি বসানো নিয়ে ঝগড়ার আওয়াজ। কাঠের দোকানের করাত-মেশিনের একঘেয়ে শব্দ। রুম্পাদির হারমোনিয়ামে বেসুরো ‘জলতরঙ্গ বাজে রে’। সমাপন তখন খুঁজে পেয়ে গেছে ভুল— রুক এক্সচেঞ্জ করাটা ঠিক হয়নি। সেম-কালার্ড বিশপ রেখে দিয়েই ভুলটা করেছে। ইশ্‌, ছি ছি। কান্তিস্যারের দেওয়া ‘স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড ট্যাকটিক্স’ খুলে পজিশন সাজাচ্ছে সমাপন। ম্যাক্স ইয়ুইর বই। কান্তিস্যার বইগুলো পড়ে ওদের শেখান। ভাষা বা নোটেশন বুঝতে অসুবিধে হলে বুঝিয়ে দেন ধরে ধরে। ইনকাম ট্যাক্সে চাকরি করেও ঠিক সময় বার করে নেন দাবা শেখানোর। সন্ধের লোডশেডিংয়ের পর আলো এলে ‘হোওওও’ চিৎকার ওঠে পাড়ায়। রোজই হয়। পাজল্‌ সল্‌ভ করে সমাপন। সাব-জুনিয়র স্টেটে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিন অনুজস্যার এসেছিলেন প্রাইজ দিতে। সমাপনের প্রশংসা করেছিলেন খুব। রেটিং পেয়ে গেছে ও ততদিনে। একজন ইন্টারন্যাশনাল মাস্টারের সঙ্গে ড্র। দুটো একুশশো প্লেয়ারকে হারিয়েছে। সমাপন জেনেছিল অনুজস্যারের কথা অব্যর্থ। অনুজস্যার ইন্টারন্যাশনাল মাস্টার। দেশের সবচেয়ে বড় গ্র্যান্ডমাস্টারের সঙ্গে ভাল সম্পর্ক। দুজন ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন, একজন আইএম অনুজস্যারের হাতে তৈরি। এতদিনে অনুজস্যার ওকে শেখাতে আগ্রহী। মায়ের সঙ্গে দেখা করে বলেছে বাড়িতে নিয়ে যেতে। তবে, পার সিটিং ভালই টাকা নেন। কান্তিস্যারের থেকে অনেকটাই বেশি। মা দ্বিধায় পড়ে গেছে বুঝতে পেরে বলেছিলেন টাকা নিয়ে চিন্তা না করতে। কমসমই নিচ্ছেন বোধহয়। বাবা বলেনি কত টাকা। কান্তিস্যার রাগ করেছিলেন। সমাপনেরও ভাল লাগেনি প্রথমে। অনুজস্যারের প্রতি কেমন একটা ভোঁতা অপছন্দ। কিন্তু খেলাটাকে ততদিনে বড্ড ভালবেসে ফেলেছে। মাথায় নতুন নতুন ভেরিয়েশন আসছে। ‘চেসমেট’ ম্যাগাজিনে গ্র্যান্ডমাস্টারদের গেমগুলো দেখে অ্যানালিসিস করতে শিখেছে। এটাও কান্তিস্যারই শিখিয়েছিলেন। কিন্তু কয়েকটা টুর্নামেন্টের পর সমাপন বুঝতে পারছিল ও আটকে যাচ্ছে। ক্লোজড পজিশনে মুভ খুঁজে পাচ্ছে না। রাধানাথ বোস লেনের কানাগলিতে আর পথ খুঁজে পাচ্ছে না। মরা দুপুরের আলো কেড়ে নিচ্ছে বেঢপ ফ্ল্যাটবাড়িটা। এ-পাড়ায় প্রথম এরম ফ্ল্যাট হচ্ছে। একতলা টালির বাড়িগুলো আশেপাশে ছটফট করছে আলো-হাওয়ার জন্যে। কালো নিয়ে স্লাভ ডিফেন্স খেললে পজিশন ভেঙে দিচ্ছে ভাল অপোনেন্ট। মুভ খুঁজতে অস্থির হয়ে কী যে ভুল করছে, এন্ডগেমে বাজে হয়ে যাচ্ছে। মায়ের সেলাইমেশিন চলতে চলতে থেমে যাচ্ছে। অর্ডার নেই। রেডিমেডে সস্তা পড়ছে। হালফ্যাশানের ডিজাইন প্রচুর। অনুজস্যার ব্রেক-থ্রু শিখিয়েছেন। ক্লোজড পজিশনের চক্রব্যূহ ভাঙার প্ল্যান এ আর প্ল্যান বি। জুনিয়র ন্যাশন্যালে টার্টাকোয়ার ডিফেন্স খেলেছিল সমাপন। অন্ধ্রপ্রদেশের ওয়াই সন্দীপের সঙ্গে ছ-ঘণ্টা চলেছিল লাস্ট রাউন্ডের গেম। দু-ঘণ্টায় চল্লিশ মুভ শেষ করতে টাইম-প্রেশারে পড়েছিল। তবে, কাসপারভের গেমের মুভটা মনে পড়ে গেছিল। রিস্ক নিয়েছিল। অত ভয়ে দাবা খেলা হয় না। তুই রিস্ক নিস না কেন? অপোনেন্ট অ্যাডভান্টেজ পেতে চলেছে বুঝলেই পজিশনে ইমব্যালান্স আনবি। ইচ্ছে করে। দরকারে একটা হোপলেস পন স্যাক করে দিবি। আনসার্টেনটির রিস্ক দরকার কখনও কখনও— অনুজ স্যারের স্ট্র্যাটেজিতে সন্দীপের অ্যাডভান্টেজ হঠাৎ ঘেঁটে গেছে বুঝে মজা পেয়েছিল সমাপন। ডি-ফাইলের পন স্যাক করে বিশপের রাস্তা খুলে নিয়েছিল। দ্বিধায় ছিল সন্দীপের রুক নিয়ে। কিন্তু স্নাইপারের মতো খেলেছিল লাইট-স্কোয়ার বিশপটা! আহ্‌! পজিশনাল অ্যাডভান্টেজ। জিতেছিল। কলকাতায় রেটিং টুর্নামেন্ট তেমন হয় না। বছরে দুটো বড়জোর। টুকটাক র‍্যাপিড টুর্নামেন্টগুলোয় খেলে। প্রাইজমানি জমায়। বেশ কিছুটা জমলে মহারাষ্ট্রে আর অন্ধ্রপ্রদেশে খেলতে যায়। প্রথম চারের মধ্যে থাকতেই হয়, নইলে টাকা ভাল পাওয়া যায় না। অনুজস্যার ইনফরমেটর কিনতেন। বছরে তিনটে। না, একটা সমাপন কিনত, একটা রক্তিম কিনত, আরেকটা অনুজস্যার দিতেন। নিজে দেখতেন, ইম্পর্ট্যান্ট গেমগুলো দাগ দিয়ে দিয়ে অরিঞ্জয়, রক্তিম আর সমাপনকে দিতেন। কতগুলো ভাষায় লেখা থাকত ‘চেস ইনফরম্যান্ট’। সমাপন স্বপ্ন দেখত এই ভাষার দেশগুলোতে খেলতে যাবে। জিতবে। ইনফরমেটরে দেখা কোনও খেলার আইডিয়া মনে রেখে নিজের গেমে মুভ দিতে ছটফট করত। সমাপন চেষ্টা করত অনুজস্যারের ফেভারিট স্টুডেন্ট হতে।

লাস্টের আগের রাউন্ড চলছে। মাঝখানে একটা ঝাড় খেয়ে আরেকটা ড্র করে পিছিয়ে রয়েছে সমাপন। রেটিং দশ পয়েন্ট ঝাড় খেল। এই রাউন্ডটা না জিতলে গণ্ডগোল হয়ে যাবে। সিনিয়র ওপেন ফিডে রেটিং। বাইরের জিএম আইএমরা খেলতে আসে এটায়। প্রেস্টিজিয়াস ইভেন্ট এটা। এই টুর্নামেন্টেই নর্মটা তুলে ফেলতে হবে। অঙ্কিত, মহারাষ্ট্রের জিএম। কষা প্লেয়ার। দুর্দান্ত ওপেনিং প্রিপারেশন। স্প্যানিশ ওপেনিং খেলেছে সমাপন। অঙ্কিত বার্লিন ডিফেন্স। ক্রামনিকের পরে এত চমৎকার বার্লিন গুলে খাওয়া প্লেয়ার ভারতে দেখেনি সমাপন। কুইন এক্সচেঙ্ক হয়ে গেছে। পিস বাঁচাতে হবে। কাসপারভের সঙ্গে ক্রামনিকের খেলাগুলো মনে করছে। কাসপারভের ওই পিকটাইমে প্রত্যেকটা বার্লিন ডিফেন্সে আটকে দিয়েছিল ক্রামনিক। কিছুতেই ড্র করা চলবে না। এই নর্মটা পেলে সাউথ সেন্ট্রাল রেলের চাকরিটা হয়ে যাবে। পার্মানেন্ট। টুর্নামেন্ট খেলতে বাধা থাকবে না আর। অন্ধ্র আর তামিলনাড়ুর তিনজন লাইন দিয়ে আছে। প্রদ্যুম্ন আর নিখিল ইনকাম ট্যাক্সে পাচ্ছেই। ওএনজিসি-র জন্যে ভেঙ্কট হত্যে দিয়ে পড়ে আছে। ওর হয়ে যাবে, আইএম হয়ে গেছে। সাউথ সেন্ট্রাল রেলের জন্য ওড়িশার দুজন ইট পেতে রেখেছে। ভবেশ আর সুধাকর। এই চ্যাম্পিয়নশিপ আর নর্মটা মারতে পারলেই পাক্কা লেগে যাবে সমাপনের। আগেরবার এলআইসির অফার পেয়েও নেয়নি। ভেবেছিল দরকার নেই, জিএম হওয়ার জন্য ঝাঁপাবে। স্পেন আর পর্তুগালের পরপর দুটো টুর্নামেন্ট। ধারকর্জ্জ হবে। কিন্তু প্রাইজমানি ভাল, শোধ হয়ে যাবে। পারলে দুবাই ওপেনটাও খেলবে ভেবে রেখেছিল। একবার আইএম হয়ে গেলে এন্ট্রি-ফি লাগবে না। দু-একটা স্পন্সর জুটে যাবে ঠিক। ছোটখাট হলেও হবে। দুষ্যন্ত সাউ সিনিয়র, স্নেহ করেন। ব্যবস্থা করে দেবেন বলেছিলেন। হঠাৎ দেখল হাতের তালুর মতো চেনা ন্যাইডর্ফ ভেঙে যাচ্ছে। ইংলিশ অ্যাটাক। প্রিপারেশন নেওয়া। এত বছরের প্র্যাকটিস। শ্রীমন্তদাকে একসময় গর্ব করে বলেছিল, নো ওয়ান ক্যান বিট মি ইন সিসিলিয়ান। পরের রেপোর্টিয়ারটা আমি লিখব, দেখো। শ্রীমন্তদা একুশশো-বাইশশো লেভেলের। কিন্তু ন্যাইডর্ফ, কান আর স্কেভেনিঞ্জেন ভেরিয়েশনে চূড়ান্ত দখল। সিসিলিয়ান তৈরি করতে এক বছর লেগেছিল, টপ লেভেলের টুর্নামেন্ট প্র্যাক্টিসে আরও এক বছর। সেই ন্যাইডর্ফ ভেঙে হু হু করে সাদার পন ঢুকছে কিং-সাইডে। লিউকেমিয়া। মায়ের রক্তের কোষে কোষে প্রতিরোধ ভেঙে যাচ্ছে। ব্লাড ট্রান্সফিউশনন। লেটস গো ফর আ ফিউ ইয়ার্স প্ল্যান। কিন্তু… কস্টলি। বেশ কস্টলি। তুমি প্লেয়ার না? কী খেলো যেন? চেস! গুড গুড। প্রসপার কিরকম চেসে? আরে, আমাদের হস্টেলে আই ওয়জ দ্য হার্ডেস্ট নাট টু ক্র্যাক ইন চেস। এইচ-সিক্স বাড়ায় না, তবু কেন যে এইচ-সিক্স বাড়াল। এক্সপোজড কিং। টয়লেটে গিয়ে রাজেশ হাসছে, ভাই তেরা দিমাগ চোদ গয়া ক্যা। মিডলগেম পেরোতে পারল না। মুখ থুবড়ে পড়ল। পরপর অনেকগুলো গেম তখন এমন হয়েছে। পজিশন হোল্ড করতে পারছে না। প্রিম্যাচিওর্ড অ্যাটাক করে ফেলে পস্তাচ্ছে। ওষুধের গন্ধ, চ্যানেলের ছুঁচ থেকে টপকানো রক্ত, মায়ের আরও ফ্যাকাশে মুখে কালচে ছোপ। প্রথম নর্মটা মিস করেছে। র‍্যাপিড টুর্নামেন্টের খেপ খেলছিল পরপর। দু-হাজার, তিন হাজার প্রাইজমানি যেমনই হোক, ওষুধের খরচা উঠছিল। হারিয়েই যাচ্ছিল। হারিয়েই যেত। চোখেমুখে জল দিল সমাপন। রুমালে মুখ মুছতে মুছতে দেখল চোখের নিচে কালো দাগ। সাংলির বুদ্ধিবল রেটিং টুর্নামেন্ট থেকে ফেরার পর মা বলেছিল, ইশ্‌, কী কালি পড়ে গেছে। খুব চাপ গেছিল সত্যিই। রুক দিয়ে ওপেন ফাইলটা কভার করবে। ভাল ইনিশিয়েটিভ। কিন্তু, ব্ল্যাকের রুকটাও তো বি-ফাইল কভার করবে। উঁহু। হচ্ছে না। অনুজস্যার বলেছিলেন একটা ভাল মুভ খুঁজে পাওয়া মানে আরও ভাল মুভ নিশ্চয়ই আছে। সময় দিতে হবে। কিন্তু বেশি সময় দেওয়া যাবে না। অপোনেন্ট অ্যাটাকিং স্পেস খোলার আগেই অ্যাটাকে ধাঁধিয়ে দিতে হবে। এই ত্তো, কিংকে সেন্টারে এনে তারপর এফ-ফোরের ব্রেক? এটা অঙ্কিত গাগারে ভাববে না। ভাববে কি? ওর চোখমুখ রিল্যাক্সড এত? ড্র ধরে খেলছে?

 

তিন.

—দাবায় তো অনেক খরচ। চালান কী করে? অসুবিধে হয় না এই মাইনেয়…

কান গরম হয়ে গেছিল সুকান্তর। সাধন জোরাজুরি করছিল অনেকদিন। একটা পলিসি করাবেই। বছরে টাকা দিতে হবে, বারো বছর পরে ফেরত পাওয়া যাবে। মিত্তিরদা, প্রাণেশবাবু ওরা সব অনেক টাকার পলিসি করে। আগের বছর এপ্রিলে লচ্ছুও করল। অল্প টাকার। সাধনই করিয়েছিল। জোরাজুরিতে সুকান্ত না বলতে পারেনি। বাড়িতে এসে সাধনের চোখ বারবার চটা দেওয়াল আর খাটের নিচে ডাঁই করে রাখা জিনিসপত্তরে পড়ছিল। ছোট আলমারিটার মাথায় দুটো ছোট কাপ আর একটা ট্রফি। ট্রফিটা রাজ্য দাবায়, আন্ডার নাইন, রানার আপ। সার্টিফিকেটগুলো ল্যামিনেশন করাবে, সেই খান্নার মোড়ে দোকানটায় যেতে হবে, একটু সস্তা পড়ে। ন্যাশনালে যাওয়ার এন্ট্রির টাকা লাগবে না, কিন্তু থাকা-খাওয়ার খরচ আছে। রীতেশের বাবা জিজ্ঞেস করেছিল এসি স্লিপারে টিকিট রিজার্ভ করবে কিনা, দু-মাস আগে তো বুক করতে হবে। দেখছি দেখছি করে এড়িয়ে গেছে সুকান্ত। অত খরচ পোষাবে না। এমনি স্লিপারই ভাল, কয়লাঘাটা যাবে পরের সপ্তাহে। ভোরবেলা। মিত্তিরদা বুঝিয়ে দিয়েছে পাখিপড়া করে। এই প্রথম বাংলার বাইরে যাবে সুকান্ত। একটা লজে ঘর নিয়ে নেবে। খেলার জায়গার কাছেই নিতে হবে, যাতায়াতের গাড়িভাড়া বাঁচবে তাতে। অর্ণব, পারমিতারা কার্তিকদাকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। ওদের কোচ। সুকান্ত অত পারবে না। দু-একটা বই, দাবার বোর্ড নিয়ে যাবে। সাধনকে বলে দিয়েছে, বাইরে থেকে ঘুরে এসে তারপর একটা পলিসি করবে। এখন না। এখন স্যারের কাছে নিয়ে যাবে। হপ্তায় চারদিন। দুদিন প্র্যাকটিস আর দুদিন গেম শিখবে। ছুটি পাওয়াটাই সবচেয়ে ঝামেলা। অস্থির হয়ে উঠছে সুকান্ত। কী করেই বা ছুটি পাবে? বড়বাবু পাল্টেছে। আর্দালির তাতে আর কী যায় আসে? হুকুম তামিল করে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সুকান্ত। কিন্তু লোকটা সেদিন অপমান করল। এমনিতে লোক খারাপ না। লচ্ছুও বলছিল যে, ওর সঙ্গেও হেসে হেসে কথা বলেছে। দ্বিতীয় দিনই বলে দিয়েছিল, শুনুন, আমাকে আপনারা ব্যানার্জিদা বলবেন। কবে ইংরেজ চলে গেছে, এখনও স্যার বলার অভ্যেস গেল না আমাদের। আমি আপনাদের লোক, পোস্টটা একটু ওপরে, এই যা…। আরও কীসব ‘কলোনি’, ‘হ্যাং’ এসব বলেছিল। সুকান্ত অবশ্য স্যারই বলত। তাতে বড়বাবুর মুচকি হেসেছে, চোখেও কি খানিক তৃপ্তি ছিল না? এসব ভরসাতেই সুকান্ত দুদিনের ছুটি চাইতে গেছিল। আসলে পুজোর মরসুম, রীতার কাজের চাপ বড্ড। বিষ্যুদ আর শুক্কুরবারের দুটো ছুটি পেলে ছেলেকে খেলায় নিয়ে যেতে পারব। সাব-জুনিয়র দাবা। ওর চেয়ে বয়সে বেশ খানিকটা বড়দের সঙ্গেই খেলবে, কিন্তু ভিত মজবুত হবে। ভুলত্রুটি শুধরে নিয়ে ভাল প্র্যাকটিস হবে। আর, প্রমিত, সন্ময়, ভচ্চাজ্জিদের ছেলেদের মতো হারিয়ে প্রথম দুই-তিনের মধ্যে থাকলে তো! আহ্‌, সে তো স্বপ্ন। স্বপ্নের ঘোর ভেঙেছিল স্যারের হা হা না-থামা হাসিতে। ধুর্‌, ওতে ফিউচার কী? ও তো আমাদের ড্রাইভারও মাঝে মাঝেই রাস্তায় বসে খেলে। ওই যেখানে গাড়ি পার্ক করে না, তার সামনের রকে দু-চারজন খেলে। সুকান্ত থমকেছিল। বল্লভপাড়ার রকে বা কাদেরের দোকানে দাবার বোর্ডে যতই মারকাটারি কম্বিনেশন দেখুক, বড়বাবুর সামনে হাতের তালু কচলাতে কচলাতে বলেছিল দাবা এখন অনেক ছেলেমেয়ে খেলে। ভারতের দাবা এগোচ্ছে। কুশলদার কথাগুলোই অবিকল বলতে শুরু করেছিল। হয়তো কুশলদার ভারিক্কি সুকান্তর নেই বলেই কিংবা হয়তো অধস্তনের দাবাপ্রীতিকে খামোখা বেয়াক্কেলেপনা ভেবেই সুশোভন ব্যানার্জি বলে উঠেছিলেন, দিজ ইজ দ্য টাইম ফর ক্রিকেট। ঋককে তো ক্রিকেটেই দিলাম আমরা। গাভাসকার, শচীন, সৌরভ সব একডাকে চেনে। আস্ক অ্যাট দ্যাট পান-শপ অর দ্যাট ইডিয়ট টি-সেলার। বাট নোবডি নোজ কাসপারভ অর আনন্দ। হুঁ হুঁ, আমি কিন্তু খোঁজ রাখি ঠিক। একসময় আমিও…। বড়বাবুর শেষ কথাগুলো তরল হাসির সঙ্গে ভেসে যেতে যেতে সুকান্ত দেখতে পাচ্ছিল পিস খাওয়াখাওয়িটা কাজে দিল না। ছকটা হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। কারণ উল্টো রঙের গজ হলেও তিনটে বোড়ে বেশি আছে বড়বাবুর। এবার ছুটির কথা পাড়তে হবে ভেবেই জ্বর আসছে সুকান্তর।

এ কী! বারবার ছেলেটা টয়লেটে যাচ্ছে কেন? ওকে তো অতীশদা আর বিমল দত্ত চোখে হারায়। ও নাকি জিএম হবেই। ধীরজ সাহুকে রেখেছে। পয়সাকড়ি না থাকলে হয় না, বুঝলে? বিমল দত্ত চশমা মুছতে মুছতে ওই অহঙ্কারী হাসিটা হেসেছিল। আমিই তো লাইন করিয়ে দিলুম। ঘাঁতঘোঁত শিখিয়ে দিয়েছি, এবার খুঁটে নিক ধীরজের থেকে। সুকান্ত অদূরে দাঁড়িয়ে আছে জেনেই অতীশ দাশগুপ্ত স্বর তুলেছিল, জার্মানিতে খেলতে যাচ্ছে স্বর্ণেন্দু। তারপর ব্রিটিশ চ্যাম্পিয়নশিপ। বাজি মারবেই… হ্যাঃ… বাকিরা ছিঁড়বে। সুকান্ত চুপচাপ সরে গেছিল। ভেন্যুর বাইরে চায়ের দোকান। হিসেব করেছিল প্লেনের টিকিট, পুজোর বোনাস, সস্তায় থাকা। আচ্ছা, পাসপোর্ট করতে খরচ কত? নন্তু পাসপোর্ট, প্লেনের টিকিট সব করে দেয়। সেই লাস্ট বেঞ্চে মদনস্যারের হাতে বেদম ক্যালানি খাওয়া নন্তু কী স্মার্ট হয়ে গেছে। এসপ্ল্যানেডে অফিস। মারুতি গাড়ি। সুকান্তকে জড়িয়ে ধরেছিল গাড়ি থেকে নেমে। সুকান্তই বরং আড়ষ্ট। দাবা? আরে বাঃ। দারুণ তো। ন্যাশনাল খেলেছে? জ্জিও বস্‌! বোকাকান্তর ছেলে দাবা-মাস্টার! ভাবা যায়? খুব ভাল্লাগল শুনে। গাড়িতে আসতে আসতে কথার ফুলঝুড়ি ছুটছিল নন্তুর। নন্তু উৎসাহ দিয়েছিল দাবা নিয়ে এগিয়ে যেতে। ওকেই জিজ্ঞেস করবে অফিসে গিয়ে। বুলুকে ওরা ধর্তব্যে আনে না। না আনুক, ও পারবেই। ধীরজ সাহুকে দিয়ে শেখাতে পারলে ভাল হত, না? কিন্তু, অত টাকা? প্রতি ক্লাসে হাজার টাকা? নন্তুর থেকে জেনে নেবে বাইরের হোটেলপাতির ভাড়া কেমন। আজ স্বর্ণেন্দুর সঙ্গে খেলা। রেটিং এসে গেছে ওর। ওকে হারাতে পারলে বুলুর পার্ট-রেটিং আসবে। দু-মাস পরে উড়িষ্যায় একটা খেলা আছে। ওখানে নিয়ে গেলে পুরো রেটিং এসে যাবে। আঃ, বুলুটা একটু মন দিক, আরেকটু মারপ্যাঁচ শিখুক। ও এদের সব্বাইকে হারাতে পারবে। এ কী, ছেলেটা ঘন ঘন টয়লেট যাচ্ছে কেন? বিমল দত্তও টয়লেটে যাচ্ছে সিগারেট খেতে। সুকান্ত গিয়ে দেখেছিল ভেন্যুর ভেতরের ওয়াশরুমের একটা কোণায় বিমল দত্ত কথা বলছে স্বর্ণেন্দুর সঙ্গে। সুকান্তকে আচমকা ঢুকতে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল বিমল। মাঝপথে কথা থেমে গেছিল। সুকান্তর কানে এসেছিল— নাইট ই-সিক্স। স্যাক। পন অ্যাডভান্স। সুকান্তর বিস্ময় আর রাগভরা চাউনিতে বিমল থতমত খেয়েও সামলে নিয়েছিল ঠোঁটের কোণে উদ্ধত হাসিটা টেনে। স্বর্ণেন্দু মুখ নামিয়ে চলে গেছিল বোর্ডে খেলতে। সেক্রেটারি অতীশ দাশগুপ্তকে নালিশ করেছিল সুকান্ত। অসহ্য রাগে কাঁপছিল। শান্ত গলায় অতীশ দাশগুপ্ত বলেছিল, তাই নাকি? খুব অন্যায়। ছি ছি। কিন্তু, আপনি সিওর? বিমল করেছে এসব? প্রমাণ আছে? ক্রমশ শ্লেষ মিশছিল, আর কেউ দেখেছে? ভাল প্লেয়ার আর কোচের নামে এসব অনেক রটে। সমাপনকে ভাল খেলতে বলুন। একটা নামী কোচের কাছে দিলে…

কে বলেছে তোমায় দাবা ইন্ডিভিজুয়াল খেলা? বাই দ্য ওয়ে, দাবা গেম না। স্পোর্ট। গেমের থেকে অনেক অনেক বেশি। মন আবার কী? মাথাই সব। মাথা শরীরের অংশ না? চার ঘণ্টা, পাঁচ ঘণ্টা একটানা ঠায় বসে কনসেনট্রেট করে খেলতে ধক লাগে। আর, দাবায় ১৬টা পিস-পন এক সুতোয় বাঁধা। তুমি তাদের কোচ। ওই ১৬টা প্লেয়ার একসঙ্গে খেলতে নেমেছে। কারও দায়িত্ব কম, কারও বেশি। কিন্তু সবকটাই ইম্পরট্যান্ট! ভাবো তো, একা কুইন চেকমেট করতে পারে? অন্তত একটা বোড়ে বা রাজার হেল্প লাগবেই। ওই যে ফিশারের দুর্দান্ত গেমটা, মাত্র ১৩ বছর বয়সে খেলেছিল। আরে, সেদিন তোমায় দেখালাম যেটা আবার। কোনও একটা পিস করেছিল কম্বিনেশনটা? না। না। একুশটা দান ধরে বিশপ, নাইট, রুক একে অপরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে পিছিয়ে চেকমেট করেছিল। এইটাই তো টিমগেম। কো-অর্ডিনেশন। পল মরফি। শুধু পিস স্যাক্রিফাইসটাই দেখলে? তার পিছু পিছু অন্য পিস আর পনগুলো পরপর মুভ করছে। যেন কারও দক্ষ চালনায় অপেরায় সঙ্গীত সৃষ্টি হচ্ছে। জীবনের সঙ্গে দাবার এখানেই তো মিল। জাজমেন্ট, ডিসিশন মেকিং, প্ল্যানিং, এক্সিকিউশন। পরপর সাজানো সব। সাফল্য আর ব্যর্থতা আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা এর সঙ্গে। জীবনের মতো দাবার বোর্ডেও তোমাকে একাই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কোনও পিসের মুভমেন্ট ফেইল করলে, বা কোনও বিশপ হঠাৎ ব্যাড-বিশপ হয়ে গেলে পুরো গেম অ্যাফেক্টেড হবে। মনে আছে তিন বছর আগের সেই ব্যাড নাইট? ভুল সিদ্ধান্ত? ভুল প্ল্যান? ভুল দান। তিনটে বছর শেষ হয়ে গেছে। ভালবাসা হারিয়ে গেলে কেমন লাগে? সব স্যাক্রিফাইসে শাবাসি জোটে না, কারণ সেগুলো মূর্খামি। কিস্যু হল না। মাথাটাই কাজ করল না, কনসেন্ট্রেশন তুলোর মতো হালকা হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ধরতে চেয়ে বেকার লাফ দিলি? তিন বছরের খাদ। গভীর। ব্ল্যাক হোল। ইউ ফেইল্ড ইওর টিম, ইওর ওন পিস-পন এভরিথিং। ব্ল্যাক হোল। ধড়ফড় করে উঠে বসল সমাপন।

 

চার.

—ন্যাশনালটা খেলে আমরা সোমনাথ আর দ্বারকা ঘুরতে যাব। তোরা যাবি না? চল না, তুই গেলে খুব ভাল্লাগবে আমার।

ওই ভাল্লাগবে আর আমার শব্দদুটোর মধ্যেকার বিরতিতে সমাপনের সমস্ত জীবনের ওপর দিয়ে মাঝ-নভেম্বরের হাওয়া কেমন মাঝ-ফেব্রুয়ারির হাওয়ায় বদলে গিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। জটিল মিডলগেম থেকে সহজ পন-এন্ডগেমে আসার রাস্তা খুঁজে পেয়েছিল। নভেম্বর। টালির ওপরে শীতের রোদ্দুর। এমন রোদ্দুর নরম হতে হতে মিলিয়ে যায়। দুপুরে অঙ্ক করে বেরিয়েছিল সমাপন। কেশব নাগের বইয়ের চারটে অঙ্ক পারেনি। কী শক্ত। মণীশ, সুধন্যরা করে ফেলেছে এগুলো। নিখিলজেঠু সেদিন পিঠ চাপড়ে বলেছিল, দাবা খেললে অঙ্কে মাথা হয় খুব! তুই কত পাস রে? একশো? লজ্জায় একটু বাড়িয়ে বলেছিল আশি। আসলে বাহাত্তর পেয়েছিল। দাবা খেললেই অঙ্কে একশো পাবে? হুঁহ। কেশব নাগ ব্যাটা যদি বুঝত এ-কথা, তাহলে তো এত ঝামেলা থাকত না জীবনে। সমাপন মোটেই পঁচাত্তরের বেশি পায় না। গেলবার মিড-টার্মে সাতাত্তর পেয়েছিল। মণীশ পঁচানব্বইয়ের নিচে পায় না। অমিতও তিরানব্বই মেরে দিয়েছিল। ওর কেন যে সিলি মিসটেক হয়, ইশ। সেদিন অরিত্রর সঙ্গে খেলাটাতেও তো তাই হল। মিডল গেমে পন আপ হয়ে গেছিল। রুক এন্ডিং। পাসড পনটা ধরে এগোলেই হত। ধুর। কেন যে মরতে চেকটা দিতে গেল। একটা সিলি মিসটেক। গেম ড্র হয়ে গেল। সমাপন বিরক্ত হয়ে লাথি মারল ইটের টুকরোয়। ইটটা বাঁদিকে অনেকটা দূর গিয়ে নেড়িটার গায়ে লেগেছে। ওঃ, প্রমথকাকুরা এখন খেলছে। মিত্তির লেনের মুখেই মানুদের রক। রংচটা বোর্ড। প্লাস্টিকের পিস-পন। সমাপন মুখ ব্যাঁকাল। অ্যাঃ। কী বোকা বোকা খেলে প্রমথকাকু, ভেটকিদাদুরা। সিসিলিয়ান ডিফেন্সে কুইন সাইডের বিশপ ফিয়াঞ্চেটো করছে। হাঃ। জানেই না ওপেনিং। সমাপনকে ডেকেছে ওরা অনেকদিন, এই সমু, একদান খেলবি? পাত্তা দেয়নি সমাপন। ভেবেছে ধুর্‌ আজেবাজে খেলায় ওর খেলা বাজে হয়ে যাবে। রেটিং একুশশো পার করতে হবে পরের টুর্নামেন্টে। উফ্‌, কম ঝক্কি? সবে রেটিং এসেছে। সমু, আজ একদান বসবে? তুমি কত বড় জায়গায় খেলতে যাও। শেখাও একটু। রোদ্দুর নরম হচ্ছিল বলেই কি সমাপন রাজি হয়ে গেছিল? শীতকালের ওই চারটে সওয়া-চারটের রোদে কী যেন একটা মায়া থাকে। সবকিছুতে রাজি হওয়া যায় তখন। ক-বছর আগে কুহেলির কথায় রাজি হয়েছিল। ন্যাশনাল খেলতে গিয়ে ঘোরা হত না। খেলার আগেরদিন পৌঁছানো, যেমন-তেমন হোটেলে থাকা, ন-দিনের খেলা, খেলা শেষের পরদিনই স্লিপার সেকেন্ড ক্লাসে চেপে বাড়ি। সেবার বায়না জুড়েছিল আন্ডার-ইলেভেন ন্যাশনালের পরে চারদিন ঘুরেফিরে বাড়ি। শর্ত ছিল প্রথম তিনের মধ্যে থাকবে। কত ভাল পজিশন হারিয়ে গেছে— সমাপন কনভার্ট করতে পারেনি। কোথায় যে ভুল হত। অমন বেখেয়ালি হাওয়া আবারও তীব্র হয়ে উঠেছিল সমাপন যখন মাধ্যমিক দেব-দেব করছে। টুর্নামেন্ট কমিয়ে দিয়েছিল। ফোকাসে মাধ্যমিক আর রোহিণী। সমাপনের একাগ্রতা বরাবরই ভাল। কান্তিস্যার তো তাই বলতেন। ছিল কি? তাহলে অমনভাবে ফোকাস নড়ে গেছিল কেন? আঃ, ওই বেখেয়ালি মিসটেকগুলো যদি একবার ফিরিয়ে নেওয়া যেত। ন্যাশনালে অন্ধ্রপ্রদেশের রেভন্ত কৃষ্ণার সঙ্গে খেলায় রুকের মুভটা যদি ফেরত পাওয়া যেত। পাওয়া যায় না, না? তবে, ভেটকিদাদুর মুখে শেখাও একটু শুনে সেদিন ওদের সঙ্গে খেলতে বসেছিল। এঃ বাবা, আস্ত রুক নেই একটা, শোলার টুকরো কেটে রুক বানিয়েছে। ইচ্ছে করেই সিসিলিয়ান ডিফেন্স খেলেছিল সমাপন। সেই বি-থ্রি খেলেছিল ভেটকিদাদু। তারপর লং ক্যাসেল করে, কিং-সাইডের পন বাড়িয়ে অদ্ভুত একটা অ্যাটাক করেছিল। রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হয়েছিল সমাপনকে। হাত থেকে বেরিয়েই যাচ্ছিল খেলাটা। নেহাত এন্ডগেমে সেম-কালার্ড বিশপ নিয়ে জেতার থিওরিটা কান্তিস্যার আগের সপ্তাহেই দেখিয়েছিল। প্রমথকাকু খুব খুশি হয়েছিল ও জিততে। সমাপন অবশ্য ভাও নিয়েছিল খুব। এখন ভাবলে লজ্জা লাগে। ভেটকিদাদু, রকে বসে দাবা খেলত, ব্যবসায় ফেল মেরে এর-ওর থেকে টাকা ধার চেয়ে চালাত, সে অমন বেগ দিয়েছিল বলে সমাপনের আঁতে লেগেছিল। তবে বুঝেছিল যে, ভেটকিদাদু ওরম দুর্দান্ত মিডলগেম আর পজিশনাল সেন্স নিয়ে টুর্নামেন্ট খেললে ভাল রেটিং তুলতে পারত। বাড়িতে এসে সন্ধেবেলায় বাবাকে ফলাও করে জেতার কথাটা বলেছিল সমাপন। খানিকটা জল মিশিয়েছিল বলতে বলতে। দাঁড়াতেই দিইনি। খেলতেই পারে না ওপেনিং। এন্ডগেম কিস্যু বোঝে না, জানো তো…। ওর গলায় তাচ্ছিল্য টের পেয়ে খুব বকেছিল বাবা। কোনওদিন কোনও প্লেয়ারকে ছোট ভাববি না। কীভাবে ‍হারিয়ে দেবে বুঝতেও পারবি না। সমাপনের ভাল্লাগেনি ওসব শুনতে। পরের বছর স্টেটে অবশ্য বুঝতে পেরেছিল। অর্পণ ওর সঙ্গেই শিখত কান্তিস্যারের কাছে। কান্তিস্যারের বাড়িতে প্র্যাকটিসের সময় বলে বলে অর্পণকে হারাত ও। দু-একবার কালেভদ্রে জিতেছিল অর্পণ। কিন্তু, স্টেটের থার্ড রাউন্ডে দুম করে হারিয়ে দিয়েছিল সমাপনকে। খুব আলগা দিয়েছিল সমাপন। প্রস্তুতি ছাড়াই আনকোরা একটা ওপেনিং ভেরিয়েশন খেলে দিয়েছিল। ভাবছিল না ভাল করে। ধুরর ও আর কী আহামরি খেলবে, জিতেই যাব কয়েক দানে, এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ দেখেছিল নাইট ট্র্যাপ হয়ে গেছে। ওই ম্যাচে হেরে প্রোগ্রেসিভ স্কোর কমে গেল। ফাইনাল রাউন্ডে ড্র। থার্ড হয়েছিল সমাপন।

***

 

জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহ। ঠান্ডা পড়েছে জমিয়ে। প্রদ্যুম্ন কৃষ্ণা। রেটিং প্রায় সত্তর বেশি। তুখোড় ট্যাকটিক্স চেনে। একটু আলগা দিলেই ম্যাচে ফিরে আসার দ্বিতীয় সুযোগ পাব না। আগেরবার ন্যাশনালে সাত মুভের কম্বিনেশন দেখে নিয়েছিল। আঃ, বরাতজোরে কোনওমতে ড্র করেছি। হ্যান্ডশেক ফিরিয়ে দিয়ে প্রদ্যুম্ন দাঁতে পিষে বলেছিল, ইউ ওন্ট গেট লাক এভরিটাইম। এন্ডগেম বাঁচিয়ে দিয়েছিল। নাঃ, ওই ভুল আর না। সামলে। মেপে মেপে খেলতেই হবে। কিং-সাইড ওপেন করার সুযোগ দেব না। প্রদ্যুম্ন সিসিলিয়ান প্লেয়ার। সিসিলিয়ানের এগেনস্টে বি-থ্রি লাইনটা তৈরি করেছি অনেকদিন ধরে। সিক্রেট ওয়েপন। প্রদ্যুম্ন এটা প্রিপেয়ার করবে না, সিওর। রাশিয়ান জিএমের কাছে ট্রেনিং নিচ্ছে ইদানীং। প্রচুর টাকা। টুর্নামেন্টে আসে একটা দামী গাড়ি চেপে। এ-বছর অনেকগুলো ওপেন খেলেছে বিদেশে গিয়ে। প্রচুর ডাঁট হয়েছে। কম রেটেডদের প্লেয়ার বলেই ভবে না। ইশ্‌, প্রদ্যুম্নর মতো দুর্দান্ত ট্যাকটিকাল সেন্স যদি থাকত! মিখাইল তালের গেম, তিনটে বই জেরক্স করে নেওয়া মননকাকুর থেকে। অরিজিনাল বইয়ের অনেক অনেক দাম। মননকাকু অরিজিনাল বই কিনে এনে জেরক্স করে বিক্রি করত। কিন্তু তালের গেম আর মিডলগেম এনসাইক্লোপিডিয়া সলভ করেও কোথায় যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগত। ট্যাকটিক্সগুলো ঠিক খাপে খাপ লাগছিল না গেমে। বছর পাঁচেক আগে অন্ধ্রপ্রদেশের রামাকৃষ্ণান বলেছিল ল্যাপটপ কেনার কথা, ওরা সফটওয়ারে গেম দেখে প্র্যাক্টিস করে। ওদের গভর্নমেন্ট টপ প্লেয়ারদের ল্যাপটপ দিয়েছে। তখন সেসব স্বপ্ন ছিল। পরপর দুটো রেটিং টুর্নামেন্টের একটায় চ্যাম্পিয়ন আরেকটায় রানার-আপ হয়ে টাকা পেয়েছিল সমাপন। ভাল টাকা। সেকেন্ড হ্যান্ড কম্পিউটার কিনেছিল মতিদার থেকে আর দাবার সফটওয়ার সুজন এনে দিয়েছিল। কপি করা, আসল না। খেলার ধরন পাল্টাচ্ছে, আপডেট করতেই হবে। যে স্প্যানিশ আইএমের সঙ্গে প্র্যাকটিস করছি, ওর কবে থেকে ল্যাপটপ, নতুন সফটওয়ার। আমি তো পুরনো ভার্সনটা দিয়েই চালিয়ে নিই। মিগুয়েল বি-থ্রি-র নতুন ভেরিয়েশনটা না দেখালে নভেলটিটা বের করতেই পারতাম না। প্রদ্যুম্নকে ঝাড়তে আজ ভেরিয়েশনটা দরকার। ফিফথ মুভ বিশপ বি-ফাইভ! আঃ, এই তো, চোখ কুঁচকেছে প্রদ্যুম্নর। ভাব শালা। তোর ট্যাকটিকাল গেমের ট্র্যাপেই ফেলব তোকে। স্নাইডার ভেরিয়েশন। প্রমথকাকুর দর্জির দোকান উঠে গেছে বহুদিন। লাস্টবার পাড়ায় গিয়ে দেখলাম না। পণ্ডিতদের বাড়ি ফ্ল্যাট হয়ে গেছে। প্রমথকাকুর দর্জি-গুমটি ওটার সামনেই ছিল। জায়গা দেয়নি নাকি প্রমথকাকুকে? ছানি-ফানি পড়ে যা-তা অবস্থা। কী, দাবা খেলছ না আজকাল? কোনও মতে হ্যাঁ-হ্যাঁ বলে ঘাড় নেড়ে সরে না গেলে ঘণ্টা কাবার করে দিত। ভেটকিদাদু বিয়েফিয়ে করেনি। মরার পরে বাড়ি প্রোমোটারের হাতে। আজ এসব মনে পড়ছে কেন? একটা সিগারেট খেয়ে আসি স্মোকিং কর্নারে গিয়ে। ভেটকিদাদু স্নাইডার ভেরিয়েশনের নাম জানত না। আট নম্বর দানে অন্য একটা মুভ দিত। তবে স্ট্রাকচার অমন ভাল রাখত কি করে, কে জানে। এইচ-টুর পনটা মেরে দিল? রিস্ক নিচ্ছে। লং ক্যাসলও করেছে। কী করব? রাইট। সেন্টার। এফ-সিক্স দিয়ে ব্রেক করছেই যখন, সুযোগ নিতে হবে। কিন্তু, প্রদ্যুম্ন এখন তুখোড় ফর্মে রয়েছে। একটাও আনপ্ল্যানড মুভ দিলে শেষ করে দেবে। নাঃ, সেই ড্রয়েই ঢুকছে। ভুল হল প্রিপারেশনে? প্রদ্যুম্নর হাসিটা দেখেই গা জ্বলছে। লাস্ট সিগারেটটা খেয়ে সমাপন ফিরছে বোর্ডে। প্রদ্যুম্ন ঘুরে ঘুরে অন্যদের বোর্ড দেখে বেড়াচ্ছে। ভাখোলভ আর বিশাল নারাংয়ের গেম দেখছে। উইন দেখতে পেয়েছে নাকি? স্বয়ম মিশ্রকে কী বলছে সমাপনের দিকে ইশারা করে। আরে, এটা কী করেছে? এফ-ফাইলের রুকটা দিয়ে মেরেছে? আঃ, শান্তি। প্রদ্যুম্ন বুঝছে না, ও নিজের বাঁশ ডেকে এনেছে। এন্ডগেম থিওরি। ওর এইচ পন বেরোনোর আগেই আমার ই-ফাইলের পন কুইন হয়ে যাবে। কিং ডি-ফাইভ। এতক্ষণে প্রদ্যুম্ন ব্লান্ডার টের পেয়েছে। বাবা সেই কবে একটা এন্ডগেম দেখিয়েছিল— দেখে মনে হচ্ছে হার কিন্তু ড্র করে দেওয়া যায়, অদ্ভুত দান বের করেছিল বাবা। একাই চেলে চেলে দানটা পেয়েছিল। সেরকমই একটা আইডিয়া কাজে লেগে গেল আজ। প্রদ্যুম্নর মুখটা দেখে মায়া লাগছে। মালটা ভাবেইনি এই ক্যালকুলেশন করে মেরে দেব ওকে।

 

পাঁচ.

—তাস, দাবা, পাশা তিন কর্মনাশা জানো তো? দেখো দিদি, পরে আফসোস কোরো না।

পরশু নেমন্তন্ন যাওয়া হবে না। ইশ্‌, বেলাপিসিরা কী যে ভাববে। বুলুর খেলা পড়ে গেল। সাতদিন খেলা। রোববারে শেষ। শনিবার সন্ধেয় যাওয়া হবে না। আমাকেই নিয়ে আসতে হচ্ছে রোজ। দুপুরে খেলা। দুটো থেকে। ওর এত ছুটি কোথায়? আমারও কাজ জমে যাচ্ছে। কালকের মধ্যে ফলস্‌-পিকো করে অত শাড়ি দিয়ে আসতে হবে। পারব না। আর দুদিন সময় চেয়ে নিই। রাত জেগে করে দেব। আজই ফেরার পথে বলে আসব। এত কষ্ট করে বুলু যদি ভাল খেলে তালেই হয়। দাবা খেলে চাকরি হয়, বাপের জন্মে শুনিনি। কুণালের মা বলছিল তো। হয়। রেল, আয়কর আরও কোনও কোনও দফতরে। বুলুটার হিল্লে হলে নিশ্চিন্দি। ধুস, কী করে হবে? গতকাল হেরে গেল। পাঁচ ঘণ্টা খেলল। মুখ ঝুলিয়ে বেরোচ্ছে দেখেই বুঝতে পেরেছি যে হেরেছে। কুণাল জিতেছে, অর্ঘ্য জিতেছে। ওরা এগিয়ে গেল। বাসের ভাড়া, এতটা সময়, সেলাইয়ের টাকা সব নষ্ট। আমি বুঝি না খেলা, তবে ও বলে যে বুলুর মাথা আছে। তা বোধহয় আছে। কান্তিবাবু বলেছিলেন তো, ও আরেকটু মন দিয়ে খেললে প্রথম হবে। আমাদের মতো ঘরে খেলাধুলো হয় না। পুনুর মা সেদিন দুঃখ করছিল পুনুর জন্য। এত ভাল ফুটবল খেলত, বাইরে থেকে ম্যাচ খেলার জন্য ডেকে নিয়ে যেত। কী হল? হাওড়া না হুগলি কোথায় খেলতে গিয়ে পাঁচশো টাকা আর ট্রফি নিয়ে ফিরল। তারপর রোজগারের জন্য মাল ডেলিভারির কাজ করতে করতে খেলার সময় পেত না। আস্তে আস্তে সরে গেল পুনু খেলা থেকে। তকাইদার কী পেটানো চেহারা, কুস্তি লড়ে প্রাইজ পেত। তারপর ঘন্টুমস্তানের দলে ভিড়ে গেল। কাঁচা টাকা। গুণ্ডা তকাই নাম হয়ে গেল। বুলুর দাবায় ঝোঁক শুনে মলি ঠেস দিয়ে বলল সেদিন। বুলুর দাবা খেলা নিয়ে খোঁচা দেবেই ওরা। ভাল মনে পিঠ চাপড়ে দিতে জানে না। ব্বাবাঃ, আমাদের বংশে দাবাখেলার মাতামাতি কবে হল গো? তোর তাতে কী? বুলু খেলছে নিজের আনন্দে, প্রাইজ পাচ্ছে, খেলতে দে না। সত্যিই, কোত্থেকে যে ধারাটা পেল বুলু। ওর থেকেই পেয়েছে বোধহয়। তকাইদা, পুনু, বিল্টুর মতো হতে দেব না বুলুকে। ওকে ভাল ভাল খেলায় নিয়ে যেতে হবে। ও বলছিল বাইরে নিয়ে যাবে রেটিং খেলতে। খেয়ে না-খেয়ে টাকা বাঁচাতে হবে। তাঁতিপাড়ার মোড় থেকে আজ হেঁটেই চলে যাব। ওঃ হো, জল চলে যাবে, এহ্‌ পাঁচটা বাজতে চলল। কল থেকে জল তোলা হয়নি সকালেও। সারাক্ষণ জল পড়বে এমন কল থাকলে কী ভাল হত। তা না, কর্পোরেশনের জল দিনে দুবার। কপালটাই খারাপ এমন। বুলু আজ জিতবে তো? ঠাকুর, আজ জিতিয়ে দিও। দিতি কেমন ভাল খেলছে ইদানীং। কমলস্যারের ইস্কুলে শেখে। বুলুকে ওখানে ভর্তি করলে হয় তো। ওর আবার বাড়াবাড়ি এসব ব্যাপারে। চট করে কোচ বদলানো ঠিক না। গুরুর ওপর বিশ্বাস চলে যায়। কী জানি, আমি ভাল বুঝি না এসব। বুলুর মুখ কালো হয়ে গেলে খুব খারাপ লাগে। ইশ, ও তো চেষ্টা করছে। একটা হেরেছে তো কি, কালকেরটায় ঠিক জিতবে। অর্ঘ্য, দিতিদের থেকে অনেক ভাল খেলে বুলু। কিন্তু কী যে হচ্ছে, সময়টা ঠিক জুত হচ্ছে না। উঁহু। বাইরে খেলতে যাওয়ার আগে বিরাজবাবার আশ্রমে যাব একদিন। অপেক্ষা। অপেক্ষা। একটু বুঝদার হোক বুলু। ঠিক বুঝবে। স্যার বলছিলেন ওকে, শুনেছি আমি রান্না করতে করতে। তাড়াহুড়ো না করে ধৈর্য ধরে উল্টোদিকের ভুলের জন্য অপেক্ষা করতে বলছিলেন। আমিও তো বলি, যে সয় সে রয়। আমাদের এত কষ্টের একটা দাম আছে ঠিকই। ধৈর্য রাখতে হবে। নাঃ, দাদারা যে পিকনিক করছে, যাব না। এমনিতেই ও বলছিল কোন একটা খেলা আছে বেহালায়, নিয়ে যাবে। আমি সেদিন বিরাজবাবার কাছে যাব। দেখি একটু যদি ফুল-জল দিয়ে দেন বাবা। এই বসন্তের হাওয়াটা খুব খারাপ। এঃ, বুলুর আবার ঠান্ডা লাগার ধাত। শীতের মধ্যেই এরম বসন্ত বসন্ত হাওয়া কেন? ঘরে রোদ ঢোকে না ভাল করে। জিনিসপত্র ডাঁই হয়ে ড্যাম মেরে গেছে ঘরে। বুলুর জন্য ওকে একটু মধু কিনে আনতে বলব। দিতির মা রোজ খাওয়ায়। বেশি না, এক চামচ করে দিলেই হবে, ঠান্ডা লাগবে না, বুদ্ধি খুলবে। পরশু নেমন্তন্নটা থাক। ওসব অনেক আসবে। বুলু বড় খেলায় জিতলে তখন আনন্দ করব! কাগজের অফিস থেকে লোকেরা আসবে। ছবি ছাপবে। কুণাল, বিনীতরা একসঙ্গে বেড়াতে যাবে বোধহয়। বাবারা রেল আর ব্যাঙ্ক, কত সুযোগসুবিধে পায়। বুলু যদি বড় হয়ে অমন চাকরি পায়, আমরাও যাব। ওই তো, বেরোচ্ছে বুলু। কিন্তু মুখ দেখে কিছু বোঝা যাচ্ছে না তো। বুলু কেমন খুশি, দুঃখ সব চাপতে শিখে যাচ্ছে। মুখে আর ছাপ পড়ে না। বড় হয়ে যাচ্ছে। ন্না ন্না, চাপ পড়ছে বড্ড বেচারার। আজ জিতেছে, ঠিক জিতেছে। আঃ, মায়ের মন, ঠিক বুঝি।

সুকান্ত চলে যাওয়ার পরে বরফ পড়ত। চারদিক ঝাপসা করা বরফ। বাইরে রোদ। ঝাঁকড়া কৃষ্ণচূড়া গাছ লাল। সমাপনের ভেতরে বাইরে শুধু বরফ জমছে। মাধ্যমিক শুরু হতে দু-সপ্তাহ। বল্লভপাড়ার রক থেকে ফিরেই কেমন অস্থির অস্থির করছিল। পরে জেনেছে চাকরিটা থাকা নিয়ে কয়েক মাস অশান্তি চলছিল। সুকান্ত বাড়িতে বলেনি। থোক টাকা হাতে দিয়ে চলে যাওয়ার কথা বলে দিয়েছিল বড়বাবু। ইউনিয়ন কী একটা রফা করে নিয়েছিল। আর, আর্দালির কাজ হুকুম তামিল করা। উল্টোপাল্টা কারণে ছুটি-নেওয়া বেয়াক্কেলে আর্দালি আর টুলে বসে ঝিমোতে থাকা রাজবাহাদুরের জন্য তেমন কিছু করা যাবে না জানিয়ে দিয়েছিল ইউনিয়ন। পেনশন নেই। ওই থোক টাকা ব্যাঙ্কে রেখে যতদিন চলে চলবে। কয়েক মাসের চাপ বুকে প্রবল ধাক্কা দিয়েছিল। রীতার সেলাই আর সোয়েটার বোনার সামান্য বাজারেও মন্দার গাঢ় ছায়া। কোনওমতে মাধ্যমিক পার করেই ছুটকো কাজ। ছোট্ট প্রেসের ঝুপ্পুস আলো-আঁধারি। দাবার একটা বই বিক্রি করেছিল কলেজ স্ট্রিটে, খুবই সামান্য টাকা। পরেরগুলো কিছুতেই আর বিক্রি করতে পারেনি। মনখারাপ, শোক, স্মৃতিকাতরতা, দাবার ট্রফিগুলোর থেকে চলকে আসা জিতের গন্ধ সবই হালকা হয়ে আসছিল। সিদ্ধান্ত নিতেই হত। জাজমেন্টের বিলাসিতা করার অবকাশ ছিল না। সকাল থেকে কাজ। প্রেস থেকে প্রায়ই বই ডেলিভারির জন্য বাড়ি বাড়ি যেতে হত। তারপর বিকেলে রাতকলেজের ক্লাস। অর্ধেক দিন প্রথম দুটো ক্লাস মিস হত। বাড়ি ফিরে ভেঙে পড়ত সব। শুরুর দিকে বাড়ি ফিরে পুরনো বই, অনুজস্যারের শেখানো গেমগুলো নিয়ে বসত। শুরুর দিকে। তারপর আর বসা হত না। বাড়ি ফিরে ভেঙে পড়ত ক্লান্তিতে। ততদিনে পুরনো পাড়া ছেড়ে আরও সস্তার পাড়ায় ঘর খুঁজে নিয়েছে। শহরে সস্তার পাড়া কমতে কমতে উবে যাচ্ছিল। দামি, আরও দামি পাড়া গজিয়ে উঠছিল। ভোল বদলে যাওয়া পুরনো পাড়ায় সমাপনরা বেমানান। একবছর ড্রপ গেল, পড়া তৈরি হয়নি বলে। তখন সবকিছু থেকে কেমন পালিয়ে যাওয়া। চ্যালেঞ্জ নিতে ভয়। পাঁচ বছর আগের সমাপনের সঙ্গে আকাশ-পাতাল তফাত এই সমাপনের। প্রথম প্রেমের থেকে পালাতে পালাতে হাঁফিয়ে উঠছিল যখন, তখন কান্তিস্যারের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। ততদিনে কি বরফ সরছিল? ইচ্ছেগুলোর ওপরে জমে-থাকা কুয়াশার পরত সরিয়ে রোদ্দুর আসতে চাইছিল? কান্তিস্যার নিজের কম্পিউটার ব্যবহার করতে দিয়েছিলেন। স্যারের বাড়ি গিয়ে কম্পিউটারে গেম দেখত। ফ্রিৎজ সেভেন লাগিয়ে দিয়েছিলেন। মাস ছয়েক প্রিপারেশনের পরে টুর্নামেন্টে নাম দিয়েছিল। হোঁচট খাচ্ছিল। জানত, খাবে। এ তো আর ম্যাজিক না। টুর্নামেন্টের পরিবেশে ধাতস্থ হতে সময় লাগবে। তাই র‍্যাপিড দিয়ে শুরু করেছিল। বিরাটি, সোনারপুর, মনোহরপুকুর, হাওড়া। মনোহরপুকুরের টুর্নামেন্ট থেকে আবার ফিরতে শুরু করেছিল খেলায়। চক্রধরপুরের রেটিং টুর্নামেন্টে খেলতে যাবে বলে রেডি। অনিকেত, নাদিমদের সঙ্গে ট্রেনের টিকিট কাটা, রুম শেয়ার করে থাকার ব্যবস্থাও হয়ে গেছে। মায়ের রিপোর্ট এল সেই সন্ধেবেলা। কোন্নগরের টুর্নামেন্টে চোখে দেখতে পাচ্ছিল না মুভ। চার মুভের কম্বিনেশন মিস। কোনও মতে শেষ দুটো জিতে টেন্থ হয়েছিল। রেটিং বাড়ানো, মাস্টার নর্ম সবকিছুর ওপরে আবার বরফ পড়ে আবার ঢেকে দিচ্ছিল খোয়াবগুলো। এত প্র্যাকটিস, পড়া ছেড়ে কাজ ছেড়ে নতুন ভেরিয়েশন তৈরি করার জন্য পরিশ্রম সমস্তটা কেউ কেড়ে নিচ্ছিল যেন। সেক্রেটারি অতীশ দাশগুপ্ত সমাপনকে দেখিয়ে এক গার্জেনকে বলেছিল, নর্ম-ফর্ম সবার দ্বারা হয় না। ওই খেপ খেলাই ঠিক আছে। জুনিয়র প্লেয়াররা উঠে আসছে। অম্বরীশ, প্রকাশ, সুদীপদের ব্যাচটা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। আন্ডার টোয়েন্টি-ফাইভ স্টেটে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সাড়ে সাত পয়েন্ট উঠল। পনেরো নম্বর। সব সিদ্ধান্ত ভুল হয়ে যাচ্ছিল গেমে। জীবনেও।

***

 

—আর্থার ফয়েরস্টাইন ফিরে এসেছিল, জানিস?
—চিনি না। নাম শুনিনি। সুপার জিএম? জিএম? রেটিং কত?
—ফয়েরস্টাইন রেশেভস্কিকে রুখে দিয়েছিল। ফিশারকেও। ফিশারের সেরা সময় শুরু হচ্ছে তখন। ১৯৫৭।
—ফিশার? ববি ফিশার? অসম্ভব। ১৯৫৭-৫৮ সালের ফিশার ক্রমশ অপ্রতিরোধ্য।
—হ্যাঁ, সেই ফিশার। স্যামুয়েল রেশেভস্কি। পল বেঙ্কো। বিশ্বের সেরার সেরা দাবাড়ুরা এদের ডরাত। তাদের বিরুদ্ধে আর্থার ফয়েরস্টাইনের গেম। পুরনো জার্নালে পাবি। আচ্ছা, খুঁজে তোকে দেব। ফয়েরস্টাইন চারবার নিউ ইয়র্ক স্টেট চ্যাম্পিয়ন। আমেরিকার জাতীয় ব্লিৎজ দাবায় চ্যাম্পিয়ন। ১৯৫৬। ববি ফিশার সেকেন্ড।
—আমাকে শোনাচ্ছেন কেন এসব গল্প? হবে হয়তো ভাল প্লেয়ার। আমি নই। আমি ভুলে যাচ্ছি খেলা। হেরে যাচ্ছি।
—ফয়েরস্টাইনও ওরম ভাবত। খেলায় রোজগার নেই। বড়লোক তো নয়। কাজ খুঁজতে হল। ফয়েরস্টাইন ভেবেছিল দাবা ওকে ছেড়ে চলে গেছে।
—তারপর? এ তো অনেকের গল্প। আমার চেনা কতজন এরকমই। আর ফিরতে পারেনি। চায়ওনি।
—ফয়েরস্টাইনের মারাত্মক অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল। আঠেরো চাকার ট্রাক ধাক্কা মেরেছিল গাড়িতে। দুমড়েমুচড়ে গেছিল গাড়ি, ফয়েরস্টাইন। আমরা যেমন দুমড়ে, থেঁতলে যাই। দু-মাস কোমায় ছিল। যখন জ্ঞান ফিরল, নিজের ভাষা ভুলে গেছে। চিনতে পারেনি আত্মীয়দের। কিন্তু, ও একটা অদ্ভুত জিনিস করেছিল, জানিস? সবাইকে অবাক করে দিয়ে নিউরোসার্জেনের সঙ্গে দাবা খেলছিল। দাবাটা ভোলেনি। স্টেপিং ভুল হত, কথা জড়িয়ে যেত, কিন্তু রোজ দাবা খেলত। ব্রেকফাস্ট খেতে ভুলে যেত কিন্তু নিজের প্রিয় ওপেনিংগুলো নিখুঁত মনে ছিল ফয়েরস্টাইনের। আবার টুর্নামেন্ট খেলতে শুরু করে ফয়েরস্টাইন। সবাই যে বয়সে খেলা ছেড়ে দেয়, সেই বয়সে টুর্নামেন্টে প্রাইজ জিতেছে। হবু-জিএমদের হারিয়েছে। ন্যাশনাল মাস্টারের রেটিং তুলেছে। দাবায় ফিরে বাঁচতে শিখেছিল ফয়েরস্টাইন। তোর আঘাত কি ফয়েরস্টাইনের কোমার থেকেও বেশি, সমাপন? তোর ফিরে আসার পথ কি ফয়েরস্টাইনের জীবনে ফেরার চেয়েও জটিল?

সংলাপের ছেঁড়া অংশগুলো, ভুলে যাওয়া শব্দ, বাক্য নিজের মনে সাজিয়ে নেয় সমাপন। অবিকল মনে থাকে নাকি? অনুজস্যার আর্থার ফয়েরস্টাইনের গল্প বলেছিলেন। কত্ত বছর আগে। তারপর এই কাল্পনিক সংলাপগুলো বানিয়ে তোলে সমাপন। বহুবার বানিয়েছে। নতুন নতুন শব্দ আর অভিব্যক্তি ঢুকে যায় কবেকার এই সংলাপে। কোন এক অতল থেকে ওকে তুলে আনে। তবু বারবার পিছলে যায় সমাপন। অনুজস্যারের ফেভারিট স্টুডেন্ট হতে পারেনি। আইএম হতে পারেনি। হেরে গেছে বিচ্ছিরি ভুল করে। ভুল সিদ্ধান্তে ছটফট করেছে। তবু কোনও এক তুষারপাতের চেয়েও শীতল সময়ে অনুজ স্যারের বলা ফয়েরস্টাইনের গল্পটা ওম দিয়েছে। মরা মাছের মতো জমে যেতে দেয়নি সমাপনকে।

 

ছয়.

—রিস্ক নিয়ে ভাল খেলে হেরে যাওয়ায় কোনও মাহাত্ম্য নেই। বরং একটা কিস্যু না-হওয়া পজিশনে হারার রিস্ক কমাতে কমাতে আর পজিশনটাকে নিংড়ে নিংড়ে জিত বের করার মধ্যে চাম্পি সুখ আছে।

আলোদা বুঝিয়েছিল সমাপনকে। মাথায় গেঁথে আছে। আজ ফাইনাল রাউন্ড। উজবেক গ্র্যান্ডমাস্টারের সঙ্গে খেলা। কিছুতেই হারা চলবে না আজ। কালো নিয়ে অন্যরা ড্র করতে পারলেই খুশি। অদ্ভুত লাগে এটা সমাপনের। ও কালোটাই পছন্দ করে। হোয়াইটের মুভ মেপে নিয়ে রিপ্লাই করা যায়। হোয়াইট ভাবে আপার হ্যান্ড নিয়ে খেলছে, সেটা ব্রেক করতেই তো মজা! এই ভাখোলভের বিরুদ্ধে একবার চিটিংয়ের চার্জ লেগেছিল। অদ্ভুত সব মুভ দিচ্ছিল। পরপর দুটো ওপেন টুর্নামেন্টে। সমাপন ওর গেম দেখেছে। সন্দেহ হয়েছে বটে। কীসব চিপ লাগিয়ে রেখেছিল টুপির ভেতরে, মাথায় টুপি পরে খেলত। ভিনসেন্ট আর ওই আরোমাতোভ, রুশি আইএম কমপ্লেইন ঠুকে দিয়েছিল। অ্যানালিসিস করে দেখেছিল কমিটি। ধরা যায়নি। আরোমাতোভ লাস্ট জিএম নর্ম তুলে নিল এই টুর্নামেন্টেই। সমাপনের সঙ্গে ড্র হল ফোর্থ রাউন্ডে। ভাখোলভ এই টুর্নামেন্টে এখনও অপরাজিত। চারটে ড্র করেছে। ভাল ফর্মে আছে। ধরেই নিয়েছে চ্যাম্পিয়ন হচ্ছে। অতগুলো প্রাইজমানি। ট্রফি। চাপ লাগছে? না, ভয় ঠিক না, কিন্তু কীরকম যেন চাপ। আলোদা শিখিয়েছিল ভয় পাওয়া জরুরি। অতিচালাক আর ওভারকনফিডেন্ট নির্বোধরা ভয় পায় না। কিন্তু একজন ভাল প্লেয়ারকে ভয় পেতেই হয়, চাপ নিতেই হয় তার পারফরম্যান্সের আগে। তারপর ওই ভয়টাকেই একটু একটু করে তাড়াতে হয়। সাহস জোগাড় করে জেতার রাস্তা খুঁজে নিতে হয়। যে প্লেয়ার ভয় পায় না, সে ভয়কে জয় করার স্ট্র্যাটেজিও জানে না। ওই চাপ, ওই অনিশ্চয়তা গেমের পর গেম কাটিয়ে উঠতে উঠতে দেখবি নিজের সেরাটা বার করে আনতে পারছিস। ওগুলো না থাকলে দাবা খেলার মজাটাই পাবি না। আলোদা ওর সঙ্গে কয়েকটা রেটিং টুর্নামেন্টে গেছে। রুম শেয়ার করত। কয়েক বছরের সিনিয়র। দাবার গেম নিয়ে, বিভিন্ন প্লেয়ারের সাইকোলজি নিয়ে কথা হত। আলোদার ইউনিক কিছু অ্যানালিসিস ছিল। কী করে যে ওসব অ্যানালিসিস বের করত! সমাপনকে অত খুঁটিয়ে কারপভের গেম কেউ দেখায়নি আগে। আলোদার পছন্দ ছিল আলেখাইনের খেলা। ওরম কমপ্লিট প্লেয়ার দাবার ইতিহাসে তার আগে আসেনি। ওপেনিং থেকে এন্ডগেম, কী স্কিল লোকটার! অকালে মরে না গেলে কত কী দিতে পারত দাবাকে। চেন্নাইতে সেবার বিশ্বেশরণের সঙ্গে খেলা। বিশ্বেশ্বরণ জিএম নর্ম পেয়েছিল একটা। অভিজ্ঞ। বয়সের সঙ্গে ধার একটু কমেছে, কিন্তু অভিজ্ঞতা প্রচুর। আলোদা সমাপনের সঙ্গে প্র্যাকটিসে বসেছিল। পরের দিন নিজের খেলা কেলকারের সঙ্গে, সেদিকে হুঁশ নেই। বিশ্বেশ্বরণের মিডলগেম প্ল্যানিং-এর ভুলভ্রান্তি বুঝিয়ে দিয়েছিল। বিশ্বেশ্বরণ অধৈর্য, পজিশন হোল্ড করতে চায় না, মিডলগেম থেকে এন্ডগেমে ঢোকার সময় ভুল করে। কোত্থেকে এত গেম অ্যানালিসিস করেছিল কে জানে। কিন্তু পরের দিন আলোদার কথা হুবহু মিলে গেছিল। মিডলগেমের শেষে গিয়েই পন আপ হয়েছিল সমাপনের। তারপর অবশ্য ওই আনন্দেই এন্ডগেমে ছোট্ট একটা ভুল করেছিল। ড্র। কোনও জিএম-নর্ম-পাওয়া খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে সেটাই প্রথম ড্র। কারপভের একটা গেম দেখিয়ে আলোদা বুঝিয়েছিল key-স্কোয়ার দখল করতে হয়। সন্তর্পণে। অপোনেন্টের অ্যাকটিভ পিসের নড়াচড়া বন্ধ করে দিতে হয়। কখনও একটা হোপলেস পজিশন থেকে পা টিপে টিপে এগিয়ে কীভাবে আচমকা লাফ মেরে অপোনেন্টের টুঁটি টিঁপে ধরতে হয়, দেখিয়েছিল আলোদা।

***

 

একটা একটা করে কুইন সাইডে রুক, নাইট জড়ো করেছে সমাপন। দু-ঘণ্টায় চল্লিশ দানের বিপদ কাটিয়ে ফেলেছে। আরও একঘণ্টা জুড়েছে ঘড়িতে। কিং-সাইডে কিচ্ছুটি করেনি। কিন্তু ভাখোলভের বিশপকে আটকে দিয়েছে ওদিকে। রিস্ক কমিয়েছে। কুইনের দিকে আসতে তিনটে মুভ লাগবেই মিনিমাম। ততক্ষণ পন বাড়িয়ে ব্রেক করার সেট-আপ সেরে ফেলা যাবে। তারপর অপেক্ষা করবে ভাখোলভের একটা ভুলের জন্য। নাইটটা কি-স্কোয়ার পেয়ে যাবে ততক্ষণে। জেতার গন্ধ পাচ্ছে সমাপন। জেতার গন্ধ মারাত্মক। একবার এই গন্ধটা পেয়ে গেলে সামনে যত বড় প্লেয়ারই থাকুক পরোয়া করে না। ছোটবেলায় এজ-গ্রুপ স্টেটে স্বর্ণেন্দু একটা স্যাক মেরেছিল। নাইট ই-সিক্স। স্বর্ণেন্দু তখন ফুল অ্যাটাকিং মোডে। পরের ছটা মুভ সমাপন সামলেছিল হাঁকপাঁক করে। আচমকা ব্রেক-থ্রুটা দেখেছিল। কিলার ইনস্টিংক্ট। পাঁচ ঘণ্টা লড়ে জিতে বোর্ড থেকে উঠেছিল সমাপন। পিষে পিষে অ্যাডভান্টেজ বাড়িয়ে। বাবা সেদিন জড়িয়ে ধরেছিল গেমের পরে। অতটা আবেগে ভাসতে দেখেনি কখনও। কিন্তু সেদিন কেন যে বাবার চোখের কোণ চিকচিক করতে দেখেছিল। প্রথম রেটিং ওই টুর্নামেন্টের পরেই। আজও ওরকম একটা পজিশন। জীবনমরণ নির্ভর করছে ভাখোলভের পরের দানটার ওপর। ক্যালকুলেট করছে সমাপন। গাছের ডালপালার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে ভেরিয়েশনগুলো মাথার ভেতর। ভাখোলভ বিশপটা এক্সচেঞ্জ করবে? মুভ দেওয়ার জন্য আঙুল বাড়িয়েছে ভাখোলভ। বিশপটা এক্সচেঞ্জ করুক। দুটো গুরুত্বপূর্ণ ম্যানুভার করবে সমাপন। জীবন সুযোগ দেয় ফিরে আসার। ভালবাসার। সমাপন সুসময়ের অপেক্ষা করতে শিখে গেছে।


*উৎসর্গ মতি নন্দীকে, যিনি ক্রীড়াসাহিত্যকে ভালবাসতে শিখিয়েছেন।

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4725 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

2 Comments

    • অসংখ্য ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা নেবেন

আপনার মতামত...