আর্থিক সমাধান ও আমানত বীমা বিল, ২০১৭ : রাজার হস্ত ও প্রজার ধন

আর্থিক সমাধান

অমিত দাশগুপ্ত

 

ভালোর ভানও ভালো

১৯৪৭ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৬৭ বছর ভারতীয়রা খুব ভাল ছিল এমনটা কোনও সৎ, বিবেচক, সমাজসচেতন মানুষ বলবে বলে মনে হয় না। ওই একটু কম ৭ দশকে দেশে দারিদ্র বেকারি নিরক্ষরতা চিকিৎসাহীনতা শিশুমৃত্যু এসব কিছুই নির্মূল হয়নি। তবে সরকারের সামাজিক দায় নেওয়ার একটা আবরণ ছিল। কথায় বলে, ভালোর ভানও ভালো। সেই ভানটা অন্তত ছিল। তাই কৃষকের জন্য সহায়ক মূল্যের গল্প ছিল, গরীবী হটাও শ্লোগান ছিল, ১০০ দিনের কাজের কর্মসূচী ছিল, শিক্ষার অধিকার আইন ছিল, শিশুশ্রম বিরোধী আইন ছিল, কয়লা, বীমা, পেট্রোল জাতীয়করণ হয়েছিল, রাজন্যভাতা বিলোপ হয়েছিল, আর এসবের মধ্যে সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ জাতীয়করণ ছিল প্রথমে ১৪টি ও পরে ৬টি ব্যাঙ্ককে জাতীয়করণ। এর পাশাপাশি অতিরিক্তভাবে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার জাতীয়করণ তো আগেই হয়েছিল। কিন্তু গত ৩ বছরে সেসব ভালোর ছিটেফোঁটাকেও লুপ্ত করে দেবার প্রচেষ্টা আজ সর্বব্যাপী। শিশুশ্রমবিরোধী আইনকে লঘু করা, শিক্ষার অধিকার আইনে রদবদল আনা, নোট বাতিল করার মতো জনবিরোধী কাজগুলি ক্রমাগতই হয়ে চলেছে। সেই জনবিরোধী কর্মসূচির সাম্প্রতিকটি হল আর্থিক সমাধান ও আমানত বীমা বিল, ২০১৭ (Financial Resolution and Deposit Insurance Bill, 2017) বা এফআরডিআই বিল, ২০১৭।

ভারতের ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা ও রিজার্ভ ব্যাঙ্ক

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এদেশে ৩১৬টি ব্যাঙ্ক ফেল করেছিল ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত। ২০০৮-এর বিশ্বব্যাপী মন্দার সময়ে তেমন কোনও ব্যাঙ্ক লাটে না উঠলেও ১৮টি সমবায় ব্যাঙ্ক লালবাতি জ্বেলেছিল। এই সেদিন, ২০০৪ সালে শেয়ার বাজার ঘোটালা করে গ্লোবাল ট্রাস্ট ব্যাঙ্ক পাততাড়ি গুটিয়েছিল, তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অফ কমার্স তার ব্যবসা নিয়ে নেয়, শেয়ার হোল্ডাররা কিছুই পায়নি, তবে আমানতকারীদের কোনও ক্ষতি হয়নি। তার আগে রাষ্ট্রায়ত্ত নিউ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া যখন ফ্যাসাদে পড়েছিল ১৯৯৩ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের ব্যবস্থাপনায় পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের সঙ্গে নিউ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া মিশে যায়। আমানতকারীদের গায়ে বিন্দুমাত্র আঁচ লাগেনি। তারও আগে, ১৯৮৯ সালে বেসরকারি ইউনাইটেড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ব্যাঙ্কের আমানতকারীদের বাঁচানোর জন্য এলাহাবাদ ব্যাঙ্ক সেটিকে অধিগ্রহণ করে। সব মিলিয়ে ১৯৫৫ সালের পরে ভারতে কোনও বাণিজ্যিক ব্যাঙ্ক লালবাতি জ্বালেনি। ভারতীয় ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার এই যে উত্তরণ তা কিন্তু ঘটেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের তত্ত্বাবধানে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক গঠিত হবার সময়ে ব্যক্তি শেয়ার হোল্ডারদের ব্যাঙ্ক হিসেবে কাজ করত, কিন্তু ১৯৪৯ সালে ব্যাঙ্কটি রাষ্ট্রীয় মালিকানায় চলে আসে। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল ভারতের সংবিধানের মতো রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গঠনেও বাবাসাহেব আম্বেদকারের অপরিসীম অবদান রয়েছে। ভারতে ব্যাঙ্কগুলিকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিজস্বতা বহুলাংশেই সঠিক ভূমিকা রেখেছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির অকার্যকরী সম্পদ (এনপিএ) বৃদ্ধি

এতদসত্ত্বেও, সাম্প্রতিক কালে ভারতীয় ব্যাঙ্ক ব্যবস্থা বিশেষত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি তীব্র মন্দার সম্মুখীন হচ্ছে। ১৯৯০ দশকে নূতন অর্থনৈতিক নীতি প্রণীত হওয়ার পরে, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা শুধরানোর নামে বিভিন্ন কমিটি কাজ করে। কিন্তু রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির অকার্যকরী সম্পদ (এনপিএ) ক্রমাগত বৃদ্ধি পেতে থাকে। বর্তমানে ওই এনপিএ-র পরিমাণ ১০ লক্ষ কোটি টাকার মতো। এর সঙ্গে পুনর্গঠিত ঋণ (খাতক ঋণ শোধের শর্ত মানতে অপারগ হওয়ায় যেসব ঋণের শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে) যোগ দিলে পরিমাণ ১৩ লক্ষ কোটি টাকার মতো। যেহেতু ব্যাঙ্ক কর্তৃক প্রদত্ত সামগ্রিক ঋণের পরিমাণ ৮০ লক্ষ কোটি টাকার কিছু বেশি। তাই অনুরূপ এনপিএ মোট ঋণের ৬ ভাগের এক ভাগ। ওই এনপিএ-র কিছু অংশ প্রতি বছরেই ব্যাঙ্কের খাতা থেকে মুছে ফেলতে হয় অনাদায়যোগ্য ঋণ হিসেবে। গত ৩ বছরেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির ওই রূপ অনাদায়যোগ্য মুছে ফেলা ঋণের পরিমাণ প্রায় ১.৯ লক্ষ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। গত ৫ বছরে তার পরিমাণ ছিল ২.৫ লক্ষ কোটি টাকা; আর ২০১৭-১৮ আর্থিক বর্ষে তার পরিমাণ ৫৫ হাজার কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ অনাদায়ী ঋণের ভারে ব্যাঙ্কগুলির আর্থিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত। তাই সেই ব্যাঙ্ক ব্যবস্থাকে চাঙ্গা করতে, ব্যাঙ্কগুলির স্বাস্থ্য পুনরুজ্জীবনে নূতন দাওযাই নিয়ে আসা হয়েছে যার নাম আর্থিক সমাধান ও আমানত বীমা বিল, ২০১৭ (Financial Resolution and Deposit Insurance Bill, 2017) বা এফআরডিআই বিল, ২০১৭।

শাসকের প্রয়োজনেই আইন

বিলটির বিষয়ে আলোচনায় যাওয়ার আগে একটি বিষয়কে খোলসা করে নেওয়া যাক। এদেশে আইন প্রণীত হয় শাসিতের চাপ বা শাসকের প্রয়োজন থেকে। মহাত্মা গান্ধী গ্রামীণ কর্মনিশ্চয়তা আইন যেমন শাসিতের মধ্য থেকে উঠে আসা গ্রামীণ দরিদ্রদের চাপের জন্য বিধিবদ্ধ হয়েছে, তেমনি শাসকের (শ্রেণির) প্রয়োজনেই এসেছে পণ্য ও সেবা কর (জি এস টি), যার জন্য শাসিতের কোনও আগ্রহ ছিল না। একই ভাবে এফআরডিআই, ২০১৭ বিল চালু নিয়ে সাধারণের তেমন কোনও উৎসাহ নেই, কারণ ওই আইন শাসকের প্রয়োজন, আমার আপনার নয়। সরকার ঋণ পরিশোধে গাফিলতি করা ঋণীদের (প্রতারক!) বিরুদ্ধে কোনও আইনি ব্যবস্থা না নিয়ে অন্য এক আইন আনতেই আগ্রহী। পুঁজির এই দুনিয়ায় আইনকানুন এমনভাবেই তৈরি থাকে যাতে বৃহৎ পুঁজির মালিকরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারে। যেমন রিলায়েন্সের অনিল আম্বানি গোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকার এনপিএ-র জন্য দায়ী থাকলেও আইনিভাবে তাঁর কেশাগ্র ছোঁয়া যাবে না; বিজয় মাল্য অনায়াসে বিদেশ চলে যাবে ব্যাঙ্কগুলির টাকা শোধ না দিয়ে। বৃহৎ পুঁজির শুরুর থেকেই সীমিত দায়ের কোম্পানির ব্যবস্থার মাধ্যমেই সে বন্দোবস্ত করা হয়েছে। তবে এফআরডিআই, ২০১৭ বিল যেহেতু সাধারণ আমানতকারীর আমানতের অনিশ্চয়তা তৈরি করছে তাই এ ব্যাপারে জনসাধারণকে আগ্রহী করে তোলাও দরকার।

কেন্দ্রীয় সরকারের কর্পোরেট পোষণ

বর্তমান সরকার দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনাকে শোধরানোর নামে বারংবার নানা আপাত নাটকীয় ও দায়সারা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। নোট বাতিলের দ্বারা কালো টাকা উদ্ধারের কর্মসূচি আদপে কালো টাকার মালিক ধনীদের বিরুদ্ধে কোনও লড়াই নয়, অসংগঠিত ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত নিম্নবিত্ত গরীব জনসাধারণের দুর্দশাকে বাড়িয়ে তুলে নগদহীন কর্পোরেটমুখী একটি আর্থিক ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠিত করার চক্রান্ত। সেই চক্রান্তকে আরও জোরদার করে তুলতে জিএসটি চালু করে অসংগঠিত ক্ষেত্রকে বিপদে ফেলে সংগঠিত ক্ষেত্রকে বাজারের ভাগ বেশি করে উপহার দেওয়ার প্রচেষ্টা জারি হয়েছে। অনাদায়ী ঋণের জন্য দুর্বল ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার স্বাস্থ্য ফেরানোর জন্য সম্প্রতি ২ লক্ষ কোটি টাকা মূলধন সরবরাহ করার প্রকল্প কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করেছে। যে ব্যবস্থাকে বলা হয় ব্যাঙ্কগুলিকে বেল-আউট করা। একই সাথে এফআরডিআই আইন প্রণয়ন করে বেল আউট করার দায়িত্ব থেকে মুক্ত হতে চাইছে। সরকারের আর্থিক দায় কমানোর যে প্রক্রিয়া নয়া অর্থনৈতিক নীতিতে ৩ দশক আগে শুরু করা হয়েছিল তারই ধারাবাহিকতায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির দায় থেকেও মুক্তি চাইছে এই সরকার। আর্থিক সমাধান ও আমানত বীমা বিল, ২০১৭ (এফআরডিআই)-কে যদি আইনে পরিণত করা যায়, তাহলে একদিকে সাধারণ আমানতকারীদের জমা করা আমানত অসীম ঝুঁকিবহুল হয়ে উঠবে, ব্যাঙ্কব্যবস্থার উপরে সাধারণের আস্থা কমবে, অপরদিকে বহু লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ সম্পূর্ণ অবান্তর হয়ে যাবে। ফলে বলা যেতে পারে, প্রতারক পুঁজিপতিদের অপরাধের দায় বহন করতে হবে সাধারণ আমানতকারীদের ও দেশের বৃহত্তর জনসাধারণকে।

আর্থিক সমাধান ও আমানত বীমা বিলের প্রভাব

এফআরডিআই বিল আইনে পরিণত হলে—

১. কোনও ব্যাঙ্ক অনাদায়ী ঋণ বা অন্য কোনও কারণে বিপদে পড়লে বেল-ইন ধারার মাধ্যমে আমানতকারীদের আমানতকে,
ক. সম্পূর্ণ বাতিল করে দেওযা যেতে পারে [ধারা ৫২(৩)(ক)];
খ. আমানতের শর্ত পাল্টে দেওযা যেতে পারে [ধারা ৫২(৩)(খ)] অর্থাৎ আমানতের মেয়াদকাল বা সুদের হার পাল্টে দেওয়া যেতে পারে;
গ. আমানতের ধরণ পাল্টে দেওয়া যেতে পারে [ধারা ৫২(৩)(খ)] অর্থাৎ আমানতকে সেই অলাভজনক ব্যাঙ্কের শেয়ারে বা প্রেফারেন্স শেয়ারে রূপান্তরিত করা যেতে পারে (অলাভজনক ব্যাঙ্কের শেয়ারের বাজারমূল্য কিছুই থাকবে না)।

২. ব্যাঙ্কগুলিকে ঝুঁকির মাপকাঠিতে ৫ ভাগে বিভাজিত করা হবে [ধারা ৪৫(৫)]। সেগুলির মধ্যে শেষের ৩টি হল–
ক. ব্যাঙ্কটি ফেল করার যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে [ধারা ৪৫(৫)(গ)];
খ. ব্যাঙ্কটি ফেল করার অতিমাত্রায় ঝুঁকি রয়েছে [ধারা ৪৫(৫)(ঘ)];
গ. ব্যাঙ্কটি ফেল করার মতো সঙ্কটকালীন ঝুঁকি রয়েছে [ধারা ৪৫(৫)(ঙ)]।

যদিও বলা হয়েছে উপরোক্ত প্রথম ও দ্বিতীয় ধরণের বিভাজনকে গোপন রাখা হবে। ওই সমস্ত ব্যাঙ্কগুলিকে চাঙ্গা করার বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে ব্যাঙ্কগুলির ঝুঁকির মাত্রা সম্পর্কে তেমন গোপনীয়তা রেখে অনুরূপ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না। এই ঝুঁকির মাত্রা ঘোষণা অবশ্যম্ভাবীভাবে আমানতকারীদের ওইরূপ ব্যাঙ্কগুলি থেকে আমানত তুলে নিতে প্রলুব্ধ করবে। ব্যাঙ্কগুলি ফেল করার অবস্থায় বা সঙ্কটকালীন ঝুঁকির অবস্থায় পৌঁছবে। তখন বেল ইন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

৩. বেসরকারি ব্যাঙ্কগুলির অবৈধ ও আমানতকারীদের স্বার্থ-বিঘ্নকারী কাজকর্মকে রদ করা ছিল ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কসমূহ সরকার কর্তৃক পোষিত থাকার কারণে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার উপর আমানতকারী ও নাগরিকদের আস্থা ছিল অগাধ। এর আগে যখন কোনও ব্যাঙ্ক অসুবিধের সম্মুখীন হয়েছে, সেই ব্যাঙ্ককে অন্য ব্যাঙ্কের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। নূতন আইন ব্যাঙ্ক ফেল করাকে বিধিসম্মত ও নৈতিক করতে চাইছে।

৪. এফআরডিআই আইন সমস্ত রকমের ব্যাঙ্কের জন্য সমানভাবে প্রযুক্ত হবে। ফলে বেসরকারি ব্যাঙ্কের মালিক বা শেয়ারহোল্ডারদের ব্যাঙ্কের এবং আমানতকারীদের আমানতের বিষয়ে যেরকম দায়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রেও সরকারেরও সেটুকু দায়ই থাকবে। সমস্ত যথেষ্ট বা অতিমাত্রায় ঝুঁকি সম্পন্ন ব্যাঙ্কের ক্ষেত্রেই ব্যাঙ্কগুলির আর্থিক স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের প্রকল্প গঠনের দায়িত্ব সমাধান কর্তৃপক্ষের (Resolution Authority) উপর ন্যস্ত হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি ব্যাঙ্ক সম্পর্কে এই সমদৃষ্টিভঙ্গী তাহলে অন্যান্য বিষয়েও কার্যকরী হবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির যে সামাজিক দায়িত্ব ছিল সেগুলি আর থাকবে না। অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলিতে, কৃষি ক্ষেত্রে, স্বনির্ভর প্রকল্পে ঋণ দেওয়া, গ্রামাঞ্চলে ব্যাঙ্কের শাখা খোলার যে দায়িত্ব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে এযাবৎ কাল পালন করতে হয়েছে, সেসব দায়িত্ব থেকেও তাদের অব্যাহতি দিতে হবে।

সারা ভারতে বাণিজ্যিক ব্যাঙ্কের শাখা আছে প্রায় ১,৪৫,০০০। তার মধ্যে প্রায় ৫৩,০০০ গ্রামাঞ্চলে। এটা সম্ভব হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির শাখা সম্প্রসারণের ফলে। শাখার সংখ্যা ৩৭% হলেও মোট আমানতের মাত্র ১০% এবং মোট ঋণের মাত্র ৮% গ্রামাঞ্চল থেকে আসে। ফলে প্রথাগত দিক থেকে গ্রামাঞ্চলে শাখা সম্প্রসারণ লাভজনক নয়। যদি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে সরকার নিস্পৃহ থাকে তাহলে ওই ব্যাঙ্কগুলিও এরূপ সামাজিক দায় পালনে নিস্পৃহ থাকবে।

ফলে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের সকল উদ্দেশ্যগুলিই পরাস্ত হবে।

৫. যেহেতু এই মুহূর্তেই বেশ কয়েকটি ব্যাঙ্কের আর্থিক অবস্থা খারাপ, তাই এফআরডিআই আইন অনুমোদিত হলেই কিছু ব্যাঙ্কের পুনর্গঠন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা আছে। সেক্ষেত্রে বেল-ইন-এর সম্ভাবনাও বর্তমান। তেমনটা ঘটলে দেশের আর্থিক ক্ষেত্রটিই সঙ্কটে পড়বে। যার প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী হতে পারে।

৬. সমাধান কর্তৃপক্ষ ব্যাঙ্কগুলিকে এই আইন অনুসারে বিভিন্ন বিধির আওতায় আনবে। ওই কর্তৃপক্ষ আমানত বীমার বন্দোবস্ত করবে। ফলে বর্তমান আমানত বীমাকারী সংস্থা আমানত বীমা ও ঋণ নিশ্চয়তা নিগমের কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। সমাধান কর্তৃপক্ষ বীমার সীমা নির্ধারণ করবে। উল্লেখ্য বর্তমানে ওই বীমার সর্বোচ্চ মূল্য মাত্র ১ লক্ষ টাকা, যে সীমা আড়াই দশক আগে নির্ধারিত হয়েছে। বর্তমান বাজার মূল্যে যার পরিমাণ অন্তত ৬-৭ লক্ষ টাকায় দাঁড়াবে।

৭. বহু রাজ্যে বিস্তৃত নয় এমন সমবায় ব্যাঙ্কগুলির আমানতের জন্য কোনও বীমার বন্দোবস্ত থাকবে না। ফলে স্থানীয় ভিত্তিতে গঠিত সমবায় ব্যাঙ্কগুলি বিপদে পড়বে।

৮. এফআরডিআই আইনে ব্যাঙ্কগুলির নিয়ন্ত্রক হিসেবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এতদিন যে কাজ করে এসেছে সেই দায়িত্ব সমাধান কর্তৃপক্ষের উপর বর্তাবে। এতদিন ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসা রিজার্ভ ব্যাঙ্কের কোনও ভূমিকা থাকবে না বললেই চলে।

‘ন্যাশনালিস্ট’ সরকার — বিদেশী আইন

আর্থিক সমাধান ও আমানত বীমা বিল আইনে রূপান্তরিত হলে যে সমস্ত মধ্যবিত্ত নাগরিক তাদের সঞ্চয়কে কম সুদের হারেও ঝুঁকিহীনভাবে ব্যাঙ্কে গচ্ছিত রাখতেন, তাদের সেই সঞ্চয়কেও প্রবল ঝুঁকির আওতায় নিয়ে আসবে। সমগ্র সঞ্চয়কেই বিস্তর ঝুঁকিসম্পন্ন শেয়ার বাজার অভিমুখী করে তোলা যাবে। এমন বেল ইন আইনের সুবাদে সাইপ্রাসে আমানতকারীদের আমানতের মূল্য প্রায় অর্ধেক করা হয়েছিল। আমানতের পরিমাণ ৪৭.৫% কমিয়ে দেওয়া হযেছিল। ২০১০ সালে ডড-ফ্রাঙ্ক আইনের দ্বারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাঙ্কগুলিতে এই ধরণের ব্যবস্থা প্রণয়ন করা হয়েছে। সারা বিশ্ব জুড়ে একই ধরণের আইন চালু করার একটি ভাবনা একবিংশ শতকের গোড়ার থেকেই চালু রয়েছে। এফআরডিআই আইন অনুরূপ প্রকল্পের অংশ। জি ২০-র অম্তর্ভুক্ত সমস্ত দেশগুলিতেই এই ধরণের আইন চাপানোর চেষ্টা চলছে। যে শাসক রোজ ভারতীয় ঐতিহ্যের গুণগানে মত্ত, যাদের মতে কৌটিল্যই বিচক্ষণতম অর্থশাস্ত্রী, তারা কিন্তু চলেন মার্কিনীদের কথায়; নকল করেন তাদের আইন।

রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রই মন্দার সময়ে বাঁচায়

ভারতে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার সিংহভাগই রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের অন্তর্ভুক্ত। ২০০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাউসিং বাবল বা সাব-প্রাইম ঋণ বুদবুদ ফেটে যাওযার পরে সারা বিশ্বে যে মন্দার সৃষ্টি হযেছিল তা আমাদের দেশে অত বিপুল সমস্যার সৃষ্টি করতে পারেনি কারণ আমাদের ব্যাঙ্কব্যবস্থা মূলতঃ রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের আওতায় ও পাশাপাশি শিল্পক্ষেত্রেও বেশ বড় একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছিল (যদিও তাকে ক্রমাগত কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে)। রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের আওতায় থাকা ব্যাঙ্কগুলির উপরে জনসাধারণের ভরসা অটুট। কিন্তু সেই ভরসাকেই তছনছ করে দিতে চাইছে এই আইন। এসবই করা হচ্ছে ধান্ধাপুঁজির সঙ্গে গাটছড়া বাঁধা দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদদের প্রভাবে প্রদত্ত লক্ষ লক্ষ কোটি টাকার অনাদায়ী ঋণের বোঝাকে সরাসরি আমানতকারীদের ঘাড়ে চাপানোর জন্য।

রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে দুর্বল করা

মনে রাখা দরকার, ব্যাঙ্কগুলির আপৎকালীন দায় মেটানোর জন্য বিধিবদ্ধ তারল্য অনুপাত (এসএলআর বা স্ট্যাটুটরি লিকিউডিটি রেশিও) রয়েছে। এসএলআর-এর অর্থ হল, নগদ টাকা, সোনা ও সরকারি সিকিউরিটির মোট পরিমাণের সঙ্গে মেয়াদি ও চাহিদা আমানতের মোট পরিমাণের অনুপাত। এসএলআর বেশি থাকলে ব্যাঙ্ক ফেল করার সম্ভাবনা কম থাকে। এসএলআর-এর সর্বোচ্চ হার ৪০% হতে পারে। কিন্তু কর্পোরেট ক্ষেত্রকে বেশি ঋণ দেওয়ার জন্য ওই এসএলআরকে ক্রমাগত কমিয়ে ১৯.৫% য় নিয়ে আসা হয়েছে। এভাবেই ব্যাঙ্কব্যবস্থাকে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলা হয়েছে। আর এখন আমানতকারীদের আমানতকেই বাজিতে তুলতে চাইছে এফআরডিআই বিল।

আমাদের দাবি

সচেতন নাগরিকদের উচিৎ অবিলম্বে এই আর্থিক সমাধান ও আমানত বীমা বিল, ২০১৭-এর বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করা, দাবি করা একে প্রত্যাহার করার। বর্তমানে আমানত বীমার যে সর্বোচ্চ সীমা রয়েছে তা অত্যন্ত কম। আমানতকারীদের স্বার্থরক্ষা করার জন্য বীমাকৃত আমানতের সীমা বাড়িয়ে অন্তত ১০ লক্ষ টাকা করা প্রয়োজন। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির আর্থিক স্বাস্থ্য ফেরানোর জন্য একদিকে সরকারকে ওই ব্যাঙ্কগুলিতে অর্থ সংবহন করতে হবে, অন্যদিকে অনাদায়ী ঋণের জন্য দায়ী সমস্ত শিল্পপতিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে। ওই ধরণের অনুৎপাদনশীল ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বহু ক্ষেত্রেই প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ ও শিল্পপতিদের বোঝাপড়া থাকে। সর্বোপরি রিজার্ভ ব্যাঙ্ককেই ব্যাঙ্কব্যবস্থা শুধরানোর জন্য আরও কার্যকরী করে তুলতে হবে ও বহু লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে অর্জিত ব্যাঙ্ক জাতীয়করণকে অবান্তর ও বাতিল করার অপচেষ্টা থেকে সরকারকে বিরত করতে হবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...