ভাইরাস

ভাইরাস: মনোজ কুমার গোস্বামী | অনুবাদ: বাসুদেব দাস

মনোজ কুমার গোস্বামী

মূল অসমিয়া থেকে বাংলা অনুবাদ: বাসুদেব দাস


১৯৬২ সনে অসমের নগাঁও জেলায় গল্পকার, লেখক, সাংবাদিক মনোজ কুমার গোস্বামীর জন্ম হয়। গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের ছাত্র শ্রীগোস্বামী অসমের প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্র ‘নতুন দৈনিক’, 'আজির বাতরি’, ‘আমার অসম’, ‘দৈনিক জনসাধারণ’ ইত্যাদি পত্রপত্রিকার সম্পাদনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে ‘ডি ওয়াই ৩৬৫’ নামে উত্তর পূর্বাঞ্চলের একটি জনপ্রিয় টিভি চ্যানেলের ম্যানেজিং এডিটর। ‘সমীরণ বরুয়া আহি আছে’, ‘মই রাজেন বরুয়াক সমর্থন করো’, ’এলুমিনিয়ামর আঙ্গুলি’ লেখকের অন্যতম গল্প সংকলন।


অনুবাদক পরিচিতি: ১৯৫৮ সনে অসমের নগাঁও জেলায় বাসুদেব দাসের জন্ম। গৌহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও ভাষা তত্ত্বে এম এ।  আজ পর্যন্ত অসমিয়া অনুবাদ গল্পের সংখ্যা ৪৫০টির ও বেশি। প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৯।

 

 

 

রাতে অনাদির শরীরের ওপর দিয়ে একটা ইঁদুর পার হয়ে গেল। ধড়মড় করে জেগে উঠে লাইট জ্বালিয়ে সে উঠে বসল। রাতের বেলা প্রায়ই সে রান্নাঘর আর বারান্দায় ইঁদুর নেংটি ইঁদুর দৌড়ে বেড়ানোর শব্দ শুনতে পায়– কিন্তু ক্ষুধার্ত প্রাণীগুলিকে সে ক্ষমা করে আসছিল। কিন্তু ওই রাতে তারা সমস্ত সীমা ছাড়িয়ে গেল। স্টোর রুমটার একপাশে আধবস্তা চাল, স্যানিটাইজারের দুটো বোতল, ফিনাইল, ছোট বড় কয়েকটি টিন এবং কিছু পুরনো খবরের কাগজ এবং ম্যাগাজিন। এই রম্যভূমিতে ইঁদুরগুলির সাহস বেড়ে গেছে। অনাদি স্তম্ভিত হয়ে দেখে বস্তার এক কোণে নেংটি ইঁদুরটা মাথা তুলে তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে প্রত্যাহ্বানের ভঙ্গিতে। মাটি থেকে একপাটি স্যান্ডেল তুলে ইঁদুরটার দিকে সজোরে ছুড়ে মারতে গিয়ে অনাদি থমকে গেল, পাশের ঘরে মা শুয়ে রয়েছে। মায়ের ঘুম খুব পাতলা।

গায়ের ওপর দিয়ে ইঁদুর ঘুরে বেড়ানো কি কোনও শুভ লক্ষণ? কোনও গুড সাইন? না কোনও দুর্ভিক্ষের আগামী সঙ্কেত। যা– আজ তোকে ক্ষমা করে দিলাম। বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে অনাদি সিঁড়ি বেয়ে ছাদে উঠে আসে।

সিগারেটের প্যাকেটটা খুলে অনাদি থমকে গেল। কেবলমাত্র একটা সিগারেট বাকি। দেশলাইয়ের বাক্সে কেবল কয়েকটি কাঠি রয়েছে। দেশে দুর্ভিক্ষ এসে গেল নাকি? পাশের পানদোকান, গুমটি সবই দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। লকডাউন চলছে। অনাদিদের ফ্ল্যাটের ছাদে বিশৃঙ্খল আবর্জনা, একটা টিনের ড্রাম, দুটো জীর্ণ গাড়ির টায়ার, রশিতে মেলে রাখা শাড়ি, অন্তর্বাস এবং বিভিন্ন ভঙ্গিতে ঝুলতে থাকা প্যান্ট-পায়জামা। ইস, সিগারেটটা শেষ হয়ে গেল। অথচ আজ তার একটা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবার কথা ছিল। দেওয়ালে কনুইয়ে ভর দিয়ে বিপজ্জনকভাবে হেলান দিয়ে সে নিচের দিকে তাকাল– রাত গভীর হয়নি। অথচ দূর দিগন্ত পর্যন্ত কোনও জনপ্রাণী নেই। মৃত সাপের মতো রাজপথ পড়ে রয়েছে। শিরা-উপশিরার মতো ফাটতে চলা অলিগলিগুলি শূন্য, যেন পরিত্যক্ত। কোথাও সাইরেনের শব্দ। অনাদি শেষ সিগারেটটা জ্বালাল। এক ঝাঁক ঠান্ডা বাতাস আগুনের শিখাকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়েছিল, গলিগুলিতে জল জমে আছে, মেইন রোডে স্ট্রিট লাইটের বিচ্ছুরিত আলোর খেলা দূরদূরান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ লকডাউন চলছে।

হাতের পয়সা শেষ হয়ে আসছে। রান্নাঘরে দীর্ঘদিন নিরামিষ ডাল-ভাত। আবদ্ধ শৃঙ্খলিত মানুষ নিস্তেজ হয়ে আসছে। জীবনের রং-রস শেষ হয়ে আসছে। সবচেয়ে বড় কথা– সিগারেট শেষ হয়ে গেছে। অনাদি পকেট থেকে মোবাইল বের করল। ফেসবুকে নিজের প্রোফাইল পিকচারটা দেখল– খুব কি করুণ, হতাশাগ্রস্ত, বিষণ্ণ একটি মুখ? নাকি তাকে খুব ডেসপারেট দেখাচ্ছে? চারদিন আগের কথা– অনাদির ফেসবুক মেসেঞ্জারে প্রথম রাতে শব্দগুলি এভাবে এসেছিল।

-কিছু একটা করতে চাও? তোমার কিছু টাকার প্রয়োজন?

’ভাইরাস’ নামে একটা অ্যাকাউন্ট থেকে প্রশ্নগুলি এসেছে। ডিপিতে কোনও ছবি নেই।

-মানে?
-মানে একটা টাস্ক আছে। যদি তুমি করতে পারো– তুমি কিছু টাকা পাবে।
-আমাকে কেন? পৃথিবীতে এত লোকজন থাকতে? অনাদির সরল প্রশ্ন।
-কারণ আমি জানি এই মুহূর্তে তোমার একটা কাজ, কিছু টাকা খুবই জরুরি। আমি তোমাকে ফেসবুকে ফলো করেছি। তোমার পোস্ট পড়েছি। তোমার কবিতা পড়েছি। তোমার ফ্রাস্ট্রেশন বুঝতে পেরেছি। আমি তোমাকে বুঝতে পারছি। কিন্তু কেবলমাত্র ক্রোধ, বিদ্রোহের দ্বারা কোনও কাজ হাসিল করা যায় না। আই ওয়ান্ট টু হেল্প ইউ আউট।
-দরকার নেই। গুড নাইট।

শেষ দুটি শব্দে মেসেঞ্জারে সেই কথোপকথন শেষ করে দিতে চেয়েছিল অনাদি। দুনিয়া ঠগ আর প্রবঞ্চকে ভরে গেছে। এই ফেসবুক অ্যাকাউন্টটার কোনও পরিচিতি নেই, কোনও মুখ নেই। ‘ভাইরাস’ হয়তো তাড়াহুড়ো করে বানানো একটা অ্যাকাউন্ট। ফ্রেন্ড নেই, বিশেষ কোনও পোস্ট নেই। কিন্তু সেই অপরিচিত ব্যক্তিটি যে তাকে কিছুদিন ধরে ফলো করে আসছে অনাদির তা বুঝতে বাকি রইল না। কখনও খুব হতাশায়, খুব ক্রোধে কিছু একটা লিখে ফেলে। বিক্ষিপ্ত মন্তব্য। মাস তিনেক আগে অনাদি কবিতার মতো ফেসবুকে কিছু একটা লিখেছিল, তিনি সেটাও পড়েছেন। তার নিজেরই স্পষ্ট মনে নেই।

-শঙ্খের মতো নিস্তেজ তার মুখ, দুটি হাত তার বরফ শীতল। তার চোখে চন্দন কাঠের রক্তিম চিতা জ্বলে, উষ্ণ সজল।– এরকমই কিছু একটা। নিজেই ভুলে গেছি। ধুত্তেরি বলে সে মেসেঞ্জার বন্ধ করে দিল।

কবুতরের খাঁচার মতো অনাদির দাদার এই ফ্ল্যাটটা। ২বিএইচকের নামে সাড়ে সাতশো স্কোয়ার ফিটের ঘরটিতে দাদা-বৌদি, সাত বছরের ভাগ্নি, মায়ের সাথে অনাদিও মাথা গুঁজে পড়ে রয়েছে। এদিকে সারাদিন জুড়ে দাদা-বৌদির সংঘাত এবং মিলনের বিভিন্ন দৃশ্য, অসুস্থ মায়ের অরণ্য রোদন, পিকলুর মোবাইল গেম এবং তার বিভিন্ন আবদার, বৈঠকখানার টেলিভিশনটিতে দিবারাত্র নিউজ আর সিরিয়ালের কোলাহল– এই সবের মধ্যে অদ্ভুত সহাবস্থান অনাদির। টেলিভিশনে দেশে দেশে করোনা ভাইরাসের আগ্রাসনের খবর। নিউইয়র্কে তৈরি হয়েছে গণকবর। অয়েল প্রাইসের ঐতিহাসিক পতন। তাসের মতো খসে পড়েছে বিশ্বের অর্থনীতি। ভারতে কী আবার লকডাউন বাড়বে? অনেক রাত পর্যন্ত তার ঘুম এল না। কাল এক প্যাকেট সিগারেট জোগাড় করতে হবে।

কিন্তু পরের দিন ঘুম থেকে ওঠে সে দেখে আবার সেই অজানা লোকটির কাছ থেকে বার্তা এসেছে। –-কী, তুমি রেডি?

-কী চান আপনি?
-লকডাউন চলছে। কোথাও কাজ নেই। টাকা নেই। আমি তোমাকে একটা কাজ দিচ্ছি। তার পারিশ্রমিকও পাবে।
-কত?
-পাঁচ লাখ।
-হোয়াট? অনাদি স্তম্ভিত হয়ে যায়। কোনও প্রবঞ্চকের কাণ্ড বলে ভাবে। কিন্তু প্রবঞ্চিত হওয়ার মতো তার তো কিছুই নেই। হাত খালি, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খালি। তাই প্রস্তাবটির প্রতি অনাদি কিছুটা আগ্রহী হয়ে ওঠে–

-কী কাজ?
-প্রথমে বলো তুমি রেডি কিনা?
-পাঁচ লাখ টাকার জন্য আমি নিজেকে খুন করতেও দ্বিধা করব না।

অনাদির রসবোধ উপেক্ষা করে ‘ভাইরাস’-এর উত্তর এল ঠিক হিন্দি সিনেমার বিখ্যাত সেই ডায়ালগের মতো– কাজ আরম্ভ করার পূর্বে ৫০ পারসেন্ট, কাজ শেষ হওয়ার পরে ৫০ পারসেন্ট। রেডি?

-কাজটা কী? কোনও মার্ডারের প্ল্যান নয় তো? হা-হা-হা-
-একদম ঠিক! একটা খুন করতে হবে। একেবারে ইজি টার্গেট।

অনাদি কিছুক্ষণ উত্তর দিল না। কোনও পাগল হবে হয়তো।

-হ্যালো? ওপাশে অপরিচিত ব্যক্তিটি অপেক্ষারত।

২৮ বছরের জীবনে অনাদি বহু তুফান পার হয়ে এসেছে। অনেক স্বপ্নভঙ্গ, অবহেলা, ব্যর্থতা, নৈরাশ্য এবং প্রেমহীনতায় কখনও আত্মহত্যার কথাও ভেবেছে। এই ধরনের একটি মানুষের সঙ্গে কেউ ধামালি করতে পারে।

-হ্যালো! আর ইউ ডেয়ার? পুনরায় প্রশ্ন ভেসে এল!
-বলুন!
-তুমি প্রস্তুত?
-বলে যান।
-প্রোফাইলে দেখছি তুমি এই মহানগরে থাক। আমি একটা অ্যাড্রেস দেব– একটা অ্যাপার্টমেন্টের। ওর ভেতরে ঢুকতে তোমার অসুবিধা হবে না। নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটটিতে মহিলাটি থাকেন। তোমার টার্গেট।
-মানে? আমি মহিলাটিকে…
-ইয়েস, ইজি টার্গেট, তার জন্য তুমি পাঁচ লাখ টাকা পাবে। অর্ধেক টাকা কাজের আগে। ইয়েস অর নো? হ্যাঁ না না?

অনাদি ফোনটা সামলে রাখে। জীবনে সে কত কিছু করার চেষ্টা করেছে। পঞ্চাশটারও বেশি ইন্টারভিউ দিয়েছে। ছোটখাটো ব্যবসা করার চেষ্টা করেছে। কখনও কোথাও এগিয়ে গেছে, কখনও পালিয়ে এসেছে। পৃথিবী কি তার জন্য কোনওরকম সংস্থাপন রাখেনি? পৃথিবীর কি একটি গ্র্যাজুয়েট শক্তসমর্থ ছেলের কোনও প্রয়োজন নেই? তার কি কোনও ভবিষ্যৎ আশ্রয় নেই? প্রায়ই দাদা-বৌদির রুম থেকে সেই নিদারুণ কটাক্ষ ভেসে আসে– কতদিন আর এভাবে বসে বসে…। দেশের পরিস্থিতি ভালো নয়। মাল্টিন্যাশন্যাল কোম্পানিগুলি পালিয়ে গেছে। বহু কোম্পানি ডাউনসাইজিং আরম্ভ করেছে। দাদা যে দিল্লিওয়ালা কোম্পানিতে চাকরি করে তার রিজিওন্যাল অফিস বন্ধ হয়ে যাবে বলে শোনা যাচ্ছে।

ঘনঘন কেঁপে উঠে অনাদির মোবাইলটা অস্তিত্ব জানায়।

সেই ভার্চুয়াল ‘ভাইরাস’-এর প্রশ্ন ভেসে আসে– ইয়েস অর নো?

 

(২)

সিগারেটে দীর্ঘ টান দিয়ে অনাদি লকডাউনের পরিচ্ছন্ন বাতাসে ধোঁয়া ছেড়ে দেয়। কোথাও একটা রাতের পাখি ডেকে ওঠে। যে অনাদির সঙ্গে এই বিপজ্জনক ধামালি করতে পারে, সেও তো তার সঙ্গে খেলতে পারে। মোবাইলটা খুলে সে উত্তর দেয়–

-ইয়েস!
-গুড। আমি মহিলার অ্যাপার্টমেন্ট সম্পর্কে বিস্তারিত পাঠিয়েছি। ফোটোও পাঠাচ্ছি। ইয়োর টাইম স্টার্টস নাউ। যে কোনও সময়ে লকডাউন খুলে যেতে পারে, তার আগেই তোমাকে মহিলাকে হত্যা করতে হবে।
-কেন? লকডাউনের মধ্যে কেন?
-কারণ লকডাউন খুললে বাড়িতে বহু লোকজন এসে যাবে। ক্যাম্পাস সিকিউরিটির লোকজনের সংখ্যাও বেড়ে যাবে। শুভস্য শীঘ্রম। দেরি কোরো না।
-আমার অ্যাডভান্স? আমার সিগারেট শেষ হয়েছে। বেশি দামে সিগারেট কেনার মতো টাকা আমার হাতে নেই। অনাদি ভাইরাসকে নিজের সেন্স অফ হিউমার দেখায়।
-ডান। পেয়ে যাবে।

বিশৃঙ্খল দুর্গন্ধময় ছাদের ওপরে অনাদি অপেক্ষা করে থাকে। প্রস্রাবের গন্ধ, সাবানের গন্ধ, উচ্ছিষ্টের গন্ধ। বস্তির মতো বিশৃঙ্খলভাবে চার পাঁচটা মলিন ফ্ল্যাট পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে। শত শত নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত মানুষের বসতি সেখানে। সকালে পিলপিল করে পিঁপড়ের মতো মানুষগুলি জীবনযুদ্ধের জন্য বেরিয়ে যায়। রাতে শ্রান্ত ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরে। কিন্তু এটা যেন এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। ভাইরাসের আতঙ্কে দিনের পর দিন ঘরের ভেতর বসে আছে মানুষগুলি। অহেতুক মৃত্যুভয়ে কাতর মানুষ। খাবার দ্রুত শেষ হয়ে আসছে। ভাঁড়ারে দিনেরবেলা বিক্ষিপ্তভাবে খোলা দুই একটি স্টোরে বিস্কুট-দুধের জন্য হাহাকার লেগেছে। বেশি দামেও উধাও হয়ে গেছে চাল-ডাল। মাঠে শস্য নষ্ট হয়ে গেছে। খেতে শাক-সব্জি-ফলমূল গলে পচে যাচ্ছে। কৃ্ষক মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছে। কেরাসিনের অভাবে বস্তি গভীর অন্ধকারে ঢাকা পড়েছে। অনাদির সিগারেট শেষ। দেশে কি সত্যিই দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে?

-গ্যাস শেষ হয়ে এসেছে। আগে থেকেই বলে রাখছি, ব্যবস্থা করতে না পারলে খাওয়া দাওয়া বন্ধ কিন্তু। রান্নাঘর থেকে বিরক্ত বৌদির কথা ভেসে আসছে। বাড়িতে দুই দুটো পুরুষ মানুষ বসে আছে। আমাকেই এইসব ব্যাপারে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। বৌদির ইঙ্গিত অনাদির দিকেও। টিভির সামনে বসে দাদাও একটা দুটো করে প্রত্যুত্তর দিয়ে যাচ্ছে। অনাদি জানে এর পরে এক উত্তপ্ত বাকযুদ্ধের সৃষ্টি হতে পারে। অনাদির অস্বস্তি হয়। পাশের কামরা থেকে বৃ্দ্ধা মায়ের পরিচিত দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়– আমাকে নিয়ে যাও প্রভু আর কত কষ্ট দেবে? ওই যে করোনা না কী একটা এসেছে না তুমি তাকেই আমাকে উঠিয়ে নিতে বলো প্রভু!

এই বিষম সমস্যায় পাঁচ লাখ টাকা কল্পনা করতেও ভালো লাগে। কিন্তু অনাদি জানে, এই মুহূর্তেই ভাইরাসের ধামালি শেষ হবে। সে জেনেশুনেই ‘ভাইরাস’কে অ্যাডভান্সের কথা বলেছিল। অ্যাডভান্সের কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে তার গল্পে যতি নেমে আসবে।

উদাসীনভাবে সে টিভির পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকে। লকডাউন আরও বাড়ানো হবে নাকি?

কিন্তু অনাদির মোবাইলে সকালবেলা টিং করে ভাইরাস তার উপস্থিতি জানিয়ে দিল। হি ইজ সিরিয়াস। অনাদিকে অ্যাপার্টমেন্টের ঠিকানা দিল। সন্ধে নটা নাগাদ অনাদি সেখানে যেতে পারবে। কেবলমাত্র একজন সিকিউরিটি ক্যাম্পাসটাতে কাজ চালাচ্ছে। সে বিকেলে ঘুমোয়। রাত এগারোটার সময় ডিউটির জন্য উঠে। অ্যাপার্টমেন্টের টেরেসে একটা গুদামের মতো ঘর আছে– খোলাই থাকে। সেখানে একটা পুরনো রুকসেক পড়ে থাকবে, যার মধ্যে আড়াই লাখ টাকা রাখা থাকবে। অ্যাপার্টমেন্টটার মেইন গেট দিয়ে ঢোকার প্রয়োজন নেই, মূল প্রবেশদ্বার পার হয়ে কোণে ক্লিনারের জন্য একটা ছোট সার্ভিস গেট আছে। সেই গেট দিয়ে ঢুকে পার্কিংয়ের মধ্য দিয়ে সোজাসুজি গেলেই লিফট পাওয়া যাবে। লিফটের শেষ গন্তব্য পাঁচতলা, তারপরে সিঁড়ি দিয়ে টেরেসটা।

অনাদি থমকে দাঁড়ায়। দেখা যাক। অলস লক্ষ্যহীন সময়ে কী যেন এক উত্তেজনা। কিছু একটা নতুন গল্প। সিগারেট নেই– খুব কষ্ট হচ্ছে তার। ঘরের ভেতরে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার মতো আবহাওয়া। ঘরের বাইরে গিয়ে কোথাও এককাপ চা খাওয়ার কথা ভাবারও অবকাশ নেই। সিগারেট খেতে না পারলে তার অস্থির লাগে। সেই কলেজে পড়ার সময়েই অল্পস্বল্প মদ খাওয়া শুরু করেছিল। একবার এক বন্ধুর সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রের পারে ড্রাগসের ওপরে পরীক্ষা করতে গিয়ে পুলিশের ঝামেলায় পড়েছিল। কিন্তু সে ক্রিমিন্যাল নয়। হাজারটা সাধারণ বঞ্চিত-স্বপ্নহীন-প্রেমহীন মধ্যবিত্ত যুবকের মতো কেবল বহু পাপবোধের সঙ্গে অনাদি তার অসহায় বর্তমানে নিজের বিপন্ন অস্তিত্ব জড়িয়ে ধরে থাকে।

-মহিলার ফোটো কেন পাঠাননি?
-পাঠাচ্ছি। প্রথমে অ্যাডভান্সটি নিয়ে নাও। ভাইরাস উত্তর দিলেন।
-অনেক রিস্ক নিতে হবে। আমাকে ভাবার সময় দিন।
-দরদাম করবেন না। সময় কমে আসছে।
-মানে? কিছু সময় নীরবতা। ‘ভাইরাস’ যেন থমকে দাঁড়াল।
-আমি তোমাকে দশ লাখ দেব। আজ রাতে এসে আমার বলা নির্দিষ্ট জায়গা থেকে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে যাবে। কোনও অসুবিধা নেই। অ্যাপার্টমেন্টের CCTV কাজ করছে না। লকডাউন শেষ না হওয়া পর্যন্ত টেকনিশিয়ান এসে ঠিক করতে পারবে না। হঠাৎ প্রস্তাবটা আরও লোভনীয় করে দিল ‘ভাইরাস’।
-আপনি কি আমাকে ক্রিমিন্যাল বলে ভাবছেন?
-এই মুহূর্তে পাঁচ লাখ টাকা তোমার জন্য অপেক্ষা করে রয়েছে। নিয়ে যাও।
-আপনি কী করতে চাইছেন? খেলাটা কী?
-কাজ শেষ হয়ে গেলে একই জায়গায় আরও পাঁচ লাখ পাবে– মোট দশ লাখ টাকা। এটা ফাইন্যাল অ্যামাউন্ট, আমার হাতে আর নগদ টাকা নেই।

অস্থির হয়ে সিঁড়ি দিয়ে অনাদি নেমে আসে। গৃহবন্দি মানুষ টিভির সামনে বসে ভাইরাস আক্রমণের নিউজ দেখছে। প্রায় প্রতিটি ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসছে দেশে দেশে হাজার হাজার মৃত্যুর খবর। আমেরিকা বিধ্বস্ত। ইউরোপ দিশাহারা। চিনে লেলিহান সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে, জাপানে ইমার্জেন্সি।

কিন্তু অনাদির জন্য? খুব সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটতে চলেছে নাকি? সত্যিই কি এটা লাইফ চেঞ্জিং গেম? অনাদি পুনরায় ছয়তলার ছাদে চলে আসে। এদিকে-ওদিকে তাকায়। তিনতলার বিতু সরকারের স্ত্রী কাপড় মেলছে। গায়ের কাপড় অবিন্যস্ত, অনাদিকে দেখেও উপেক্ষা করার ভঙ্গি। ফার্স্ট ফ্লোরের চৌধুরীদা মোবাইলে কারও সঙ্গে মাছির মতো গুঞ্জন করে চলেছেন। তাঁর ফ্ল্যাট থেকে নাকি নেটওয়ার্ক একেবারে পাওয়া যায় না। তাই তিনি প্রায়ই নেটওয়ার্কের খোঁজে ছাদে চলে আসেন। তিনি লুঙ্গিটা কুঁচিয়ে পড়েছেন, বুকের ওপরে কিছু নেই– বুক থেকে তলপেট পর্যন্ত ঘন লোমের প্রদর্শনী। ফোনে কথা বলা শেষ হওয়ার পরে অনাদির দিকে তাকিয়ে একটা আধা লজ্জিত হাসি হাসলেন– আমেরিকার অবস্থা খুবই খারাপ নাকি? হোয়াইট হাউস নাকি ভীষণ নার্ভাস? হলিউডের সমস্ত অ্যাক্টর অ্যাক্ট্রেস নাকি ঘরে খিল তুলে দিয়ে ভেতরে বসে আছে? যত সব ক্যাপিটালিস্ট বাস্টার্ড। মর এখন!

আমেরিকার প্রতি চৌধুরীদার এত অবসেশন কেন অনাদি বুঝতে পারে না। সে মাথা দুলিয়ে সায় দিল। সন্ধেবেলা স্ট্রিট লাইটগুলি জ্বলে ওঠার আগে আগে অনাদি রাস্তায় বেরিয়ে এল। পিঠে একটা ব্যাগ। তাতে দুই বোতল স্যানিটাইজার, এক বোতল জল। গুগল ম্যাপে অ্যাপার্টমেন্টের লোকেশন দেখে নিয়েছে। জায়গাটার মোটামুটি একটা ধারণা পেয়ে গেছে। মেইন রাস্তার সামনে সে থমকে দাঁড়ায়– জনহীন নিষ্প্রাণ, যেন মরুভূমি নেমে এসেছে। সারি সারি দোকান শোরুমের শাটার বন্ধ। ফুটপাথে দুটো শীর্ণ ক্ষুধাতুর কুকুর শুয়ে আছে। দূরে কোথাও অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের শব্দ। ডিভাইডারের মধ্যে লাগানো ফুলগাছগুলি অদ্ভুত ধরনে সবুজ হয়ে দ্রুত বেড়ে ওঠেছে। আকাশ ভয়ঙ্কর নীল। মুক্ত বাতাস দিকবিদিকশূন্য হয়ে নাচছে।

মানবসভ্যতা কি ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাবে? রাস্তাটা পার হয়ে একটা গলির ভেতরে সে দ্রুত ঢুকে গেল। শূন্য দীর্ঘ উপপথ– দুটো পরিত্যক্ত ঠেলাগাড়ি, এক সারি বন্ধ গুমটি, বোম্বে স্টার নামের সেলুনটা অনেকদিন ধরে বন্ধ। গলির ভেতরে আলো কমে আসছে। কোথাও খোলা জানালা দিয়ে টুকরো টুকরো টিভির নিউজ ভেসে আসছে। –চিনে পুনরায় ভাইরাস ছড়িয়েছে। কাল সকালে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেবেন। কিউবাতে ভ্যাক্সিনের গবেষণায় অনেকটা সাফল্য পাওয়া গেছে। শীঘ্রই মানবদেহের ওপরে পরীক্ষা করা হবে।

কী নির্জন অনাদির পথ, কী লক্ষ্যহীন, কী সারশূন্য! অথচ এরকম হওয়ার কথা ছিল না। অনাদির স্বপ্ন ছিল, ভরপুর রং ছিল এবং সবচেয়ে বড় কথা– তার জীবনে তৃষা ছিল। সে দ্রুত এগিয়ে যাবার চেষ্টা করল। এইসমস্ত কথা এখন আর মনে করার কোনও মানে হয়? তথাপি এক গভীর একাকিত্ব অনাদিকে গ্রাস করে ফেলতে চায়। একটা রেলক্রসিং সে দ্রুত পার হয়ে যায়, একটা ক্ষীণ গলি, সিঁড়ি বেয়ে সে একটা রাস্তায় বেরিয়ে আসে, সতর্কভাবে আবার রাস্তা পার হয়। এই সময়ে অনাদির একটা সিগারেটের খুব প্রয়োজন ছিল।

অ্যাপার্টমেন্টটা খুঁজে বের করতে অনাদির খুব একটা অসুবিধা হল না। একটা অভিজাত অঞ্চল। প্রশস্ত পথ। চারপাশে এক ধরনের সুশৃঙ্খল পরিচ্ছন্নতা। তার মধ্যে বিশাল অট্টালিকাটি দাঁড়িয়ে আছে। সিংহদরজার মতো অ্যাপার্টমেন্টটার বিশাল প্রবেশদ্বার। পাশেই অন্য একটি নির্মীয়মান বিল্ডিং– হয়তো লকডাউনের জন্য কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। রাস্তায় অস্বস্তির সঙ্গে দাঁড়িয়ে অনাদি এদিক ওদিক তাকাল। হ্যাঁ, তাকে বলার মতোই অট্টালিকাটার চার দেওয়ালের এক কোণে ছোট একটা সার্ভিস গেটও রয়েছে।

অনাদি প্রথমেই অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকল না। এক পা দুই পা করে সে পাশের অর্ধেক তৈরি বিল্ডিংটাতে উঠে গেল। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গেল। ফ্লোরগুলি হয়ে গেছে যদিও অনেক কাজ বাকি রয়েছে। দরজা জানালার কাজও আরম্ভ হয়নি। রেলিংহীন সিঁড়ি দিয়ে উঠে গিয়ে অনাদি পাঁচতলায় গিয়ে দাঁড়ায়। এখান থেকে গোটা অট্টালিকাটা ভালোভাবে দেখা যাচ্ছে। সুদৃশ্য অ্যাপার্টমেন্টটার সেই তলায় তার টার্গেট রয়েছে। সমান্তরালভাবে থাকা অর্ধনমিত বিল্ডিংটা থেকে অনাদি সাবধানে নিরীক্ষণ করতে থাকে। অন্ধকার হয়ে আসছে, হঠাৎ স্ট্রিট লাইটগুলি জ্বলে উঠল। সার্ভিস গেটটা দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকতে তার কোনও অসুবিধা হবে না। অ্যাপার্টমেন্টটা বেশ ভালোভাবেই আলোকিত হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন মহলের লাইটগুলিও একে একে জ্বলে উঠেছে। পাঁচতলার একটা অংশ অন্ধকার, অন্য দিকে লাইটগুলি জ্বলছে। প্রশস্ত ব্যালকনি– বিশাল গ্লাসপেইন এবং হালকা রঙের পর্দা। এই পর্যন্ত সে আশেপাশে কোনও সিকিউরিটি গার্ডের অস্তিত্ব দেখেনি। থাকলেও অনাদির প্ল্যান বি তৈরি– সে নিজেকে স্যানিটাইজার কর্মী হিসেবে পরিচয় দেবে। পিঠের ব্যাগটাতে সেম্পল হিসেবে স্যানিটাইজারের বোতলগুলি রাখা আছে।

লক্ষ্যস্থানের উদ্দেশ্যে অর্ধনির্মিত বিল্ডিংটার সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করতে যেতেই অনাদি চমকে উঠল– ব্যালকনিতে একটি নারীমূর্তি। আলো আঁধারে সে ভালোভাবে কিছু বুঝে উঠার আগেই পর্দা টেনে দেওয়া হল। এক মুহূর্তের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল। অনাদির শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল।

চট করে সে নিজেকে সরিয়ে আনল। এই তার টার্গেট? সে নিজেকে সামলে নিল। মনটাকে অবিচল রাখার চেষ্টা করল, তার মুখ কঠোর হয়ে উঠল।

অ্যাপার্টমেন্টের চৌহদে ছোট সার্ভিস গেটটা দিয়ে অনাদি ঢুকে পড়ল। কার পার্কিংয়ের মধ্য দিয়ে এগিয়ে গিয়ে লিফট। অত্যাধুনিক লিফটটার প্যানেলে সে পাঁচ তলার সুইচ টিপল। ওটাই শেষ তলা, এরপরে টেরেসের জন্য সিঁড়ি। পাঁচতলায় দুটোই ফ্ল্যাট। একটাতে হয়তো কেউ থাকে না– অন্তত কারও কোনও সাড়াশব্দ নেই, ওপাশটাই হল অনাদিকে দেওয়া ঠিকানা– অভিষেক দত্ত, অনাদি সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত ওপরের টেরেসে উঠে যায়। বিশাল টেরেসটা পরিচ্ছন্ন। কোথাও এতটুকু আবর্জনা নেই। টেরেসের অর্ধাংশ কমন এরিয়া, বাকিটাতে অভিষেক দত্ত। সাজিয়ে নেওয়া বাগান, ফুল, কাস্ট আয়রনের টেবিল বেঞ্চ, ঝুলনা ইত্যাদি নিয়ে এক সুদৃশ্য আয়োজন। সেই অংশটা লোহার রেলিং দিয়ে পরিবেষ্টিত। সময় নষ্ট না করে অনাদি কমন এরিয়াতে থাকা স্টোর রুমটার দিকে এগিয়ে গেল। দরজার হুকটা খুলে ফেলল। ভেতরে অন্ধকার। দুটো ভাঙা চেয়ার, একটা ছোট বোর্ড, কয়েকটি ম্যাগাজিন, একটা সাইকেল, একটা কম্পিউটার মনিটর, এমনকী একটা তার ছেঁড়া গিটার– ইস তার আড়ালেই অনাদি গাঢ় রঙের ব্যাগটা দেখতে পেল। যেভাবে বলা হয়েছিল সেভাবেই ব্যাগটা পড়ে আছে। যেন কোনও চলচ্চিত্রের স্ক্রিপ্টের মতোই সমস্ত ঘটে চলেছে। যেন স্বয়ং নিয়তি এর নির্দেশক।

এর পরে? আবার এক প্রবঞ্চনা, প্রতারণার সম্মুখীন হয়নি তো সে। ঠোঁটের সামনে থেকে আবার পানপাত্র খসে পড়বে না তো? এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখে কালো রঙের ব্যাগটা একটু আলোতে এনে অনাদি চেইনটা খুলে ফেলে–

৫০০ টাকার ১০টি বান্ডিল! পাঁচ লাখ।

 

(৩)

অনাদির লোভী হাত টাকাগুলি স্পর্শ করতে চায়– ইস। তারপরে বান্ডিলগুলি পিঠের ব্যাগটাতে ভরিয়ে খালি ব্যাগটা পুনরায় অন্ধকারে ছুড়ে দেয়। এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে সে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসে। লিফটের কথা তার মনেই পড়ল না। তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এসেছে। দ্রুত পায়ে সে রাস্তায় আসে। চারপাশের আলো যেন তার শত্রু। স্ট্রিট লাইটের আলোগুলি যেন সজাগ প্রহরীর মতো তার দিকে তাকিয়ে থাকে।

দৌড়ে যাবার মতো গিয়ে সে একটা গলির ভেতর ঢুকল। রাস্তার পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল। পিঠের ব্যাগটা ছুঁয়ে দেখল– আছে। টাকাটা ঠিকই আছে। গলিটার অন্যপ্রান্ত থেকে আসছে একটা ক্লান্ত কুকুর, দুপাশের খোলা জানালা দিয়ে মাঝে মাঝে এক ঝলক আলো, নির্জনতা সহ আগ্রাসী রাত নেমে আসছে। কোনও বাধা ছাড়া বাড়ি পৌঁছাতে হবে– মেইন রাস্তায় মাঝেমধ্যে পুলিশ পেট্রোলিং রয়েছে। সতর্ক হতে হবে। তার বুক গলা শুকিয়ে আসছে। একটা সিগারেটের খুবই প্রয়োজন ছিল। অথচ গোটা রাস্তাটায় একটাও দোকান খোলা নেই। আধা আলো আধা ছায়ার মধ্য দিয়ে অনাদি দ্রুতবেগে এগিয়ে যায়– জনহীন গলিটাতে নিজেকে তার প্রেতের মতো মনে হয়। এটা স্বপ্ন না দুঃস্বপ্ন! এরপরে কী? সে কি ‘ভাইরাস’-এর কাছে দায়বদ্ধ হয়ে গেল? তার জীবন কি এক নতুন দিকে মোড় নিতে চলেছে?

সিঁড়ি পার হয়ে ঘরে ঢুকে অনাদি বিছানায় শুয়ে পড়ে। ব্যাগটাকে বিছানার নিচে একটা কার্টুনের ভেতরে সাবধানে রেখে দেয়। মোবাইলে কেঁপে কেঁপে কোনও বার্তা আসছে। অনাদি কিছুক্ষণের জন্য আর সেই চক্রব্যূহের মধ্যে ঢুকতে চাইল না। জাদুর মতো এতগুলি টাকা তার হাতে এসেছে– সে কেবল মুহূর্তগুলি উপভোগ করতে চাইল। কী এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা, কী এক অদ্ভুত অনুভূতি। ধীরে ধীরে অনাদির চোখদুটি বুজে আসে।

সকালে খাবার টেবিলে হুলস্থূল। করোনা ভাইরাসের নাকি ভ্যাক্সিন বের হবে। ইস রক্ষা! টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজ চলছে। আমেরিকার গবেষক দাবি করেছে যে নভেম্বরের ভেতরে ভাইরাসের প্রতিষেধক বাজারে বেরিয়ে যাবে।

-এখন নভেম্বর পর্যন্ত বেঁচে থাকলেই হল। বৌদির কথা ভেসে আসছে।
-কাঁচা হলুদ, রসুন খেলে এমনিতেও এই সমস্ত রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। দাদা মন্তব্য করছে। আসলে এই সব কিছুই মেডিসিন কোম্পানিগুলির খেলা। এখন ভ্যাক্সিনের নামে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। দেখতে থাকো।

মোটের উপর সেই সকালবেলা ঘরের পরিবেশ ভালো। সবাই মন্ত্রমুগ্ধের মতো টিভির সামনে। অসুস্থ মা-ও টিভি দেখে মাথা নাড়াচ্ছে। পিকলু মোবাইল থেকে মাথা তুলে ভ্যাক্সিন ইঞ্জেকশন নিলে ব্যথা করবে কিনা জিজ্ঞেস করছে। একটা বেশ ইতিবাচক আবহাওয়া। জানালা দিয়ে সুগন্ধ পরিচ্ছন্ন বাতাস বয়ে আসছে। কোথায় যেন একটা অচিন পাখি ডাকছে। হঠাৎ অনাদির মনে হল– লকডাউনবন্দি পৃথিবী খুবই সুন্দর হয়ে উঠেছে। জীবনকে যেন নতুনভাবে আরম্ভ করা যায়। ভোরের রোদের সঙ্গে যেন পৃথিবী্তে নেমে আসছে আশা, বিশ্বাস আর আনন্দ। বিছানা থেকে ওঠে অনাদি পুনরায় একবার টাকার ব্যাগটা দেখল, স্বপ্ন নয়তো!

কিন্তু একসময়ে সেই অমোঘ নির্দেশ আসে। চা খেয়ে মোবাইল খুলে সে দেখে ‘ভাইরাস’-এর একাধিক বার্তা– কনগ্রাচুলেশনস। আমার নির্দেশ অনুসারে টাকা পেয়েছ। এখন কাজের কথায় এসো।

অনাদির নিজেকে কেমন যেন দায়বদ্ধ বলে মনে হয়।

-বলুন।
-সময় কমে আসছে। দ্রুত আমার বলা কাজটা করে ফেলো।
-এখনও ফোটোটা পাঠানো হয়নি।
-কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পেয়ে যাবে।
-আমি একবার বাড়িটাতে যেতে চাই। পরিবেশটা দেখে নিতে চাই। আমি স্যানিটাইজারের মানুষ হয়ে যেতে পারি। অনাদি বেশ সপ্রতিভভাবে জানাল।
-হু-।
-এনি প্রবলেম!
-ঠিক আছে। আগামীকাল এসো। সময়টা খুব জটিল। ভুল কোরো না। তোমার জন্য আরও পাঁচ লাখ টাকা অপেক্ষা করছে। একটা ভুলে সমস্ত উলটপালট হয়ে যেতে পারে– ফোটো পাঠিয়েছি।

নিমেষের মধ্যে মেসেঞ্জারে ফোটো এসে গেল। কয়েক মুহূর্ত অনাদি স্তব্ধ হয়ে রইল। গভীর নীল চোখ, মেঘের মতো চুল, অপাপবিদ্ধ ঠোঁট, বিষণ্ণ সেই নারী যেন তার দিকেই অপলকে তাকিয়ে রয়েছে। অনাদির হাত কেঁপে উঠল। অস্পষ্টভাবে তার মনে পড়ে ঠিক এরকম একটি মুখ, এরকম চোখজোড়ার কথা– যাকে সে ভুলতে চাইছে, মন থেকে মুছে ফেলতে চাইছে।

-থ্যাঙ্ক ইউ। ফোটোটা পেয়ে সে লিখল।

এই বাজারে পাঁচ বা দশ লাখ টাকা বড় সহজ কথা নয়। টাকাটা দিয়ে সে নিজে ছোটখাটো কোনও কাজ আরম্ভ করতে পারবে। দাদার স্কুটিটা অনেক পুরনো হয়ে গেছে, মাঝেমধ্যেই খারাপ হয়– একটা নতুন স্কুটি কিনতে হবে। একটা দামি শাড়ি কিনে দিলে বৌদির মনটা ভালো হয়ে যাবে। মায়ের ওষুধ কেনার দায়িত্বটা এখন থেকে অনাদি নিতে পারবে।

-পিকলু তোর একটা মোবাইল লাগবে নাকি?
-আমার আইফোন চাই। দেবে?
-দেব। ভালোভাবে পড়াশোনা কর। অনাদি হঠাৎ দাদার দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করল– মায়ের ওষুধের জন্য মাসে কত টাকা খরচ হয় দাদা?
-কোথাও লটারি পেয়েছিস নাকি? অনাদির কথাবার্তা শুনে বৌদিও মজা করে বলল।

পরের দিন সকালেই অনাদি তৈরি হয়ে নিল। ভালো করে স্নান করল। পরিষ্কার করে চুল আঁচড়াল। দাড়িগুলি বেশ বড় হয়েছে, একটু ঠিক করে নিল। আয়নায় মুখ দেখল– ইম্প্রেসিভ মনে হচ্ছে কি? জুতোজোড়া নোংরা হয়েছিল, পরিষ্কার করে নিল।

বিকেলের আলো থাকতেই খুব আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অ্যাপার্টমেন্টের বিশাল প্রবেশদ্বারে অনাদি এসে দাঁড়াল। সিকিউরিটি ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করল–

-কোথায় যাবেন?
– 5(A), স্যানিটাইজারের কাজ।
-আচ্ছা। আমাকে বলে রেখেছে। আসুন।

দিনের আলোতে অনাদি অট্টালিকাটার চারপাশের বৈভব দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেল। চারপাশে বিদেশি ফুল গাছের বর্ণময় আলো, একটা ছোট পার্ক। এই মুহূর্তে সেখানে কেউ নেই। পার্কিং-এ নাম না জানা বিলাসী ব্র্যান্ডের কয়েক ডজন গাড়ি শোভা বাড়াচ্ছে। পাথরের টেক্সাসের দামি টাইলস দিয়ে সম্পূর্ণ জায়গাটা বাঁধিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফ্ল্যাট নাম্বার 5(A)-র সামনে অনাদি কলিং বেলের সুইচ টিপল। কিছুক্ষণের অপেক্ষা। দরজা খুলে গেল। সামনে একজন মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক।

-স্যানিটাইজার? আচ্ছা, কাম ইন। লোকটার পেছন পেছন অনাদি ভেতরে চলে এল। অভিষেক দত্ত– চুল কিছুটা পাতলা হয়ে এসেছে, পেটে চর্বি জমা হয়েছে। কিন্তু মুখ আর শরীরে সুস্বাস্থ্যের দ্যুতি। গালে সুন্দর করে কামানো দাড়ির নীল আভা, চলাফেরায় এক ধরনের আভিজাত্য। অনাদি যতই ফ্ল্যাটের ভেতরে চলে আসে ততই সে অভিনব বৈভব দেখে হতবাক হয়ে যায়। একটা দরজার আড়ালে কত প্রাচুর্য লুকিয়ে থাকতে পারে। বিশাল একটা ড্রইং রুম, দেওয়ালে বিরাট প্লাজমা টিভি, বেশ কয়েকটি দুষ্প্রাপ্য পেইন্টিং, শো কেসে দেশ বিদেশ থেকে তুলে আনা গৃহসজ্জার সংগ্রহ, একটা প্রাচীন দেওয়াল ঘড়ি থেকে ছিটকে ছিটকে আসছে সেকেন্ডগুলি-

-আচ্ছা, স্যানিটাইজিং করতে তোমার কত সময় লাগবে? কাজটা কখন করবে? অনাদি দ্রুত দত্তের ইঙ্গিতটা বুঝে নেয়। মানুষটা স্মার্ট, মুখে এক ধরনের ক্রূর হাসি, চোখদুটি এক্সরের মতো ভেদ করে যায়– যার মধ্যে ধরা পড়ে মানুষের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য এবং সামর্থ্য।

-তাড়াতাড়ি করে ফেলব। তবে কিছু কথা জেনে নিতে চাইছি। একবার বাইরে এবং ভেতরটা ভালো করে দেখে যেতে হবে। আমার স্টাফ এসে কাজ করে যাবে। –আপনাদের কোনওরকম অসুবিধা না করে। অনাদি যেন প্রত্যুত্তর দেবার চেষ্টা করে। সে এদিকে ওদিকে তাকায়, কারও প্রত্যাশায়।

-গুড! দত্ত আবার বললেন। যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি করা ভালো। এই ভাইরাসগুলি বড় বিপজ্জনক, ডেঞ্জারাস। The biggest pandamic is not the virus itself, it is the fear and uncertainity, বিজনেস নষ্ট করে দিয়েছে। আমাদের বহু অ্যাসাইনমেন্ট ক্লোজ করে দিতে হয়েছে। অভিষেক দত্ত ব্যস্ত মানুষ। বারবার রিং আসছে, মানুষটা ফোনে ব্যস্ত হয়ে যায়। তখনই বিশাল ব্যালকনিটার পেছনে অনাদি সেই নারীমূর্তি দেখতে পায়। তন্বী দীর্ঘ দেহ, পর্দার ওপারে ধীরে ধীরে পায়চারি করছে। তার উপস্থিতিতে যেন কিছু অস্বস্তি, কিছুটা আশ্চর্য। কিন্তু সে তো বুঝতে পারছে না কী ভীষণ ঘটনা ঘটতে চলেছে।

-যত দ্রুত সম্ভব কাজটা করে ফেলুন। মানুষটা আবার বলে উঠেন। তাঁর চোখ দুটো নেচে উঠে। এমনকী তার মুখে কোনও অপরাধবোধ নেই।
-আপনার দুটো ফ্লোর?
-হ্যাঁ। ওপরের টেরেসে আমার একটা পেন্ট-হাউসের মতো এরিয়া আছে। নিচের এই ফ্লোরটা ফোর থাউজেন্ড স্কোয়ার ফুটের মতো হবে।

অনাদি অবাক হয়। এই দৈত্যাকার ফ্ল্যাটটিতে মাত্র দুজন মানুষ। এদিকে-ওদিকে তাকায় সে-কী সুন্দর ইন্টেরিয়ির। আভিজাত্য আর ঐশ্বর্য চারপাশে প্রকট হয়ে উঠেছে।

-আমার তো এখানে বেশি থাকাই হয় না। এখন সব কমিউনিকেশন বন্ধ, প্রায় একমাস মিছামিছি বাড়ির ভেতর বসে থাকতে হচ্ছে। ভাইরাস কত মানুষ মেরেছে সেটা ইমপর্ট্যান্ট নয়, ইট কিলস বিজনেস, দিস ইজ ইমপর্ট্যান্ট। মানুষটা স্বগতোক্তি করার মতো বললেন। ডিসগাস্টিং। তারপরে হঠাৎ ডেকে উঠলেন– অলি,অলি!

তখনই পর্দা ঠেলে ভেতরে চলে এল সেই নারী। সেই বিষণ্ণ মুখ, নীল চোখ। চুলগুলি বাহুর ওপরে নেমে এসেছে। অনাদির আর ভুল হওয়ার মতো কিছু নেই। অভিষেক দত্ত অনাদির সামনে আনার জন্যই নিজের পত্নীকে ডেকেছে। শালা– কী নৃশংস হৃদয়হীন মানুষ তুই! অনাদি নিজের মনে বলে। এই মহিলা কী অপরাধ করেছে? সে দেখল অলি তার দিকে এক পলক তাকাল। সে যেন ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়– এত গভীর নীল চোখ, এত শান্ত অথচ সুন্দর মুখ।

-অলি এই সপ্তাহেই স্যানিটাইজারের কাজটা করতে হবে। বাহাদুরকে বুঝিয়ে দিও। ঘরের জিনিসগুলি ঠিকঠাক করে রাখতে হবে তো। অভিষেক কর্তৃ্ত্বের সঙ্গে নির্দেশ দিল।
-খুব স্ট্রং নয় তো, কারও কোনও অসুবিধা হবে না তো? নিস্পৃহভাবে অভিষেক জিজ্ঞেস করল।
-না, ঘরের ভেতরে খুব একটা স্প্রে করা হবে না। বাইরেই হবে। ব্যালকনির রেলিং, সিঁড়ি, ওপরের টেরেস, বাইরের বারান্দা… কোনও প্রবলেম নেই।
-গুড, অভিষেক যেন তাকে এদিকে ওদিকে তাকানোর সুবিধা করে দিল।

তখনই অনাদি বাহাদুরকে দেখতে পেল। ট্রেতে করে দত্তের জন্য এককাপ চা নিয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। ছোটখাটো মানুষটা। প্রায় ষাট বছর, স্থূলকায়, হাফ শার্টের ওপরে একটা অ্যাপ্রন পরেছে। ঘরটাতে তৃ্তীয় একটি প্রাণী আছে– অনাদি দ্রুত পরিস্থিতিটা বুঝে নেয়।

-আপনি এক কাপ চা খাবেন? হঠাৎ মহিলাটি বলে উঠলেন। কোমল নিরুত্তাপ কণ্ঠ।
-না না না। নার্ভাসের মতো একসঙ্গে কয়েকটি না বলল অনাদি। থ্যাঙ্ক ইউ। তারপর সে একটা পেন চেয়ে নিল– এরিয়াটা হিসেব করে বুঝে নেবে। পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে সে কিছু একটা নোট করার মতো সময় পার করতে থাকে। স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে আছে মহিলাটি।

-কী অদ্ভুত সময়! অভিষেক দত্ত খুব বিরক্তির সঙ্গে বলে উঠে। এভরি ডে ইজ সানডে নাউ। উই আর প্রফেশনেল পিপল– এভাবে সময় নষ্ট হতে দিতে পারি না। কবি-সাহিত্যিকদের কথা আলাদা। মানুষটা নিজের রসবোধে এবার নিজেই হেসে উঠল। ওরা জানেই না যে দেয়ার ইজ নো স্পেস ফর লিটারেচার ইন দিস ওয়ার্ল্ড, অ্যান্ড ইউ নো– পোয়েট্রি ইজ জাস্ট অ্যা ডায়িং আর্ট। কিছুটা অপ্রাসঙ্গিকভাবেই তিনি বলে উঠলেন। সজোরে মাথা নাড়াতে গিয়ে অনাদি থমকে গেল। মিছিমিছি আবেগী হয়ে লাভ নেই। তার লক্ষ্য আজ আলাদা। অনাদি আড়চোখে মেয়েটার দিকে তাকায়। তার দিকেই তাকিয়ে রয়েছে।

অনাদি অ্যপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে এল। সিকিউরিটির মানুষটাকে দেখতে পেল না। অন্ধকার নেমে আসছে। স্ট্রিট লাইটগুলি জ্বলে উঠেছে। কবিতার মৃত্যু হয়েছে? কে ঘোষণা করেছে? শালা, ভাইরাস। কিন্তু অনাদি এই মুহূর্তে আশায়। তার খুবই টাকার দরকার। সে কাজটা করার জন্য ইতিমধ্যে দায়বদ্ধ হয়ে পড়েছে।

সে পাশের অর্ধেক তৈ্রি বিল্ডিংটায় উঠে যায়। পাঁচ, ছয় তলায় উঠা নামা করে সে দত্তদের ফ্ল্যাটটা নিরীক্ষণ করে। অনেকক্ষণ ধরে তিনটি মানুষের গতিবিধি লক্ষ্য করে। রাত হয়ে আসছে। প্রফেশনাল অপরাধীদের মতো অনাদি অপেক্ষা করে থাকে।

সেই রাতে বিছানাতে শুয়েও অনেকক্ষণ পর্যন্ত অনাদির ঘুম এল না। সত্যি সত্যিই কবিতার মৃত্যু হয়েছে নাকি? তার খুব কষ্ট হয়। দরজা খুলে ওপরের ছাদে চলে আসে। নিচের লকডাউনস্তব্ধ পৃথিবীর দিকে অনেকক্ষণ থাকিয়ে থাকে। সে বুঝতে পারে ফোনের মধ্যে কিছু খবর এসেছে।

-কিসের জন্য অপেক্ষা করছ?
-হু।
-কাজটা দ্রুত শেষ করো। টেরেসের এটিকে পাঁচ লাখ টাকা পড়ে থাকবে। কাজ শেষ করার পরে নিয়ে যাবে।

 

লোভ, ঘৃণা আর জিঘাংসায় ভরা এই পৃথিবী্তে কবিতা কীভাবে বেঁচে থাকবে? মগজ থেকে অন্য কথা বের করে অনাদি কাজটার জন্য প্রস্তুত হয়। এর পরের দুদিন সে সন্ধেবেলা পুনরায় অর্ধেক তৈরি বিল্ডিংটাতে গিয়ে উঠল। অনেকক্ষণ অ্যাপার্টমেন্টের দিকে তাকিয়ে রইল– তিনটি প্রাণীর গতিবিধির দিকে লক্ষ করার জন্য। বাহাদুর কিচেনের দিকে বেশি সময় কাটায়। অলি টিভির সামনে, ব্যালকনিতে বা বেডরুমে একা। স্টাডি বা নিজের রুমে দত্তের বিচরণ… কিন্তু ডিনার করার পরে ঠিক নটার সময় সে টেরেসে উঠে যায়। গেস্ট হাউসের দিকে বাইরে অভিষেক সিগারেট জ্বালায়, এটা তার অভ্যাস। ঘরের প্রতিটি মানুষই যেন বিচ্ছিন্ন এক একটি দ্বীপ।

তৃ্তীয় দিন অনাদি প্রস্তুত হল। সন্ধেবেলা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। মাথায় একটা বেসবল ক্যাপ, মুখে মাস্ক, পিঠে ব্যাগটা। অনেকবার আসা যাওয়া করার পরে গলি রাস্তাগুলি তার খুবই পরিচিত হয়ে উঠেছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা কুকুরগুলি পরিচিত, স্ট্রিট লাইটগুলি পরিচিত, জানালা দিয়ে আসা বিচ্ছুরিত আলো পরিচিত, সে কেবল মানুষগুলিকে চেনে না। কেন এই জিঘাংসা? সে পুনরায় ভাবল। ক্ষমাহীন ঘাতকের মতো সে নির্মীয়মান বিল্ডিংটাতে সন্ধেবেলা খাপ পেতে রইল। চার হাজার স্কোয়ার ফুটের অ্যাপার্টমেন্টটাতে তিনটি চরিত্রের বিচরণ। ক্যাম্পাসে সিকিউরিটির পাত্তা নেই। হয়তো সে খানা বানিয়ে এখন এক ঘুম দেবে। দূরে কোথাও একটা পুলিশের গাড়ি সাইরেন বাজিয়ে গেল। সময় পার হয়ে গেছে, অসীম ধৈর্যের সঙ্গে অনাদি অপেক্ষা করছে।

ডিনার শেষ হয়েছে, অভিষেক এখন সিগারেট নিয়ে টেরেসে উঠবে। নিচে অলি একা, বাহাদুর কিচেনে ব্যস্ত থাকবে। লাফ মেরে বিল্ডিংটা থেকে অনাদি সার্ভিস গেট দিয়ে অ্যাপার্টমেন্টে প্রবেশ করল, লিফটে উঠে পাঁচ নাম্বার সুইচটা টিপল। পাঁচ তলায় লিফট থেকে অলিদের দরজার সামনে এসেও অনাদি থেমে গেল। তারপর এক পা দু পা করে সিঁড়ি বেয়ে সে টেরেসে উঠল।

অভিষেক একটা সিগারেট জ্বালাচ্ছে। টেরেসে ম্লান আলো। কমন এরিয়ার দিক থেকে অনাদি মানুষটার দিকে তাকাল। লোকটা কেন অলিকে মারতে চাইছে? অনাদি তো জানল না। বিভ্রান্তের মতো সে অভিষেকের দিকে এগিয়ে গেল–

-গুড ইভনিং স্যার!

জ্বলন্ত সিগারেটটা আঙুলে নিয়ে অভিষেক চমকে উঠল।

-কে?
-আমি স্যার। দি স্যানিটাইজার ম্যান…।
-ইস, আমি বুঝতেই পারিনি।

অভিষেক উত্তর দিল। তারপরে কণ্ঠস্বর নামিয়ে অনাদিকে সেই প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করল– আমার কাজটা কবে হবে?

-ডোন্ট ওরি স্যার! লাইটারটা দেবেন নাকি? একটা সিগারেট খেতে খুব ইচ্ছা করছে।
-অভিষেক কিছুটা অবাক হল। লাইটারটা টেবিলের ওপর রেখে এগিয়ে দিল।
-একটা সিগারেট দিন প্লিজ! লজ্জাহীনের মতো অনাদি বলল।
-হা-হা-হা! দিস ইজ ইন্টারেস্টিং। অ্যান ওল্ড ট্রিক। অভিষেক শ্লেষের হাসি হেসে উঠল। সিগারেটের প্যাকেটটা অনাদির দিকে এগিয়ে দিল।

আঃ। সিগারেটে টান দিয়ে অনাদি মুগ্ধ হয়ে গেল। কতদিন পরে সিগারেট। কী তার সুগন্ধ! আমেজে সে বাতাসে ধোঁয়া ছেড়ে দেয়।

-থ্যাঙ্ক ইউ স্যার!

অভিষেক তার দিকে তাকিয়ে আছে। দুদিকে মাথা ঝাঁকাল।

-দ্যাটস ওকে। কিন্তু কাজটা করো। বি প্রফেশনাল!

অনাদি ম্লান হাসে। সম্মতিসূচক মাথা নাড়ায়।

-কিন্তু কেন? সে আবার জিজ্ঞেস করে– কেন?
-ভাইরাস। ও সব শেষ করে দিয়েছে।
-আপনি জানেন স্যার। আপনার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর থেকে আমি আপনার ফ্যান হয়ে গেছি। জীবনে আমি আপনার মতো প্রফেশনাল হওয়ার চেষ্টা করব।

অভিষেক অনাদির দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখে সামান্য অবিশ্বাস।

-আপনার অটোগ্রাফ চাই আমার। অনাদি বলে গেল।– সেই যে আপনি বলেছিলেন ভাইরাস মানুষ মারছে সেটা ইম্পরট্যান্ট নয়, ইম্পরট্যান্ট হল বিজনেস মারছে। হোয়াট এ লাইন!

-আর ইউ ম্যাড। অভিষেকের কণ্ঠে প্রশ্রয়ের সুর– আজ পর্যন্ত কেউ আমার কাছে অটোগ্রাফ চায়নি।
-কিন্তু আপনি আমার আইডল স্যার! পকেট থেকে পেনটা বের করে অনাদি একটা সাদা কাগজ এগিয়ে দেয়। অটোগ্রাফ প্লিজ স্যার! আর আপনার সেই লাইনটাও দিন-
-তুমি তো বড্ড ড্রামাবাজ মানুষ! কাগজটায় বাক্যটা লিখে উপেক্ষার সঙ্গে সাইন করে অভিষেক– কিন্তু প্রফেশ্যনালিজমের প্রথম শর্তটাই হল আজেবাজে কথা না বলে নিজের কাজ সময়মতো ঠিকঠাক ভাবে করা!
-রিলাক্স স্যার! এত দৌড়াদৌড়ির কী আছে? কাগজটা পেনের সঙ্গে হাতে নিয়ে অনাদি শান্তভাবে বলে– কিন্তু আপনি সবসময় শুদ্ধ নন। সেদিন আপনি বলেছিলেন, পোয়েট্রি ইজ ডায়িং… তখন কিন্তু আপনি ভুল বলেছিলেন। কবিতা বেঁচে আছে স্যার!

অভিষেক হাসে। কিছু উপেক্ষা কিছু বিরক্তি– ওকে দেন, গুড নাইট!

-যাই স্যার, কিন্তু তার আগে সেই পৃ্থিবীটার দিকে একবার তাকান। জনশূন্য রাস্তার দিকে তাকান। টেরেসের পারাপেট ওয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে নিচের নিঃসার পৃথিবীর দিকে অনাদি ইঙ্গিত করে। আসুন স্যার, পরাজিত মানুষের উচ্চারণহীন কবিতা শুনুন।

অভিষেক মিনিওয়ালটার দিকে এগিয়ে আসে। দূর থেকে দূরান্তরে জনপ্রাণীর কোনও অস্তিত্ব নেই। স্ট্রিট লাইটগুলির আলো নিথর। পৃথিবী স্তব্ধ হয়ে গেছে। সিগারেটে অলস টান দিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো নিচু দেওয়ালের কাছে অভিষেক দাঁড়িয়ে থাকে। দূরের দিকে তাকিয়ে থাকে।

-থ্যাঙ্কস ফর দি অটোগ্রাফ, স্যার!

অনাদি কাগজটা মার্বেলের টেবিলের ওপর রেখে অ্যাসট্রেটা দিয়ে চাপা দিয়ে রাখে। নীল কলমটাও পাশেই রাখে, যে পেনটা সেদিন অভিষেকের ঘর থেকে সেদিন সে তুলে নিয়েছিল।

তারপরে অতর্কিতে অনাদি সর্বশক্তি দিয়ে অভিষেক দত্তকে ছাদ থেকে নিচের দিকে ঠেলে ফেলে দেয়।

 

(শেষ খণ্ড)

অনাদি এক মুহূর্ত দাঁড়াল। একটা ভরের পতনের অনুচ্চ শব্দ শোনার চেষ্টা করে। টেরেসের প্যারাপেট ওয়ালে দুহাত রেখে সে নিচের দিকে তাকায়– নির্জীব অভিষেক দত্ত পড়ে আছে।

সে চট করে সরে আসে।

লাফ মেরে রেলিংটা পার হয়ে কমন এরিয়ায় আসে। ভাঙাছেঁড়া, অপ্রয়োজনীয় বস্তুগুলির মধ্যে, ম্যাগাজিনের স্তূপের নিচে সে ব্যাগটা খুঁজে পেল– দশটা বান্ডিলে গর্ভিনী।

লিফট দাঁড়িয়েছিল। অনাদি দ্রুত নেমে এল। অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে রাস্তায় পা রেখে দ্রুত হাঁটতে শুরু করে। দূরে কোথাও একটা পুলিশের গাড়ি হুটার বাজিয়ে গেল।

স্ট্রিট লাইটের আলোতে সে খুব নিরাপত্তাহীন বোধ করল।

প্রথম গলিটাতে সে ঢুকে পড়ল। অনাদি ছোট গলিটা দিয়ে প্রাণপণে দৌড়াতে থাকল। মুখ থেকে মাস্কটা খুলে ফেলল, তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চাইছে, মাথা থেকে গলফ ক্যাপটাও খুলে ফেলল। সারা শরীরে ঘাম, কপাল থেকে জলবিন্দু পড়ে তার চোখ ঢেকে ফেলছে।

পিঠে ব্যাগটা– টাকাটা, তার মধ্যে জল আর স্যানিটাইজারের বোতল, তার চাপে পিঠটা ভিজে গেছে…

সে এটা কী করল? এসব কী হয়ে গেল? সে একটা মানুষকে মেরে ফেলল!

বারবার হাত ধুলেও রক্তের এই দাগ মুছে যাবে কি? হতে পারে মানুষটা নির্মম, স্বার্থপর বা পাষাণ– তার জন্য অনাদি কেন এত ক্ষুব্ধ হতে গেল? সে নিজেই নিজেকে চিনতে পারল না। রেলস্টেশনটার পাশের গলিটা দিয়ে মেইন রাস্তায় উঠল– এদিকে ওদিকে তাকিয়ে রাস্তা পার হল। ধীরে ধীরে তার অল্প ভয় করতে লাগল। হয়তো সেই ভয় নির্জনতার, নিস্তব্ধতার এবং সঙ্গীহীনতার। গলিটাতে কয়েকটি ধূসর অটোরিক্সা, এক সারি মিনিট্রাক, কিছুদূরে পাথরের মূর্তির মতো নির্লিপ্তভাবে একটি ঘোড়া দাঁড়িয়ে রয়েছে।

না, সমস্ত দুশ্চিন্তা সে মগজ থেকে বের করে দিতে চাইল।

সে তো একজন নিষ্পাপ মেয়েকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেছে। আজ যদি সে কাজটা হাতে না নিত অন্য কেউ সহজেই তা করে ফেলত– দশ লাখ টাকার জন্য এই মহানগরীতে বহু হত্যাকারী পাওয়া যায়। অনাদি নিজেকে প্রবোধ দেয়।

আর এই দশ লাখ টাকায় অনাদি সমস্ত কিছু আবার নতুন করে আরম্ভ করতে পারবে। তাদের জীর্ণ ক্ষয়িষ্ণু মধ্যবিত্ত জীবনে এটা সঞ্জীবনীর মতো হতে পারে।

তাদের অভাবী সংসারে এই টাকায় অনেকখানি সাশ্রয় হতে পারে। গলি থেকে অনাদি পুনরায় মেইন রাস্তায় এসে উঠল। কিছুটা এগিয়ে উপপথটায় ঢুকে গিয়ে কিছু দূরে ওদের ফ্ল্যাটগুলি।

অলির কাছে তো সে কোনও অন্যায় করেনি। কী কৌশলে অভিষেক অলিকে তার জীবন থেকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল সেটা অলি জানলে হয়তো হতবাক হয়ে যাবে। একই ঘরে থাকা মানুষটার প্রতি কতটা অবিশ্বাস, ঘৃণা, কত চক্রান্ত। অনাদির অলির চোখদুটির কথা মনে পড়ে, তার সেই নিষ্পাপ ঠোঁট, মেঘের মতো নেমে আসা আলুলায়িত চুল।

একদিন অনাদি অলির কাছে যাবে। তার বহু কথা বলার আছে। কিন্তু তার আগে তার জীবনটাকে গুছিয়ে নিতে হবে। দাদা-বৌদিকে কিছুটা শান্তি দিতে হবে। শহরের কোনও একটি কোণে একটি ছোট ব্যবসা আরম্ভ করবে, মায়ের ওষুধগুলি কিনবে এবং…

ঠিক তখনই অন্যমনস্ক অনাদির কাছে পুলিশের পেট্রোলিং গাড়ি এসে দাঁড়াল।

তিন চারজন অটোমেটিক বন্দুকধারী জোয়ান লাফিয়ে নামল। তাকে ঘিরে ধরল। সামনের দরজা খুলে মোটাসোটা আরক্ষী অফিসার নেমে তার দিকে এগিয়ে এলেন।

স্ট্রিট লাইটের আলোতে অনাদি দেখতে পেল– তাঁর মুখে ভ্রূকুটি। ঘন মোচের আড়ালে এক ধরনের শ্লেষ মেশানো হাসি। তিনি অনাদির ঠিক সামনে এসে দাঁড়ালেন।

জীবনে বহুবার অনাদির সঙ্গে নিয়তি এরকম খেলা খেলেছে। বহুবার সে তার প্রাপ্য হারিয়েছে, বহুবার অপ্রতিরোধ্য দুর্ভাগ্য তার দরজায় এসে টোকা দিয়েছে। ঠোঁটের কাছে পানপাত্র নিয়েও অনেকবার হাত থেকে খসে পড়েছে। অনাদি ধীরে ধীরে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে হাত দুটি ওপরের দিকে তুলে ধরে।

-কী হয়েছে?

অফিসারের কর্কশ কণ্ঠস্বর সে শুনতে পায়। সে চোখ নামিয়ে আনে। হয়তো অ্যাপার্টমেন্টটার সিকিউরিটি কিছু শব্দ শুনে পুলিশকে ফোন করেছে। না কি অলিই খবর দিয়েছে নিজের স্বামীর নিরুদ্দেশের…

অন্যকে তো মারবিই নিজেও মরবি। অফিসার তার দিকে ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধমকে উঠলেন– মাস্ক কোথায়? মাস্ক কেন পরিসনি?

অনাদি নির্বাক হয়ে সন্তর্পণে পকেট থেকে মাস্কটা বের করে অফিসারকে দেখায়।

-পকেটে কেন? শালা, তাড়াতাড়ি পরে নে!

পুলিশের গাড়িটা পার হয়ে যাবার পরে অনাদির বুকে রেলের ইঞ্জিন চলার মতো শব্দ হয়। আতঙ্ক এবং উত্তেজনা তাকে চেপে ধরে।

রাস্তা ছেড়ে সে দ্রুত গলিটাতে ঢুকে পড়ে। বাড়ি আর বেশি দূরে নেই।

এক অদ্ভুত অবসাদ অনাদিকে ঘিরে ধরে। বাড়ি পৌছেও সিঁড়ি বেয়ে ওঠার মতো তার শরীরে শক্তি নেই।

সঙ্কীর্ণ নোংরা সিঁড়িটাতে সে বসে পড়ে। কাঁধের ব্যাগটা নামিয়ে রেখে হাত-পা মেলে দেয়। তার চোখ বুজে আসে, ঘুম নয়– সে এক ধরনের আচ্ছন্নতায় ডুবে যায়।

পায়ের কাছে ব্যাগটা পড়ে আছে– টাকাগুলি পড়ে আছে। দশ লাখ। এত অপেক্ষা, এত কৃচ্ছ্রসাধনার পরে কী এক অদ্ভুত পথে সৌভাগ্য এসেছে। এই বিষম সময়ে অনাদির হাতে এতগুলি টাকা এল– হা-হা-হা! জীবনে বহু সময় আসে কৌতুক এবং ট্র্যাজেডির সীমারেখা হারিয়ে যায়। পাপ এবং পুণ্যের প্রভেদ নাই হয়ে যায়। একটা ভাইরাস যেভাবে সমস্ত পৃথিবীটাকে বদলে দিল, এই ‘ভাইরাস’-ও অনাদির জীবন বদলে দিল।

সকালে অনাদি নিজেকে নিজের বিছানায় আবিষ্কার করে। টেলিভিশনে উচ্চস্বরে নিউজ অ্যাঙ্কর কোনও ব্রেকিং নিউজ দিচ্ছে। শাণিত ছুরির মতো ভোরের প্রখর রোদ তার বিছানায় নেমেছে। তখনই অনাদি পুনরায় সেই ইঁদুরটাকে দেখতে পায়।

ডালের একটা টিনের ওপর দিয়ে বেয়ে যাবার সময় ওটা অনাদির দিকে তাকিয়ে রয়েছে। উদাসীন, নির্ভীক, যেন উপেক্ষার ভঙ্গি। যা যা– বিছানা থেকেই অনাদি হাত দিয়ে ওটাকে তাড়ানোর চেষ্টা করল। এই ইঁদুরটাকেই তো সে একদিন না মেরে যেতে দিয়েছিল। সে আজ সাহসী হয়ে উঠেছে। সামনের ছোট ঠ্যাং দুটি দিয়ে মুখটা মোছার মতো করল, অনাদির দিকে তাকিয়ে চোখেরও ইশারা করল।

বিরক্তিতে সে বিছানা থেকে উঠে এল। ইস অনেক দেরি হয়ে গেল। দরজা খুলে সে দেখল, খাবার টেবিলের সামনে বসে সবাই টিভি দেখছে।

চোখ কচলে সে টেলিভিশনের পর্দার দিকে তাকায়– গত রাতে মহানগরের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী অভিষেক দত্ত আত্মহত্যা করেছেন। নিজের অ্যাপার্টমেন্টের ছয় তলার টেরেস থেকে লাফিয়ে পড়ে দত্ত আত্মঘাতী হয়েছেন। তিনি সুইসাইড নোটও লিখে রেখে গেছেন– ভাইরাস মানুষ মারছে, সেটা গুরুত্বপূর্ণ কথা নয়। কিন্তু এটা বিজনেসও নষ্ট করে দিচ্ছে– It kills business that’s important. তারপর একাধিক বিশেষজ্ঞের মতামত। লকডাউন দীর্ঘায়িত হবে নাকি? ব্যবসায়ী, উদ্যোগী, কৃ্ষক হতাশায় ভুগছে।

অসহায় মানুষ আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। গৃহবন্দি হয়ে মানুষ হয়তো ভাইরাসের আক্রমণ থেকে বাঁচবে, কিন্তু ব্যবসাবাণিজ্যের কী হবে? কলকারখানার কী হবে? দেশের অর্থনীতি এক আত্মঘাতী রূপ নেয়নি কি?

দাদা টিভির সামনে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে, হাতে ঠান্ডা হয়ে আসা চায়ের কাপ। সব্জির একটা থালা হাতে নিয়ে বৌদির চোখও এখন টিভির পর্দায়– দেশটার কী যে হবে!

স্বতঃস্ফুর্তভাবে বৌদি উদ্বেগ প্রকাশ করে। বিশাল অভিজাত অ্যাপার্টমেন্টটার নিচে ব্যবসায়ী দত্তের নির্জীব শরীর পড়ে রয়েছে। টিভির ফ্রেমে কেবল দুইজন খাকি পোশাকধারী, দুই একজন উৎসুক লোক। আবছাভাবে বাহাদুরের মুখও দেখা যাচ্ছে।

লকডাউন চলছে, হয়তো বন্ধুবান্ধব-আত্মীয় স্বজনও দুঃসংবাদ শুনে আসতে পারেনি। জীবনের মতো মৃত্যুর মুহূর্তেও মানুষ আজ নিঃসঙ্গ।

-আমাকেও মেরে ফেলছ না কেন, প্রভু করুণা করো আমাকে। বিছানা থেকে মায়ের আর্তিতে অনাদি সম্বিৎ ফিরে পায়। পালিয়ে আসার মতো সে দৌড়ে ছাদের উপর চলে আসে। আকাশ শান্ত নীল। বহু উপরে দুই-একটা অপরিচিত পাখি মুক্তির আনন্দে উড়ে বেড়াচ্ছে। সকালের পথ ঘাট যথারীতি শূন্য– হঠাৎ একটা ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি মেইন রাস্তা দিয়ে সজোরে দৌড়ে যায়।

-পৃথিবীতে ১৬০ কোটি মানুষের চাকরি যাবে, জানেন? মুখে টুথব্রাশ নিয়ে অনাদির দিকে তাকিয়ে প্রতিবেশী চৌধুরীদা ছাদে ঝুলিয়ে রাখা একটা বেডকভারের আড়াল থেকে বেরিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল। আমাদের ট্রাম্প সাহেব তো সব ইন্ডিয়ান মানুষদের আমেরিকা থেকে কাজ ছেড়ে দিয়ে চলে যেতে বলেছে!

চৌধুরীদার এক হাতে মোবাইল। ঊর্ধ্বাঙ্গ শূন্য, তলপেটে একটা কালো রঙের লুঙ্গি বিপজ্জনক ভাবে ঝুলে রয়েছে। চৌধুরীদা পুনরায় ফোনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

পকেট থেকে নিজের মোবাইলটা বের করে অনাদি মেসেঞ্জার খুলল। হ্যাঁ, ’ভাইরাস’-এর কাছ থেকে আর কোনও বার্তা নেই। এই অভিষেক দত্ত নামের ‘ভাইরাস’কে অনাদি এই পৃথিবী থেকে মুছে দিয়েছে।

গোপনে, অবধারিতভাবে।

তার জন্য অনাদির কোনওঁ দুঃখবোধ, অপরাধবোধ থাকা উচিত নয়। একটা খারাপ স্বপ্ন ভেবে সে সেই অধ্যায় ভুলে যেতে পারে। অনাদি ‘ভাইরাস’-এর সমস্ত বার্তালাপ মোবাইল থেকে ডিলিট করে দেয়। অলির ছবিও মুছে দেয়।

 

শেষ দৃশ্য (প্রায় এক সপ্তাহ পরে)

কলিং বেলটা বাজছে। বাহাদুর তার নিজের জন্য ওষুধ আনতে পাশের ফার্মাসিতে গেছে। বেডরুম থেকে অলি নিজেই বেরিয়ে এল। ড্রয়িং রুমের টিভিটা চলছে। আশেপাশে কেউ নেই। নিউজ চলছে। টিভিটা অফ করার জন্য অলি মোবাইলটা খুঁজতে যেতেই কলিং বেলটা পুনরায় বেজে উঠল।

কি-হোলে উঁকি দিয়ে অলি দেখে– অনাদি দাঁড়িয়ে আছে। সে জানে যে একদিন অনাদি আসবেই। সে অনাদির জন্য দরজাটা খুলে দিল।

ড্রয়িং রুমটার মাঝখানে এসে সে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়িয়ে রইল। কিছুটা অস্বস্তি, কিছুটা সন্দিগ্ধতা। অলি তার দিকে তাকাল, এক মুখ দাড়িও অনাদির মুখের কমনীয়তা ঢাকতে পারেনি। উচ্ছৃঙ্খল, অবিন্যস্ত, রুক্ষ জীবন এখনও তার চোখের দ্যুতি মুছে দিতে পারেনি।

-যা সব হয়ে গেল, তার জন্য আমি দুঃখিত। অনাদি ধীরে ধীরে বলে উঠল। কিন্তু আমার একটা কথা আপনাকে বলার আছে।
-বলো।

অনাদি এদিক ওদিক তাকাল। যেন কিছুটা নার্ভাস।

-বলো। শান্ত কণ্ঠে অলি বলল। এখন ঘরে কেউ নেই।
-আপনার স্বামী আত্মহত্যা করেনি। কিছুক্ষণের নীরবতা। টিভিতে নিউজ চলছে। ওটা সুইসাইড নয়।
-আমি জানি। অস্ফুটস্বরে অলি বলল। অনাদি চমকে উঠল। মুহূর্তের জন্য সে অলির চোখের দিকে তাকাল, আবার দৃষ্টি সরিয়ে আনল।
-আমি জানি। অভিষেক সুইসাইড করার মানুষ নয়। অলি বলে গেল। আমাদের বিয়ের তিন বছর হল। ওর সম্পর্কে আমি অন্তত এতটুকু জানি।
-আপনি অন্তত এটা জানেন না যে আপনার স্বামী আপনাকে হত্যা করার জন্য আমাকে টাকা দিয়েছিল।
সমস্ত প্রস্তুত করে দিয়েছিল। বারবার মোবাইলের মেসেঞ্জারে তাগাদার মেসেজ পাঠাতেন। আপনার ফোটোও আমাকে মেইলে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

অলি শান্ত হয়ে শুনছে।

ঠোঁটের এক কোণে মৃদু হাসি।

অনাদি ভেবেছিল সে স্তম্ভিত হয়ে যাবে, তার কথা শুনে বিধ্বস্ত হয়ে পড়বে– কিছুই হল না। অলির মধ্যে কোনও ভাবলেশ ঘটল না।

-আমি আপনাকে হত্যা করতে পারলাম না, কিন্তু পরিস্থিতি এরকম হল যে আমাকে অভিষেক দত্তকেই মারতে হল। আজ এই সময়ে আপনাকে এই সমস্ত কথা বলা ঠিক হচ্ছে কিনা আমি জানি না। কিন্তু আমার সমস্ত ক্ষেত্রেই ভুল হয়ে গেল। আপনার স্বামীর আমাকে দেওয়া এই টাকাটা আমি ডিজার্ভ করি না। ১০ লাখ টাকা কম নয়। তাছাড়া এই পরিস্থিতিতে এই টাকাটা আপনারই দরকার হবে।
-তোমায় টাকা অভিষেক দেয়নি, আমি দিয়েছিলাম।
-মানে? এবার অনাদির স্তম্ভিত হওয়ার পালা।
-আমিই ‘ভাইরাস’। অলি নির্লিপ্তভাবে বলে যায়। —
অভিষেক নয়, আমিই তোমাকে সমস্ত কিছু ঠিক করে দিয়েছিলাম। আমার নিজের ফোটোও পাঠিয়েছিলাম। গেটে সিকিউরিটিকে বা অভিষেককে আমিই জানিয়েছিলাম স্যানিটাইজারের জন্য তুমি আসবে বলে। কিন্তু তুমি আমাকে হত্যা করতে পারলে না।
-কিন্তু কেন? অনাদির কণ্ঠস্বর কেঁপে উঠল। এক এক করে সমস্ত কথা তার কাছে স্পষ্ট হয়ে যেতে লাগল।
-আপনি নিজেকে মারার জনা আমাকে লাগিয়েছিলেন কেন?
-আমি বাঁচতে চাইছিলাম না।
আমি আর পারছিলাম না। অভিষেকের সঙ্গে থাকতে গিয়ে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। সারাটা বছর বিজনেসের কাজে অভিষেক দিল্লি-মুম্বাই ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু এই লকডাউনের সময় ঘরটাতে আমি তার সঙ্গে একসঙ্গে থাকতে বাধ্য। আমাদের মধ্যে কোনও সম্পর্ক ছিল না। কোনও অনুভূতি ছিল না। কিন্তু এই গৃহবন্দিত্বের সময়ে মানুষটার সংস্পর্শে আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি নিজেকে মেরে ফেলতে চেয়েছিলাম, আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলাম। অনেকবার ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলাম, বেঁচে গেছি। টেরেস থেকে ঝাঁপ মেরে মরার কথা ভেবেছি, হাতের শিরা কাটতে চেয়েছি সাহস হয়নি।

অলি একনাগাড়ে কথাগুলি বলে গেল।

-তখন একদিন তোমার অ্যাকাউন্টে আমার চোখ পড়ল। অনেকের মধ্যে তোমার পোস্টগুলি পড়ে আমি তোমার ফ্রাস্টেশন, বঞ্চনা, ক্ষোভগুলি বুঝে উঠতে পারি। আমি তোমাকে টাকার লোভ দিয়েছিলাম। প্রথমে পাঁচ লাখ এবং পরে আরও পাঁচ লাখ পাবে বলেছিলাম। ভেবেছিলাম তোমার সাহায্যে আমি মরতে পারব।

অনাদি মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে রইল। সে অলির চোখের দিকে তাকিয়ে রইল– এখন?

-অভিষেক নেই আজ এক সপ্তাহ হয়েছে। কিন্তু আমি ধীরে ধীরে সঙ্কল্প করেছি আমি বেঁচে থাকব। অলির মুখ দৃঢ় হয়ে আসে। আমি নতুন করে জীবন আরম্ভ করব। …আমি এক মুক্ত মানুষ, এখন আমার আর মৃত্যুর ইচ্ছা নেই।
-এটা আপনার টাকা। পিঠ থেকে ব্যাগটা নামিয়ে অনাদি বলে– রেখে দিন। এখন আপনার দরকার পড়বে। পুরো দশ লাখ আছে।এক টাকাও খরচ করিনি, এমনকী এক প্যাকেট সিগারেটও কিনিনি।
-তুমি আমাকে নতুনভাবে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিয়েছ। আমি কৃতজ্ঞ। অনাদির দিকে তাকিয়ে অলি মৃদুকণ্ঠে বলেছিল। এটা তোমার প্রাপ্য।
-না, না অনাদি মাথা নাড়াল। লাগবে না, আমি নিজের কাছে খুব ছোট হয়ে যাব। তখন অলি তার কাছে এগিয়ে আসে। তার হাত দুটি খামচে ধরে– প্লিজ! প্লিজ! এটা আমার অনুরোধ। অলি কাতর কণ্ঠে বলে– আর থ্যাঙ্কস ফর এভরিথিং!

কয়েক মুহূর্ত অলির হাতের মধ্যে তার হাত আবদ্ধ হয়ে থাকে। কয়েকটি বোবা মুহূর্ত।

ড্রয়িং রুমের টিভিটাতে ভাইরাস প্রতিরোধের বিজ্ঞাপন চলছে– সামাজিক দূ্রত্ব মেনে চলুন। করমর্দন করবেন না। অহেতুক স্পর্শ করবেন না…

 

 

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 3909 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...