ইডিপাস ও অতিমারি

স্বাতী মৈত্র

 


লেখক অধ্যাপনা করেন, প্রাবন্ধিক

 

 

 

 

কোনও কোনও রোগী বিনা চিকিৎসা ও যত্নে মারা গিয়েছিলেন। কেউ কেউ আবার বহু যত্নেও বাঁচেননি। সে রোগের সেরকম কোনও চিকিৎসা ছিল না, সেরকম কোনও ওষুধ ছিল না যা সবাইকে সমানভাবে দেওয়া যেত। যে চিকিৎসায় একজন উপকার পেয়েছেন, সেই চিকিৎসাতেই আরেকজনের ক্ষতি হওয়ার নিদর্শন ছিল। শারীরিকভাবে শক্ত অথবা অশক্ত, কেউই এই মহামারির থেকে নিস্তার পাননি। এই রোগে সব ধরনের মানুষের মৃত্যু হয়েছে, সে যেভাবেই তাদের চিকিৎসা করা হোক না কেন। এ রোগের সবথেকে ভয়ঙ্কর দিক যেটা ছিল, তা হল এই যে যেই মুহূর্তে কেউ বুঝতে পারত যে তার এই রোগ হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে সে জীবনের আশা ত্যাগ করত। এরকম মানসিক অবস্থার কারণে রোগের সঙ্গে লড়তে পারেননি বহু মানুষ। এ ছাড়াও, একজন আরেকজনের শুশ্রূষা করতে করতেও রোগাক্রান্ত হত, প্রায় ভেড়ার পালের মতন মরতে হয়েছিল। এ কথা বলা যায় যে সবথেকে বেশি মৃত্যু এই কারণেই হয়। যারা অন্য কারও কাছে আতঙ্কে যেতে না চাইত, তারা অনেকেই নিঃসঙ্গ মৃত্যুবরণ করতে বাধ্য হয়েছিল। বহু ঘর খালি হয়ে গিয়েছিল, কারণ সে বাড়ির মানুষদের দেখাশোনা করবার জন্য কেউ ছিল না। যারা অন্যদের কাছে যাওয়া ছাড়েনি, তারা মরত। এঁদের মধ্যে অনেকেই সৎ, নির্ভীক মানুষ, তাঁরা নিজেদের বন্ধুবান্ধবদের কিছুতেই ত্যাগ করেননি। এমনকি যখন রোগীর বাড়ির লোকজন হাল ছেড়ে দিয়েছে, তখনও তাঁরা রোগীর সেবা-শুশ্রূষা ছাড়েননি।

গ্রিক ইতিহাসবিদ থুসিডিডিসের ‘হিস্ট্রি অফ দা পেলোপোনেসিয়ান ওয়ার’-এর থেকে উদ্ধৃত উপরোক্ত অংশটুকু পড়ে মনে হতেই পারে, এ কোন মহামারির কথা লিখছেন থুসিডিডিস? সংক্রমণ, মৃত্যু, মানসিক অবসাদ, ছোঁয়াচে রোগের ভয়ে মানুষের একে অপরকে এড়িয়ে চলা, প্রিয়জনেদের সঙ্গ-বঞ্চিত হয়ে নিঃসঙ্গ মৃত্যু— এ তো যেন আমাদেরই সময়ের বয়ান!

থুসিডিডিসের এই ইতিহাস অবশ্য আজ থেকে দু হাজার বছরেরও আগে লেখা। খ্রিস্টপূর্ব ৪৩১ থেকে ৪০৪ ধরে চলা পেলোপোনেসিয় যুদ্ধের সময়ে লেখা এই ইতিহাসের বই আট খণ্ডে বিভক্ত। সেই যুদ্ধে এথেন্সের জেনারেল হিসেবে থুসিডিডিস নিজেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ৪৩০ সালে এথেন্স শহরে প্রথম হানা দেয় এক অজানা রোগ। তারপর খ্রিস্টপূর্ব ৪২৯-৪২৬ সালের মধ্যে সে রোগ মহামারি আকার নিতে নিতে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। সেই অজানা রোগের উৎপত্তি সম্ভবত উত্তর আফ্রিকার ইথিওপিয়া। আমাদের এ যুগের মহামারি যেমন বিমানবন্দর থেকে বিমানবন্দরে ছড়িয়ে পড়েছে, অনেকটা সেরকমভাবেই সমুদ্রবন্দর মাধ্যমে দূর-দূরান্তের নাবিক ও বণিকদের আনাগোনার সঙ্গে সঙ্গে রোগ ছড়িয়ে পড়ে এথেন্স নগরীতে। সেই মারণ রোগ যে আসলে কী ছিল, তা আজকের চিকিৎসাবিদ ও ইতিহাসবিদেরা এখনও ঠিক করে উঠতে পারেননি, হয়তো পারবেনও না। কারও ধারণা, এটা গুটিবসন্তের মহামারি ছিল। কারও ধারণা টাইফাস। কেউ কেউ একে বিউবোনিক প্লেগের একটি প্রাচীন নিদর্শন হিসেবেও দেখেছেন। বলা হয়, ৭৫,০০০ থেকে ১০০,০০০ এথেন্সবাসী এই মহামারির শিকার হন, যদিও সে সংখ্যার সঠিক হিসেব আজকের দিনে পাওয়া সম্ভব নয়। থুসিডিডিস নিজেও এ রোগের শিকার ছিলেন, যদিও রোগমুক্ত হয়ে উঠতে পেরেছিলেন তিনি। এই মারণ রোগের হাতে এথেন্স তার শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব পেরিক্লসকে হারায়। বলাই বাহুল্য, এ মহামারি প্রাচীন এথেন্সে গভীর ছাপ ফেলে গিয়েছিল।

প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে মহামারি নানা রূপে ঘুরে ফিরে আসে। হোমারের ‘ইলিয়াড’ শুরুই হয় এক ভয়াল মহামারির দৃশ্য দিয়ে। নাট্যকার সফোক্লিসের ‘ইডিপাস রেক্স’ নাটকের শুরুতেও আরেক মহামারি। মহামারির জ্বালায় কাতর থিবস নগরীর নাগরিকেরা এসে কেঁদে পড়ে রাজা ইডিপাসের কাছে, সুরাহার আশায়। নাটকের শেষে ইডিপাস জানতে পারে যে থিবস নগরীর ভূতপূর্ব রাজা লায়াসকে সে পথে হত্যা করেছিল, তাঁর পরিচয় জানা ছিল না তার। সেই লায়াস আসলে ইডিপাসের জন্মদাতা পিতা ছিলেন। একটি ভবিষ্যৎবাণীর ফলে লায়াস শিশু ইডিপাসকে হত্যার আদেশ দিয়ে নগর থেকে দূর করে দেন, কিন্তু যার হাতে শিশুটিকে দিয়েছিলেন তিনি, সে মায়ার বশেই ইডিপাসকে হত্যা করতে পারেনি। ইডিপাস এও জানতে পারে যে তার স্ত্রী জোকাস্টাই তার জন্মদাত্রী মা। এই ভবিষ্যৎবাণী সম্পর্কে জানতে পেরে কোরিন্থে তার পালিত পিতা-মাতার গৃহ ত্যাগ করে ইডিপাস। কিন্তু নিয়তি বড় নিষ্ঠুর! রাজহত্যা, পিতৃহত্যা, অজাচার— নিজের অজান্তেই এই সমস্ত অপরাধ করে ইডিপাস, এবং সে অপরাধের যথাযথ শাস্তি না হওয়ার ফলে দায় নিতে হয়েছে সমগ্র থিবস নগরীকে। এহেন ভয়ানক সত্য জানবার পরে জোকাস্টা আত্মহত্যা করেন। শোকে, ক্ষোভে কাতর ইডিপাস নিজেই নিজেকে আঘাত করে, নিজের চোখ অন্ধ করে দেয়। এরপর থিবস নগরীতে তার আর স্থান হওয়া সম্ভব নয়। নির্বাসন, যা কিনা মৃত্যুর থেকেও ভয়ানক, তার একমাত্র শাস্তি। সন্তানদের হাত ধরে থিবস ত্যাগ করে ইডিপাস। তার প্রস্থান ও যথোচিত শাস্তির পরেই মহামারি থেকে নিস্তার পায় থিবস নগরী। এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসিকিস্ট অধ্যাপক মেরি বেয়ার্ড বলেছেন, পাশ্চাত্য সাহিত্যের শুরুই হয়েছে মহামারি দিয়ে। ‘অতিমারি’ বা ‘প্যান্ডেমিক’ শব্দটা তাঁদের ডিকশনারিতে ছিল না যদিও, তবে সাহিত্যের পাঠকদের জন্য এটি বেশ মনোজ্ঞ একটি বক্তব্য। স্বাস্থ্য, দুর্ভোগ ও পীড়া, রোগ ও সাহিত্যের সম্পর্ক প্রসঙ্গে আমরা সচরাচর হয়তো এতটা চিন্তা করি না।

‘রাজা ইডিপাস’ বহু পঠিত, সতত অভিনীত একটি নাটক। নাটকের মূল কাহিনি হিসেবে আমরা সাধারণত নায়কের তমসা থেকে সত্যের আলোকে যাত্রাকেই ভেবে থাকি। পাঠ ও অভিনয় করবার সময় বার বার প্রশ্ন ওঠে— নিজের অজান্তে করা অপরাধের জন্য ইডিপাস দায়ী, না সে নেহাতই অদৃষ্টের হাতে এক পুতুল মাত্র? তার উত্তরে অবশ্য এরিক ডডস বহুকাল আগেই বলেছেন যে এইভাবে ভাবার আদৌ প্রয়োজন নেই। একদিকে নাটকটি যেমন নিয়তি নামক বৃহত্তর শক্তির সামনে মানুষের অসহায়তার কাহিনি, আবার আরেকদিকে নাটকটির বিষয় মানব চরিত্র। প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কঠিন সত্যের সম্মুখীন হওয়ার শক্তি ও সাহস যে মানুষের আছে, এটা ‘ইডিপাস রেক্স’ চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। মানব চরিত্রের দুর্বলতা ও মানুষের অদম্য সহনশীলতা, এই দুই মিলিয়ে ‘ইডিপাস রেক্স’। আবার মঞ্চ থেকে ক্লাসরুমে যখন ইডিপাস এসে অবতীর্ণ হয়, তখন আলোচনায় উঠে আসে ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব। আমরা আলোচনা করি প্রাচীন গ্রিসে নগর ও গৃহস্থের সম্পর্ক নিয়ে (oikos অর্থাৎ গৃহ, ও polis অর্থাৎ নগর)। যে কোনও মানুষই একই সঙ্গে গৃহস্থ এবং নাগরিক, যদি না তিনি ব্যতিক্রমী সংসারত্যাগী অথবা ক্রীতদাস হন। রাজা ইডিপাস নিজেই একাধারে গৃহস্থ এবং নাগরিক। ক্লাসরুমের আলোচনায় তাই উঠে আসে ইডিপাসের সন্তানদের কথা, উঠে আসে একটি নিষ্ঠুর সত্য— রাজহত্যা, পিতৃহত্যা, অজাচারে কলুষিত ইডিপাসের ঘর উজার না হয়ে গেলে থিবস নগরীকে সংক্রমণ-মুক্ত করা সম্ভব না। আলোচনায় উঠে আসে রাজনীতি, কারণ ইডিপাস তো শুধু ব্যক্তি মানুষ নয়, ইডিপাস রাজা। অতঃপর আলোচনা হয় রাজা ও নগরের সম্পর্ক প্রসঙ্গে, আলোচনা হয় নগর (আজকের ভাষায়, সিটি স্টেট) সম্পর্কিত গ্রিক রাজনৈতিক চিন্তা প্রসঙ্গে, গ্রিক নগর ও আধুনিক রাষ্ট্রের সম্পর্ক প্রসঙ্গে। কিন্তু আমাদের এই অতিমারির অভিজ্ঞতা হঠাৎ করেই নতুন ভাবে আমাকে ভাবিয়েছে। ইডিপাস ও তার ট্র্যাজেডি নিয়ে আমি নিজে এর আগে যতদিন চর্চা করেছি, নাটকের একটা মূল বিষয়কে সেরকম গুরুত্ব দেওয়ার আদৌ অবকাশ হয়নি— তা হল থিবস নগরীর মহামারি, যা দিয়ে ‘ইডিপাস রেক্সের’ কাহিনির সূত্রপাত।

এই প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে একজন ডাক্তার— ডঃ রায়ান এম অ্যান্টিয়েল— একটি প্রবন্ধ লেখেন, যা আমাকে বেশ নাড়া দিয়ে গিয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন,

আমাদের আজকের পরিস্থিতি, এবং পরিস্থিতির চাহিদা অনুযায়ী এই যে সামাজিক দূরত্ব, এই একাকিত্ব, তা যেন ‘রাজা ইডিপাস’ নাটকের প্লেগ আক্রান্ত থিবস শহরের প্রতিচ্ছবি। নাটকের প্রথম দৃশ্যেই আমরা মহামারির ফল দেখি— নগরের ব্যস্ত রাস্তা সব শুনশান, সন্তান-বিচ্ছিন্ন মাতাপিতা, নাগরিক-বিচ্ছিন্ন নগর। এক পুরোহিতের ভাষায়,

আমাদের নগরীর দশা আপনি তো নিজে দেখেছেন,
ঝঞ্ঝায় তাড়িত যেন সীমাহীন মৃত্যুর পাথার
যার থেকে পালাতে পারে না কেউ—
মুক্তি নেই, তীর নেই সেই ক্রুদ্ধ মৃত্যু-ঢেউ থেকে।
মৃত্যু আজ আমাদের ফলবন্ত জমির গভীরে,
মৃত্যু আজ বিরান চারণক্ষেত্রে,
রমণীর জরায়ুতে নিষ্ফলা কঠিন মৃত্যু।
মারি ও মড়ক নামে অগ্নিময় নির্মম দেবতা
নগরীতে সমাগত।
(অনুবাদ – আকবর আলি খোন্দকার)

এই কাহিনি কি আমাদের কাহিনি নয়? আমরা কি লকডাউনে দিনের পর দিন খালি রাস্তা, বন্ধ দোকানপাট দেখিনি? আমরা কি রোজ অ্যাম্বুলেন্সের আর্তনাদ শুনিনি? রাস্তায় শ্মশানের শান্তি, আর শ্মশানে ভিড়— ২৪ ঘন্টা ধরে জ্বলতে থাকা ইলেকট্রিক চুল্লির ধোঁয়া, হাসপাতাল থেকে মৃতদেহের পাহাড় বেরোনো। নাম না জানা বেওয়ারিশ লাশ, ফলকহীন গণকবর, প্রিয়জনকে শেষবারের মতন দেখতে না পাওয়া পরিবার। কর্মহীন মানুষের বেদনা, শ্রমিকদের মিছিল, ক্ষুধার্ত মানুষের গণরান্নাঘর আর চাল-ডাল-আলুর রেশন— এই অদ্ভুত আতঙ্কের কাহিনি কি আমাদের কাহিনি নয়?

ইতিহাসবিদ থুসিডিডিস ও নাট্যকার সফোক্লিস সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। যে মহামারি থুসিডিডিস দেখেছিলেন, তা সফোক্লিসও প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ‘ইডিপাস রেক্স’ নাটক ঠিক প্রথম কবে অভিনীত হয়েছিল, সেই নিয়ে কিছু দ্বন্দ্ব রয়েছে নিঃসন্দেহে, কিন্তু বার্নার্ড নক্সের মতন বহু ইতিহাসবিদের দৃঢ় ধারণা যে নাটকটির অভিনয় এথেন্সের প্লেগ-পরবর্তী সময়ে হয়েছিল। এর প্রথম কারণ, নক্স বলছেন, কাহিনিতে মহামারির প্রশ্ন উত্থাপন হওয়া। গ্রিক সাহিত্যে আর পাঁচটা গল্পের মতন ইডিপাসের কাহিনিও সফোক্লিসের নিজস্ব নয়, কিন্তু ইডিপাস-কাহিনিতে প্লেগের বর্ণনা একেবারেই সফোক্লিসের নিজস্ব অবদান। বহুপ্রচলিত খরা, ফসল নষ্ট হওয়া ও সন্তানহীনতার কাহিনিতে সফোক্লিস হঠাৎ প্লেগের বর্ণনা আনবেনই বা কেন, এতগুলো সমস্যাই কি যথেষ্ট নয়? নক্সের উত্তর একটাই— থিবসের মহামারি আসলে এথেন্সের মহামারি। তাঁর অনুমান, ‘ইডিপাস রেক্স’ প্রথম অভিনীত হয়েছিল খ্রিস্টপূর্ব ৪২৫ সালে, মহামারির দ্বিতীয় ঢেউ কাটবার পর। আমরা জানি যে এ সত্ত্বেও সে বছরের গ্রেটার ডায়নিসিয়া উৎসবে প্রথম পুরষ্কারটা পাওয়া হয়ে ওঠেনি ‘ইডিপাস রেক্সের’, তবে তাতে কি বা এসে যায়? আজকে, ২০০০ বছরেরও বেশি পরে, আমরা ‘ইডিপাস রেক্স’ নিয়ে আলোচনা করছি, এটাই বা কম কী?

এখন প্রশ্ন যেটা, তা হল এরকম একটা নাটকের পাঠ আমরা কেমন করে করব? সফোক্লিস ও তাঁর দর্শকবৃন্দ মহামারি দেখেছিলেন, হয়তো কেউ কেউ পরিজনকে হারিয়েছিলেন, কেউ কেউ নিজেই রোগাক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁরা তাঁদের নেতা পেরিক্লসের মৃত্যু দেখেছিলেন। তাঁদের নাটকের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল, তা হয়তো পুরোপুরি আজকের দিনে বসে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। কিন্তু এ কথা অনুমান করা যেতে পারে যে শিরোনাম-চরিত্র, অর্থাৎ রাজা ইডিপাস নিজে, তাঁদের দর্শন ও চিন্তার অনেকটাই জুড়ে ছিলেন। এটা অন্তত কিছুটা অ্যারিস্টটলের ‘পোয়েটিক্স’ পাঠ করলেও বোঝা যায়। রাজা ইডিপাস চরিত্র হিসেবে যে আমাদের সমসাময়িক অনেকের মনেই এসেছেন, এ কথাও বেশ জোর দিয়েই বলতে পারি। কয়েকটা মার্কিনি উদাহরণ দিই, কারণ এই মুহূর্তে বিশ্বে সবথেকে বেশি করোনা-জর্জরিত তাঁরাই। এলএ টাইমস থেকে একটা হেডলাইন: “President Trump vs. Oedipus Rex: Leaders Reveal themselves in times of plague”। টাইমস অফ স্যান ডিয়েগো থেকে: “An Ancient Greek Tragedy Holds a Mirror to Trump’s Coronavirus Leadership”। মিলাউকি টাইমস থেকে: “When Plagues Followed Bad Leadership: Greek Tragedy of Oedipus Tyrannos is a Lesson for Trump on Covid-19”। হেডলাইন পড়ে শুধু লেখার সারমর্ম বোঝা যে যায় বা উচিত, তা নয়, তবে এখান থেকে একটা সামান্য আন্দাজ হয়তো পাওয়া সম্ভব। এই তিনটে লেখার মূল বিষয় একটাই: ‘ইডিপাস রেক্স’ নাটকের আলোকে স্বয়ং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বের সমালোচনা। থিবস নগরীতে তার প্রজাদের যাতনার জন্য ইডিপাস নিজেই দায়ী। এই সবকটা লেখাতেই ইডিপাসের মাধ্যমে আঙুল তোলা হচ্ছে স্বয়ং প্রেসিডেন্টের দিকে, তাঁকে দায়ী করা হচ্ছে অগণিত মার্কিন নাগরিকের দুঃখ-কষ্ট-মৃত্যুর জন্য।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, ২০২০ সালে বসে এরকম একটা তুলনা এত সহজে আসে কেমন করে? মিকা আলটোলার ২০১২ সালে লেখা একটা প্রবন্ধ আছে, প্রসঙ্গ, ‘অতিমারির রাজনীতি’। সেখানে তিনি বলছেন,

ক্ষমতার সঙ্গে রোগের নিবিড় সম্পর্ক, কারণ বহু ক্ষেত্রেই রোগকে দুর্বলতার চিহ্ন হিসেবে দেখা হতে পারে— এমন দুর্বলতা, যার কারণে কেউ ক্ষমতার অযোগ্যও গণ্য হতে পারেন। আবার রোগ কারও ক্ষমতার উৎস হতে পারে, হতে পারে অবিশ্বাস্য শক্তির পরিচয়। এর কারণ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের বৈধতার মাপদণ্ডের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে সু-স্বাস্থ্য নিশ্চিন্ত করতে পারা, বহু ক্ষেত্রেই। স্বাস্থ্যের অভাবকে দেখা হয় অন্যায়ের সঙ্গে, অবৈধতার সঙ্গে। শুধু শারীরিক স্তরে নয়, ক্ষমতার মাপদণ্ড হিসেবেই এই প্রশ্নগুলি উঠে আসে।

প্রাচীন সাহিত্যে এর উদাহরণ প্রচুর। সেখানে আমরা যেমন অভিশাপ-জনিত অস্বাস্থ্যও দেখি, আবার মিরাকলের সাহায্যে সুস্থ হওয়া, দৈব সাহায্য, অদ্ভুত চিকিৎসা— এ সবই আমরা দেখতে পাই। ‘মহাভারতে’ ধৃতরাষ্ট্রর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে শুধু ক্ষমতাধারণের অযোগ্য করে তোলে তা নয়, পুরো কাহিনি জুড়ে তাঁর অন্ধত্ব একটি বৃহৎ মেটাফর হিসেবেও ব্যবহার হয়। ‘রামায়ণে’ হনুমান সঞ্জীবনী নিয়ে আসতে গিয়ে একটি গোটা পাহাড় তুলে নিয়ে আসেন— এটা একই সঙ্গে তাঁর আনুগত্য ও চারিত্রিক দৃঢ়তার উদাহরণ। ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে দেবী মনসা ক্ষমতার প্রকাশ হিসেবে প্রাণ যেমন কেড়ে নেন, আবার সে প্রাণ ফিরিয়েও দেন।

এই কাহিনি ইডিপাসেরও। থিবস নগরীতে সে রাজা হয় কেমন করে? স্ফিংসের উপদ্রব থেকে থিবস নগরীর মানুষকে সে বাঁচায়, অর্থাৎ সে থিবস নগরীতে সু-স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনে। যদিও আমরা জানি সে থিবস নগরীর বৈধ উত্তরাধিকারী (সে নিজে তা না জানলেও), রক্ত নয়, নগরীর স্বাস্থ্য ফিরিয়ে আনাই ইডিপাসের রাজত্বের বৈধতার প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়। ‘ইডিপাস রেক্স’ নাটকের শুরুর মহামারি শুধু মানুষের প্রাণ বিপন্ন যে করে, তা নয়— ‘ইডিপাস রেক্সের’ মহামারি রাজার রাজত্বের বৈধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। ইডিপাস নিজে যে তা বোঝে না, তা নয়। সেই কারণেই দেবতা অ্যাপোলোর পুরোহিতের কাছে সে দূত পাঠায়, ঈশ্বরের বার্তার আশায়। ইডিপাসের সঙ্গে জ্ঞানবৃদ্ধ টাইরেসিয়াসের বিতর্ক বহু আলোচিত, এবং সাধারণত এই বিতর্ককে ইডিপাসের অজ্ঞানতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যে ইউলিসিসের পরেই চতুরতম চরিত্র যে ইডিপাস, তার এই বিতর্কে অংশগ্রহণকে আমরা তার অজ্ঞানতার লক্ষণ না ভেবে দূরদর্শিতার লক্ষণ হিসেবেও ভাবতে পারি। এভাবে ভাবতে পারি যে চতুর ইডিপাস একটা বিষয় জানে— টাইরেসিয়াস যদি সঠিক হন, তাহলে তার রাজত্ব শেষ। শেষ তার সুশাসনের জন্য সুনাম— ইতিহাস তাকে মনে রাখবে এক ব্যর্থ, অযোগ্য রাজা হিসেবে। নগরীর স্বাস্থ্য, নাগরিকের স্বাস্থ্য, রাজা ও রাজনীতিবিদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার তৈরি করতে পারে, আবার শেষও করে দিতে পারে, যেমন ইডিপাসের হয়েছিল। আমাদের সময়ের রাজনীতিবিদেদের সঙ্গে কী হতে চলেছে, তা আমরা এখনও জানি না। তবে রাজা ইডিপাসের পরিণতি চিন্তা করলে হয়তো অনেক রাজনৈতিক নেতা চিন্তায় পড়বেন— অতিমারির রাশ টানতে না পারলে তাঁদের গদি থাকবে তো?

তবে অন্যায় হবে যদি আমরা ‘ইডিপাস রেক্সের’ আলোচনা শুধু রাজার আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ রাখি। ডঃ রায়ান এম অ্যান্টিয়েল লিখেছেন,

থিবসের প্লেগ কিন্তু দুঃখ-কষ্ট-বেদনার সামাজিক রূপকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখায়। আমাদের সময়ে হয়তো আমরা ইন্ডিভিজুয়ালাইজড মেডিসিন নিয়ে বেশি চিন্তিত, কিন্তু এই অতিমারি খুব পরিষ্কার করে জানান দিয়েছে যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক চিন্তা আসলে ভুয়ো, নিস্ফল। আমরা সামাজিক প্রাণী। নিউ ইয়র্কের একজন ডাক্তার আমাকে বললেন, ‘কোভিড-১৯ রোগের সব থেকে খারাপ দিক হচ্ছে যে রোগীরা একা মারা যায়, পরিবারের কাউকে তারা পাশে পায় না।’ ডাক্তাররা কিন্তু ইতিমধ্যেই সামাজিক দূরত্বের মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রতিফলন সম্পর্কে যথেষ্ট সতর্ক করছেন।

ডাক্তারবাবু সত্যিই ভুল কিছু বলেননি। আমাদের তো বার বার বোঝানো হয়েছে যে এই অতিমারির সঙ্গে লড়াই আমাদের সবার দায়িত্ব। আমাদের যখন মাস্ক পরতে বলা হয়, তখন তো বলাই হয় যে মাস্ক শুধু নিজের জন্য নয়, মাস্ক অন্যদের সুরক্ষার জন্যও— আমার থেকে অন্য আরেকজনকে সুরক্ষিত রাখবার জন্য, কারণ আমি না চাইতেও কাউকে বিপদে ফেলতে পারি। অতিমারি আমাদের শিখিয়েছে যে আমাদের প্রত্যেকের মধ্যেই অপরের ক্ষতি করবার ক্ষমতা আছে, জ্ঞানত অথবা নিজেদের অজান্তেই। ইডিপাস কি চেয়েছিল তার প্রিয় থিবস নগরীর নাগরিকদের বিপদে ফেলতে?

গ্রিক নাটকে কোরাস বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিল্পী একত্রে গান গাইলে তাকে কোরাস অথবা সমবেত গান বলে। অ্যারিস্টটলের লেখা থেকে আমরা জানি যে ধর্মীয় উৎসবে সমবেত নৃত্যগীত থেকেই নাটকের জন্ম। গ্রিক নাটকে ২৪ জন অভিনেতার সমবেত নৃত্যগীত পরিবেশনার মাধ্যমে কোরাস মঞ্চকে মাতিয়ে রাখত। কোরাসের চরিত্ররা সরাসরিভাবে নাটকের ঘটনাবলিতে যুক্ত না হলেও তারা দর্শকের ভূমিকা পালন করত, তাদের ব্যাখ্যা আসলে দর্শকের চোখ দিয়ে নাটকের ব্যাখ্যা। ‘ইডিপাস রেক্স’ নাটকের শুরুতেই আমরা দেখি যে এখানে কোরাস রয়েছে থিবস নগরীর নাগরিকদের চরিত্রে। অর্থাৎ, তাদের সমবেত কণ্ঠস্বর জনতার কণ্ঠস্বর। তাদের বেদনা, তাদের আকুতি, সাধারণ মানুষের বেদনা-আকুতি-যন্ত্রণা। ‘ইডিপাস রেক্স’ নাটকে জনতার কন্ঠস্বর কী বলে? প্রথমেই তাদের রাজাকে উদ্দেশ্য করে তারা বলে, “আমাদের নগরীর দশা আপনি তো নিজে দেখেছেন”, যেন তারা চায় যে ইডিপাস তাদের বেদনার, তাদের যন্ত্রণার সাক্ষী হোক। তারা ইডিপাসকে তার ক্ষমতায় আসবার কাহিনি মনে করিয়ে দেয়,

মনে আছে, এ নগরে যেদিন প্রথম করলেন পদার্পণ:
স্ফিংসের প্রশ্নের নির্ভুল জবাব দিয়েছেন আপনিই!
সবাইকে করেছেন মুক্ত মরণের অভিশাপ থেকে।
কোন সহায়তা আমরা পারিনি দিতে
আপনাকে সেদিন
না জ্ঞান দিয়ে, না অন্য কোনওভাবে। তবু
আমরা বিশ্বাস করি, শুধুমাত্র দেবতার বরে
সেদিন ফিরিয়ে দিয়েছেন পরমায়ু সকলের –
আমাদের সকলের সুপ্রিয় জীবন।
(অনুবাদ – আকবর আলি খোন্দকার)

এখানে অবশ্যই তারা খুবই বিনীত। কিন্তু তার পরের বক্তব্য কী?

হে মানবশ্রেষ্ঠ,
আমাদের প্রিয় নগরীর প্রাণ ফিরিয়ে আনুন
ফিরিয়ে আনুন আপনার নামে মানুষের আস্থা —
কোন দুর্মুখ যেন কখনো না বলে, আপনার রাজত্বে
আমরা বেঁচেছি শুধু পতনের জন্য।…
সত্যি যদি হতে চান আমাদের রাজা, যেমন এখনও
আপনি তাহলে জীবিত মানুষের রাজা হন, শূন্যতার
সম্রাট হবেন না।
নগর-প্রাকার কিম্বা যুদ্ধ-জাহাজকে কেউ রাজত্ব বলে
না, যদি মানুষ না বাঁচে আর জীবন-স্পন্দন যদি
থেমে যায় মানুষের বুকের ভেতর, তবে
রাজত্ব কীসের?
(অনুবাদ – আকবর আলি খোন্দকার)

যদি থিবস নগরীর মানুষকে ইডিপাস বাঁচিয়েই রাখতে না পারে, যদি তাদের স্বাস্থ্যর প্রতিই সে নজর না দিতে পারে, তাহলে আর তার রাজা হয়ে লাভ কী? তাহলে আর তার রাজা হওয়ার বৈধতা কোথায় রইল? যদি সে আগের মতন এবারও থিবস নগরীর নাগরিকদের প্রাণ রক্ষা করতে না পারে, তাহলে তার সিংহাসনের উপর দাবি কি সত্যিই থাকে? থিবস গণতন্ত্র না হতে পারে, সফোক্লিসের এথেন্স নগরী কিন্তু একটি প্রাচীন গণতন্ত্র ছিল। আগেও বলেছি, রক্ত নয়, নাগরিকদের সমর্থনেই ইডিপাস ক্ষমতায় আসে, বৈধ রাজা হিসেবে স্বীকৃত হয়। “নগর-প্রাকার কিম্বা যুদ্ধ-জাহাজকে কেউ রাজত্ব বলে  না, যদি মানুষ না বাঁচে আর জীবন-স্পন্দন যদি থেমে যায় মানুষের বুকের ভেতর, তবে রাজত্ব কীসের?”— এখানে কি কোরাসের কণ্ঠে কিছুটা চ্যালেঞ্জ উঠে আসেনা? ইডিপাস তাদের প্রিয় নেতা, হীরকের রাজা নয় যে তারা বলবে, “অনাচার করো যদি, রাজা তবে ছাড়ো গদি”— কিন্তু আস্থাভঙ্গের ফল যে একই, তা পরিষ্কার।

এরপর নাটকে সঙ্কট যত গভীর হয়, কোরাসের কণ্ঠে নাগরিকের যাতনা— রাজনৈতিক সঙ্কট ও মহামারির যাঁতাকলে পেষবার যন্ত্রণা ফুটে ওঠে,

অগণন দুঃখ আমাদের।
নগরীর সারা অঙ্গে বিনাশের থাবা
এবং কোথাও নেই মুক্ত সুবাতাস
পবিত্র মাটিতে আর জন্মে না তো ঘাস
রমণীরা উদ্বাহু চিৎকার করে প্রসবের কালে,
কিন্তু মৃত শিশু জন্মগ্রহণ করে।
মৃত মানুষের আত্মা একে একে উঠে যায় যেন
ঊর্ধ্বগামী পৈশাচিক আগুনের শিখা –
রাত্রির গহন-বুকে ছুঁড়ে দেয়া হাহাকার তার।
অগণিত শবদেহ নগরীর পথে পথে
পড়ে আছে, শয্যাহীন।
শোকের কান্নার জন্য নেই কেউ।
(অনুবাদ – আকবর আলি খোন্দকার)

অতিমারি, আমি আগেই লিখেছি, একটি সামাজিক পরিস্থিতি— কেবলমাত্র ব্যক্তিগত দুঃখ বা কষ্ট নয়। সেরকমভাবেই, নাটক, বিশেষ করে গ্রিক ট্র্যাজেডি একটি সামাজিক মাধ্যম— জনগণের অর্থে জনসাধারণের জন্য জনসমক্ষে অনুষ্ঠিত, ব্যক্তিগত নিবিড় পাঠ এর উদ্দেশ্য নয়। অতএব কোরাস তথা নাগরিকের কণ্ঠে এই যে যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ, এই যে শোকের প্রকাশ, এ শুধু কাহিনির অংশ হিসেবে ভাবলে হবে না— এ যন্ত্রণা সামাজিক যন্ত্রণা, এই শোক সামাজিক শোক, সফোক্লিসের কোরাসের কণ্ঠস্বর থিবসের নাগরিকের কণ্ঠস্বর এবং এথেন্সের নাগরিকের কণ্ঠস্বর। আমি জানি, আমাদের সময়ে দাঁড়িয়ে হয়তো এই রকম সামাজিক শোক কল্পনা করাও সম্ভব নয়। লকডাউনে মৃত ও কর্মহীন, রাজপথে শ্রমিক মিছিল, রোগগ্রস্ত ও মৃতের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা, নানা প্রকারের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সঙ্কট— এর কোনও কিছুই যেন আমাদের আজকে স্পর্শ করে না। ওয়াটসঅ্যাপের ছেলেভুলনো গল্প আর নিউজ অ্যাঙ্করদের নিত্যনতুন কেচ্ছা কোরাস তথা নাগরিক কণ্ঠরোধে অতি পারদর্শী, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।

নাটকের শেষে কোরাস যখন বলে: “জীবিত মানুষকে সুখী কখনো বোলোনা/যতক্ষণ কবরের অন্ধকার এসে না দেয় সবলে টেনে জীবনের যতি/ততক্ষণ কেউ সুখী নয়”— তা কিন্তু হতাশার বাণী নয়। তা মহামারির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত মানুষের বেঁচে থাকবার বক্তব্য— মৃত্যুর বিভীষিকার সম্মুখীন হয়ে আসা জীবিতের বাণী। ডঃ অ্যান্টিয়েল লিখেছেন,

ট্র্যাজেডির উদ্দেশ্য নাগরিকদের যাতনা সহ্য করতে শেখানো, যাতনার সম্মুখীন হয়ে তার যথাযথ প্রতিক্রিয়া জানা। কখন ভয় পাওয়া যথাযথ, কখন সমবেদনা যথাযথ, ট্র্যাজেডি মানুষকে তা শেখায়। এথেন্সের নাগরিকেরা এই নাটক দেখে বুঝতেন যে ইডিপাসের মতন মহান ব্যক্তির জীবনে যদি এইভাবে অন্ধকার নামতে পারে, তাহলে সে অন্ধকার আমাদের জীবনেও নামতে পারে। ট্রাজেডি আমাদের জীবনের সীমাবদ্ধতা বুঝতে শেখায়। করোনাভাইরাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে আমরা ভঙ্গুর, এবং সীমাবদ্ধ।

এই অতিমারি যেদিন থাকবে না— সে কেমন পৃথিবী আজ আমার কল্পনার বাইরে— সেইদিন থিবসের নাগরিকদের মতই জীবিতের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে কথা আমাদের উপলব্ধির কথা বলতে পারব কি না, ক্ষতবিক্ষত হয়ে বেঁচে থাকার কথা বলতে পারব কি না, জানি না। কিন্তু ট্র্যাজেডি যদি মানুষকে বেদনা সহ্য করতে শেখায়, তাহলে আশা করব ‘ইডিপাস রেক্সের’ কাহিনি আমাদের মতন পাঠকদের কাছে কাথারসিস— মুক্তির— পথ দেখাবে।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 2769 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...