এখনও আশাজাগানিয়া স্বপ্নে আস্থা রাখেন আবু হোসেন

রুখসানা কাজল

 


লেখক গল্পকার, গদ্যকার। ঢাকা তেজগাঁও মহিলা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের বিভাগীয় প্রধান।

 

 

 

৭ মার্চ ১৯৭১ সালের মধ্য দুপুর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষ ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মাদ আবু হোসেন একটু আগেভাগে লাঞ্চ করে নিলেন। চরম উত্তেজনা চারদিকে। সবার লক্ষ্য রেসকোর্স ময়দান। আজ বঙ্গবন্ধু ভাষণ দেবেন। ’৭০এর সাধারণ নির্বাচনে নিখিল পাকিস্তানের পরাজিত প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী জুলফিকার আলি ভুট্টো বিজয়ী প্রার্থী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে যড়যন্ত্রের যে চাদর ঝুলিয়ে দিয়েছিলেন, তার মাজেজা ফলস্বরূপ বোঝা যাচ্ছিল। মার্চের ১ থেকে ৬ তারিখের মধ্যে চট্টগ্রাম, রংপুর, সিলেট, খুলনা, টঙ্গী, রাজশাহী সহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঙালিদের উপর গুলিবর্ষণ করছে পাকিস্তান সৈন্যরা। নিহত এবং আহতদের সংখ্যা শতাধিক। এসব তো ভালো আলামত নয়!

যে কারণে সর্বদলীয় ছাত্রনেতৃবৃন্দরা বঙ্গবন্ধুর চরম এবং ফাইনাল নির্দেশনার অপেক্ষা করছিলেন। আজ সেই দিন।

পদ্মা মেঘনা যমুনাকে স্বাধীন ঠিকানা করতে চাওয়া অতি সাধারণ জনগণও লক্ষ করেছিল, টেনে খেলছেন ভুট্টো ইয়াহিয়া। কেমন যেন ছল্লিবল্লি ভাব। অজানা আশঙ্কায় অনেকেই ঢাকা ছাড়তে শুরু করে। খেলাটা আন্তর্জাতিক রাজনীতিবিদদেরও মনোযোগের হিট লিস্টে উঠে এসেছিল। দুই পরাশক্তির সুদক্ষ পিজিয়নরা সারাক্ষণ সক্রিয় হয়েছিল। ৬ মার্চ ১৯৭১ ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রাম জানিয়ে দিয়েছিলেন, ভারতের উপর দিয়ে পাকিস্তানের বিমান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত থাকবে (সূত্র ইত্তেফাক, ৬ মার্চ ১৯৭১)।

২ মার্চ বঙ্গবন্ধু জানিয়ে দিলেন মার্চের ৭ তারিখ তিনি জনসমাবেশে বক্তব্য রাখবেন। এ জনসমাবেশকে কেন্দ্র করে সমগ্র দেশে তোলপাড় উঠল। স্বতঃস্ফূর্ত স্লোগান কাঁপিয়ে দিল— বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।

পূর্ব পাকিস্তানের গ্রামগঞ্জ শহর নগর উজিয়ে লঞ্চ নৌকা, ট্রেন বাস, পায়ে হেঁটে যে যেভাবে পারছিল ঢাকা আসতে শুরু করেছিল মানুষ। ভুট্টোর আলোচনা-অলঙ্কৃত চাদর তখন ফাটছে। তাতে ফুটে উঠছে রক্তে রাঙা স্বাধীন বাংলাদেশের মানচিত্র। সেই মানচিত্রকে বুকে ধারণ করে তৈরি হয়ে গেছিল স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা।

বুজুর্গ ব্যক্তিরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তরে মান্দার, শিরীষ, বট অশ্বত্থের গাছে শকুন নামার আভাস পেয়ে শঙ্কিত হয়ে উঠছিলেন। কালের কলমে বাঙালির রক্তে নতুন এক ইতিহাস লেখা হবে বলে কালঘুম থেকে জেগে উঠেছিল ইতিহাস। যে কোনও মুহূর্তে অঘটন ঘটার বার্তা দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল উত্তাল মার্চ।

কোটি বাঙালির মত তরুণ আবু হোসেন মাতৃভূমির স্বাধীনতা আনতে বদ্ধপরিকর। তাছাড়া তার দল বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট পার্টি থেকে (মনি সিং-ফরহাদ) নির্দেশ এসেছে— বি অ্যালার্ট অ্যান্ড অর্গানাইজড।

লক্ষ লক্ষ জনতার সমুদ্রে বঙ্গবন্ধু কখনও রূপক আবার কখনওবা সরাসরি নির্দেশ দিলেন— এবারের সংগ্রাম, আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।

৮ মার্চ মোহাম্মাদ আবু হোসেন তার দেশের বাড়ি তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ সাবডিভিশনে চলে এলেন। ছোট দুই ভাইয়ের একজন ইঞ্জিনিয়ার আবুল কাশেম ছিলেন বুয়েটের ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক এবং অন্যজন আবুল কামাল ছাত্র ইউনিয়নের একজন সক্রিয় কর্মী। তিনি স্থানীয় কম্যুনিস্ট নেতা ডাঃ রমানাথ বিশ্বাস, ওয়ালিয়র রহমান লেবু, শওকত চৌধুরীর সঙ্গে প্রতিরোধ বাহিনী গঠনে শুরু করলেন জনসংযোগ। কায়েদ এ আজম কলেজ থেকে সংগ্রহ করলেন কুড়িটি ডামি রাইফেল। বাড়িতে ছিল তিনটি বাঁশঝাড়। সেখান থেকে বাঁশ নিয়ে তৈরি করলেন আরও কিছু দেশীয় অস্ত্র। এবার প্রতিরোধের প্রথম পর্যায় শুরু করলেন। ভোরে তার প্রতিষ্ঠিত যুগশিখা ক্লাবে তরুণদের সামরিক প্রশিক্ষণ হত। সুফিয়া কামালের নেতৃত্বে মহিলা পরিষদ পাড়ায় পাড়ায় মহিলা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের আহ্বান জানিয়েছিল (১২ মার্চ ১৯৭১, দৈনিক ইত্তেফাক)। অণুপ্রাণিত হয়ে বীনাপাণি বালিকা বিদ্যালয়ে কলেজ পড়ুয়া সহ অন্যান্য নারীরা তার কাছে প্রশিক্ষণ নিতেন। এরপর তিনি স্থানীয় টাউল মাঠ এবং কায়েদ এ আজম কলেজের মাঠে স্বাধীনতার স্বপ্নে উজ্জীবিত ছাত্রযুবকদের প্রশিক্ষণ দিতেন।

প্রতিদিন সন্ধ্যায় মশাল মিছিল হয় এক অদ্ভুত আশা নিয়ে। তবুও অভিজ্ঞজনদের মনে দুশ্চিন্তা ধেয়ে আসে। এসব ঠুনকো অস্ত্রের ট্রেনিং কি পারবে পাকিস্তানি প্রশিক্ষিত বাহিনীর মোকাবেলা করতে?

এরমধ্যে খবর আসে ২৫ মার্চ, রাত বারোটায় অতর্কিত আক্রমণ চালিয়েছে পাকিস্তানি বাহিনী। আধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত সৈন্যরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল, রেডিও, টিভি অফিস, পুরানো ঢাকার বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে। ঢাকা এখন রক্তসাগর। পাকিস্তানিরা ধেয়ে আসছে বাংলার গ্রামগঞ্জে।

২৭ মার্চ কায়েদ এ আজম কলেজের ফ্ল্যাগস্ট্যান্ড থেকে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে ফেলেন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের (পরবর্তীতে কম্যুনিস্ট নেতা) নেতা শওকত চোধুরী এবং ছাত্রলিগ নেতা জাকির হোসেন খসরু। ২৯শে মার্চ খবর আসে পূর্ব পাকিস্তানের নিরীহ বাঙালিদের উপর হত্যাযজ্ঞের বিপক্ষে ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি (সিপিএম)-র কলকাতার শহীদ মিনারের পাদদেশে এক প্রতিবাদসভায় পশ্চিমবঙ্গের তথা ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির নেতা বিমান বসু বাংলাদেশের জনগণের স্বাধীনতার অধিকারকে সমর্থন করে মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি সাহায্য করার কথা ঘোষণা করেন এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীকেও আহ্বান জানান।

পাকিস্তানি সৈন্যরা শহর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিচ্ছে। ধর্ষণ করছে নারীদের। শিশুদের আছড়ে মারছে, কাউকে বেয়নেটে চিরে ফেলে রাখছে বা ছুঁড়ে দিচ্ছে আগুনে। অসহায় বাঙালি পালাচ্ছে। লক্ষ্য ভারত। ভারত তখন খুলে দিয়েছে তার সোনার হৃদয়খানি। ওপেন বর্ডার। রাজনৈতিক কর্মী থেকে কবি সাহিত্যিক সাধারণ ভারতীয়রা সোচ্চার হয়ে উঠেছে বাঙালির পক্ষে।

আবু হোসেনরা জানতেন, গোপালগঞ্জ এক সাহসী অঞ্চল। তবুও নারীদের কোদাল, খন্তা, কাস্তে, সড়কি, বর্শা, ছেনি, দা, কুড়াল, রামদা, হাতুড়ি বটি আর লাঠি ধার দিয়ে হাতের কাছে মজুত রাখতে পরামর্শ দিলেন তাঁরা। মৃত্যু ভয় সন্তাপ আর মেরে মরার প্রতিজ্ঞা নিয়ে সবাই প্রস্তুতি নেয়।

৩০ এপ্রিল, স্থানীয় পাকিস্তানপন্থীদের সহায়তায় ক্যাপ্টেন ঘোরির নেতৃত্বে খুলনা থেকে পাকিস্তানি বাহিনী জলপথে গোপালগঞ্জ শহর দখল করে নেয়।

আবু হোসেন ভারতের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লেন এবার। একদল শরণার্থীর সঙ্গে মধুমতী নদী পেরিয়ে নড়াইলের বাঐসোনা, কলাবাড়িয়া ছাড়িয়ে বড়দে নামের এক গ্রামে এসে থামলেন। এখানে নদী ভয়ঙ্কর। তাছাড়া জলে পাকিস্তানিদের গানবোটের টহল আর ডাঙ্গায় ছিল রাজাকার আলবদরদের পাহারা। রাতের অন্ধকারে বড়দে পেরিয়ে কলাগাছি নামের একটি গ্রামে এসে দেখা পেলেন রাজাকারদের। এদেরকে ধোঁকা দিতে তিনি একজন হিন্দু শরণার্থী নারীর দুটি শিশুর একজনকে কোলে নিয়ে তাদের বোঁচকা মাথায় তুলে বলেছিলেন, মণি (গোপালগঞ্জ অঞ্চলে স্নেহ সম্মানে অনাত্মীয় নারীদের এভাবে সম্বোধন করা হয়) আমি খারাপ মানুষ নই। আপনাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে আমাকে যেতে অনুমতি দেন মণিমা।

কলাগাছি ছাড়িয়ে এবার তিনি বর্ডারের কাছাকাছি এক গ্রামে পৌঁছে দেখলেন অস্ত্র হাতে কয়েকজন যুবককে। তারা জানাল এটা মুক্ত অঞ্চল। কেন ভারত যাবেন। আমাদের সঙ্গে থেকে লড়াই করেন বলে তারা আবু হোসেনকে জোর করছিল। এরা ছিলেন পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সক্রিয় সদস্য।

এ সময় তার কোমরে লুকানো ছিল একটি পিস্তল। কিছুটা ভয় আতঙ্কে খেয়াল করে দেখলেন, এখানকার কোনও কোনও দেওয়ালে লেখা আছে, এটা স্বাধীনতা যুদ্ধ নয়, দুই কুকুরের লড়াই চলছে, ইয়াহিয়া এবং মুজিবরের। আমার নেতা শেখ মুজিব নয়, আমার নেতা কমরেড মাও সেতুং। আবু হোসেন এবার কাতর অনুরোধ করে জানালেন, আমার ভাইবোনরা যুদ্ধে কে কোথায় হারিয়ে গেছে। তাদের খুঁজতে ভারত যাচ্ছি। আমাকে যেতে দিন ভাই। এ সময় অন্য আরেকজনকে নিয়ে এরা ব্যস্ত হয়ে পড়লে তিনি দ্রুত পালিয়ে যান। অবশেষে বর্ডার পেরিয়ে ঢুকে গেলেন ভারতের বনগাঁতে।

বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট পার্টি (সিপিবি) থেকে নির্দেশ ছিল, বনগাঁর ফরিদপুর ক্যাম্পে যোগাযোগ করার জন্য। এখানে তখন কম্যুনিস্ট নেতা মোকলেসুর রহমান, সন্তোষ ব্যানার্জী, ওয়ালিউর রহমান লেবু, কমরেড ফরহাদ, নুরুজ্জামান খোকন, শাহাবুদ্দিন বিশ্বাস সহ আরও অনেকে ছিলেন। কয়েকদিন পর তার সঙ্গে যুক্ত হয় একই শহরের কমরেড শওকত চৌধুরী, কমরেড হারান বিশ্বাস, মিরন বিশ্বাস সহ আরও কয়েকজন। কলকাতার লেনিন ইশকুলে বাছাই শেষে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হল আগরতলা ক্যাম্পে। সেখানে অগ্নিকন্যা মতিয়া চৌধুরী তাদের স্বাগত জানালেন। প্রতি জেলা থেকে আগত নেতাকর্মীদের নিয়ে ৪০০ জনের একটি দলকে আগরতলা থেকে অসমের তেজপুর সালোনাবাড়িতে নিয়ে আসা হয়। এখানে একমাস ট্রেনিং শেষে উচ্চতর গেরিলা ট্রেনিং-এর জন্যে তাদের পাঠানো হয় অরুণাচলের নেফাতে। দুটি জা্যগাতেই তাদের কমান্ডার ছিলেন কমরেড মঞ্জুরুল আহসান খান।

ট্রেনিং শেষে আবু হোসেন সহ ৪৬ জন কল্যাণীর অফিসে এসে রিপোর্ট করলেন। পার্টি নির্দেশে আসল নাম পরিচয় গোপন রেখে তারা শুধু চেস্ট নম্বর বলেছিলেন। ফলে ভারতীয় অফিসাররা তাদের আনট্রেইন্ড মনে করে ট্রেনিঙের জন্যে বিহারের চাকুলিয়া পাঠিয়ে দেন।

কিন্তু কেন তারা জানালেন না যে তারা বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা? বা ভারতীয় অফিসারদের সবাই কেন জানতেন না, এই বিশেষ গেরিলা বাহিনীর হদিস?

পাঠকদের কৌতূহল মেটাতে কমরেড আবু হোসেন এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে যা জেনেছি তা হল, একাত্তরের মে মাসে কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও ছাত্র ইউনিয়ন ‘সশস্ত্র সংগ্রামে নিজ উদ্যোগে পরিপূর্ণ অংশগ্রহণের’ সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি-ছাত্র ইউনিয়নের একটি যৌথ বিশেষ গেরিলা বাহিনী গঠন করা হয়। এই বিশেষ গেরিলা বাহিনী পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের জন্যে ভারত সরকার এবং  সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকারের সহযোগিতায় বিশেষ গেরিলা প্রশিক্ষণ ও উচ্চতর অস্ত্রশস্ত্র পেয়েছিল। এদের ট্রেনিং কিছুটা গোপনীয়ভাবে দেওয়া হত বলে অনেকেই ভালো করে এদের সম্পর্কে জানতে পারত না।

বিশেষ গেরিলা বাহিনীর প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রধান স্থান ছিল ভারতের অসমের তেজপুর। এছাড়া ত্রিপুরা, মেঘালয় ও পশ্চিমবঙ্গর বিভিন্ন স্থান। বাংলাদেশের কম্যুনিস্ট পার্টির সূত্রে জানা যায় যে, মুক্তিবাহিনীতে প্রায় ১২ হাজার এবং বিশেষ গেরিলা বাহিনীতে প্রায় পাঁচ হাজার ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি এবং ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মী ছিলেন।

চাকুলিয়াতে আবু হোসেনদের  সামরিক দক্ষতা দেখে চমকে যায় ভারতীয় আর্মি অফিসাররা। পরে তাদের ফিরিয়ে আনা হয় হয় এবং ৯ নং সেক্টরে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেকটর কমান্ডার ছিলেন মেজর জলিল। তিনি এই ৪৬ জন গেরিলা যোদ্ধাকে যুদ্ধে পাঠাতে আগ্রহী ছিলেন না। এক সময় মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ওসমানির নির্দেশে আবু হোসেনকে গ্রুপ কমান্ডার করে যুদ্ধে যেতে অনুমতি দিতে বাধ্য হলেন। পরের দিন ভারতীয় সীমান্ত দেবহাটা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করে তারা ব্যর্থ হয়। কারণ পাকিস্তান বাহিনী অত্যন্ত কড়া প্রতিরোধ তৈরি করে রেখেছিল। তারা চলে যান, খুলনা ক্যাম্পের কম্যুনিস্ট নেতা কমরেড রতন সেনের কাছে। সেখান থেকে রাতের অন্ধকারে নৌকা করে টাকি দিয়ে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। শুরু হয় দেশের অভ্যন্তরে তাদের গেরিলা যুদ্ধ। ক্রমশ যুদ্ধ করতে করতে নিজ শহর গোপালগঞ্জকে পাকিস্তানি মুক্ত করতে মুজিব বাহিনী, হে্মায়েত বাহিনীর সঙ্গে তারাও সাঁড়াশি আক্রমণ গড়ে তোলেন। অবশেষে ৭ ডিসেম্বর গোপালগঞ্জকে তারা শত্রু মুক্ত সক্ষম হন।

একজন বিদগ্ধ দেশপ্রেমী মানুষ, বয়সের ভারে ন্যুব্জ, কিছু স্মৃতি খোয়ানো গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, আজীবন সামাজিক আন্দোলনকারী একজন স্বচ্ছ সাহসী মানুষের কাছে তেমন কোনও প্রশ্ন করার ছিল না। ৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করেছিলেন বলে কয়েকজন ছাত্র সহ তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দাগী আসামির মত নিয়ে আসা হয়েছে থানায়। ছাত্রদের মুচলেকা না দিয়ে নিঃশর্ত মুক্তি আদায় করতে পারলেও তাকে চালান করে দেওয়া হয় জেলে। স্মৃতি হাতড়ে তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু কোনও দলের নিজস্ব নেতা নন। তিনি সমগ্র বাঙালি জাতির নেতা। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ একটি ধর্মনিরপেক্ষা রাষ্ট্র হয়ে উঠত। এভাবে সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতে পারত না।

হয়ত পারত না। কিম্বা পারত। কারণ এখন বঙ্গবন্ধুর সৈনিকরাই চাইছে বঙ্গবন্ধুকে ধর্মীয় লেবাসে ঢেকে দিতে। আজও ধর্মনিরপেক্ষাতার জায়গায় বহাল রয়েছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম।

ব্যক্তিগতভাবে আমি সংঘাত, দ্বন্দ্ব, শত্রুতা, সংঘর্ষ, অমীমাংসা, কূটকচালে ধ্বসে গেলেও হতাশাবাদী নই। শ্মশানের ছাই কিম্বা কবরের মাটিও উর্বর হয়ে ওঠে মৃত মানবের অস্থি, মজ্জা, রক্ত ও আমিষে। শেষ বলে কিছু নেই। আছে শেষতল। তল ফুঁড়ে শুরু হয় পুনঃজাগরণ, লতানো স্বপ্নের উর্ধ্বমুখীন বেয়ে ওঠা।

জানতে চেয়েছিলাম, এখন আপনার স্বপ্ন কী ?

স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের নাজুক অবস্থা দেখে তিনি কষ্ট পান। ক্ষুধা দারিদ্র্য, নারী ধর্ষণ, হত্যা, মুনাফেকি আর ধর্মান্ধ বাংলাদেশ তাকে ব্যাথা দেয়। তবু তিনি কাজ করে যান। অন্যায়ের প্রতিবাদে একা হলেও তার প্রতিবাদী কণ্ঠ শোনা যায় গোপালগঞ্জ জেলা শহরে। বর্তমানে তিনি জেলা কম্যুনিস্ট পার্টির সভাপতি এবং তার প্রতিষ্ঠিত অনির্বাণ ইশকুলের অধ্যাক্ষ। শত শত ছাত্রকে আলো দান করে চলেছেন এই আলোকস্তম্ভ। আশা জাগানিয়া স্বপ্নে আস্থা রেখে তিনি ভাবেন, হয়ত তার ছাত্রছাত্রীদের দ্বারাই একদিন বাংলাদেশ ফিরে আসবে ঐক্য, শিক্ষা, শান্তি ও প্রগতির সোনার ঘাটে। বিজয়ের মাস মহান ডিসেম্বরে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে তাকে শ্রদ্ধা জানাই। লাল সালাম কমরেড।

About চার নম্বর প্ল্যাটফর্ম 4722 Articles
ইন্টারনেটের নতুন কাগজ

Be the first to comment

আপনার মতামত...