হরাপ্পার গুহা খুঁড়ে ইতিহাসের মাণিক খুঁজছে সতেরো বছরের আলিবাবা

আরশ আলি

চার নম্বর নিউজডেস্ক

 

মিশরের প্রাচীন লিপিতে একটা গোলাকৃতি চাকার ছবি, অনেকটা আমাদের বৌদ্ধ ধর্মচক্রের মতো দেখতে। সেটাই হয়ে দাঁড়াল যত নষ্টের গোড়া। সাঁচির বৌদ্ধ শিলালিপিতে যে চিহ্ন হরবখত দেখতে পাওয়া যায়, আমাদের অশোকস্তম্ভের নীচে এবং জাতীয় পতাকার মাঝখানে ঠেলাগাড়ির চাকার মতো দেখতে যে বস্তুটাকে আমরা অশোকচক্র নামে ডাকি, সেটা হঠাৎ মিশরে পৌঁছল কী করে? কবেই বা পৌঁছল? নিছকই সমাপতন? না কি, কোনও গূঢ় রহস্য লুকিয়ে আছে এর পেছনে? এমন কি হতে পারে, সম্রাট অশোক তার দূত পাঠিয়েছিলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার পাশাপাশি, মধ্যপ্রাচ্যেও? সেই সূত্রেই কি কোনওভাবে ধর্মচক্রের মিশরে পাড়ি?

কাকাবাবু-উপন্যাসের ওপরচালাক-গোছের কিশোরটির মাথায় নয়, প্রশ্নটা উঁকি দিয়েছিল বয়েসে প্রায় সন্তুরই কাছাকাছি ইলাহাবাদের আরশ আলির মাথায়। তারপর সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজার তাড়না তাকে এতটাই পেয়ে বসে যে, স্কুলের পড়াশোনা প্রায় ডকে ওঠার জোগাড়। টার্মিনাল পরীক্ষায় শোচনীয় রেজাল্ট, বেশ কয়েকটা সাবজেক্টে ফেল। স্কুলে শিক্ষকদের বকুনি, বাড়িতে মায়ের। কিন্তু সেসব নিয়ে মাথা ঘামানোর সময়ই নেই ছেলের। সে তখন লাইব্রেরিতে ঘুরে ঘুরে বইপত্র জোগাড় করছে। প্রাচীন মিশরের ইতিহাস ও অশোকের বৌদ্ধধর্মপ্রচার নিয়ে লেখা বই। এবং বলা বাহুল্য, কোত্থাও প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছে না। স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষককে গিয়ে ধরেছিল, তিনি হেসেই উড়িয়ে দিয়েছেন। যোগাযোগ করেছিল ইতিহাসের আরও বেশ কয়েকজন গবেষকের সঙ্গে। তাঁরাও, হয় ’ডেঁপো ছেলের’ এহেন পাকামিকে পাত্তা দেননি, কিংবা হিয়েরোগ্লিফিক্‌সের চিহ্নমালায় ধর্মচক্রের মোটিফকে নিছকই সমাপতন বা চোখের ভুল বলে পাশ কাটিয়ে গিয়েছেন।

কিন্তু সতেরো বছরের আলির একরোখা জেদকে দমানো যায়নি। জেদের ইতিহাস তার খুব নতুন নয় যে। ক্লাস টু-তে পড়তেই হয়েরোগ্লিফিক্‌স নিয়ে চর্চা শুরু হয়েছিল তার। মূলত মায়ের আগ্রহেই। সাত-আটবছরের ছেলেমেয়েরা যেমন ড্রইংখাতায় সুপারম্যান বা ডাইনোসরের ছবি আঁকে। কিন্তু ফতিমা ভাবতে পারেননি, বিষয়টা এতটা সিরিয়াস হয়ে দাঁড়াবে। গোটা স্কুলজীবন মিশরীয় চিত্রলিপিমালা নিয়ে রীতিমত গবেষকের আগ্রহে চর্চা করে গিয়েছে ছেলে। কতটা সিরিয়াস সে চর্চা? আলিকেই জিগ্যেস করে দেখুন। উত্তরে এখনও-ভালো-করে-গোঁফ-না-ওঠা মুখ যথাসম্ভব গম্ভীর করে সে বলবে, “হিয়েরোগ্লিফিক্‌স বর্ণমালায় লাখের বেশি চিত্র-হরফ রয়েছে। ফলে, সময় তো লাগবেই। আর, শুধু বর্ণই তো নয়, মিশরীয় ভাষার ব্যাকরণটা শেখাও তো দরকার।“ কদ্দূর শিখলে এই ক’বছরে? আলির পাশ থেকে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে এগিয়ে আসবেন দিল্লির ন্যাশনাল মিউজিয়ামের ডিরেক্টর জেনারেল, অধ্যাপক বি আর মণি। প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি জানাবেন, “এই মুহূর্তে গোটা দেশে হিয়েরোগ্লিফ লিপিতে প্রাচীন মিশরীয় ভাষা লিখতে পারে এমন একজনই আছে। তার নাম আরশ আলি।“

এবং এটুকু বলেই থামবেন না তিনি। “আলিকে প্রথম দেখি বছরদুয়েক আগে, গুয়াহাটিতে এক সেমিনারে। তখন ও সবে পনেরো। কথা বলেই বুঝতে পেরেছিলাম এ ছেলে বহু দূর যাবে। আমি এত ইমপ্রেস্‌ড হয়ে গিয়েছিলাম যে, তৎক্ষণাৎ ওকে ন্যাশনাল মিউজিয়ামের ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ লেকচার-সিরিজে পেপার পড়ার আমন্ত্রণ জানাই। সত্যি বলতে কী, এই বয়েসে ও যা করেছে, বাকি জীবনে আর কিছু না-করলেও ওর অনায়াসে চলে যাবে,” ঘোর-লাগা চোখে দু’বছর আগের স্মৃতি হাতড়ে বলতে থাকবেন মণি সাহেব।

এই বয়েসে আর কী কী করেছে আলি? যে বয়েসে ছেলেরা সবে লুকিয়ে সিগারেটে টান দিতে শেখে কিংবা ফেসবুক-হোয়াট্‌সঅ্যাপে দিন কাবার করে দেয়, সেই বয়েসে আলি হাতে তুলে নিয়েছে প্রত্নতাত্ত্বিক উৎখননের গাঁইতি আর বেলচা। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়ার গবেষকদলের সঙ্গে পৌঁছে গিয়েছে রাজস্থানের বিজনোরের কাছে হরাপ্পার আমলের একটি এক্সক্যাভেশন সাইটে। নিছক কৌতূহলী পর্যবেক্ষক হিসেবে নয়, দস্তুরমত একজন উৎখনক হিসেবে। তখন তার বয়েস মাত্র পনেরো। সেখান থেকে ফিরেই ডেকান কলেজের প্রত্নতত্ত্বের অধ্যাপক বসন্ত শিন্ডের আমন্ত্রণে যোগ দিয়েছে সিন্ধু সভ্যতার যুগের আর একটি প্রত্নগবেষণাক্ষেত্র রাখিগড়িতে উৎখননের কাজে। খননকার্য ও গবেষণার পাশাপাশি এখন সে হাত দিয়েছে বেদ অনুবাদে। ইংরেজিতে নয়, প্রাচীন মিশরীয় ভাষায়, হিয়েরোগ্লিফিক্‌সে। এরই মধ্যে সময় করে ইজিপ্‌শিয়ান বুদ্ধিজ্‌ম নিয়ে পেপার তৈরি করেছে ন্যাশনাল মিউজিয়ামের লেকচার-সিরিজের জন্য।

বিশেষ করে এই বছরটা একটু বেশিই ব্যস্ততায় কাটছে আরশ-এর। কারণ, ওই ধর্মচক্রের ভূত। ধর্মচক্র হিয়েরোগ্লিফ বর্ণমালায় জায়গা পেল কীভাবে, তা নিয়ে গবেষণার কাজে ইতিমধ্যেই মধ্যপ্রদেশের সাঁচি, কায়রোর সুপ্পারা ও সাক্কারায় সরেজমিন অনুসন্ধান চালিয়ে এসেছে সে। এবং প্রাথমিক অনুসন্ধান থেকে যেটুকু হদিশ মিলেছে তাতে রীতিমত উত্তেজিত আলি। “আমি জানতাম উত্তর পাবই। তবে যা ভেবেছিলাম, পেয়েছি তার চেয়ে অনেক বেশি। সম্রাট অশোকের হাত ধরেই যে আমাদের বৌদ্ধ ধর্মচক্র মিশরে পাড়ি দিয়েছিল, তা মনে করার যথেষ্ট সঙ্গত কারণ রয়েছে। আমার এই ভাবনার যে সারবত্তা আছে, তার সমর্থনে দু’তিনটে সূত্র পেলেই আমার চলত। কিন্তু পেয়েছি প্রায় পঞ্চাশ থেকে আশিটা। এমনকী সম্রাট অশোকের ব্রাহ্মী ভাষায় লেখা শিলালিপিতে আমি স্পষ্ট উল্লেখ পেয়েছি মিশরের ফারাও ও গ্রিক রাজাদের। শুধু তা-ই নয়, মিশরে আমি ব্রাহ্মী লিপি খোদাই-করা মৃৎপাত্রও পেয়েছি…” আবিষ্কারের উত্তেজনায় চোখ চিকচিক করে ওঠে দেশের সর্বকনিষ্ঠ প্রত্নতত্ত্ববিদের। সেখানেই না-থেমে, অশোকের শিলালিপি ধরে ধরে আলি দেখাতে থাকে, কোথায় কোথায় রয়েছে সেসব উল্লেখ।

হ্যাঁ, আরশ ব্রাহ্মীটাও পড়তে পারে গড়গড় করে, উর্দু-হিন্দির মতোই।

Facebook Notice for EU! You need to login to view and post FB Comments!
About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3842 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...