একটি মিছিল এবং…

রাণা আলম

 




লেখক প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক।

 

 

 

কিছুদিন আগের কথা। দক্ষিণ কলকাতার শহরতলি। ফ্ল্যাট কেনার জন্য কথা বলছি ফ্ল্যাটের মালকিনের সাথে। সুসজ্জিত ড্রয়িংরুমে সোফার পাশের টেবিলে Marcel Proust এর ‘ইন সার্চ অফ লস্ট টাইমস’। কথাপ্রসঙ্গে জানালেন যে তিনি যাদবপুরে কম্পারেটিভ লিটারেচার পড়েছেন। মোটামুটি কথা এগোনোর পর আমার নাম জানতে চাইলেন।

বললাম,
‘মাহফুজ আলম।’

সোফার উল্টোদিকের ফর্সা মার্জিত মুখ খানিক মেঘাচ্ছন্ন হল। তারপর একটু থেমে বললেন,
‘দেখুন, আমার আপত্তি নেই কিন্তু ফ্ল্যাটের বাকিরা আপনাকে থাকতে দেওয়ার ব্যাপারে রাজি হবেন না।’

আমি মৃদু হাসলাম। এটা আমার কাছে নতুন কিছু নয়। চাকরিসূত্রে কলকাতায় আসার পর ঘরভাড়া থেকে নিজের জন্য ফ্ল্যাট কেনার চেষ্টা করা, এই লম্বা রাস্তায় আমি অনেকবার শুনে ফেলেছি যে আমি মুসলমান তাই আমাকে ফ্ল্যাট দেওয়া যাবে না। কখনও সরাসরি আর কখনও বা ঘুরিয়ে ভদ্রলোকের ভাষায়। বিরক্ত লাগল ব্রোকারের উপর। আগেই বলেছিলাম যে আগে জেনে নেবেন রিলিজিয়ন সংক্রান্ত ইস্যু আছে কিনা। হতভাগা ব্রোকার বড়মুখ করে বলেছিল যে ইনি পেশায় শিক্ষিকা, ওরকম নন, ইত্যাদি ইত্যাদি।

সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছি, শুনতে পেলাম গৃহকর্ত্রী চাপা গলায় ব্রোকারকে বকছেন, ‘তোমাকে মুসলমান খদ্দের আনতে কে বলেছে? জানো না, আমাদের বাড়িতে এসব অ্যালাউড নয়?’

ফ্ল্যাটের সামনের গলি রাস্তাটা স্টেশনের দিকে গেছে। সন্ধে সাতটার আলো-আঁধারিতে আমি তখন সেদিকেই হাঁটা দিলাম। একটা অদ্ভুত বিরক্তি চেপে বসছিল মাথার মধ্যে। শুধুমাত্র মাইনরিটি কম্যুনিটি থেকে উঠে এসেছি বলেই কি এতটা হেনস্থার মুখোমুখি হতে হচ্ছে? প্রত্যেকবার এই নাম শুনে বাদ যাওয়ার সময় আমার সাড়ে তিনদশকের দুনিয়াদারিতে অর্জিত শিক্ষা-চেতনা সবই ধর্ষিত হয়। বুঝতে পারি আমার অস্তিত্ব কোথাও না কোথাও সেই অপাংক্তেয় মাইনরিটি আইডেনটিটিতেই আটকে আছে।পরিচিতরা এতদিন পাখি পড়ার মতন করে বোঝাচ্ছিলেন পার্ক সার্কাস বা তপসিয়ার মতন মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় ফ্ল্যাট খুঁজতে। কিন্তু বাম এবং প্রগতিশীল রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু বলে পরিচিত জায়গায় কেন আমি নিজের নামে ফ্ল্যাট পাব না সেইটের সদুত্তর কারুর কাছে পাইনি।

শক্তি-সুনীল-ঋত্বিক আর নবারুণের তিলোত্তমা কলকাতা আমার কাছে ক্রমশ ফ্যাকাশে হয়ে উঠছিল। মনে হচ্ছিল এইবার সরকার বাহাদুরকে বদলির দরখাস্তটা দিয়ে ফেলি। পরিচিত মানুষজন, যারা অধিকাংশই সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের, তারা জানতেন যে কীভাবে প্রতিনিয়ত এই বাড়ি খোঁজার চেষ্টায় আমি অপমানিত হয়ে চলেছি। মৌখিক দুঃখপ্রকাশ বা আলগা সহানুভূতির বাইরে তাদের কাছ থেকে কিছু পাইনি। অবশ্য, এটাও ঠিক যে এটা নিয়ে তাদের সত্যিই কিছু করার ছিল না। আমাকে যেমন একাংশের কাছে পাকিস্তান বা আফগানিস্তানের তালিবানি শাসনের দায়ভার বইতে হয় নামের সৌজন্যে, তারাও হয়ত সংখ্যাগুরুর এই অন্যায়ের ভার বয়ে বেড়ান প্রতি মুহূর্তে।

ঠিক সেইসময়, আসামে এনআরসির চক্করে উনিশ লাখ মানুষকে রাষ্ট্র রাতারাতি ঠিকানাহীন বানিয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে ঢোকাতে চাইছে। ঊনত্রিশ জন দেশের মানুষ, আমার আপনার সহনাগরিক ডিটেনশন ক্যাম্পে বন্দি অবস্থায় মারা গেছেন। অমিত শাহ হুঙ্কার দিচ্ছেন যে গোটা দেশে এনআরসি হবে আর মুসলমান ছাড়া বাকিদের নাকি নিঃশর্ত নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। জামিয়া মিলিয়া ইসমালিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে ঢুকে পুলিশ ছাত্রদের পিটিয়েছে। আলিগড় থেকে হোস্টেলে পুলিশ ঢোকার খবর আসছে। তারমধ্যেই কলকাতার রামলীলা ময়দান থেকে নাগরিক মিছিলের ডাক দেওয়া হল এনআরসি আর ক্যাবের বিরুদ্ধে।

এর আগে বহু রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক মিছিলে হেঁটেছি। এইবার হাঁটার জন্য খুব তাগিদ বোধ করছিলাম না। নির্ধারিত সময়ের বেশখানিক পরে মিছিল শুরু হল।তারপর বুঝতে পারলাম যে এইরকম অত্যাশ্চর্য মিছিলে আমি আগে কখনওই হাঁটিনি।অসংখ্য বিভিন্ন বয়সের মানুষ নিজেদের মতন ব্যানার-পোস্টার নিয়ে রাস্তায় নেমেছেন। শ্লোগানে-গানে-কবিতায় ভরপুর এই মিছিল। যেটা খুব করে বলা দরকার যে আমার চারপাশে যারা মিছিলে হাঁটছিলেন এবং মোদি-শাহের বিরুদ্ধে তারস্বরে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন তারা অধিকাংশই সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মানুষ। যাওয়ার পথে মিছিলের বয়স্কা মহিলাদের জন্য সাময়িক বিশ্রামের জন্য বসার চেয়ার এগিয়ে দিচ্ছিলেন স্থানীয় অবাঙালি দোকানের মানুষজন। যেখানে মিছিল পুলিশ আটকে দিল সেখানে স্থানীয় মানুষজন জল আর বিস্কুট দিচ্ছিলেন আমাদের।

এ এক অবাক করা মিছিল যেখানে কোনও নেতা নেই, আলাদা করে অর্গানাইজ করা নেই, সব্বাই নিজের তাগিদে রাস্তায় নেমেছেন রাষ্ট্রের চোখে চোখ রেখে তার এক্তিয়ার বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। মিছিলে আমার পাশে অনেকখানি রাস্তা মৃদু পায়ে হাঁটছিলেন এক বিরাশি বছরের মানুষ। আর সামনে উদাত্ত গলায় শ্লোগান দিচ্ছিল যেসব কমবয়সের ছেলেমেয়েরা তার অনেকেই খুব বেশি হলে আঠেরো পেরিয়েছে। রাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু মানুষ তার সংখ্যালঘু সহনাগরিকের নাগরিক অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হয়ে রাস্তায় নেমেছে, এর থেকে বড় পাওনা আর কী হতে পারে?

পড়ন্ত বিকেলের মায়াবী আলোয় মিছিল শেষ হল। সে অপার্থিব আলোয় ভরে যাচ্ছিল প্রত্যেকটি প্রতিবাদী মুখ। আমার নুইয়ে পড়া মেরুদণ্ডে যেন নতুন করে জোর এল। যেখানে আমার সহনাগরিকরা আমার অধিকারের জন্য রাস্তায় নামেন সেখানে আমার কীসের বিছিন্ন হওয়ার ভয়?

গোটা দেশে নতুন নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। অসংখ্য মানুষ রাস্তায় নামছেন প্রতিবাদে সামিল হতে। হিন্দুত্ববাদের তাস খেলে যারা দেশটাকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বানাতে চাইছিলেন তারা বুঝতেই পারেননি গান্ধি-রবীন্দ্রনাথের দেশের মাটির জোর কতটা।

এখানে আট থেকে আশি রাষ্ট্রের চোখরাঙানি ফিরিয়ে দিতে পারে স্পর্ধিত চেতনায়।এখানে মানুষের জন্য আওয়াজ ওঠে। গান্ধির চেতনায় শাহিনবাগ-পার্কসার্কাস-রোশনবাগে শান্তিপূর্ণ জমায়েত শুরু হয় যা শাসকের শিরদাঁড়ায় কাঁপুনি ধরাচ্ছে এখন।

এইটে আমার দেশ। আমার ভারতবর্ষ। কারও বাপের সম্পত্তি নয়।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4046 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...