আর্যায়নের প্রক্রিয়ায় শবরনন্দিনী কালী হলেন দুর্গা

চন্দ্রশেখর ভট্টাচার্য

 


লেখক সাংবাদিক, কবি ও প্রাবন্ধিক। লিটল ম্যাগ কর্মী

 

 

 

 

কম বেশি সকলেই দুর্গাপূজার মহাষ্টমীতে অঞ্জলি দিয়েছি। ছোট থেকে বড়দের নির্দেশে, জেনে না না-জেনে হলেও, অঞ্জলি দিয়েছেন সকলেই। উচ্চারণ করেছেন, “জয়ন্তী মঙ্গলাকালী ভদ্রকালী কপালিনী”৷ ছোটবেলায় অঞ্জলি দেওয়ার ঝোঁকে শব্দগুলি আমরা সবাই পুরোহিতের সুরেই আউড়ে গিয়েছি। আমাদের সমাজের আজন্ম অভ্যাসই হল, মানে না বুঝেই পুরোহিতের সুরে মন্ত্র উচ্চারণ করে যাওয়া। ফলে, ছোটবেলায় কেউ কখনওই প্রশ্ন তোলেননি, দুর্গার অঞ্জলিতে পুরোহিত কেন মা কালীকে অঞ্জলির মন্ত্র পড়ান? যদি কখনও কেউ বাড়ির বড়দের কাছেও এই প্রশ্ন তুলে থাকেন, যদিও তাঁরা হয়তো শতকরা ১০ জন, বাড়ির বড়রা বলেছেন, “যিনি মা দুর্গা, তিনিই মা কালী।” 

একটি কিশোর একবার মহাষ্টমীতে অঞ্জলি দিয়ে এসে শেওড়াফুলি রাজবাড়ির পূজামণ্ডপের বাইরে আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “মা দুর্গা কেমন করে মা কালী হবেন?” এই বাড়ির মূর্তির বিশেষত্ব আছে। এখানে দুর্গার নাম সর্বমঙ্গলা। দুর্গার সিংহ ঘোড়াদাবা সিংহ, যা গলাটা ঘোড়ার মত বক্র। এখানে কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী নেই। হয়তো স্থানীয় এই কিশোরটি বছরের পর বছর এই বাড়িতে অন্যরকম মূর্তি দেখে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছে। সেই প্রশ্নই সে আমাকে করে বসেছে। 

আমরাও সেই কোন ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি দুর্গার দশমহাবিদ্যার রূপের কথা। সেখানেও প্রথম রূপ মা কালীই। তিনিই কি পরে দুর্গা হয়েছেন? গত বছর কলকাতায় কয়েকজন বিশিষ্ট লেখিকা ও সমাজসেবীর আমন্ত্রণে দুর্গা নিয়ে এক আলোচনাতেও এমন একটি প্রশ্ন এসেছিল। আজ যখন দেশে দলিতজীবন গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হয়েছে, তখনই বেশ কিছু ক্ষেত্রে দলিত মহলেও দুর্গাকে উচ্চবর্ণের নারী হিসাবেই ধরে নিয়ে আলোচনা চলছে। মহিষাসুর দলিত ছিলেন, এটা প্রশ্নাতীত। পৌরাণিক যুগে ইতিহাস লেখা হত না। সেই সময়ের কোনও একটি বা একাধিক ঘটনার ভিত্তিতে দুর্গাকে আর্যদের প্রতিনিধি ধরে নেওয়ার মধ্যেও অনেক ফাঁক রয়েছে বলেই মনে হয়। বরং, না-লেখা ইতিহাসের যুগের পুরাণ কাহিনিগুলি বহু ক্ষেত্রেই ইতিহাসের রূপক হিসাবে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে এমন কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যা থেকে এই ভূখণ্ডের হাজার হাজার বছরের পথ চলায় কীভাবে ইতিহাসের সত্যতাকে আড়ালে ঠেলে দিয়ে অনার্য সভ্যতার শক্তির দিকটির আর্যায়ণ হয়েছে, ভারতের লোকসংস্কৃতি, মানসিকতা ও ধ্যানধারণাকে প্রভাবিত করা হয়েছে, তা বোঝা যায়।

আদিমকাল থেকেই ভারতীয় লোকসমাজে, বিশেষত দক্ষিণ ভারতীয় ও বাঙালিদের মধ্যে মহাকালীর প্রতি ভক্তি বেশি। বাংলায় দুর্গাপূজা হচ্ছে যদিও এক হাজার বছরের কিছু বেশি সময় ধরে। কিন্তু, গত কয়েক দশকে দুর্গাপূজা নিয়ে বাঙালিদের মাতামাতি সবকিছুর উর্ধে। শরতের দিন পাঁচেকের দুর্গা যেন সম্বৎসরের কালীর চেয়েও বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু, প্রশ্ন যদি এটাই হয় যে, যিনি কালী, তিনিই দুর্গা, তাহলে তো প্রশ্ন আসেই, দেবীর চেহারার এমন বদলটা হল কী করে?

আগেই বলেছি, না-লেখা যুগের ইতিহাসের কিছু রসদ রয়ে গিয়েছে পুরাণের নানা কাহিনিতে। এই সব পুরাণের মধ্যে কেবল দুটি পুরাণেই আছে দুর্গা-র উল্লেখ। যে দুটিতে দুর্গার উল্লেখ আছে, সেগুলি হল মার্কণ্ডেয় পুরাণ ও মৎস্যপুরাণ। আর আছে কালিকাপুরাণে দুর্গা এবং একটি উপপুরাণ— দেবী ভাগবত-এ। কিন্তু, কালীর উল্লেখ আছে বহু পুরাণেই৷ ষষ্ঠ শতকের গমদাপুরাণে ও অগ্নিপুরাণেও কালীর বর্ণনা রয়েছে। সেখানে কালীর রূপ বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি কৃশকায়া, ক্ষুধার্ত, লোলজিহ্বা, অট্টহাস্যকারী, নৃমুণ্ডমালিনী, নৃত্যরতা উন্মাদিনী, ভুত-পিশাচ পরিবৃতা ও শ্মশানবাসিনী৷ শ্রী শ্রী চণ্ডী কাহিনি আছে মার্কণ্ডেয় পুরাণের অংশ দেবী ভাগবতে, যেখানে দুর্গাকে সবচেয়ে বেশি দেবীত্ব দেওয়া হয়েছে, সেখানেও কালীকে নররক্তে তৃপ্তা, যুদ্ধ এবং সন্তান প্রজননের দেবী হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছে৷

প্রায় সব পুরাণেই কালের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মহাকালী হলেন ভয়াল ভয়ঙ্করী ও শ্মশানবাসিনী, ভূত-পিশাচ বাহিনী পরিবৃতা৷ নানা প্রাচীন সাহিত্যে কালীর একাধিক নাম। অষ্টম শতকের শুরুর দিকে রচিত সাহিত্য ‘গৌড়বাহ’-তে শক্তি ও যুদ্ধের এই দেবীকে বলা হইয়েছে ‘সর্বশবরানাং ভগবতী‘ ও ‘দেবী বিন্ধ্যবাসিনী’৷ সপ্তম শতকে লেখা ভবভূতির ’কাদম্বরী’তে বলা হয়েছে, ‘দেবী শবরদের দ্বারা গভীর জঙ্গলে পূজিতা’। ভবভূতিরই ‘মালতীমাধব’ নাটকে কালী হলেন শ্মশানবাসিনী চামুণ্ডা৷ তিনি পিশাচ-পরিবৃতা, নৃমুণ্ডমালাধারিণী৷ অনেক সাপ তার লজ্জাস্থানকে লোকচক্ষুর আড়াল করেছে৷ তাঁর চোখ থেকে ঠিকরে বেরচ্ছে আগুন৷ একাদশ-দ্বাদশ শতকে সোমশেখরের লেখা ‘যশতিলক’-এ দেবীর যে চণ্ড রূপ ব্যাখ্যাত হয়েছে, সেটি মহাকালীরই৷ বরং, সেখানে দেবী আরও ভয়ঙ্করী৷ কালীর মন্দির প্রসঙ্গে ‘মনসরা শিল্পশাস্ত্র’ বলছে, শ্মশান বা তার আশেপাশে চণ্ডালদের বাসস্থানের কাছেই কালীর মন্দির গড়তে হবে, কারণ তিনি তাঁদেরই উপাস্যা৷ আবার, ভাগবত পুরাণ মতে দেবী কাত্যায়নী বা দুর্গা প্রজননের দেবী। কালিকাপুরাণে কালী বলছেন, তিনি প্রতি মুহূর্তে লক্ষ লক্ষ প্রাণ সৃজন করে চলেছেন।

আর, নানা পুরাণে দেখা যাচ্ছে, দুর্গা তাঁর রূপ বদলেছেন বার বার। নতুন নতুন অসুরের সঙ্গে সংগ্রামে তিনি নতুন নামে অবতীর্ণা৷ কখনও চামুণ্ডা, কখনও কাত্যায়নী, চণ্ডী। এবার, তিনিই শাকম্ভরী, দেবী বিন্ধ্যবাসিনী। মহাভারতে অর্জুনের স্তবের সময় দুর্গার উল্লেখ এসেছে কালী, কপালী, ভদ্রকালী, চণ্ডী, চামুণ্ডা, তারিণী ও কাত্যায়নীর সঙ্গে৷ দেবী ভাগবত-এ এই দুর্গাই ‘সর্বশবরানাং ভগবতী’।

শবরানাং ভগবতী অর্থাৎ, শবরদের দেবী। সর্বশবরানাং ভগবতী অর্থাৎ, সব শবরদের দেবী। শবরদের দুটি ভাগ— নগ্নশবর ও পর্ণশবর৷ দেবীর এক রূপ পর্ণশবরী৷ তাঁর আগে দেবী ছিলেন নগ্নশবরী। কালিদাস তাকেই বলেছেন ‘অপর্ণা’। অপর্ণা কারণ, তিনি শিবকে পতি হসাবে পেতে একগলা জলে নির্বস্ত্র হয়ে সাধনা করেন। তখন একটি পাতাও ভক্ষণ করতেন না। ভক্ষণ বাদ দিলাম, তখন তাঁর শরীরে একটি পাতার আবরণও ছিল না। অর্থে পাতার পোশাকও নেই তাঁর লজ্জা নিবারণের জন্যে। তিনিই নগ্নশবরদের উপাস্যা দেবী নগ্নশবরী৷ কুমারসম্ভবে কালিদাস ‘নগ্নশবরী’ শব্দটিকে আরেকটু সুসভ্য করলেন ‘অপর্ণা’ বলে। নগ্নশবরী দেবী, অর্থাৎ মাতৃতান্ত্রিক নগ্নশবদের সমাজের প্রধান নারী এক সময় পর্ণশবর বা পাতাশবর গোষ্ঠীকেও নিজের অধীনে আনতে সক্ষম হলেন। পর্ণশবররা তাঁর অধীনতা মেনে তাকে পাতার পোশাকে ভূষিতা করলেন। তিনি হলেন পর্ণশবরী। দেবী ভাগবত তার স্বীকৃতি দিচ্ছে ‘সর্বশবরানাং ভগবতী’ বলে৷ একাদশ শতকে ভবদেব ভট্ট, দ্বাদশ শতকে জীমূতবাহন, শূলপাণির লেখায় বলা হয়েছে, এই দেবী আদিবাসী শবর, মারবার, পুলিন্দদের উপাস্যা৷ এরা দক্ষিণ ভারতের বিন্ধ্যাচলের জঙ্গলের আদিম অধিবাসী৷

ছয়টি তামিল মহাকাব্যের অন্যতম হল দ্বিতীয় শতকে চোল রাজার ভাই ইলাঙ্গো অডিগালের ‘শিলপদ্দিকারম’। তাতে কোবরবাই বা কোরবাই নামে এক দেবীর কথা বর্ণিত হয়েছে। গভীর রাতে এক জঙ্গলের মধ্যে মারবার যোদ্ধাদের দ্বারা সেই দেবীর পুজা দেখার বর্ণনা আছে সেই মহাকাব্যে। সেই দেবী কৃষ্ণাঙ্গী, চার হাতের, মোষের কাটা মুণ্ডুর উপর দাঁড়ানো। পরবর্তীকালে ষষ্ঠ আ অষ্টম শতকে তামিলনাডুর পুঞ্জমঙ্গই ও পুণ্ডমঙ্গেশ্বরের মন্দিরে সেই দেবীর মূর্তি স্থাপিত হয়েছে। তামিলনাডুর দুর্গার আরেক রূপের মন্দির আছে। মীনাক্ষী মন্দির। তিনিও কৃষ্ণাঙ্গী। মীনাক্ষীকে বলা হয় বিষ্ণুদুর্গা। দক্ষিণ ভারতেরই নর্মদা তীরে রচিত মার্কণ্ডেয় পুরাণে তিনি পেলেন চণ্ডীর রূপ। চণ্ডী-উপাখ্যানে বলা হল, কোল জাতির রাজা সুরথ প্রথম তাঁর মৃন্ময়ী মূর্তি গড়ে পূজা করেন৷ লক্ষণীয় হল, আর্য সংস্কৃতির বেদে দুর্গা অনুপস্থিত কিন্তু অনার্যদের সৃষ্ট পুরাণ-উপনিষদে তাঁর সগর্ব উল্লেখ। বেদে রুদ্র-রুদ্রাণীকে অনেকে দুর্গা বলে বর্ণনা করেন, বেদে শিব ও দুর্গা নেই। তাঁরা অনার্যের পূজ্য, আর্যের না।

মীনাক্ষী। তামিলনাড়ু

 

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। কালীই দুর্গা হলে নানা পুরাণে দুর্গার সহায়ক শক্তি হিসাবে আলাদাভাবেই কালীর উপস্থিতি আছে। আছে কালিদাসের কুমারসম্ভব-এও। দুর্গা-বিষয়ক উপপুরাণ ‘দেবীমাহাত্ম্য’-তে মহাকালীর আবির্ভাব দেখানো হয়েছে দুবার, এবং দুবারই অসুর দমনে দুর্গাকে সাহায্য করার জন্য তার আগমন। একবার চণ্ড-মুণ্ড বধের সময়ে, দ্বিতীয় বার শুম্ভ-নিশুম্ভ দমনে৷ চণ্ড-মুণ্ড বধের গল্পটা কী? এই দুজনের অতর্কিত আক্রমণে দুর্গা বিব্রত ও ক্রুদ্ধা হলে তার শরীর কৃষ্ণবর্ণ হয়৷ তখন তাঁর ত্রিনয়নের জ্যোতি থেকে আবির্ভূতা হন এক ঘোর ‘তমসাবর্ণ ব্যাঘ্রাম্বর-পরিহিতা নৃমুণ্ডমালাধারিণী দেবী’। তিনি কালিকা৷ আবার, রক্তবীজ বধের সময়েও দেবী দুর্গা শরণাপন্ন হচ্ছেন দেবী কালিকার৷ মহাকালী ছিন্নমস্তা রূপে রক্তবীজকে বধ করে তার রক্ত পান করছেন, যাতে রক্তবীজের রক্ত মাটিতে পরে ফের আর কোনও রক্তবীজের জন্ম না হয়৷

অর্থাৎ, যুদ্ধে দুর্গা অপ্রসন্না হলে তিনি শত্রু সংহারের জন্য মহাকালীর রূপ ধারণ করছেন কিংবা যখনই অসহায় বোধ করছেন, কালিকার শরণাপন্ন হচ্ছেন৷ এসব কাহিনির মধ্যে দিয়ে পুরাণকাররা ইঙ্গিত দিলেন, দেবী দুর্গা আর কালী বস্তুত আলাদা দেবী নন৷ পৃথক চেহারায় একই দেবী।

কিন্তু, তারপরও প্রশ্ন রইল, তাঁর রং কালো থেকে গোধূম বর্ণ বা অতসী বর্ণ হল কিভাবে? লিঙ্গপুরাণে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা আছে। বলা হয়েছে, মহাদেব দারুকা রাক্ষসকে বধের ভার দিলেন দুর্গাকে। কারণ, নারী ছাড়া দারুকাকে কেউ বধ করতে পারবে না। দুর্গা তখন শিবের কণ্ঠস্থ গরল পান করে কৃষ্ণবর্ণা হলেন ও দারুকাকে বধ করলেন৷ অর্থাৎ, লিঙ্গপুরাণ মতে, দুর্গাই কালীর রূপ নিয়েছিলেন। পুরাণ তাই দারুকা বধের শ্রেয় কালীকেই দিল, দুর্গাকে নয়৷ দশমহাবিদ্যায় বলা হল, দুর্গার প্রথম রূপ কালী আর দু-জনেরই সহচর বা ‘স্বামী’ হলেন শিব।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, সেই কালীকেও কেন রং বদলে ফর্সা হতে হল? কারণ হল আর্যায়ন। ব্রাহ্মণ্যবাদ আসার পর শবর-চণ্ডালদের আরাধ্যা কালীকে পূজায় আপত্তি ছিল আর্য তথা উচ্চবর্ণের, বিশেষত ব্রাহ্মণদের৷ কোনও কৃষাঙ্গীকে বা অব্রাহ্মণকে তাঁরা পুজা করতে রাজী ছিলেন না। মহাভারতে কৃষ্ণকে পাদ্যার্ঘ্য দেওয়া নিয়েও এমন আপত্তি ঊঠেছিল। অথচ, সাধারণ মানুষ কালীকেই মানেন৷ অর্থাৎ, সাধারণের মন পেতে হলে কালীর পূজা ছাড়া অন্য কোনও উপায়ও নেই৷ অতএব, সমস্যার সমাধান হল দেবীর শরীরের রং বদলে, নগ্নশবরীকে কাপড় পরিয়ে, শ্মশান থেকে লোকালয়ে এনে। সেটাকে সর্বমান্য করতে পুরাণে পুরাণে নানা কাহিনির অবতারণা হল। কখনও বলা হল, অসুর বধের প্রয়োজনে তিনি কৃষ্ণাঙ্গী হলেন, কখনও শিবের কন্ঠস্থ গরল পান করে কৃষ্ণাঙ্গী হলেন। উপরের কাহিনিগুলি থেকে মনে হয়, তিনি আসলে গৌরী, কিন্তু প্রয়োজনে কৃষ্ণাঙ্গী হয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা নয়। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

আর্যায়নে সেই কৃষ্ণাঙ্গী দেবীই হয়ে গেলেন দুর্গা, যার বর্ণনা মার্কণ্ডেয় মুনি করেছিলেন। তিনি কাত্যায়নী, অর্থাৎ কালী। মার্কণ্ডেয় মুনির আশ্রম ছিল দক্ষিণ ভারতে, নর্মদার কাছাকাছি দক্ষিণের পাহাড় ঘেরা বিন্ধ্যাঞ্চলে। দেবী যে ওখানকারই, তার প্রমাণ দেবীর বহুল প্রচারিত নাম ‘বিন্ধ্যবাসিনী’। দক্ষিণ ভারতের শবর, পুলিন্দ, মারবারদের মেয়েরা গৌরাঙ্গী নন, কৃষ্ণাঙ্গী। অন্ধ্র, ওড়িশার গ্রামে গ্রামে দুর্গা হিসাবে যে বনদুর্গা পুজিতা, তিনিও কৃষ্ণাঙ্গী।

কৃষ্ণাঙ্গী থেকে আর্যায়নে গৌরী হওয়ার জন্য পুরাণকাররা কোন কাহিনির অবতারণা করেছেন, তা আছে বামনপুরাণ-এ। বামনপুরাণ বলছে, কৃষাঙ্গী বলে মহাদেব পার্বতীকে প্রায়ই ‘পার্বতীকালী’ বলে সম্বোধন করতেন৷ এতে মনঃক্ষুণ্ণ পার্বতী ‘নাকি’ গাত্রবর্ণ পরিবর্তনের জন্য কঠিন তপস্যায় বসেন। একসময় কঠোর তপস্যায় তার গায়ের রং তামা কাষার মতো হয়ে যায়। তার সেই রূপের নাম কৌষিকী। অবশেষে, শিবের বরেই তার তপস্যা সফল হয়। তিনি ফর্সা হয়ে যান। সেই থেকে তার নাম হয় ‘গৌরী’ ৷

দেবী কৌষিকী

মজার ব্যাপার, অন্য কোনও পুরাণে তপস্যার দ্বারা গায়ের রং বদলানো যায়, এর সামান্যতম ঈঙ্গিতও নেই। থাকলে নারায়ণ বা শিব নিজেরা কালো থাকতে চাইতেন? জানা নেই। কেবল কালীকেই তপস্যা করে ফর্সা হতে হল? এটা সর্বজনবিদিত যে, তপস্যায় কারও গায়ের রং বদলায় না৷ বরং, পুরাণ কাহিনিগুলিই পরোক্ষে বলে দেয়, সময় বদলের সঙ্গে সঙ্গে দাক্ষিণাত্যের নিম্নবর্ণের মানুষদের উপাস্যা আদিবাসী শবর সমাজের কৃষ্ণকায়া দেবী কীভাবে উত্তর ভারতের উচ্চবর্ণের আরাধ্যা ও আর্যদের পূজ্যা হলেন৷ তাঁর রূপ বর্ণনায় বদল ঘটিয়েই কঠিন বৈপরীত্যের সহজ সমাধান করেছিলেন পুরাণকারেরা। না হলে কি তথাকথিত আর্যরক্তের ‘ধারক-বাহকরা’ দুর্গাপূজার অধিকার পেতেন?

আরও কিছু কৃষ্ণাঙ্গী দুর্গা

এ ছাড়াও নানা পুরাণের আরও নানা কিছু থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে, দুর্গা ছিলেন আদিবাসীই। মহিষাসুরের (নাকি মহিষাশূর-এর) সঙ্গে তাঁর যুদ্ধও যে আসলে দুটি আদিবাসী গোষ্ঠীর এলাকায় ক্ষমতা দখলের পরিণাম, সেটিও আলোচ্য হতে পারে। মহিষাসুরের দেশ, দুর্গার উদ্ভবের এলাকা ইত্যাদির আলোচনায় তা স্পষ্ট হতে পারে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2769 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...